Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৩৩

সে খলনায়ক পর্ব ৩৩

সে খলনায়ক পর্ব ৩৩
ফারহানা সানিয়াত

কিছু সুন্দর সম্পর্কের সমাপ্তি ঘঠনোর পিছে কতজনের ই না হাত থাকে। নিজেদের লাভের জন্য বন্ধুত্বের মত একটা মিষ্টি সম্পর্ক কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গিয়ে অবশেষে শেষ করে আলাদা করে ই দিল। অবশ্য নিয়তিতে এমনটাই লেখা আছে বা এর থেকেও হৃদয় বিধায়ক কিছু। কে জানে!
যাই হোক আপাতত প্রাণ প্রিয়ার দিনগুলো চলছে বাস্তবতা মেনে। তার আশ্রম, স্কুল, শখের ড্রইং এগুলো নিয়ে দিন কাটছে। নিজেকে অল্প বয়স থেকে যে মেয়েটা সামলে নিতে জানে।
সময় কেটে যাওয়ার সাথে সাথে ইভানের সাথে তার আর দেখা হয়নি শুধু একটা মেসেজ এসেছিল
” আমি এমন একজন তোর বেহায়া প্রেমিক যে বাস্তবতার মঞ্চে হেরে গেছি। ভালোবাসার কথা বলতে পারলেও নিজের করার জোর হলো না। সত্যি বলছি প্রিয়া ঝুকে গেছে মাথা আমার ।উপরওয়ালা এমন এক পরিস্থিতির মাঝে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল যেখান থেকে তোকে চাওয়া ছিল কঠিন। আমার ভালবাসা সমুদ্রে আমি একাই ডুবতে ডুবতে হারিয়ে গেলাম, অনেক দূরে অনেক।

বলেছিলি আমি যদি সম্মানের সাথে তোকে নিজের করতে না পারি তাহলে আর যোগাযোগ রাখতে না। দেখ সত্যিই যোগাযোগ আর হবে না। তবে একটা রিকোয়েস্ট বন্ধুত্ব শেষ হওয়ার কথা ছিল দয়া করে বন্ধুত্ব আমাদের মধ্যে শেষ না হোক, যদি কখনো সামনাসামনি দেখা হয় আমি ভালবাসার মানুষ না হতে পারলাম বন্ধু হিসেবে যেমনটা আমরা আগে ছিলাম ঠিক সেভাবেই আমরা কথা বলবো প্লিজ”
তার শেষ মেসেজ,,প্রাণপ্রিয়া এর উত্তরে কিছুই লিখেনি শুধু চোখ দিয়ে দু ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়েছিল, এমনটা তো হাওয়ার ই ছিল তাই না।
প্রাণপ্রিয়া হা করে শ্বাস ফেলে সে আপাতত আশ্রমে মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করে। আগে মত তার মুখে হাসি প্রানোচ্ছল ভাব টা নেই।
মিসেস সেলিনা রহমান দুজন মিলে আশ্রমের পুরো উঠান ঝাড়ু দিচ্ছিলেন তারা প্রাণপ্রিয়াকে দেখে মুখে ক্লান্তি ভাব নিয়ে থেমে সোজা হয়ে দাঁড়ান।

__ টিচার্স মিটিং কেমন হলো প্রিয়া,
সেলিনা জিজ্ঞেস করেন।
স্কুলের মিটিং ছিল প্রাণপ্রিয়া সেখান থেকে সে মাত্র ফিরলো ।
__ ভালো, তার বিরস কণ্ঠ
রহমান হাতের ঝাড়ু মাটিতে রেখে হাসিমুখে বলে ওঠেন,
__ শুনেছি তোমাকে স্কুলে নাকি পার্মানেন্ট ভাবে চাকরিতে নিচ্ছে শুধু ড্রয়িং টিচার হিসেবে না। আমি কিন্তু অনেক খুশি হয়েছি।
সেলিনা অবাক কণ্ঠে মুখে হাত দিয়ে বলেন,,
__ কি বলছেন ভাইজান এটা সত্যি?
প্রাণপ্রিয়া দুজনের মুখে প্রতিক্রিয়া দেখে আবারো হা করে শ্বাস ফেলে, দু দিন আগের কথা তার খারাপ সময় যাওয়া মধ্যে একটা ভালো খবর প্রাইমারি স্কুলে শুধু ড্রয়িং না পার্মানেন্ট ভাবে চাকরি যেকোনো সাবজেক্টে তাকে পড়াতে হবে । বিস্মিত প্রাণপ্রিয়া কিছুক্ষণ তব্দা লেগে বসে ছিল হেডমাস্টারের কথা শুনে, কারন তার কাছে এখনো এইচএস এর সার্টিফিকেট নেই রেজাল্ট বের হয়নি আর পার্মানেন্ট হওয়া কি এত সহজ নাকি কিন্তু এটাই সত্যি যে সে পার্মানেন্ট ভাবে চাকরি পেয়েছে।
সেলিনা খুশিতে গদগদ হয়ে হাতে আবারো ঝাড়ু নিয়ে উঠান ঝাড়ু দিতে দিতে বলেন,,
__ যাক ভালো হয়েছে মন দিয়ে বাচ্চাদের পড়াশোনা করাবে আমি যে কি খুশি, পাশে রহমান স্বচ্ছ হেসে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে সেও ঝাড়ু দেওয়া শুরু করেন।
প্রানপ্রিয়া ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা টেনে আশ্রমের দিকে হাটা ধরে, আজ কাল যে তার জীবনে কি থেকে হচ্ছে সে নিজেও জানে।

খাঁচার ভিতর পাখির কিচিরমিচির শব্দ এখন আর সে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছটফট করে না। অভ্যাস হয়ে গেছে বন্দি থাকার এই যে দামিয়ান‌ তাকে খাঁচা খুলে খাবার দিচ্ছে তার পালানোর কোনো চেষ্টা নেই। দামিয়ান তার আঙ্গুল পাখির দিকে এগিয়ে দেয়। সাথে সাথে পাখিটি তার সুরু ঠোঁট দিয়ে ঠোকোর দেওয়ার চেষ্টা করে।
__ স্যার আসবো? দরজার বাহির থেকে আকম্মিক নিলয়ের কন্ঠ।
দামিয়ান পাখির দিকে দৃষ্টি রেখে ভেতরে আসার অনুমতি দেয়।
নিলয় প্রবেশ করে দামিয়ানের থেকে কয় এক হাত দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ায়।
__ ডক্টর ইসরাফিল খানের ছেলে র এক সপ্তাহ পর রাশিয়া যাওয়ার ফ্লাইট সবকিছু ঠিকঠাকভাবে ব্যবস্থা হয়ে গেছে,
দামিয়ানের ঠোটের কোণে হাসি ফুটে উঠে,,
আর মিস প্রাণপ্রিয়ার চাকরিও পার্মানেন্ট ভাবে হয়ে গেছে।দামিয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে নিলয়ে দিকে তাকায়,
__ আমি সব নিখুঁতভাবে করেছি মিস্টার আবরারের আদেশ হয়েছে এমনটাই বোঝানো হবে।
দামিয়ান খাঁচার ভেতর থেকে হাত বের করে পাশের সোফায় গিয়ে বসে।
__ গুড, এই মাস থেকে তোমার বেতন তিনগুণ বাড়ানো হবে।
নিলয় অত্যন্ত খুশি হয় মাথা নত করে, ধন্যবাদ স্যার।
দামিয়ান পায়ের উপর পা তুলে সামনে টেবিলে রাখা ফুলদানি দিকে তাকায় যেখানে কিছু সাদা সতেজ গোলাপ রাখা।

__ যাও অন্য কাজে এখন ব্যস্ত হতে পারো।
নিলয় মাথা নাড়ায় জী স্যার ,এরপর যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই চলে যায়।
নিলয় যেতেই দামিয়ান হাত বাড়িয়ে একটা সাদা গোলাপ হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখা শুরু করে,
এতে সুন্দর একটা মিষ্টি গ্রান তার নাকে গিয়ে বাজতেই কিছুটা শব্দ করে হেসে সোফার মাথা হেলিয়ে দেয়।
এখন থেকে আমি যা চাইবো তোমার জীবনের সেটাই হবে মিস প্রাণপ্রিয়া তুমি বুঝবেও না আমি তোমাকে তোমার অবস্থানে রেখে ধীরে ধীরে তোমার জীবন গ্রাস করব। আমার যে এখন তোমাকে চাই তোমার সৌন্দর্য, শরীর ,অসহায়ত্ব, কান্না, ভয় সব হবে আমার। তোমার মধ্যে ডুবে আমি নেশায় মত্ত হবো ।
দামিয়ান চোখ বন্ধ করে হাতের গোলাপ ঠোঁটে হালকা স্পর্শ করে মনে পড়ে তার ঠোঁটের স্বাদ আর শরীরের সুবাস।
দামিয়ান ফের হাসে,
তবে সে জানে প্রাণপ্রিয়া মেয়েটি কতটা পবিত্র সরল নরম মনের একটি মেয়ে তাকে পেতে হলে তার মত করে পেতে হবে। অবশ্যই দামিয়ান আবরার কোনো কিছুতে তাড়াহুড়ো করে না পরিস্থিতি অনুযায়ী যেভাবে ডক্টরের ছেলেকে সরিয়েছে ঠিক তাকে ও সে অধিকার করবে।

আজ অনেক দিন পর হঠাৎ সারা প্রাণপ্রিয়া কে নিয়ে যাওয়ার জন্য আশ্রমে একজন সার্ভেন্ট পাঠিয়েছিল।
তাকে দিয়ে নাকি দেয়ালে কি পেন্টিং করাবে। প্রয়োজনে যেতে বলেছে অবশ্যই যেতে হবে তাই টিচার্স মিটিংয়ে পড়া শাড়ি পরেই প্রানপ্রিয়া তার আর্ট করার সরঞ্জাম নিয়ে সার্ভেন্টের সাথে আবরার ম্যানশনের উদ্দেশ্যে বের হয়ে ছিল। আপাতত সে সারার বেড রুমে দৃষ্টি নত করে এক পাশে দাঁড়িয়ে। সুবিশাল ঘরে একটা মেয়ের যাবতীয় যা প্রয়োজন সব ই আছে ধনী পরিবারের একমাত্র ছেলের বউ হবে বলে কথা এখন থেকেই তার ঘর সাজানো হচ্ছে তবে এখানে প্রানপ্রিয়ার মতো মেয়ের আনাড়ি হাতের পেন্টিং?
__ এই দিক টায় দেখ প্রিয়া আমার এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কিছু পেন্টিং করে দিবে। পারবে না? হাসিমুখে সারা জিজ্ঞেস করে।
প্রানপ্রিয়া চোখ তুলে তাকায় কোনো রকম কথা না বলে হ্যাঁ সূচক মাথায় নাড়ায়।
সারার মুখের হাসি ঘাঢ় হয়। প্রানপ্রিয়ার কাছে গিয়ে ঘুরে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলে,
__ আমি জানতাম তুমি পারবে। প্রকৃতির কিছু পেন্টিং করা নিয়ে তোমার থেকে ভালো কেউ পারবেনা। প্রথম আমি চেয়েছিলাম প্রফেশনাল লোক দিয়ে করাতে কিন্তু আমার শ্বশুরের আশ্রমের প্রতিভান মেয়ে যার সাথে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক তাকে কিভাবে ভুলে যাই বলো।
যাইহোক মনোযোগ দিয়ে পেন্টিং করবে আমার যাতে অবশ্যই পছন্দ হয়।
বলেই সারা সরে দাঁড়ায়,

__ আমি অবশ্যই আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করবো, প্রানপ্রিয়া বলে।
__ সেটা তো করতেই হবে এর জন্যই তো আগে থেকে এর মূল্য পাচ্ছো।
সারা কিছু টা সামনে এগিয়ে টেবিলের উপর রাখা তার ব্যাগ থেকে সাদা টাকার খাম বের করে।
__ এটা তোমার পেন্টিংয়ে মূল্য। পিছে ঘুরে সারা প্রানপ্রিয়াকে দেখিয়ে টেবিলের ওপর ঠাস করে রাখে।
প্রানপ্রিয়া দৃষ্টি নত করে। সারা বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল ভাব ভাব,,
__ আজ অবশ্যই আর্ট করে শেষ করতে পারবে না কাল ও তোমার আসতে হবে। ভালোই হলো তোমার সাথে আড্ডা দেওয়া যাবে এমনিতে তুমি তো নিজে থেকে আসোই না।
সারার কথায় প্রানপ্রিয়া ঢোক গিলে,
সারা প্রাণপ্রিয়ার দিকে দৃষ্টি ফেলে‍,
চুপচাপ হয়ে গেছো আগের থেকে বেশি এর কারন ইভান ?
ইভানের কথা তোলার জন্য প্রানপ্রিয়ার ভেতরটা হঠাৎ চিলিক দিয়ে উঠে তবে কিছু প্রত্যুত্তর দেয় না।
সারা টেবিলের ওপর রাখা ব্যাগ টা হাতে নিয়ে প্রানপ্রিয়ার কাছে যেতে যেতে বলে।

__ সত্যি বলতে আমার কাছে তোমাদের দুজনকে অনেক ভালো লাগতো বার্ট কি করার উচ্চ সাথে শ্রেণী নিম্ন এই সমাজে কেউ মেনে নিবে সম্মানের তো ব্যাপার আছে।
সারা প্রানপ্রিয়ার কাছে দাঁড়ায়, প্রানপ্রিয়ার পড়নের গারো মেরুন রঙের শাড়ি যা তার ফর্সা শরীরে ফুটে আছে।
রুপ থাকলে ই তো হয় না সব কিছু পাওয়ার যোগ্যতাও থাকতে হয়।
সারার অপমানে মুহূর্তে প্রানপ্রিয়া হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয় কোনভাবে নিজেকে সামলে অপমান গিলে ফেলে।
সারার ঠোঁটের কোণে হাসি,
__ কিছু মনে করোনা আমি কিন্তু তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বলছি না।
প্রানপ্রিয়া মাথা নাড়ায় হুম। তার কম্পিত কণ্ঠ।
সারা ফিচেল হাসে, তার বাহিরে যেতে হবে তাই আর কথা না বাড়িয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী আরো কিছু আর্ট আর কোথায় রেখে রং মিশ্রণ করবে দেখিয়ে তার জুতোর ঠকঠক শব্দের সাথে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
প্রানপ্রিয়া চোখ বন্ধ করে ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে মনকে শক্ত থাকতে বলে অল্পতেই ভেঙে গেলে চলবে না ।

পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে চারদিক থেকে আসরের আজান প্রাণপ্রিয়া দক্ষতার সাথে দেয়ালে পেইন্টিং করছে কিন্তু সময়ের কমতির জন্য থেমে যায়।
এবার আশ্রমে যাওয়া উচিত। সে বলে কয়েক কদম পিছনে গিয়ে সম্পূর্ণ পেন্টিং টা কিছুক্ষণ দেখে। অতঃপর হা করে শ্বাস ফেলে চোখ সরিয়ে সামনের টেবিলে রাখা তার আর্ট করার সব সরঞ্জাম গুছিয়ে এক পাশে রেখে নিজের পরনের শাড়ি ঠিক করে।
তার ঠিক করার মাঝে একজন মহিলা সার্ভেন্ট ঘরে প্রবেশ করতে ই প্রাণপ্রিয়া তাকে সব কিছু বুঝিয়ে আশ্রমের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয় ।
দোতারার শেষ প্রান্তে সারা ঘর হওয়ার কারণে কিছুটা হাটঁতে হবে কিন্তু পা যেন চলছে না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেন্টিং করার জন্য কোমর পিঠ পা ব্যথা হয়ে গেছে। তার মধ্যে রং ধরার কারনে হাতের অবস্থা বেহাল দশা শাড়িতেও কিছু জায়গায় লেগেছে হয়তো মুখেও লেগেছে ,

সে খলনায়ক পর্ব ৩২

নিজের ভাবনায় সে অলস ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে।
কিন্তু আকম্মিক পিছন থেকে পরিচিত পুরুষালী ভারী কন্ঠে,
__ মিস প্রাণপ্রিয়া!
সাথে সাথে থেমে যায় প্রানপ্রিয়ার পা। ব্যাথা শরীরে হঠাৎ কম্পন অনুভব করে আস্তে আস্তে ভেতরটা ভারী হয়ে যেতে থাকে।

সে খলনায়ক পর্ব ৩৪