সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩২
মৃধা মৌনি
পৌষের ভোর। গ্রাম জুড়ে তখনো কুয়াশার ঘন চাদর, চারপাশ ঢাকা হিমেল ধোঁয়ায়। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছে বাঁশঝাড়ের পাতা। শিশিরে ভিজে আছে মেঠো পথ আর দূর্বাঘাস। পূর্ব আকাশে লাজুক লালচে আভা ফুটলেও সূর্যের তেজ পৌঁছায়নি ধরিত্রীতে। এরই মধ্যে দূর থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি, আর উঠোনে মাটির চুলোয় কাঠ পোড়ার ধোঁয়ার সাথে মিশে যাচ্ছে সদ্য তোলা খেজুর গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ। দাওয়ায় বসে কেউ কেউ আরাম করে খেজুর পাতা দিয়ে বোনা চাটাইয়ে বসে জড়োসড়ো হয়ে হাতে নিচ্ছে ভাপ ওঠা এক ভাঁড় চা। শীতের জড়তা ভেঙে গ্রাম ধীরে ধীরে কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে।
এই কুয়াশা আর ঠাণ্ডার মধ্যেই চপল পায়ে দৌঁড়াচ্ছেন খালেদা, সঙ্গে মিষ্টি। কিন্তু পায়ে যতটা গতি, মেজাজটা তার তার চেয়েও বেশি তেতে আছে; বলা যায় একশোতে একশো! মনে মনে তিনি ক্রমাগত বকে চলেছেন বকুলকে। ভারী পাজি মেয়ে তো! হলুদের অনুষ্ঠান কেউ পুকুর পাড়ে করে? সামনে এত বড় উঠোন ফেলে সে কি না ওই পুকুর ধারে প্যান্ডেল সাজাতে বলেছে!
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
খালেদা বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বকুল উল্টে পণ ধরে বসেছে। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘হলুদ মাখালে ওখানেই মাখাব। উঠোনে সাজালে আমি বসবোই না। শেষে তুমি বসে যেয়ো ফুপু। তোমার বিয়েতে হলুদ টলুদ হয়েছে কি হয়নি- আমার বদলে তুমিই গায়ে হলুদ দিও!’
এটা একটা কথা? খালেদা রাগে গজগজ করতে করতে ভাবলেন, দিন দিন অসভ্য হচ্ছে মেয়েটা। আগে কী শান্তশিষ্ট ছিল! আর এখন- যবে থেকে শান্তর সাথে পাকাপাকিভাবে বিয়েটা ঠিক হয়েছে, মেয়ে যেন হাতির পাঁচ পা দেখে ফেলেছে। সারাক্ষণ লাফালাফি, দৌড়ঝাঁপ! খালেদা বড় বিপদে পড়েছেন। এই বয়সে এত দিকে সামলানোর শক্তি কি তার আছে? সে কথা এই মেয়েদের বোঝাবে কে? একটা নিঃশ্বাস ফেলে তিনি পাশে তাকালেন, মিষ্টির মুখটাও ভার।
‘কিরে, তোর আবার কি হলো?’ প্রশ্ন করলেন তিনি।
তাতে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল মেয়েটা, ‘কিছু না।’
‘অমন প্যাঁচা মুখ বানিয়েছিস কি জন্যে? দুই বান্দরনী তো আমায় জ্বালিয়ে মারলো, এখন তোর কি চাই আবার, বলে ফেল…’
মিষ্টি তেতে উঠল, খুব পাকা গলায় বলল, ‘খবরদার বুড়ি, একদম আমার বেস্টিদের যদি বান্দরনী বলো- তোমায় চোবাবো, ওই পুকুরে…’
‘বাপরে বাপ, এইটুকু মরিচের ঝাল দেখো!’
‘হুহ।’ মুখ ভেংচিয়ে অন্য দিকে তাকাল আবারও।
খালেদা দরজা ধরে দাঁড়ালেন। সামান্য ফাঁক করতেই এক ঝলক আলো ছলকে বেরিয়ে এলো বাইরে। দীক্ষা উবু হয়ে কাজ করছে। লম্বা চুলগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বুকের ওড়না পাশে পড়ে, গাল বসে গেছে, চোখের তলায় কালি জমেছে- আছে কোনো খেয়াল? এই মেয়ে ডুবে গেছে কাজ নিয়ে… দিনকে দিন শুধু বড়ই করে চলেছে তার নিজস্ব হাতে তৈরি পোশাকের বুটিক। এটাকে এখন কারখানা করার পরিকল্পনা। খালেদা সবই দেখেন, বোঝেন, কিন্তু এত এত পরিশ্রমের মাঝেও নিজের একটু খেয়াল রাখতে এত অনীহা থাকবে কেন? শত বুঝিয়েও কোনো ফলাফল হয়নি তাই আজকাল আর বোঝাতে যান না তিনি…
নিঃশব্দে ভেতরে পা দিতেই দীক্ষা উবু অবস্থা থেকেই শুধালো, ‘বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন মা?’
খালেদা চমকালেন না, সামান্য হাসলেন, ‘ভুলেই যাই, তুই যে ছত্রিশটা মাথা নিয়ে জন্মেছিস।’
দীক্ষা সোজা হয়ে বসল, ‘এই সাত সকালে মেজাজ খিঁচিয়ে রেখেছ কেন মা? আজকে একটা শুভ দিন।’
‘তোমরা আমার কথা শুনলে তো আর মেজাজ খারাপ হয় না। তোমরা কেউ শোনো এই বুড়ির কথা? সবাই বড় হয়ে গেছ, যার যার ইচ্ছানুযায়ী সবকিছু করো।’
‘আবার কি হলো?’ দীক্ষা মিষ্টির দিকে তাকাল, ‘কিরে, কি করলি আবার? নানী চেতছে কেন?’
মিষ্টি ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘আমি আবার কি করব বেস্টি নাম্বার ওয়ান? তোমার মা হচ্ছে একটা পাগল…আমাকেও ঘুম থেকে তুলে হাঁটাচ্ছে দেখো না।’
মিষ্টি এগিয়ে এসে বিছানায় উঠল। কাগজ পত্র ছড়ানো ছিটানো এদিক ওদিক। তার মাঝখানেই একটুখানি জায়গা করে নিলো। শুয়ে পড়ল গুটিশুটি দিয়ে। অপেক্ষা করল না আর। চোখ বন্ধ করতেই হারিয়ে গেল গাঢ় ঘুমের গভীরতায়। সেদিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করে দীক্ষা। কম্ফোর্টটা টেনে দেয় গলা অবধি। তারপর তাকাল মায়ের দিকে, ‘কি হয়েছে মা? তুমি এমন অস্থির অস্থির করছ কেন?’
খালেদা এগিয়ে এসে নিজেও বসলেন, ‘বকুল কি এক পণ করল দেখ তো। পুকুর পাড়ে কেউ হলুদ করে?’
‘করলে সমস্যা কি?’
‘সবখানে সব করতে নেই। পুকুর ঘাটলার আশেপাশে অনেক খারাপ…’
‘ভূত থাকে?’ মুখের কথা কেড়ে নিলো দীক্ষা, ‘মা!’
খালেদা হঠাৎ ভোঁতা স্বরে বললেন, ‘ঠিক আছে। কর যা করার, আমি আর কিছুই বলব না। দুনিয়ার এত জায়গা থাকতে ওখানে ম র তে হবে হা রা ম জা দীর। মরুক! আমার দল ফাঁকা, রমিলাটা থাকলে..’
তিনি চুপ করে গেলেন। এমন শুভ দিনে তাকে তো মনে পড়বেই। সে যদি আজ থাকত, দু’জন মিলে কত আনন্দ উল্লাস করতে করতে বকুলের বিয়েটা দিতেন! দীক্ষা মায়ের শূন্যতা বুঝতে পারে। সে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। তার কোলের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল আচমকাই, চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। খালেদা মৃদু হাসলেন, নিজের সন্তানকে বুকে আগলে নিলেই সব ফাঁকাস্থান পূর্ণ হয়ে ওঠে, তাই না?
তিনি ওর মাথায় ধীরস্থির ভাবে হাত বোলাতে লাগলেন৷ দীক্ষা চোখ বুঁজে সেই আরামটুকু নিতে নিতে জানাল, ‘ওই জায়গাটায় তুমি কি দোষ খুঁজে পাও জানি না তবে বকুলের অনেক প্রিয়৷ কেন প্রিয় এত ব্যাখ্যা তোমায় দিতে পারছি না, তবে বলব বিশ্বাস আর ভরসা রাখো। কিছুই হবে না। আয়োজনটা যাদের, তাদের পছন্দ অপছন্দই তো ভাবতে হবে মা, তাই না?’
‘ওর তো গতি হচ্ছে, তোর কি হবে? তুই কি আর…’
দীক্ষা উঠে বসল, ‘ইশ ভুলেই গেছি মা, একটা কুর্তির ডিজাইন আজকের ভেতর করে দিতে হবে৷ কাজ শুরু করবে। আজকে না করতে পারলে আগামী ৩-৪ দিন আর করতে পারব না, দেখি তুমি যাও তো মা, আমি কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করি। পারলে এক কাপ চা দিও আমাকে মা। আর বকুলকে উঠিয়ো না, ঘুমাক মেয়েটা।’
দীক্ষা যে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল, সেটা বুঝতে খালেদার একটুও অসুবিধা হলো না। মেয়েটা এমনই, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে সে কিছুতেই রাজি নয়। তার সমস্ত চিন্তা-ভাবনা এখন শুধু তার সন্তানকে ঘিরে, তার মিষ্টিকে নিয়েই।
কিন্তু নিজেকে নিয়ে ভাবা কি তবে অপরাধ? বয়স তো থেমে থাকে না। একসময় পাশে কি কেউ থাকবে না—একজন সুন্দর জীবনসঙ্গী ছাড়া? সুখ-দুঃখের গল্পগুলো ভাগ করে নিতেও তো একজন মানুষের প্রয়োজন হয়। এসব কথা এই মেয়েটাকে বোঝাবে কে? খালেদা জানে, তার সাধ্যেও তা নেই।
শিশিরের সঙ্গে ডিভোর্সের পর বহুবার, অসংখ্য চেষ্টা করেছেন তিনি- কিন্তু দীক্ষা এসব কথা শুনতেই রাজি নয়।
খালেদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠতে নিতেই দীক্ষা তাকে আবার জড়িয়ে ধরল, তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল ধাপ করে। খালেদা চমকে হাসলেন, মেয়েটার চুলগুলি আবারও এলোমেলো করে দিতে লাগলেন, দীক্ষা ওভাবেই মুখ গুঁজে রেখে নরম স্বরে বলল, ‘বিধাতা আমার জন্য যা লিখে রেখেছে তা তো হবেই মা। কেন এত পেরেশান হচ্ছো? আমি আর কিছুতে ভয় পাই না। তুমি তো জানো না, তোমার মেয়েটা কত শক্ত হয়েছে…!’
‘তুই ভালো থাক, এইটুকুই আমার চাওয়ারে মা। তোর সুখ দেখে যেন বিধাতা আমাকে নেন…’
‘উফ মা, এসব বলো না তো,’ দীক্ষা উঠে বসে পুনরায় কাজ করতে শুরু করল, ‘এক কাপ চা দিও মা, আর রুটি থাকলে একটা পাতলা রুটি। কাজটা শেষ করেই ঘন্টা দুয়েক ঘুমাবো।’
‘পিঠা খাবি?’
‘না, এই সাত সকালে মিষ্টি খাবো না।’
‘আচ্ছা৷’
নিজের হাতে চা-রুটি নিয়ে ঘরে ঢুকে খালেদা দেখলেন, দীক্ষা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। মিষ্টিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মা-মেয়ে দু’জনই কম্বলের ভেতর কী শান্ত, কী আরাম করে ঘুমোচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে খালেদার প্রাণটা জুড়িয়ে গেল।
তিনি আলতো করে বিড়বিড় করে পড়লেন, ‘মাশা আল্লাহ… মাশা আল্লাহ।’
আর বিরক্ত করলেন না। ধীরে, খুব ধীরে দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন তিনি।
সেই ঘটনাটার কতদিন হয়ে গেল?
খালেদা ভাবছেন- আঙুল কষে হিসেব করতে গেলেও যেন আউলে ফেলা লাগে। সময়টা কেমন ধোঁয়াশা হয়ে গেছে। মিষ্টির তিন নম্বর জন্মদিন গেল এইতো, মাস দুয়েক আগেই। সেই সময়টায় প্রকৃতির মেজাজ ছিল বড়ই মনোরম; শীত ছিল না বটে, তবে ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তিটুকুও ছিল না। সন্ধ্যের আলো তখনো নিভে যায়নি পুরোপুরি, কেক কাটার সেই হুড়োহুড়ি আর ছোট্ট মেয়েটার বাঁধভাঙা আনন্দ! দীক্ষা অবশ্য প্রথমে মানা করেছিল, ‘কেক টেক কাটার কী দরকার’, আর তাতেই মেয়ের সে কি কান্নাকাটি! শেষে মাগরিবের আজানের পরপরই একরাশ বিস্ময় নিয়ে উদয় হলো আরহাম আয়ান- বিশাল এক কেক আর মস্ত কয়েকখানা উপহার হাতে নিয়ে। অরুণিমাভ এসে দীক্ষার হাতে তুলে দিলেন জমকালো এক জামদানি। তাঁর চোখে-মুখে লাজুক হাসি, অস্ফুটে বললেন, ‘সবাই তো মেয়েকে দিচ্ছে, আমি দিলাম মেয়ের মা’কে।’
সেই রাতভর চলল বিরিয়ানি রন্ধনের তোরজোর। রাত বারোটা পেরিয়ে গেল যখন খেতে বসল সবাই। না হবে না হবে করেও শেষমেশ কী এক হৈ-হুল্লোড়ের উৎসবেই না পরিণত হলো সেই সন্ধ্যা! খালেদা মনে মনে কেবলই ভাবেন, সময় কত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলে। কারো জন্য এক পা থমকে দাঁড়ানোর বালাই নাই। কে বাঁচল, কে মরল- সেসব দেখে নাকি সময়? সে শুধু সবার হিসেব মনে রেখে চলতে থাকে। চলতে চলতে ফিরিয়ে দেয়, যে যা হারিয়েছে অবহেলায়, অপ্রাপ্তির খাতায় শূন্যতা যার বেশি- তাদের ফিরিয়ে দিতে দিতে!
দীক্ষার স্বপ্নের প্রাঙ্গণ ‘রুদ্রাণী’ এখন ধুম গতিতে ছুটছে। শুরুটা হয়েছিল একটা নিছক আবেগ বশত; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দীক্ষার নতুন নতুন ডিজাইনের আবিষ্কার, আর সুতা দিয়ে কাপড়ের জমিনে ফুটিয়ে তোলা সেসব কারুকাজের মনোমুগ্ধকর সূক্ষ্মতায় মুগ্ধ হয়েই রিপিট কাস্টমারের সংখ্যা কেবল বেড়েই চলল। যারা একবার ‘রুদ্রাণী’র স্পর্শ পেয়েছে, তারাই অন্যদের কাছে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে প্রচার করেছে। অর্ধেকেরও বেশি কাস্টমার এখন আসে রেফারেন্স সূত্রে। এইতো দিন কয়েক আগে একটা বড়সড় লট পাঠানো হলো লন্ডনে। যিনি নিলেন, তিনি এর আগেও নিয়েছিলেন, তবে কম পরিমাণে। তার ওখানেও একটা ছোট ব্যবসা আছে, মূলত সেটির জন্যই। প্রথম লট প্রায় পুরোপুরি বিক্রি হয়ে যাওয়ায় এবার তিনি নিয়েছেন আরও বেশি করে।
দীক্ষার আগ্রহ আর স্বপ্ন দুটোই যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দিন দিন। এখন তার মনে দানা বেঁধেছে একটি কারখানা খোলার ইচ্ছে। আর কত এভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ দিয়ে আসবে? কারখানা হলে একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে সবাই সেখানে এসে কাজ করে দিয়ে যেতে পারবে, মাস শেষে পাবে সুনিশ্চিত বেতন। ‘রুদ্রাণী’কে আরও বড় আকারে দেখার যে স্বপ্ন দীক্ষার হৃদয়ে জন্ম নিয়েছে, তার অনুভূতি অন্যরকম, ভাষায় ব্যাখ্যা করা যেন দায়।
আর এই পথে দীক্ষা একা নয়। তার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে চলেছে বকুল, আর শান্তও!
মালামাল আনা-নেওয়ার যাবতীয় গুরুদায়িত্ব এখন শান্তর কাঁধে। সম্প্রতি তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে কাজল, বিনিময়ে সেও নিয়মিত বেতন নিচ্ছে। আর বকুল? সে তো দীক্ষার ডান হাত! কীভাবে কীভাবে যেন নিজের চেষ্টাতেই সে কিছু অনন্য ডিজাইন আর কালার প্যালেট আবিষ্কার করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে সবাইকে। কাস্টমাররাও তার ডিজাইনের দারুণ সমাদর করেছে। একটি ফুলেল বাগানে দোয়েলের থিম নিয়ে বকুলের বানানো কুর্তিটি এতটাই সুন্দর ফুটেছে কাপড়ে যে- এখন পর্যন্ত সেটাই ‘রুদ্রাণী’র সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ডিজাইন। কাপড়ে যেন রঙের ছোঁয়ায় এক টুকরো প্রকৃতিই জীবন্ত!
সবকিছুই তো চলছিল সুন্দর, মসৃণ গতিতে। ‘রুদ্রাণী’র প্রগতির পথে দীক্ষা, শান্ত, বকুল- প্রত্যেকের পদক্ষেপেই ছিল সাফল্যের ছোঁয়া। তবুও কোথাও একটা ফাঁকা ফাঁকা, খালি খালি লাগত খালেদার। আর সেই শূন্যতা যে কিসে, তাও তিনি বিলক্ষণ জানতেন। মন ভরে উঠলেই কোনো এক কোণে বাজত এক অপূর্ণতার সুর।
শান্ত আরও আগেই বকুলকে নিজের জীবনসঙ্গী করতে চেয়েছিল। প্রেমের সে কী গভীরতা! কিন্তু বকুলের দিক থেকে ছিল স্পষ্ট বারণ। তার ভাষ্য ছিল পরিষ্কার- শান্ত যেদিন নিজের পায়ে পুরোপুরি দাঁড়াতে পারবে, যেদিন সে স্বাবলম্বিতার চূড়ান্ত প্রমাণ দেবে, সেদিনই সে বিয়ের ব্যাপারে ভাববে।
কথা শুনে শান্তর জবাব ছিল স্বভাবসুলভ সরলতায় মোড়া, ‘আমি কি অন্যের পায়ে দাঁড়াই নাকি? এই দেখ, নিচে তাকা, আমার পা দিয়েই আমি দাঁড়াই আছি!’
শান্ত হয়তো ভেবেছিল এই রসালাপে বকুল হেসে উঠবে, কিন্তু বকুল মোটেই হাসল না। বরং তার চোখে ছিল এক দৃঢ় সংকল্পের প্রতিচ্ছবি। সে কড়া ভাষায় বুঝিয়ে দিল, শান্তর বাবার অর্থ-সম্পদ যা থাকে থাকুক, তাতে তার কোনো আগ্রহ নেই। সে স্বামীর টাকায় রাজরানী হতে চায়, কিন্তু সেই স্বামীর উপার্জন হবে একান্তই তার নিজের। বকুল চায়, বিয়ের দেনমোহর শান্ত তার নিজের ইনকামের টাকায় পরিশোধ করবে। সে আরও চায় না যে, তার নাকের ফুলের দামটাও শান্তর পরিবার দিক- ওটা যেহেতু শান্তর নামে পড়বে, তাই ওটার খরচ শান্তই দেবে… নিজের অর্জিত আয় দিয়ে!
শান্ত কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল বকুলের চোখে। তার প্রেমিকা শুধু ভালোবাসা চায় না, চায় তার ভালোবাসার মানুষের আত্মমর্যাদা আর স্বনির্ভরতার প্রমাণ। এই চাওয়াটা শান্তর মন ছুঁয়ে গেল। সে গভীরভাবে কথা দিল, ‘এইটুকুই চাওয়া তো তোর? ঠিক আছে, আমি পূরণ করব, কথা দিলাম। দুটো বছর দে- আমি তোকে স্বর্ণে মুড়িয়ে নেবো, নিজের টাকায় কিনে। তবে তুই শুধু আমারই থাকবি, এইটুকু কথা দিবি?’
বকুল তখন সলজ্জে শান্তর দিকে তাকালো। তার মুখে ফুটে উঠল এক স্নিগ্ধ হাসি। সেই হাসিতে প্রতিজ্ঞা আর গভীর আস্থা মেশানো। সে ফিসফিস করে বলেছিল, ‘এত বছরেও তো কারো হইনি, আপনি আমার হবেন কিনা তা না জেনেও অপেক্ষা করে গেছি। আর এখন যখন জানি আপনি আমার, তখন কেন অন্যের হব আমি?’
সেই মোতাবেক দুই বছর নয়, বরং তিনটি দীর্ঘ বছর পার হলো। সময় হয়তো কিছু বেশি নিয়েছে, কিন্তু শান্ত তার প্রতিজ্ঞা পূরণ করেছে। আজ সে মাথা উঁচু করে বকুলের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আর অরাজি হওয়ার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। শান্ত এখন কেবল দায়িত্বশীল নয়, স্বাবলম্বীও। সবাই সানন্দে এই প্রস্তাবে রাজি হলো। তারিখ পড়ল- আজ গায়ে হলুদ, আর কাল শুভ বিবাহ!
খালেদার মন আজ খুশিতে ভরে আছে। আগামীকাল তার এই বাড়ি, এই ঘর ঝলমল করে উঠবে। লাল টকটকে বেনারশীতে সাজবে তার আরেক মেয়ে বকুল। ঠিক এমন করেই যদি আরও একটি পালকি উঠত এই বাড়ি থেকে… দীক্ষার পালকি!
বিয়ের আনন্দের মাঝেও কোথাও একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস পড়ে খালেদার। এই মেয়েটা কেন নিজের জীবনটাকে এভাবেই এক জায়গায় থামিয়ে রাখল? কেন সে নিজেকে এমনভাবে গুটিয়ে নিল কাজের আড়ালে?
দীক্ষার জন্য অরুণিমাভের মনে কী গভীর অনুরাগ, খালেদা সব বোঝেন। তিনি অরুণিমাভের চোখে দেখেছেন তার মেয়ের জন্য সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, যেখানে কোনো প্রত্যাশা নেই, শুধুই ভালো থাকার কামনা।
আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগের সেই দিনটি খালেদার মনে পড়ে- মাস দুয়েকের মিষ্টিকে নিয়ে যখন দীক্ষা ওই বাড়ি থেকে পাকাপাকিভাবে চলে আসতে চাইল, অরুণিমাভ ভীষণ ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, দীক্ষা থেকে যাক সেখানে, সারাজীবনের জন্য। আয়ান তো সেদিন হাউমাউ করে কেঁদেছিল। আরহামও বলেছিল, ‘গোল্লাকে নিয়ে যেয়ো না আন্টি, ভালো লাগবে না আমাদের। বাসাটাই ফাঁকা ফাঁকা লাগবে। প্লিজ।’
দীক্ষা সেদিন কারো অনুনয়-অনুরোধ শোনেনি। তার ভাষ্য ছিল, চেনা জানা না থাকতেও কতগুলো মাস একটা অজানা সম্পর্কের সুতো ধরে রয়ে গেলাম তো, আর কত? এবার ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। তাই ফিরে এসেছিল।
এরপর দীক্ষা আর ওই বাড়িতে না গেলেও অরুণিমাভ ঠিকই তার দুই ছেলেকে নিয়ে বারবার এসেছেন, থেকেছেন। মাঝে মাঝে শুধু আয়ান, আরহাম এসে থেকে বেরিয়ে যায়। খালেদার তখন কী যে ভালো লাগে! ঘরটা তখন জমজমাট থাকে, বুকের সেই ফাঁকা ভাব আর অনুভব হয় না। যদি সবসময়ের জন্য এভাবেই ভরে থাকত! কী যে ভালো হতো!
সে কথা তার বোকা মেয়েটা বুঝলে তো! কাজ ছাড়া আর কিছু নিয়েই ভাবে না সে। এত বোঝানোর পরেও… সরাসরি কিছুই বলে না। প্রতিবারই এড়িয়ে যায় এই প্রসঙ্গ। যে ভালোবাসা তিনি অরুণিমাভের চোখে দেখেছেন, সেই সহজ, সরল ভালোবাসা দীক্ষা কেন দেখে না? খালেদা কোনো উত্তর খুঁজে পান না।
খালেদার বুক চিরে বেরিয়ে পড়ল এক দীর্ঘনিঃশ্বাস। এই চাপা কষ্টটুকু যেন তাঁর সকালের আকাশেও কুয়াশার মতো জেঁকে বসে।
এমন সব ভাবনাতে ডুবে থেকেই তিনি দ্রুত হাতে সকালের নাশতাটা তৈরি করলেন। বাইরে সূর্য অল্প একটু উঁকি দিলেও কুয়াশার পুরু চাদর তখনো কাটেনি, তাই ঠান্ডায় গা শিরশির করে ওঠে। ঠিক এমন সময়েই উঠোন থেকে ভেসে এলো একটা ছোটখাটো হল্লা, যেন চাপা উত্তেজনা আর বিস্ময়ের মিশেল। তার বড় ভাই গলা ছেড়ে ডেকে চলেছেন, ‘ও খালেদা, বাইরে এসে দেখ, কারা এলো…’
খালেদা হাতের পানি মুছতে মুছতে তড়িঘড়ি করে বাইরে বেরোলেন। আর বেরিয়েই থমকে গেলেন। তার চোখ স্থির হলো উঠোনে দাঁড়ানো মানুষটির ওপর।
সায়েমা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে জল- যেন বহুদিন ধরে জমিয়ে রাখা অভিমান আর কষ্টের বাষ্প। তিনি কেন এসেছেন? তাকেও কি দাওয়াত করা হয়েছে? কে করল, দীক্ষা কিন্তু কেন? তাকে একবার জানালো না পর্যন্ত! তার মেয়েটা এখন এতই বড় হয়ে গেছে যে একা একা এতবড় বড় সিদ্ধান্ত ও নিতে শিখেছে!
আসবাব বা কৃত্রিমতার কোনো বালাই নেই। দুপুরের পর স্নিগ্ধ রোদে পুকুরঘাটের পাশেই বসেছে আড্ডা। ডেকোরেটরের লোকেরা ততক্ষণে একটা ছোটখাটো স্টেজ সেট করেছে হলুদের অনুষ্ঠানের জন্য। সেই মঞ্চের উপরেই আসন পেতে বসেছে দীক্ষা, শর্মিলা আর বকুল।
মিষ্টি খেলা ছেড়ে শর্মিলার কোলের ভেতর ঢুকে আছে, তার চোখজুড়ে ঘুমমাখা আলস্য। ওই অবস্থাতেই সবাই একযোগে কাজ করছে, আবার গল্পেও মেতে উঠেছে।
হলুদের মঞ্চ কী রঙে সাজানো হবে, আলো কেমন থাকবে, কোথায় কোন ফুলের ব্যবহার হবে- এসব নিয়ে যেখানে যা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার, তার সবটাই নিচ্ছে দীক্ষা। কাজের মাঝে তার মুখে হাসি লেগে আছে, আগামীকালের আনন্দ যেন আজকের প্রস্তুতিতেই ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। বকুলের মুখ তো লজ্জার আভা আর খুশির ঝলকে ঝলমল করছে।
পুকুরের শীতল বাতাস আর নারীদের মিষ্টি হাসির শব্দে পড়ন্ত বেলা হয়ে উঠেছে আরও মধুময়।
দীক্ষা হঠাৎ শর্মিলার দিকে স্থির চোখ থামাতেই শর্মিলা থতমত খেয়ে একটুখানি হাসল। দীক্ষা এক ভ্রু নাচালো, ‘কি ভাবি, কতক্ষণ ধরে আমার দিকেই তাকিয়ে আছ যে?’
‘এমনি। ভাবছিলাম।’ শর্মিলা ঠোঁটের হাসি আরও দীর্ঘ করে।
‘কি ভাবছিলে?’
‘কত বড় হয়ে গেছো তুমি! মনে আছে, রাতে একা ঘুমাতে কি ভয় পেতে ও বাড়ি থাকতে, আর এখন এতবড় ব্যবসা সামলাও! তোমার প্রতিটি পদক্ষেপে একটা কর্ত্রী কর্ত্রী ভাব ফুটে উঠেছে!’
‘হবে না, সারাদিন বকা ঝকাও কি কম করে নাকি। এটা এভাবে কেন, ওটা ওভাবে কেন- শাসনের শেষ নেই।’ যোগ করল বকুল।
দীক্ষা চোখ পাকাল, ‘খুব বিচার দেওয়া হচ্ছে না রে?’
‘যা সত্য তাই বললাম। তুমি যে এ বাড়ির মুরুব্বি, সেটাই বোঝালাম আর কি।’ বকুল মুখ ভেংচি কাটলো।
শর্মিলা হাসল দুই বোনের খুনসুটি দেখে।
তৃপ্তি ভরা গলায় শুধালো, ‘তোমরা ভালো আছে দেখে কি যে ভালো লাগছে! কতবার আসতে চেয়েছি, মা মানা করত, বলত আমাদের দেখলে তুমি আবার…’ একটু থেমে ভীষণ অস্বস্তিতে শেষ করল, ‘কষ্ট পাও যদি…’
দীক্ষা হাসল এবার, ঠোঁটের কোলে মলিনতার ছাপ, ‘কষ্টের কি!’ একটু থেমে যোগ করল, ‘যা গেছে তা তো গেছেই…আমার সন্তানের নানী যেমন আছে, দাদীও আছে, আছে চাচা-চাচীও। আমি নাহয় আর কিছু না, কিন্তু ওর সম্পর্কের সুতো যে চাইলেও ছিন্ন হবার নয়। ও সবার আদর পাক, ভালোবাসা পাক- এইতো চাই আমি। আসবে ভাবি, যখন ভালো লাগবে আসবে।’
‘তুমি ফোন করে দাওয়াত না দিলে আজকেও আসা হতো না।’
‘দাওয়াত দেইনি। তোমরাও এই পরিবারেরই একজন। এতবড় একটা ব্যাপারে তোমরা থাকবে না, কেমন করে হয়?’
শর্মিলা একটু ভাবনায় পড়ে গেল। কি নিয়ে- তা বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হলো না দীক্ষার। সে একটা হাত রাখল শর্মিলার হাতের উপর, ‘মায়ের আচরণ নিয়ে ভেবো না ভাবি। ওই ব্যাপারটার পর থেকে মা একটু আপসেট হয়ে গেছে। তোমাদের উপর বিশেষ রাগটাগ নেই, তবে একটা আতংক যে- হয়তো আমি ওই পরিবারের ছায়ায় থাকলে নিজে মুভ অন করতে পারব না। দুঃখটাকে ভুলতে পারব না। কিন্তু মাকে কে বোঝাবে, দুঃখ যে ভোলা যায় ও না, শুধু অভ্যেসে মিশিয়ে নিয়ে পথ চলতে শিখতে হয়। আর ওটা খুব ভালো করেই শিখে গেছি।’
মুখ টেনে হাসল শর্মিলা। তাকিয়ে দেখল, মিষ্টি একদম জড়োসড়ো পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার গো
লাপের কোয়ার মতো ওষ্ঠদ্বয় কাঁপছে তিরতির করে। মেয়েটা গেছে একদম শিশিরের উপরে, সেই একই রকম ভাসা ভাসা চোখ, একই রকম পাতলা ঠোঁট, থুতনিতে হালকা আপেল কাঁটা- শিশিরেরও তাই। হঠাৎ করেই বুকটা ভার হয়ে এলো শর্মিলার। এক মুহূর্ত তাকাতেই তার মনে পড়ে গেল নামটা, না জানি প্রতিদিন কত শত বার দীক্ষার ও মনে পড়ে সব! অথচ বাহির দিয়ে কি শক্ত, দৃঢ়! সত্যি… সময় মানুষকে ভীষণ পালটে দেয়!
সেই সহজ, উষ্ণ আড্ডার মাঝেই এলেন সায়েমা বেগম, সঙ্গে খালেদা।
প্রথম ধাক্কাটা সামলে এখন তিনি কিছুটা সহজ হয়েছেন। সায়েমা বেগমকে নিয়ে খালেদার মনে কোনো রাগ বা অভিমান নেই, কিন্তু একটা চাপা ভয় মনের ভেতর গেঁথে আছে। তিনি ভয় পান, এঁরা যত বেশি দীক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবেন, দীক্ষা তত বেশি করে পুরোনো স্মৃতি মনে করবে, বারবার আটকে যাবে। খালেদার একমাত্র প্রত্যাশা- তাঁর মেয়ে যেন সব ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তাই তিনি চাননি তাদের সঙ্গে দীক্ষার যোগাযোগ আর বাড়ুক।
কিন্তু সায়েমা বেগমের কথায় তার ভুল ভাঙল এবং তিনি সন্তুষ্ট হলেন। সায়েমা বেগমও চান দীক্ষা এগিয়ে যাক, নতুন করে জীবন শুরু করুক। ভুল যা করার তা তাঁর ছেলে করেছে, আর তার শাস্তিও সে পাচ্ছে। সেখানে দীক্ষা কেন নিজেকে শাস্তি দেবে? বরং ভালো কাউকে খুঁজে নিক। এমন একজন, যে শুধু তাকেই নয়, তার বাচ্চা মিষ্টিরও বাবা হয়ে উঠবে!
তাঁদের দুজনকে আসতে দেখে আড্ডার সবাই নড়েচড়ে উঠল। শর্মিলা মিষ্টিকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, ‘ওকে ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসি।’
সায়েমা বেগম পরম মমতায় ঘুমন্ত মিষ্টির কপালে একটা চুমু এঁকে দিলেন। সেই চুম্বনে কোনো দ্বিধা নেই, মিশে আছে কেবল নিবিড় স্নেহ। শর্মিলা ঘরে চলে গেলে তিনি মঞ্চের উপরে আসন নিলেন। দীক্ষা তখন ডালা সাজাচ্ছে, আর বকুল পাশে বসে গাদা ফুল ছিঁড়ে তাকে সাহায্য করছে। সম্পর্কের কুয়াশা কেটে গিয়ে সেখানে এখন কেবলই এক উষ্ণ আবহ বিরাজমান।
সায়েমা বেগম বেশ সহজ ভঙ্গিতেই দীক্ষার দিকে একটি সাদা খাম এগিয়ে দিলেন।
দীক্ষা অবাক সুরে জানতে চাইল, ‘এটা কী?’
‘পড়ে দেখো,’ সহজভাবে বললেন তিনি।
দীক্ষা খামটি হাতে নিল। খুলতে নিতেই সায়েমা বেগম আলতো করে বললেন, ‘ঘরে গিয়ে পড়ো ছোট বউ…’
বলতে গিয়েই তিনি হঠাৎ থেমে গেলেন। অভ্যাসের বশে ডেকে ফেলেছেন, কিন্তু এখন তো এই নামে আর ডাকার অধিকার নেই! দীক্ষার সঙ্গে তার ছেলের সম্পর্ক যে আজ আর নেই!
দীক্ষা সেই নীরব ভুল বুঝতে পারল। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘আমি আসি।’ বলেই সে পড়িমরি করে প্রায় ছুটল।
বুকের একাংশ হঠাৎ করেই উদ্বেলিত হচ্ছে জোরে জোরে। এই খামের ভেতরে যে একটি চিঠি আছে, আর চিঠিটা যে কার, তা বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হলো না তার। আঙুলগুলো কেমন নিশপিশ করছে। কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি! এক কালে যে মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশি আপন ভাবত, আজ সে মানুষটাকে নিয়ে ভাবাই যেন পাপ! অদ্ভুত এই সম্পর্কের সমীকরণ!
দীক্ষা বাড়ির ভেতরে একটা ফাঁকা ঘর খুঁজে নিয়ে দ্রুত ঢুকে পড়ল। দরজা ভেজিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতেই বসে রইল। প্রায় মিনিট পাঁচেক সে এভাবেই বসে থাকল। কেন যেন হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে। সে চিঠিটা খুলতে চেয়েও পারছে না। কী লিখে পাঠিয়েছে শিশির? আর তারই বা কেন এমন অস্থির অনুভূতি হচ্ছে? এই দ্বিধা যেন তাকে গ্রাস করে নিয়েছে।
একসময় ভেতরের সেই প্রবল নীরবতাকে জয় করে দীক্ষা নড়ে উঠল। সে দীর্ঘ এক দম টেনে ফুসফুস ভর্তি করে নিল, যেন এক কঠিন পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে। এরপর কাঁপা কাঁপা হাতে খামের ভেতর থেকে চিঠিটি বের করে নিল।
খুলল আলগোছে- যেন চিঠিটি নয়, এটি একটি অতি ভঙ্গুর সোনার পাত্র, সামান্য একটু এদিক-ওদিক হলেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে!
ভেতরের সাদা কাগজটি পুরাতন, কিছুটা মোচড়ানো; অনেকবার হাতে নিয়ে টেনেটুনে সোজা করার চেষ্টা করা হয়েছে, তা দেখলেই বোঝা যায়। তবুও লেখাগুলো লেখা হয়েছে দারুণ যত্ন করে। আর এক বসায় লেখা নয়- চিঠিটির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এটি থেমে থেমে, অনেকদিন ধরে লেখা। প্রতিটি অক্ষর যেন ধৈর্য আর অনুশোচনা নিয়ে সাজানো হয়েছে।
এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, অবশেষে সেই স্পর্শ এল। দীক্ষা পড়তে শুরু করল।
আমার সন্তানের মা,
জানি না, কতদিন পর এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছালো। আর যখন পৌঁছালো, তখন তুমি কেমন আছো, সেটা খুব জানতে ইচ্ছে করছে। যদিও মানুষের সব চাওয়া পূরণ হয় না মোটেই!
আমি কেমন আছি সেই প্রশ্নের উত্তরটা সহজ নয়। এই চার দেয়ালের মাঝে আমি বেঁচে আছি কেবল; কিন্তু জীবন বলতে যা বোঝায়, তা অনেক আগেই মরে গেছে। তবে এটাই আমার প্রাপ্য। এখানে বসে আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাই, কী নিদারুণ অন্যায় আমি তোমার সঙ্গে করেছি। আমার অবহেলা আর ভুল সিদ্ধান্তের জন্য তুমি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে, সেই ক্ষত আমি দূর করতে পারব না।
কিন্তু আজ একটা অনুরোধ নিয়ে লিখেছি। দীক্ষা, প্লিজ তুমি থেমে থেকো না।
তুমি যদি এভাবে জীবনটাকে তোমার চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখো, যদি আর কোনোদিন মুভ অন না করো, তবে আমার নিজেরই ভীষণ খারাপ লাগবে। এমনিতেই অপরাধবোধে আমি জর্জরিত, তোমার এই থেমে থাকা দেখলে সেই কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যাবে।
তার চেয়ে বরং একটা সুযোগ দাও। আমাকে তো ছেড়েছোই, এবার সেই জীবনকে ছেড়েও তুমি এগিয়ে যাও। যতটা অবহেলায় আমি তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম, তার চেয়েও বহুগুণ ভালোবাসা আর যত্নে কেউ একজন যেন তোমাকে কুড়িয়ে নিতে পারে, সেই সুযোগটা দাও। তুমি এত ভালো একটা মেয়ে, তোমাকে ভালোবেসে আগলে রাখার জন্য নিশ্চয়ই কেউ না কেউ আছে। তুমি শুধু একবার তাকে সেই সুযোগটা দাও। নিজেকে আবার হাসতে দাও, ভালোবাসতে দাও।
আর একটা কথা- তোমার শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বলছি, আমার সন্তান যেন কোনোদিন না জানতে পারে, তার ব্যর্থ বাবা বেঁচে আছে। আমি চাই না, তার কাছে একজন অপরাধী বাবা হয়ে থাকতে। আমি চাই, তার স্মৃতিতে যদি কিছু থাকে, তবে বাবার ভালো দিকগুলিই মনে রাখুক। তার নিষ্পাপ চোখে যেন কোনোদিন আমার অপরাধের ছায়া না পড়ে।
তোমাদের ভালো রাখাটা আমার দায়িত্ব ছিল- যদিও আমি তা পারিনি। তবে দোয়ায় থাকো তুমি আর তোমার জীবন- তোমরা ভালো থেকো, তুমি ভালো থেকো। খুব ভালো থেকো।
ক্ষমা করো।
সরি—-আবারও!
ইতি,
পরিচয় দেওয়ার মতো পরিচয়টাই নেই।
শেষ!
ফুরিয়ে গেল!
এইটুকুই লিখল? নিজে কেমন কি আছে, তাও কি একবার লিখা যায় না? দীক্ষাকে মুভ অন করতে বলে নিজে মহৎ সাজলো? আবার ঢং করে মেয়ের কাছে নিজের পরিচয় গোপনের অনুরোধ জানালো! হাহ! দীক্ষা পাথরের মতো তবু অনেকক্ষণ চিঠিটির দিকে তাকিয়ে রইল। ওই দোমড়ানো মোচড়ানো কাগজের বুকে বুঝি এক পলক ফুটে উঠল শিশিরের মুখ- চমকে উঠে সম্বিৎ ফিরে পেল সে। বাইরে হাঁকডাকের স্বর ভেসে আসছে। দীক্ষা উঠে দাঁড়াল ধীরে ধীরে। জানালাটা আঁটকানো, সেটি খুলে দিতেই ঝপাৎ করে এক ফালি সূর্যের কিরণ এসে পড়ল কিনারায়। চিঠিটি ছিঁড়ে কুচিকুচি করল দীক্ষা। যতখানি ছেঁড়া যায় হাত দিয়ে, ঠিক ততখানিই… উড়িয়ে দিলো বাইরে।
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩১
ফিসফিস করে আওড়াল, ‘দেখো না, আজ আমার ভীষণ ব্যস্ততা। এত ব্যস্ততা, এত কোলাহলের ভীড়ে তোমার যে ঠাঁই নেই গো….হারিয়েছো তুমি বড্ড অবহেলায়, বড্ড করুণায়!’
দীক্ষা দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই চমকে উঠল।
অরুণিমাভ স্থির দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছেন।
ওই দৃষ্টিতে তাকানোর সাধ্য আগেও ছিল, এখনো হয়নি। দীক্ষা চোখ নামিয়ে কেমন অস্থির হয়ে উঠল আবারও, এই লোক এখানে কেন এসেছেন?
