Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩৩

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩৩

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩৩
মৃধা মৌনি

‘হাই?’
দীক্ষা ধাতস্থ হলো, হঠাৎ করেই কেমন একটা লাগল। এই মানুষটা কি বুঝে ফেলেছে, সে যে এতক্ষণ শিশিরের চিঠি হাতে বসে ছিল? বুঝতেও পারে! মানুষটা তো তার মন পড়তে জানে।
দীক্ষার কীরকম একটা লাগল। সে কোনোমতে ‘হ্যালো’ প্রত্যুত্তর ছুঁড়ে দিয়ে পালাতে চাইলো।
অরুণিমাভ সেই পথ আঁটকে দাঁড়ালেন সটান বুকে, ‘কি হয়েছে?’
দীক্ষা থতমত খাওয়া কণ্ঠে শুধালো, ‘কি হবে?’

‘সেটাই তো জানতে চাইছি, হয়েছে টা কি?’ অরুণিমাভ আবার বললেন।
দীক্ষা প্রায় বুঁজে যাওয়া স্বরে জানাল, ‘কিচ্ছু না। আমি ঠিক আছি। ফুল ফিট এন্ড ফাইন।’
‘তাই?’ ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকালেন, ‘দুই পায়ে দুই ধরনের স্যান্ডেল পরে ঘুরছ, চুল অর্ধেক খোপা করা, অর্ধেক এলোমেলো হয়ে আছে, এমন পাগলিনী বেশে বলছ, ইউ আর টোটালি ওকে?’
চমকে ওঠে দীক্ষা। সঙ্গে সঙ্গে একটা হাত চলে যায় মাথার পেছনে, চোখজোড়া নামলো পায়ে। এক পায়ে নিজের ব্যবহৃত চপ্পল থাকলেও অপর পায়ে কাজলের একটা ফোমের জুতা। চুলগুলোও টুপলির মতো বেঁধে আছে তাও অর্ধেক, বাকিটা ছাড়া! ইশ, এই অবস্থা…আর এমন পরিস্থিতিতে উনার সামনেই পড়তে হলো! টাইমিং বড় আজিব চিজ!

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

দীক্ষা বিড়বিড় করে নিজের মনে। ভাবটা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে এনার সামনে তো নয়ই। নইলে ঠিক বুঝে যাবে- কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল তো হয়েছে। সেই গন্ডগোলে কোনোভাবে শিশিরের নামটি উঠে আসুক, এটা দীক্ষার কাম্য নয়। অবাক হলেও সত্য- অরুণিমাভের সামনে সে শিশিরের ব্যাপারে যেকোনো কথা বলতে কিংবা শুনতে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে।
হাসল দীক্ষা, জোরজার করে- যেন কিছুই না এসব এমন ভঙ্গিতে বলল, ‘আরে এটা হচ্ছে চুলের একটা ফ্যাশন, নিউ ফ্যাশন, আপনি পুরুষ মানুষ, এসবের কি বুঝবেন।’
‘আর জুতাটাও বুঝি ফ্যাশন? দুই পায়ে দুই ধরনের ব্যবহার করা?’
‘উমম না, ওটা ফ্যাশন না, তবে এক্সপেরিমেন্ট। আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম, দুই পায়ে দুই রকম জুতো পড়লে মানুষের হাঁটতে চলতে অসুবিধা হবে নাকি না…’

‘আচ্ছা আচ্ছা! তুমি যে ফ্যাশন ডিজাইনিং বাদ দিয়ে বিজ্ঞানী হয়ে গেছ, এ খবরটা তো আমাকে কেউ দেয়নি।’
দীক্ষা কোমরে হাত গুঁজল, লোকটা তাকে নিয়ে রসিকতা করছে, হুহ?
‘মোটেই বিজ্ঞানী হইনি। মানুষ হিসেবে কৌতূহল জাগতেই পারে। আর নিজের কৌতূহল নিজে মেটানোই উত্তম। যাইহোক, আপনি এইসব আজাইরা কথা বলে আমার কতখানি সময় নষ্ট করলেন, হু?’
অরুণিমাভ কাছে এগিয়ে এলেন, তার চোখের দৃষ্টিতে কিছু একটা ছুটে গেল। দীক্ষা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে ওঠে একটু পিছাতেই পিঠ বাঁধলো টিনের দেয়ালে। অরুণিমাভ হাত ধরে থাকা একটা শপিং ব্যাগ দীক্ষার দিকে তুলে ধরলেন, ‘এটা দিতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম..’ একটু থেমে বললেন, ‘আজাইরা কথা বলতে না।’

‘ও..ওটা…’ দীক্ষার গলা কাঁপছে, তবু সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার। এই মানুষটা হুটহাট কাছে এসে দাঁড়ালেই একটা অদ্ভুত সুবাসে মুখরিত হয় চারপাশ। সুবাসটি এতই স্নিগ্ধ এবং মোহনীয় যে, দীক্ষার মাথা ঘুরতে থাকে। মনে হয়, একটা ঘোরে চলে যায় সে। এমনকি অরুণিমাভ চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরেও সুবাসটি নাকের পাটায় বিঁধে থাকে।
অরুণিমাভ প্রশ্ন করলেন, ‘কি?’
ঢোক গিলে গলাটা ভিজিয়ে নিলো মেয়েটা, ‘ওটাতে.. ক..কি আছে?’ টানটে টানতে শেষ করল বাক্যটি।
অরুণিমাভ হাসলেন, ‘গাজরা এনেছি।’

‘কেন?’
‘পানি ধুয়ে খাবে। সকালে একবার, রাতে একবার, এতে মাথার বুদ্ধি খুলবে।’
‘গাজরা খাওয়ার জিনিস নাকি! ওটা তো চুলে বাঁধে।’
‘জানো যখন জিজ্ঞেস করলে কেন? ধরো।’
দীক্ষার হাতে ধরিয়ে তিনি সরলেন, দীক্ষা নিঃশ্বাস ফেলল। বাপরে বাপ…ঘেমে উঠেছে শরীরের ভেতর।
‘বকুলের জন্যেও আছে। তোমার একার জন্য স্পেশাল ভাবে আনিনি।’
দীক্ষা তীর্যক চোখে চাইল, অরুণিমাভ আবার যোগ করলেন, ‘কয়েকটা এক্সট্রা আছে। গ্রামের আরও অনেকে আসবে না, কারো লাগলে দিও, কার্পণ্য করো না, হাজার হোক আমাদের বকুলের বিয়ে।’
‘পুরো এলাকাবাসীর জন্য আনতেন.. একটা ফুলের দোকানই দাঁড় করিয়ে দিতেন উঠোনে…’ বলল দীক্ষা চিবিয়ে চিবিয়ে,

অরুণিমাভ যেন দারুণ কোনো বুদ্ধি পেয়ে গেল এমন ঢংয়ে শুধালেন, ‘আরে তাই তো, আমার মনেই হয়নি এরকম কিছু.. ইশ হাউ ইন্টালিজেন্ট ইউ আর! এখন করলে হয় না দীক্ষা? এক ঘন্টা লাগবে ম্যাক্সিমাম। ফুল সহ একটা ছেলেকে এখানে আসতে…’
দীক্ষা শুনলোই না বাকি কথা। মেজাজ চড়িয়ে দিয়েছে এই লোক, অভদ্র, অসভ্য!
বিন্দুমাত্র বালাই নেই শরম লজ্জার!
‘কি হলো, কোথায় যাও?’
‘আপনার গাজরা বিলাতে যাই.. জাহান্নামে!’
অরুণিমাভ হাসলেন।
ভালো তো তুমিও বাসো আমায়, কেন স্বীকার করো না? প্রশ্ন ছুঁড়লেন মনে মনে…

সন্ধ্যে নামতেই বাড়ির পিছনের পুকুর পাড়ের জায়গাটা মুহূর্তেই এক ঝলমলে উৎসব ক্ষেত্রে পরিণত হলো। শীতল বাতাস, আর পুকুরের জলে প্রতিফলিত হওয়া লণ্ঠনের আলো- সব মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশ।
হলুদের মূল আয়োজন পুকুর পাড়ের ঠিক লাগোয়া একটা খোলা জায়গায়। সেখানে শক্ত করে পোঁতা হয়েছে বাঁশের খুঁটি। সেই খুঁটিগুলোর ওপর রঙিন শাড়ি আর সোনালী জরির ফিতে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটা বড় শামিয়ানা। মূল মঞ্চটি বানানো হয়েছে বাঁশের পাটাতন দিয়ে, যা দেখলে মনে হয় যেন পুকুরের জলের ওপরেই ভেসে আছে।
মঞ্চের ব্যাকড্রপ এবং খুঁটিগুলো সাজানো হয়েছে গ্রাম্য ঐতিহ্যে- রঙিন কাগজ, গাঁদা ফুল আর সবুজ পাতা দিয়ে। লাল, নীল, হলুদ আর সবুজ কাগজের নকশা আর ফুলের ঝালর ঝোলানো হয়েছে সব দিক থেকে। মঞ্চের মাঝখানে রাখা হয়েছে একটি আলপনা আঁকা কাঠের জলচৌকি, যা বকুলকে বসানোর জন্য প্রস্তুত। চারিদিকে মাটির প্রদীপে তেল ঢেলে রাখা হয়েছে, যা টিমটিম করে জ্বলে পুকুরের জলে সোনালী ঢেউ তুলছে।

দলে দলে আসতে শুরু করল মেয়েরা। তাদের পরনে পাট ভাঙা নতুন শাড়ি- কারো কাঁচা হলুদ, কারো বা বাসন্তী রঙ। হাতে-মাথায় ফুল আর কাঁচের চুড়ি জড়িয়ে আসা এই মেয়েদের কলকাকলি, শাড়ির খসখস শব্দ আর ফুলের মিষ্টি বাসনা- সব মিলে পরিবেশটা যেন এক জাঁকজমকপূর্ণ গ্রামীণ আনন্দ মেলা। উচ্চ শব্দে বাজছে জনপ্রিয় সব বিয়ের গান।
এই ব্যস্ত আয়োজনের মাঝেও দীক্ষা সব দিক নিজে হাতে তদারকি করছে।
তার নিজের সাজ খুবই স্নিগ্ধ, কিন্তু তার সহজাত সৌন্দর্য সেই সাজকে ছাপিয়ে গেছে। সে পরেছে সবুজ জমিনের ওপর হলুদের কাজ করা একটি মসলিন শাড়ি। শাড়ির নরম রঙ আর দীক্ষার উজ্জ্বল ত্বক এক অসাধারণ বৈসাদৃশ্য তৈরি করেছে। তার চুলগুলো হাত খোঁপার আকারে আলতো করে পেঁচানো, আর সেই খোঁপার চারপাশে জড়ানো হয়েছে এক গাছি টাটকা গাঁদা ফুলের গাজরা।

চোখের নিচে হালকা করে টানা কাজল, ঠোঁটে হালকা মিষ্টি লিপস্টিক, ব্যস, সাজ বলতে এতটুকুই। তার হাত ভরা কাঁচের চুড়ি, যা প্রতিটা নড়াচড়ায় রিনিঝিনি শব্দ তুলছে। সব কষ্টকে সে একপাশে সরিয়ে রেখে বকুলের আনন্দের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছে। তার স্নিগ্ধ হাসি পুকুর পাড়ের ফ্যাকাশে আলোকেও আরও আলোকিত করে তুলছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বকুলকে নিয়ে আসা হলো। বকুলের পরনে সম্পূর্ণ হলুদ রঙের একটা লেহেঙ্গা। তাকে ঘিরে ধরল তার সখীরা। আনন্দে ও লজ্জায় লাল হয়ে আছে বকুলের মুখ।

লাজুক পায়ে বকুল যখন বাঁশের মঞ্চের দিকে এগিয়ে চলল, তখন সবার দৃষ্টি তার দিকে। সখীরা ধরাধরি করে বকুলকে এনে আলপনা আঁকা জলচৌকিটির ওপর বসাল। উচ্চস্বরে বেজে উঠল গান। চারপাশে শুরু হলো হলুদ ছোঁয়ানোর পালা। বকুল হাসছে, লজ্জায় কাঁপছে।
হলুদের আলতো ছোঁয়া, শুভকামনার কোলাহল- সবকিছু মিলে এই সন্ধ্যাটা বকুলের জন্য এক স্বপ্নিল মুহূর্ত।
পুকুর পাড়ের বাঁশের মঞ্চে হলুদের মূল পর্ব শুরু হয়ে গেছে। ঢোল আর বাদ্যের সঙ্গে মেয়েদের মিলিত কণ্ঠে গান ভেসে আসে,

‘ওই আয় আয় রে সখী,
হলুদ বাটার ডাক;
পুকুরপাড়ে আলো ঝিলমিল, বিয়ের বাজে ঢাক।’
অন্য একজন সুর ধরে,
‘হলুদ বাটা হাতে নিয়ে, মায়ের চোখে জল;
আজ যে আমাদের সোনা মেয়ের হলুদ পড়ার দল।’
বকুলের ইচ্ছে করল মিশে যেতে মাটির সঙ্গে। হলুদ ছোঁয়ানোর সময় তার গাল বেয়ে নেমে এলো সেই হলুদ, আর তার চেয়েও বেশি লালে ছেয়ে গেল ওর চোখ-মুখ। কি নিদারুণ লজ্জায় ছেয়ে গেল ওর চোখ-মুখ। সেই সঙ্গে ঝাপসাও হয়ে এলো চোখজোড়া। মনের কোণে উঁকি দিয়ে গেল পরিচিত মুখেরা- যারা হারিয়ে গেছে অনেক আগে, আর যাদের স্মৃতি আজ এই আনন্দ মুহূর্তে আরও বেশি বিঁধছে।
কাঁধের ওপর মিষ্টিকে কোলে করে সেখানে এসে দাঁড়াল কাজল। দীক্ষা ওকে সাইডে সরিয়ে নিয়ে রামধমকে উঠল, ‘ওকে কোলে তুলে রেখেছিস কেন?’

কাজল বিরক্তি নিয়ে ঘাড় নাড়ে, ‘দৌড়াদৌড়ি করে। পুকুরে পড়ে যদি! বকুল যে কী ভেবে এইখানে অনুষ্ঠান করার জিদ ধরল!’
‘ওসব তোর বোঝা লাগবে না। তুই ওকে নামা, এক্ষুনি…’
‘আমিও সেই কখন থেকে নামাতে বলতেছি বেস্টি নাম্বার ওয়ান, কাজল তো শোনেই না।’
‘কতবার বলেছি মামা বলে ডাকতে! কাজল কি হ্যাঁ? পাজি মেয়ে কাজল কি?’ ঠোঁট উলটে অভিযোগ জানাল ওইটুকু পুচকে।

ধমকে ওঠে দীক্ষা, মেয়ের উপর।
কাজল বাঁধা দিয়ে বলল, ‘থাকুক আপা… ও যে নামে ডাকে ডাকুক, আমার তো ভালোই লাগে।’
দীক্ষা মিষ্টিকে কোলে থেকে নামিয়ে দিতেই মিষ্টি এক দৌড়ে মিশে গেল ভীড়ের মধ্যে।
আর হৈহৈ করে উঠল কাজল, ‘ওই দেখো, কীভাবে দৌড়াচ্ছে!’ তার কণ্ঠে চিন্তার ছাপ।
দীক্ষার ভালো লাগে। মিষ্টি শুধু তার একলারই জান পাখি না, বরং এই ঘরের প্রাণ যেন সে-ই। এই আদর, এই আহ্লাদ উপভোগ করে সে।
সে আশ্বস্তের সুরে বলে, ‘ভয় পাস না। আরহাম আর আয়ান আছে তো। ওদের গোল্লাকে ঠিক দেখে রাখবে। একটা রাত তো, মজা করতে দে। আর তুই নিজেও গিয়ে মজা কর যা। তোর সব বন্ধু-বান্ধব কই?’
‘আছে, ওই দিকে…’

‘আচ্ছা, হলুদ দিয়ে যেতে বল এসে।’
কাজল এবার ইতস্তত করে, অস্পষ্টে ডাকে, ‘আপা…’
‘কি?’
সে উশখুশ করে। দীক্ষা অভিজ্ঞ চোখে তার দিকে তাকায়, বুঝে নিলো ছেলেটা কী বলতে চায়। এক ভ্রু উঁচিয়ে অভিজ্ঞ গলায় শুধালো, ‘শান্ত এসেছে?’
কাজল যেন আকাশ থেকে পড়ল।
‘তুমি বুঝলে কী করে?’
দীক্ষা হাসল। তার মাথায় গাট্টা মেরে ওঠে।
‘ভুলে যাস কেন, তোরা যে কলেজের স্টুডেন্ট, আমি তার প্রিন্সিপাল! বান্দরটা কই?’
‘আছে, ওইদিকেই… একদম লুকানো।’

‘বুঝছি। কিন্তু মা দেখলে চিৎকার করবে, জানিস তো?’
‘জানি দেখেই তো… তোমার কাছে এলাম।’
‘মুসিবতে ফেলতে তোরা সেরা রেহ…’
কাজল দাঁত বের করে হাসি দেখাল। দীক্ষা এবার দ্রুত প্ল্যানটা বলল, গলা চাপিয়ে, মৃদু স্বরে, ‘আমি একটু পর বাথরুমে যাওয়ার কথা বলে বকুলকে উঠিয়ে নিবো। রমিলা মামীর কর্নারে ছোট একটা রুম করা হইছে না, ওখানে থাকব। তুই আগে থেকে ওখানে শান্তকে এনে রাখ, কেউ যেন টের না পায়, বুঝছিস?’
‘একদম!’

এরপর স্যালুট দেখানোর ভঙ্গি করে হাসি মুখে ছুট লাগাল। দীক্ষা এদিক ওদিক তাকাল। মা নেই, অন্য মুরব্বিরাও ব্যস্ত। এই ফাঁকেই করতে হবে যা করার।
দীক্ষা এবার দ্রুত পায়ে গেল যেখানে বকুল বসে আছে। বকুলকে ঘিরে তখন হলুদ ছোঁয়ানোর পালা চলছে।
দীক্ষা সবার মাঝখানে এসে হাসিমুখে ঘোষণা দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, ‘এক্সকিউজ মি! বউয়ের ইমারজেন্সি! আপনারা একটু ওয়েট করুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি।’
সবাই অবাক হয়ে তাকাল। বকুলের মুখ তখন হা-মুখ করে খোলা। সে বুঝতে না পেরে বোকার মতো বলতে নিলো, ‘কিসের ইমার্জেন্সি?’

তার আগেই দীক্ষা হাসতে হাসতে বকুলের কোমরে কনুইয়ের গুতা মারল। ব্যথায় বকুল চুপসে গেল।
একজন টিটকারির সুরে বলছে, ‘হয় হয় এরকম হয়। নার্ভাসের চোটে সব লুজ হয়ে যায়। বারবার লাগে। আমার বেলায় তো প্যামপার্স ছিল না, থাকলে ওটা পড়ে বসতাম, হা হা হা।’
তার কথা শুনে সবাই হাসিত ভেঙে পড়ল। দীক্ষাও হাসি হাসি মুখ করে বকুলকে ওখান থেকে একপ্রকার তুলে এনে প্রায় ঝড়ের গতিতে কর্ণারের দিকে নিয়ে গেল।
বকুল তখনো হতবাক। ফিসফিস করে বলল, ‘আপা, কি করছ?’
দীক্ষা শুধু বলল, ‘চুপ! চল বলছি! যা করার আমি করছি!’
বকুল জানে না, এই ইমার্জেন্সি তাকে সেই রামবলদের সামনে নিয়ে যাচ্ছে, যাকে এক নজর দেখার জন্য তার মন অস্থির হয়ে উঠেছিল ক্ষণকাল আগেও!
দরজার সামনে এসে দীক্ষা দ্রুত হাতল ধরে বকুলকে ঘরের ভেতর ধাক্কা দিলো।

‘যা! ভেতরে যা! দ্রুত কাজ শেষ করে বের হবি।’
বকুল কিছু বুঝে ওঠার আগেই দীক্ষা বাইরে থেকে সিটকিনি আটকে দিলো। ঝপাং করে একটা শব্দ হলো।
বকুল অবাক হয়ে ঘরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ব্যাপারটা কী হলো, সে কিছুই বুঝতে পারছে না।
‘কী হলো এটা? আপা! দরজা লাগালে কেন? খুলে দাও! আমি যাবো!’
বাইরে থেকে দীক্ষার চাপা হাসি ভেসে এলো।
‘আমার কাজ শেষ, এখন শান্ত হয়ে ভেতরে থাক! কাজ শেষ হলে দরজা খুলব।’
‘কিসের কাজ আপা? কি বলছ তুমি? ফাজলামো রাখো প্লিজ, দরজা খোলো, এই আপা.. আপা…’
ওপাশ থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
তবে দু’তিনজনের চাপা হাসি একটু শোনা গেল, তারপর সব শেষ। মনে হলো, একটা দল দরজার সামনে থেকে সরে গেল এই মাত্র।

বকুল হতাশ হয়ে দরজার দিকে চেয়ে, পুরো ব্যাপারটা মেলাতে পারছে না সে। এখানে এভাবে ঢোকানোর কারণ কি?
ঘরটা ছিল ছোট, অল্প আলোয় আবছা অন্ধকার। বকুল চারিদিকে তাকানোর চেষ্টা করছে। সে কী করবে বুঝতে চেষ্টা করতেই, ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে একটা হাত এসে তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরতে নিলো!
আকস্মিক এই স্পর্শে বকুলের শরীরের সব রক্ত যেন এক মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল। সে ভয় আর লজ্জায় একেবারে জমে গেল। তার মনে হলো, এত লোকের মাঝে কেউ কি তাকে আক্রমণ করতে এলো? সে তো জানে না, এই ঘরে শান্ত অপেক্ষা করছে!
বকুল ভয়ে চিৎকার করে উঠল, সজোরে, একেবারে গলা ফাটিয়ে!

‘ওমাগো! বাঁচাও! ভূত! ভূত! আপা… আপা ভূত…’
সে হাত পা ছুঁড়তে শুরু করে।
পিছন থেকে শান্তর ফিসফিসানি ভেসে এলো। সে হাসতে হাসতে বকুলকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
‘আরে বকুল! আমি! আমি শান্ত!’
কিন্তু বকুল তখন ভূতের আতঙ্কে কাঁপছে। সে ঘুরে শান্তর মুখে এক সজোরে ধাক্কা মেরে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করল।

‘না না! ভূত! ভূত! ভূত শান্ত সেজে এসেছে! আপনি আমার কাছে আসবেন না! প্লিজ। লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা…’
শান্ত নিজেকে সামলে হাসতে লাগল। সে তার হাত দিয়ে বকুলের মুখটা আলতো করে চেপে ধরল।
‘আরে বোকা মেয়ে! আমি তোমার শান্ত! তোমার ভূত!’
বকুল তখনো থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু শান্তর হাতের উষ্ণ স্পর্শ আর তার চেনা কণ্ঠস্বর, তার নাকের কাছে শান্তর চেনা গন্ধ- সব মিলে সে বুঝতে পারল, এটা কোনো ভূতের কাণ্ড নয়।
‘সত্যি…আপনি?’ কোনোক্রমে উচ্চারণ করল সে।
শান্ত হাসল, ‘হ্যাঁ, আমি, এই দেখো..’ বলে হাত বাড়িয়ে দিলো, ‘আমার হাতটা ধরো, তাহলেই বুঝবে।’
বকুল ধরবে কি ধরবে না ভাবতে ভাবতেই শান্ত ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর এক ধাক্কায় মিশিয়ে নিলো বুকের পাটাতনে। আকস্মিক ঘটনায় বিস্ময়ে হতবাক, আতংক গেছে তবে এখনো কাঁপছে মেয়েটা- এবার লজ্জায়!

এই প্রথম মানুষটা তার এত কাছাকাছি।
চোখজোড়া বন্ধ হয়ে এলো আপনাতেই।
‘এখানে কখন এসেছেন?’ ফিসফিস করল বকুল।
শান্তও উত্তর দিলো ফিসফিস করে, ‘কিছুক্ষণ আগে।’
‘কেন এসেছেন?’
‘আমার পরীটাকে দেখতে।’
‘কে পরী?’
‘এই যে আমার সামনে দাঁড়ানো জলজ্যান্ত হলুদ পরী…’
তার নিঃশ্বাসটা ঘন হয়ে উঠল। এত লজ্জা, এত অস্বস্তি এসে জড়ো হলো হৃদয়ের আঙিনায়- তবে এই অস্বস্তিতেও একপ্রকার স্বস্তি লুকিয়ে। হৃদপিণ্ডের দ্রুত গতি আর শান্তর শরীরের উষ্ণতা তাকে একই সঙ্গে কাঁপিয়ে তুলছে।
বকুল উশখুশ করে শান্তর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে।

‘ছাড়ুন তো… ঢং করতে এসেছেন, বুঝেছি। ফুপু দেখলে খবর আছে! ওদিকে সব বসে আছে, যান আপনি। আপনাকে আজ গায়ে হলুদ মাখাবে না?’
শান্ত তার কানে ফিসফিস করে অভিযোগ জানাল।
‘হুম, হচ্ছে তো অনুষ্ঠান। তা ফেলে আমি ছুটে এসেছি তোমায় এক নজর দেখব বলে, আর তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ?’
‘দিচ্ছি।’
‘চলে যাব?’
‘যান…’
‘সত্যি?’
‘একশো পারসেন্ট!’
‘আচ্ছা চলে যাই…’

এই বলে শান্ত সরে যাওয়া তো দূরে থাক, উল্টে আরও শক্ত করে বকুলের শরীর নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। বকুল এবার আর নিজেকে আটকাতে পারল না। সে হেসে উঠল, তার রিনরিনে কণ্ঠস্বরে সেই হাসির শব্দে ঘরটা ভরে গেল।
‘আপনাকে দেখে কোনোদিন মনেই হয়নি, আপনি যে এত রোমান্টিক!’
প্রত্যুত্তর করল না শান্ত। তার অধর তখন বকুলের গলায় মিশে- বকুল তার মাথা সামান্য কাত করল, আর শান্তর ঠোঁট যেন সীমাহীন আসক্তিতে ডুবে যেতে লাগল সেই নরম ত্বকে। চারপাশের জগৎ নীরব, কেবল তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দই সেখানে জীবন্ত।
শান্ত বকুলের কাঁধে মাথা রেখে, তার সেই চেনা জড়ানো গলায় শুধালো, ‘আসমানের চাঁদ যে এত সুন্দর হয়, কেউ আমায় কোনোদিন বলেনি জানো!’

বকুল কথা বলতে পারল না। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, চোখের পাতা বুজে এলো।
শান্ত ঘোরগ্রস্ত গলায় তাকে ডাকল, ‘বকুল… বকুল!’
অসাড় কণ্ঠে উচ্চারণ করল, ‘উঁ?’
‘ভালোবাসি।’
সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন করে উঠল বকুলের হৃদয়ের সব কলকব্জা। তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন নতুন কিছু একটা ছুটল। এমন অনুভূতি, এমন দিশেহারা পাড় ভাঙার শব্দ- এ জন্মে আগে তো শোনেনি, আগে তো জানেনি সে! এই একটা শব্দেই যেন তার সমস্ত অপেক্ষার মূল্য চুকিয়ে দিলো শান্ত।
আর ঠিক সেই সময়ে দরজায় ধাক্কার আওয়াজ হলো। দু’জনেই মাথা তুলে চাইলো সেদিকে।
‘কে এলো?’ জানতে চাইলো শান্ত।
বকুল বলল, ‘আপা বোধহয়। আমায় যেতে হবে।’
‘শোনো।’ বকুলের মুখটি আঁজলায় তুলে নিলো শান্ত, অকস্মাৎ ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো ললাটে, ‘আজকের রাতটাই, এরপর তুমি আমার…কাল, পরশু, চিরকালের জন্য… আমার, আমার, আমার!’
বকুলের চোখ ভরে এলো।

বিধাতা তার কপালে এত ভালোবাসা লিখে রেখেছিল, এ যেন সম্পূর্ণ অজানা ছিল তার। মনে মনে শত কোটি বার শুকরিয়া জানাল রবের দুয়ারে। একই সঙ্গে দোয়া করল, এ সম্পর্কে যেন নজর না পড়ে…কারো না!
বিড়বিড় করে আওড়ালো সে, ‘মাশা আল্লাহ…মাশা আল্লাহ।’
বকুল নিজেকে মুক্ত করে দ্রুত দরজা খুলল। কিন্তু দরজা খুলতেই পিলে চমকে উঠল তার। দীক্ষা নয়, বাইরে খালেদা বেগম, রাশভারী মুখে তাকিয়ে আছেন। তার পাশে দীক্ষা এবং কাজল দু’জনেই অপরাধীর মতো উশখুশ ভঙ্গিতে দাঁড়ানো।

দীক্ষা বকুলের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে নীরবে ‘সরি’ বলল। সে যেন জানাতে চাইছে, ম্যানেজ করতে পারল না। মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া আসলেই অসম্ভব! খালেদা আগেই সাফ জানিয়েছিলেন, বিয়ের তিনদিন আগে থেকে বর-বউয়ের দেখাসাক্ষাৎ একেবারে বন্ধ থাকবে। আর সেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা অবজ্ঞা করে ছেলে-মেয়ে গুলো তাই করেছে!
বকুল আমতা আমতা স্বরে কিছু একটা বলল, কিন্তু তা স্পষ্ট বোঝা গেল না।
খালেদা বেগমের গম্ভীর স্বরটি পরিবেশ ভারী করে তুলল।
‘ইতরটা কই?’ জানতে চাইলেন তিনি।
বকুল মাথা নিচু করে শুধু মানে মানে করতে লাগল।
দীক্ষা পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করতে বলল, ‘বাদ দাও না মা… ওদিকে সবাই বসে, চলো…’

‘এই তুই চুপ কর! দামড়ি হয়েছিস হাতে-পায়ে, কিন্তু বিন্দুমাত্র বিবেক বোধ হয় নাই।’
দীক্ষা সঙ্গে সঙ্গে চুপসে গেল।
খালেদা বেগম একা একাই গজগজ করতে লাগলেন।
‘কত নিয়ম কানুন আছে জানিস? আমাদের সময় আমরা সব মানতাম বলেই টিকে থাকতে পারছি। এখনের ছেলেমেয়েরা কিচ্ছু বাছ বিচার করে না, শেষে হাত কামড়ায়… সব উচ্ছন্নে গেল!’
পরিবেশ অসহনীয় ভারে চাপা,
সবকিছু শুনে শান্ত আপনাতেই বেরিয়ে এলো ভিতরের অন্ধকার থেকে। তাকে দেখে খালেদা বেগম আরও জ্বলে উঠলেন।
শান্তের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাকেও বলি, বউ তো নিয়েই যাবে আগামীকাল, আজ কেন আসতে গেলে? গ্রামের ছেলেমেয়ে হয়েও গ্রামের নিয়ম মানবে না? সূচির মা কি এক কান্ড বাঁধিয়েছে ওদিকে দেখো গিয়ে! সে নিজের চোখে তোমায় আসতে দেখেছে, এ ঘরে ঢুকতে দেখেছে, এসব নিয়ে টিটকারি সুরে কী বিচ্ছিরি সব কথা…’

দীক্ষা চমকে উঠল, ‘তুমি আমাকে এগুলো তো বলোনি মা! আমি এক্ষুনি যাচ্ছি…’
‘না, তোর যেতে হবে না। আমি সামলে নেবো। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।’
শান্ত মিনমিন করে নিজের পক্ষে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করে, ‘আমরা তো বিয়েই করতেছি, একটু দেখা করলে… সমস্যা কী…’
তাতে খালেদা বেগম জ্বলজ্বলে চোখে চাইলেন।
‘অত বুঝলে তো হতোই! সবার তো সেই বিবেক বুদ্ধি নেই। ভালো ভাবে না নিয়ে খারাপ ভাবে নেয়!’
বকুল শান্ত গলায় বলল, ‘ফুপু… সরি।’
খালেদা বেগম নরম হয়ে বকুলের মাথায় হাত রাখলেন।
‘তুই আমার উপর রাগ ধরিস না। সত্যি… সূচির মা… এমন সব কথা বলছিল, শুনে আমার মাথাটা…’
কথাটা শেষ করবার আগেই যেন ঝড়ের বেগে কোথা থেকে উদয় হলেন সূচির মা!

তিনি বয়স্ক, মুরুব্বি গোছের মানুষ। গায়ে হলুদের পোশাক পরা মহিলাদের ভিড় ঠেলে তিনি সশব্দে এগিয়ে এলেন। তাঁর মুখের ভাষায় শালীনতার এক কণা পরিমাণ নেই। তাঁর চোখজোড়া যেন আ গু ন ছড়াচ্ছে- কারণ তিনি সুযোগ পেয়েছেন টিটকারি মারার। দীক্ষা-বকুলকে নিয়ে খালেদা খুব বড় বড় কথা বলতেন সবসময়। তার মেয়ে সূচিকে কম অপমান করেনি, মেয়েটা একটু চঞ্চল, বেপরোয়া সেই জন্যে! এবার দেখো, মজা কত প্রকার আর কি কি…
তার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভীড়ের জটলাও এসে জড়ো হলো সেইখানে। খালেদা ঘামছেন। ভয় পাচ্ছেন। হৃদপিণ্ড ধপধপ করছে শব্দ করে। আর যাইহোক,ঝড়ের মুখ যেন ঘুরে দীক্ষার দিকে চলে না যায়। এই এক ভয়ে, তিনি সবার থেকে নিজেকে, তার পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছেন। তবু কথায় আছে, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়!
সূচির মা কর্কশ সুরে হাঁকিয়ে উঠলেন, ‘কিরে মাইয়া, এইটুক তর সয় না? নাঙ্গোর তো আইতাছেই কালকে, তোরে নিয়া যাইতে, এক রাইত একটু শইলে সইলো না?’

বকুলের কান দু’খানা রিরি করে উঠল। চাপা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চেয়ে রইল সে। এই মহিলার মুখের ভাষা এরকম? কই, খুব তো নমঃ নমঃ করেছিল, তার মেয়েকে এখানে একটা কাজের পদবী দেওয়ার জন্য! স্বার্থ ফুরালে মুখের ভাষাও পরিবর্তন হয়ে যায়?
‘আপনি কারে কি বলতাছেন মহিলা, মাথার ঠিক আছে?’ অগ্নি চোখে কথা ছুঁড়ে দিলো শান্ত, বকুলের হয়ে। এগিয়ে এলো দু’পা, ‘সাবধানে কথা বইলেন, ও আমার বাড়ির বউ!’
‘হয় নাই ছেড়া, হইবো! হওয়ার আগেই এত বাড়াবাড়ি ভালো না। তোমাগো মতো একজন বহুত বাড়াবাড়ি কইরা প্রেম পিরিতি মারাইয়া বিয়া করছিল, মনে নাই? কি জুটছে কপালে শেষে?’
দীক্ষার সমস্ত শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। তাকে ইংগিত করেই বলা হচ্ছে- বুঝতে অসুবিধে হলো না মোটেই। কিছু একটা বলবে- সেই ভাষাও জানা নেই তার। সব শব্দ হারিয়ে একেবারে নির্বাক, বোবা সে। শুধু চেয়ে আছে পুতুলের মতোন।

‘পোলা মাইয়ার বিয়া ঠিক হইলেই এক ঘরে থাকোনের নিয়ম নাই। আগে বিয়া হইবো, তারপর এক ঘরে ফূর্তি করব। অবশ্য, তোমরা হইছ ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল মানুষ, বিয়া ছাড়াই এক ঘরে থাকো, পুরুষের লগে সম্পর্ক গড়ো, কি সম্পর্কের ছুতায় পরপুরুষেরা ঘরে আয়, যায়.. সব দেখি.. দিন দিন দেশটা নষ্ট হইয়া গেলো রে খোদা! সব কিয়ামতের আলামত। ইশশিরে…’
দীক্ষার সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে গেল। মহিলা অরুণিমাভ কে নিয়ে এমন নোংরা কথা ছুঁড়ছেন? আশেপাশে চাইলো দ্রুত, কোথায় অরুণিমাভ, শোনেননি তো? সম্মান বলতে আর কিচ্ছু রইলো না বুঝি…
‘আপনি এখান থেকে… এখান থেকে যান।’ মৌনতা ভেঙে বলে উঠল দীক্ষা, জড়োসড়ো ভঙ্গি তার, ‘প্লিজ যান খালা.. আপনি আর কোনোদিন আমাদের বাড়িতে আসবেন না।’ হাতজোড় করে দেখালো সে।
সূচির মা আরও জোর গলায় বলে উঠলেন, ‘তোগো বাড়ি আসার জন্য নাচি নাকি আমি? তোর মায়ে দাওয়াত দিলো দেইখা আসছি। এমন নোংরা বাড়িতে পা দিলেও পাপ.. থু…’

‘খালা!’
‘এই মাইয়া একদম চোপ, গলা বাড়াস কার লগে? ঘর ভাঙ্গা মাইয়া!! কত কাহিনি কইরা বিয়া করলি, জামাই নিয়া নাচলি, সেই জামাই আবার নিজের আপনা বইনে ছিনাইয়া নিলো। প্রথমে তো ভাবছিলাম দোষ ওই পোলা আর তোর বইনের, কিন্তু এখন দেখি তুই মাইয়া ভালো না। বেডাগো লগে হাত, তাও এক বুইড়া বেডার লগে.. আল্লাহই জানে, তুই একলা শোস নাকি তোর মা…’
বাকিটা উচ্চারণের আগেই তীব্র চড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বজ্জাত মহিলা। মুহূর্তে যেন সময় থমকে গেল। উপস্থিত সবাই পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে- কারও শরীর নড়ছে না, কেবল বিস্ফারিত চোখে দৃশ্যটা গিলে নিচ্ছে।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩২

‘ওরে আল্লাহগো… কে, কে মারলো…’ সূচির মা আর্তনাদ করে উঠে দাঁড়ালেন।
ঠিক তখনই তৃণা এক পা এগিয়ে এল। চোখে আ গু ন, শরীর জুড়ে দাউদাউ রোষ। বজ্রস্বরে চিৎকার করে উঠল,
‘এখান থেকে বের হ! নাইলে তোরে জুতা দিয়ে..’
কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজের পায়ের জুতা খুলে নিল সে।
সে মুহূর্তে উপস্থিত কেউই আর তৃণাকে তৃণা মনে করল না। এ যেন র ক্তমাংসের মানুষ নয়- রণমূর্তি ধরা কোনো চণ্ডালিনী। তাকে দেখে ভয়ে সিটকে গেল সবাই।

সোনাডিঙি নৌকো শেষ পর্ব