Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো শেষ পর্ব

সোনাডিঙি নৌকো শেষ পর্ব

সোনাডিঙি নৌকো শেষ পর্ব
মৃধা মৌনি

সূচির মা খিটমিট করে এগিয়ে এলেন, ‘কত্তবড় সাহস তোর.. এই মাই…’ পুনরায় আরেকটি চ ড়ে পিছিয়ে পড়লেন তিনি। তৃণা বিন্দুমাত্র কোনো কিছুর পরোয়া করছে না। আশেপাশে কে আছে, কে নেই- তাতে তার মাথাব্যথা নেই। বরং এই মুহূর্তে সূচির মায়ের প্রতিই যত মনোযোগ তার। কতবড় সাহস, তার মা তুলে কথা বলে!
কে একজন এগিয়ে এলো, ‘আপনি যান এখান থেইকা। একটা শুভ কামে আইসা গ্যাঞ্জাম বাঁধাইলেন।’ পড়শিদের ভেতর থেকেই একজন তরুণী বলল।

সূচির মা হৈহৈ করলেন, ‘আমি গ্যাঞ্জাম বাঁধাইলাম? আমি?’
এবার এগিয়ে এলো আরও একজন, ‘তাই তো, আপনারে কে কইছে এত কথা বলতে? আইছেন দাওয়াতে, খাইয়া চইলা যাবেন, হুদাই একটা ক্যাচাল লাগাইলেন।’ তারও একই সুর৷
এবার প্রায় সকলেই সম্মিলিত ভাবে সূচির মা কেই দোষারোপ করে বের করে দিলো। আর জটলা না পাঁকিয়ে বকুল কে নিয়ে চলল স্টেজের দিকে। এসব ঝামেলায় অনেকখানি সময় নষ্ট হলো। গান বন্ধ করে দিয়েছিল, আবার চালু করা হলো। কাজল ও শান্তকে নিয়ে চলল, শান্তদের বাড়িতে দিয়ে আসবে করে।
কেবলমাত্র দাঁড়িয়ে রইল, তৃণা, দীক্ষা আর খালেদা। চোখের সামনে কত বছর পর মেয়েটাকে দেখলেন, আগের চেয়ে একটু স্বাস্থ্যবতী হয়েছে তৃণা। বুকে নেবেন কীনা বুঝতে পারছেন না, একদিকে যে তার বুক ভাঙা আরও একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে…

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

দীক্ষা মনে হয় বুঝল মায়ের মনের অবস্থা৷ নিজে থেকেই চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। কিন্তু থমকে দাঁড়াল তৃণার ডাকে।
‘আপা?’
দীক্ষা জবাব না দিলেও চোখ তুলে তাকাল, চাহনিতে প্রশ্ন, তৃণা মুচকি হেসে বলল, ‘তোমায় সুন্দর লাগছে।’
দীক্ষা কোনো জবাব দিলো না। হাসলও না। চলে গেল গটগট পায়ে। আর তারপর পরই প্রশ্ন ধেঁয়ে এলো খালেদার তরফ থেকে, ‘তুই এখানে কেন?’ গলা গম্ভীর তার, তৃণা হাসিমুখেই চাইলো,
‘বারে, বাড়িতে বিয়ে লেগেছে আর আমি আসব না?’
‘তুই কোথায় শুনলি, বকুলের বিয়ের খবর?’

‘আমাকে জানানোর কত মাধ্যম আছে…মা।’ তৃণা হেয়ালি করে বলতেই খালেদা রেগে গেলেন, ‘ঢং না করে সরাসরি বল, কোথা থেকে জানলি? যতদূর জানি, দীক্ষা তোকে…’ একটু থেমে গলার স্বরটা যথাসম্ভব নামিয়ে নিয়ে বললেন, ‘এ বাড়ির কেউই তোকে ফোন করে দাওয়াত দেবে না। তাহলে এলি কেন?’
‘এলাম বলে তোমার কি কষ্ট হচ্ছে মা?’ তৃণার খারাপ লাগল। এতক্ষণ খুব চেষ্টা করছিল, নিজেকে খারাপ না লাগানোর, কিন্তু আর পারল না। ভেবেছিল ওকে দেখে আর কেউ খুশি হোক না হোক, মা তো খুশি হবেই! কিন্তু তিনিও কেমন করছেন.. তবে কি সত্যিই তৃণার আপন বলতে কেউ নেই? এ কথা মনে হতেই মন স্বান্তনা স্বরুপ শোনালো, ‘এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক না? তুমি কি করেছিলে, ভুলে গেলে এত তাড়াতাড়ি?’
না, ভোলেনি তৃণা, মনে আছে সব।

একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ছেড়ে সে বলল, ‘আপার পেইজে দেখলাম, সবার কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছে, বকুল আপার বিয়ে উপলক্ষে। তখন মিয়া বাড়ির রশ্নিকে ফোন করে জানলাম, বিয়ের তারিখ কবে পড়েছে? তাই শুনে নিজেই ছুটে এলাম। এতবড় একটা দিন বকুল আপার, এ বাড়ির- আমি তো এ বাড়িরই…’ তৃণা থামল ক্ষণকাল, মলিন হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘না এলেই ভালো করতাম বুঝি। ব্যাপার না মা, সকালেই চলে যাবো। রাতটুকু অন্তত…’
তৃণা চলে গেল।

খালেদা দাঁড়িয়ে রইলেন একা একা। স্পষ্ট দেখলেন, মেয়েটার অভিমানে ভরা ছলছল দুই চোখ, কিন্তু কিছুই করতে পারলেন না। বলতে পারলেন না। এক মেয়ের অন্যায়ের প্রতি ইনসাফ দিতে গিয়ে তিনি আরেক মেয়ের নামে বুকে যে পাথর বেঁধেছেন, সে খবর কি কেউ জানে?
তৃণা একপাশে সরে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে সে এক চিলতে ম্লান হাসি ধরে রাখল। বাড়ির পরিবেশটা দ্রুত বদলে যেতে শুরু করেছে। সূচির মায়ের সেই তিক্ততা ধুয়ে মুছে দিয়ে আবার ফিরে এসেছে উৎসবের আমেজ।
পুকুর পাড়টা সাজানো হয়েছে চমৎকার করে। চারদিকে বাঁশের কঞ্চিতে ঝোলানো হয়েছে হরেক রঙের টুনি বাল্ব। সেই আলোর প্রতিফলন যখন থিরথিরে পুকুরের জলে গিয়ে পড়ছে, মনে হচ্ছে যেন জলের তলায় আরেকটা আলোর শহর জেগে উঠেছে। পাড়ের এক কোণে কলাগাছ গেড়ে তার ওপরে লাল-হলুদ কাপড়ের শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। মাটির সরাগুলোতে জ্বালানো হয়েছে ঘিয়ের প্রদীপ। সরাগুলোর চারপাশ দিয়ে আলপনা আঁকা, যা আগত অতিথিদের চোখে এক স্নিগ্ধ মায়া বুলিয়ে দিচ্ছে।

বকুলকে যখন পিঁড়িতে করে নিয়ে আসা হলো, তখন পাড়ার মেয়েদের চিৎকারে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠল। তার পরনে বাসন্তী রঙের সুতি শাড়ি, কপালে চন্দনের ফোটায় আঁকা লাল টিপ আর গলায় কাঁচা ফুলের গয়না। বকুলের মুখটা থমথমে থাকলেও ছোট বোনদের আর পড়শিদের হুল্লোড়ে সে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
একে একে শুরু হলো আচারের পালা। খালেদা বেগম সবার পেছনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে চোখ মুছছিলেন। আজ এ বাড়ির এক মেয়ের হলুদ, কত আয়োজন, কত স্বপ্ন! সবটাই পূরণ হতে চলেছে…
হলুদ মাখানোর পর্বটা সবচাইতে জাঁকজমকপূর্ণ। বড় একটা কাঁসার থালায় বাটা কাঁচা হলুদ আর সর্ষের তেল রাখা। একে একে সবাই এসে বকুলের গালে, কপালে আর হাতে হলুদের ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে। একদল তরুণী গোল হয়ে বসে ধরল বিয়ের গান,

‘হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মৌ
বিয়ের সাজে সাজবে রে আজ বকুল নামের বউ…’
তালি আর গানের ছন্দে পুকুর পাড় যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে গেল। কাজলের বন্ধুরা ও আরহাম-আয়ান-মিষ্টি মিলে ছোট ছোট আতশবাজি পোড়াতে শুরু করল। আকাশের বুক চিরে সেই আলোর রোশনাই যখন পুকুরের জলে আছড়ে পড়ছিল, বকুলের মনে হলো এই মুহূর্তটা এক চিরস্থায়ী স্মৃতি হয়ে তার মনে খোদাই হয়ে থাকবে।
শীতের তীব্রতায় চারদিকে একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ, তার ভেতর মিললো হলুদ আর বাটা মেহেদির ঘ্রাণ, সব মিলিয়ে এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরি হলো। দীক্ষা তদারকি করছে সবকিছুর। সে একবারও তৃণার দিকে তাকাল না, কিন্তু তৃণা দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল তার বড় বোনের কর্মব্যস্ততা। সে ভাবল, একদিন এই বাড়ির উঠোনে সেও তো কত ছোটাছুটি করেছে। অথচ আজ সে অতিথির চেয়েও পর- সবই নিজের কর্মফল!

মাঝপথে শুরু হলো দুষ্টুমি। পাড়ার ভাবীরা মিলে বকুলকে একদম হলুদে ভূত বানিয়ে ছাড়ল। বকুল হাসতে হাসতে না বললেও কেউ তার কথা শুনল না। এরই মাঝে কাজল এক বাটি হলুদ নিয়ে এসে দীক্ষার মুখে মাখিয়ে দিয়ে দৌড় দিল। শুরু হলো এক চোর-পুলিশ খেলা। হাসির রোলে ফেটে পড়ল উপস্থিত সবাই।
রাতের নিস্তব্ধতা ভাঙছিল মাঝে মাঝে দূরে কোথাও ডেকে ওঠা ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে। পুকুরের শান্ত জলে ভেসে থাকা কচুরি ফুলগুলো টুনি বাল্বের আলোয় অন্যরকম দেখাচ্ছে। বকুল এক পলক তৃণার দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হলো। তৃণার চোখে জল থাকলেও ঠোঁটে ছিল এক প্রশান্তির হাসি। বকুল বুঝতে পারল, হাজারো মান-অভিমান আর দূরত্বের পরেও, র ক্তে র টান আসলে অস্বীকার করা যায় না।

খাওয়াদাওয়ার আয়োজন ছিল পুকুর পাড়েই। কলাপাতায় গরম গরম চিকেন বিরিয়ানি আর সালাদ, সঙ্গে একটু তেতুলের আচার। খাবারের সুবাসে ম ম করছে চারপাশ। খালেদা বেগম নিজের হাতে সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন, কিন্তু তার চোখ বারবার খুঁজে ফিরছে বাড়ির সেই অবাধ্য মেয়েটাকে, যে আজ অনেক বছর পর এই ভিড়ে এসেও বড্ড একা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হলুদ মাখানোর অনুষ্ঠান শেষ করে বকুলকে নিয়ে যাওয়া হলো বাড়ির ভেতরে। পুকুর পাড়ের আলোগুলো একা একাই জ্বলছে। জলের প্রতিবিম্বে অতীত ঢেউয়ে ভেসে এলো যেন, তৃণা একা পুকুর ঘাটে গিয়ে বসল। জলে হাত ডুবিয়ে সে অনুভব করতে চাইল তার শেকড়কে। বিমর্ষ রাতের আকাশে তখন একলা চাঁদটা সাক্ষী হয়ে রইল- এক ভাঙা আর গড়ার গল্পের।

শীতের রাতটা যেন আরও একটু জেঁকে বসেছে। নিস্তব্ধ গ্রাম, কেবল টিনের চালে টুপটাপ করে ঝরছে ঘন শিশিরের ফোঁটা। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দুটোর ঘর ছুঁইছুঁই। মেহমানদের বিদায় করে, সারাদিনের হুল্লোড় শেষে বাড়ির অন্দরমহলে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

ভেতরের বড় বারান্দাটায় লম্বা করে পাটি পাতা হয়েছে। ল্যাম্পের হলদেটে আলো আর কুয়াশা মিলে সৃষ্টি করেছে এক মায়াবী পরিবেশের। সেখানে গোল হয়ে খেতে বসেছে সবাই- খালেদা বেগম, দীক্ষা, তৃণা, অরুণিমাভ, কাজল আর শিশিরের পরিবারের লোকজন। মাঝখানে বড় ডেকচি থেকে ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি কলাপাতাগুলোতে বেড়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই এলাচ আর দারুচিনির ম ম গন্ধে শীতের রাতটা যেন একটু উষ্ণ হয়ে উঠল।
তৃণা এক কোণে জড়সড় হয়ে বসেছে। তার কলাপাতাটা সবার শেষে। খালেদা বেগম পরম মমতায় সবার পাতে বিরিয়ানি তুলে দিচ্ছিলেন। তৃণার পাতের কাছে আসতেই হাতটা সামান্য কাঁপল তাঁর, কিন্তু মুখে কিছু বললেন না; অনেকটা বেশিই মাংসের টুকরো তুলে দিলেন মেয়ের পাতে। তৃণা মাথা নিচু করে রইল, তার চোখে জল উপচে পড়ার উপক্রম।

অরুণিমাভ আর কাজল দ্রুত হাত চালাচ্ছে। ঘন্টাখানেকের বিশ্রাম নিয়েই আবার কাজে নামতে হবে তাদের। আগামীকাল বিয়ে বাড়ির বিশাল আয়োজন- সকালে খিচুড়ি, দুপুরে চার-পাঁচ রকমের পদ রান্নার তোড়জোড়। যে কোনো মুহূর্তে হেড বাবুর্চি এসে হাজির হবেন।
এত বড় একজন মানুষ হয়েও অরুণিমাভ অবলীলায় মিশে গেছেন সবার সঙ্গে। বকুলকে নিজের বোনের মতোই ভেবে প্রতিটা কাজে এগিয়ে যাচ্ছেন, নিজ হাতে তদারকি করছেন সবকিছু। খালেদা দূর থেকে দেখে মুগ্ধ হন। এই ছেলেটা প্রতিবারই তাঁকে নতুন করে মুগ্ধ করে।

আরহাম আর আয়ান অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মিষ্টি একই ঘরে, তাদের সঙ্গেই আছে হৃদয়- তৃণার সন্তান। সব ভাইবোন আজ একসঙ্গে, একই বিছানায়। দীক্ষা দেখে এসেছে ওদের। বকুলও নিজের ঘরেই আছে।
রাতে আর খাবে না বকুল। স্টেজে সবাই মিলে এক লোকমা, দুই লোকমা করে খাওয়াতে খাওয়াতেই ভালো করে খাওয়ার ইচ্ছেটা মরে গেছে। পেট ভরা। তার ওপর ভোরে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে, গোসল করাতে হবে। তাই খালেদা তাকে নিজের ঘরে গিয়ে শাড়ি খুলে ঘুমাতে বললেন। হাত-মুখ ধোয়ারও দরকার নেই এখন। ভোরে এই লেবাসেই গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হবে।

খাওয়া-দাওয়ার ক্ষীণ শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোনো আওয়াজ নেই। টিনের চালের ওপর টুপটাপ করে নিশির ঝরনা পড়ছে- মৃদু, একঘেয়ে শব্দে। খেয়েদেয়ে সবাই দ্রুত বিছানার দিকে ছুটবে- এমন হাবভাব। সবার শরীরেই ক্লান্তির ভার। তাছাড়া উঠতেও হবে ভোরবেলা, আগামীকাল তো আসল যুদ্ধ!
এই নীরবতা ভেঙেই শর্মিলা বলে উঠল হঠাৎ, ‘তোমাকে কে দাওয়াত দিলো?’
কথাটা সাধারণ ভাবেই জিজ্ঞেস করা, তবু তৃণার বুকে খচ করে একটা কামড় দিলো। সে রেগেই গেল ঈষৎ, গলার স্বর গম্ভীর করে শুধালো, ‘আমার বাড়িতে আমাকে দাওয়াত দিতে হবে?’

শর্মিলা আড়ালে মুখ বাঁকাল, এই মেয়েটাকে সে এখনো ঠিক যুতের ভাবতে পারছে না, ‘আমি সেটা বলিনি, আমরা এলাম পরে তুমি এলে.. নিজের বাড়ি হলে তো তুমি আরও এক সপ্তাহ আগে থেকে থাকতে, তাই না?’
কাঁটা হয়ে উঠল তৃণার গা, শর্মিলা কি তাকে খোঁচা দিচ্ছে? সে খালেদার দিকে তাকাল, তিনি নির্লিপ্ত, যেন কিছুই বলার নেই এখানে। তৃণা মাথানিচু করে খাওয়া শুরু করল পুনরায়। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতে চাইছে, কতক্ষণ ধরে আঁটকে রেখেছে, আর পারছে না। দ্রুত উঠতে হবে।
সায়েমা বেগম পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বললেন, ‘কিছু মনে করো না। আমার বড় বউয়ের মনে দোষ নেই। শুনলাম, তুমি বিয়ে করে নিয়েছো, তোমার স্বামী আসেনি?’
তৃণা বলল, ‘না।’

‘নিয়ে আসতে…যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। আমার তোমার উপরে আর কিছুই নেই। রাগ,অভিমান,কষ্ট – কোনোটাই না। নিজেদের জীবন নিজেরা এলোমেলো করেছ, ভুলটা শুধরে এখন ভালো হয়ে গেলেই হলো।’
তৃণা কিছুই বলল না। চুপচাপ খাওয়ার পাতে হাত চালাতে লাগল।
রাসেলের সঙ্গে তার সম্পর্কটা বাইরে থেকে ঝামেলাবিহীনই বলা যায়। রাসেল পারতপক্ষে তার মুখে মুখ লাগায় না। পড়াশোনার খাতিরে বাইরে যাবে, এই নিয়েই যত প্রস্তুতি, যত ব্যস্ততা। তৃণাকে নিয়ে তার ভাবনা সেখানেই থেমে থাকে।

তবে মিনারা বেগমের সঙ্গে তৃণার প্রতিদিনই দুইবেলা করে লাগে। ভালোবাসা, যত্ন, স্বামীর সোহাগ- কোনোটাই তৃণার কপালে জোটেনি। কোনোদিন জুটবে কি না, সে নিজেও জানে না। হৃদয় হওয়ার পর হাতে গোনা পাঁচবার তাকে কাছে টেনেছিল রাসেল- সেটাও যেন কেবল শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্যই। এর বাইরে কখনো ‘তুমি খেয়েছো?’- এই সামান্য প্রশ্নটুকুও তার মুখ থেকে বের হয়নি।
তবে হৃদয়কে রাসেল মন থেকে ভালোবাসে। মিনারা বেগমও। হয়তো এই শিশুটার জন্যই সম্পর্কের সুতোটা এখনো টানটান হয়ে কোনোভাবে জোড়া লেগে আছে। কতদিন এভাবে চলবে- তৃণা জানে না।
একসময় কত আশা ছিল, কত স্বপ্ন ছিল। বিয়ের পর জীবন এমন হবে, স্বামী হবে এমন- সবকিছুই আজ ধূলিসাৎ। এসব নিয়ে সে আর আফসোস করে না। যা হয়েছে, নিজের জীবনেই নিজে ডেকে এনেছে- আফসোস করবে কাকে ঘিরে?
তবু বুকটা ভারী হয়ে আসে। প্রায়ই। চোখ ভরে ওঠে অজান্তেই। মনের ভেতর পাহাড় জমে- জীবনটা যে অন্যরকমও হতে পারত!

দু’জনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। উঠোনের এক কোণে, আলো-ছায়ার সীমারেখায়। সিগারেটের আগুন একসাথে জ্বলে ওঠে- ক্ষুদ্র, ক্ষণস্থায়ী আলো। তারপর আবার নীরবতা।
অরুণিমাভ আর কাজল দু’জনেই চুপচাপ সিগারেট টানছে। কারো মুখে কথা নেই, অথচ দু’জনের মাথার ভেতরই অনেক কিছু ঘুরছে। নিশির ঠান্ডা বাতাসে ধোঁয়াগুলো এলোমেলো হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।
হঠাৎ কাজল নীরবতা ভাঙে।
‘ভাইয়া, একটা কথা বলি… যদি কিছু মনে না করেন?’

অরুণিমাভ তখন অন্য কিছু ভাবছিল। ধোঁয়ার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকে দূরে। খানিক থেমে বলেন, ‘হ্যাঁ, বলো?’
কাজল ঠোঁটে সিগারেট চেপে একটান দেয়। তারপর চোখ সরিয়ে বলে ফেলে, ‘আপনি এত ভোদাই কেন?’
প্রশ্নটা এমনভাবে আসে যে অরুণিমাভ প্রায় চমকে ওঠেন। অবাক হয়ে তাকান কাজলের দিকে।
কাজল তাড়াতাড়ি যোগ করে, ‘রাগ করবেন না ভাইয়া। কথা খারাপ শোনালেও এরচেয়ে ভালো বিশেষণ আমার মাথায় আসছে না। আপনি যে আপাকে কতটা ভালোবাসেন- এটা এ বাড়ির মানুষ বাদে ফুপুর আঁতালের হাঁস-মুরগিও জানে। অথচ আপনি মুখ ফুটে বলতেই পারছেন না!’

অরুণিমাভ দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। লজ্জা ঢাকতে গলা খাঁকারি দেয়, আমতা আমতা করে জানালেন, ‘দীক্ষা আমাকে পছন্দ করবে না, কাজল। আমি কোথায় আর ও কোথায়… আমার মতো বয়স্ক একজন মানুষ…’
কাজল হালকা হেসে ফেলে, ‘আরে জামাই বয়স্কই ভালো। আপনি একবার নিজে থেকে বলেই তো দেখেন।’
‘তাতে কী হবে?’
‘তাতে আমরা সবাই ফোর্স করতে পারব, বোঝাতে পারব। এখন বোঝাতে গেলে ও বলবে- ‘অরুণিমাভ কি বলেছে যে সে আমাকে পছন্দ করে? তোমরা আন্দাজে এসব বলছো।’ কিন্তু আপনি সরাসরি বললে এই বাহানাটাও দিতে পারবে না।’

অরুণিমাভ আর কিছু বললেন না। চুপ করে সিগারেটের শেষটুকু পোড়ান। চোখে জমে থাকা দ্বিধেটা আরও ঘন হয়ে ওঠে।
তা দেখে কাজল নিজের সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পায়ের তলায় চেপে নিভিয়ে দেয়। একপা এগিয়ে এসে অরুণিমাভের কাঁধে হাত রাখে।

আশ্বস্ত কণ্ঠে বলে, ‘সময় কিন্তু বসে নেই। আরহাম আয়ান কতটা পছন্দ করে গোল্লাকে- নিজের বোন ভাবে। সেইদিন আপাকে মা ডাকতে চেয়েছিল আয়ান, আপা না করল। না, রাগ করে না, দ্বিধায়- বলল তোমাদের পাপা শুনলে রাগ করবে। আপাও আপনাকে পছন্দ করে, বোঝা যায় তার চোখ দেখলেই। কিন্তু স্বীকার করতে ভয় পায়৷ যা হলো তার জীবনে, তাতে এই স্বাভাবিক না? কিন্তু আপনি যদি এভাবে থমকে থাকেন, নিজের অনুভূতি গুলো প্রকাশ না করেন, তাতে কি এক হওয়া হবে কোনো ভাবে? এই যে বকুল আর শান্ত ভাইয়ার বিয়েটা হচ্ছে, শান্ত ভাইয়া এগোলো বলেই তো…আপনার মতো থমকে থাকলে চেয়ে চেয়েই দেখা লাগত আজীবন। আপনি একবার নিজের উপর বিশ্বাস রেখেই বলেই ফেলুন না.. আমার বিশ্বাস আপা আপনাকে ফিরিয়ে দেবে না। মিষ্টিটা বড় হচ্ছে আর আপা একা হচ্ছে.. সবাই থেকেও কি যেন নেই তার… আমি বুঝি ভাইয়া…’

‘খুব বড় হয়ে গেছো!’ অরুণিমাভ মজা করে কাজলের গাল টানলেন।
কাজল ঝামটা দিয়ে হাত সরিয়ে দিল।
‘আহ্লাদ না করে আপাকে গিয়ে বলুন।’
‘এখন?’
‘হ্যাঁ, এক্ষুনি। দিনের আলোয় যা বলা যায় না, রাতের অন্ধকারে তা অনেক সময় করেও ফেলা যায়- জানেন তো?’
‘কা… কাজল…’
কথা শেষ করার আগেই কাজল তাকে ঠেলতে শুরু করল, ‘যান যান… আপাকে ডাকুন গিয়ে। অবশ্য একটা নৌকো থাকলে আরও জোশ হতো।’
‘কেন?’

কাজল হালকা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আপা নদীর বুকে নৌকো চড়ে ঘুরে বেড়াতে অসম্ভব ভালোবাসে। একদিন নিজেই বলেছিল, তাতে নাকি তার দুঃখগুলোও হালকা হয়ে নদীর স্রোতে ভেসে যায়। যাই হোক, নৌকো না থাকলে নাই। আপনি আগে মনের কথাটা বলুন, বাকিটা পরে দেখা যাবে। যান না ভাইয়া… প্লিজ যান।’
অরুণিমাভের বুকের ভেতর হাজারটা ভয়, আতঙ্ক আর দোটানা একসাথে জড়ো হয়ে ওঠে। তবু শেষমেশ পা বাড়ান দীক্ষার ঘরের দিকে।

দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারেন- কাজল নেই।
পালিয়েছে! নিশির অন্ধকারে এখন শুধু তার নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়।
রাত বেশ গভীর। মিউজিক বক্সের শব্দ থামতেই চারপাশে নেমে এসেছে গাঢ় নিস্তব্ধতা। হালকা চাঁদের আলোয় তারাদের ঝিকিমিকি মিশে গিয়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ঠিক সেই সময় অরুণিমাভ নিঃশব্দে দীক্ষার দরজায় দুটো টোকা দিলেন। দরজা খোলাই ছিল।
‘আসুন।’ ভেতর থেকে জবাব দিলো সে।

‘তুমি একটু বাইরে আসবে দীক্ষা?’ অরুণিমাভ রিকোয়েস্ট করলেন।
‘সেকি, কেন, কিছু হয়েছে?’ বলতে বলতে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সে।
অরুণিমাভ দু’ধারে মাথা নাড়লেন, ভদ্রলোককে ভীষণ নার্ভাস দেখাচ্ছে, এই তীব্র ঠকঠকে কাঁপন ধরানো শীতেও ঘামছেন তিনি।
‘কি হয়েছে? ইজ এভ্রিথিং অলরাইট?’ দীক্ষার মুখ থেকে বিস্ময়তা সরে না।
‘এক…একটু আসবে?’ প্রায় ফিসফিস করেন তিনি।
‘কোথায়?’

‘আসোই না…’ খুব সাহসে ওর হাতজোড়া চেপে ধরে কোথাও একটা নিয়ে যেতে লাগলেন এবারে। দীক্ষা এতই অবাক হলো যে পুনরায় কিছু শুধানোর খেয়াল হলো না। এগিয়ে চলল চপল পায়ে।
গ্রামের অন্ধকার কাঁচা পথ ধরে পাশাপাশি হাঁটছে তারা। সোনাডিঙি নদীর দিকে এগিয়ে চলেছেন অরুণিমাভ। চারপাশে কেবল ঝিঁ-ঝিঁ পোকার ডাক আর দু’জনের চাপা নিঃশ্বাসের শব্দ। দীক্ষা এবার ইতস্তত করে বলল, ‘আপনি….এত রাতে আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আর এই সোনাডিঙি নদীর পাড়েই বা কেন?’
অরুণিমাভ ঠান্ডা হাসলেন, সেই হাসি অন্ধকারেও যেন এক ধরনের নির্ভরতা এনে দিল। তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে আচমকা তার দু’হাত বাড়িয়ে দীক্ষার চোখ চেপে ধরলেন, ‘আমাকে বিশ্বাস করো?’
হৃদপিণ্ডটাকে হাতে নিয়ে জড়ানো স্বরে উচ্চারিত হলো শব্দগুলি, ‘ক..করি।’

‘তবে চুপ করে চলো…’
কিছু একটা বলতে গিয়েও আর বলল না সে। নীরবতাকে মেনে নিয়ে অরুণিমাভের নির্দেশিত পথ ধরে এগোতে লাগল ধীরে ধীরে।
‘সাবধানে হাঁটান..’ এতটুকুই বলল।
অরুণিমাভ তার চোখ শক্ত করে চেপে ধরে আলতো করে সামনে এগোতে লাগলেন। দীক্ষা অন্ধের মতো পা টিপে টিপে অরুণিমাভর নির্দেশনা মেনে হাঁটছে, মাঝে মাঝে তার হাত ধরে ভারসাম্য রাখছে। পায়ের নিচে নরম মাটি, চারপাশের আবহাওয়া যেন এক রহস্যময় প্রত্যাশায় থমকে আছে। দীক্ষার মনে কৌতূহল- আসলে কী হতে চলেছে? এই অন্ধকার নদীর ধারে কী এমন চমক অপেক্ষা করছে?

কিছুদূর হাঁটার পর অরুণিমাভ থেমে গেলেন। তার হাত দুটো তখনও দীক্ষার চোখের ওপর চাপা, কিন্তু এবার তার কণ্ঠস্বরে এক গভীর আবেগ নেমে এলো, ‘রেডি? এবার চোখ খোলো!’
দীক্ষা চোখ খুলতেই যেন এক দমকা বাতাস এসে তার সমস্ত অনুভূতিকে স্তব্ধ করে দিল। সে একদম হা হয়ে গেল- অবাক, স্তব্ধ, স্থির- সবগুলো অনুভূতি আছড়ে পড়ল একত্রে..
তার সামনে সোনাডিঙি নদীর পাড় ধরে জলের উপর ভাসছে একটি বিশাল মাপের নৌকো। কিন্তু এ কোনো সাধারণ নৌকো নয়! যেন রাতের অন্ধকারে ভুল করে কোনো রাজবাড়ির বজরা এসে ভিড়েছে। নৌকোটির কাঠ খোদাই করা, তার পালিশে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো তার সজ্জা আর আলো। পুরো নৌকোটিকে আবৃত করে রেখেছে মৃদু হলুদ, নীল আর সোনালী রঙের ছোট ছোট ফেইরি লাইট। সেই আলো নদীর কালো জলে প্রতিবিম্বিত হয়েছে। দেখে মনে হয়, হাজার হাজার দীপ জ্বালিয়েছে কেউ কালো জলের চাদরে। নৌকোটির প্রবেশপথে ঝোলানো কোমল লণ্ঠন, ভেতরে নরম কুশন পাতা আর সামান্য দূর থেকে ভেসে আসছে অতি ধীর লয়ের কোনো বাদ্যযন্ত্রের সুর। এত সুন্দর, এত রাজকীয়, এত জাঁকজমকপূর্ণ এই দৃশ্য- দীক্ষার বিশ্বাসই হয় না প্রথমে।

সে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ, কেবল তাকিয়ে আছে সেই আলোকিত জলযানের দিকে। অরুণিমাভ তার কাঁধে হাত রাখতেই দীক্ষার ঘোর কাটল। সে ফিসফিস করে বলল, ‘এ-এ সব… এ সব কী? কার জন্য এত আয়োজন?’
পেছন ফিরে চাইতেই আরও চমকে উঠল সে।
এক হাঁটু ভেঙে বসেছেন অরুণিমাভ। এই বয়সে এসে এমন বাচ্চামো তাকে কি মানায়? দীক্ষা আবিষ্কার করল, তার চোখজোড়ায় কিছু একটা পড়েছে। ঝাপসা লাগছে সবকিছু। কুয়াশা বাড়ল নাকি….চোখে জমল জল?
‘ক…কি চাই…চাইছেননন আপনি…’ প্রায় আধ মিনিট পর রুদ্ধ হয়ে আসা কণ্ঠে ফিসফিস করে শুধালো সে, অরুণিমাভ উঠে এলেন, খুব কাছাকাছি- দীক্ষার ঘোর লাগল কেমন। নাকি এই শীতল আবহাওয়ায় গায়ে কাটা দিলো, কে জানে!

মানুষটা ওর একটা হাত ধরে নিজের হাতের মুঠিতে চেপে ধরলেন, আকস্মিক চুমু খেলেন উলটো পিঠে, এতই অকস্মাৎ চমকে উঠতেও ভুলে গেল মেয়েটা।
জবাবে তিনিও ফিসফিস করেই শুধালেন, ‘তোমার ভাই আমায় কি বলল জানো? বলল, তুমি নাকি নৌকো চড়তে খুব পছন্দ করো, ওতে চড়লে তোমার দুঃখ নাকি ভেসে ভেসে যায়। খুব চাইছিল, আমি যেন তোমায় একটা নৌকো উপহার দেই।’

‘আর তাই আপনি এই নৌকো বানিয়েছেন?’ গলার অভিমানটা টের পেলেন অরুণিমাভ, হাসলেন অল্প, কপালটা ঠেকালেন ওর কপালে, ‘তোমার কি মনে হয়, ওর কথা শুনে আমি এইটিই বানাবো?’
জবাব না দিয়ে চেয়ে রইলো দীক্ষা, ঠোঁটের কোণে মিটমিটে হাসি,
‘না, ও যখন বলছিল, আমি শুধু শুনছিলাম, বুঝতেই দেইনি, ওর বলার আগেই যে আমি সমস্তটা পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম!’
‘কিসের পরিকল্পনা?’

‘তোমায়…’ আরেকটু কাছে টেনে বুকের সঙ্গেই মিশিয়ে নিলো মানুষটা, ‘এই ভাবে…’ আরও টানলো একটু, ‘আমার বুকের সঙ্গে…’ শেষবারের মতো টেনে পুরোটা নিকের বুকের পাটাতনে ফেলল, ‘জড়িয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা…’
পুরো শরীরটা থরথর করে কাঁপছে দীক্ষার। মানুষটা এত রোমান্টিক, কবে থেকে, কি করে- বাইরের খোলসে তো বোঝা যায়নি কোনোদিন!
লজ্জাবতী পাতার ন্যায় নুয়ে পড়ল সে, সইতে পারছে না এ ভার, বুকের ভেতর ভেঙে যাচ্ছে কিছু একটা। কান্না পাচ্ছে, ভীষণ ভীষণ ভীষণ….
অকস্মাৎ সে সব ভুলে জড়িয়ে নিলো…

জড়িয়ে নিলো মানুষটাকে। উপেক্ষা করতে পারল না, পারল না তার উষ্ণ আলিঙ্গন, তার তীব্র ভালোবাসা কিংবা তাকেই.. স্বাক্ষী হলো ভোরের পথে হাঁটা রাত, স্বাক্ষী হলো সোনাডিঙি নৌকো।
দীক্ষা মানুষটার বুকে মাথা রেখে কাঁদছে। নীরবে, নিভৃতে- তার আর কোনো দুঃখ নেই, কোনো যাতনা নেই, বিধাতা যা নিয়েছিলেন, তার চেয়ে বহুগুণ ফিরিয়ে দিয়েছেন… ফিরিয়ে দিয়েছেন হৃদয়ের শূন্য দুয়ারে!

ভোরের সেই কুয়াশা ঢাকা রূপালি পর্দা সরিয়ে দিয়ে আকাশের বুকে ঝকঝকে রোদের জয়গান শুরু হলো। রাতের সেই হাড়কাঁপানো শীতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সূর্যি মামা আজ যেন একটু বেশিই দরাজ হাতে সোনা ছড়াচ্ছেন। মাঘের এই মিঠে রোদ গায়ে লাগতেই সবার আলস্য কেটে গিয়ে শরীরে নতুন এক চঞ্চলতা ভর করল।
আজ বকুলের বিয়ে! সোনাডিঙি গ্রামের এই বাড়িটাতে আজ সাজ সাজ রব।
সকালবেলার রোদটা উঠোনের আমগাছের ফাঁক দিয়ে এসে যখন বকুলের মুখে পড়ল, তখন থেকেই শুরু হলো আসল হুল্লোড়। নিয়মানুযায়ী বকুলকে নিয়ে আসা হলো উঠোনের মাঝখানে। চারিদিকে শোরগোল উঠল
‘ধর ধর ধর
মাখ মাখ মাখ
নয়া বউরে আরও হলুদ মেন্দি মাখ’

আগের রাতের সেই থমথমে ভাবটা যেন রোদের তাপে উবে গেছে। দীক্ষা, কাজল, শর্মিলা আর পাড়ার একঝাঁক ছেলেমেয়ে মিলে শুরু করল এক অভাবনীয় রঙের উৎসব। শুধু হলুদ নয়, সাথে যোগ হলো আবির আর জল। বকুলকে হলুদে মাখামাখি করে একেবারে চেনা দায় করে ফেলল তারা। কিন্তু মজা সেখানেই থেমে রইল না; ‘হলুদ দিলে বকুলকে একা কেন? আমরা কি দোষ করলাম?’- এই বলে কাজল প্রথমে রুমেলের গালে এক থাবা হলুদ লাগিয়ে দিল। ব্যস, মুহূর্তেই বাড়ির আঙিনাটা একটা রঙিন রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। সবাই সবাইকে মাখিয়ে ভূতের মতো চেহারা করে ফেলল। সেই হাসির রোল আর গগনবিদারী চিৎকারে পাড়া-প্রতিবেশীরাও এসে ভিড় জমালো।
খালেদা বেগম বারান্দা থেকে এই দৃশ্য দেখে হাসলেন। কতদিন পর এই উঠোনটা এমন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে!
এরপর শুরু হলো বকুলের গোসলের পালা। বড় বড় ডেকচিতে করে গরম পানি করা হয়েছিল, তাতে নিমপাতা আর ফুলের পাপড়ি ভাসছে। পাড়ার ভাবি-বৌদিরা মিলে গান গাইতে গাইতে বকুলকে সেই ওষুধি পানিতে গোসল করিয়ে দিল। গোসল সেরে যখন বকুল ঘরে ঢুকল, তার গায়ের সেই হলুদাভ আভা শীতের সকালের রোদকেও হার মানাচ্ছিল। বকুলকে শেষ করে সবাই একে একে কলতলায় গিয়ে নিজেদের ফ্রেশ করে নিল।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়িতে এল পার্লারের লোক। বকুলের ঘরের দরজাটা এখন ‘নিষিদ্ধ এলাকা’। দীক্ষা নিজেই সেই দরজার অতন্দ্র প্রহরী। সে গম্ভীর মুখে ঘোষণা করে দিল, ‘খবরদার! এই ঘরে কেউ টু শব্দ করবে না। পার্লারের আপারা কাজ শুরু করেছে। বকুলকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন সবাই দেখলেই নজরে পড়ে। কেউ গিয়ে ডিস্টার্ব করলে সাজ নষ্ট হবে, আর সাজ খারাপ হলে আমি কিন্তু কাউকে ছাড়ব না!’
দীক্ষার কড়া শাসনে বাড়ির ছোটরা উঁকিঝুঁকি মারা বন্ধ করে দিল। অরুণিমাভ তখন বাইরে প্যান্ডেলের তদারকি করছে, আর তৃণা নিরবে এক কোণে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের আগলে রাখছে। সবাই ব্যস্ত সবার মতোন।
ভেতরের ঘরে আয়নার সামনে বসেছে বকুল। তার চোখের কোণে কাজল ছোঁয়া দিতেই সে যেন এক অন্য মানবী হয়ে উঠল। বাইরে রোদের ঝিলিক বাড়ছে, আর বকুলের মনের ভেতর বাড়ছে এক অজানা শিহরণ- একটু পরেই সে হবে অন্যের ঘরের ঘরণী।

বাড়ির উঠোনে তখন ডেকচিতে পোলাওয়ের চাল ধোয়ার শব্দ আর রান্নার মশলার সুবাস মিলেমিশে একাকার। বকুলের বিয়ের এই রোদঝলমলে সকালটা যেন এক পূর্ণতার গল্পই বলছে।
দীক্ষার হাতে শাড়ি, এর সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজটা কোথায় যেন রেখেছে, খুঁজে না পেয়ে ছুটছে এদিক ওদিক। কপালে ভাঁজ, মেজাজ তিতিক্ষি!
এর মধ্যেই তার পথ আগলে দাঁড়াল একজন, অরুণিমাভ চৌধুরী! চোখের ইশারায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো মেয়েটা, ‘কি?’
অরুণিমাত ভ্রুতে ভাঁজ ফেলে বললেন, ‘সাজবে কে, শুধু বকুল একাই?’
‘আর কে সাজবে? বিয়েটা তো ওর-ই!’

‘তবু… বউ সাজে আমারও তো দেখতে ইচ্ছে করছে কাউকে।’
দীক্ষা লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, ‘আপনার যত উল্টাপাল্টা আবদার..’ গমগম করল মেকী রাগ দেখিয়ে, ‘যার বিয়ে সেই বউ সাজবে, অন্যরা সিম্পল, নিয়ম এটাই।’
‘তাহলে কি তাকে বউ সাজে দেখতে হলে আমারও বিয়ের প্রোগ্রাম করা লাগবে?’
আড়ষ্ট হয়ে মাথা নুয়ে হাসল মেয়েটা।

ভারী পাজি, দুষ্টু, কে বলবে এই লোকের বয়সটা আর কিশোরে আঁটকে নেই! তবে মনটা বুঝি এখনো বাচ্চা?
দীক্ষা ছুট লাগাল, অরুণিমাভ হাসলেন, ‘এবার পালাও, পরেরবার কিন্তু এই সুযোগটাও পাবে না।’
‘দেখবখন…’ দৌড়ে ঘরে ঢুকতেই কানে এলো কথাটা, ‘আর দুয়েকদিন থেকে যাও। কবে না কবে আসতে পারো। এ বাড়ি তো তোমার বড় বোনের, তোমার আর কি?’
ঘরে তৃণা, শর্মিলা, রূম্পা সহ আরও কয়েকজন।

সবাই বসে সবার শাড়ির ভাঁজ খুলে দেখাচ্ছে। তৃণাও নিয়ে এসেছে একটা নরমালের ভেতর, মোটামুটি দেখতে শাড়ি, তাই দেখাতে বসে বলছিল, বিয়েটা হলেই চলে যাবে রাতে, তাই শুনে রূম্পা ও কথাটি বলল। দীক্ষাকে দেখে চুপ হয়ে গেল দলটা। দীক্ষা যেন শোনেইনি অমন করে আলমারির পাট খুলল। ব্লাউজটা পেল খুঁজে, ওটা বের করে আরেকটা শাড়ি নামিয়ে আনলো। কি সুন্দর, জলপাইয়ের ভেতর সোনালি জরি সুতোয় কারুকাজ করা। এটাও দীক্ষার পেইজেরই একটা ফেমাস শাড়ি, রূম্পা উৎসুক স্বরে শুধালো, ‘এটা পড়বে নাকি?’
দু’ধারে মাথা নেড়ে ওটা তৃণার দিকে এগিয়ে দিলো সে, ‘তুই পড়, মানাবে।’

ব্যস এতটুকুই, তারপর যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই বেরিয়ে গেল। ফিরেও দেখল না, তৃণার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে সমানে…বোনের এইটুকু যত্নেই তৃণার এ জন্মের সব আফসোস ঘুঁচে গেছে!
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। কাজী সাহেবের খেরোখাতায় সই করে যখন বকুল কাঁপা কাঁপা গলায় ‘কবুল’ বলল, তখন তার দুচোখ বেয়ে শ্রাবণ নেমেছে। জীবনের এক এক করে চব্বিশটি বছর যে আঙিনায় কাটল, নিমিষেই যেন সেই ভিটেমাটি পর হয়ে গেল। একদিকে নতুন জীবনের রোমাঞ্চ, অন্যদিকে নাড়ি ছেঁড়া বিচ্ছেদের হাহাকার- এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই বোধহয় নারীর জীবন সার্থক হয়।

একটু দূরে শামিয়ানার নিচে সায়মা বেগমের কোলে মুখ গুঁজে বসে আছে ছোট্ট মিষ্টি। তার বেস্টি নাম্বার টু- অর্থাৎ বকুল চলে যাচ্ছে, এটা মেনে নেওয়া তার জন্য এমনিতেই কঠিন। তার ওপর দাদুমণি আজ তাকে একটা ছবি দেখিয়েছে। বলেছে, ওটাই নাকি মিষ্টির বাবা!
মিষ্টির শিশুমন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সে দাদুমণির ওপর ভীষণ নারাজ। তার পাপা তো ওই যে- অরুণিমাভ চৌধুরী! যে মানুষটা সারাক্ষণ মায়ের ছায়ার মতো পাশে থাকে, আরহাম আর আয়ানের মতো তাকেও নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখে, মিষ্টিকে ভালোবেসে ‘গোল্লা’ বলে ডাকে- সে ছাড়া আর কে বাবা হতে পারে? দাদুমণি কেন ওই লোকটাকে বাবা বলছে? মিষ্টি ঠিক করেছে, সে আর দাদুমণির সাথে কথাই বলবে না।
এমন সময় দীক্ষা এগিয়ে এল। ক্লান্ত মুখে স্নিগ্ধ হাসি মাখিয়ে বলল, ‘আসবেন না? ওদের গাড়ি ছেড়ে দেবে। মিষ্টির কী হয়েছে? মুখটা এমন হাঁড়িপানা কেন?’

সায়মা বেগম করুণ চোখে নাতনির দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ধরা গলায় বললেন, ‘কী বলব মা তোমায়! ও তো মানতেই চাইছে না। বলছে ওর পাপা তো ওই যে অরুণিমাভ… আর আমার ছেলেটা নাকি কেউ না।’
বলেই সায়মা বেগমের চোখ ভিজে উঠল। দীক্ষা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো যে কত কঠিন, তা সে আজ প্রতি পদে অনুভব করছে। সে কিছু বলার আগেই পেছন থেকে অরুণিমাভ এসে ছোঁ মেরে মিষ্টিকে কোলে তুলে নিলেন। দোল দিতে দিতে বললেন, ‘কী হয়েছে আমার মিষ্টি মামণির? আমার গোল্লা কি আজ রাগ করেছে?’

মিষ্টি গাল ফুলিয়ে বলল, ‘তুমিই তো আমার পাপা, তাই না? ওই লোকটা কে?’
অরুণিমাভ এক মুহূর্ত থমকালেন। তারপর মিষ্টির চোখের দিকে চেয়ে খুব শান্ত আর গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘জানিস গোল্লা, মানুষের সচরাচর একটাই বাবা থাকে। কিন্তু আল্লাহ তোকে খুব বেশি ভালোবাসেন বলে তোকে দু’জন বাবা দিয়েছেন। ওই ছবিতে যে মানুষটাকে দেখলি, উনি তোর ‘বাবা’। উনি আজ দূরে আছেন বলে আসতে পারছেন না, কিন্তু খুব শিগগিরই তোর কাছে আসবেন। তখন দেখবি, আমি তোকে যতটা ভালোবাসি, উনি তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি ভালোবাসেন। তোর প্রিয় চকলেট, জামাকাপড়, খেলনা কিংবা যা চাই, সব উনি কিনে আনবেন। কোনোদিন যদি তোর মা কিংবা আমি নাও থাকি, সেই মানুষটা তোকে বড্ড যত্নে আগলে রাখবে। ওটাই র ক্তে র টান রে মা!’

মিষ্টি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আর তুমি?’
অরুণিমাভ মিষ্টির কপালে একটা চুমু খেয়ে তাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলেন। মৃদু স্বরে বললেন, ‘আর আমি তোর ‘পাপা’। আমাদের মধ্যে র ক্তে র সম্পর্ক নেই ঠিকই, কিন্তু আত্মাটা যে একসাথে জুড়ে গেছে রে মা।’
অরুণিমাভের কথা শেষ হতে না হতেই আরহাম আর আয়ান হইহই করে ছুটে এল। আয়ান চিকন গলায় অভিযোগের সুরে বলল, ‘ইউ আর সো লাকি গোল্লা! তুই বাবাকে পাপা বলতে পারিস, কিন্তু আমি যদি মাম্মিকে একবার ‘মা’ বলে ডাকি, অমনি উনি চোখ রাঙিয়ে নিষেধ করে দেন। হুহ!’

দীক্ষার বুকের ভেতরটা এক অজানা হাহাকারে দুমড়ে গেল। এতদিন যে ডাকটা শুনতে চেয়েও সে নিজেকে শাসন করে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, আজ আর সে পারল না। দুই ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে চোখের জলে ভেজা গলায় দীক্ষা বলল, ‘আর নিষেধ করব না বাবা। বল, আজ প্রাণভরে বল… আমি তোর কে?’
আয়ান আর আরহাম একসাথে চেঁচিয়ে উঠল, ‘তুমি আমার মা! আমার মাম্মি!’
দীক্ষা তার দুই সন্তান আর অরুণিমাভের কোলে থাকা মিষ্টিকে একসাথে জড়িয়ে ধরল। এ যেন এক অদ্ভুত মায়ার বাঁধন, যেখানে র ক্তে র চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে হৃদয়ের স্পন্দন।

ঠিক তখনই ভারী পায়ে এগিয়ে এল বকুল। বেনারসির আঁচলটা সামলে নিয়ে ঠাট্টার সুরে বলল, ‘বা রে! আমাকে ছাড়া সবাই মিলে ফ্যামিলি হাগ দিচ্ছো? আমি তো চলেই যাচ্ছি, একটা শেষ হাগ আমাকে দেবে না?’
দীক্ষা আর অরুণিমাভ দুজনেই দুপাশ থেকে বকুলকে জড়িয়ে ধরল। বকুল তাদের দুজনের বুকের মাঝখানে মাথা রেখে চোখ বুজল। অস্ফুট স্বরে ফিসফিস করে বলল, ‘আজ সত্যিই আমার হৃদয়টা পূর্ণ হলো। সোনাডিঙির এই নৌকোটা আজ তার আসল ঘাটে এসে পৌঁছাল।’

বাইরে তখন একটানা বেজে চলেছে সানাইয়ের সেই মায়াবী সুর। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সুরে আজ কোনো করুণ বিচ্ছেদের আর্তি নেই; নেই কোনো বুকফাটা হাহাকার। বরং এই সুর যেন এক নতুন পথচলার জয়গান গাইছে। যে পথে কেউ আজ একা নয়, বরং সবাই সবার হাত শক্ত করে ধরে আছে।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ৩৩

মান-অভিমান, দীর্ঘ বছরের দূরত্ব আর হৃদয়ের সব পুরনো ক্ষত আজ উৎসবের এই পবিত্র আলোয় ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে। কেউ কাউকে আর পর ভাবছে না, কেউ আর ব্রাত্য নয়। একে অপরকে সাথে নিয়ে, পরম মমতায় পাশে আগলে রেখে এক মোহনায় এসে মিলেছে এই একান্নবর্তী প্রাণের মেলা- আমাদের প্রিয় ‘সোনাডিঙি নৌকো’ পরিবার!
বিকেলের ঝিকমিক করা সোনালী রোদ মাখিয়ে সেই নৌকো এখন নতুন এক দিগন্তের পানে পাল তুলেছে। যে দিগন্তে বিচ্ছেদ নেই, আছে কেবল ভালোবাসার অনন্ত জলরাশি। যেখানে ঢেউয়ের শব্দে মিশে আছে একতার গান আর মাঝির কণ্ঠে অনুরণিত হচ্ছে এক সুখী ভবিষ্যতের গল্প।

সমাপ্ত