স্নিগ্ধবিষ পর্ব ১২
সানজিদা আক্তার মুন্নী
সময়টা বিকেল তিনটে ছুঁইছুঁই। পশ্চিম আকাশে সূর্যের তেজ শেষবারের মতো জ্বলে উঠছে লালচে আলোয় রক্তমাখা আভা ছড়িয়ে আছে চারপাশে আর এই আলোয় ভেসে যাচ্ছে এক উন্মত্ত দৌড়ের দৃশ্য।
সামনে একজন লোক প্রাণ বাঁচাতে হাপাতে হাপাতে, পা টলমল করতে করতে দৌড়াচ্ছে। ওর পায়ের শব্দ মাটির বুকে মরিয়া আর্তনাদ তুলে নিচ্ছে। আর তারি পিছনে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে তৌসির। ওর পরনে সাদা পাঞ্জাবি,আর ক্রিম-সাদা রঙের চেকের লুঙ্গি। বাতাসে ওর সাদা পাঞ্জাবি পিছনে হাওয়ায় উড়ছে, কোমরে লুঙ্গিটা ভাঁজ করে শক্ত করে গোঁজা।
সেই গোঁজের ফাঁক দিয়েই আবার উঁকি মারছে তৌসিরের সবসময়কার প্রধান অস্ত্র, ধারালো সেই লোহার চাপাতি।চাপতি তো আছেই সাথে ওর ডান হাতে ধরা আরও ভয়ঙ্কর কিছু। সেটা হলো ‘লুসি’ একটি বেসবল ব্যাট, যার সামনের মোটা অংশটায় মরিচা ধরা কাঁটাতারের আঁটসাঁট বাঁধনে বাঁধা। তার ফাঁকে ফাঁকে খাড়া হয়ে আছে ধারালো পেরেক। হাতে থাকা এই ‘লুসি’-র গায়ে এখনো লেগে আছে শুকনো ছিলে যাওয়া মাংস আর রক্ত। হয়তো এর আগে এটি দিয়ে কাউকে বেদুম পেটানো হয়েছে।
তৌসিরের চোখ দুটো সামনেই স্থির, কোনো হুঁশ-জ্ঞান নেই ওর। দৌড়ের শব্দ, চিৎকার, বাতাস কিছুই আর ওর কানে পৌঁছাচ্ছে না। ওর দৃষ্টি কেবল সামনে ছুটতে থাকা মানুষটার ওপর, যাকে ধরতে পারলেই আজরাইলের সাথে সাক্ষাৎ করাবে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“তৌসির! থাম!”
পিছন থেকে নাযেম চাচা মিনহাজ মামা আর রুদ্র প্রাণপণ চিৎকার করছেন। ওরাও দৌড়াচ্ছেন, কিন্তু তৌসিরের উন্মত্ত গতির সঙ্গে তাদের পদক্ষেপ এখন শিশুদের ব্যর্থ দৌড়ানোর সমান। কোনো যুক্তি, কোনো সম্পর্ক, কোনো মানবিক ডাক কিছুই পৌঁছাচ্ছে না তৌসিরের কানে।
যে লোকটির পিছনে এমন দৌড় দৌড়াচ্ছে, তার নাম কাজিম। এই লোকটি একটা মস্ত বড়ো ভুল করেছে আর তা হলো ওদের থেকে একটা মেয়েকে একদিনের জন্য নিয়ে তাকে নিজের রাগ মিটাতে বাজেভাবে মেরেছে । আর তৌসিরদের কনট্যাক্টে নির্যাতন করার কোনো রুলস নেই।মেয়েরা নিজের ইচ্ছেয় আসে, নিজ ইচ্ছেয় ক্লায়েন্টের কাছে যায়। তৌসিরের সাফ কথা ভোগ করবি কর, কিন্তু টর্চার করলে খবর আছে।
এই কাজিম আসলে একটা সাইকো। যে মেয়েটাকে নিয়েছিল, ওকে ভীষণ বাজেভাবে জখম করেছে মেয়েটির কান ছিঁড়ে নিয়েছে, নাভী থেকে বুক অবধি ছিলে দিয়েছে, হাত-পা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। তৌসির এসেছিল নাজহার নামে একাউন্টের ব্যাপারে কথা বলতে। এসে এসব দেখে আর শুনে তৌসির মেয়েটাকে সিটি হাসপাতালে ভর্তি করে এসেছে। কাজিমকে খুঁজতে ওর বাড়ি কিন্তু ওকে পেয়ে যায় মাঝরাস্তায় ওকে পেয়ে গাড়ি ধার করিয়ে জিজ্ঞেস করতেই কাজিম পালাতে শুরু করে। আর এবার তৌসিরও ওর পিছে দৌড়াচ্ছে।কাজিম জানে তৌসির একবার ধরলে কিচ্ছা বাজেভাবে খতম করবে তাই পালাচ্ছে। ভেবেছিল পালালে তৌসির পরে পিছু করবে না। আর ও বেঁচে যাবে। কিন্তু ওর এই ভাবনা, ভাবনাই থেকে গেল।
তৌসির একাই এসেছিল, কিন্তু ওকে আসতে দেখে পিছু নিয়েছেন নাযেম চাচা আর মিনহাজ মামা রুদ্র কারণ তারা জানেন তৌসিরের ট্রমা আবার বেড়ে গেছে। নিশ্চয়ই বেড়ে গেছে, নয়তো এমন পাগলা কুকুরের মতো ছুটত না।
ওরা বর্তমানে শহর থেকে কিছুটা দূরে পাহাড়ের পিছনে একটা জায়গায় আছে। কাজিম প্রাণ বাঁচাতে একটা পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়ির গেটের ভেতর দিয়ে ঢুকে যায়। তৌসিরও ওর সাথে প্রবেশ করে। তৌসিরের হাতের নাগালের কাছে প্রায় কাজিম এসেই গেছে। কাজিম দৌড়ে একটা পড়ে থাকা গাছের খুঁটির সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। ব্যাস, আরকি তৌসির ওর নাগাল পেয়ে যায়। তৌসির দৌড়ে গিয়ে একটু ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে ওর গর্দান চেপে ধরে ওকে দাঁড় করাতে করাতে বজ্রকণ্ঠে বলে,
“এই সুদানির ফুয়া! তোর সাহস! এত সাহস কেমনে হয় আমার লোকরে মারছিস!”
এ বলে কাজিমকে টেনে তুলে নিজের দিকে ঘুরায়। কাজিম ভয়ে ডুকরে উঠে বলে,
“ভ…ভাই আমায় ছেড়ে দাও… আমি টাকা দিব।
টাকার কথা শুনে তৌসির কিছুটা শান্ত হয়ে বলে,
“কত দিবি?”
কাজিম হাপাতে হাপাতে বলে,
“যত চান!”
তৌসির এটা শুনে ফুঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে আর বলে,
“ক্রেডিট কার্ডের নাম্বার দে।”
এটা শুনে কাজিম তাড়াতাড়ি দিয়ে দেয় প্রাণ বাঁচাতে। তৌসির নাম্বারটা শুনে মুখস্থ করে নেয়। অতঃপর তৌসির কাজিমের চোখে চোখ রেখে বলে,”তুই ওরে মারলি ক্যান? ও তোর কথা শুনে নাই?”
কাজিম ঢোক গিলে বলে,”শুনেছে… আমি নিজের রাগ মেটাতে ভুল করে ফেলেছি….ভুল করেছি।
নিজের রাগ মেটাতে ভুল করেছি এটা শুনে তৌসিরের মগজ গলতে থাকে। রাগে, ক্রোধে চোখের সামনে কিছু একটা ভেসে ওঠে সেখানে একটা যুবতী মেয়েকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, আর পাশ থেকে সেইম কথাটা কেউ বলছে”আমি রাগ মেটাতে এমনি করেছি।”
তৌসিরের চোখের সামনে এটা ভাসতেই পাগল হয়ে যায় ও। তৌসির বাঁ হাতে শক্ত করে কাজিমের ঘাড়ের কলার চেপে ধরে, আর ডান হাতে কাঁটাতারের ব্যাট দিয়ে কাজিমের পিঠ বরাবর একটা বারি মারে। বারি মারতে না মারতেই কাজিম কলিজা-ছিঁড়ে যাওয়া চিৎকার করে ওঠে। কাঁটাতার আর লোহার পেরেকগুলো কাজিমের শার্ট ভেদ করে পিঠের মাংসে টুশ টুশ করে বিঁধে যায়। ঝরঝর করে রক্ত পড়তে থাকে।
তৌসির ওর চিৎকার শুনে হাসতে হাসতে ব্যাটটা একটানে বের করে নেয়। সাথে সাথে কাজিম আবারও চিৎকার করে ওঠে। ব্যাটের সাথে ওর পিঠের কিছু মাংস ছিলে খুলে পড়ে মাটিতে, আর কিছুটা ব্যাটে এঁটে থাকে। কাজিমের জিভ বেরিয়ে আসে।
তৌসির দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“খা***নিকির পোলা! এত সাহস! তোর এত রাগ? আইজ তোর বগার রাগ বাইর করমু!”
এ বলেই ব্যাটটা ফেলে দিয়ে কাজিমকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। নিজে ওর কাটা-ছেঁড়া, ছিলে যাওয়া পিঠের উপর ওঠে বসে, বাঁ হাত দিয়ে ওর ঘাড় চেপে ধরে। এতে কাজিমের নাক-মুখ মাটির সাথে লেগে যায়। মাটিতে থাকা কংক্রিটের ছোট ছোট কাটা কাজিমের গাল দিয়ে ঢুকতে থাকে। কাজিম ফোঁফাতে থাকে শুধু।
তৌসির এবার নিজের কোমরে গোঁজা চাপাতিখানা ডান হাতে শক্ত করে ধরে নিয়ে ধীরে ধীরে কাজিমের ডান হাতের উপর রাখে আর বলে,”এই হাত দিয়া মারছিলি না?”
কাজিম চিৎকার করে ওঠে কি হবে বুঝতে পেরে। কিন্তু ওর চিৎকারে কিছুই বদল হয় না। তৌসির কিড়মিড় করে চাপাতি দিয়ে কাজিমের আঙুলগুলো কাটতে থাকে। মানুষ যেমন সবজি কুচি করে, তেমনভাবে কুচি করতে থাকে। রক্ত ছিটকে এসে তৌসিরের হাতে-পায়ে লাগে, কিন্তু তাতেও তৌসির থামে না। কাজিমের হাতটা এমন করে কনুই অবধি কেটে নেয় তৌসির। কাজিম চিৎকার করতে করতে মারা যায় বলতে গেলে শুধু শ্বাস টা আসে আর যায়।
তৌসির এবার চাপাতিটা ফেলে দিয়ে পাশ থেকে ব্যাটটা নিয়ে দুই হাতে শক্ত করে ধরে কাজিমের মাথায় মারতে থাকে। একেকটা বারির সাথে কাজিমের মাথার খুলি, চামড়া টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে যেতে থাকে। গলগলিয়ে রক্ত আর মগজ বেরিয়ে আসে। মগজ বেরিয়ে আসতে দেখে তৌসির মগজ ভেতরে রাখতে পাশেই পড়া ছিল পোকার এক গুচ্ছ বড় বাসা। সেগুলো হাতে নিয়ে ওর মাথায় ঠেসে দেয় সাথে সাথে পোকারা কাজিমের মগজে হামলে পড়ে। কাজিম তো মারা যায় এর আগেই।
তৌসির ওকে শেষ হয়ে যেতে দেখে শুধু হাসে, শুধু হাসে। ওর চোখের সামনে আবারও ভেসে ওঠে একজন যুবতীর আর্তনাদ, যাকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় পুড়ানো হচ্ছে। তৌসির মুখ তুলে আসমানের দিকে তাকায় আর চিৎকার করে ওঠে,”பணத்துக்காக அவனை/அவளை எரிய விடாதீர்கள், காப்பாற்றாதீர்கள்! காப்பாற்றுங்கள்!”
এ বলেই তৌসির মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে রুদ্ররা সবাই দেখছিল এটা, কিন্তু তারা আটকায়নি। এটা তৌসিরের একটা ট্রমা যখন ও নিজের ট্রমার ভেতর দিয়ে যায়, তখন কি করা উচিত আর কি না সেটা আর বুঝতে পারে না। উল্টোপাল্টা কীসব ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। বাঁধা দিতে আসলে উল্টো মার খেতে হয়।
নাজহা শুয়ে আছে নিজেদের রুমের বিছানায়। আজ স্পিকিং টেস্ট দিয়ে এসেছে, মুটামুটি ভালোই হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। এইট অথবা নাইন তো আসবেই ইনশাআল্লাহ, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছে। তৌসির নিয়ে গিয়েছিল, ওকে দুটোর দিকে, বাড়ি ফিরেছে। বাড়ি ফিরে তৌসির গোসল করে বেরিয়ে গেছে আর নাজহা গোসল করে নামাজ পড়ে খাবার খেয়ে শুয়ে আছে। শরীরটা অচেতন অচেতন লাগছে, কিছুই আর ভালো লাগছে না। মন চায় সংসার ছেড়ে দূরে কোথাও লুকিয়ে যেতে, আর মস্তিষ্ক বলে, “মানিয়ে নেও না, এই লোকটি এমনি।”
তৌসিরকে সহ্য করা কঠিন থেকে কঠিন হয়ে যাচ্ছে নাজহার পক্ষে। এক তো কথায় কথায় উঠতে বসতে মুখ দিয়ে ঝড়ে গালির ফুলঝুরি, আর সাথে হাড় কিপ্টামি। এই তো আজ আসার সময় এক বোতল ঠান্ডা পানি কিনতে বলেছিল, এক বোতল পানি বিশ টাকা নিবে বলে পাঁচ টাকার আইসললি ওকে কিনে দিয়েছে। সাথে গাড়ির স্টেশন থেকে বাড়ি অবধি যাওয়ার সময় আসার সময় হাঁটিয়েছে নাজহাকে। এই বিষয়গুলো নিয়ে বহু তিক্তায় ভুগছে নাজহা। এই দশ পনেরো দিনের সংসারিই এত বিরক্তি, তাহলে গোটা জীবন কিভাবে পার করবে? কিভাবে সম্ভব পার করা? এই লোক এত বেশি যে মাঝেমধ্যে নাজহার নিজেকেই খুন করে নিতে ইচ্ছে করে। বিরক্তি আর বিরক্তি। এই বিরক্তির মধ্যে ওর আব্বা ওকে ফোন দেন। উনি প্রতিদিন দু’একবার কল দেন, কিন্তু নাজহা কথা বলে না। কল ধরে, “আসসালামু আলাইকুম, ভালো আছি,” ব্যাস, এতটুকুই কথা হয় ওদের মধ্যে। বাবার ওপর ভীষণ অভিমান, রাগ জমা যে। আজ উনার সিদ্ধান্তেই ও ধ্বংস বলতে গেলে।
নাজহা ফোন ধরে সালাম দেয়:
“আসসালামু আলাইকুম।”
ছিদ্দিক সাহেব মেয়ের গলা শুনে খুশি হয়ে বলেন, “ওয়ালাইকুম সালাম, কেমন আছো, আম্মা?”
নাজহা নিরস গলায় উত্তর দেয়, “ভালো।”
ছিদ্দিক সাহেব বুঝেন, উনার মেয়ে যে উনার উপর রাগ করেছে, কিন্তু কি আর করা, আবেগ দিয়ে তো সব হয় না। উনি জিজ্ঞেস করেন, “আজ পরীক্ষা দিতে গেছিলা?”
“হ্যাঁ।”
“ভালো হয়েছে তো পরীক্ষা?”
“হয়েছে!”
ছিদ্দিক সাহেব এবার বলেন, “আব্বারে জিগাইবা না, আব্বা কেমন আছি?”
কথাটা শুনে নাজহার কলিজা ছিঁড়ে যেতে থাকে। ওর জীবনের প্রথম ভালোবাসার পুরুষ, ওর বাবা, যার প্রতি ভালোবাসা কোনোদিনই কমবে না। নিজের বাবার মুখে এমন অসহায়ের মতো কথা শুনে বক্ষ কষ্টে স্তব্ধ হয়ে গেছে। চোখ বেয়ে পানি পড়ে। নাজহা ফোনটা কিছুটা দূরে নিয়ে নাক-মুখ মুছে ঢুক গিলে নেয় একটু স্বাভাবিক হয় অতঃপর ফোনটা কানে লাগিয়ে শক্ত হওয়ার বান করে বলে, “আপনি তো ভালোই থাকবেন, আমার মতো এত বড় বুঝা যে মাথা থেকে সরলো।”
মেয়ের বলা এমন কথায় অন্তরে ক্ষতের দাগ আঁটে ছিদ্দিকের। উনি বুঝে যান ও কাঁদছে। নরম গলায় বলেন, “আম্মা, কাদঁতাছো তুমি? কাইন্দ না, তোমার বাপ তোমার বালার লাইগাই যা করার করছি, আর তুমি আমার মাথার বোঝা ছিলা না, আমার মাথার মুকুট ছিলা যে মুকুট আমি হারাইয়া ফেলছি।”
বাবার কথায় নাজহা ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে, ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরে বলে, “আমার ভালো চাইতে গিয়া আপনি আমারেই ক্ষয় কইরা দিলেন, আব্বা।”
নাজহা যে কাঁদছে, এবার স্পষ্ট বুঝতে পারেন উনি। ছিদ্দিক সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলেন, “বাপরা কখনোই তার সন্তানকে বেনালে দেয় না গো আম্মা। তুমি ভুল বুইঝো না তোমার এই বাপরে। তোমার বাপ সারাটা জীবন তুমি ভালো থাকো এই আশায় মরছে, কিন্তু শেষমেষ পরিস্থিতির কোলে পড়ে সব আশা হারাইছে। তারপরও কই যার হাতে তুলে দিছি তারে সম্মান কইরো। হে, ভালো রাখবো তোমারে।”
নাজহার চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়াতে থাকে। ফুপাতে ফুপাতে ওড়না মুখে আরো শক্ত করে গুজে ধরে বলে, “আমি ভালো আছি আব্বা, আমি ভালো আছি।”
এ বলে ফোন কেটে দেয়। বাবার অসহায় গলার সুর ওকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে শেষ করে দিচ্ছে। পৃথিবীতে নিজের বাপ চাচার কষ্টেই একমাত্র নাজহার কলিজা ছিঁড়ে ফাটে। ওর বাবার জায়গায় অন্য কেউ হলে এমন কান্না তো দূরের কথা, দীর্ঘ শ্বাসও বের হতো না ভেতর থেকে। কিন্তু এই লোকটা যে সবার সমান নয়, তিনি যে সবার থেকে আলাদা, সবার চেয়ে আপন। উনার এক চুল কষ্টে ভেতর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় নিজের । বাবা তো আর মেয়েরা আবার একটু বেশিই বাবা কে ভালোবাসে। তার ওপর ওর মা-বাবা দুজনি উনি। এর জন্য কষ্ট আর ক্ষতটাও দ্বিগুণ প্রগাঢ়।
তৌসির, রুদ্র আর কেরামত সবাই মিলে ছাদে টিভি দেখছে। দুপুরে ঘটে যাওয়া ঘটনার কারণে তৌসিরের মেজাজ এখনো তিক্ত। যদিও জ্ঞান ফেরার পর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে, তবুও ওর হাত অস্থির হয়ে আছে ভীষণভাবে চুলকাচ্ছে, মন চাচ্ছে আরেকটা লাশ ফেলতে।
কিন্তু নাহ, অকারণ খুন করে হাতে দাগ লাগানো তৌসিরের নিয়মে নেই। ও বরং মিটমাটের মধ্যেই সমস্যার সমাধান করতে পছন্দ করে। তুচ্ছ কারণে খুন করা, তারপর লাশ লুকানো, রক্তে ভেজা কাপড় ধোয়া এসব ওর কাছে ঝামেলা ছাড়া আর কিছু নয়। বেশি রক্তের দাগ লাগলে সেই কাপড়ও আর পড়া যায় না। তার ওপর লাশ গুম করতেও টাকা খরচ হয়। তাই তৌসিরের মতে, মুখে কথা বলে মিটমাট করাই শ্রেয় টাকাও বাঁচে, ঝামেলাও কমে।
ছাদে টিভি বসানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, সবাই মিলে মুভি দেখছে। স্ক্রিনে চলছে তৌসিরের সবচেয়ে প্রিয় সিনেমা Cannibal Holocaust। এই সিনেমাটা প্রায়ই দেখে ও। মাঝে মাঝে The Passion of the Christ কিংবা এরকমই তীব্র কাহিনীর মুভি দেখা পড়ে। তবে বেশির ভাগ সময়েই ওর মন টানে Cannibal Holocaust-এর মতোগুলোই তেই অন্য কিছুতে মন টিকে না।
রাতের খাবার খেয়ে এসে বসেছে স্ক্রিনের সামনে মুভিটা দেখবে বলে। কিন্তু হঠাৎই কাজের লোক একজন ছুটে এসে জানাল, বিবিজান ডেকেছেন।তাড়াতাড়ি যেনো ও নিজের রুমে যায়। খবর পেয়ে তৌসির বিরক্ত স্বরে বলে
“এই বুড়ির যন্ত্রণায় চইল্লা যামু কবে বাড়ি ছাইরা সাউয়া।
এমন বাণী বুক থেকে ঝেড়ে চুপচাপ ছাদ থেকে নামে।
নাজেম চাচা ওর যাওয়ার ভঙ্গি দেখে মুচকি হেসে বললেন,
“যাও ভাতিজা, আইজ তোমার লাইগা মারাত্মক আয়োজন করছি।”
বিকেল থেকে তৌসির রুমে ঢোকেনি। রুমের দরজা পেরিয়ে পা রাখতেই তো তব্দা খেয়ে যায়। চারদিকে ফুলের মিঠা গন্ধে ঘর ভরে আছে। বিছানায় ফুল দিয়ে এমনভাবে সাজানো, ঘরটা এমনভাবে সাজানো যেমনটা বিয়ের প্রথম রাতে ছিল। কিন্তু আজ হঠাৎ এমন আয়োজন কেন?
কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে বিবিজানের দিকে তাকিয়ে বলে “বি বি….
ব্যাস আর কিছু গলা থেকে বের করার আগেই কথা হারিয়ে যায়। বিবিজানের পিছনে একজনের উপর তৌসিরের নজর আঁটকে যায়। পা থেকে মাথা অবধি তাকে পরখ করতেই গা ঝিম ধরে যায়। মনে হয় কেউ চারশো ভোল্টের শক দিল, আর নাহয় বজ্রপাত তৌসিরের উপর এই মুহূর্তে হলো। নাজহা দাঁড়িয়ে আছে সামনে কিন্তু আজ ও প্রতিদিনের মতো সুরূপা রূপে নয়, বরং অদ্বিতীয়া রূপলাবণ্যের রূপ ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে।নাজহার গায়ে জড়ানো হালকা ক্রিম আভাময় শাড়ি, যার জমিনে সূক্ষ্ম সোনালি সুতোর আঁকিবুঁকি দেখেই বোঝা যাচ্ছে নিপুণ কারিগরের হাতে বোনা। শাড়ির পাড়জুড়ে গাঢ় সবুজে রঙ তার উপর সোনালি সুতোয় কারুকার্য করা। আঁচলের অংশটিও পাড়ের রঙের সাথে মিলিয়ে গাঢ় সবুজ। শাড়ির কাপড়টি খাদি কাপড়ের তৌসির দূর থেকেই বুঝতে পারছে এটা। ব্লাউজটি গাঢ় সবুজ রঙের, যা শাড়ির পাড়ের রঙের সাথে হুবহু মিলে গেছে। এরই মধ্যে নাজহার ধবধবে শুভ্র গলায় একখানা ভারী চোকার পড়া। চোকারটা দেখে মনে হচ্ছে চাঁদের কিরণকে আঁকড়ে রাখা কোনো এক অলঙ্কার। নাজহার দুধসাদা লাবণ্যময় দেহাবয়ব এই সবুজ পাড়ের অশ্বেত-অশ্বেত মিশ্র আভা রঙের শাড়িটিতে নাজহাকে শরতের স্নিগ্ধা মনোহারিণী তিলোত্তমার ন্যায় লাগছে। তৌসির হা করে স্থবির চোখে নাজহার ন্যায় তাকিয়েই থাকে। ঘরের লাইট আর বাইরে থেকে আসা চাঁদের আলোয় লাবণ্যময়ী নাজহাকে দেখে এই জীবনে পৃথিবীর অন্য কোনো নারীর রূপ ওর দৃষ্টিগোচর হওয়ার যোগ্য নয়। নাজহা আজ শুধুমাত্র অপরূপা রূপে নয় বরং অদ্বিতীয়া রূপে। এই রূপে কোনো খুঁত নেই, কোনো তুলনা নেই যা আছে তা একান্তই চারণ্যরূপ।
নাজহার কোঁকড়ানো বাদামি কেশ তরঙ্গগুলো খোলা। খোলা চুলগুলো কাঁধে গলায় দু-একছা এসে উড়ে পড়ছে। চারপাশে দুলছে। এরই মধ্যে কালো ঘন পাপড়িতে আবদ্ধ কালচে সবুজ নয়না। হয়তো কাজল দিলে আরো বেশি সুন্দর লাগতো কিন্তু যে প্রকৃত সুন্দর থাকে আর কী কৃত্রিমতা দেওয়া যায়? তাই কাজল না দিলেও মারাত্মক লাগছে চোখজোড়া। ঠোঁটে কিছু দেওয়া নেই কারণ ওর পুষ্পাধরে কোনো কিছু দেওয়ার প্রয়োজন নেই ওর পদ্মধর অধরদ্বয় এমনিতেই পদ্মফুলের পাপড়ির মতো। তৌসির লক্ষ্য করে ওর লাবণ্যময় হাতের ত্বকে চকচক করছে দু-জোড়া সোনার চিকন চুড়ি। কানে হালকা পাতলা দুটি ঝুমকা। নাকে ছোট্ট পাথরের নাকফুল। নাজহার শাড়ি আর গহনার এই সাজে যে কমলীয়তা ফুটে উঠেছে, তা দেখে তৌসিরের অন্তর মুগ্ধতায় নির্বাক। ওর মুখ থেকে সব শব্দ উধাও হয়ে গেছে। আজ ওর মনে হচ্ছে, পৃথিবীর কোনো তুলনা, কোনো বিশেষণই নাজহার এই রূপের যোগ্যতা রাখে না। এই সৌন্দর্য তুলনাহীন।
তৌসির শুধু স্তব্ধ চোখে নাজহাকে দেখতে থাকে আর মনে মনে স্বীকার করে নাজহা আজ নিরুপমা, যার রূপের কোনো মাপকাঠি নেই। যে সৌন্দর্য দেখলে শব্দরা সব চুপ করে যায়, সেটাই তো নিরুপমা। আর সবচেয়ে মিঠে অনুভূতি হলো এই অনন্য রূপসী তৌসিরের নিজের একান্ত। তৌসির যতটুকু না নাজহার রূপে বিমোহিত হয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ তীব্র মোহে আবিষ্ট হয়েছে ওর চিত্ত নাজহার সবুজ কালচে চোখে। এই নয়নদ্বয় মনে হয় বর্ষায় ভেজা শ্যামল বনভূমির সমস্ত রহস্য আর রাতের আকাশের স্তব্ধতা একসাথে এসে ভিড় করেছে। তৌসিরের দৃষ্টি যখন এই চোখে নিবদ্ধ হয়, তখন তৌসিরের মনে হয় ও মনে হয় এক অতলান্ত হ্রদের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে, যার অন্তহীনে রয়েছে শুধুই মোহছন্নতা।
তৌসিরকে এমন তব্দা খেতে দেখে বিবিজান এগিয়ে এসে ওর গাল টেনে বলেন, “শুধু চোখ দিয়া না গিল্লা অন্যকিছু করো মিয়া হালা।”
তৌসির উনার কথায় ভরকে আবুল বনে গিয়ে মেকি হেসে বলে, “কি যে কন বিবিজান।”
বিবিজান ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে নাজহার দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে ওকে কিছু একটা আদেশ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। তৌসির উনার যাওয়ার পানে তাকিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ছাগল বনে গিয়ে ঠোঁটের কোণে লাজের হাসি টেনে ধরে। তারপর পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে তাকতে বলে ওঠে, “আজকে তোমার যে সুন্দর লাগের গো তালুক…..।”
ব্যাস আর কিছু বলবে তার আগেই নরম হাতের গরম থাপ্পড় পড়ে যায় ওর বা গালে। নাজহা রোষে জ্বলে ওঠে তৌসিরকে টাশ করে থাপ্পড়টা মারে। তৌসির তো বুঝে ওঠতে পারে না কি হচ্ছে আসলে। নাজহার দিকে একবার তাকায় এই একটু আগের সুরুপা অদ্বিতীয়া রূপ নিয়েছে এখন অগ্নিকন্যার। নাজহার মুখাবয়বে রোষশিখা দাউদাউ করছে। তৌসিরের ভুরু আপনাআপনি কুচকে আসে এত রেগে আছে কেন ও? চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। নাজহা হাত বাড়িয়ে তৌসিরের পাঞ্জাবির কলার খাবলে ধরে চিৎকার করে বললো, “আপনি একটা শয়তান আপনি খুব খারাপ আপনি একটা কুত্তা। আমার বাপ চাচা সবগুলো ডাকাত নয়তো আপনার মতো খবিসের সাথে আমায় বিয়ে দিত না। আপনি খুব খারাপ।”
তৌসির নাজহার এমন ক্রোধ দেখে ঠিক হিসেব মেলাতে পারছে হয়েছেটা কি। নাজহার চোখ জ্বলছে রাগের আগুনে মুখাবয়ব লাল হয়ে গেছে আক্রোশের উত্তাপে। তৌসির কিছুই বলে না এত রাগ ঝাড়ছে নাজহা এতে কিছুই যায় আসে না ওর। নাজহা ওর কলার এত জোরে টেনে ধরেছে তারপরও তৌসির কোনো বাক্য ব্যয় করছে না, ও শুধু এক দৃষ্টিতে লাবণ্যময়ী নাজহার দিকে তাকিয়ে আছে আবিষ্ট হয়ে। ঘায়েল ঘায়েল লাগছে নিজেকে। নেশাক্ত নয়নে তৌসির নাজহার আঁখি পানে তাকিয়ে থাকে। তৌসিরের এই চাহনি দেখে নাজহাও ক্ষিপ্ত চোখে তৌসিরের চোখে চোখ রাখে। একজন অপরজনের আঁখিতেই আবদ্ধ রয় সামান্য সময়। তৌসিরের শরীরে লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তিরতির করে কাঁপতে শুরু করছে হাত পা। তৌসিরের অন্তর যখন গলে পড়ছে নাজহার আঁখির সৌন্দর্য তখনি এমন মুহূর্তে হঠাৎই নিচ যে স্পিকার বাজাচ্ছে বাড়ির ছেলেরা যেখান বেজে ওঠে,
নিশা লাগিলো রে
বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলো রে…!!
নিশা লাগিলো রে।
বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলো রে..!!
হাসন রাজা পিয়ারির প্রেমে মজিলো রে
হাসন রাজা পিয়ারির প্রেমে মজিলো রে..!!
নিশা লাগিলো রে।
বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলো রে..!!
নিশা লাগিলো রে
বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলো রে..!!
তৌসির গানটা কান দিয়ে ঠিকই শুনছে কিন্তু ওর চোখ নাজহার মধ্যেই আবদ্ধ। তৌসির এবার নাজহার দিকে হাত বাড়ায়, ওর কাঁধে রাখে কিছু বলতে চায় কিন্তু বলতে পারে না তার আগে নাজহা ঝাঁকিয়ে ওঠে আবার চিৎকার করে ওঠে, “ছুবেন না আমায়।”
“ক কি হইছে?”
নাজহা চিৎকার করে ওঠে, “এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? চোখ দিয়ে গিলে হয়নি অন্যকিছু করতে চান? নির্লজ্জ পুরুষ কোথাকার। এই দেখুন আমায় সঙ সাজিয়েছেন, আরো সাজব সঙ? করতে চান আরো ঢং?”
তৌসির তো বুঝে ওঠতে পারে না কি হলো হঠাৎ এই মেয়ের? এমন করছে কেনো? তৌসিরের কলার টেনে নাজহা তৌসিরকে নিজের মুখোমুখি করে তৌসিরের চোখে রোষাগ্নি চোখে চোখ রেখে ওকে জিজ্ঞেস করে, “আমি আপনায় নিজেকে ছুঁতে দেইনি? আপনাকে অধিকার দেইনি? আপনি আমায় জড়িয়ে ধরে আমার চুলে মুখ ডুবিয়ে ষাড়ের মতো নাক ডাকিয়ে ঘুমাননি?”
তৌসির নাজহার কথায় হতবাক কি বলে এই মেয়ে। নাজহার রাগ দেখে তৌসির আর কিছু বলে না চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে বলে, “ঘুমিয়েছি, অধিকার দিয়েছো।”
নাজহা কথাটা শুনে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বলে, “তাহলে কেন আপনি আপনার বিবিজানকে আমাদের মধ্যে কিছু হয়নি এ কথা বললেন? বলুন এমন লজ্জাহীণ কান্ড কি করে করলে? এত গরু কেন আপনি?”
তৌসির প্রথমে নাজহারের কথা শুনে ভুরু কুঁচকায় তবে পর মুহূর্তেই হিসেবে মিলিয়ে নেয় ওর মস্তিষ্ক। নাযেম চাচাকে গতদিন কথায় কথায় বলেছিল আর নাযেম চাচা হয়তো বিবিজানকে বলেছেন আর তাই এত সাজ এত আয়োজন। তৌসির ওকে শান্ত করার জন্য বলে ওঠে, “আ আমি নাযেম চাচাকে বলেছিলাম কথায় কথায় কি কিন্তু ঐ মাদারচুত বাইনচু**দে ওর মারে কইয়া দিছে।”
নাজহা গালি শুনে আরো বেশি রেগে যায়। আক্রোশে ক্রোধে ওর শিরা-উপশিরা স্পন্দিত হতে লাগে। নাজহা দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “এত নির্লজ্জ আপনি এসব চাচাকে বলেন কিভাবে?”
“বিশ্বাস কর কৈতরি আমি এইসব আমি ইচ্ছা কইরা কইনি কথায় কথায় বইল্লা ফেলেছি।”
তৌসিরের কথা শুনে চিত্ত ফেটে পড়ে রাগে নাজহার। নাজহা নিজের পায়ের গোড়ালি উঁচু করে উঁকি দিয়ে তৌসিরের সমান হয়ে দাঁড়িয়ে ওর চোখে চোখ রাখে। নাজহার চাহনিতে ডুকরে উঠে তৌসির। নাজহার নয়নজোড়া আগুনে জ্বলছে। নাজহা কটমট করে বলে, “আপনার এই কথার জন্য আপনার বিবিজান আমায় বলে আমায় বলে…
এ বলেই নাজহা চোখের পানি ছেড়ে দেয় তবে এই কান্না দুঃখের নয়, তা জেদের রুদ্ররূপ। নাজহা জেদে কাঁদছে। নাজহা কিছু না বলে শুধু ঠোঁট কামড়ে জেদে কাঁদে। তৌসির এ বিষয়ে বড্ড বিরক্ত হয়। এভাবে কান্নাটা ভালো টিকে না, বাইরে থেকে কেউ শুনলে খারাপ ঘটনা ধরে নেবে আর সারাজীবনের দাগ থেকে যাবে। তৌসির এবার ধমকে বলে, “এ বাইন***চদের নাতিন সাউয়ার কান্দন বন্ধ কইরা ক, কি হইছে।”
নাজহা ওর ধমকে এবার গলার শক্ত আওয়াজে বলে, “আ আপনার বিবিজান বলেছেন আমার বাড়িতে অনেক যোয়ান ভাই আছে, তাদের কারো কাছ থেকে হয়তো আমি নিজের কুমারিত্ব হারিয়েছি এর জন্য আমি আপনার কাছে যাই না ধরা খেয়ে যাব বলে।”
এ বলে নাজহা আরো শক্ত করে নিজের দুই হাতের মুঠোয় তৌসিরের কলার চেপে ধরে। অপমানের প্রতিটি তীক্ষ্ণ শব্দ নাজহার কানে তীরের মতো এখনো বিঁধছে। এগুলো মনে হতেই ওর চোয়াল দুটো কঠিন পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। জিদের রুদ্ররসে ওর চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। ক্রোধে দাঁতে দাঁত চেপে ও এমনভাবে কাঁদছে, মনে হচ্ছে ওর শরীরের ভেতরের প্রতিটি পেশী চিৎকার করছে জেদে। রগ ছিঁড়ে যাচ্ছে রাগে। তৌসির এটা শুনে তটস্থ হয়ে নাজহার মুখপানে তাকিয়ে রয়। ওর বিবিজান ওর সংসারে এমন আগুন লাগাবেন তৌসির কখনো কল্পনাও করেনি। বিবিজান নিজের জায়গা থেকে তো বলে দিয়েছেন কিন্তু এই নাজহা যে এমন ভয়ংকর রূপ নিলো একে কিভাবে সামলাবে? তৌসির সব সামলাতে পারলেও এই ঘাড়ত্যাড়াকে সামলাতে পারবে না। তৌসির হাত বাড়িয়ে নাজহার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলে, “দে দেখো এভাবে কেঁদো না আমি বিবিজানকে জিজ্ঞেস করব ক্যান উনি এমন কইলেন।”
তৌসিরের এমন ভেজা বেড়ালের রূপ দেখে নাজহা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, “আপনার মনে হয় আমি অপবিত্র?”
তৌসির জিহ্বায় কামড়ে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়, “না না আমি এসব স্বপ্নেও ভাবি না।”
“তাহলে উনি কেন আমাকে এটা বললেন?”
“উনি বৃদ্ধ মানুষ, বুঝেননি।”
নাজহা এটা শুনে ঝাঁঝ ধরানো গলায় বলে,”উনি বুঝেননি! চুল কি উনার এমনি এমনি পেঁকে গেছে? উনি ইচ্ছে করে আমায় এসব বলেন, ইচ্ছে করে আমায় বলেন।”
তৌসির পড়ে যায় মহা বিপদে। এদিকে-ওদিকে এক পলক তাকায় আর মনে মনে বলে, “বুড়ো নাগিনের কি প্রয়োজন ছিল আমার নাগিনকে উসকে দেওয়ার? এখন না আমার নাগিন আমায় গিলে নেয়!”
তৌসির নাজহার কপালে চোখের পাশে পড়ে থাকা চুলগুলো ওর কানের পাশে গুঁজতে গুঁজতে নরম সুরে বলে, “আ আমি জিজ্ঞেস করব ক্যান উনি কোন সাহসে তোমায় এসব কন।”
নাজহা ঢুক গিলে বিষাক্ত গলায় বলে, “উনি নিজে মাগিবাজ হয়ে আমায় মাগি বানিয়ে দেন। উনার মতো ব্যবসা নাকি আমি? যে উনি আমায় এসব বলেন!”
তৌসির এমন বিষাক্ত কথা শুনে হালকা ধমকে ওঠে, “এ সিনাল মুখ সামলা, মুখ সামলা।”
নাজহা তৌসিরের কলার আরো শক্ত করে টেনে ওকে ঝাঁকিয়ে তুলে বলে, “কি সামলাব? সামলাব না মুখ! উনি কেন বলবেন আমায়? এসব কেন বলবেন? আমায় বিয়ে কে করছে? কে বিয়ে করেছে বলুন?”
তৌসির উত্তর দেয়, “আমি।”
নাজহা রক্তাভ দৃষ্টিতে অগ্নি শিখার ঝলক ছুঁড়ে দিয়ে বলে, “তাহলে কেন উনি আমায় এমন কথা বলবেন? আমায় বিয়ে আপনি করছেন, তাহলে উনি কেন বলবেন? বলুন কেন বলবেন? উনি কি বিয়ে করেছেন নাকি?”
“আমি জিজ্ঞেস করমু তো বললাম ক্যান এমন কইলেন।”
নাজহা জোরে জোরে শ্বাস ছেড়ে বলে, “কি বলবেন? কিভাবে জিজ্ঞেস করবেন, বলুন!”
তৌসির তো এবার আঁটকে যায় বিপদে। আমতা আমতা করে বলে, “বলব, ক্যান তুমি আমার বউ রে এসব বললা, আর এসব জীবনেও কইও না।”
নাজহা দাঁত চেপে বলে, “কেন এত শান্তভাবে কেন বলবেন? এমনতিই তো গালির ফুলঝুরি ছুটান মুখ দিয়ে, তাহলে আমার বেলায় এত নরম হয়ে জিজ্ঞেস করবেন কেন?”
“তাইলে কিভাবে জিগামু?”
তৌসিরের কথায় নাজহা তৌসিরকে টেনে নিজের আরেকটুখানি কাছে টেনে আনে। তৌসিরের শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায় এতে। এই মেয়ে ওকে হার্ট অ্যাটাক করাবে নিশ্চিত। নাজহা তৌসিরকে শিখিয়ে দেয়, “গিয়ে বলবেন, আমার বউ তোমার মতো না। আমার বউ ব্যবসা না, যে অপবিত্র হবে। আমার বউকে দ্বিতীয়বার এসব বললে বড্ড খারাপ হবে, বড্ড।”
এ বলে তৌসির কে আবার শোধায়, “এভাবে বলবেন।
“আইচ্ছা, বলব।”
“এই যে এত কিছু হলো, সব দোষ আপনার, সব দোষ আপনার।”
তৌসির মাথা নাড়িয়ে বলে, “জ্বি ম্যাডাম, সব দোষ আমার।”
নাজহা আবারো তৌসিরের চোখে চোখ রেখে বলে, “সব দোষ আপনার, সব দোষ আপনার।”
তৌসির এবারও মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে নরম গলায় বলে, “জ্বি, আমি মানি, সব দোষ আমার।”
এ বলে মিনমিনিয়ে বলে, “পৃথিবীর যত দোষ আছে, সব দোষের দশা আমার পাছায়ই-ই আঁটা।”
নাজহা এটা শুনে না ভালো মতো। ও ক্রোধে ঘেরা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে তৌসিরকে দূরে ঠেলে দিয়ে কিছু সময় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তৌসির ছাড়া পেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, অতঃপর পাঞ্জাবির কলারে হাত বুলিয়ে দেখতে থাকে কলারটা ছিঁড়লো-টিঁড়লো নাকি। এই পাঞ্জাবিটাকে সেদিন ছিঁড়ে দাগ লাগিয়েছিল, আবার সেলাই করেও দিয়েছে কিন্তি দাগ যায়নি। ওমন দাগযুক্ত পাঞ্জাবিই পড়ছে তৌসির। একটু দাগের জন্য বারোশো টাকার পাঞ্জাবি তো আর ফেলা যায় না। আজ ভাগ্য একটু সাধ দিয়েছে তৌসিরের। নয়তো আজ ছিঁড়েই নিত নাজহা, আর এখন ছিঁড়লে সেলাই করা মুশকিল হয়ে পড়তো। এবার নাজহা তৌসিরকে উদ্দেশ্য করে আদেশ করে বলে,
“এক হাঁটু গেড়ে বসুন।”
তৌসির এটা শুনে চমকে ওর দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলে, “ক্যান?”
“আমি বসতে বলেছি, বসুন।”
তৌসির দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ডান হাঁটু গেড়ে নাজহার সামনে বসে পড়ে। না জানি কি করতে চায় এই ঘাড়ত্যাড়া। এখন না বসলে আরো বেশি চিৎকার করবে। তৌসির বসতেই নাজহা নিজের টাখনুর উপর হতে শাড়ি কিছুটা উপরের দিকে সরিয়ে নেয়, তারপর পা বাড়িয়ে তৌসিরের বা হাঁটুর উপর নিজের ডান পা তুলে রাখে। নাজহার পায়ের তলার স্পর্শে কেঁপে ওঠে তৌসির খানিকটা।
নাজহা নিজের পা ওর হাঁটুর উপর রাখতেই তৌসিরের চোখে স্পষ্ট হয় এক অনিন্দ্য সৌন্দর্য। নাজহার শুভ্রগৌর পদপল্লবে এক রণিত নূপুর ঝনঝন করছে। এই দৃশ্য দেখে তৌসিরের চোখ কিছু মুহূর্তে নাজহার শুভ্র পদপল্লব আর নূপুরের সুরে আটকে থাকে। নাজহা নূপুরের টুংটাং শব্দ তৌসিরের অন্তরকে মোহময় করে তুলছে। তৌসির হাত বাড়িয়ে কাঁপা হাতে নাজহার পায়ে হাতের আঙুল ছুঁয়ে দেয়। তৌসিরের ঠান্ডা স্পর্শে হালকা কেঁপে ওঠে নাজহা কিন্তু তারপরও রুক্ষ গলায় বলে, “এই হারাম নূপুরগুলো আমায় আপনার বিবিজান পড়িয়েছেন। আর বলছেন, আপনি যতক্ষণ না নিজের পায়ের আঙুল দিয়ে এগুলো টেনে টেনে না ছিড়েন ততক্ষণ যেনো আমি না খুলি। ভাবতে পারছেন কতটা বেহায়া আপনার বিবিজান? ছিঃ! লজ্জা হওয়া উচিত, লজ্জা। একজন বৃদ্ধ মানুষ আজ মরবেন কি কাল মরবেন, উনি এমন ভাবনা নিয়ে চলেন তো চলেন, আবার এসব আমায় আদেশ দেন।”
তৌসির নাজহার কথায় মুখ তুলে নাজহার দিকে তাকায়। কিছু বলবে বলে, কিন্তু আজ নাজহার এই অদ্বিতীয়া রূপ দেখে তৌসিরের তিক্ত কিছু বলার ইচ্ছে হলো না। নাজহা তৌসিরের চাহনি দেখে বলে, “এভাবে না তাকিয়ে নিন, এগুলো খুলুন। আপনার জন্যই তো এমন সঙ সাজিয়েছেন আমায়, তাহলে আপনিই খুলুন।”
তৌসির দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়িয়ে বলে, “আচ্ছা।”
ইচ্ছে হচ্ছিল বলতে থাক না, নূপুরগুলো পড়া খুব সুন্দর লাগছে। কিন্তু নিজের ইচ্ছে কে এই মুহূর্তে প্রাধান্য না দিয়ে আলতো হাতে নাজহার পায়ের নূপুরটা খুলে নেয়। ডান পায়ের খুলে, হাত বাড়িয়ে বা পায়েরও খুলে নিয়ে নূপুরগুলো হাতের মুঠোয় বন্দি করে উঠে দাঁড়ায়। নূপুরগুলো বেশ দামি হবে। এখন যদি এগুলো নাজহার হাতে দেয়, তাহলে নাজহা নিশ্চিত এত দামি নূপুরগুলো ছিঁড়ে নেবে। তাই তৌসির বুদ্ধি খাটিয়ে নূপুরগুলো বেলকনিতে ছুঁড়ে মারে আর বলে, “এই সাউয়াগুলো ফেইল্লা দেওয়াই বালা।”
তৌসির এগুলো ফেললো, সকালে উঠে যাতে নাজহার অগোচরে এগুলো নিয়ে নিতে পারে। এত টাকার নূপুর ফেলবে নাকি ও! নাজহা এটা দেখে শান্ত চোখে বলে, “এগুলো কেন ফেললেন? যান গিয়ে নিয়ে আসুন।”
“থাক না, ঐগুলা দিয়া কি করবা?”
“বলছি নিয়ে আসতে, নিয়ে আসুন।”
তৌসির গরম চোখে নাজহার দিকে তাকায়। বেশি বেশি করে ফেলছে এই মেয়ে। এবার মেজাজ খারাপ হচ্ছে ও। চোখ রাঙ্গায়। কিন্তু নাজহা এসবেও ভয় না পেয়ে উল্টো বলে, “যান গিয়ে নিয়ে আসুন। চোখ কাকে দেখাচ্ছেন? ভুলে যাবেন না, বউ হই আমি আপনার। আপনাকে আঁচলে বেঁধে নাচানোর ক্ষমতা রাখি আমি।”
এটা শুনে তৌসিরের প্রথমে রাগ হলেও পরে যখন ভাবে নাজহা তো ওকে স্বামী মানলো। যেভাবেই হোক মানলো তো! ব্যাস, এতটুকুই যথেষ্ট। তাই তৌসির আর অচথা কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ গিয়ে নূপুরগুলো হাতে তুলে নেয়। নূপুরগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে, “আইজ এগুলোর জীবন শেষ রে।”
নূপুরগুলো নিয়ে এসে নাজহার হাতে তুলে দেয়!নূপুর হাতে পেয়ে কিছু সময় নূপুরের দিকে তাকিয়ে থাকে নাজহা। অতঃপর কি একটা ভেবে নূপুরগুলো টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলে। নূপুরের পুঁতিগুলো ঝনঝন করে ঘরের ফ্লোরে এদিকে-ওদিকে গড়িয়ে পড়ে। এই শব্দে তৌসির চোখ বুঁজে নেয়। নিজেকে সামলাতে নিজের বদ মেজাজকে নিজের আয়ত্তে রাখতে। নাজহা নূপুরগুলো ছিঁড়ে নূপুরের এলোমেলো পুঁতিগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা প্রশান্তির হাসি দেয়। একটু শান্ত হলো অন্তর। এবার ও নিজের দুই হাত তৌসিরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “নিন, এবার আমার কানে, গলায় যা যা আপনার মনোরঞ্জনের জন্য পড়ানো হয়েছে সবগুলো আপনি খুলে দিন। আমি কষ্ট করে পড়েছি, আমি আর কষ্ট করতে পারব না।”
তৌসির এটা শুনে স্থবির হয়ে নাজহার দিকে তাকিয়ে থাকে এই মেয়ে কি চায়? মেরে ফেলবে নাকি তৌসিরকে? তৌসির দু’কদম এগিয়ে যায়। নাজহার মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে তৌসিরের নিজের শ্বাসও আরও ভারী হয়ে উঠে।ও নাজহার হাত নিজের হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে। তারপর আলতো করে, পরম যত্নে ওর হাত থেকে চুড়িগুলো খুলে নেয়। চুড়িগুলো সরিয়ে দেওয়ার সময় তৌসিরের আঙুল নাজহার মসৃণ চামড়ায় ছুঁয়ে যায়। এই অপ্রত্যাশিত স্পর্শে নাজহার শরীরে মৃদু কেঁপে ওঠে, তৌসিরের আঙুলগুলোও আবেগে থরথর করে কাঁপছে। নাজহার এত কাছে এসে নিজেকে সামলানো সত্যিই কঠিন, মহা কঠিন এক কর্ম।চুড়ি খোলে নিয়ে তৌসির হাত বাড়ায় নাজহার কানের দিকে। ধীরস্থিরভাবে কানের দুলগুলোও খুলে নেয়। এতে তৌসিরের উষ্ণ নিশ্বাস নাজহার গাল ছুঁয়ে যায়। নাজহার তো শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম কিন্তু সে বাঁধা দেয় না।শ্বাস বন্ধ হলে হোক। বন্ধ হয়ে মরে যাক কিন্তু জেদ তো পূরণ হবে। মন তো চাচ্ছে তৌসির আর ওর পরিবারকে কাঁচা চিবিয়ে খেতে, কিন্তু তা কোনো কলেই সম্ভব নয়, যদি সম্ভব হতো তবে আজ এই মুহূর্তে নাজহা এমন কিছুই করত।
তৌসিরের চোখ যায় এখন নাজহার গলায়। হাত বাড়িয়ে নাজহার গলার চোকারটা খুলে নেয়। এরপর নাজহার মুখের আরও কাছে ঝুঁকে পড়ে উদ্দেশ্য নাকফুলটা খুলে নেওয়া ঝুঁকে যাওয়ায় তাদের মাঝের দূরত্ব প্রায় নেই। তৌসিরের দৃষ্টি স্থির নাজহার নাকের উপর। পরম মমতায়, আলতো করে নাজহার নাকফুলটি সরিয়ে নেয়। তারপর দ্রুত নাজহার থেকে দূরে সরে গহনাগুলো ওয়ারড্রোবে রেখে দিয়ে ওয়ারড্রোব থেকে একটা কালো পায়জামা কামিজ এনে ওর হাতে দিয়ে বলে, “নাও এবার গোসল কইরা আও, এখন আবার কইও না শাড়ি খুইললা দিতাম।”
নাজহা কিছু বলে না, শুনেও না-শুনার ভান করে তৌসিরের হাত থেকে ড্রেসটা নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়। নাজহা ওয়াশরুমে প্রবেশ করতেই তৌসির খাটপাসীরর উপর থেকে পানির জগটা হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে বেলকনিতে যায়। বেলকনির কিনারায় দাঁড়িয়ে মাথা বাইরে রেখে মাথায় পানি ঢালে, সাথে নাক মুখ ধুতে ধুতে বলে, “মানুষ কেমনে দুই বিয়া চাইর বিয়া করে! আমি এক নাগনের ছোবলেই শেষ।”
মাথায় পানি দেয় কারণ ধোঁয়া উঠছে মাথা থেকে। নাজহা এই একটু সময় যা নাচ নাচিয়েছে, সারাজীবনেও এমন নাচ নাচেনি। কান দিয়ে গরম বাতাস বের হচ্ছে। তৌসির জগ থেকে ঢকঢক করে পানি গিলে নিয়ে বলে, “দয়াল, তোমার কাছে চাইলাম বউ আর তুমি কপালে জুটাইয়া দিলা আজরাইল।”
তৌসির তাড়াতাড়ি রুমে আসে, জগটা জায়গামতো রেখে পড়ে থাকা নূপুরের পুতিগুলো কুড়িয়ে নিয়ে খাটপাসীর ড্রায়ারে রাখে এগুলো পরে জোড়া লাগাবে সময় নিয়ে। এরপর পড়নের পাঞ্জাবিটা বদলে একটা কালো স্যান্ডো গেঞ্জি পড়ে নেয়। উদ্দেশ্য বাইরে যাওয়া আর গিয়ে নাযেম চাচাকে উড়াধুড়া উষ্টা দেওয়া। এই এত্তসব যা যা হলো তা সব নাযেম চাচারই আবদান। উনার এই মহান অবদানের জন্য তো উনাকে সংবর্ধনা দেওয়া উচিত। তাই তৌসির নিজ হাতে উনাকে বিশেষ একখানা নয়, কয়েকখানা সংবর্ধনা দিতে যাচ্ছে। তৌসির বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় তখনই ওয়াশরুম থেকে নাজহা বের হয়ে পিছন থেকে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় যাচ্ছেন?”
তৌসির পিছন ফিরে ওর দিকে তাকায়, এক পলক। চোখ মুখ লাল করে নিয়েছে, কান্না করতে করতে তাই লাল টুকটুকে হয়ে আছে ওর মুখাবয়ব। কালোতে তো অসম্ভব মানাবে নাজহাকে, সে আর নতুন কি! তৌসির স্বল্প সময় ওকে দেখে নিয়ে বলে, “বাইরে কাজ আছে একটু।”
নাজহা নিজের ভেজা কেশ তরঙ্গগুলো তোয়ালে মুড়াতে মুড়াতে তৌসিরকে বলে, “চুপচাপ ঘুমান। এখন বাইরে গেলে আপনার নষ্ট মনমানসিকতার বিবিজান আবারো আমায় খুটা দিবেন।”
তৌসির বিষয়টি ভেবে দেখে, সত্যিই তো বলছে নাজহা। তাই আর কিছু না বলে চুপচাপ এসে মাটিতে পাটি বিছিয়ে নিজের বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ে। নাজহা তৌসিরকে এত শান্ত দেখে তৌসিরের দিকে আড়ো চোখে কিছু সময় দেখে নেয় তারপর রুমের লাইট অফ করে নিজেও তৌসিরের পাশে নিজের বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ে। ওর বিড়ালগুলোকে বিবিজান নিচে রেখে দিয়েছেন আজ, তাই আজ বিড়ালগুলো ওর পাশে নেই। নাজহা বালিশে মাথা রাখতেই অভ্যেস মতো তৌসির ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের ভেতর টেনে নেয়। নাজহা জোরে শ্বাস ছেড়ে ফিসফিসিয়ে বলে, “আমার চুল ভেজা, ভিজে যাবেন।”
এটা শুনেও তৌসির মুচকি হেসে নাজহার ঘাড়ে নিজের মুখ গুঁজে দেয়। নাজহার ভিজে চুলের ঘ্রাণে নিজেকে হারিয়ে নেয়, চোখে আপনাআপনি লেগে আসে। তৌসিরের খুচা খুচা দাড়ির তীক্ষ্ণ আঘাতে নাজহার নরম ত্বক ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। চোখের কিনারা বেয়ে বেয়ে পড়ে দু’ফোঁটা পানি। নিজের প্রিয় পুরুষের স্পর্শের বদলে অপ্রিয় কারো ছোঁয়া আর বিষাক্ত কাটার মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। নাজহা পাটির এক কোণ খাবলে ধরে।এবা প তৌসিরের দিকে ঘুরে শুয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ এভাবে ঘুমালে তৌসির ওর কাছ থেকে সরবে না আর তৌসিরের খুচাঁ খুচাঁ দাড়িশুলো ওকে বড্ড জ্বালাবে। যেই ভাবা সেই কার্য নাজহা ধীরে ধীরে তৌসিরের দিকে ঘুরে যায়। ওর মুখ ঠেকে গিয়ে তৌসিরের গলায়। তৌসির এতে ভারী বিরক্ত হয়ে বলে, “এত নইড়ো না তো।”
নাজহা সহজ ভাষায় উত্তর দেয়, “আমায় ছেড়ে ঘুমান, আমি নড়ব।”
“এত কথা ক্যান কও? এক লাইন বেশি কথা বলার অভ্যাস হইয়া গেছে?”
“হ্যাঁ হয়ে গেছে। আপনার জন্য আমি ঘুমাতে পারি না।”
“সারা রাইত আমার বুকের ভেতর ইঁদুরের মতো। ঘাপটি মেরে ঘুমাইয়া কও ঘুমাইতে পারো না?”
“আপনার বুকে ঘুমালে ঘুম শান্তির হয় না!”
“বাপ চাচার মতো মিথ্যা কথা বলায় দেখতাছি একশোতে তো সাতশো তুমি।”
নাজহা রাগি সুরে বলে, “কথায় কথায় আমার বাপ চাচাকে কেন টানেন?”
“জাতের দুষমন তো তাই টানি। মাঝেমধ্যে মন চায় কথায় কথায় না টাইন্না এক্কেবারে মাইরা ফেলি সব-কয়টারে।”
“কাপুরুষের মতো বলতেই পারবেন, আমার বাপ চাচার একটা লোম ছোঁয়ার ক্ষমতা আছে নাকি আপনার?”
কাপুরুষের মতো কথাটা শুনে বিরাট রাগ জমে মনে, তৌসিরে শক্ত গলায় বলে, “যদি বিনামূল্যে বোমা পাওয়া যাইত তাইলে এতদিনে তোর বাপ চাচা সবগুলারে দয়ালের দরবারে পাঠাইয়া দিতাম।”
” এত যখন আক্রোশ এত যখন শত্রুতা তাহলে শত্রু ঘরের মেয়ে বিয়ে করলেন কেন? আপনি না করে দিলেই তো পারতেন।”
“আমার ইচ্ছার থাইকা আমার পরিবারের ইচ্ছা আমার কাছে আগে। আর এমনিতেও তোমারে বিয়া কইরা তেমন লস আমার হয় নাই, লাভই হইছে।”
” একটা কথা জিজ্ঞেস করি উওর দিবেন?”
“তোমার মতো নিমাতরি( কম কথা বলে যারা) না যে উওর দিমু না। ”
নাজহা এটা শুনে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে, “আচ্ছা, আপনার ভয় করে না?”
“কিসের ভয়?”
“এই যে আমি শত্রু পরিবারের, আমি যদি আপনায় ঘুমের মধ্যে মেরে ফেলি বা কোনো কিছু খাইয়ে মেরে ফেলে চলে যাই।”
তৌসির এটা শুনে হতবাক হয়ে বলে, “ও ডাকাইতের ডাকাইত লো, এটা চলতাছেনি তোর মনে ?”
নাজহা বিরক্ত হয়ে বলে, “আরে আমি শুধু বলছিলাম, আমি সত্যি করব নাকি।”
“নোবেল প্রাপ্ত ডাকাইতের মাইয়া তুই, তোরে দিয়া কোনো বিশ্বাস আছে নাকি! কবে সত্যিই কুপ মাইরা দয়ালের দরবারে পৌঁছাইয়া দিবি।”
“আমার আব্বাকে নিয়ে বাজে কথা বলবেন না।”
“তোর বাপরে তুই চিনস না, হালা আস্ত একটা মুনাফিক।”
নাজহা নিজের বাবার ওপর রেগে আছে। কিন্তু রেগে তাকলেও নিজের বাবার সম্পর্কে খারাপ বাণী শুনে কেউ কি আর সহ্য করবে? নাহ করবে নাহ। নাজহা তৌসিরকে হুমকি দিয়ে বলে, “আমার আব্বাকে উল্টোপাল্টা কিছু বললে খুব খারাপ হবে কিন্তু।”
তৌসির তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “খারাপের লগে আর কি-ই খারাপ হবে।”
“আপনি ভারী নোংরা একজন মানব।”
“যদি বলো নিকৃষ্ট, নোংরা আর খারাপ তবে আমি তাই। কারণ সত্য এটাই, যাই হই আমি তো আমিই।”
নাজহা এটা শুনে খানিকটা সময় স্তব্ধ হয়ে কথাটা ভাবে বুঝার চেষ্টা করে। কিন্তু এখন আর ও এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাচ্ছে না, তাই বিষয়টি এড়াতে এমনিই বলে, “আমার ইউজ করা ডাভ সাবান শেষ হয়ে গেছে, এনে দিবেন।”
তৌসির ডাভ সাবানের কথা শুনে ভুরু কুঁচকায়, মনে মনে ভাবে, “মেলা দাম তো সাবানের। একবার কিনা দিলে প্রতিবার কিনা দেওয়া লাগবে নাকি? বেহুদা টাকা নষ্ট করার মানে হয় না।” তৌসির আলতো সুরে বলে, “এগুলা ইসরায়েলি পণ্য এগুলো মাখালে চামড়া-টামড়া জুইল্লা যাইব।”
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ১১
নাজহা বিরক্ত হয়ে বলে, “ছিঃ ছিঃ, কি পরিমাণ কিপ্টে আপনি! লজ্জা লাগে না।”
তৌসির নাজহার কথায় মুচকি হেসে বলে, “এখন ঘুমা, আর ছিঃ মারাইছ না।”
এ বলে নাজহা টেনে বালিশে রাখে তারপর নিজের নাজহার গলায় মুখ বুঁজে দেয়। তৌসিরের উষ্ণ শ্বাস আর খুঁচা খুঁচা দাঁড়ির আঘাত ক্ষতবিক্ষত করে তুলে নাজহা কে। তৌসির নিজের শরীরের অর্ধ ভার ওর উপর ছেড়ে দিয়েছে। ভারী কষ্ট হচ্ছে নাজহার। দম বন্ধ হয়ে আসছে। নাজহা হাঁপিয়ে ওঠে, ” আমার কাছ থেকে একটু সরুন না দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে খুব ভার আপনার শরীর।”
