স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৫
সানজিদা আক্তার মুন্নী
একটা কাঠের চেয়ারে নাজহা বসে আছে আধো অন্ধকার একটি ঘরে ঘরটি কে হয়তো ‘ঘর’ নয়, বরং ‘কসাইখানা’ বললেই ভালো হয়। ঘরটা জমাট বাঁধা ধুলো আর রক্তের এক মিশ্র ধাতব গন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। জানালার ভাঙা ফাঁক দিয়ে একফালি, রুগ্ন আলো এসে পড়েছে নাজহার সামনে টেবিলের মাঝখানটিতে। নাজহার চোখ যখন পুরোটা খুলে নেশার ঘোর কাটে, তখন প্রথমে তার দৃষ্টি আটকে যায় টেবিলের উল্টোদিকে তার সামনে চেয়ারে বসে থাকা মানুষটির দিকে। তাকে দেখে এক নিমেষেই নাজহার দেহ-মন স্থবিরতার নিবিড় কুয়াশায় ডুবে যায়।
নাজহার সামনে বসে আছে ওসি ফারদিন। তাকে একটা কাঠের চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে। শুধু বাঁধা হয়নি তাকে টেবিলের ওপর কার্যত বিদ্ধ করে রাখা হয়েছে।ফারদিনের দুই হাতের কবজি ও তার নিচের অস্থিসন্ধি ভেদ করে গেঁথে আছে দুটি জং-ধরা, মোটা খঞ্জর, যা টেবিলের পুরোনো কাঠের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গেছে। তার হাত দুটো দেখে মনে হচ্ছে কোনো পশুর চামড়া টেনে পেরেক মেরে সাঁটা হয়েছে। রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে, টেবিলের কাঠের ওপর তৈরি হয়েছে জমাট রক্তের কালচে আস্তরণ। যন্ত্রণায় ফারদিনের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, ওর পেশিগুলো কাঁপিতেছে কিন্তু মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের করছে না সে। কারণ ও জানে, এই নরক থেকে বাঁচতে হলে এই নীরবতা বজায় রাখতে হবে। প্রতিটি গোঙানির শব্দ তার গলার ভেতর আটকে গিয়ে শ্বাসরোধ করছে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
নাজহা তার নিজের চেয়ারে বসে প্রথমে স্থির হয়ে গিয়েছে। তারপর ফারদিনের হাতের দৃশ্যটা মস্তিষ্কে গেঁথে যেতেই সে এক তীব্র আর্তনাদ চেপে কোনোমতে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। নাজহার মস্তিষ্ক কাজ করছে না। সব কেমন ধোঁয়াশা লাগছে। আবছা মনে পড়ছে ফজরের নামাজের পর সে রান্নাঘরে গিয়েছিল। সেখানে বিবিজান ছিলেন। আজ অলাদা একটা মায়া ছিল বিবিজানের আচরণে নিজের হাতে দু’কাপ দুধ চা জ্বাল দিয়েছিলেন। এক কাপ নিজে খেয়েছেন, আরেক কাপ পরম মমতায় বাড়িয়ে দিয়েছিলেন নাজহার দিকে। নাজহা অবাক হয়েছিল, ভেবেছিল অসুস্থতার কারণেই হয়তো বা এই হঠাৎ পরিবর্তন। কিন্তু সেই চায়ে কয়েক চুমুক দিতেই চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছিল তার। তারপর আর কিছু মনে নেই।
চোখ মেলতেই নিজেকে আবিষ্কার করে এই চেয়ারে, আর ঠিক সামনেই দেখতে পায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর ফারদিন কে। নাজহা হতভম্ব হয়ে এক লাফে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ভয়ে, বিস্ময়ে তার শরীর থরথর করে কাঁপতেছে।ঘরে তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন বিবিজান তৌসির আর নাযেম চাচা।
ফারদিন দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে। তীব্র যন্ত্রণায় তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। চিৎকার করার শক্তি বা ইচ্ছে দুটোই হয়তো সে হারিয়েছে। হাতের স্নায়ুগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম, অথচ সে শুধু পশুর মতো গোঙাচ্ছে। সে জানে, চিৎকার করে লাভ নেই। নিজের কৃতকর্মের ফল আজ তাকে পেতেই হবে। আজ তার মৃত্যু নিশ্চিত, আর সেই ভয়ানক সত্যটা মেনে নিয়েই সে যন্ত্রণার সাগরে ডুব দিয়েছে। নাজহা আর স্থির থাকতে পারে না। তোতলানো গলায়, অবিশ্বাসের স্বরে সে প্রশ্ন ছুড়ে,
“আ… আমি এখানে ক… কি… কি করে এ… এলাম? ত… তৌসির! এসব কি হচ্ছে? কি হয়েছে ওনার?”
নাজহার প্রশ্নে ঘরের স্তব্ধতা ভাঙে। বিবিজান ধীরভঙ্গিতে তৌসিরের দিকে তাকান, ওকে কথা বলার অনুমতি দেন।
তৌসির কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে এক ক্রুর হাসি নাজহার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সে শান্ত গলায় বলে,
“আমরা নিয়ে এসেছি জ্ঞান শূন্য করে।”
নাজহা বিস্ময়ে থমকে রয়। কি হয়েছে, কেন হচ্ছে, বা সামনে কি হতে চলেছে এসব ভাবার শক্তি তার লোপ পেয়েছে। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে চারদিকে। কোনোমতে বিড়বিড় করে আওড়ায় ও,
“কিন্তু কেন?”
নাজহার প্রশ্নের উত্তরে বিবিজানের ঠোঁটে ঝুলে রয় এক রহস্যময়, কুটিল হাসি। তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলেন,
“একটা শুটিং তোরে দিয়া করমু বইলাই তো আনছি। ও নাযেম, মাল দে।”
বিবিজানের হুকুম পাওয়া মাত্রই নাযেম চাচা পকেট থেকে একটা ভারী পিস্তল আর চকচকে ধারালো এক ছুরি বের করে বিবিজানের হাতে তুলে দেনন। অস্ত্রের ঝনঝনানি শব্দে নাজহার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। তার হাত-পা বরফশীতল হয়ে আসছে। নিজেকে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা আর অসহায় প্রাণী মনে হচ্ছে তার। কেন জানি নাজহার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, তাকে এখানে আনার পেছনে এক ভয়ংকর উদ্দেশ্য কাজ করছে।নাজহা অসহায় চোখে তৌসিরের দিকে তাকায় আর কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কি করবেন তৌসির? আমাকে কি আমাকে কি মেরে ফেলতে এনেছেন?”
নাজহার প্রশ্নে তৌসির শব্দ করে হেসে ফেলে। এই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই, যা আছে তা পৈশাচিক আনন্দ। সে ধীর পায়ে নাজহার কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে ,
“আমার কালনাগিনী! তুমি মরবা ক্যান? তুমি তো মারবা!”
তৌসিরের মুখে ‘কালনাগিনী’ সম্বোধন আর অদ্ভুত কথাটা শুনে নাজহার বিস্ময় আকাশ ছুঁয়। প্রচণ্ড রাগ হলো তার, কিন্তু এই মৃত্যুপুরীতে দাঁড়িয়ে রাগ দেখানো মানে নিজেকেই বিপদে ফেলা। তাই নিজেকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রেখে ও পালটা প্রশ্ন করে,
“মারব মানে? কাকে মারব আমি?”
এ প্রশ্ন করতেই বিবিজান সশব্দে পিস্তল আর ছুরিটা টেবিলের ওপর নাজহার ঠিক সামনে রাখেন। তারপর ঘৃণামাখা চোখে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা ফারদিনের দিকে তাকিয়ে নাজহাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“এই মা*গির পুতরে মারবি। নে, মার! তোর যেটা দিয়া পছন্দ, সেইটা তুইল্যা নে। যন্ত্র পছন্দ না হইলে ক, পাল্টাইয়া দিমু।”
নাজহার মাথার ওপর দিয়ে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ফারদিন? ফারদিন তো এদেরই লোক ছিল! এদের হয়েই তো কাজ করত! তবে আজ কেন এই নির্মমতার স্বীকার ফারদিন হলো ? আর কেনই বা নাজহাকে দিয়ে তাকে মারতে হবে? সমীকরণের কিছুই মিলছে না। নাজহা সমীকরণ মিলাতে পারতেছে না। নাজহা স্থীর দাঁড়িয়ে রয়।নাজহাকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তৌসিরের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে সে প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বলে,
“এই মাগি! বিবিজান কি কইলো কানে যায় নাই তোর? মার এই বাইনচ**রে! ওই চাক্কু দিয়া এফোঁড়-ওফোঁড় কইরা দাও ওর বুক!”
তৌসিরের মুখে এমন গালি আর হিংস্র ধমক নাজহার কল্পনাতীত ছিল। আতঙ্কে, অবিশ্বাসে আর স্নায়ুর চাপে নাজহা চিৎকার করে বলে দেয়,
“কেন মারব আমি? আমি পারব না! আমি কাউকে খুন করতে পারব না!”
নাজহার আর্তনাদ শুনে বিবিজান তার দিকে রুক্ষ দৃষ্টিতে তাকান সাথে উনার কণ্ঠে ঝরে পড়ে চরম বিরক্তি আর ঘৃণা,
“এই মা*গি! গলা নিচে নামা!”
বিবিজানের ধমকে নাজহা স্তব্ধ হয়ে যায় । নাজহাকে ঠোট মুখ শুকিয়ে কাঠ। সে শেষ ভরসা হিসেবে তৌসিরের দিকে তাকায়। তৌসিরের চোখে যদি বিন্দুমাত্র মায়া অবশিষ্ট থাকে এই ভরসায়! আহত, ভাঙা গলায় অনুনয় করে বলে নাজহা,
“ত তৌসির! আমাকে দিয়ে এই পাপ করাইয়েন না। দোহাই লাগে, আমি পারব না।”
নাজহার আকুতিতে তৌসিরের মন গলে না, বরং সে কটাক্ষভরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। হাসি থামিয়ে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলে,
“ক্যান? তুই পারবি না ক্যান? গাদ্দারিতে তো উস্তাদ তুই, তাইলে খুন করতে পারবি না ক্যান? আমার কালনাগিনী!”
তৌসিরের মুখে আবারো ‘কালনাগিনী’ সম্বোধন শুনে নাজহা নিশ্চিত হয়, তার ধারণা ভুল ছিল। তৌসিরকে সে যতটা সহজ ভেবেছিল, সে আসলে ততটাই জটিল। এক ঘৃণ্য, মুখোশধারী পিশাচ এই তৌসির শিকদার। ওর বাবার কথাই আজ সত্য হলো “নীরর অতিরিক্ত আবেগই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।” ভয়ে নাজহার হাতের আঙুলগুলো ঝিরিঝিরি করে কাঁপতেছে। কপালে জমতেছে বিন্দু বিন্দু ঠান্ডা ঘাম। পায়ের পাতা মেঝের সাথে সেঁটে গেছে, নড়ার শক্তি আর নেই।এমন সময় হঠাৎ তৌসির টেবিলের নিচ থেকে চকচকে এক ছোট কুড়াল বের করে। নাজহা বড় বড় চোখে সেদিকে তাকায়। চোখের পলক ফেলার আগেই তৌসির প্রচণ্ড ক্রোধে ফারদিনের টেবিলের ওপর রাখা হাতের ওপর এক কোপ বসিয়ে দেয়।
”আআআহ্!” ফারদিনের গগনবিদারী চিৎকার ঘরটা কাঁপিয়ে দেয়। কোপের তোড়ে ফারদিনের হাতের চারটি আঙুল চারদিকে ছিটকে পড়ে। একটা কাটা আঙুল ছিটকে এসে লাগে নাজহার কপালে, তারপর সেটা গড়িয়ে পড়ল নিচে। রক্তের ফিনকি ছুটে নাজহার কপাল আর জামা ভিজিয়ে দেয়। নাজহা চিৎকার করতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হয় না। ভয়ে ও একেবারে সিটিয়ে গেছে। তার চোখের সামনে বারবার ভাসছে এই ভয়াবহ দৃশ্য এক কোপেই আঙুলগুলো বিচ্ছিন্ন। ফারদিনের হাতের কাটা জায়গা থেকে নলের মতো রক্ত বের হচ্ছে। যন্ত্রণায় ফারদিনের জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে, ও পশুর মতো গোঙাচ্ছে। মেঝের ওপর পড়ে আছে তার খণ্ড-বিখণ্ড আঙুলগুলো। মৃত্যুশয্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর এই দৃশ্য।
নাজহাকে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তৌসির কুড়ালটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দেয়। এরপর কোমর থেকে নিজের পিস্তলটা বের করে সোজা নাজহার দিকে তাক করে। সাক্ষাৎ যমদূতের হুকুমের মতো হুকুম করে,
“হয় তুই গুলি করে ওরে মার, নয়তো তুই মর।”
নাজহা কাঁপাকাঁপা চোখে ঘৃনা নিয়ে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি… আমি খুন করতে পারব না। আমাকে… আমাকেই মেরে ফেলুন।”
তৌসিরের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে যায় ও আবারো হুঙ্কার দেয়,
“টেবিল থেকে পিস্তল হাতে নে আর ওকে মার!”
“আমি পারব না!”
“মাগি ইমোশন দেখাইস না! মার ওরে!”
“আমি মারব না সম্ভব নয় আমার পক্ষে!”
নাজহার কথা শেষ হতে না হতেই ‘ঠাস’ করে একটা গুলির শব্দ হয়। তৌসির নাজহার পায়ের একদম কাছে মেঝেতে গুলি ছুড়েছে। আগুনের ফুলকি আর বারুদের গন্ধে নাজহা ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে,
“না! আমাকে মারবেন না! আ আমি আমি মারব!”
তৌসির জানে নাজহার দুর্বলতা কোথায়। নাজহার দুর্বলতা তার নিজের জীবন তার মৃত্যুভয়! এই ভয় দেখিয়েই ওকে যা খুশি তাই করানো সম্ভব। নাজহা বড়ই স্বার্থপর, সে বড়ই স্বার্থপর নিজের প্রাণ বাঁচাতে সে সব করতে প্রস্তুত।আর এই দুর্বলতার-ই সুযোগ নিবে এখন তৌসির সারাজীবন নিবে।
বিবিজান নাজহার কাঁপা হাতে পিস্তলটা ধরিয়ে দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। তৌসিরও পিছিয়ে যেতে যেতে নিজের পিস্তল তাক করে রাখে নাজহার দিকে আর বলে,
“মাঙ্গের নাতিন! পাঁচ সেকেন্ড মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের ভেতর যদি তুই ট্রিগার না চাপিস, তো আমি তোকে মারব, তারপর এই জানোয়ারকে মারব।”
নাজহার চোখের সামনে পৃথিবীটা দুলতেছে। তৌসির তাকে এত বড় শাস্তি দিল? এত ভয়াবহ পরীক্ষা? সে কাঁপাকাঁপা হাতে ফারদিনের দিকে পিস্তল তাক করে।
ফারদিন যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাত উচ্চারণ করে ,
“আমাকে ছেড়ে দাও মেয়র সাব আমি আর এমন করব না আমাকে মাফ করে দাও!
তৌসির পৈশাচিক হেসে বলে,
“করবি না ক্যান? কর! আরও বেশি করিস! কবরে গিয়া করিস!”
নাজহা কিছুতেই গুলি চালাতে পারছে না। সে বিশ্বাসঘাতক হতে পারে, কিন্তু খুনি তো নয়! তার স্বভাবজাত সত্তায় খুনের অস্তিত্ব নেই। ভেতর থেকে কান্না দলা পাকিয়ে আসছে ওর। দেরি দেখে তৌসিরের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে সে তিক্ত স্বরে বলে,
“ও ছিনাল তোর কলিজায় এত ডর ? দাঁড়া, বের করতাছি তোর কলিজার ডর!”
বলেই তৌসির নাজহার ঠিক পেছনের দেয়ালে আরেকটা গুলি করে।গুলি শব্দটা কানের পাশ দিয়ে যেতেই নাজহা ভাবে তাকেই বুঝি গুলি করা হয়েছে। ভয়ের চোটে, সম্বিত হারিয়ে সে চোখ বন্ধ করে পরপর তিনবার ট্রিগার চাপে আর সাথে সাথেই গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম করে তিনটে বুলেট বিঁধে গিয়ে ফারদিনের বুকে। ফারদিনের শরীরটা একবার ঝাঁকুনি দিয়ে এলিয়ে পড়ে। সব শেষ। সে পাড়ি দেয় না ফেরার দেশে।
নাজহা নিজের হাতে করা খুনের দিকে তাকিয়ে থাকে চোখের পাতা না বুজে। ফারদিনের বুক চুইয়ে বের হচ্ছে লাল রক্ত, না এ রক্ত না এ তো লাল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। নাজহার হাত-পা অবশ হয়ে যায়। হাত থেকে পিস্তলটা খসে পড়ে মাটিতে। সে নিজের মুখে হাত চেপে ধরে দু’কদম পিছিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে দেয়। ঠিক তখনই বিবিজান নাযেম চাচার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নাজহার সামনে ধরেন। ফোনের স্ক্রিনে চলছে একটা সিসিটিভি ফুটেজ। এই একটু আগের মুহূর্তের ভিডিও। কিন্তু ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল এমনভাবে সেট করা যে, সেখানে তৌসির বা বিবিজান কাউকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখা যাচ্ছে নাজহা পিস্তল হাতে নির্দয়ভাবে ফারদিনকে গুলি করছে। দৃশ্যটা দেখে নাজহা শিউরে ওঠে। সে ফ্যালফ্যাল করে বিবিজানের দিকে তাকায়।বিবিজানের মুখে তখন শয়তানি হাসি এনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন,
“আর গাদ্দারির চিন্তা করলে বেজায় ফাঁসবি। এই ফুটেজ পুলিশ, মিডিয়া সবার হাতে যাবে। শিরোনাম থাকবে কি জানিস? ‘স্বামীর সাথে গাদ্দারি করেছিল এক তরুণী, আর সেটা ইনভেস্টিগেশন করে বের করেছিল পুলিশ অফিসার ফারদিন। তাই নিজের পাপ ঢাকতে সেই তরুণী তার বাপ-চাচার সাহায্যে অফিসারকে ধরে এনে খুন করে দেয়।’ বুঝলি মাগি?”
নাজহা সব শুনে ঠিকই কিন্তু ওর যে কথা বলার শক্তি নেই। ওর কলিজাখানা যে ছিঁড়ে কয়েক খন্ডে রুপান্তর হয়ে গেছে। তৌসির তার সাথে এমন গেম খেলল? যাকে সে আপন ভেবেছিল, সে তাকে এভাবে ফাঁসাল?
নাজহা কাঁপতে কাঁপতে বিড়বিড় করে,
“আ আমার সা সাথে এমন কেন করলেন?”
বিবিজান এবার এগিয়ে এসে নাজহার পাশে দাঁড়ান। পরম আদরে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলেন,
“নাটক করিস না। আমি সব জানি। তোর কি মনে হয় আমার নাতি, আমার তৌসির আমার থেকে কিছু লুকাবে? তুই তো মাত্র দুই দিন হইছে আইছোস, তোর প্রতি এত প্রেম দেখাইবো? মনে রাখিস, এই নূরজাহানের অনুমতি ছাড়া শিকদার বাড়িতে একটা পোকাও মরে না।”
বলেই হঠাৎ বিবিজান নাজহার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরলেন। হ্যাঁচকা টানে নাজহার মাথাটা পেছনে হেলে যায়। ব্যথায় চোখ বুজে কপাল কুঁচকে আর্তনাদ করে ওঠে নাজহা,
“উহ্! ব্যথা।
তৌসির নাজহার আর্তনাদ শুনে দু কদম এগিয়ে এসে বিবিজানকে চোখ দিয়ে ইশারা করে ওকে আঘাত করতে না করে। বিবিজান তার এই দরদ দেখে নাজহার চুল মুঠি ধরে দাঁতে দাঁত চেপে তৌসিরের দিকে নাজহাকে ছুঁড়ে মারেন আর বলেন, “কী পাইছিস এই গাদ্দার মাগির মাঝে? তোর এত দরদ সাউয়া উতলাইয়া পড়ে!”
ধাক্কা খেয়ে নাজহা টলে এসে তৌসিরের বুকে আছড়ে পড়ে। তৌসির সাথে সাথে দুই হাতে আগলে ধরে নেয় নাজহাকে। নাজহা মুখ তুলে ছলছল চোখে তৌসিরের দিকে তাকায়। আহত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “আপনি আমার সাথে এমনটা করতে পারলেন তৌসির? আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এমন করবেন আপনি!”
নাজহার এ প্রশ্নে তৌসির নাজহার চোখে চোখ রেখে, নাজহার মাথায় হাত বুলিয়ে বিকৃত হেসে বলে, “আমি ফোর টুয়েন্টি সম্ভব যোগ্য সবই আমি করতে পারি,।”
এরপর একটু থেমে আবারো বলে, “তোর কি মনে হয়, তোর এই লোভনীশ রুপ-ঝরা রুপ দেইখা আমি গইলা গিয়া সব ভুইলা যামু? তোর মতো এমন শত রুপ-ঝরা মাগি দের দেহ কেনা বেচা করি আমি। তুই ছোট বইলা তোরে স্নেহ করতাম, কিন্তু তুই তো গাদ্দার! খালি গাদ্দারি-ই আমার লগে করলি।”
নাজহা তৌসিরের কথায় স্তব্ধ হয়ে যায়। ওর হৃদপিণ্ডখানা খান খান হয়ে যাচ্ছে। এক দৃষ্টিতে সে তৌসিরের দিকে চেয়ে রয়। তৌসির তার তাকানো দেখে হাসতে হাসতে আবারো বলে, “শুনে রাখ, আমি ঐ পুরুষদের কাতারে পড়ি না যারা নারীর সৌন্দর্যে ডুবে নিজের সত্তা ভুলে বসে। নিজের রুপ দিয়া আমার কন্ট্রোল তুই জীবনেও করতে পারবি না। এই আশা ছাড়া দে।”
এটা বলেই তৌসির একটা রুমাল বের করে নাজহার মুখে চেপে ধরে। সাথে সাথে নাজহা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তৌসির রুমালটা ফেলে দিয়ে নাজহাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। বিবিজান এটা দেখে বিরক্ত হয়ে বলেন, “এই গাদ্দার মাগিরে মার নয়তো ছাড়। ও তোরে ক্ষয় কইরা দিব।”
তৌসির বিবিজানের মুখের দিকে তাকায়। তারপর ক্ষীণ হেসে অচেতন নাজহাকে আরো শক্ত করে নিজ বক্ষে চেপে ধরে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলে, “আমি জানি ও খারাপ, ও গাদ্দার। কিন্তু কী করার আছে আমার? আমার বউ তো! খারাপ হইলেও আমার, ভালো হইলেও আমার। আমার তো আমারই। আমি ওরে না ছাড়তে পারমু, না মারতে পারমু। ব্যাথায় হয় বড্ড ব্যাথ ধরে বুকে, ও আঘাত পেলে।”
এ বলেই নাজহাকে তৌসির কোলে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বিবিজানও বের হোন। হওয়ার আগে নাযেম চাচাকে বলেন, “ওর কিডনি বের কইরাইস।”
নাযেম চাচা উত্তর দেন, “আচ্ছা।”
তৌসির নাজহাকে সাবধানে বাড়িতে নিয়ে আসে এবং সরাসরি নিজেদের শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। নাজহার কপাল, হাত ও জামায় যে রক্ত লেগেছিল, তা একটি ভেজা তোয়ালে দিয়ে মুছে দেয়। যদিও সে চাইলে নাজহার পোশাকও বদলে দিতে পারত, কিন্তু সে তা করলো না। কারণ, নাজহার জ্ঞান নেই বলে তার অনিচ্ছায় তার শরীর দেখা বা পোশাক পাল্টে দেওয়াকে তৌসির সঠিক মনে করলো না। তাই শুধু রক্তের দাগ মুছে দেওয়ার কাজটিই করলো। নাজহাকে যে ওষুধ দিয়ে জ্ঞানশূন্য করেছল, সেটির প্রভাব তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে থাকবে। তাই নাজহা আরও কিছুক্ষণ জ্ঞানশূন্য অবস্থাতেই থাকুক।নাজহার পরিচর্যার পর তৌসির নিজের হাত-মুখ ধুয়ে মুছে নেয়। তার হাতেও রক্ত লেগেছিল। তৌসির ঠিক করেছে এখন আর গোসল করবে না, সোজা চলে যাবে ক্ষেতে। এখন অগ্রহায়ণ মাস, চারদিকে ধান কাটার ধুম পড়েছে।
তবে তৌসিরদের বাড়ির নিয়মটা একটু আলাদা। ধান কাটার মৌসুমে তারা খুব একটা বাইরের লোক বা মজুর লাগায় না বাড়ির পুরুষরাই হাতে হাত লাগিয়ে ফসল ঘরে তোলে। তৌসির নিজেও মনেপ্রাণে একজন কৃষক। তাই সুযোগ পেলেই সে ক্ষেতের কাজে মন দেয়।
এর পেছনে অবশ্য একটা বড় হিসেব আছে। বর্তমানে একজন মজুর খাটাতে গেলে দিনে অন্তত আটশো টাকা গুনতে হয়। তৌসিরের মতে, অন্যের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার চেয়ে নিজের কাজ নিজে করে সেই টাকাটা বাঁচানোই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই নিজের ক্ষেতে নিজেই কৃষি কাজ করে সে। তৌসিরের জীবনে যে বিশেষ কিছু লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো মিতব্যয়ী হওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয় করা।
তালুকদার বাড়ির দিক ——-
তালুকদার বাড়ির বিশাল অট্টালিকাটি আজ ভুতুড়ে নিস্তব্ধতায় মোড়া। এক অদৃশ্য কালো ছায়া নেমে এসেছে পরিবারটির ওপর। ইকরাবের ছোট বোন ইয়ারা কে জ্বীনে ধরেছে। ইয়ারার বয়স সদ্য চৌদ্দ পেরিয়েছে। বয়ঃসন্ধির চঞ্চলতা এখনো তার চোখেমুখেই আছে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে সে আর সেই আগের ইয়ারা নেই। তার আচরণে এসেছে অমানবিক পরিবর্তন, দৃষ্টিতে হিংস্রতা। বুঝতে বাকি রইল না, কোনো অশরীরী শক্তি বা ‘জ্বীন’ ভর করেছে তার ওপর।
বাড়ির বড় ঘরটিতে থমথমে পরিবেশ এখন। আতর আর লোবানের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে চারপাশ। মাঝখানে বসে আছে ইয়ারা, তাকে ঘিরে বসে আছে বাড়ির মুরব্বিরা এবং ইকরাব। সামনে বসে দোয়া পড়তেছেন একজন অভিজ্ঞ হুজুর। তিনি জ্বীন চালান দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছেন। ইয়ারার শরীরটা মাঝে মাঝে ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে, মুখ দিয়ে বের হচ্ছে অমানুষিক সব গর্জন।
হুজুর কড়া গলায় প্রশ্ন করেন, “কে তুই? কেন এই মাসুম মেয়েটার ক্ষতি করছিস? কী চায় তোর?”
হঠাৎ ইয়ারার ছটফটানি থেমে যায়। সে স্থির দৃষ্টিতে হুজুরের দিকে তাকায়। তবে এই দৃষ্টি কোনো চৌদ্দ বছরের কিশোরীর নয়, হাজার বছরের পুরনো কোনো হিংস্র সত্তার। ঘরদোর কাঁপিয়ে হু হু করে হেসে ওঠে সে। এই হাসিতে রক্ত হিম করা এক বিভীষিকা রয়েছে।
কর্কশ, ভরাট এক পুরুষালি কণ্ঠে ইয়ারার মুখ দিয়ে কথা বলতে শুরু করে সেই সত্তা, “আমি? আমি তো ওর কাছে আসতেই চাইনি! ও-ই তো আমাকে ডেকে এনেছে, নিজের কাছে টেনে নিয়েছে!”
উপস্থিত সবাই একটু ভয়ে পান যদিও এগুলো নতুন কিছু না। জ্বীন বলতে থাকে তার ভয়ঙ্কর অভিযোগের ফিরিস্তি
“ও যখন গোসলখানায় যায়, লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে গোসল করে। শুধু তাই নয়, অশ্লীল সব গান গায়। সেই সুর আর তার নগ্ন শরীর আমাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করেছে। আমি থাকতে পারিনি দূরে।”
একটু থেমে আবার বীভৎস হাসি দিয়ে গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিস করে বলে, “ও তো পবিত্র থাকে না। নিজের ঋতুশ্রাবের রক্তভেজা কাপড়গুলো না ধুয়ে বাথরুমে জমিয়ে রাখে। সেই রক্তের গন্ধে আমি মাতাল হই, আনন্দ পাই। সেই গন্ধে পাগল হয়েই আমি ওর ঘাড়ে চেপেছি।”
ইকরাবের বাবা-মা লজ্জায় আর ভয়ে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছেন। কিন্তু জ্বীন থামে না। সে একে একে ইয়ারার অসতর্ক জীবনযাপনের কথা বলে যেতে লাগে,
“রাতে যখন সে ঘুমায়, তার শরীরে ঠিকমতো কাপড় থাকে না, অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে শোয়। এই সুযোগে আমি তার আরও কাছে আসার সাহস পেয়েছি।”
“সে অতিরিক্ত সুগন্ধি মাখে। ওই তীব্র ঘ্রাণ আমার মতো সত্তাকে পাগল করে দেয়।”
“আয়না! সারাক্ষণ সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে। নিজেদের রূপ নিয়ে এই বাড়াবাড়ি আমার সহ্য হয় না তাই আমি তাকে ধরেছি।”
“আর তার ওই লম্বা চুল সে সবসময় চুলগুলো খোলা রেখে বাতাসে উড়িয়ে হাঁটে। খোলা চুলের ওই দোলায় আমি বাঁধা পড়ে গেছি।”
হঠাৎ ইকরাবের দিকে তাকিয়ে জ্বীনটি বলে, “তুই তো ভাই, তুই কি খেয়াল করিসনি?”
”সূর্য ডোবার সময়, ঠিক মাগরিবের আজানের সময় ও চুল খুলে বারান্দায় বা ছাদে হাঁটত। ও জানে না?, ওই সময়টা আমাদের বিচরণের সময়। খোলা কালো চুল যখন বাতাসে ওড়ে, তখন জিনের বাদশা হলেও নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। আমি তো সাধারণ এক জ্বীন মাত্র! ওর চুলের ফাঁদে আমি আটকা পড়েছি।”
এবার জ্বীনটি ইয়ারার বাবার দিকে আঙুল তুলে হুংকার দিয়ে বলে, “ও নামাজ পড়ে না, শরীরে কোনো ‘হিসার’ বা সুরক্ষা নেই। ও এক খোলা দরজা! আমি সেই দরজা দিয়ে ঢুকেছি। এখন আমাকে বের করা অত সহজ হবে না। ও আমার শুধুই আমার! আমি ওর সাথে অজস্রবার মিলিত হয়েছি আমি ওকে নিয়ে খুব শীঘ্রই নিয়ে যাব।”
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৩+২৪
সবশেষে জ্বীনটি হুংকার দিয়ে ওঠে, “ও নিজেই নিজের বিপদ ডেকে এনেছে। এখন আমাকে তাড়াবে সাধ্য কার?”
কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। সবাই একসাথে তেলাওয়াত শুরু করে দেন। তেলাওয়াত শুরু হতেই ইয়ারার মুখ দিয়ে গোঙ্গানির শব্দ বের হয় অতঃপর সে জ্ঞান হারায়।
