হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৩৫
তামান্না ইসলাম শিমলা
কেন আসে দিন তোকে কাছে না পাওয়ার?
কেন আসে দিন তোকে চোখে হারাবার?
কী উপায়ে ফেরা যায় তোর স্বপ্নতে আবার?
ওরে মন উদাসী, একা ফেলে পালালি কোথায়?
ওরে পরবাসী, ওরে বন্ধু আমার ফিরে আয়
হাসিতে হাসিতে ভুল, ফুরিয়েছে আজ সব
চলে গেছে, ঢলে গেছে কালকের কলরব
কথা ছিল সাথে তোর, বলা হলো শেষ না
খালি খালি চারিপাশ, এ আমার দেশ না
কী উপায়ে ফেরা যায় তোর স্বপ্নতে আবার?
ওরে মন উদাসী, একা ফেলে পালালি কোথায়?
ও ওরে পরবাসী, ওরে বন্ধু আমার ফিরে আয়
তোর সাথে এসে যেত ঝরনারা কথাদের
ঝরে গেল কেন আজ মরসুম পাতাদের
কত না বিকেলঘুড়ি উড়িয়েছি দু’জনে
চলে আয়, চলে আয়, আজ আবার উজানে
কী উপায়ে ফেরা যায় তোর স্বপ্নতে আবার।
ওরে মন উদাসী, একা ফেলে পালালি কোথায়?
ও ওরে পরবাসী, ওরে বন্ধু আমার ফিরে আয়!
বার বার গানের লাইন গুলো কানে বাজছে তনয়ার।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত, সিসিইউ ওর সামনে থেকে তনয়ার সড়ার নামই নেই। জ্ঞান ফেরার পর আবারও এসে বসে আছে দরজায় হেলান দিয়ে, সারাদিনে একফোঁটা পানি পর্যন্ত পান করেনি। তানিয়া তাসলিমা সহ কত লোক এলো গেলো, খাওয়ানোর জন্য জোর করল কিন্তু তনয়া? সেযে মূর্তির মতো একই জায়গায় বসে আছে, না বলছে কথা না কিছু খাচ্ছে।
তাসলিমাও এতটা সময় হাসপাতালেই ছিল, ইরা সবে মাত্র জোর করে বাড়িতে নিয়ে গেল। ইউসুফ আর শফিক বসে আছে ব্রেঞ্চে, কেন হচ্ছে এসব? সে তো নিজের মেয়েটার দিকেই তাকাতে পারছে না, আর তেহরাব? জ্ঞানহীন ভাবে শুয়ে আছে, ডাক্তার কিচ্ছু বলছে না।
তানিয়া নিজেকে স্বাভাবিক করে তনয়ার সামনে গিয়ে বসল, তনয়ার মাথায় হাত রেখে বলল,
“এভাবে চললে তো তুইও অসুস্থ হয়ে পরবি তনয়া, কিছু খেয়ে নে। একটু কিছু!”
তনয়া কিছু বলল না, তাকিয়ে রইল অনুভূতি শূন্য দৃষ্টিতে। তানিয়াও যে মেয়ের আর জামাইয়ের এহেম অবস্থা দেখতে পারছে না, এমন সময় দুজন ডাক্টার সহ ফাহিম এগিয়ে আসল সিসিইউ এর দিকে। তনয়া উঠে দাঁড়াল, ডাক্টার দুটো ভেতরে যেতেই তনয়া ফাহিমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল,
“উনি বাঁচবেন তো?”
তনয়ার কন্ঠ আশ্চর্যরকম শীতল, ফাহিমের ভেতরে ধক করে উঠেছে। ফাহিম চোখ নামিয়ে নিল,
“বাঁচবে, তেহরাবকে বেঁচে থাকতেই হবে। তুমি এবার বাড়ি যাও আমরা আছি তো এখানে!”
তনয়া হাসে, মাথা ঘুরিয়ে কেবিনের ভেতর তাকায়। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।
“বাড়ি? কোন বাড়ি? আমার স্বামী যেখানে নেই সেটা আমার বাড়ি নয়, ওইতো উনি, আমিও এখানেই থাকব।!”
ফাহিম আর কিছু বলল না, চলে গেল ইউসুফদের কাছে।
“আঙ্কেল আপনি চলে যান, আমি আছি তো এখানে। আর পারলে ভাবিকেও নিয়ে যান, এভাবে আর কতক্ষণ? “
ইউসুফ শফিকের দিকে তাকাল,
“তনয়াকে আপনার বাড়িতে নিয়ে যান, সারাদিন না খেয়ে বসে আছে, আমি এখানেই থাকব।”
শফিক মাথা নাড়ে, তনয়ার কাছে এসে বোঝানোর চেষ্টা করে।তবে তনয়া কিচ্ছুতেই যাবে না, অতঃপর রাত বাড়ে।ব্যর্থ হয়ে তানিয়া ও শফিকও চলে যায়, থেকে যায় তনয়া, ইউসুফ ও ফাহিম।
তনয়া পা বাড়াল নামাজের কেবিনে, ওজু করে নামাজে বসল। তার তেহরাবকে তার চায়, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে লাগল।
এভাবেই সারারাত কাটলো, এখন রাত তিনটা। চোখ বেয়ে পানি পরেই যাচ্ছে তনয়ার, মোনাজাতে বসে বারবার একটি কথায় বলছে,
“আল্লাহ মানুষটাকে ফিরিয়ে দাও, দরকার পরলে আমাকে নিয়ে নাও তবুও মানুষটার প্রাণ ভিক্ষা দাও।”
জায়নামাজে বসে এভাবেই কেঁদে কেঁদে তেহরাবকে চাইছে তনয়া, একটা সময় এই মানুষটাকে না চাইতেও কত কষ্ট দিয়েছে আর এখন? এই মানুষটার প্রাণ ভিক্ষা চাইছে!
“শুনছেন, নামাজ হলে একটু বাইরে আসবেন।”
নারী কন্ঠ কানে আসতেই তনয়া দ্রুত মোনাজাত শেষ করে উঠে দাঁড়াল, পেছনে তাকিয়ে দেখল একটি নার্স। তনয়ার গলা শুকিয়ে আসছে, ভয় করছে তার। তেহরাব ঠিক আছে তো? শরীর কাঁপছে, তার উপর সারাদিন কিচ্ছুটি পেটে পরেনি, শরীর দূর্বল।
তনয়া বেরিয়ে আসলো। নার্সের সামনে দাঁড়ালো,
“উ উনি ঠিক আ আছেন তো?”
নার্স একবার পেছনের দিকে তাকাল, অতঃপর তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার স্বামী সত্যি ভাগ্যবান একজন স্বামী যে আপনার মতো একটা স্ত্রী পেয়েছে, আল্লাহর রহমতে এখন তিনি কিছুটা ভালো। সিসিইউ থেকে আবারো আইসিইউ তে নেয়া হয়েছে, আটচল্লিশ ঘন্টা অবজারভেশনে রাখা হবে। এর মাঝে জ্ঞান ফিরলে তো ভালোই, আর বাকিটা আল্লাহর হাতে।”
তনয়ার কান্না পাচ্ছে, তার মন যে শান্ত হচ্ছে না। আবারো শব্দ করে কেঁদে উঠল, নার্স মেয়েটি তনয়া পিঠে হাত রাখল,
“আরে আপু কাঁদবেন না, দোয়া করুন বেশি বেশি।!”
তনয়া কান্নামিশ্রিত কন্ঠে নার্সকে বলল,
“একবার দেখা করতে দেবেন প্লিজ? শুধু একবার?”
“আমার হাতে তো কিছু না, স্যারদের বলতে হবে। তবে মনে হয় না অনুমতি দেবে।”
তনয়া নিজের চোখের পানি মুছে নিল,
“ একটু দেখুন না, একটা বার শুধু।”
নার্সটা স্মিত হাসে,
“আচ্ছা আসুন দেখছি!”
তনয়া নার্সের পিছু পিছু আসে, নার্সটি ভেতরে চলে গেল। তনয়া বাইরে দাঁড়িয়ে রিল, প্রচুর মাথা ব্যথা করছে তার। তার উপর পেটের ব্যথা, ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে রেখেছে সে।
মিনিট পাঁচেক পর নার্সটি আবারো বেরিয়ে আসল, সাথে ভেতরে থাকা দুজন ডাক্টারও।
ডাক্টার দুটি নিজেদের মাঝে কথা বলতে বলতে প্রস্থান করল, নার্সটি এসে তনয়ার সামনে দাঁড়াল,
“অনেক কষ্টে স্যার অনুমতি দিয়েছে, তবে আপনাকে দূর থেকেই দেখতে হবে। কাছে যেতে যা কথা বলতে পারবে না।!”
তনয়া দ্রুত মাথা নাড়ায়,
“দূর থেকেই দেখব, তবুও যেতে দিন।”
নার্স টি তনয়াকে নিয়ে ভেতরে আসে, বেডে শুয়ে আছে তেহরাব। বুকে পেটে ব্যান্ডেজ, মৃখে অক্সিজেন মাক্স, হাতে সেলাইন ও রক্তের সুচ গাথা। আরো কত রকমের যন্ত্রপাতি। বুকটা ধুক করে উঠল তনয়ার, লোকটা কতটা কষ্ট পাচ্ছে। দূর থেকে মন ভরছে না তনয়ার, অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল নার্সের দিকে।
“একটু কাছে যাই আপু? প্লিজ?”
নার্স দীর্ঘশ্বাস ফেলল, মেয়েটার কান্নাকাটি দেখে নিজেরই খারাপ লাগছে নার্সের।
“যান তবে প্লিজ ধরবেন না।!”
তনয়া কিছু না বলেই তেহরাবের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, আলতো করে হাত রাখল তেহরাবের মাথায়। এলোমেলো চুল গুলোতে স্পর্শ করল,নিজের চোখ থেকে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরল তেহরাবের চোখে। তেহরাবের চোখের পাতা যেন নড়ো উঠল, তনয়া অস্থির হয়ে পরল। দ্রুত নার্সের দিকে তাকাল,
“আপু উনি নড়ছে, উ উনি নড়ছে।”
নার্স দৌড়ে আসে, সত্যিই তেহরাবের আঙুল নড়ছে। পাল্স রেটও দ্রুত চলছে, বুঝতে পারল না নার্সটি, দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল ডাক্তারকে ডাকতে।
তনয়া হাঁটু গেঢ়ে বসল, তেহরাবের হাতটা শক্ত করে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“শুনছেন, কি হলো আপনার? তাকান না একটু, শুনুন না, তেহরাব তাকান প্লিজ।”
তেহরাব কেমন করছে, তনয়া ভয় পেয়ে যাচ্ছে। কান্নার গতিও বৃদ্ধি পাচ্ছে, হঠাৎ তনয়া অনুভব করল তেহরাবের হাতের মাঝে থাকা তার হাতটা চাপা পরছে। তনয়া তাকাল সেদিকে, তেহরাব শক্ত করে চেপে ধরেছে তনয়ার হাত। এমন সময় কেবিনে প্রবেশ করে ডাক্তার,
“আপনি বাইরে যান, নার্স উনাকে নিয়ে যান।”
নার্স এসে তনয়ার হাত ধরল,
“বাইরে চলুন আপু, আসুন।”
তনয়া নড়ল না, তাকিয়ে রইল তেহরাবের মুখের দিকে। ডাক্তার অক্সিজেন মাক্সটা ভালোমতো আবারো বসালো,
“কি হলো আপনি বাইরে যান।”
ডাক্তারের ধমক পর্যন্তও তনয়ার কানে গেল না, সে নিজেও শক্ত করে চেপে ধরল তেহরাবের হাত। বিড়বিড়িয়ে বলল,
“উনি ঠিক আছে, উনি একদম ঠিক আছে।”
তনয়ার কথায় যেন ঠিক হলো, ডাক্তার অক্সিজেন মাক্সটা খুলে দিতেই তেহরাবের পাল্সরেট ঠিক হয়ে গেল। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেল, চোখের পাতা নড়ছে তার।
“স্ট্রেঞ্জ, এত তারাতারি এমনটা হবে ভাবনার বাইরে ছিল। উনি তো এতক্ষন নিজেই চেষ্টা করেননি, হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন।”
আরেকজন ডাক্তারও একই কথা বলল,
“ আসলেই, আপনি বাইরে যান, আমরা উনার আরেকটু পরিক্ষা করব। আই হোপ উনি সুস্থ হয়ে যাবে।””
তনয়া দুদিকে মাথা নাড়ল,
“নাহ, আমি যাব না, কোথাও যাব না। প্লিজ আমি থাকি?”
“এটা হয় না, আপনি প্লিজ বাইরে যান। আমরা তো খবর জানাবোই।”
তনয়া আরেক নজর তেহরাবের দিকে তাকাল, কি নিষ্পাপ মুখশ্রী। আলতো করে হাতটা ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল, চোখের পানি মুছে বেরিয়ে আসলো বাইরে।
বাইরে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে ইউসুফ ও ফাহিম, এই দুটো মানুষও যে পাগলের মতো ঘুরছে।
“বাবা উনি ভালো হয়ে যাবেন, উনি নড়ছিলেন বাবা।”
তনয়ার উচ্ছাস্বিত কণ্ঠস্বর শুনে ইউসুফও কিছুটা ভরসা পায়, ফাহিমের অধরেও ফুটে উঠে হাসি।
“আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সব ঠিক করে দেবেন।”
ফাহিমের কথায় ইউসুফ ও মাথা নাড়ি,
“বাবা আপনি বাড়ি যান এখন, আমি আছি তো। “
ফাহিম ইউসুফের পিঠে হাত রাখে,
“হ্যাঁ আঙ্কেল চলুন, আমিও তো আছি।”
ইউসুফ একবার তাকাল তনয়ার দিকে আরেকবার ফাহিমের দিকে, বলতে গেলে তিনজনই আজ সারাদিন এখানে। কাকে রেখে কে যাবে?
ইউসুফ কিছু বলতে নিবে তখনই তনয়া বলে,
“প্লিজ বাবা আমাকে যেতে বলবেন না, আপনি আর ফাহিম ভাই বাড়ি যান। আপনারা বাড়ি গিয়ে রেস্ট নিন, আমি ঠিক আছি।”
ফাহিম বড় করে শ্বাস নিল, সে সত্যি ক্লান্ত। আর ইউসুফতো অসুস্থ হয়েই পরেছিল, ফাহিম মাথা নাড়ে,
“আচ্ছা তাই হোক, চিন্তা করবেন না সকালেই চলে আসব। আর কিছু দরকার পরলে কল করবেন!”
অতঃপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুজনে পা বাড়াল, তনয়া বসল ব্রেঞ্চে। আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাতে লাগল,
“ ধন্যবাদ আল্লাহ, আমার স্বামীকে সুস্থ করে দেওয়ার জন্য,।। এখন শুধু জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা, রহমত করো আল্লাহ্।”
সকাল দশটা, গোসল করে ওয়াশরুম থেকে বের হয় তনয়া। কিছু সময় আগেই বাড়িতে এসেছে তনয়া, তবুও ইরা জোর করে এনেছে।
রুমে আসতেই দেখে ইরা খাবার নিয়ে বসে আছে, তনয়া গিয়ে বসে ইরার পাশে। প্রচুর খিদে পেয়েছে তার তবে খেতে ইচ্ছা করছে না,
“এখন যদি না খাও তাহলে আর তোমাকে হাসপাতালেই যেতে দেব না, তাই বেশি কথা বলে খাবারটা খাও।”
তনয়া কিছু বলে না, প্লেটটা হাতে নিয়ে খাবার মুখে দেয়। ইরা তনয়ার দিকে তাকায়, একদিনেই মেয়েটার অবস্থা নাজেহাল।
তনয়া অল্প কিছু খেয়ে প্লেটটা রেখে দেয়,
“হাতপাতালে কখন যাবেন?”
তনয়ার কথায় ইরা আড়ালে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে, পানির গ্লাসটা এগিয়ে দেয় তার দিকে।
“চুপচাপ রেস্ট নাও, বিকেলে যাব। এখন ঘুমাও সারারাত তো জেগে ছিলে।”
তনয়া কিছু বলে না, কিচ্ছু ভালো লাগছে না তার। ইরা প্লেটটা নিয়ে বেরিয়ে গেল, তনয়া গিয়ে বিছানায় শুয়ে পরল। তেহরাবের বালিশটার উপর নিজের হাত রাখে, আনমনে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরছে নোনাজল।
“তারাতারি সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন প্লিজ, আপনার তনয়া ভালো নেই। কেন এত ঝামেলায় ঝরান? আজ তো তাহলে এই দিন দেখতে হতো না।”
তনয়া চোখ জোড়া বন্ধ করে নেয়, তেহরাবের কথা ভাবতে ভাবতেই ক্লান্ত শরীরটা তলিয়ে যায় ঘুমে।
“না ছুঁয়েও অনুভব করা যায়, যুগের পর যুগ না দেখেও ভালোবাসা যায়। হয়ত মস্তিষ্ক থেকে অবয়বটা অস্পষ্ট হয়ে আসে, মস্তিষ্ক জানান দেয়, ” তুমি ভুলতে চলেছো তাকে”! তবে হৃদয় বারংবার বেহায়া হয়ে আবছা স্মৃতি নিয়েই বাঁচতে চায়, আমি নাহয় তাই করলাম। তবুও ভালোবেসে যাব চিরকাল!”
বিড়বিড়িয়ে কথাটা বলল শিহাব, তাচ্ছিল্য হোসে শেষ বারের মতো তাকাল কেবিনের ভেতরে।
দেখতে এসেছিল তেহরাবকে, সারাদিন সময় পায়নি বলে বিকেলে এসেছিল। তেহরাবকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে, জ্ঞান ফিরেছে তবে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পারিয়ে রাখা হয়েছে।
শিহাব কেবিনের কাছে আসতেই দেখে ভেতরে তনয়া বসে আছে তেহরাবের বুকে মাথা রেখে। ধরে রেখেছে হাতটা শক্ত করে, অথচ এই হাতটা তো সে ধরতে চেয়েছিল৷ আজ ভাগ্য ক্রমে তার ভালোবাসার মানুষটা তার নেই, থাকবেই বা কি করে? এক তরফা ভালোবাসা যে!
শিহাব আর ভেতরে যায় না, সেখান থেকেই চলে আসে।শফিক, তানিয়া, তানহা, সালমা ওদিকে তেহরাবোর বাড়ি থেকেও সকল মানুষ এসেছে। সবাই দাঁড়িয়ে আছে বাইরে, নিজেদের মাঝে কথা বলছে। শিহাব কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে আসে হাসপাতালের বাইরে, বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে তার।
একটি চায়ের দোকানে এসে দাঁড়াল, শুনেছে সিগারেট নাকি দুঃখ ভুলায়? এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে এখনো সিগারেট ছোঁয়া হয়নি তার, আজ ইচ্ছে করছে। তাও শুধু তনয়ার জন্য।
মেয়েটাকে যে সেও ভালোবাসত, তবে সে প্রকাশ করতে পারেনি। অতীত বর্তমান সব জেনে বুঝেই তো ভালোবেসেছিল সেও, তাহলে সে কেন পেল না তার তনয়াকে? তার?
নাহ নাহ এখন তো তনয়া তার নয়, বরং অন্য একটি মানুষের বৈধ স্ত্রী। আনমনে হাসে শিহাব,
“!মামা একটা সিগারেট দেন তো।”
“কোনটা দিমু?”
শিহাব চুপ হয়ে গেল, সে তো এসব চেনে না।
“দিন একটা যেটা ভালো।”
দোকানদার একটি সিগারেট বের করে দেয় শিহাবের হাতে, শিহাব টাকা দিয়ে সিগারেটটাই আগুন ধরালো। তবে ঠোঁট অব্দি ছোঁয়াতে পারল না, আবারো তাচ্ছিল্যে হেসে সিগারেটটা ফেলেদিল।
“ভালোবাসলেই তাকে পেতে হবে? না পেলেই ডুবে মরতে হবে?”
চশমাটা ঠিক করে পকেটে হাত গুঁজে পা বাড়াল সামনের দিকে,
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৩৪
“ততটা দূরে চলে যাব যতটা দূরে গেলে তোমাকে আর দেখতে পারব না, তবে অনুভূতি গুলোও মুছতে পারব না মেয়ে, আমি যে জড়িয়ে গিয়েছি তোমার মাঝে৷ আমার মুক্তি কোথায়? ইহকালে নাকি পরকালে? নাকি আবারো জন্ম নিতে হবে তোমাকে পাওয়ার জন্য? “
শব্দ করে হেসে উঠল শিহাব, কি সব ভেবে চলছে সে। সে পাবে তনয়াকে? হাজার বার জন্ম নিলেও না, বিড়বিড়াল,
“যদি হাজার বার জন্ম নেয়া যেত তবে হাজার বার আমি তোমার প্রেমে পরতাম, তুমি আমার হও বা না হও। ভালোবাসতে ক্ষতি কি?”
