হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪৯
তামান্না ইসলাম শিমলা
“খুব বেশি পেট ব্যথা হচ্ছে?”
তেহরাবের অস্থির কন্ঠস্বর। তনয়ার হুট করেই মেজাজ খারাপ হল। রেগে গিয়ে বলল,
“আপনি সড়ুন আমার সামনে থেকে।”
তনয়া পেটে হাত দিয়ে বসে পরল বিছানায়। তার প্রচুর ব্যথা হচ্ছে যা সহ্য করার মতো না।
তেহরাব তনয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। অস্থির তেহরাব বুঝে উঠতে পারছে না তনয়ার এমন করার কারন।৷ তেহরাব তনয়ার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে তার হাত নিজের মুঠোই নিয়ে বলে,
“কি হয়েছে পাখি? এমন করছিস কেন? আমি কি করেছি?”
তনয়ার ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। নিজের হাতটা চট করে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
“কিচ্ছু করেননি। প্লিজ যান এখান থেকে। অসহ্য লাগছে সব কিছু।”
তেহরাব যেন আরো পাগল পাগল হয়ে উঠল। তনয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। এবার তনয়াও শব্দ করে কেঁদে উঠল। নিজেও জড়িয়ে ধরল তেহরাবকে।
“ সরি জান সরি। আর এমনটা করব না প্লিজ কাঁদিস না। চল হাসপাতালে……..
তেহরাবকে পুরো কথা শেষ করতে দিল না তনয়া। তার আগেই চোখ মুখ খিঁচে তেহরাবের বুকে মাথা লুকিয়ে বলে উঠল,
“আ আপনি আ আপনি ব বাবা হতে চ চলেছেন।”
কান্নার শব্দ বৃদ্ধি পেল,ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলে উঠল,
“কিন্তু আ আমার এখন ভয় ক করছে। ওর কি কিছু হয়ে যাবে না তো?”
তেহরাব থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের সামনে সব কিছু যেন গোলগোল ঘুরছে। সে বাবা হতে চলেছে! বারবার কানে বাড়ি খাচ্ছে একই বাক্য। কিছু বলার শক্তিটাও আপাতত পাচ্ছে না।তেহরাবের হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়েছে তা স্পষ্টই বুঝতে পারছে তনয়া। শুনতে পাচ্ছে ধুকপুক আওয়াজ। হঠাৎ করেই তনয়াকে ছেড়ে দেয় তেহরাব। তনয়া চমকায়!
কি হল? তেহরাব দুপা পিছিয়ে গেল, তনয়া ভেবে পেল না তেহরাবের এমন করার কারন। এমনিতেই পেটের যন্ত্রণায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে। তেহরাবের মুখশ্রী আরো গম্ভীর হল, কর্কশ আওয়াজে প্রশ্ন করল,
“কত দিন?”
তনয়া মাথা নিচু করে ছোট্ট করে জবাব দিল,
“দু মাস।”
তনয়া আর তাকাল না তবে তেহরাব সেই আগের মতোই। তার চোয়াল শক্ত হচ্ছে, দাঁতে দাঁত পিষে জিজ্ঞেস করল,
“কবে জেনেছিস?”
তনয়া আগের ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকেই বলল,
“ য যেদিন আপনি র রাগ করে আমাকে ওই বাড়ি দিয়ে আসলেন।”
রাগে শরীর কাঁপছে তেহরাবের, নিজের কপাল চেপে ধরে নিজেকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টাও করল একবার। তবে পারলো না। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠল,
“আমার ইচ্ছে করছে এক্ষুনি তোর গালে কষিয়ে দুটো চড় মারি।”
তেহরাবের ধমকানোর স্বরে বলা কথা শুনে কেঁপে উঠল তনয়া। সাথে ভারী হল হৃৎস্পন্দন। তার মনে যে উল্টো পাল্টা ভাবনা আসছে। তেহরাব কি এই খবর পেয়ে খুশি নয়? সে কি এই বাচ্চাকে চায় না? ভাবনার মাঝেই আবারো তেহরাবের কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
“আগে কেন বলিসনি?”
তনয়ার এবার কান্না পাচ্ছে, বিছানায় বসে পরল সে। মাথা এখনো নিচে, শুঁকনো ঢোক গিলে বলল,
“আ আমি বলতে চেয়েছিলাম আ আসলে……
“আসলে নকলে কি হ্যাঁ?”
তেহরাবের ধমকে এবার তনয়া কেঁদেই ফেলল, কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
“ অস্বস্তি কাজ করছিল। বুঝতে পারিনি কি করে জানাব।”
তনয়ার এহেন কথায় রাগটা আরো বাড়ল যেন, দুহাতে নিজের চুল চেপে ধরল তেহরাব।
“তোর অস্বস্তির গুষ্টি কিলাই। আমার কাছে তঁর অস্বস্তি কীসের? মন কি চাচ্ছে জানিস? মন চাচ্ছে ইচ্ছে মতো থাপড়াই।”
তনয়া কান্নামিশ্রিত মুখে তেহরাবের দিকে তাকাল, প্রশ্ন করে বসল,
“আপনি এত র রাগ ক কেন করছেন?”
তেহরাব দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“রাগ করব না তো কি? কেন সেদিন আটকালি না? কেন বললি না তুই প্রেগন্যান্ট? আর আজ? আজকেও কেন না? তুই….. উফ. বা*ল। এই প্রেগ্ন্যাসির সময়ে আমি….. তনয়ারে।”
তনয়া বুঝল না তেহরাবের কথা। প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল কিছু সময়। অতঃপর জিজ্ঞেস করল,
“মানে? ব বুঝিনি।”
তেহরাবের ইচ্ছে করল তনয়াকে তুলে একটা আছাড় দিতে। বহু কষ্টে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“ ঝড়ের রাতে কি হয়েছে মনে নাই? আর আজ সকালে? এই অবস্থায়….. তুই কি বলদ তনয়া? মাথায় কিচ্ছু নাই?”
তনয়া চমকাল, সত্যিই তো। সত্যিই সে ভুলে গিয়েছিল, দ্রুত পেটে হাত রাখল। পেটের যন্ত্রণা হচ্ছে তার, কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে না তো? নাহ!
তনয়া আবারো শব্দ করে কেঁদে উঠল, কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
“আমি কিচ্ছু জানি না। বাবুর কিছু হবে না তো বলুন? ওর কিছু হলে আমি মরে…..
বাকিটা শেষ করার আগেই তেহরাব তনয়াকে থামিয়ে দেয়,
“চুপ। আর একটা কথাও না। চল হাসপাতালে যাব।”
“সব দোষ আমার। কেন আমি আগে বললাম না, কেন আমার খেয়ালই ছিল না। আমি আসলেই বোকা, অপয়া। ওর কিছু হয়ে গেলে আমি নিজেকে মাফ করতে পারব না।”
তেহরাব নিজেও চিন্তিত। তার যে এখন মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। এক দিকে নিজের অস্তিত্ব, নিজের বাবা হওয়ার আনন্দ আর অন্য দিকে ভয়। যদি কিছু হয়ে যায়! সে নিজেও তো ক্ষমা করতে পারবে না।
তেহরাব দ্রুত তনয়ার কাছে আসলো, অস্থির চিত্তে বলল,
“আরে কিছু হবে না। চল চেকাপ করাবো, এক্ষুনি যাব। কিচ্ছু হবে না।”
তেহরাব কিছু না বলেই তনয়াকে কোলে তুলে নিল, এই অবস্থায় সে কিছুতেই বাইকে যাবে না। গাড়িটা বের করল তেহরাব। তনয়াকে বসিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“তুই কাঁদিস না। কিচ্ছু হয়নি, আমাদের বেবি একদম ঠিক আছে দেখিস।”
তেহরাব গাড়ি স্টার্ট করল,তনয়া অদ্ভুত ভাবে তেহরাবকে দেখতে লাগল। এক মুহুর্তর জন্য ভুলেই গেল নিজের ব্যথা। কিছু সময় আগের ভাবনা পুরোপুরিই পাল্টে গেছে তনয়ার। তেহরাব যে এই খবরে কতটা খুশি তা আর বুঝতে বাকি নেই, তেহরাবের অস্থিরতাতেই বোঝা যাচ্ছে। এটাই হয়তো নিয়ম। মানুষ যত খারাপই হোক নিজের সন্তানের আগমন তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাওয়া। আর যেখানে তনয়ার বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল ১০% সেখানে সে আজ গর্ভবতী। রক্তের টান বুঝি এমনই? এতটা অস্থিরতা হয়তো তনয়া নিজের জন্যেও দেখেনি। নিজের রক্ত, নিজের অস্তিত্বের প্রতি যতটা দেখতে পাচ্ছে।
ডাক্টারের চেম্বারে বসে আছে তনয়া। তেহরাবকে ঢুকতে দেয়নি৷ কিছু সময় আগেই আল্ট্রা স্নোগ্রাফির রিপোর্ট হাতে পেয়েছে ডাক্তার মনিরা সুলতানা। কিছুটা বিরক্ত নিয়েই রিপোর্ট দেখছে সে আর বারবার আড় চোখে তনয়ার দিকে তাকাচ্ছে। তনয়াকে ওষুধ দেওয়া হয়েছে সেটা নেওয়ার পর ব্যথা কমেছে অবশ্য তবে বাচ্চা কেমন আছে সেটার জানার জন্য চিন্তামগ্ন সে।
ডাক্তার ফাইলটা টেবিলে রাখল। তনয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“প্রেগ্ন্যাসি নিয়ে কোনো প্রবলেম ছিল?”
তনয়া শুধু হালকা উপর নিচ মাথা নাড়লো। ডাক্তার মনিরা স্বভাবতই গম্ভীর। তিনি গম্ভীরতা বজায় রেখেই বলল,
“তাহলে সেই রিপোর্ট গুলো কেন আনোনি?”
তনয়া মিনমিনিয়ে বলল,
“আসলে খেয়াল ছিল না। হুট করেই পেটে ব্যথা শুরু হয়েছিল।”
ডাক্তার মনিরা নিজেও মাথা দুলালেন। একটু রাগ দেখিয়েই বললেন,
“প্রথমত সমস্যা ছিল এবং সেই সমস্যার কারনে এই সময়টায় তোমার পুরোপুরি রেস্টে থাকা উচিত। এমনিতেও এই প্রেগ্ন্যাসি তোমার জন্য রিস্কি কিছু করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত ছিল।”
তনয়া চুপ করে বসে রইল। কি বলবে সে? মনিরা বলল,
“আজকালকার ছেলে মেয়েদের কোনো কন্ট্রোলই নেই। প্রেগন্যান্সির খবর পেয়েছ আরে সপ্তাহ খানেক আগে। অথচ এই অবস্থাতেও….. অসহ্য!”
শেষ কথাটা বিড়বিড় করে বললেও স্পষ্টভাবে শুনতে পেল তনয়া। কিছুটা লজ্জাও পেল। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরতে হবে জানা ছিল না তার। তনয়াকে চুপ করে থাকতে দেখে মনিরা বলল,
“ যাইহোক। পুরপুরি রেস্টে থাকবে এবং প্রতিমাসে দুবার চেকআপ করাবে।আপাতত কিছু মেডিসিন দিচ্ছি পনেরো দিনের জন্য। তবে পনেরো দিন পরে আবারো চেক আপ করাতে হবে তখন সেই অনুযায়ী ওষুধ পাল্টাতে হবে।”
তনয়া দুদিকে মাথা নাড়ে। মনিরা প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বলে,
“সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট বিষয় হল তোমার স্বামীকে বলবে গোটা প্রেগন্যান্সির জার্নিতে সে যেন তোমার কাছে না আসে। কোন কাছে আসার কথা বলেছি বুঝেছ নিশ্চয়?”
তনয়া চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়। ডাক্তার মনিরা নার্সকে বলে তেহরাবকে ডেকে আনতে। তেহরাব অস্থির হয়ে ভেতরে আসে,
“সব ঠিক আছে তো আন্টি?”
মনিরা তেহরাবের দিকে তাকাল না। প্রেসক্রিপশনটা তনয়ার হাতে দিয়ে তেহরাবকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ওকে পুরোপুরি রেস্টে রাখবে। অন্যদের আর তোমার বউয়ের পরিস্থিতি এক নয় সেহেতু সেভাবেই ট্রিট করবে।”
তনয়া আড় চোখে তেহরাবের দিকে তাকাল, তেহরাব অসহায় চোখ করে মনিরার দিকে তাকিয়ে আছে।
“আন্টি।”
মনিরা চোখ তুলে তাকাল৷ গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ ব্যক্তিগত কোনো কথা থাকলে আমি শুনতে চাচ্ছি না। আশা করছি সেসব নিয়ে কথা বলবে না।”
তেহরাব থেমে যায়। তনয়া প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তেহরাবের দিকে তাকায়। তেহরাবকি ডাক্তার মনিরার পরিচিত? পরিচিত হলে এমন ব্যবহার কেন করছে?
“জয়ী, আর কোনো রোগী দেখতে পারব না। আমার যাওয়ার সময় হয়েছে।”
নার্স তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনারা আসতে পারেন।”
তনয়া উঠে দাঁড়াল, পা বাড়াল বাইরের দিকে। তেহরাব এক পলক ডাক্তার মনিরার দিকে তাকিয়ে চলে আসলো। গাড়িতে বসতেই তনয়া প্রশ্ন করল,
“উনি কি আপনার পরিচিত?”
তেহরাব তনয়ার দিকে তাকাল। চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“ছিল এক সময়।”
তনয়া কিছু বলতে চেয়েও বলল না। তেহরাব গাড়ি স্টার্ট দিলে। আসার পথে মেডিসিন গুলো নিয়ে এসেছে।
বাড়িতে ফিরতে ফিরতে তখন রাত। আকাশ আজ পরিষ্কার সাথে মৃদু বাতাস। তাসলিমা ও ইউসুফও কিছু সময় আগে ফিরেছে। তেহরাব কিছু না বলে তনয়াকে নিয়ে নিজের রুমে চলে আসে। তনয়া ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসে। তেহরাব সোফায় হেলান দিয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে। গভীর চিন্তায় মগ্ন সে, তবে কি চিন্তা?
“শুনছেন?”
তেহরাব আগের ন্যায় থেকেই জবাব দেয়,
“হুম।”
“একটু নিচে যাই?”
তেহরাব আঁড়চোখে তনয়ার দিকে তাকাল। তেহরাব মাথা নেড়ে বলল,
“নিচে গিয়ে কাজ কি? রেস্ট নে। আমি খাবার নিয়ে আসছি,খেয়ে পড়তে বসবি। বই এইঘরেই এনে দিচ্ছি।”
তেহরাব উঠে যেতে নিলে পিছু ডাকে তনয়া,
“শুনুন।”
তেহরাব তনয়ার দিকে ফিরে তাকায়,
“বল।”
“ মা বাবাকে কি আপনিই জানাবেন?”
তেহরাব কপাল কুঁচকে বলে,
“নাহ। আমার শাশুড়ী এসে জানিয়ে দিবে। এই সুযোগে রেড কাউটা হাতাতে পারব।”
তনয়া মুখ ভেঙায়, তেহরাব হেসে চলে যায়।
মাথায় ঘোমটা টেনে চুপচাপ বসে আছে তনয়া। বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে তার। আশে পাশে তার অনেক মানুষ। রিমু, রিমুর মা, তাসলিমা, পাশের বাসার এক চাচি সবাই তার রুমে। তেহরাব সবটাই জানিয়েছে তাসলিমাকে। আর এমন একটি খুশির খবর পেয়ে তৎক্ষনাৎ সবাইকে জানিয়েছে সে। তার নাতিনাতনি আসতে চলেছে। এর থেকে খুশির খবর কি হতে পারে?
সকলেই নানারকম পরামর্শ দিচ্ছে তনয়াকে। তনয়া শুধু শুনছে, এছাড়া আর কিছু করারও নেই তার। তানিয়া অবশ্য সবার আগে জেনেছে খবর তবে তাসলিমা তাদেরও কল করে জানিয়েছে। ওদিকে তেহরাব বেরিয়েছে বাইরে, রাত এখন এগোরাটার বেশি। ফেরার নাম নেই।
“আচ্ছা রেস্ট নে তুই। আমরা যাই।”
তাসলিমা তনয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে যায়। সাথে বাকিরাও প্রস্থান করে। তনয়া কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পরে, শরীরটা দুর্বল লাগছে তার। এমন সময় ঘরে আসলো তেহরাব। হাতে তার একটি প্যাকেট।
তেহরাব এসে তনয়ার পাশে বসল, হাত বুলিয়ে দিল চুলে।
“ঘুমাবি?”
তনয়া তেহরাবের পায়ে মাথা রাখে,
“ঘুম আসছে না।”
“চল ছাদে যাই।”
তনয়া চমকায়,
“এত রাতে? কিছু হবে না তো?”
তেহরাব তনয়ার কপালে চুমু খায়,
“আল্লাহ ভরসা।”
তনয়া উঠে বসে। তেহরাব কোলে তুলে নেয়,
“শুনুন।”
তেহরাব পা বাড়ায়, যেতে যেতে বলে,
“বলুন শুনছি।”
তনয়া তেহরাবের গালে চুমু খেল,
“ডাক্তার বলেছে প্রেগন্যান্সির সময়…..
তনয়ার পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই তেহরাব বলে উঠল,
“আসব না। আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না জান। আর যেক্ষেত্রে তুই আছিস সে ক্ষেত্রে তো আরো না।”
তনয়া লজ্জা পেল, হাসলো মৃদু।
“সরি।”
“ভালোবাসি।”
“আমিও।”
তেহরাব হাসে, সাথে তনয়াও।
“আপনি আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি তেহরাব!”
তেহরাব তনয়ার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। সেভাবে থেকেই বলল,
“উহু তুই আমার প্রাপ্তি। তুই না এলে এই তেহরাব এত কিছু পেত? পেত না তো। সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সবচেয়ে সেরা উপহার হচ্ছিস তুই। আর তোর দেওয়া উপহার কি আমাদের সন্তান।৷ জানিস কেমন একটা লাগছে আমার।”.
“কেমন লাগছে?”
“জানি না। অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। আমার কাছে সব কিছু যেন রঙিন সপ্ন তনয়া। এই আমি, এই পাগল তেহরাবকে তুই বন্দি করেছিস।আর সেই পাগল তেহরাব বাবা হবে। পুচকু পুচকু হাত দিয়ে আমাকে ধরবে, আমাকে বাবা বলে ডাকবে তনয়া। ভাবতেই কেমন একটা লাগছে। আচ্ছা তনয়া সবারই কি এমনই হয়?”
তনয়া হাসলো,
“হয়তো।”
“তনয়া আমি এত সুখী কেন? আমি যেন পৃথিবীটা কিনে নিয়েছি। আর সেই পৃথিবী বারংবার আমাকে সব সুখ এনে দিচ্ছে। আমার পৃথিবী তুই আর তুই আছিস বলেই হয়তো এত সুখ।”
তনয়া চোখ টলমল করছে।সে তাকাতে চাচ্ছে না তেহরাবের দিকে। আজ বরং চোখের দুরত্বেই মনের কথা আদান-প্রদান হোক।
“আচ্ছা আমি যদি সুখ না হয়ে দুঃখ হতাম তাহলে?”
তেহরাব উঠে বসল,দুহাত মেলে আকাশের দিকে তাকাল। চিৎকার করে বলে উঠল,
“তাহলে আমি পৃথিবীর সকল দুঃখ কিনে নিতাম, যে সুখে আমার তনয়া নেই সেই সুখ নিয়ে এই তেহরাব কি করবে? তনয়া যদি দুঃখ হয়ে জন্ম নেয় তবে এই তেহরাব দুঃখ কুড়াবে সারাজীবন।”
চন্দ্র বিলাসে মগ্ন তনয়া, আর তেহরাব মগ্ন তার নিজস্ব ব্যক্তিগত চাঁদকে বিলাস করতে। মাঝে মাঝে নিজেকে খুব বেশি ভাগ্যবান মনে হয় নিজের কাছে নিজেকে, সে যে তার চাঁদটাকে পেয়েছে। সাথে পেয়েছে জীবনের মূল্যবান কিছু, তার এলোকেশী না থাকলে বোধ হয় তার জীবনটা ছন্নছাড়াই থেকে যেত। তেহরাব নিজেও হয়তো বৈরাগী জীবন পার করত, আনমনে হাসে তেহরাব। তনয়ার চোখের কোণে মুক্তার ন্যায় অশ্রুকণা চিকচিক করছে। তেহরাব দেখল। অতংপর তনয়ার দিকে তাকিয়েই নরম স্বরে বলল,
” তুই আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে থাকা কেউ একজন, যাকে ছাড়া এই তেহরাব বাঁচতেই পারবে না।”
তনয়া আগের ন্যায় চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে, আজ যে তার ব্যক্তিগত পুরুষের দিকে তাকানো তার দ্বারা সম্ভব না। এখন যদি তাকায় হয়তো আর বসে থাকতে পারবে না এখানে, হয়তো আনন্দ, সুখের কান্না আটকাতে পারবে না। সাথে লজ্জা, অস্বস্তি নিয়েই বিদায় হতে হবে এখান থেকে। তনয়া নিজেও হাসে, তেহরাবের কাছে আবদার করে বলে,
“একটা গান শুনাবেন?”
“উহু!”
তেহরাবে স্পষ্ট জবাব, এবারও হাসলো তো তনয়া। তবে তাকালো না, আজ সে পন করেছে সে কিছুতেই তাকাবে না।
“আচ্ছা, একটা গান শুনাবে?”
তেহরাব মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে তার এলোকেশীর দিকে, গিটারটা হাতে নিয়ে সুর তুলে।
Yeh raaten yeh mausam
Nadee ka kinara, ye chanchal hawaa
Aa.. aa…
Yeh raaten yeh mausam
Nadee ka kinara, ye chanchal hawaa
Kahaa do dillon ne
Ki milkar kabhi hum na honge jooda
Yeh raatein yeh mausam
Nadee ka kinaara, ye chanchal hawaa
Ye kya baat hai aaj ki chandani me
Ye kya baat hai aaj ki chandani me
Ke hum kho gaye pyar ki raagani me
Ye baahon mein baahen, ye behki nigaahe
Lo aane lagaa zindagi ka mazaa
Ye raatein, yeh mausam
Nadee ka kinara, yeh chanchal hawaa
Sitaaron ki mehfil ne karke ishaara
Sitaaron ki mehfil ne karke ishaara
Kahaa ab toh saara jahaan hai tumhaara
Mohabbat jawaan ho khula aasmaan ho
Kare koyi dil arzu kya
Yeh raatein yeh mausam
Nadee ka kinara, yeh chanchal hawaa
মাঝ পথে তনয়া নিজেও তাল মেলায় তেহরাবের সাথে ,
Kasam hai tumhe tum agar mujhse ruthe
Kasam hai tumhe tum agar mujhse ruthe
Rahe saans jab tak yeh bandhan na toote
Tumhe dil diya hai yeh waada kiya hai
Sanam main tumhaari rahungi sadaa
Ye raatein yeh mausam
Nadee ka kinaara, yeh chanchal hawa
Kahaa do dilon ne
Ke milkar kabhi hum na honge jooda
hmm hmmm hmmm hmmm
hmmm hmm hmm hmmm
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪৮
সময়টা যেন সেখানেই বন্দি হল। হোক না, কিছু সময় সময় থেমে গেলে দোষ নেই, বরং মুহুর্ত গুলো আরো স্মরণীয় হয়ে যায়। যেমন হচ্ছে তেহরকব তনয়ার, এভাবেই চলতে থাকুক। দোষ কোথায়? হাওয়াই মিঠাই এর স্বাদ ছড়িয়ে আছে সর্বত্র, হয়তো প্রতিটা শরৎ, হেমন্ত, বসন্ত, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায়!
