হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৮ (২)
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
ঘরময় যখন কাছে আসার মৌসুম ঠিক তখনি ইলেকট্রিসিটির আগমনে ঝলঝল করে জ্বলে উঠল কক্ষের প্রতিটি বাল্ব। কৃত্রিম আলোয় আলোকিত হলো কক্ষের প্রতিটি কোণা।
কৃশানের নেশালো চোখ জোড়া আলোর সংস্পর্শে আসতেই সম্বিৎ ফিরলো তার। মস্তিষ্ক জুড়ে নিউরনের আগাম বার্তা পৌঁছাতেই হুমায়রাকে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিল। বলল,
“ তিন মাইল দূরে থাক আমার থেকে! ”
অকস্মাৎ ধাক্কায় পড়তে পড়তেও নিজেকে সামলে নিলো মেয়েটা। বড় বড় শ্বাস নিয়ে ভরকানো চিত্তে মানুষটার দিক তাকাতে গিয়েও দৃষ্টি এলোমেলো হলো। প্রচন্ড আনইজি ফিল হচ্ছে। মানুষটার এমন হঠাৎ কাছে আসা আবার এভাবে অযত্নে দূরে সরিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা না চাইতেও মনে দাগ কাটল। কোনোরূপ কথা ছাড়াই মাথা নুইয়ে বিছানার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল সে। ওমনিই পুরো বিছানা জুড়ে দুহাত মেলে ধপাস করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো কৃশান। থতমত খেয়ে গেল হুমায়রা। পরপরই শুনতে পেল মানুষটার নিভু নিভু কণ্ঠ,
” বললাম না দূরে থাকবি আমার থেকে। তোর জন্য আমার জীবনে প্যারা বাড়ছে। সবকিছু তোর জন্য হয়েছে! ”
“ আমি আপনার থেকে দূরত্ব বজায় রাখলে আপনি খুশি? ”
কিয়ৎক্ষণ কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না। সময় নিয়ে ভেসে আসলো একটা অতিষ্ট কণ্ঠ,
“ জানিনা আমি, কিচ্ছু জানিনা! মস্তিষ্ক তোকে দূরে ঠেলতে চায় কিন্তু এই বখাটে মনটা কিছুতেই তোর দূরত্ব মানতে পারেনা। অন্তরে ভয়ানক দহন সৃষ্টি করে! বড্ডো ভয়ানক! ”
হুমায়রা থমকায়, থমকায় তার অন্তরাত্মা। কিছুক্ষণ বিমোঢ় হয়ে চেয়ে রইল চোখ বুঁজে বিড়বিড় করতে থাকা মানুষটার পানে। পরপর নিঃশব্দে বসল তার শিয়রে। মিহি স্বরে বলল,
“ তাহলে এখন আমি কি করবো? ”
আবারও নিস্তব্ধতা নেমে এলো কক্ষে। সহসা নীরবতা চিরে শুনা গেল কৃশানের শক্ত স্বর,
“ দূরে থাক! ”
ঠোঁট উল্টে গেল রমণীর। কি অদ্ভুত কথাবার্তা! মনে হচ্ছে এক মানবের ভিতরেই দুটো সত্ত্বা বিরাজ করছে। নাহলে এরকম কথা
কেউ কিভাবে বলে? ব্যার্থতার নিঃশ্বাস ফেলল হুমায়রা। বলল,
“ আচ্ছা ঠিক আছে। এবার আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। ”
“ ঘুম আসছে না। ”
“ কেন? ”
নাল হয়ে পড়ে থাকা ডান হাত খানা উঠিয়ে বুক অব্দি নিলো কঠোর মানব। বুকে আঙুল চেপে বলল,
“ এখানে শান্তি পাচ্ছি না। অশান্তি লাগছে। ”
কি নিষ্পাপ স্বীকারোক্তি! হুমায়রার মনে হলো দুনিয়ার সকল মায়া যেন আজ এই মানুষটার মধ্যেই ফুটে উঠেছে। নিশ্চই সকালের ঘটনা নিয়ে মনকে বিষিয়ে রেখেছে? সে মোলায়েম স্বরে বলল,
“ আম্মু তখন রাগের মাথায় যা মুখে এসেছে বলে ফেলেছে। উনি ইকরাকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তখন- এসব আপনি মনে গেঁথে রাখবেন না। রাগের সময় মানুষ নিজের বশে থাকে না শয়তানের বশে চলে যায়। তাই ওসব মাথায় রাখতে নেই। ”
“ মাথায় রাখতে হয় না এমনিতেই গেঁথে যায়। ”
“ এই আমাদের মানবজাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, যেটা আমাদের মনে রাখলে কষ্ট হবে সেটাই মনে গেঁথে রাখি। ”
“ তো কি করবো! তুই কি করিস? ”
“ আমি তো যেটা আমাকে কষ্ট দেয় সেটা কখনো মনেই রাখি না। বরং হাজারো কষ্টের ভিড়ে যে এক টুকরো সুখ মিলে সেটা মনে রেখেই বাকি কষ্টগুলো মুছে দেই। ”
ক্লান্ত আঁখি যুগল মেলে সরাসরি হুমায়রার উপর তাক করল কৃশান। চোখে চোখ রেখে বলল,
” তাহলে তোকে হৃদয়ে গেঁথে নেই? ”
ধ্বক করে উঠল মেয়েটার বুক। কথা আটকে গেল গলায়। বহু কষ্টে উচ্চারণ করল,
“ আমাকে….? ”
“ হুম, পরে আবার দুঃখ হয়ে যাবি না তো? ”
তড়িৎ গতিতে দুদিকে মাথা নাড়াল হুমায়রা। মুখে বলল,
“ ইনশাআল্লাহ কখনই না। ”
“ তবে আজ থেকে-
আমার শূন্য হৃদয়ের একমাত্র পূর্ণতা হিসেবে তোকে গেঁথে নিলাম,
দুঃখকে সরিয়ে হৃদয়রাজ্যে শুধু ‘তুই’ নামক সুখের স্থান দিলাম! ”
এক পশলা ভালোলাগার আবেশে অন্তরাত্মা জুড়িয়ে গেল হুমায়রার। ঠোঁটে ফুটল তৃপ্তির হাসি। তবে তা বেশিক্ষণ টিকল না।
“আচ্ছা সকাল হতেই সবকিছু ভুলে যাবে নাতো মানুষটা? এসব তো নেশার বশে বলছে। সকাল হতেই তো সব ভুলে যাবে। এর আগের বারও তো কিছু মনে ছিল না! ”
মুখের হাসিটা ওমনিই গায়েব হয়ে গেল। খানেক চুপ থেকে পরক্ষনেই আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। আর যাই হোক, মানুষটার মনে যে তাকে নিয়ে একটু হলেও অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে- এইটুকু তো নিশ্চিত। যেহেতু সৃষ্টিকর্তা এই অব্দি দিয়েছেন বাকি টুকুও তিনি সঠিক সময়ে দিয়ে দিবেন।
তার ভাবনার মাঝেই সহসা কোলের মধ্যে মাথা রেখে তার কোমড় জড়িয়ে ধরল কৃশান। মুখ গুঁজে দিলো মেয়েটার পাতলা উদরে। ক্ষণিকের জন্য বিদ্যুৎ শক খাওয়ার মতো ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল মেয়েটার নরম সরম কায়া। নড়ে চড়ে উঠে বলতে নিলো,
“ কি কর……”
পথিমধ্যেই শুনতে পেল ঘুম জড়ানো কন্ঠের ধমক,
“ আমার থেকে তিন মাইল দূরে থাক। ঘুমে ডিস্টার্ব করবি তো মেরে ফেলবো। ”
কথা বলার মাঝে তার উষ্ণ শ্বাস হুমায়রার উদরে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল। জমে গেল মেয়েটা। চোখ বড় বড় করে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। আজকে একের পর এক ঝটকা খেয়েই যাচ্ছে সে! অথচ কি অবলিলায় ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে তাকে প্রতিটা কর্মে আশ্চর্য করা মানব। সবশেষে তার ঘুমাটাই হারাম করে দিলো।
বরাবরের মতোই ঘুম থেকে উঠে হুমায়রাকে পাশে পেল না কৃশান। সেই ভোরেই তাকে সযত্নে নিজের থেকে ছাড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেছে সে। তবে সেসবের কিছুই অবগত নয় কৃশান। সে ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেশ হয়ে ভার্সিটির জন্য তৈরি হতে শুরু করল। তবে মন গহীনে উদয় হলো কিছু প্রশ্ন- “ সে কি রাতে উল্টা পাল্টা কিছু করেছিল? হুমায়রার প্রতি তো বেশ রেগে ছিল। মেয়েটাকে আবার আঘাত করে নি তো? ”
পরক্ষনেই নিজের উপর বিরক্ত হয়ে ভাবল- আঘাত করলে করেছে। সবকিছুর মূলে তো ঐ মেয়েই। অবশ্য সবটা তারই দোষ। মেয়েটাকে নিয়ে আজকাল একটু বেশিই কনসার্ন হয়ে যাচ্ছে সে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে দিনদিন। এখন থেকে একদম মনোযোগ দেয়া যাবে না ওর উপর।
তার ভাবনার মাঝেই মিঠুর জন্য খাবার নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল হুমায়রা। আড়চোখে একবার তাকে পর্যবেক্ষণ করে নিল। পরপর নিজের কাজে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা চালাল। তবে সেটা আর হয়ে উঠল না হুমায়রার পরিবর্তন দেখে। মেয়েটা আজকে রুমে এসে একটা কথাও বলেনি। প্রতিদিন এসে কিছু না কিছু তো বলেই। নয়তো মুচকি হেসে সালাম দেয়। কিন্তু আজকে কোনোদিক না তাকিয়ে ডিরেক্ট করিডোরে চলে গেছে। ব্যাপারটা লক্ষ্য করতেই ভ্রু কুঁচকে গেল ছেলেটার। কাজের ফাঁকেই আবারও অজান্তেই তার সবটুকু মনোযোগ কেড়ে নিল হুমায়রা।
মিঠুর খাওয়া শেষ হওয়া অব্দি পুরোটা সময় সেখানেই বসে রইল হুমায়রা। একটি বারের জন্যও রুমে এলো না। একেবারে মিঠুর খাওয়া শেষ হতেই সেখান থেকে বেরিয়ে এলো। যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই কক্ষ ত্যাগ করল। ভ্রু কুঁচকে তার দিক তাকিয়ে থাকা কৃশানকে একবার ফিরেও দেখল না।
“ মেয়েটাকি তাকে ইগনোর করল! ”
আপনমনে বাক্যটা আওড়াল কৃশান। চিন্তিত ভঙ্গীতে কিয়ৎক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পূনরায় বিন্দাস মুড ফিরে এলো। ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে ভাব নিয়ে বলল,
“ ধুর, ইগনোর করলেই বা তার কি! ”
ক্লাসের বাইরে রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চার বন্ধু। তন্মধ্যে একজন নির্লিপ্ত চোখে রৌদ্রময় আকাশপানে চেয়ে আছে। আর বাকি তিন জন চেয়ে আছে তার দিকে।
“ আচ্ছা নূপুরের মাঝে কি নেই তুই বল! ক্লাস টপার+ যথেষ্ট সুন্দরী। এমনকি তোকে কাজ করেও খাওয়াবে। ”
অতিষ্ট কণ্ঠ অভির। পাক্কা আড়াই বছর ধরে কৃশানকে ভালোবাসে তাদের ক্লাসমেট নূপুর। একদিন ভার্সিটি আসার সময় ছেলেরা ওকে ডিস্টার্ব করছিল আর কৃশান সেই ছেলেদের ধুলাই দিয়েছিল। এরপর থেকেই কৃশানের প্রতি তার ভালোলাগা শুরু। তারপর এই ভালোলাগা থেকেই একসময় কৃশানকে ভালোবেসে ফেলেছে সে। সাহস করে একবার সরাসরি নিজের মনের কথাও জানিয়েছিল। তবে কৃশানের রাম ধমকে পূনরায় আর সামনে আসার সুযোগ পায়নি। কিন্তু এখনো মাঝে মাঝে তার বন্ধুদের কাছে বলে। আজকেও অভিকে বলেছে। আর সেই নিয়েই কৃশানের সাথে ভার্সিটি আসার পর থেকেই ঘ্যান ঘ্যান করে যাচ্ছে। অথচ যার সাথে কথা বলছে সে একেবারে নির্জীব। তার মস্তিষ্কে ঘুরছে অন্যকিছু। বারবার মানস্পটে হুমায়রার এড়িয়ে চলার দৃশ্য ভেসে উঠছে।
“ ভাই আমাকে যদি এভাবে কেউ ভালোবাসতো আমি তো কবেই জান প্রাণ দিয়ে দিতাম ঐ মেয়েকে। আর তুই! কি নেই ওর মাঝে? ”
বড্ডো আফসোসের কণ্ঠ সাইফুলের। মেজাজ খারাপ হলো কৃশানের। ঘাড় ঘুরিয়ে শক্ত চোখে তাদের একবার দেখে নিল। উত্তর করল,
“ ওর মাঝে দুনিয়ার সব থাকলেও-
আমার মাঝে ওর জন্য ভালোবাসা নেই!
সতুরাং আরেকবার এসব নিয়ে কথা বলবি তো শরীরের হাড্ডি একটাও সোজা থাকবে না। ”
এবেলায় এসে চুপসে গেল ছেলেগুলো। মনে মনে কৃশানের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে লাগল। তবে মুখে কিছুই বলল না। কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে রবি মুখ খুলল,
“ আচ্ছা তুই একটা প্রেম করলে কি হয়! একটা করেই দেখনা! ”
বন্ধুর মুখে সেই একই বাসি বাক্য শুনে আর উত্তর করার প্রয়োজন বোধ করল না কৃশান। কিছুটা সময় কাটানোর পর সহসা বন্ধুদের এড়িয়ে সামনে পা বাড়াল সে। পকেট থেকে সিগারেট বের করে মুখে পুরল। একটা টান দিয়ে নিজের পুরুষালী কণ্ঠে গেয়ে উঠল দুটো লাইন,
“ প্যারা লাগে, প্যারা লাগে, প্যারা লাগেরে…
প্রেম পিরিতি ভালোবাসা প্যারা লাগেরে….! ”
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৮
গান শুনে তিন বন্ধু চোখাচোখি করল। বুক চিরে একসাথে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। দুনিয়াতে এতো গান থাকতেও এই একটা গানের এই দুটো লাইনই কৃশানের মুখে সবসময় শুনে এসেছে তারা। আর বাদ বাকি কোনো গানই কৃশান মির্জার পছন্দ না।

Porer part ta kobe debe.
Taratari dew na please 🥺❤️