হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৩
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
“ তুমি তলে তলে ট্যাম্পু চালাও,আমরা করলেই হরতাল…
আমরা করলেই হরতাল মামা, আমরা করলেই হরতাল!
রাতের নীরবতা চিরে সহসা তিনটি কণ্ঠ সমস্বরে গেয়ে উঠলো গানের লাইনগুলো। পরিচিত চায়ের টঙ এর সামনে এসে মাত্র দাঁড়িয়েছিল কৃশান। বন্ধুদের কণ্ঠে এমন অদ্ভূত গান শুনে সেখানেই স্তব্ধ হয়ে রইল বেচারা। ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি চোখে চাইল সামনের ব্যক্তিদের পানে। এগিয়ে এসে টেবিলে বসল সে। বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলল,
“ কি আজগুবি গান গাচ্ছিস? আগে আগেই মাল খেয়ে এসেছিস নাকি? ”
“ ভোর সকালে বাইকে মেয়ে নিয়ে ঘুরাই বুঝি তোমার পার্সোনাল কাজ? ”
রবির কথায় চমকে উঠল কৃশান। অবাকের সপ্তম আকাশে পৌঁছে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
“ মানে? ”
“ আবার মানে লাগাও! ভাগ্যিস রেশমত(দোকানদার) কাকায় দেখেছিল নয়তো এই তাজা খবর আমাদের কানেই আসতো না! ”
কৃশান আসার খানেক আগেই দোকানদার কাকার থেকে এই তথ্য জেনেছে তিন বন্ধু। সকালে যখন এই পথে হুমায়রাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল কৃশান তখন নাকি দোকান থেকে সেই দৃশ্য স্পষ্ট দেখেছেন রেশমত বেপারী। অতি পরিচিত হওয়ায় কৃশানকে চিনতে মোটেও বেগ পোহাতে হয়নি তার।
এবেলায় এসে দমে গেলো কৃশান। বুঝতে পারল মুখ না খুলে উপায় নেই। অগ্যতা বলল,
“ ঐটা ইকরার বান্ধবী ছিল। কালকে ইকরার বিয়ে তাই আনতে গিয়েছিলাম। ”
কুঁচকানো ভ্রু জোড়া আরও বেশি কুঁচকে গেল তাদের। চোখে মুখেই অবিশ্বাসের ছাপ ফুটে উঠছে। অভি সরু চোখে কৃশানের দিক তাকিয়ে বলল,
“ সত্যি? আমারতো মনে হচ্ছে তোর গার্লফ্রেন্ড। ”
“ থাপ্পড় দিয়ে গাল লাল করে দিব, বলেছি না এটা ইকরার বান্ধবী। আমার ওসব গ্রিলফ্যান থাকলে তো মেসেজ করতেই দেখতি লাফাঙ্গা! ”
“ গ্রিলফ্যান! ”
“ গ্রিলফ্যান নয়তো কি? সারাদিন গলায় জুলে থাকে শুধু। ”
তার কথার মাঝেই চা নিয়ে এগিয়ে আসলেন রেশমত বেপারী। কাপটা কৃশানের দিক এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“ মেয়ে তো মনে হয় একেবারে খাসা! দূর থেকেই মনে হচ্ছিল। ”
“ মনে হয়। ”
কাপটা হাতে নিয়ে এমনভাবে উত্তর করল কৃশান যেন সেই রমণীকে ভালো করে চেনেই না সে।
“ মামা, তাহলে আমার সাথে সেটিং করিয়ে দেনা তোর বোনের বান্ধবীটাকে। একেবারে ভালো হয়ে যাব পাক্কা! ”
খুক খুক করে কেশে উঠল কৃশান। মাত্রই চায়ের কাপে চুমুক বসিয়েছিল ছেলেটা। অপ্রত্যাশিত কথা খানা কর্ণপাত হতেই বিষম খেয়ে শ্বাস- প্রশ্বাস গলায় আটকে গেল। অবস্থা বেগতিক দেখে তার দিকে তাড়াহুড়া করে পানি বাড়িয়ে দিল সাইফুল। ঢকঢক করে বোতল খালি করল। নিজেকে ধাতস্থ করল খানেক । পরপর সময় না নিয়েই জোরেশোরে একটা লাথি বসালো অভির পা বরাবর। বলল,
“ আরেকবার এটা শুনলে তোর জবান কেড়ে নেব আমি। ”
“ কেন? আমিতো বললাম একেবারে ভালো হয়ে যাব। দরকার হয় মুজুর থেকে হুজুর হয়ে যাব। তাও একটু….”
“ অভি.! ”
কৃশানের চড়া কণ্ঠে মাঝপথেই থেমে গেল অভি। অসহায় মুখে বলল,
“ এমন কেন করছিস তুই! ”
তার সাথে বাকিরাও তাল মিলালো,
“ আসলেই তো! এমন করছিস কেন কৃশান? ওঁ তো বলল যে ভালো হয়ে যাবে। আর তুই এমন চেতে উঠছিস কেন! ব্যাপার কি বলতো? ”
রাগ পুরো মাথায় চড়ে বসেছে কৃশানের। বন্ধুদের শান্ত স্বরে বলা কথাগুলোও গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে। ছেলেটা কোনো কিছু না ভেবেই রাগে কটমট করতে করতে বলল,
“ এটা তোদের মামি হয়! লাফাঙ্গা কোথাকার! ”
বড়সড় একটা বজ্রপাত পড়ল রেশমত বেপারীর ছোট্ট দোকানটায়। চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে ছেলেগুলোর। তিন জোড়া মারবেল আকৃতির চোখ একসাথে নিক্ষিপ্ত হলো কৃশানের উপর। কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে সহসা তিনজন একত্রে চেঁচিয়ে উঠল,
“ মামি!…… এর মানে তোর বউ? ”
থতমত খেয়ে গেল কৃশান। নিজের কথার জালে বেচারা নিজেই কট খেয়েছে। রাগের মাথায় মুখ দিয়ে যা এসেছে তাই বলে দিয়েছে। একবার বন্ধুদের শকুনি দৃষ্টিতে আড় চোখ বুলালো সে। পরপর থেমে থেমে কথা ঘুরিয়ে বলল,
“ আরে, আমার বউ হতে হবে যাবে কেন! ”
“ তাহলে মামি কিভাবে হয়? ”
“ ওঁ বিবাহিত। আর তোরা তো শুধু আমাকে না বরং সব ছেলেকেই মামা বলিস। সেই হিসেবে ওঁ তোদের মামিই হবে। সুতরাং নজরের হেফাজত কর! ”
প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে চোখাচোখি করল সামনের ব্যক্তিরা। অভি মুখ কালো করে বলল,
“ বিবাহিত! এটা আগে বলে দিলেই পার..! ”
তার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই শুনা গেল রবির সন্দিহান কণ্ঠ,
“ বিবাহিত হলে তোর সাথে কেন আসলো? জামাইয়ের সাথেই তো আসতে পারতো! ”
“ ওঁর স্বামী ভালো না। এক নাম্বারের বখাটে, বিরিখোর,নেশাখোর ওকে সহ্যই করতে পারে না! ”
তিমিরে ঢাকা দিগন্তে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর করল কৃশান। হৃদ গহীনের কোথায় যেন এক অজানা তিক্ততা কাজ করছে। এবেলায় এসে সবার জবান বন্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন আর কোনো কথা খুঁজে পেলো না।
চোখ বেয়ে অনর্গল জলধারা গড়িয়ে পড়ছে হুমায়রার। বাঁ চোখটা ক্রমান্বয়ে ভয়ংকর লাল হয়ে উঠছে। সাথে অসহনীয় ব্যাথা ধীরে ধীরে পুরো মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ছে। তার সামনেই বসে আছেন নাজমিন বেগম ও ইয়াসমিন বেগম। ইকরা মোবাইল হাতে বারবার এপাশ থেকে ওপাশে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কৃশানের নাম্বারে লাগাতার কল করে যাচ্ছে। তবে বরাবরের মতোই কোনো রেসপন্স আসছে না অপর পক্ষ থেকে।
“ তোমার ছেলে ফোন ধরছে না তো আম্মু! ”
অসহায় চিত্তে বলল ইকরা। মেয়ের মুখপানে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ইয়াসমিন বেগম। বললেন,
“ তোর বাবা- চাচারা তো একটু আগেই বাইরে থেকে ফিরলেন। তখন বললেই তো হতো। আচ্ছা আমি গিয়ে বলে দেখি। ”
“ না না দরকার নেই আম্মু, আমি দোয়া পড়ে নিয়েছি ইনশাআল্লাহ ভালো হয়ে যাবে এমনিতেই। ”
শাশুড়ির কথায় প্রবল নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে বলে উঠল হুমায়রা। তার কথায় রেগে গেলো ইকরা। বলল,
“ তখনও তো একই কথা বলেছিলি! আমি জিজ্ঞেস করলাম চোখে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা। তুই বললি- কিছুই না, পানি দিলে চলে যাবে। আর এখন কী অবস্থা হয়েছে! ”
বিকেলের দিকে বাগান থেকে ফিরার সময় হঠাৎ চোখে একটা পোকা পড়েছিল হুমায়রার। প্রথমে খানেক জ্বালা করলেও ইকরা পোকাটাকে বের করে দেয়ার পর আর জ্বালা করেনি। শুধু চোখের ভিতর একটু আনইজি ফিল হচ্ছিল। তবে সেটাকে তেমন গ্রাহ্য করেনি মেয়েটা। ভেবেছিল পানি দিলেই চলে যাবে। কিন্তু এমন হয়ে যাবে কে জানতো?
“ আরও কবার চেষ্টা করে দেখ ধরে কিনা। নাহলে তোর বড়ো আব্বুকে পাঠাবো। ”
বড়ো আম্মুর কণ্ঠে হুমায়রার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আনলো ইকরা। পরপর আদেশ অনুযায়ী ভাইয়ের নাম্বারে আবারও কল লাগাল।
মসজিদের মাইকে একের পর এক মধুময় কণ্ঠে এশার আযান ধ্বনিত হচ্ছে। কেউ কেউ সকল ব্যাস্ততা ছেড়ে ছুটে চলছে আল্লাহর পবিত্র ঘরে আবার কেউ বা এই আহ্বানে সাড়া দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না। যেন এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকেই একমাত্র আপন করে নিয়েছে তারা।
তেমনি একদল ছেলে নিয়ে গড়া কৃশান দের দলটা। আশেপাশের কোনকিছুতেই তাদের তোয়াক্কা নেই। তারা চলে নিজ গন্তব্যে। যেখানে ফলস্বরূপ পাওয়া যায় এক অন্ধকার জগৎ। হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় নিজেদের কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছাল কৃশানরা। বট গাছটাকে ঘিরে বসে পড়ল রবি, সাইফুল ও অভি। কৃশান বসার আগে একবার প্যান্টের পকেটে ভাইব্রেট হতে থাকা ফোনটা হাতে নিল। উদ্দেশ্য এরোপ্লেন মুড অন করে দিবে। তখনি স্ক্রিনে ভেসে উঠল গুটিগুটি অক্ষরের একটা মেসেজ,
“ ভাইয়া প্লিজ কল ধরো, হুমায়রার চোখে সমস্যা হয়েছে। ”
হুমায়রা নামটা দেখতেই সাথে সাথে ব্যাস্ত হাতে কল ব্যাক করল কৃশান। রিসিভ হতেই প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ কি হয়েছে চোখে? ”
কৃশানের কণ্ঠের মাঝেই উদ্বিগ্নতা ফুটে উঠছে। তার এমন ব্যাকুল স্বর শুনে বাকি তিন বন্ধুও সব বাদ দিয়ে তার দিক তাকিয়ে আছে। ওপাশ থেকে কি বলছে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
ইকরার থেকে সবটুকু শুনে কিছুক্ষণ চুপ রইল কৃশান। অতঃপর ফোন কেটে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলল,
“ আমি আজকে থাকতে পারবো না। ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তারপর বাসায় যেতে হবে কাজ আছে। ”
“ বাড়ির কারও কিছু হয়েছে? ”
“ হুম। ”
বলেই কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ত্রস্ত পায়ে স্থান ত্যাগ করল কৃশান। এভাবেই হুমায়রাকে কেন্দ্র করে তার নিত্যদিনের অভ্যাসের পাতায় দুটো দিন নেশা করা ছাড়া যুক্ত হলো।
চোখের অসহনীয় ব্যাথা নিয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে হুমায়রা। তখনি ভেড়ানো দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করল কেউ। আওয়াজ পেয়ে আপনাআপনিই চোখ মেলে ফেলল সে। সাথে সাথেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রুকণা। পিছন ফিরে হুমায়রার লালিত চোখে চোখ পড়তেই ভিতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল কৃশানের। কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে দেখতেই নিশ্চিন্তে আবারও চোখ বুঁজে নিল হুমায়রা। চোখ বন্ধরত অবস্থাতেই বুঝতে পারল মানুষটা তার দিক এগিয়ে আসছে।
“ চোখ খুল। ”
গম্ভীর অথচ শান্ত কণ্ঠের পরিপ্রেক্ষিতে বাধ্য মেয়ের মতো চোখ খুলে তাকালো হুমায়রা। ড্রপ হাতে মুখের উপর ঝুঁকে থাকা স্বামীকে নজরে আসতেই অস্বস্তি নিয়ে হালকা ঢোক গিলল। মিহি স্বরে বলল,
“ এখন দিতে পারবো না। নামাজ আদায় করে, খাবার খেয়ে এসে দিবো। ”
কথা বলার মাঝেই চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ছে মেয়েটার। তা দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল কৃশান। অশান্ত স্বরে বলল,
“ চোখ বন্ধ কর! ”
সাথে সাথেই চোখ বন্ধ করে ফেলল হুমায়রা। একটু থেমে কৃশান প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ এই অবস্থা নিয়ে নামাজ কিভাবে পড়বি তুই? ”
“ পড়তে পারবো, হতে পারে ওযুর পানির উসিলায়ও চোখ ভালো হয়ে যেতে পারে। ”
আবারও চোখ খুলে ফেলল মেয়েটা। কথার সাথে অজান্তেই চোখ জোড়া খুলে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে কৃশানের। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
“ চোখ বন্ধ কর হুজুরনী, তোর লালিত আঁখি আমার শক্ত বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে! ”
শেষের কথাটা শুনতে পেল না হুমায়রা। কারণ কৃশান শুনার মতো করে বলেই নি। স্বামীর কথামতো চোখ বন্ধ করে নিল রমণী। এমনিতেও তার নিজেরই কষ্ট হয় চোখ খুললে। তবে না খুলেও থাকতে পারে না।
“ আর যেন চোখ খুলতে না দেখি! ”
হুমায়রার বন্ধ চোখে তাকিয়ে শাসানো সুরে বলল কৃশান।
“ একটু ইকরাকে ডেকে দিন। ”
“ কেন? ”
“ আপনি তো বললেন চোখ না খুলতে। চোখ না খুলে নামাজঘরে যাব কিভাবে আমি? ”
কিছুক্ষণ নীরব রইল পরিবেশ। সময় নিয়ে সামনে থেকে উত্তর আসলো,
“ আমি নিয়ে যাচ্ছি। ”
মুখে মুচকি হাসি ফুটলো হুমায়রার। খুব করে ইচ্ছে হলো মানুষটাকে একবার দেখে নিতে। তবে নিজের এই বাসনাকে নিয়ন্ত্রন করে বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ রেখেই হাত বাড়িয়ে বলল,
“ চলুন। ”
হুমায়রার বাড়ানো হাতের দিক চেয়ে কি যেন ভাবছে কৃশান। এইদিকে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কোনোরূপ সাড়া না পেয়ে কপালে ভাঁজ পড়ল হুমায়রার। মুখ খুলে কিছু বলতে নিবে এর আগেই নিজেকে শূন্যে অনুভব করল। বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে তৎক্ষনাৎ কৃশানের গলা পেঁচিয়ে ধরল মেয়েটা। মিহি স্বরে থেমে থেমে বলল,
“ এটা কি করলেন? ”
“ গন্তব্যে পৌঁছানোর সিক্রেট পথ খুললাম। যে পথের পথিক হিসেবে কেবল একজনকেই ঠাই দিলাম! ”
শেষের লাইনটা মনে মনে বলায় কানে পৌঁছালো না হুমায়রার। প্রথম বাক্যটা শুনতেই মেয়েটা চুপ মেরে গেছে। লজ্জায় গাল দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। ভিতর দেশে বইছে প্রবল সুনামি। সজ্ঞানে আজ প্রথম কৃশান তাকে কোলে নিয়েছে- ব্যাপারটা যতটা আনন্দ দিচ্ছে ততটাই লজ্জায় গ্রাস করছে। মেয়েটা নড়চড় হীন নেতিয়ে রইল স্বামীর কোলে।
এইদিকে হুমায়রার মুখপানে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কৃশান। ফোলা ফোলা চোখ, হালকা লালিত কপোল, শুঁকনো ঠোঁট সব মিলিয়ে একটা অন্যরকম মায়া কাজ করছে হুমায়রার মুখে। যেই মায়ার জালে ধীরে ধীরে গভীর ভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে তার কঠোর সত্ত্বা।
দুটো পাউরুটি একসাথে করে তার মাঝে ক্রিম লাগিয়ে হুমায়রার সামনে দিল কৃশান। একটা রুটি তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“ খাওয়া শুরু কর। ”
খাবার টেবিলে বসে চোখ বন্ধ রেখেই খাওয়া শুরু করল হুমায়রা। টেবিল অব্দিও কৃশানের কোলে চড়েই এসেছে সে। শুধু তাই নয় ওযু করা থেকে জায়নামাজে বসা অব্দি সবটা সময় কৃশানের কোলেই ছিল। রুটিতে একটা কামড় বসিয়ে হুমায়রা বলে উঠল,
“ আপনি খেয়েছেন? ”
“ হুম। ”
হুমায়রার বরাবর অপর পাশের একটা চেয়ারে বসতে বসতে উত্তর করল কৃশান। পরপরই লাইটার জ্বালিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে দিল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল নিকোটিনের বিষাক্ত গন্ধ। কান্নার দরুণ নাক বন্ধ থাকায় সে গন্ধ বেশি একটা প্রভাব ফেলল না হুমায়রার মাঝে। তবে বুঝতে পারল কৃশান সিগারেট খাচ্ছে। সে ওসবে মনোযোগ না দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কি খেয়েছেন? ”
“ বার্গার। ”
কোনোরূপ ঘাড়ত্যাড়ামি ছাড়াই শান্ত কণ্ঠের জবাব ভেসে আসলো। মানুষটার শান্ত কণ্ঠে খানেক সাহস পেলো হুমায়রা। বলল,
“ আপনি সবসময় এসব হাবিজাবি খেয়ে কেন নিজের ক্ষতি করছেন? ”
কথাটা মোটেও পছন্দ হলো না কৃশানের। সে কপাল কুঁচকে বলল,
“ তাতে তোর কী? তোকে না আমার ব্যাপারে ভাবতে নিষেধ করেছি! ”
“ আমি না ভাবলে কে ভাববে? আমার তো এক আপনি ছাড়া আর কেউই নেই। আপনার কিছু হলে আমি কার পরিচয়ে বাঁচবো? ”
কথাগুলো কর্ণপাত হতেই থমকাল কৃশান। হাতে থাকা সিগারেট টাও যেন পড়ে যেতে চাইল। সকল বিরক্তি লুপ পেয়ে হৃদ কোটরে আছড়ে পড়ল এক প্রশান্তিময় অনুভূতি। কুচকুচে কালো মণিবিশিষ্ট চোখ জোড়া যেন পলক ফেলতে ভুলে বসল। অপলক চিত্তে তাকিয়ে রইল সামনে থাকা মায়াবী মুখ পানে।
পরিবেশ অত্যধিক শান্ত হয়ে যাওয়ায় হালকা চোখ মেলে মানুষটার দিক তাকালো হুমায়রা। ওমনিই অকস্মাৎ চোখাচোখিতে ভরকে গিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিছুক্ষণ নীরব থেকেও যখন উত্তর পেল না তখন মিনমিন করে বলল,
“ কিছু বলছেন না যে? ”
“ চুপচাপ খাবার শেষ কর। তোকে ড্রপ দিয়ে ঘুমাবো আমি। ”
“ বখাটে স্বামী, এভাবে তো ঘরে ফিরে মধ্যরাতে এখন নাকি সে ঘুমাবে! ”
আপনমনে বিড়বিড় করল হুমায়রা। বুঝতে পারল সামনের ব্যক্তির সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। অগ্যতা চুপচাপ খেতে লাগল।
তুলতুলে বিছানায় এনে হুমায়রাকে তার বালিশে সোজা করে শুইয়ে দিল কৃশান। পরপর ড্রপ হাতে কিছুটা ঝুঁকল হুমায়রার উপর। মানুষটার তপ্ত নিঃশ্বাস চোখে মুখে পড়তেই ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠছে মেয়েটার পেলব কায়া। তবে উপরে উপরে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাল। এর মাঝেই ভেসে আসলো মানুষটার অত্যধিক মোলায়েম স্বর,
“ চোখ খুল। ”
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২২
ভেতরের সকল অস্থিরতা সাইডে রেখে স্বামীর আদেশ মোতাবেক চোখ খুলে তাকালো হুমায়রা। আরেকটু ঝুঁকে এলো কৃশান। এবার দুজনের নিঃশ্বাস বারি খেতে লাগল। কৃশানের শ্বাস স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত বলে মনে হলো হুমায়রার কাছে। মানুষটাকে কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে। বারবার হাত দিয়ে ঘাড় ডলছে। এইটুকু তেই কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যাচ্ছে।
বেশিক্ষণ দেরী করল না কৃশান। সতর্ক চিত্তে তার দুচোখে ড্রপ দিয়ে দিল। তৎক্ষনাৎ চোখ খিচে নিল হুমায়রা। সেদিকে এক পল তাকিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে এলো কৃশান। লাইট অফ করে ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। মনে মনে আউড়াল,
” এই মেয়ের কাছে গেলে এমন বুক কাঁপে কেন আমার! কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগে! ”

Next part please apu…
Aksathe 2/3 ta part deyar try koiren please