Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৫ (২)

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৫ (২)

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৫ (২)
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

“ শুনছেন..? ”
অসহায় চিত্তে মোবাইলে মজে থাকা কৃশানের উদ্দেশ্যে ডাক ছুঁড়ল হুমায়রা। মানুষটা যেন তার ডাকগুলো শুনেও শুনছে না। সেই কখন থেকে বলে যাএকটু- তাকে একটু বাইরে যেতে দিতে। অথচ কে শুনে কার কথা! নিজের মতো চুপচাপ তার পাশেই খাটের সাথে হেলান দিয়ে মোবাইল স্ক্রোল করে যাচ্ছে কৃশান। মেয়েটা ফের ক্লান্ত স্বরে ডেকে উঠল,
“ আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না? ”
“ দুঃখিত, আপনার কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তি এই মুহূর্তে ব্যাস্ত আছে। পরবর্তীতে আবার ট্রাই করলেও সে রেসপন্স করতে পারবে না! ”
কৃশানের এমন অদ্ভুত কথাবার্তা শুনে চোখ ছোট ছোট করে তার দিক তাকাল হুমায়রা। সরু চোখে কিছুক্ষন চেয়ে রইল মানুষটার পানে। পরপর বলল,

“ আপনি এমন কেন করছেন? ”
“ এমন দুর্দান্ত অফার আপনার পছন্দ না হলেও আপনাকে এটাই গ্রহণ করেতে হবে। কারণ আপনার জন্য এই বখাটে কৃশানের অফার ব্যাতিত অন্য অপশন প্রযোজ্য নয়! ”
মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলল মেয়েটা। বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। এবেলায় মুখে কুলুপ এঁটে চুপচাপ বসে রইল। সেদিকে আড়চোখে একবার দেখল কৃশান। হুমায়রার হপ করে রাখা কপোল দ্বয় দেখে বলল,
“ টমেটো দেখতে ভালোই লাগে! ”
“ আমাকে কোনদিক দিয়ে আপনার টমেটো মনে হয়? ”
ভ্রু কুঁচকে বলল হুমায়রা। পৃষ্ঠে বরাবরের মতোই ত্যাড়া উত্তর মিলল,
“ তোকে কে বললো? আমি তো আমার ক্ষেতের দেশি টমেটোর কথা বলেছি! ”
“ আপনি কবে কোথায় টমেটো চাষ করেছেন? ”

” তোকে কেন বলতে যাব? বেশি পকর পকর করবি তো মেরে একেবারে টমেটো ক্ষেতে ফেলে আসবো! ”
উত্তরে নাক ফুলানো ছাড়া আর কিছইু বলতে পারল না রমণী। নির্বাক চিত্তে তাকিয়ে রইল সামনের পুরুষটির পানে।
সহসা একটা ভয়ানক কান্ড ঘটিয়ে বসল হুমায়রা। কৃশানের হাতে থাকা ফোনটা সহসা কেড়ে নিয়ে নিল সে। কাজটা করতে গিয়ে হাতে মৃদু কম্পনের সৃষ্টি হলো।
বন্ধুদের সাথে অনলাইনে লুডু খেলার মাঝে একটি ফর্সা হাত এসে মোবাইলটা কেড়ে নিতেই- ভ্রু কুঁচকে হাতের মালকিনের দিক তাকাল কৃশান। তীক্ষ্ণ চোখে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থেকে হুংকার ছুঁড়ল,
“ এটা কি করলি তুই? সাহস কি করে হলো তোর আমার মোবাইল ধরার! ”
মানুষটার রূষ্ট গলায় ভিতরে হালকা ত্রাসের সৃষ্টি হলো হুমায়রার। ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্ত করল। নমনীয় স্বরে বলল,

“ হয়তো আপনি মোবাইল রেখে আমার সাথে কথা বলুন, নয়তো আমাকে বাইরে যেতে দিন। আর নয়তো আপনি নিজে গিয়ে ওদিকটা একটু দেখে আসুন। বড় ভাই হয়ে বোনের বিয়ের সময় উপস্থিত থাকা প্রয়োজন তো! ”
“ তোর কথামতো চলবো আমি! ”
“ হায় আল্লাহ, আমি আপনাকে আদেশ করছি নাতো! অনুরোধ করছি। দয়া করে আপনি রেগে যাবেন না। ”
কোনোরূপ উত্তর পাওয়া গেল না কৃশানের তরফ থেকে। শুধু এক জোড়া ক্রুদ্ধ চোখে সামনের রমণীর পানে তাকিয়ে রইল সে। ঠান্ডা পরিবেশে ফের ধ্বনিত হলো একটি মিষ্টি কণ্ঠ,
“ শুনছেন..? ”
ভিতরে থাকা সকল রাগ যেন নিমিষেই ঝরে গেল কঠোর মানবের। অদ্ভুত ভালোলাগার আবেশে জুড়িয়ে আসলো উত্তপ্ত হৃদয়।
অকস্মাৎ হুমায়রার দিক ঝুঁকে এলো কৃশান। মানুষটাকে নিজের এতটা নিকটে আসতে দেখে ভয়ে অজান্তেই পিছিয়ে গেল মেয়েটা। একটু যেতেই পিঠ ঠেকে গেল খাটের মজবুত কাঠে। ওমনিই কাঁধের দুপাশ দিয়ে দুটো শক্ত হাত অস্পর্শ বন্ধনে আবদ্ধ করে নিল তার সংকীর্ণ দেহখানা। পরক্ষনেই ধ্বনিত হলো হাতের মালিকের ভারী কণ্ঠ,

“ আজকাল বড্ডো জ্বালাচ্ছিস তুই! সহ্যও করতে পারছি না আবার বিরক্তও হতে পারছি না! কি করেছিস আমায়? বিরক্তি আসে না কেন তোর উপর! উল্টো নিয়ম করে তোর উপর বিরক্তি আনতে গিয়ে নিজেই বিরক্ত হয়ে যাই! ”
ঠোঁট নেড়ে শব্দ উচ্চারণ করার মতো শক্তি পেল না হুমায়রা। প্রিয় পুরুষের মুখ হতে নির্গত প্রতিটি শব্দ প্রকান্ড ঝড় বইয়ে দিচ্ছে রমণীর হৃদ কোটরে। মানুষটার শ্বাস- প্রশ্বাসের উষ্ণ স্পর্শে চোখ মেলে রাখাই দুষ্কর হয়ে উঠেছে। সে নিজেকে স্বাভাবিক করে থেমে থেমে বলতে চাইল,
“ আমি কি জা….”
কথা সম্পূর্ন হওয়ার আগেই তার হাত থেকে খপ করে ফোনটা নিয়ে নিল কৃশান। পরপর নির্দিষ্ট দূরত্বে এসে বলল,
“ রুম থেকে বেরোবি না। আমি যাচ্ছি ওদিকে। ”
বাধ্যের মতো মাথা দোলালো হুমায়রা। বলল,
“ আচ্ছা আপনি যান। ”
অতঃপর চলে গেল কৃশান।

বিছানায় বসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা করছে হুমায়রা। কখনো ইকরাকে নিয়ে ভাবছে আবার কখনো কিছুক্ষন আগে কৃশানের বলে যাওয়া কথাগুলো নিয়ে ভাবছে।
“ হুমায়রা..? ”
ইয়াসমিন বেগমের কণ্ঠ কর্ণপাত হতেই চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসল মেয়েটা। তৎক্ষনাৎ উত্তর করল,
“ জ্বি, আম্মু? ”
চাপানো দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন ইয়াসমিন বেগম। তাড়াহুড়া কণ্ঠে বললেন,
“ একটু রান্নাঘরে গিয়ে খাবার গুলো গরম করে দাও না আম্মু। আমি একটু ইকরার কাছে যাই মেয়েটা নাকি অনেক কাঁদছে। এইদিকে বিয়ে সম্পন্ন হলেই তাদেরকে খাওয়াতে হবে। আর হ্যাঁ এখন ড্রয়িং রুমে কেউ নেই।খনি চলে যাও। ”
“ আচ্ছা আম্মু, সমস্যা নেই। তবে আপনি একটু কষ্ট করে আপনার ছেলেকে জানিয়ে দিয়েন আমি রান্নাঘরে গিয়েছি। ”
“ আচ্ছা। ”
বলেই রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা। তিনি যেতেই মিররের সামনে গিয়ে নিজের হিজাবটা ভালোভাবে পেঁচিয়ে নিল হুমায়রা। পরপর চলল রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে।

ইকরাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সকল নারী সদস্য। সবাই যে যার মতো আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। অথচ মেয়েটার মনের ভিতরে তৈরি হওয়া বেনামী ঝড়ের থামার নাম নেই। ক্ষণে ক্ষণে বুক কেঁপে উঠছে মেয়েটার। চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে নোনা জল। কেন এমন হচ্ছে জানা নেই। কবুল শব্দটা উচ্চারণ করা যে এতটা কঠিন তা আজকে বুঝতে পারছে সে। মেয়ের অশান্ত মনকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য পাশে বসলেন ইয়াসমিন বেগম। এক হাতে মেয়েকে আগলে নিয়ে বললেন,
“ ভয় পেও না আম্মু। কবুল বলে দাও। ইনশাআল্লাহ তোমার নতুন জীবন সুন্দর হবে। ”
মায়ের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হলো ইকরা। পরপর নিজেকে ধাতস্থ করে সময় নিয়ে উচ্চারণ করল তিনটি পবিত্র শব্দ। সাথে সাথেই সকলে সমস্বরে আলহাদুলিল্লাহ বলে উঠল। কাজি সাহেব চলে গেলেন জলিল মির্জার রুমে অর্থাৎ পাত্রের কাছে।

রান্নাঘরের দিকটা তুলনামূলক নির্জন। চুলার শব্দ ব্যাতিত কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না সেদিকে। সামনের জ্বলন্ত আগুনের দিক তাকিয়ে চুপচাপ খাবার গরম করছে হুমায়রা। সহসা বাইরে থেকে শুনা গেল কোনো পুরুষের গলা খাঁকারির শব্দ। সতর্ক কর্নে সেই আওয়াজ পৌঁছাতেই একহাতে হিজাব টেনে মুখ সুদ্ধ ঢেকে নিল হুমায়রা।
“ আসসালামু-আলাইকুম। ”
অচেনা কণ্ঠের সালাম শুনতেই ভ্রু কুঁচকে গেল মেয়েটার।মনে মনে সালামের উত্তর নিল। তবে মুখে কিছু বলল না।
“ আমি আব্দুল্লাহ আল আজাদ। পাত্রের ছোট ভাই। ”
ওপাশের ব্যাক্তি নিজেই পরিচয় দিল। পরিচয় টা শুনতেই মনে সন্দেহ ঢুকল হুমায়রার। পাত্রের ছোট ভাই কেন এখানে আসবে! পাশে থাকা সবজি কাটার ছু*রিটা হাতে নিয়ে নিল সে। এর মাঝেই দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসলো কিছু অপ্রত্যাশিত শব্দ,

“ আপনাকে একটি বার দেখার সৌভাগ্য কি আমার হবে? ”
বাক্যটা কর্নপাত হতেই কিছুক্ষন থম মেরে রইল হুমায়রা। পরপর শান্ত অথচ শক্ত কণ্ঠে জবাব দিল,
“ আমাকে দেখতে চাইলে সেটা আপনার সৌভাগ্য নয় বরং দুর্ভাগ্য হবে। কারণ আমার স্বামী ব্যতিত অন্য সব পুরুষের কাছে আমি অত্যন্ত ধারালো অস্ত্র। সুতরাং আমাকে দেখার দুঃসাহস করবেন না।
আর এক্ষুনি এখান থেকে চলে যান। ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৫

“ অন্তত একটি….”
বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলো না আজাদ। এর মাঝেই পিছন থেকে ভেসে আসলো একটি শক্ত কণ্ঠ,
“ কিরে তুই ওখানে কি করছিস? ”
সাথে সাথেই ঘুরে তাকাল ছেলেটা। ওমনিই নিজের থেকে একটু দূরে আবিষ্কার করল সুঠাম দেহি কৃশান মির্জাকে। যার রক্তচক্ষু তার উপরেই নিবদ্ধ।

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৬

4 COMMENTS

Comments are closed.