Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ২০

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২০

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২০
সাঞ্জেনা শাজ

তালুকদার বাড়িতে প্রায় দু তিন দিন পর কিছুটা প্রফুল্লতা ফিরে এসেছে। আর এর কারণও আছে। রোজা অন্তঃস্বত্তা। আজ সকালেই জানতে পেড়েছে এ খুশির খবর। বাড়িতে খুশির আমেজ। সোহানা শুভ্রতার হুরোহুরি চারদিকে। তারা কলেজ থেকে এসে জানার পর থেকেই রোজাকে ঘিরে বসে আছে, নড়ছেই না।
“আপু তুমি প্লিজ বাবু হলে ওকে নিয়ে আমাদের সাথেই থেকো? কোথাও যেও না প্লিজ। ” শুভ্রতা বলে উঠলো রোজার পাশ ঘেঁষে বসে।
তার দেখা দেখি সোহানাও বায়না ধরে বললো,

“হ্যাঁ আপু। বাবু হলে ওকে আমরা কিছুতেই যেতে দিবো না। কত্তো দিন পর একটা ছোট্ট পুচকু আসবে। ”
রোজা হাসছে ওদের পাগলামু দেখে। কলেজ থেকে আসার পরিই তার পিছু পিছু ঘুরঘুর করছে দুটো।
পাশে থাকা শান্তা শব্দ করে হেসে ফেললো,
“তোরা কি শুরু করলি বলতো? আপুকে একটু নিস্তার দিবি তো! আসার পর থেকে শুরু করেছিস…”
“তুমি চুপ থাকো আপু। রোজা আপুর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নিচ্ছি আমরা। আপুকে এখন আর এই কানাডা ফানাডা যেতে দিবো না আমরা।হুহ!” বলেই মুখ মুচড়ালো সোহানা।
ওদের কথার মাঝখানেই জাহানারা বেগম হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে বসলেন মেয়ের পাশে। একেক জন একেক রকম গল্প বিষয় নিয়ে জ্ঞান দিতে থাকলো রোজাকে।

রোজা সকলের কথায় সায় জানালো শুধু মাথা নাড়িয়ে। লজ্জায় মুখটা লাল হয়ে আছে। তার এতো লজ্জা পাওয়ার কারণও সে ধরতে পারছে না। জাবের কে বলেছে মোবাইলে মেসেজ দিয়ে। এরপর আর মোবাইল হাতেই নেই নি। কিছু রিপ্লাই দিয়েছে কি না তাও জানেনা সে। তার শুধু লজ্জায় হাফসাফ লাগছে।
বিকেলটা এভাবেই কেটে গেলো সকলের। সন্ধ্যা হতে একেক জন বাড়িতে আসছে আর রোজার মাথায় হাত ভুলিয়ে দোয়া করে দিচ্ছে৷ জাবির আসলো আটটার দিকে। হাতে ভর্তি মিষ্টি নিয়ে। রোজার লজ্জারা যেনো আবার আবির্ভাব ঘটালো তার মুখশ্রীতে।
লোকটা একটা সময় তার ভাইয়ের বন্ধু ছিলো। তারপর হুট করেই বিয়ে, তবে পছন্দের। তারপর… তারপর এখন তার বাচ্চার বাবা! হটাৎ করেই এতো লজ্জারা কোথা থেকে তার মধ্যে আসলো সে নিজেই বুঝলো না।
জাবির এসে রোজার সামনে দাড়ালো, হাতে মোবাইল। তাতে সে দুনিয়ার ব্যাস্ত এমন ভাব। রোজার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বললো,

“রুমে চলো, কথা আছে।”
রোজার মনটা আচমকা ধ্বক করে উঠলো। লোকটার কন্ঠটা এরকম শুনাচ্ছে কেন? কেমন যেন গম্ভীর! উনি কি খুশি হয়নি? তাহলে কতো গুলো মিষ্টি নিয়ে আসলো যে!
সে এতো কিছু ভাবার আগেই উপরে দিকে হাটা ধরেছে জাবির। রোজাও পিছু পিছু হাটলো জাবিরের চিন্তিত মুখে। তার মনে আশংকা। জাবির কি এখন বাবা হতে চায় নি?
সিড়ি বেয়ে করিডরে হাটতে হাটতে রুমের দিকে এগুছে ওরা। আর একটু দুরত্ব শুধু। অধৈর্য ভঙ্গিতে মোবাইলটা পকেটে পুড়ে ফেললো জাবির। পিছু ঘুরে রোজার দিকে তাকিয়ে বললো,
“এতো ধীরে ধীরে হাটছো কেন? তোমার থেকে কচ্ছোপও বেশি তাড়াতাড়ি হাটে। ”
রোজার মনটা আরও খারাপ হলো। চেহারায় স্পষ্ট তা প্রকাশ পেলো। জাবির যেন এতে আরও অস্থির হলো। নিজেই আরও দু কদম রোজার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওকে পাজুকোলে তুলে নিলো। আচমকা এরকম কান্ডে রোজা হতবাক। বুক ধরফর করছে তার। দু হাতে জাপ্টে ধরেছে জাবিরের গলা। চোখে মুখে তীব্র ভয়।
“তোমার হাটতেই হবে না। আমার কোলে চড়ে আসো। ” অধৈর্য ভঙ্গিতে বলে রুমের দিকে গেলো সে। রুমে ঢুকেই দরজা আটকে রোজাকে কোল থেকে নামিয়ে জাপ্টে ধরে রাখলো নিজের সাথে কিছুক্ষণ। তারপর অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিলো ওর মুখশ্রী।
রোজা হাপিয়ে যাচ্ছে জাবিরের পাগলামোতে। কিছুতেই থামাতে পারছেনা। সে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে জাবিরের তীব্র উন্মাদনায়। এবার কিছু না বুঝে বলে ফেললো,

“থামুন প্লিজ,আমার অসুবিধে হচ্ছে।”
জাবিরের বুঝি হুশ ফিরলো এবার।থামিয়ে দিলো পাগলামি। রোজার মুখশ্রীটা দু হাতের আজলায় ভরে অস্থির হয়ে বললো,
“মোবাইল রেখে কোথায় ছিলে? কত্তো গুলো কল দিয়েছি দেখেছো? আজকেই জানতে হলো এটা? আমি বাসায় থাকতে জানতে পাড়লে না? তুমি জানো আমার মনে হচ্ছিলো সব ছেড়ে ছুড়ে তোমার কাছে চলে আসি। আমার এই..এই ছোট্ট অস্তিত্বের কাছে চলে আসি। ”
“হাপাচ্ছেন আপনি। একটু থামুন। পাগলামো করছেন তো!”
“করবোই তো। আমি বাবা হতে যাচ্ছি। আমাদের সন্তান আসতে যাচ্ছে এটা পাগল হওয়ার মতোই সংবাদ রোজা। আই লাভ ইউ বেবি। সো মাচ্ লাভ ইউ বেবি।” বলে আবারও চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকলো রোজাকে।
রোজার চোখে খুশির অশ্রু। মানুষটা এত্তো খুশি হয়েছে? সে ভাবতেই পারেনি জাবির এতো খুশি হবে। সে উল্টো কতো কি ভাবলো, ধূর!

শুভ্রতা কড়িডরের এক কোনে দাঁড়িয়ে জাবির আর রোজাকে যেতে দেখেছে। ওদের এভাবে দেখে সে নিজেই লজ্জায় রাঙা হয়ে গিয়েছে। লজ্জার মধ্যেই তার একটা হাত তার উদর ছুলো আনমনে। নিজের অজান্তেই একটা কথা মনে আসলো, তারও যদি একটা বাবু হতো!
সৎবিৎ ফিরলো শুভ্রতার। চমকে উঠলো সে। হাত উদরের উপর রাখা হাতটা ঝাড়তে থাকলো অনবরত। কিসব ভাবছে সে। বাবু আর তার? বিয়েই মানে না, আবার বাচ্চা? তার আবার মনে পড়লো, তাদের যদি একটা বাবু হতো তাহলে তো কেউ আর বিয়েটা না মেনে থাকতে পাড়তো না তাইনা?
উফফ, কি সব আজগুবি কথা বার্তা! আজ কি তার মাথাটা গেলো খুশীতে? সে এসব ভাবছে তার মেহরাদ শুনলে… শুনলে কি ভাববে! সে তো লজ্জায়ই ম’রে যাবে। আল্লাহ, এসব আর আমার মাথায় দিও না। কখন আবার মেহরাদ ভাইয়ের সামনে মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়! তওবা, তওবা! ভুলেও এই ভুল করা যাবে না শুভ্রতা। এই লোক যে…..
নাক মুখ কুচকে কুছু বলবে তার আগেই দেখলো সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছে মেহরাদ। এক হাতে গলার টাই লুজ করছে আরেক হাতে অফিস ব্যাগ আর কি যেনো…

চোখ দুটো তীক্ষ্ণ হলো শুভ্রতার। গিফটে মুড়ানো ব্যাগ। এটা আবার কার? উমমম,কার জন্য এনেছে?
নিজের রুমের দরজার পর্দার আড়ালে চলে গেল শুভ্রতা। মেহরাদ ভাই এদিকে তাকিয়েছে এক পলক তাই সে লুকিয়েছে। কিন্তু এরকমটা কেন করলো সে নিজেও বুঝলো না।
আড়াল থেকে মাথা উঁকি দিয়ে বের করে দেখলো মেহরাদ ভাই চলে গিয়েছে রুমে। পর্দার আড়াল থেকে বের হয়ে হাটি হাটি পা পা করে মেহরাদের রুমের দিকে গেল শুভ্রতা। তাকে দেখতে হবে না এটা কি এবং কার জন্য এনেছে তার মেহরাদ ভাই???

মেহরাদের দরজার সামনে দাড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি মারলো প্রথম শুভ্রতা। বিছানার উপরেই রাখা ব্যাগটা। মেহরাদ কে কোথাও নজড়ে পড়ল না। সে একছুটে ব্যগটা হাতে নিয়ে নিলো। ব্যাগ হাতড়ে বের করলো একটা জুয়েলারি বাক্স।
ভ্রু কুচকালো শুভ্রতা। খুলবে কি খুলবে না, দোনোমোনো করেও খুলে ফেললো আর খুলেই দিলো এক চিৎকার। না না ভয় টয় পেয়ে দেইনি। জুয়েলারির সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে দিয়েছে এই চিৎকার। এক জোড়া ছোট ছোট স্টোন খচিত স্বর্নের দুল মেইবি। এত্তো কিউট!
দ্রুত গতিতে ওয়াশরুম থেকে দরজা খুলে বের হলো মেহরাদ। নিজের দিকে খেয়াল নেই তার। দরজা খুলার শব্দে শুভ্রতা পিছু ঘুরলো হাতের বক্সটা নিয়েই আর সামনে যা দেখলো তা দেখে পূর্বের চেয়েও দ্বিগুণ জোরে চেচিয়ে উঠলো। সেই সাথে হাতের সুন্দর ইয়ার রিংসের বক্স খানা ফ্লোরে।
একে একে দুই বার এরকম চিৎকারে মেহরাদ হতমম্ব। হলো টা কি! সে এগিয়ে গেল শুভ্রতার দিকে। ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে? চেচাচ্ছিস কেন?”
মেহরাদ কে কাছে এসে দাড়াতে দেখে শুভ্রতা তড়িৎ ঘুরে গেলো। চোখ খিচে নিলো সাথে সাথেই।
মেহরাদ আবার ঘুরে ওর সামনে গেল। কপালে ভাজ ফেলে বললো,
“কি হচ্ছে? এভনরমালদের মতো বিহেভ করছিস কেন? চোখ খুল বলছি?”
শুভ্রতা মাথা দু’দিকে নাড়িয়ে না বুঝালো। মেহরাদ এবার বিরক্ত হলো।
“বলবি তো হয়েছে টা কি? একবার চেচালি এখন আবার চোখ খিচে সাইলেন্ট মুডে চলে গিয়েছিস। ব্যাপার টা কি??”
“আল্লহ… মেহরাদ ভাই, শার্টের বাটান গুলো লাগান দয়া করে। ”
ভ্রু কুচকে নিজের দিকে নজর দিলো মেহরাদ। বিপদ সীমার কিছুটা উপরে প্যান্ট, বেল্টটা একটু আগেই খুলেছে সে। আর শার্টের বাটান গুলো পুরো পুরি বাধঁন ছাড়া। ব্যাস! এতটুকুই! এতেই এই মেয়ে এমন ডং ধরেছে! পুরোটা….
মনের কথা আর মনে রাখলো না মেহরাদ। স্বগতোক্ত স্বরে বললো,

“এটুকুতে এমন করছিস? সিরিয়াসলি? উইদাউট ড্রেস দেখলে কি করবি?”
চোখ খিচে রেখেই বড় নিশ্বাস টেনে শুভ্রতা জপতে থাকলো,
“আস্তাগফিরুল্লাহ। আস্তাগফিরুল্লাহ… ”
মেহরাদ বাধঁন হারা শার্টটা এক টানে খুলে ছুড়ে ফেললো অজানায়। শুভ্রতার চোয়াল ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আদেশ ছুড়লো,
“তাকা…”
“তাকা বলছি…”
শুভ্রতা দু পাশে মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো, অর্থাৎ সে তাকাবে না। মেহরাদের কন্ঠে গম্ভীরতা বাড়লো। আবারও আদেশ দিলো,
“তাকা বলছি।এবং এক্ষুনি…”
শুভ্রতা খিচে রাখা চোখ জোড়া খুললো ধিরে ধিরে। মেহরাদের গম্ভীর মুখ খানার দিকে তাকালো স্বভয়ে। চেহারা লাজে রাঙা হয়ে আছে মেয়েটার। মেহরাদের সেদিকে খেয়াল নেই। সে মুখটা রাগী রাগী করে বললো,

“কি বললি তখন?”
“কি?”
“এইমাত্র বললি যে..”
“আস্তাগফিরুল্লাহ?”
“কেন বললি?”
“আপনি..আপনি.. অর্ধউন্মক্ত হয়ে আছেন। ” লজ্জালু কন্ঠে বললো শুভ্রতা।
“তাই বলে আস্তাগফিরুল্লাহ বলবি?”
“তো কি বলবো?”
“এতো জিম টিম করে বডি বানাই, দেখবি, ছুবি,টাস্কি খাবি আর মাশা-আল্লাহ মাশা-আল্লাহ আওড়াবি। আস্তাগফিরুল্লাহ কি?”
শুভ্রতা ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো। এই মূহুর্তে ঠিক কি বলা উচিৎ তার জানা নেই। তার কিছু বলার অপেক্ষাও করলো না মেহরাদ। নিজেই আবারও ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠলো,

“কি?”
“কি?”
“দেখ..”
“কি দেখবো? ”
“এই যে..”
“কি যে..”
“আচ্ছা তোকে দেখতে হবে না। আমিই তোকে দেখবো আর বলবো। ”
“কি দেখবেন?”
“তোকে!”
“দেখেন..”
“এভাবে না।”
“তো কিভাবে…”
“এই যে আমার মতন করে..” নিজের অর্ধউন্মক্ত দেহটার দিকে ইশারা করে বললো মেহরাদ।
শুভ্রতা চোখ গুলো বড় বড় করে বললো,

“আপনি সেরা নির্লজ্জের এওয়ার্ড পাবেন মেহরাদ ভাই। ”
“পেলে পেলাম! তাতে কি?”
“সাথে বেহায়রও। ”
“আচ্ছা।”
“সাথে সেরা ঘাড় ত্যাড়ামোড়ও। ”
“এটাও আচ্ছা। ”
“ধূর!”
“এটাও আচ্ছা। ”
“আল্লাহ, আপনি আমায় পাগল করে দিবেন মেহরাদ ভাই। ”
“হুম,আমিও সেটাই চাচ্ছি।”

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৯

মনে মনে তওবা কাটলো শুভ্রতা এ লোকের সাথে সে পাড়বে না। ছুটে রুম থেকে বের হয়ে গেল। তার কান গাল দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। লাজে রাঙা রক্তিম কপোল জোড়া দুহাতের আজলায় ভরে বিরবির করতে করতে রুমে ঢুকে গেল শুভ্রতা। এ লোকটা দিন দিন সব কিছুর লিমিট ছাড়াচ্ছে। আর কি কি যে দেখতে হবে….

হৃৎস্পন্দন পর্ব ২১