হৃৎস্পন্দন পর্ব ২২
সাঞ্জেনা শাজ
তপ্ত দুপরের গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার শুভ্রতা আর সোহানা৷ ক্লাস শেষ হয়েছে সবে মাত্র। মাঝখানে গ্যাপ ছিলো তারপর আবার দুটোর দিকে শুরু হয়েছে ক্লাস। এখন শেষ হয়েছে দুটো চল্লিশে। ক্লাস শেষ হতেই দুজন ক্লাস রুম থেকে বেড়িয়ে এসেছে। তাদের পিছু পিছু এসেছে সামান্তা, আশিক তাদেরইই ক্লাসমেট। অনেকটা ক্লোজ ফ্রেন্ডই দু’জনার।
সামান্তা, আশিক কাজিন। একিই বাড়িতে বসবাস দু’জনের। আসা যাওয়াও এক সাথে। তবে,বনি বনা কম। খুউউব কম। এদের কথা কম ঝগড়া হয় বেশি। এই যেমন ঝগড়া করতে করতেই বেড়িয়ে ক্লাস থেকে আসলো,
“এই তুই গেলি আমার সামনে থেকে? তোর সাথে যাবো না আজ আমি। হাতি একটা! ” আশিককে রেগে বললো সামান্তা। ক্লাস শেষ হতেই তাকে ফেলে চলে যাওয়া নিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। অথচ,সে নিজেও যেতে চায় না। শুধু তাদের পরিবারের জন্য!নয়তো এই সয়তানটার সাথে কে যায়???
“তোকে নিলে তো যাবি। তোর জন্য প্রতিদিন আমার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া হয় না। তোকে বাড়ি থেকে আনা নেওয়ার ডিউটি নিয়েছি আমি? আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে, আপদ একটা।” আশিকও বললো বিরক্ত ভঙ্গিতে।
সোহানা ওদের গলা শুনে পিছু ফিরে তাকালো। বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো,
“সে-ইই তো প্রতিদিন একসাথে যাস,কোন দুঃখে প্রতিদিন যুদ্ধ লাগিস বলতে পাড়বি??”
“এটাকে নিতে চায় কে?”
“তোর সাথে যেতে চায় কে?”
“যাস কেন? আমার বাইকে তোকে আর নিবো না৷ ”
“না নিলে নাই!”
এক কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সামান্তাকে রেখেই গেইটের দিকে হাটা দিলো আশিক। তার এসব ভাব গুনায় ধরার টাইম নেই। বেয়াদব একটা। তাকে হাতি বলে! গুনে গুনে এক বছর ছ’মাশ তেইশ দিনের বড় সে। আর এটার কোন রেসপেক্ট নেই! মানছে ক্লাসমেট ভাগ্যক্রমে, তাই বলে এসব বলবে বড় কাজিনকে?
সামান্তা ফুসফুস করলো কিছুক্ষন। এই বদ টাকে সে একদম দেখতে পারেনা। আবার এটার সাথেই আসতে যেতে হয়। অসহ্য!
সোহানা,শুভ্রতা ওকে টেনেই গেইটের দিকে হাটা দিলো। তারা জানে আশিক ডোন্ট ক্যায়ার ভাব দেখিয়ে গেলেও বাইকে ঠিকিই অপেক্ষা করবে ওর জন্য। এখন না গেলে আরও রেগে যাবে। ছেলেটার এত্তো রাগ! যখন তখন চিল্লা ফাল্লা শুরু করে দেয়।
তারা যেতে যেতে শুভ্রতা শুধালো ,
“সেই তো এক সাথে থাকিস,আসা যাওয়া করিস। চুলা চুলি কেন করিস দুটোই বলতো?”
“এই হাতিটাকে ভালো লাগে না আমার। দোয়া কর এইচ এস সি টা শেষ হলে দুজন যেন ভুলেও এক ভার্সিটিতে না পরি। আমি এখন থেকেই এ দোয়া করছি, বিশ্বাস কর!”
“তুই জানিস ওকে হাতি বললে রেগে যায়, তাও কেন বলিস বলতো? ও বয়সের তুলনায় একটু বলিষ্ঠ দেহের। বরংচ, জিম টিম করে বানায় এ দেহ ছেলেরা। আর তুই অপমান করে হাতি বলিস। রাগবে না? মগী কোথাকার! ” সোহানা বললো।
“বাদ দে ওর জিম। আমার থেকে এক বছরের বড় শুধু আর ভাব ধরে পঞ্চাশ বছরের বড়। এই কারণেই আরও ভালো লাগে না। ”
ওর কথায় হতাশার শ্বাস ছাড়লো দু’জন দুটোই এক। কাউকেই বুঝানো যায় না। অবশ্য এরা নিজেরা নিজেরাই ঠিক হয়ে যায় আবার। তাই এতো ভাববার কিছু নেই৷
তারা এগিয়ে গিয়ে দেখলো ‘আশিক সাদেক’ বাইকে বসে আছে। কলেজে হাতে গুনা দু চার জন ছেলে বাইক চালায় এর মধ্যে ‘আশিক সাদেক’ একজন। বাইক নিয়ে রঙ্গ মঙ্গচের শেষ নেই।
সামান্তা প্রথমেই গেল না সেদিকে। মিনিট পাচেক ব্যয় করলো, ওর সাথে শুভ্রতা সোহানাও দাড়িয়ে রইলো। তারপর এগুলো বাইকের দিকে। আশিক তাকিয়ে অন্যদিকে। বাইকের পিছনে একজন মানবীর উঠে বসার অস্তিত্ব অনুভব করলো। তবে,পিছু ঘুরে তাকালো না। প্রয়োজনও মনে করলো না। শুধু ঘার ঘুরিয়ে বাইকের মিররে নজর দিলো সাথে সাথেই চোখাচোখি হলো সামান্তার সাথে। বাকা হাসলো সে। নজড়েই বলে দিচ্ছে, “আসলি তো সেই আমার কাছেই!”
সামান্তা দাত কটমটালো, চোখ পাকিয়ে দু কাধে নখ দ্বারা জখম করে দিলো। বাকা হাসির মুখটা তৎক্ষনাৎ শক্ত হয়ে গেলো। দাতে দাত চেপে বললো,
“বাইক থেকে ফেকে দেই?”
“ফেলে দেখা! বড় বাবাকে বলে তোর হাড্ডি পাছলি এক করাবো। ”
” কিসব আজাইরা ভয় দেখাচ্ছে। তোকে যদি না দিয়েছি….! দেখিস। ”
“আচ্ছা দেখবো।” মুখ বাকিয়ে বলো সামান্তা।
বাইক স্টার্ট দিলো আশিক। তুমুল বেগে চালিয়ে গেল সাড়া রাস্তা, সামান্তা দাতে দাত খিটে রইলো। সে জানে তাকে ভয় দেখানোর জন্য এরকম করছে আশিক। তাই সেও চুপটি করে দাত খিটে রইলো। হুহ্, তাকে ভয় দেখাবে!
সামান্তা আর আশিককে চোখের আড়াল হতে দেখে নিজেদের রাস্তার দিকে তাকালো ওরা। তাদের গাড়ি কই? ড্রাইভার আংকেল কে দেখছে না কেন? কোথাও গিয়েছে বোধহয়! তারা একটু এদিক সেদিক তাকিয়ে ভিতরের দিকে গিয়ে বসবে তার আগেই একটি গাড়ি এসে থামলো তাদের সামনে। ভ্রু কুচকালো দু’জন।
গাড়ি থেকে বের হওয়া ব্যাক্তিকে দেখে কুচকানো ভ্রু জোরা আরও কুচকালো সোহানার। শুভ্রতার দিকে তাকালো সে, শুভ্রতা অনুভূতিহীন তাকিয়ে আছে। কি প্রতিক্রিয়া দিবে সে বুঝতে পারছে না। সেদিনকার ঐ ওক-ওয়ার্ড মোমেন্টের পর এনাদের সামনে দাড়ানো অনেকটাই বিভ্রিতিকর তার জন্য। কিন্তু দাড়াতে তো হবেই!
রায়হান গাড়ির দরজাটা আটকে এগিয়ে আসলো শুভ্রতার দিকে। ওর সামনে দাড়িয়ে চোখে সানগ্লাসটা খুলে বললো,
“কি ব্যাপার শুভ্রতা? কথা বলা যাবে তো তোমার সাথে? নাকি কাজিন হিসেবে সে রাইটও নেই? ”
শুভ্রতা বেশ লজ্জায় পড়লো। বড় ভাই হয় তার। সম্পর্ক ততটা মাখোঁ মাখোঁ না হলেও গুরুজন তো!সে তাও ওসবে গেলনা। বরং রায়হানের প্রশ্ন ডিঙিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“মা কেমন আছে ভাইয়া? মা’য়ের রাগ কি কিছুটা কমেছে ভাইয়া?”
“রাগ পরার মতো কিছু করেছো তুমি? আমি ভেবেছিলাম তুমি যাবে ফুপিকে দেখতে। বাট…..”
শুভ্রতার খুব খারাপ লাগলো। সে কিভাবে যেতো? কেউ যদি কিছু মনে করতো? সে ভেবে রেখেছে বাবা আসলে বাবার সাথে যাবে মা’য়ের কাছে। তখন কেউ আর কিছু ভাবতে পাড়বে না৷ সে মিনমিনিয়ে বললো
“যেতাম ভাইয়া। ”
“হুম, জানি। ফুপির শরীরটা তেমন একটা ভালো না। জেদ ধরে খাওয়া দাওয়া’ও ঠিক মতো করছে না। তোমার কলেজের সামনে দিয়ে যাচ্ছি ভাবলাম জানিয়ে যাই। এই আরকি! ”
শুভ্রতা মূহুর্তেই অস্থির হয়ে গেল। যতই হোক মা তোহ! সে উদ্বীগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে মা’য়ের? বেশি শরীর খারাপ?”
রায়হান শুভ্রতার চেহারার উদ্বীগ্নতা দেখে মনে মনে বাকা হাসলো। তার ফুপি ‘রিমা খান ‘ অসুস্থ কিছুটা। কিন্তু ততটাও না। কিন্তু জেদ ধরে আছে, স্বাভাবিক! খান বংশের মেয়ে বলে কথা! রাগ জেদ সবিই ষোলো আনায় ভরপুর। আর তার বাবা তো বাবাই! তালুকদারদের চৌদ্দ গোষ্টি উদ্ধার করছে দিন রাত দাতে দাত চেপে। সে অবশ্য রেহাই দিচ্ছে না। এই তালুকদাররা বেশ বার বেড়েছে। তার ফুপির জন্য কিচ্ছু বলা হয় না। কিন্তু এখন? এখন তো সব এলোমেলো, একটা ঝটকা লাগানোই যায়! আর এর শুরু এই বোকা মেয়েটাকে দিয়েই করাবে সে। মেয়েটা তার পছন্দের ছিলো, কিন্তু!কিন্তু…..তালুকদারদের মতোই হেট লিস্টে চলে গেল। আফসোস! আফসোস! আর….আফসোস!
সোহানা ভ্রু গুটিয়ে তাকিয়ে আছে রায়হানের দিকে। ভদ্রলোকটাকে তার ভালো লাগে না এখন। সেদিন তার ভাইকে পুলিশে দিবে বলেছিলো। কত্তো সাহস! এরপর থেকেই তার চোখের বালি হয়েছে এ লোক। সে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে শুভ্রতার সাথে মিলে দাঁড়িয়ে বললো,
“আমরা সকলে মিলে যাবো ছোট মা’য়ের কাছে। ছোমা’কে আমরাও ভালোবাসি। টেনশন হয় ওনার জন্য আমাদেরও। এভাবে বলার কিছু নেই। ”
“হ্যাঁ, সে-তো দেখলামইই তোমাদের খোজ খবর নেওয়া।”
“আমরা সকলেই ছোট মা’য়ের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু,ছোট মা’ই কারো ফোন ধরেনি। ”
“খান বাড়িটা নিশ্চয়ই খুব দূরে না! এই তো ঘন্টা খানিকের রাস্তা। ”
সোহানা এ যাত্রায় চুপ করে গেলো ভোতা মুখে৷ এই লোক সব কথা আগে থেকেই রেডি করে এসেছে বোধহয়। কেমন টপাটপ বলে যাচ্ছে সব!
রায়হান ঘড়িতে সময় দেখলো। নিজেকে ব্যাস্ততার চরমে নিয়ে গিয়ে বললো,
“বাসায় যাবো, ফ্রেশ হয়ে দেন আবার মিটিং আছে একটা ছেলেদের সাথে। আমি আসছি।”
শুভ্রতা আমতা আমতা করলো। তা-ও ডাকলো রায়হানকে,
“ভাইয়া…..?”
“হ্যাঁ, কিছু বলবে? ”
“মা’য়ের শরীরটা কি বেশিই খারাপ? ”
“তেমনি বলা যায় অনেকটা। ”
শুভ্রতা অসহায় চোখে তাকালো সোহানার দিকে। তার মনটা কেমন যেন করছে। সে সোহানাকে আস্তে করে বললো,
“তুই নয়তো ড্রাইভার আংকেলের সাথে চলে যা। আমি ভাইয়ার সাথে গিয়ে মা’কে দেখে আসি। ভাইয়া আপনি।আবার আসার সময় আমায় আমাদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়েন হে?”
রায়হান মনে মনে পৈশাচিক ভাবে হাসলো। সে এটাই চেয়েছে। কিন্তু সোহানা মানলো না। সে বললো,
“তোর একা যেতে হবে না। সন্ধ্যায় আমরা সকলে এক সাথেই যাবো ছোট মা’য়ের কাছে। এখন চল বাসায় যাই।”
রায়হান বিরক্ত হলো সোহানার উপর। মেয়েটা তো বাগরা দেওয়ার কারিগর! সে তবুও রয়ে সয়ে বললো,
“শুভ্রতা যেহেতু ও ফুপি কে এখন দেখতে যেতে চাচ্ছে ও না-হয় যাক। তোমরা সন্ধ্যায় গেলে ওকে সাথে করে নিয়ে এসো। বা আমিও দিয়ে যেতে পারবো। আমরা খান’রা কথা রাখতে জানি। ওয়াদা দিয়ে ভঙ্গ করা আমাদের ধাচে নেই। ”
শুভ্রতা দু’টানায় পড়লো বেশ। কি করবে বুঝতে পাড়ছে না। এভাবে কাউকে না বলে গেলেও, বিশেষ করে মেহরাদ ভাইকে না বলে গেলে খুব রেগে যেতে পারে! তাই সে-ও চুপ করে রইলো কিয়ৎক্ষন।
“আচ্ছা, দেখো তোমার যা ভালো মনে হয়। আমার লেট হচ্ছে। ফুপিকেও গিয়ে দেখতে হবে কি হাল অবস্থা…..”
শুভ্রতার আবারও মা’য়ের জন্য মন নরম হয়ে এলো। ভিতরটা কেমন মুচড়ে উঠলো। সেদিন সকলের সামনে মা’কে অবজ্ঞা করেছে। আজও মা’য়ের অসুস্থতার কথা শুনে না গেলে সেই বা পাষানদের থেকে ভালো হলো কীভাবে? আগে যাক,পরে না-হয় মেহরাদ ভাইকে বুঝিয়ে বলে দেখবে!
সে দোনোমোনো করেই সোহানা থেকে বিদায় নিয়ে আল্লাহর নাম জপতে জপতে রায়হানের সাথে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলো। সোহানাকে বললো, বড় মা মেঝো মা’কে বলে সন্ধ্যায় তারা’ও যেতে। তখন সে চলে আসবে। মেহরাদ ভাইকেও এখন কিছু জানাতে না করে দিলো।
হৃৎস্পন্দন পর্ব ২১
শুভ্রতাদের গাড়ি চলে গেল চোখের সামনে দিয়ে। সোহানার কেন যেন এটা একটুও ভালো লাগলো না। এর মাঝে আবার কি কি হয় কে জানে! সে ঘার ঘুরিয়ে দেখলো তাদের গাড়িটা আসছে। তাদের ড্রাইভার আংকেল আসতেই সেও গাড়িতে উঠে বসলো। তাকে একা দেখে ড্রাইভার আংকেল শুভ্রতার কথা জিজ্ঞেস করলে সে একে একে সব কিছু বলে বাড়ির উদ্দেশ্যে গাড়ি চালাতে বললো। তার মনটা কেমন যেন করছে। কে জানে কেন এমন লাগছে!!
