Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮
সাঞ্জেনা শাজ

শুভ্রতার ঘুম ভাঙ্গলো খুউব ভোরে। সে উঠে দেখলো, ভোরের আলো ফোটেনি এখনো ভালো করে। আজ এতো তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেলো? রাতে তো গাড়িতেই ঘুমিয়ে গিয়েছো। তারপর? তারপর আর মনে নেই।
শুভ্রতা উঠে আগে নামাজের সময়টা দেখে নিলো। ফ্রেশ হয়ে একেবারে ওজু করে বের হলো। সালাত আদায় করতে করতে বাহিরে নতুন ভোরের সূচনা হলো। বারান্দায় গিয়ে চোখ বুজে শ্বাস টানলো। তার মনটা নিমিষেই ফুরফুরে হয়ে গেল। সকালের স্নিগ্ধ এ বাতাসটা! ইশশস, এটাকে বন্ধি করে রাখা যেতো!
বলা হয়, সকালে মুনাফিকের নিশ্বাসের গন্ধ থাকে না, তাই সকালের বাতাস এতটা স্নিগ্ধ হয়৷ এবং এটাই যথার্থ, সত্য।

ফুরফুরে মন নিয়ে শুভ্রতা দরজা খুলে বাহিরে উঁকি দিলো একবার। একদম করিডর বরাবর শেষ মাথার রুমটার দরজা এখনো বন্ধ। ভেজানো কি?না-কি লক করা? এতো এতো কথা বার্তার নিচে আসল খবরই জানা হয়নি। সকালে রওনা দিবে বলেছে, কিন্তু ক’টা বাজে সেটা তো বললো না! পরে সে তখন লেট করলে তাকে ধমমে ধামকে রাখবে না। এই দোষ এখন কার? তার? উঁহু, এটা ওনার। ঐ লোকটার।
শুভ্রতা রুম ছেড়ে বের হয়ে করিডর বেয়ে সামনে এগোতে এগোতে দেখলো, নিচে কিচেনে টুংটাং শিব্দ পাওয়া যাচ্ছে। উঁকি দিয়ে দেখলো, বড় মা মেজো কি যেন বলছে। হাত চালাচ্ছে কাজে। আজ এতো তাড়াতাড়ি কেন? সে বুঝলো না।

আবারও ঘুরে মেহরাদের রুমের সামনে গিয়ে দরজার নব ঘুরালো দেখলো খোলাই। সে যেন হাফ ছেড়ে বাচলো।
ভিতরে ঢুকে দেখলো, সমস্ত রুম অন্ধকারে তলিয়ে। বিছানার পাশে গিয়ে দাড়ালো সে। মেহরাদ ঘুমিয়ে আছে উবু হয়ে। গা উন্মুক্ত। ভি শেপ বডি দৃশ্যমান, যদিও অন্ধকারে তা আবছা ভাবে বুঝা যাচ্ছে।
শুভ্রতা মিটিমিটি পায়ে এগিয়ে গেলো। ডাকবে কি ডাকবে না ভাবতে আঙুল দিয়ে মেহরাদের উন্মুক্ত পিঠে গুতো দিলো। মেহিরাদের ভাবান্তর নেই। শুভ্রতা একি কাজ আবারও করলো। এবারও প্রতিউত্তর নেই।
শুভ্রতা এবার মুখটা এগিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে ডাকলো,
“এই যে শুনছেন? ক’টা বাজে যাবো আমরা? কখন রেডি হবো?”
মেহরাদের কানে বাজলো ফিসফিসানোটা। ঘুমো ঘুমো অবস্থাতেই এপাশ ঘার ঘুরিয়ে শুভ্রতাকে দেখলো নিজের খুব সন্নিকটে। সাদা বড় হিজাবে গা ডাকা। শুভ্র শুস্রী মুখশ্রীতে স্নিগ্ধতা যেন উপচে পড়ছে। চোখ গুলো এখনো ছোট ছোট করে কুচকে রাখা৷ ঘুমন্ত ভরাট রাশভারী স্বরে বললো,
“হুম? কি হয়েছে? ইজ ইট ড্রিম?”

শুভ্রতা শক্ত ঢোক চাপলো। এ কেমন কন্ঠ স্বর! শুভ্রতার পুরো সত্তা যেন দুলে উঠলো। এতো নেশালো পুরুষালী স্বরও হয়! সে ঢোক চেপেয় আবারও আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো,
“আমরা কখন রওনা দিবো? রেডি হবো কখন? দেরি হলে তো আবার ফেলে রেখেই….. ”
মেহরাদ ওর ঘার চেপে মুখটা আরও কাছে আনলো। একদম মুখোমুখি। চোখ জোড়া এতক্ষণে কিছুটা খুলেছে। তবে চেহারার গাম্ভীর্যতা বিরাজমান। মুখোমুখি করেই বললো,
“এই ভোরে কি আমার ঘুম ভাঙ্গাতে এসেছিস নাকি ধৈর্যের বাদ ভাঙ্গাতে? ”
শুভ্রতার কি যে হলো!সে চুপসে গিয়ে ফ্যালফ্যাল কিরে তাকিয়ে রইলো। মেহরাদ হেঁচকা টানে নিজের সাথে মিশালো মেয়েটাকে৷ শুভ্রতা স্তম্ভিত। খুব কাছ থেকে পুরুষালী ঘ্রান নাসারন্ধ্রে ধাক্কা দিচ্ছে। মেহরাদের বুকের নিচে তার অবস্থান বর্তমানে। মেহরাদ ওকে আগলে বাহু জড়িয়ে। একহাত কোমরে চেওএ ধরা আলগাভাবে।
শুভ্রতার গালে নাক ঘষে ঘোলাটে স্বরে বললো,
“দশ মিনিট থাক, তারপর উঠে যাবো। ন’টায় রওনা দিবো। ওকে?”

দশ মিনিটের নাম করে আধাঘন্টা আটকে ছিলো শুভ্রতা মানুষ্টার সাথে। এইমাত্র ছাড়া পেয়ে বের হয়ে দেখলো সোহানার রুমের দরজা খোলা। ও রুমে নেই। পরপর শান্তার রুমের দিকে তাকিয়ে দেখলো সেখানে কথার আওয়াজ আসছে। শুভ্রতা রুমে ঢুকে দেখলো দু’বোন গলাগলি হয়ে শুয়ে আছে। সোহানার মুখে ব্যাথার ছাপ। কোকাচ্ছে।
শুভ্রতা হকচকিয়ে এগিয়ে গেলো। ব্যাতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এই সোহানা, কি হয়েছে? তুই এখানে কেন? রেডি হবি না?”
“আরেহ বইন কি বলিস? কিভাবে রেডি হবো? আমাদের তো শরীর ভালো না।”
“আমাদের মানে? শান্তা আপুর কি হয়েছে? কি হলো হটাৎ? ”
সোহানা শোয়া থেকে লাফ দিয়ে উঠলো। বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ বের করে শুভ্রতার মাথায় চাটি মেরে বললো,
“গতকালের প্ল্যান ভুলে গিয়েছিস,মগী ? ” আবারও ধপ করে বিছানায় শুয়ে পরলো পেট আঁকড়ে। মুখ দিয়ে কোঁকানোর সুর তুললো। এই মেয়ে এতো নাটকি!
কথায় কথায় এগুলো কি বলে?শুভ্রতা চটে গিয়ে গিয়ে বলবে তার আগেই সুরাইয়া বেগম আর জাহানারা বেগম রুনে ঢুকলেন। মেয়েদের দেখে বললেন,

“পেট ব্যাথা কমেনি? ”
“রাত থেকে একটু ভালো। তবে আছে এখনো। ” শান্তা জবাব দিলো আস্তে করে। আহারে, ভাইয়ের জন্য কতো কিছু করতে হচ্ছে!
“রাত থেকে ব্যাথা?” শুভ্রতা অবাক হয়ে বললো।
জাহানারা বেগম সোহানার মাথার পাশে বিসে বললেন,
“তোরা তো বাসায় ছিলি না। রাত থেকেই দু’জনের পেটে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখনো তো যাচ্ছে না। মেয়ে দুটো তো এমন হলে যেতে পারবে না। ”
“নাহ বড় মা। কিভাবে যাবো?আমরা তো এ অবস্থায় যেতে পারবো না। শুভ্রতা আর ভাইয়া’ই যাক এখন। ” সোহানা বললো রয়ে সয়ে কুকিয়ে কাকিয়ে। সে তো মনে মনে এ প্রশ্নের জন্যই বসে ছিলো ।
“তোরা না গেলে শুভ্রতাকে একা নিয়ে যাবে? তোর বড় বাবা আবার কি বলে কে জানে!” চিন্তিত হয়ে বললেন তিনি।
“নিবে না কেন ভাবি? মেয়েটা কতো আশায় আছে। সবিই তো ভাগ্য বুঝো না! ওঁদের জন্য ও যাবে না কেন?”
শুভ্রতা নিরব দর্শক হয়ে সব দেখছে, শুনছে। সোহানা কেমন মুখ লুকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। কি ধরিভাজ মেয়েরে বাবা!

“বড় মা। ওরাই যাক এবার বুঝলে? আমরা না-হয় দু বোন সুস্থ হলে অন্য কোথাও যাবো। নানু বাড়িতেই না-হয় যাবো! কতদিন যাওয়া হিয় না।”
সুরাইয়া বেগম মেয়ের চাল বুঝলেন না। আবেগে আপ্লুত হলেন। মেয়ে দুটোকে বলেও পাঠানো যায় না ও বাড়ি। এখন যাবে বলছে, এই তো অনেক! তিনি সাথেই সাথেই বড় জা কে এটা সেটা বুঝ দিয়ে দিলেন। সাথে শুভ্রতাকে নাস্তা সেড়ে রেডি হতে যেতে বলে বেরিয়ে গেলেন রুম ছেড়ে।
ওনারা যেতেই শুভ্রতা সোহানার মাথায় চটকানা মারলো একটা। চোখ পাকিয়ে বললো,
“তখন মারলি কেন? ভালো ভাবে বলা যায় না?”
শান্তা থামালো দুটো কে। শুভ্রতাকে বললো,
“ওর কথা ছাড়, এদিকে সব ম্যানেজ। তুই গিয়ে রেডি হ। আর শুন, গিয়ে সুন্দর সুন্দর পিক তুলবি বুঝলি? কাপাল পিক।” শেষেরটা সোহানা চেচিয়ে বললো। বলেই চোখ টিপ মারলো।
শুভ্রতা লজ্জা নিয়েও হেসে ফেলে। নেচে কুদে বায় বায় বলে চলে যায় নিজের রুমে। আগে নাস্তা করে আসবে নাকি নাস্তা করে রেডি হবে? চিন্তিত বেচারি। শাওয়ার ও তো নিতে হবে!

আলতাফ তালুকদার ড্রয়িং রুমে বসে। হাতে খবরের কাগজ। আজ অফিস যাবে তাড়াতাড়ি, যেহেতু মেহরাদ যাবে না তাই। ছেলেটা থাকলে মাথায় তেমন চিন্তাই থাকে না। ছেলেরাই বুঝি বাবার সাহারা!
মেহরাদ শাওয়ার নিয়ে নিচে নেমেছে একেবারে। ওঁকে দেখে জাহানারা বেগম কিচেন থেকে বললেন,
“মেহরাদ, সব গুছানো হয়েছে? মা হেল্প করবো?”
“উঁহু। লাগিবে না মা। সব করে নিয়েছি আমি। ”
“হ্যাঁ তা তো করবেই! শুধু একা যাচ্ছে মেয়েটা। সাবধানে রাখবে তো?” ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন আলিতাফ তালুকদার।
মেহরাদ বসলো না সোফায় গিয়ে। তার কাজ আছে বাইরে। রাতের শপিং ব্যাগ গুলো গাড়িতেই রয়ে গিয়েছে। সেগুলো আনতে যাবে। তবে বাবাকে জবাব দিলো,
“একা কোথায়? আমি নেই? সাবধানেই রাখবো।”
“তুমিই তো সমস্যাটা। তোমার থেকেও সাবধানে রাখবে।”
সাত সকাল বেলা বাবার খুঁচোতে মেহরাদ চেয়ে রইলো শুধু। আর কথা বাড়ালো না। চলে গেল বাড়ির বাইরে। এ বাবা নাকি শত্রু!

হাতে থাকা শপিং ব্যাগ নিয়ে শুভ্রতার রুমের দরজার সামনে স্থীর দাঁড়িয়ে আছে নেহরাদ। পা দুটো ফ্লোরে শক্ত ভাবে আটকানো।
এদিকে সকাল সকাল শাওয়ার নিয়ে খুশ মেজাজি শুভ্রতা, টাওয়াল গায়েই হুটোপুটি শুরু করলো। তারা চট্টগ্রাম যাবে একটু পর । সে খুশিতে আকাশে উড়ছে, রুমে নাচছে। একেবারে রেডি হয়েই নাস্তা সাড়বে সে চিন্তা করেছে সে। আবারও না ও করতে পারে৷
এদিকে মেহরাদ এসেছে রাতের গাড়িতে থাকা ড্রেস নিয়ে। শুভ্রতাকে কোলে করে নিয়ে আসায়, এগুলো আর আনা হয় নি রাতে । দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখে…….এই দৃশ্য। সে স্থীর হয়েই দাঁড়িয়ে রইলো।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৭ (২)

শুভ্রতা দরজা খোলার শব্দ পায়নি। কে-ই বা আসবে এখন! সে চিন্তা সে মাথাতেই আনে নি। ঘুরতে ঘুরতে মেহরাদকে দেখে চোখের ভুল ভাবলো। আবারও ঘুরে দেখে মুখের হাদি নিভে গিয়ে এক চিৎকার করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো আবার। আর্তনাদ করে উঠলো সেখান থেকেই । সে মুখ কিভাবে দেখাবে এবার?
মেহরাদ হাতের ব্যাগ রেখেই জায়গা ত্যাগ করলো। হুশ ফিরেছে বোধহয়। এ মেয়ে কি তার মাথা এখনি নষ্ট করে দিবে? নিশ্চিত তার আত্নসংযমের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তা না হলে এতো এতো কূটনীতি কেন? পরিক্ষা কেন…..

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮ (২)