হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫
সাঞ্জেনা শাজ
সময় গড়িয়েছে তিন মাস। এই তিন মাসে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে তালুকদার বাড়ির মানুষের জীবনে। কিছু আপন মানুষের বিয়োগে নতুন মানুষের আগমন ঘটেছে। এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জননী হয়েছে রোজা। নাম রাখা হয়েছে জারাহ। পুরো তালুকদার বাড়ির মানুষের হৃদয়ের কষ্ট লাঘব করতেই বুঝি এ পিচ্চু বাবুনির আগমন!
সকলের ব্যাস্ততা এখন তাকে নিয়ে। জারাহ বড়ো বড়ো করে চোখ পাকিয়ে মামাকে দেখছে। আজ এক সপ্তাহ হবে নতুন একটা চেহারার সাথে পরিচিত হচ্ছে সে। যদিও তার জন্ম মাস খানেকও হয়নি। তবুও সে চিনতে পারছে মামাকে। রোজ নিয়ম করে লোকটা তাকে আদর করছে, কোলে তুলে নিচ্ছে। সদা গম্ভীর মুখ খানায় তাকে কোলে তুলে নিলেই একটু খানি হাসছে ঠোঁট বাকিয়ে।
“রোজা ওঁকে নে। অনেক হয়েছে মামার আদর খাওয়া। মেহরাদ খাবে তো।” নাতনীর দিকে মিছে রাগ দেখিয়ে মেয়েকে বললেন জাহানারা বেগম।
বাদ সাধলো মেহরাদ। খুব সাবধানে জারাহকে ওর মায়ের কাছে দিলো। এতো ছোট বাচ্চা কোলে নিতেও হাত কাপে। তবুও মন মানে না।
“খাবার খাবো না, মা। মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা করছে। আমি উপরে যাচ্ছি।”
জাহানারা বেগম ব্যাতিব্যস্ত হলেন ছেলের জন্য। উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হয়েছে বাবা? শরীর খারাপ লাগছে? আসার পর থেকে ছুটাছুটি করছিস। এতো কিসের ছুটাছুটি তোর? মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে এসেছিস। একটু মা’য়ের কথা মনে পরে না? আমার কষ্ট গুলো বুঝিস না? তোরা ছাড়া কে আছে আমার? ” বলেই তিনি কান্না শুরু করলেন।
মেহরাদ স্বান্তনার বাণী শুনিয়ে থামালো মা’কে। ঔষধ খেলে ঠিক হয়ে যাবে জানালো সে। জাহানারা বেগম তবুও মানলেন না। কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললেন,
“শুভ্রতার পাষানীটার জন্য এতো ছুটাছুটি করছিস তো? যে মেয়েটা তোর কথা ভাবেনি, তার জন্য নিজেকে কেন কষ্ট দিচ্ছিস এভাবে? ও অপেক্ষা করেছে তোর জন্য? ওঁকে ভুলে যা বাবা। আমরা নতুন করে তোর জন্য কাউকে বেছে দিবো। যে তোর যোগ্য হবে।”
রোজা চোখ লুকিয়ে মেয়েকে নিয়ে প্রস্থান করলো বিনা বাক্যে। মেহরাদও প্রতিউত্তর করলো না কোন। বিগত তিন মাস তার কাছে বছরের মতো মনে হচ্ছে। তা না হলে এতো কেন পরিবর্তন তার জীবনে! তার শুভ্রতা তার কাছে নেই এটা মনে উঠলেই তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে আসে। সেই সাথে মনে অদৃশ্য এক রাগ চেপে বসে। ইচ্ছে করে মেয়েটাকে জানে মেরে দিতে।
এই তিন মাসে মেয়েটা একবারও তার খবর নেয়নি, ফোন করেনি, তার কথা ভাবেনি। এই জিনিসগুলো মনে পরলে মেহরাদের ভিতরটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠে। শীরা উপশীরায় রক্ত সঞ্চালন বেগতিক হয়৷
এটাকে খুজে পেলে মেহরাদ গুনে গুনে শুভ্র গাল দুটো চটকিয়ে লাল করবে। এবার আর কোন ক্ষমা নয়। এবার নিজের কাছেই নিজে প্রতিজ্ঞা করেছে মেহরাদ।
গত তিন মাসে সিঙ্গাপুর চিকিৎসাধীন থাকায় এখানে কি কি হয়েছে মেহরাদের তা অজানা। তাকে শুধু জ্ঞান ফেরার পর শুভ্রতার খোজ করতে এতটুকু জানানো হয়েছে শুভ্রতা ভালো আছে। ব্যাস, মেহরাদ স্বস্থিতে ছিলো। কিন্তু দেশে ফিরে কিছু তিক্ত সত্যি জানতে পেরে মেহরাদের নিজের কাছে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়েছে। বিশ্বাস করেনি কারো কথা। গত এক সপ্তাহ ধরে আসার পর থেকে পাগলের মতো খুজছে মেয়েটাকে। চট্টগ্রাম অবদি বাদ রাখে নি। কিন্তু কোথাও হদিস নেই মেয়েটার। রাগে জেদে তার মাথা ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা তার। এই ভালোবাসা? কতো ঠুনকো মানুষের ভালোবাসা, হু? এইরকম ভালোবাসার জবাবদিহিতা চায় মেহরাদ। সে তো এমন ভালো বাসেনি! তার তো এটা পাওনা ছিলো না!
মেহরাদকে জানানো হয়েছে, তার এমন ক্রিটিকাল অবস্থা দেখে ডক্টররা জানিয়েছিলো, মেহরাদ সুস্থ হলেও পুরোপুরি সুস্থ হবে না। প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারে। বা বিরাট কোন ক্ষতি দেহের। একথা শুভ্রতা আর শায়ান তালুকদার জানতেই নাকি তিনি তার মেয়েকে এরকম একটা ছেলের সাথে সংসার করতে দিবে না বলে জানিয়েছে। তার মেয়ের সবে বয়সই কতো? এইতো জীবন শুরু। মেহরাদের সাথে কোন ভবিষ্যত নেই তার মেয়ের। শুভ্রতাও নাকি বাবার কথা মেনে নিয়ে বাড়ি ত্যাগ করে চলে গিয়েছে। কারো বাধা মানেনি।
মেহরাদ এগুলো ভাবতেই সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলো। এগুলো মনে পরলেই মনে হয়, কেউ তার বুকে পাথর ছুড়ে মারছে। ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে অন্তরটাকে। অদৃশ্য রক্তের লহরী বইছে অন্তস্থলে।
বিষের ন্যায় বিষাক্ত ঠেকছে তার দিনগুলো। শুভ্রতা, চাচ্চুর কাছ থেকে এগুলো আশা করা তার জন্য কল্পনাতিত ছিলো। তার বিশ্বাস ছিলো প্রগাঢ়। কিন্তু একে একে সকলের মুখে একিই কথা শুনে সে না মেনে থাকতে পারে নি। তবুও সে বেইমান মেয়েটাকে চায়। তার প্রশ্নের জবাব চায়। ওর ভালোবাসা এতো ঠুনকো কেন এর জবাব চায়। চাচ্চুর কাছে জবাবদিহিতা চায়।
রাজশাহীর ব্যাস্ত নগরীতে গাড়ির ছুটাছুটি রাস্তা জুড়ে। মধ্যবয়সী এক লোক বাস থেকে রিকশায় চড়ে অফিসের জন্য ছুটছে। আজ বড্ড তাড়া বেশি তার। তবুও ক্লান্তি অস্থিরতা তাকে ছুঁতে পারছে না যেন। কর্মঠ দেহটা সবসময় সচ্চোর। আসতে আসতে মেয়েকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে এসেছে অফিস থেকে বিপরীত রাস্তা ধরে। তাইতো এতো দেরি হয়ে যাচ্ছে। তবুও, মেয়েকে নিয়ে নতুন জীবন মানিয়ে নিতে বেশি একটা বেগ পোহাতে হচ্ছে না তার।
রাজশাহীর নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ।
“এই মেয়ে এই! কোথায় মনযোগ দিয়ে রেখেছো? দাড়াও বলছি! দাড়াও!”
স্যারের কর্কশ কন্ঠে দৃষ্টি অনুসরণ করে সকল স্টুডেন্ট পিছনের ব্যাঞ্চের দিকে তাকালো। ট্রান্সফারে আসা নতুন মেয়েটির দিকে দৃষ্টি স্থীর হলো। মেয়েটি মলিন চোখ জোড়ায় ভয় দেখা দিয়েছে। গত দেড় মাসে এতটুকু জেনেছে৷ তাদের ক্লাসের সকল টিচারের থেকে সবচেয়ে বাজে ব্যাবহার শাকিল স্যারের। কোন না কোন ভাবেই অপমান অপদস্ত করা থেকে বিরত হন না সে। সেই থেকেই ভয়টা আরও গাঢ় হলো মেয়েটার।
“কি হলো কথা কানে যাচ্ছে না? দাড়াচ্ছো না কেন মেয়ে? কান ধরে দাড় করিয়ে রাখবো কিন্তু!” আবারও কর্কশ হুশিয়ারি ভেসে আসতে মেয়েটা দু হাতে টেবিলে ভর দিয়ে আশপাশটা একটু দেখলো। প্রয়োজনীয় জিনিসটা না দেখে ভয়টা যেনো আরও বাড়লো। শক্ত এক ঢোক চেপে তবুও দাড়ানোর চেষ্টা করলো খুব কষ্ট করে।
এক পায়ে ভর দিয়ে দাড়াতেই শাকিল স্যার আরও খেকিয়ে উঠলো,
“এ্যাহ্! এমন ত্যাড়াব্যাড়া হয়ে দাড়িয়েছো কেন? সোজা হয়ে দাড়াও! বাহিরে কি দেখছিলে এতক্ষন বলো? তুমি সেই ট্রান্সফার হয়ে আসা মেয়েটা না? লেখা পড়ায় তো কোন মনযোগ নেই। কলেজে আসো কি করতে?”
“সরিহ স্যার। আর হবে না” মেয়েটা মাথা নত করে বললো।
শাকিল স্যার মুখ বিকৃত করলেন বিরক্তিতে। খুবিই রুঢ় ভাষায় বললেন,
“আসো তো বিয়ের পড়া পড়তে। কোন রকমে নামের পাশ করে শশুর বাড়ি গিয়ে হাড়ি পাতিলা মাজবে৷ চুলা গুতাবে। সেই চিন্তাতেই তো থাকো। শুধু শুধু আমাদের স্যারদের সময় শ্রম নষ্ট করো। ”
মেয়েটা মাথা নুয়িয়ে চোখের জল ছেড়ে দিলো। ক্লাসের কিছু কিছু মেয়ে তা দেখে বেশ মজা পেলো এভাবে মেয়েটাকে অপদস্ত হতে দেখে। শাকিল স্যার ছাড়া অন্য টিচারদের থেকে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট পায় ট্রান্সফার হয়ে আসা মেয়েটা। এটা তাদের সহ্য ক্ষমতার বাইরে একদম। মাঝেমধ্যে র্যাগ দিতে চেয়েও পারে না। কিন্তু বোর্ড এক্সামের আগে একবার হলেও দিবে নিজেদের আত্নাকে শান্ত করতে।
“এই মেয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে কাদবে না একদম। কান ধরে দাড়িয়ে থাকো। আমার ক্লাসে অমনোযোগী হওয়ার শাস্তি হারে হারে টের পাবে।”
“স্যার ক্লাস শেষ হতে তো আরও অনেক সময় বাকি। আমি এতক্ষন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবো না। এবারের জন্য ক্ষমা করে দিন, স্যার। আর এমনটা হবে না।”
স্যার শুনলেন না। উল্টো আরও দুটো কথা শুনিয়ে পুরো বাকি আধঘন্টার ক্লাস শেষ করেই বিদায় নিলেন৷
স্যার বের হতে হতে মেয়েটা ধপ করে বেঞ্চে বসে পরলো। দু হাতে মুখ ঢেকে হুহু করে কেদে উঠলো বা পায়ের অসহনীয় পীড়ায়। পা টা অবশের মতো হয়ে গিয়েছে যেন। কোন বোধ পাচ্ছে না।
ক্লাস শেষ হতেই কিছু কিছু মেয়ে মেয়েটার বেঞ্চের চারপাশে ঘিরে ধরলো। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কেউ কিছুই বললো না। যে থাকলে কিছু বলতো সে আজ অনপুস্থীত কলেজে।
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪ (৩)
একটু পরেই খুব দ্রুত একজন স্যার ছুটে আসলেন ক্লাসে। বাদ বাকি স্টুডেন্ট নড়েচড়ে বসে স্পেস দিলেন স্যারকে। সম্মান জানিয়ে যার যার স্থান হতে দাড়াতেই স্যার তাদের হাতের ইশারায় বসিয়ে দিলেন। উদ্বিগ্ন স্বরে কান্নারত ফোলা ফোলা চোখ দুটোর মেয়েটার কাছে যেতে যেতেই ডেকে উঠলেন,
“শুভ্রতা? শুভ্রতা? কষ্ট হচ্ছে? ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে হবে….”
