Home হ্যালো 2441139 হ্যালো 2441139 পর্ব ৩২

হ্যালো 2441139 পর্ব ৩২

হ্যালো 2441139 পর্ব ৩২
রাজিয়া রহমান

মিরাকে শিরিন পাঠিয়েছে আষাঢ়ের রুমে।আষাঢ়ের বাবা মা ফেরার আগেই শিরিন চায় যেকোনো ভাবে মিরার সাথে আষাঢ়ের বিয়েটা দিয়ে দিতে।
তাতে যদি নিজের মেয়ের কিছুটা বদনাম হয়,হোক।
এরকম রাজ্য আর রাজপুত্র থাকলে একটু আধটু কলঙ্ক মেনে নেওয়া যায়।
শিরিন মনে মনে জানে আষাঢ়ের মতো ছেলে দ্বিতীয়টি হবে না।অন্য কোনো মেয়ে কেনো এতো ভালো একটা ছেলের বউ হবে তার নিজের মেয়ে থাকতে!
মিরা যদিও মাঝখানে মা’য়ের এসব পাগলামির সাথে তাল মেলানো বন্ধ করে দিয়েছিলো কিন্তু ইদানীং আষাঢ়ের এতো ক্রেজ,এতো ফ্যান-ফলোয়ার দেখে মিরার মনে আবারও লোভ জন্মায়।
তাছাড়া আষাঢ় তার মামার একমাত্র ছেলে।মামার তো আছেই,আষাঢ়ের নিজের ও তো কোনো কিছু কম নেই।তাই মায়ের পরামর্শ মতো মিরা এলো আষাঢ়ের রুমে।
এই সময় আষাঢ় গোসল করে গুনগুন সুরে গান গাইবে।
আষাঢ় মানুষটাই অলরাউন্ডার।

তার গানের গলা ভীষণ ভালো। স্কুল লেভেল পর্যন্ত গান গাইতো স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। এরপর রাজনীতির সাথে জড়িয়ে গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছে বোধহয়। তবে নিজের রুমে একা একা গুনগুন করে।
মিরার মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। আষাঢ় বলেছে সে এনগেজড। তার দৃঢ় গলার স্বর মিরা বুঝে।কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে না। ওদিকে মিরার মা ও মিরাকে দিন রাত ২৪ ঘন্টা চাপাচাপি করে আষাঢ়ের কাছাকাছি থাকার জন্য।
যে মানুষটা স্পষ্ট তাকে অপমান করে, সোজাসাপ্টা জানিয়ে দেয় সে এনগেজড,তার মন অন্য কাউকে দিয়েছে তাকে কি জোর করে নিজের করা যায় কখনো!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মিরা বিশ্বাস করে না আষাঢ় কারো সাথে সম্পর্কে আছে।আবার অবিশ্বাস ও করতে পারে না।
মিথ্যা কথা এতো দৃঢ়ভাবে বলা যায় না। তাছাড়া আষাঢ় ভাই বলেছে তিনি যাকে ভালোবাসেন সে মিরার চেনা।
আষাঢ়ের রুমের সামনে আসতেই দেখে পিয়াসা এই রুমে। মিরা দেয়ালের পাশে লুকিয়ে যায় পিয়াসাকে দেখে। পিয়াসা এখানে কি করছে!
মিরাকে অবাক করে দিয়ে আষাঢ় হুট করে পিয়াসাকে কাছে টেনে নেয়।
মিরার মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠে। তারমানে আষাঢ় ভাই মিথ্যে বলে নি। পিয়াসা তো মিরার চেনা।
মিরা দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে ব্যস্ত হয়ে যায়। এজন্যই কি পিয়াসার প্রতি আষাঢ় ভাইয়ের এতো টান?
এতো উতলা এজন্যই তিনি!
মিরার দুই চোখ জ্বলে উঠে। বহু বছর আগের সেই দিনটির কথা মনে পড়ে যায়। আষাঢ় ভাই তাকে কষে দুটো থাপ্পড় মেরেছিলো।পিয়াসারা প্রথম এই বাড়িতে বেড়াতে আসার পর ঈর্ষান্বিত হয়ে মিরা পিয়াসার লেহেঙ্গার উপরের টপ্সের ফিতা কেটে দেয়।

মেহমান যাওয়ার পর আষাঢ় ভাই তাকে থাপ্পড় দেয়।
আর কোনো আশা ভরসা নেই মিরার।বেকার সময় নষ্ট করছে সে এতো দিন মা’য়ের কথা ধরে। আষাঢ় ভাইয়ের কথা বিশ্বাস করা ভালো ছিলো। তিনি তো তাকে জানিয়েছেন আরো আগেই।
আষাঢ় ফিসফিস করে বললো, “আমি সরি পিয়াসা।আমি তোমাকে হার্ট করতে অথবা কোনোভাবে অপ্রস্তুত করতে এই কাজটা করি নি।দেয়ালের পাশ ঘেঁষে মিরা দাঁড়িয়ে আছে। মিরাকে দেখানোর জন্য আমি তোমাকে এভাবে কাছে টেনে নিয়েছি।এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তুমি হয়তো বুঝতে পারবে না ব্যাপারটা। তোমার কাছে এটা খারাপ মনে হচ্ছে, হবে।ব্যাপারটা তুমি বুঝতে পারবে কিছুদিন পরে।তোমাকে সুরক্ষিত রাখতেই আমাকে এটা করতে হয়েছে পিয়াসা।”
আষাঢ় আর পিয়াসাকে এরকম কাছাকাছি থাকতে দেখে মিরা আর সামনে আসে না।নিরবে স্থান ত্যাগ করে। মিরা বুঝে যায় অযথা আর পিয়াসার পেছনে লাগা যাবে না।পিয়াসার উপর আষাঢ়ের ছায়া আছে যখন, কেউ আর পিয়াসাকে কিছু করতে পারবে না।মা আর বোনদের আগেই সাবধান করে দিতে হবে।

এই বাড়িতে নিজেরা যেভাবে থাকছে তা না হলে সেটুকু ও শেষ হয়ে যাবে।
মিরা চলে যাওয়ার পর হুট করে আষাঢ় পিয়াসাকে ছেড়ে দেয়।পিয়াসা ভীষণ ঘাবড়ে আছে।
আষাঢ় দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। একটু আগে সে যা করেছে নিজেকে আর পিয়াসাকে সেইফ রাখতে করেছে।
মিরাকে দেখেই আষাঢ় পিয়াসাকে কাছে টেনে নিয়েছে ইচ্ছে করে। আজকের পর থেকে মিরার কখনোই সাহস হবে না পিয়াসাকে জ্বালানোর অথবা তার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করার।মা বাসায় নেই,এই সুযোগে মিরা নানাভাবে পিয়াসাকে কষ্ট দিতে চেষ্টা করবে।
আষাঢ় জানে সে যে কাজটা করেছে তাতে পিয়াসা ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু আষাঢ় জানে,মা না থাকার সুযোগে মিরা পিয়াসাকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলতো।

পিয়াসা হয়তো কখনোই জানবে না কিংবা বুঝতে পারবে না।
পিয়াসা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সারা শরীর যেনো জমে গেছে তার।এই লোকটাকে সে খারাপ ভাবতো,কিন্তু এতটা খারাপ কখনোই ভাবে নি।বরং মাঝেমাঝে তার কিছু কিছু কাজে সে মুগ্ধ হয়েছে। অথচ সেখানে এই লোকটা তার সাথে আজকে এরকম খারাপ ব্যবহার করলো!
অথচ সে বলছে কি-না সে পিয়াসার ভালো করতেই এরকম করেছে!
এটা কিভাবে ভালো হয়!
আষাঢ় ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নরমাল ভাবে বললো,”দাদীর কি হয়েছে?”
পিয়াসা কথা বলতে পারছে না।একটু আগের করা ব্যবহার এই মানুষটা এক মুহূর্তে এভাবে ভুলে গেলো!
পিয়াসার দুই চোখ ভিজে উঠে।
এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে পিয়াসা ছুটে চলে যায়।
আষাঢ় ধপ করে খাটে বসে পড়লো।বুকের ভেতর কতো যতনে গোপন করে রেখেছে পিয়াসার প্রতি তার সব অনুভূতি।

এই মেয়েটা সেসব কখনোই জানবে না।
অবশ্য সে যে জীবন বেছে নিয়েছে সেই জীবনে কাউকে আপন করতে নেই।সক্রিয় রাজনীতি করা মানুষের শত্রুর অভাব নেই।আষাঢ়ের ও তাই।
নিজের ভাবনা চিন্তাকে এক পাশে রেখে আষাঢ় বের হয়।মা বাবা নেই যেহেতু, দাদীর খেয়াল রাখার দায়িত্ব এখন তার।
দাদীর রুমে গিয়ে দেখে রুম খালি।আষাঢ় দ্রুত নিচে নেমে যায়।একটু আগে পিয়াসা বলেছিলো দাদীর কোনো একটা সমস্যা হচ্ছে।
আষাঢ় নিচে এসে দেখে মহুয়া বেগম দুধ দিয়ে পাউরুটি চুবিয়ে খাচ্ছেন।
তার পাশেই পিয়াসা বসে আছে।
আষাঢ়কে দেখে মহুয়া বেগম লজ্জিত হয়।এই মেয়েটাকে তিনি অপছন্দ করেন,অথচ এখন এই মেয়েটার থেকে সেবা নিচ্ছেন।

লজ্জা আর অস্বস্তি ঘিরে ধরে তাকে।
আষাঢ় দাদীকে উদ্দেশ্য করে বললো, “তো দাদী,রজনীগন্ধাবিহীন তোমার সংসার এখন কেমন চলছে?নিশ্চয় খুব ভালো তাই না!
আমার মা তো ছিলো আস্ত একটা ঝামেলা তোমাদের জন্য। ”
মহুয়া বেগম নিজের দুর্বলতা ঢাকতে উচ্চ স্বরে বললেন,”সব তোদের মা ছেলের চক্রান্ত। তুই আর তোর মা আমার ছেলের মাথা খাইছস।আমার ছেলে এজন্য এখন আমার কথা শোনে না।আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিমু।তোর মা আমার তামাশা দেখার জন্য আমারে রাইখা আমার ছেলের লগে এই বুড়া কালে রংতামাশা করতে গেছে!
তোর মা’য়ের কারণে এই বয়সে আমাকে রান্নাঘরে ঢুকতে হইছে,আল্লাহ বিচার করবে তোর মায়ের।”
আষাঢ় হেসে উঠে। পিয়াসা হতবাক হয়। এই কেমন মানুষ!
কি বলছেন উনি?

আষাঢ় বলে উঠে, “আপনি ভীষণ অদ্ভুত মানুষ দাদী!এতো বছর ধরে যিনি আপনার সব দায়িত্ব পালন করছেন,তাকেই আপনি শাপশাপান্ত করছেন!
আর যারা গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরছে তাদের কিছুই বলার নেই আপনার?কই তাদের তো কিছু বলছেন না।তাহলে আমার মা’কেই কেনো এভাবে অভিশাপ দিচ্ছেন?
আপনি যদি ভাবেন আপনার অভিশাপে আমার মা’য়ের অনেক বড় ক্ষতি হবে তাহলে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন।বিড়ালের দোয়ায় শিঁকে ছিঁড়ে না দাদী।”
মহুয়া বেগমের দুই চোখ ভিজে উঠে।
এতো অসহায় হয়ে গেছেন কেনো তিনি!
কেনো রজনীকে ছাড়া তিনি আজ একেবারে অচল হয়ে গেছেন!

এতো বছর ধরে নিজের মধ্যে জমিদারির যে ভাব তিনি ধরে রেখেছেন তা এবার আস্তে আস্তে কি খসে পড়বে!
সবাই জানবে মহুয়া বেগমের ছেলের বউয়েরা মতো মহুয়া বেগমকে কানাকড়ি ও মূল্য দেয় না!
সবাই জানবে মহুয়া বেগম আজ সারাদিন না খেয়ে ছিলেন!
অতিথি আদ্যা যে ধারা তাদের বংশে প্রচলিত ছিলো, রজনী চলে যাওয়ার সাথে সাথে কি তাও বন্ধ হয়ে যাবে!
রজনীর উপর মহুয়া বেগমের ক্রোধ আরো বাড়তে থাকে।
শিরিন মিরার হাত চেপে ধরে বললো, “তোরে আমি কি শিখাই পাঠাইছি হারামজাদি মাইয়া?”
“মা সব কিছু গায়ের জোরে হয় না।আষাঢ় ভাইকে নিয়ে তুমি মনে মনে যেই পরিকল্পনা করে রাখছো সেসব এখন থেকে বাদ দাও।আর আমি আর কখনোই আষাঢ় ভাইয়ের সাথে এরকম ঢলাঢলি করতে পারবো না।”
“তোর মতো মাথামোটা, গর্দভ কেমনে আমার পেটে জন্ম নিলো?আষাঢ় সোনার খনি হা রা ম জা দী,নিজের ভালো বুঝস না ক্যান!

ব্যাডা মানুষ হচ্ছে মোম,মাইয়া মানুষ হচ্ছে আগুন।আগুন দেখলে মোম গলবেই।একবার গলে গেলে আজীবনের জন্য বন্দোবস্ত করে দিমু আমি।আরো কি তোরে খুলে বলতে হবে?”
মিরার বিরক্ত হয়ে বললো, “মা,আমি যদি ন্যা ং টা হয়ে ও ওনার পাশে গিয়ে বসে থাকি,উনি গলবে না মা।উনি মোম না,উনি লোহা।ওনারে যেই আগুন গলাতে পারে সেটা আমি না।দুনিয়ার কেউ-ই পারবে না ওনাকে টলাতে।
আর উনি যারে পছন্দ করে তার নখের যোগ্য ও আমি না।না রূপে,না গুণে,না ব্যবহারে।”
শিরিন মিরার গাল চেপে ধরে বললো, “কারে পছন্দ করে আষাঢ়? বল আমারে?”
“না মা,আমি বলতে পারবো না।আমি কখনোই বলবো না তোমাকে।তুমি আমার মা, আমি চিনি তোমাকে।
সেই মেয়েকে জানতে পারলে তুমি তার ক্ষতি করতে চাইবে।আর আষাঢ় ভাই সেটা জানতে পারলে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিবে।আমার আর এসব কূটকাচাল ভালো লাগে না মা।আমি এবার শান্তি চাই।অযথা তোমার কথা শুনে সময় নষ্ট করেছি আষাঢ় ভাইয়ের পিছনে ঘুরে।”

শিরিন নিরাকে ডেকে আনে।বড় মেয়েটা মেজো মেয়ের চাইতে ভালো বুদ্ধিমতী।
নিরাকে সব বলতেই নিরা বললো, “আচ্ছা মা,কিছুদিন চুপ থাকো।মিরার মনে হয়তো কোনো দ্বিধা আছে।কিছুদিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে।”
মিরা মনে মনে বললো, “আমি আর কখনোই আষাঢ় ভাইয়ের সাথে এরকম সম্পর্ক করতে যাবো না।আমি নিজ চোখে দেখে এসেছি।

হ্যালো 2441139 পর্ব ৩১

এতো এতো ফ্যান ফলোয়ার হওয়ার পরেও যিনি সেই অনেক বছর আগে থেকে পছন্দ করে রাখা পিয়াসাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারেন,তিনি কখনোই পিয়াসাকে ছেড়ে দ্বিতীয় কাউকে জীবনে চাইবেন না।
তাছাড়া বিয়ে জীবনে একবার হয়,মা’য়ের কথা শুনে আমি নিজের জীবন নিয়ে এতো বড় রিস্ক নিবো না।
পিয়াসাকে আগে যতটা ইনসাল্ট করেছি,এবার থেকে শুধরে যেতে হবে।”

হ্যালো 2441139 পর্ব ৩৩