হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৬
সাবা খান
সকালটা ধীরে ধীরে গড়িয়ে উঠেছে শহরের আকাশে। এই শহরের এক প্রান্তে, উঁচু দেয়াল ঘেরা এক বিশাল এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে সারহাদের রোজ হাউজ। নামের মতোই চারদিকে অসংখ্য গোলাপের বাগান। বাতাসে মিশে আছে তাজা গোলাপের সুগন্ধ। আর রোজ হাউজের সবচেয়ে গোপন জায়গা হলো সারহাদের সিক্রেট রুম। ভারী দরজার ওপারে, শব্দরোধী সেই ঘরটা যেন তার নিজের একটা আলাদা দুনিয়া। এইটাা একমাত্র জায়গা যেখানে সে নিজেকে মেলে ধরতে পারে, যেখানে সে নিজের মতো থাকতে পারে।
এই কক্ষের মাঝখানে রাখা আছে একটা বড় ক্যানভাস। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সারহাদ। তার এক হাতে ধরা তুলি। সে তুলিটা রেখে পাশ থেকে একটা কাচের বাটিতে রঙের সাথে গোলাপের পাপড়ি মিশিয়ে তারপর তুলি চালায় ক্যানভাসের উপর। পেইন্টিং করা তার ছোটবেলাকার সখ। নিজের নিঃসঙ্গ জীবনে এই একটা জিনিস তার খুব পছন্দের। তবে তার বেশির ভাগ পেইন্টিংই একজনকে ঘিরে। যাকে সে চোখ বন্ধ করেও আঁকতে পারে। তার হাতের প্রতিটা মুভমেন্ট নিখুঁত ভঙ্গিতে চলছে ক্যানভাসের উপর। প্রতিটা স্ট্রোক হিসেব করা।
ঘরের একপাশে একটা ট্যাবলেট চলছে যেখানে দেখা যাচ্ছে ব্রেকিং নিউজ, একজন নারী জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে এক পুরুষকে
জুতো দিয়ে মারছে। স্ক্রিনে লেখা,
“লেপটেন্যান্ট জেনারেল রনি হায়দারের স্ত্রীর বিস্ফোরণ, প্রকাশ্যে অপমান”
চারপাশে ভিড় যাদের মধ্যে কেউ ভিডিও করছে, কেউ বলছে,
-“ছিঃ ছিঃ…
–“এই লোকটা এত নিচে নামল কিভাবে?”
–“ওর যা প্রাপ্য, তাই হয়েছে”
তবে সবচেয়ে বেশি ভেসে আসছে রনি হায়দারের স্ত্রী মিসেস নাজমা হায়দারের কণ্ঠ,
–“তুই আমাকে প্রতারণা করবি?”
–“আজ তোকে আমি ছাড়বো না”
তারপর আবার জুতোর আঘাত, কয়েক জন নারী পুলিশ তাকে টেনে হিঁচড়ে অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এজন্যই কাল রনি নিজের স্ত্রীর কথা শুনে এতটা ভয় পেয়েছিল। কেননা তার স্ত্রীও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার মেয়ে, বেশ রাগচটা ও বদমেজাজি। অদূরে তার ছেলে মেয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে সারহাদের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে পৈশাচিক, তৃপ্তির হাসি। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, কোনো সহানুভূতি নেই, শুধু আছে উপভোগ। সে নিচু স্বরে আওড়ায়,
–“মানুষের পতন…সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য”
তারপর তার কানে থাকা ইয়ারপিসে আদেশ ছুঁড়ে,
–“রনির কাহিনি আজ রাতেই খতম”
এই বলে ডিভাইস টাকে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাতের গতি বাড়ায়। এবার সম্পূর্ণ মনোযোগ এটাতে তুলি দ্রুত চলতে শুরু করে।
রঙ, পাপড়ি সব মিশে ক্যানভাসে তৈরি করছে এক মুখ, একটা পরিচিত মুখ। ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে এজাজ। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সারহাদের ক্যানভাসেরর দিকে তাকিয়ে। এই আঠারো বছরে সারহাদ এই চেহারা টাকে বহুবার এঁকেছে। মানুষ বিরক্ত হয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু সারহাদ বিরক্ত হয় না। সে যেন রোজ এই মুখটাকে নতুন করে আঁকে। এজাজ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
–“বস”
সারহাদ হাত না থামিয়ে অন্য হাত দিয়ে ইশারা করে বলতে। এজাজ বলে,
–“বস, সোফিয়া জাওয়ান ব্ল্যাক ম্যানশনে গেছে”
সারহাদের হাত এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। ‘সোফিয়া জাওয়ান’ এই নামটা শোনামাত্র সারহাদের ভ্রু কুঁচকে গেল। তার চোখে এক ঝলক তীক্ষ্ণতা খেলে যায়। সে ধীরে তুলি নামিয়ে রেখে বলে,
–“শিউর”
–“ইয়েস, বস, আলফা টিম নিয়ে ঢুকেছে”
সারহাদের চেহারা তাৎক্ষণিক বদলে গেল। যেই আদলে কিছুক্ষণ আগে পৈশাচিক তৃপ্তি ছিল সেখানে এখন অস্থিরতা ফুটে ওঠেছে। তার ঠোঁটের কোণের হাসি মিলিয়ে গেছে। তারপর তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আদেশ করে,
–“সব রেডি করো”
এজাজ এক সেকেন্ড দেরি না করে মাথা নাড়িয়ে বলে,
–“ওকে বস”
এজাজ দ্রুত বেরিয়ে গেলে কক্ষে আবার নীরবতা নেমে আসে। সারহাদ ধীরে ঘুরে তাকায় তার ক্যানভাসের দিকে। অর্ধসমাপ্ত সেই ছবিতে ফুটে উঠেছে তার সানাম। তার চোখ, তার মুখ প্রায় জীবন্ত। সারহাদ ধীরে এগিয়ে গেল সেদিকে। তার কণ্ঠস্বর থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“অসমাপ্ত জিনিস…আমি কখনো রেখে দেই না”
তারপর তুলি তুলে এক শেষ স্ট্রোক দিয়ে দিল। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর
দরজা খুলে বেড়িয়ে যায়।
ব্ল্যাক ম্যানশনের মেইন ফটক তখনো আধখোলা। বাইরের ধোঁয়া ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকছে গুলির বারুদের গন্ধ, পোড়া ধাতুর গন্ধ আর র*ক্তের ভারী গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে।মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে গার্ডদের দেহ, দেয়ালে গুলির চিহ্ন, কোথাও কোথাও এখনো স্পার্ক জ্বলছে। এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ভারী বুটের শব্দ ভেসে এলো সবার কানে। সবাই একসাথে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দরজার দিকে। ধোঁয়ার আস্তরণ ভেদ করে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠে একটা অবয়ব, আরজে।
পরনে কালো লম্বা কোট, পোশাকে র*ক্ত জমে আছে, চুলগুলো এলোমেলো, তার বাদামী চোখজোড়া যেন জ্বলন্ত আ*গুন, চোয়াল শক্ত করে ভারী ভারী কদম ফেলে হেঁটে আসছে। সোফিয়া জাওয়ান বিস্মিত দৃষ্টিতে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। এই মুখটা সে একদমই আশা করেনি এই মুহূর্তে। মনের কোণে প্রশ্নরা উঁকি দিচ্ছে,
“আরজের তো আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার কথা,
তাহলে এখানে…?”
সোফিয়া ধীরে হাত তুলে পাশে দাঁড়ানো জিহাদের দিকে ইশারা করে। জিহাদ এক সেকেন্ডও দেরি না করে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। তারপর মোবাইল বের করে ছোট একটা মেসেজ পাঠিয়ে দেয়।
এদিকে সানা ঘাড় কাত করে তাকায় আরজের দিকে। এক ঝলক সে দেখে রাগে শক্ত হয়ে থাকা মুখ, পরের মুহূর্তেই সে মুখ ঘুরিয়ে নিল আর একবারও তাকাল না। রমণীর হাতে এখনো বন্দুকটা শক্ত করে ধরে রাখা। আরজে এগিয়ে এসে একবার সোফিয়ার দিকে তাকায় তারপর সানার দিকে ঘুরে গেল। তার দৃষ্টি আটকায় সানার হাতে ধরে রাখা বন্দুকে। মুহূর্তে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
কিন্তু সে কিছু না বলে সানার পাশে বসে পড়ে। আরজের সাথে থাকা কাইলিন জ্যাকের সাথে দাড়িয়ে পড়ে।
আরজে ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টেনে আওড়ায়,
–“হোয়াট আ সারপ্রাইজ… মম”
সোফিয়া নিজের সমস্ত রাগ গিলে নিল, কেননা এখন পরিস্থিতি তার হাতের বাইরে আর হাতে কীভাবে আনতে হয় সেটা সোফিয়া খুব ভালো করে জানে। আরজের বলা এই ঠান্ডা বাক্য গুলো যে কতটা ভয়ংকর সে খুব ভালো করেই জানে। তাই ঠোঁটের কোণে মেকি হাসি টেনে প্রত্যুত্তর করে,
–“সারপ্রাইজ তো তুমিই দিলে, রনো। এত বছর আমার থেকে আমাট নাতিকে লুকিয়ে রেখেছো। হোয়াটএভার, আমি আসলে খুব সিম্পল একটা কারণে এসেছি, আমি আমার গ্র্যান্ডসনকে দেখতে এসেছি”
আরজে ভ্রু কুচকে তাকায়, ঠান্ডা স্বরে বলে,
–“দেখতে, এত গার্ড, এত র*ক্ত, আক্রমণ শুধু আমার ছেলেকে দেখতে নাকি নিয়ে যেতে তোমার সেই অন্ধকার সেলে?”
–“তুমি সবকিছু এত জটিল করো কেন?
আমি ওর দাদি, একটু আদর করবো এইটুকুই”
আরজে ধীরে সামনে ঝুঁকে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
–“মম, জাস্ট স্টপ ইয়োর অ্যাক্ট, আম নট ফলিং ফর ইয়োর সফট ওয়ার্ড”
আরজের এমন কথায় সোফিয়ার ভিতর রাগে গড়গড় করে উঠে, কিন্তু বাহিরের মুখভঙ্গি তা বুঝতে দিতে অক্ষম। সে ফের ঠোঁটে হাসি টেনে বলে,
–“তুমি এখনো আমাকে ভুল বুঝচ্ছ, রনো।আমি যা করি, সব তোমার ভালোর জন্য করি”
–“ইয়াহ আই নো, কাউকে দানব বানানো, কারো হাসি কেড়ে নেওয়া সবই তোমার কাছে ভালো। কিন্তু এবার টার্গেট আমার ছেলে”
সোফিয়া এবার সোজা হয়ে বসে,
–“সে শুধু তোমার ছেলে না রনো, সে আমার র*ক্তও বহন করে। সে আমার বংশধর’
আরজে মাথা কাত করে ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলে,
–“বংশধর?
তুমি যে বংশ তৈরি করেছো, সেখান থেকে আমার ছেলে হাজার ফুট দূরে থাকবে”
–“তুমি কি আমাকে শেখাতে চাও?
আমি কি করতে পারি তা তুমি হয়তো ভুলে গেছো?”
বিপরীত পাশের মানব তার চোখে চোখ রেখে বলে,
–“না, আমি কিছুই ভুলিনি। এই কারণেই তো তুমি এখানে বসে আছো, আর আমার ছেলে তোমার কাছে নেই”
এই বাক্যটা যেন সোফিয়ার সমস্ত ধৈর্যের বাধ ভেঙে দিচ্ছে। সে রুক্ষ স্বরে বলে,
–“শেষবার বলছি আমার নাতিকে আমার কাছে নিয়ে আসো। নাহয় আমি ওকে নিজেই নিয়ে…..”
আরজে তার কথা কেটে বলে,
–“আম ওয়ার্নিং ইউ ফর দ্য লাস্ট টাইম, মম”
এই এক কথাতেই যেন সোফিয়ার মস্তিষ্কে বিস্ফোরণ ঘটে। আরজে তাকে ওয়ার্ন করছে, তাকে হুমকি দিচ্ছে। কথাটা মেনে নিতে পারছে না সে। সোফিয়া হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে,
–“ডোন্ট ইউ ডেয়ার টক টু মি লাইক দ্যাট।আমি তোমার মা, তুমি আমার সাথে এইভাবে….”
তার কথার বিপরীতে আরজে উঠে দাঁড়িয়ে সোফিয়ার চোখে চোখ রেখে গর্জে উঠে,
–“মিসেস জাওয়ান…
আম নট আ সান এনিমোর, নট আ হাসবেন্ড এনিমোর, আম দ্য ফাদার। ডু ইউ নো মম, বাবারা কী করতে পারে? এভরিথিং মম। র*ক্ত ঝরানো, জীবন নেওয়া, সাম্রাজ্য ভেঙে ফেলা সবকিছু। শুধু একটা জিনিসের জন্য, তার সন্তান”
আরজের হুংকারে যেন সারা ব্ল্যাক ম্যানশন কেঁপে উঠেছে। সোফিয়া নিজেও ঘাবড়ে গেছে। আরজে একটু থেমে ফের ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,
–“এন্ড আই টোল্ড ইউ দ্যাট মম, আর একবার, শুধু একবার কেউ আমার ছেলের দিকে তাকালেও আমি দেখবো না আমার বন্দুকের সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে….
তুমি হোক, তোমার লোক হোক, পুরো পৃথিবী হোক…আমার বন্দুক থামবে না”
সোফিয়া ঠোঁট শক্ত করে, তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে নিচু স্বরে বলে,
–“কাম অন রনো, তুমি ভাবছো তুমি বাবা হয়ে বদলে যাবে। তুমি এখনো তোমার ভিতরের দানব টাকেই আটকাতে পারোনি যেটা আমি বানিয়েছি। আমাকে আটকাবে কীভাবে, নিজের মাকে গুলি মেরে?”
আরজে হালকা হেসে ওঠে। সে জানতো সোফিয়া এইরকম-ই বলবে। কেননা সোফিয়া কোন গুলি বা বন্দুক কে কখনো ভয় পায় না, বরং সে এগুলোকে তুচ্ছ মনে করে। কিন্তু সোফিয়ার মতো শক্ত পোক্ত নারীর ও দুর্বলতা আছে যেটা একমাত্র উপায় তাকে আটকানোর। আরজে ধীরে ঝুঁকে সোফিয়ার একদম কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু একটা বলে যেটা কেউ শুনতে পায় না।
কয়েক সেকেন্ড তারপর হঠাৎ সোফিয়ার মুখের রং বদলে যায়। তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। বাক্যটুকু শ্রবণ হতেই তার শ্বাস যেন আটকে আসে। আতঙ্কে তার হাঁটু সামান্য কেঁপে ওঠে। সোফিয়া মুহূর্তে ভারসাম্য হারিয়ে এক পা পেছনে সরে যায়। একটা ফাঁকা ঢোক গিলে দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে ওঠে,
–“রনো…তুমি এটা আমার সাথে করতে পারো না। হাউ ক্যান ইউ ডু দিস টু ইয়োর ওন মাদার”
ঘরের সবাই থমকে যায়। সানা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সে এখন পর্যন্ত একটা কথাও বলেনি এই কারণে যে, সে দেখতে চায় আরজে কী করে। এখন সে বুঝতে পারছে না, কি এমন বলল আরজে যার কারণে সোফিয়ার এ দশা। আরজে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার ঠোঁটে সেই একই বাঁকা হাসি,
–“মম…আমি শুরুতেই বলেছি। আমি এখন আর তোমার রনো নই। আমি একজন বাবা যে নিজের সন্তানের জন্য সবকিছু করতে পারে, এভরিথিং”
কয়েক মুহূর্তের জন্য কক্ষে ভারী দমবন্ধ করা নীরবতা নেমে এলো। সোফিয়া এখনও নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না তার রনো তার সাথে এমনটা করেছে। হঠাৎ সেই নীরবতা চিরে সোফিয়া হেসে ওঠে। প্রথমে হালকা তারপর উন্মাদের মতো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সবাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেউ বুঝতে পারছে না এই হাসির মানে কি?
সানা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে, তার চোখে প্রগাঢ় সন্দেহ। সোফিয়া হাসতে হাসতেই ধীরে দরজার দিকে হাঁটতে থাকে। দরজার কাছে গিয়ে সে থেমে ধীরে পেছনে ঘুরে তাকায়। তার চোখে পাগলামির অদ্ভুত এক ঝলক। সে নিজের হাসি থামিয়ে বলে,
–“রনো…ঠিক আছে আমি তোমার সন্তানের দিকে হাত বাড়াবো না আর। তুমি তোমার সন্তানকে আমার থেকে দূরে রাখতে পেরেছো”
সোফিয়া একটু থেমে ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে ফের বলে,
–“কিন্তু ভাগ্যের থেকে কখনো দূরে রাখতে পারবে না। ওর ভাগ্য যদি ভালো হতো, তাহলে সে কখনো জাওয়ানদের বংশধর হতো না।
তোমরা যতই লুকাও, যতই দূরে রাখো, ওর র*ক্ত বদলাবে না। এই র*ক্ত… এই সাম্রাজ্য…
আর একদিন, তোমার সেই ছেলে…এই র*ক্তের সিংহাসনের উপর দাঁড়িয়ে রাজত্ব করবে…..”
হঠাৎ তার কথা থেমে যায় সানার বজ্রপাতের মতো গর্জনে,
–“ইউ ব্লাডি ওম্যান….”
পর মুহূর্তে কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই এক ন্যানো সেকেন্ড দেরি না করে রমণী পরপর দুটো গুলি চালিয়ে দেয় সোফিয়ার দিকে। সবাই চমকে তার দিকে তাকায়। কিন্তু গুলিগুলো সোফিয়ার গায়ে লাগার আগেই আব্বাস ঝাঁপিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। যার কারণে একটা গুলি তার বাহুতে আরেক টা তার কাঁধে গিয়ে লাগে। সে যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। মুহূর্তে আলফা সেনারা সোফিয়ার সামনে দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে যায়। ঘরের সবাই স্তব্ধ। আরজে নিজেও একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সানার দিকে। সে তো ভেবেছিল সানা এমনিতেই বন্দুক নিয়ে বসে আছে। সানা যে গুলি করবে এটা সে ভাবতেও পারেনি। সোফিয়া স্থির হয়ে যায়। তার চোখে আজ সত্যিকারের বিস্ময়। এই মেয়েটাকে যেন আজ নতুন করে চিনছে সে। এরই মধ্যে সোফিয়ার পেছনে দাঁড়ানো আলফা টিম একসাথে বন্দুক তুলে ধরে সানার দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে আরজে এক সেকেন্ড দেরি না করে পরপর তার বন্দুক থেকে গুলি ছুটে যায়। মুহূর্তের মধ্যে চার-পাঁচজন আলফা সেনা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, র*ক্ত ছিটকে পড়ে মেঝেতে।
সানা এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার চোখ স্থির সোফিয়ার উপর। রাগে তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। সে আবার ট্রি*গার চাপতে যাবে তার আগে আরজে দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত ধরে বন্দুকটা নিচে নামিয়ে দেয়। এক ঝটকায় সানাকে নিজের বুকে টেনে এনে মাথা তার বুকের সাথে চেপে ধরে,
–“রিল্যাক্স ওয়াইফি, ওনি আর কোনদিনই আসবে না, কাম ডাউন”
তার কথাগুলো যেন বিপরীত পাশের রমণীর কানে যাচ্ছেই না। তার পুরো শরীর রাগে থরথর করে কাঁপছে। রমণী আরজের বুকের ভেতর থেকেও মাথা তুলে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সোফিয়ার দিকে। সোফিয়া কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে। তার মুখে আর আগের সেই আত্মবিশ্বাস নেই। এক ঝলক অদ্ভুত চাপা আতঙ্ক। কিন্তু সে নিজেকে সংবরণ করে শেষবার তাকায় আরজে ও সানার দিকে তারপর দ্রুত ঘুরে বেরিয়ে যায় ব্ল্যাক ম্যানশন থেকে।
ম্যানশনের বাইরে ঠান্ডা রাতের বাতাস বইছে।সোফিয়া দরজা পেরিয়ে বেরুতেই থেমে যায়।
অনুভূতিসার শূন্য চোখে চারদিকে তাকায়। তার একটাও আলফা সেনা দাঁড়িয়ে নেই চারপাশ ফাঁকা, নিঃশব্দ। তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রাগে, অপমানে, আর ভিতরের সেই অজানা ভয়ে।
তার মাথায় বারবার ঘুরতে থাকে আরজের একটু আগের ফিসফিস করে বলা কথাগুলো। সবকিছু কে অবজ্ঞা করে সে দ্রুত গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। দূরে রাস্তার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সারহাদের গাড়ি গুলো সোফিয়াকে বের হতে দেখেই এক এক করে সেগুলো ঘুরে যায়। রোজ হাউজ থেকে ব্ল্যাক ম্যানশন অনেকটা দূরে যার কারণে তার আাসতে দেরি হয়েছে।
সোফিয়া তাড়াতাড়ি নিজের গাড়িতে উঠে বসে। তার হাত সামান্য কাঁপছে। মুখে এখনো সেই আতঙ্কের ছায়া। সে গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার চোখের ভেতর ভাসছে একটাই মুখ “আরজে”। আর তার বলা সেই ফিসফিস কথাগুলো যা সে ছাড়া আর কেউ শোনেনি।ধীরে ধীরে তার সবগুলো গাড়ি ব্ল্যাক ম্যানশনের গেট পেরিয়ে অন্ধকার রাস্তায় হারিয়ে যায়।
ম্যানশনের ভিতরে তখনো মেঝেতে পড়ে আছে গুলির খোসা, র*ক্তের দাগ আর সেই সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সানা।
সে এখনো রাগে কাঁপছে। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। আরজে তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে কিন্তু হঠাৎই সানা এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দেয়। আরজে তার এমন আকষ্মিক ধাক্কায় এক পা পিছিয়ে যায়। সানা তর্জনী উঁচিয়ে শক্ত কণ্ঠে বুলি ছুড়ে,
–“মিস্টার জাওয়ান,
আপনার মা যদি আর একবার, শুধু আর একবার আমার সন্তানের দিকে হাত বাড়ায়, আমি ট্রি*গার চাপতে এক সেকেন্ডও লেট করবো না। আজ যেমন করেছি, ঠিক তেমনই করবো। তখন আমি দেখবো না সে কে, আপনার মা, আপনার র*ক্ত, না এই সাম্রাজ্যের রানী। আমার সন্তানের আগে কেউ না”
কক্ষের সবাই তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে, শুধু মাত্র জ্যাক ছাড়া। রমণী একটু থেমে ফের আওড়ায়,
–“আমি কারো বউ হতে পারি, কারো পুত্রবধূ হতে পারি, কিন্তু সবার আগে আমি একজন মা। আর একজন মা কি করতে পারে, আজ আপনি একটু হলেও দেখেছেন নিশ্চয়”
এই বলে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। হাতে ধরা বন্দুকটা জোড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। ধাতব শব্দটা ঘরের নীরবতায় প্রতিধ্বনি হয়ে বাজে। তারপর ধুপধাপ কদম ফেলে সিঁড়ির বেয়ে উপরে চলে যায়। রমণী একবারও পিছনে তাকায় না।
আরজে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সিঁড়ির দিকে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এসপি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মুখে অবিশ্বাস। সে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে ফিসফিস করে,
–“এটা কি আমি ঠিক দেখলাম…?
এই কটকটি কবে থেকে ঝাঁসির রানী হয়ে গেল?”
একটু থেমে ঠোঁট কামড়ে হেসে আওড়ায়,
–“আমি তো ভাবছিলাম দরকার হলে আমি সামনে দাঁড়াবো…কিন্তু এখানে তো দেখি… এই মেয়ে সবার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে”
এসপির বিভ্রম ছুটে যায় আরজের ঠান্ডা, ধারালো দৃষ্টি দেখে। সেই দৃষ্টি একদম সরাসরি অভিযোগে ভরা। এসপি এক সেকেন্ডেই বুঝে যায়। আরজের মুখ থেকে কোন বাক্য নিঃসৃত হওয়ার পূর্বেই এসপি গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
–“দেখ শালা আসমানে ওপরওয়ালা সাক্ষী জমিনে আমার না হওয়া মেয়ে সাক্ষী, আমি কিছু করি নাই। তোর বউ তো আমাকে সোজা পারমাণবিক বোমা দিয়ে উড়ানোর কথাও বলেছে”
বিপরীত পাশের মানব নীরব, হঠাৎ আরজে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে সানাকে বাহবা দিয়ে উচ্চস্বরে বলে,
–“ব্রাভো, ওয়াইফি, তুমি যদি ওকে উড়াতে পারো, আমি আরো দশ বার বাসর…মানে বিয়ে করবো তোমাকে”
এসপি মুখ হাঁ করে মনে মনে ভাবে,
“এইটা কি ধরনের সাপোর্ট রে ভাই?” তারপর আরজে কে শুনিয়ে বলে,
–“ও তোকে ছেড়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করলে আমি নিজেই নিজেকে পারমাণবিক বোমা দিয়ে উড়াবো”
বাক্যটুকু শ্রবণ হতেই আরজের চোখ লাল হয়ে ওঠে। এই বারোভাতারি আবারও তার বউকে দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলছে। সে চোয়াল শক্ত করে এক সেকেন্ডও দেরি না করে অদূরে পড়ে থাকা সানার বন্দুকটা তুলে নিয়ে গর্জে উঠে,
–“বারোভাতারির বাচ্চা, কি বললি…”
সে মাথা ঘুরিয়ে এসপির দিকে তাকাতেই দেখে সে নেই। এক মুহূর্ত আগেও যে দাঁড়িয়ে ছিল সে উধাও। বেচারা এসপি কথাটা উগড়ে দিয়ে-ই পালিয়ে গেছে।
ব্ল্যাক ম্যানশনে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পুরো ম্যানশন কৃত্রিম আলোয় আলোকিত হয়ে আছে, তাতে বুঝার উপায় নেই দিন না রাত। সিয়া আজকে প্রথম পুরো ম্যানশন ঘুরে দেখেছে। এই ম্যানশনে আসার পর থেকে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে, কখনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি, কখনো হামলা সব মিলিয়ে সে দুদিনে পুরোটা ঘুরে দেখার সুযোগ পায়নি। আর তার উপর ছিল সানিতার দায়িত্ব। সারাক্ষণ সানিতার সাথেই থাকতে হতো তাকে। ডেলিভারির সময় একদম ঘনিয়ে এসেছে সানিতার। কিন্তু সেই সিক্রেট রুমে থাকার পর সানিতা একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার শরীর দুর্বল, মাঝে মাঝে মাথা ঘুরে উঠছে, আর চোখেমুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ ছিল। এই অবস্থায় এসপি তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছাড়ছে না। সে সারাক্ষণ সানিতার আশেপাশেই থাকছে তার প্রতিটা শ্বাস প্রশ্বাস, প্রতিটা নড়াচড়া যেন নজরে রাখছে। তাই আজ দুদিন পর সিয়া সুযোগ পেয়েছে পুরো ম্যানশনটা একা একা ঘুরে দেখার।
আর সে যতই ঘুরছে ততই অবাক হচ্ছে। তার নিজের চোখ কে যেন বিশ্বাস করাতে পারছে না সকালবেলার সেই ভয়ংকর গুলির শব্দ, আতঙ্ক, দৌড়ঝাঁপ সবকিছু যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিলিয়ে গেছে। এখন সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক। দেয়ালগুলো ঝকঝকে পরিষ্কার, ফ্লোরে একটুও দাগ নেই। কোথাও যেন কোনো বিশৃঙ্খলার চিহ্নই নেই, যেন কিছুই ঘটেনি।
চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখছে সিয়া। সবকিছু এত নিখুঁত, এত ব্যয়বহুল যে তার মনে হচ্ছিল সে যেন কোনো রাজপ্রাসাদের ভেতরে হাঁটছে। এই সবকিছু দেখতে দেখতেই সে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায় নিজের রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রথম সিঁড়িতে কদম রাখতেই হঠাৎ কিছু একটার সাথে ধাক্কা খেয়ে ঠাস করে নিচে পড়ে গেল। ধাক্কাটা এতটাই আকষ্মিক ছিল যে সে বুঝে ওঠার আগেই মেঝেতে পড়ে যায়। রমণী কোমর ধরে চিৎকার করে ওঠে ব্যথায়। তার মুখে সেই ব্যথাতুর শব্দটা ভেসে উঠতেই সামনে থাকা কাইলিন নিচের দিকে তাকায়। সে তো সামনে তাকিয়েই হাঁটছিল। হঠাৎ তার মনে হয়েছিল কিছু একটা তার কোমরের সাথে ধাক্কা খেয়েছে। কিন্তু নিচে তাকাতেই সে থমকে যায়। তার চোখে ভেসে উঠে ছোটখাটো একটা বাচ্চা মেয়ে। মাথায় আবার ছোট বাচ্চাদের মতো ক্লিপও লাগানো, কাঁধ সমান চুল, গোলগাল চেহারা, সম্পূর্ণ যেন একটা জীবন্ত বার্বি ডল। কাইলিন ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকিয়ে জোরে ডেকে উঠে,
–“আরে কার বাচ্চা কাচ্চা এভাবে ছেড়ে দিয়েছেন? দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে হাত পা ভেঙে ফেলবে তো। ম্যানশনে বাচ্চাকাচ্চা কোথা থেকে এসেছে? কার পিচ্চি এটা নিচে পড়ে গেছে”
নিচে পড়ে থাকা রমণীর কানে ‘পিচ্চি’ শব্দটা ঢুকতেই মুহূর্তে তার শরীর রাগে রি রি করে ওঠে। এই একটা শব্দ তার সবচেয়ে অপছন্দ। না, অপছন্দ না, ঘৃণিত। মনে হলো যেন শব্দটা সরাসরি তার মাথার ভেতরে গিয়ে আঘাত করল। কেন সবাই তাকে এটা বলে?
সে কি শুধু খাটো বলেই?
তার চোখে মুহূর্তেই রাগ জমে উঠে। চোয়াল শক্ত করে, নিজের ব্যথা ভুলে তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়ায়। তারপর তর্জনী উঁচিয়ে দন্ত পিষে চিৎকার করে বলে,
–“এই, আপনি কাকে বাচ্চা কাচ্চা বলছেন? কে পিচ্চি, হ্যাঁ? কাকে পিচ্চি বলছেন? জানেন আমার বয়স কত? গুনে গুনে একুশ বছর। আপনার সাহস কিভাবে হলো আমাকে পিচ্চি বলার? বলুন, সাহস কিভাবে হলো?”
তার তীক্ষ্ণ গলার স্বর সম্পূর্ণ হলরুমে প্রতিধ্বনি হয়ে কাইলিনের কানে বাজতে থাকে। সে নাক মুখ কুঁচকে মনে মনে ভাবে,
“মেয়ে এটুকু হলেও গলার আওয়াজ আছে,
তার ওপর নাকি একুশ বছর,তাহলে এটুকু কেন?”
তার মুখে হালকা সন্দেহের ছাপ ফুটে উঠে। সে একটু ঝুঁকে, চোখ সরু করে প্রশ্ন করে,
–“আপনার হাইট?”
হাইটের কথা শুনতেই বিপরীত পাশের রমণী খেঁকিয়ে উঠে,
–“আপনার সাহস কি করে হলো আমার হাইট নিয়ে কথা বলার, আপনি জানেন আমার হাইট কত?”
কাইলিন কোনো কথা না বলে নিজের হাত নামিয়ে হাঁটুর কাছে দেখায়, মানে হাঁটু পর্যন্ত।এই ইশারাটা দেখেই রাগে ফেটে পড়ল রমণী।সে নিজের দন্ত খিঁচিয়ে বলে,
–“নিজে তালগাছ বলে কি সবাইকে নিজের মতো ভাবেন? আমি চার ফুট নয় ইঞ্চি। জাস্ট রিমেম্বার, চার ফুট নয় ইঞ্চি একদম পারফেক্ট হাইট বুঝতে পেরেছেন”
কাইলিন তার চিৎকারে বিরক্ত হয়ে কানে হাত দিয়ে মনে মনে ভাবে, সে ভুল কি বলেছে, সে তো ছয় ফুট। চার ফুট অনুযায়ী এই মেয়ে তার হাঁটুর কাছেই পড়ে। এদিকে রমণীর থামার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। সে একটার পর একটা কথা বলেই যাচ্ছে,
–“আপনার এত বড় সাহস কিভাবে হলো আমাকে হাঁটুর সমান বলার? আমার হাইট নিয়ে খোঁটা দেওয়ার”
কাইলিন এবার সরাসরি তার দিকে তাকায়।তার চোখে এক ধরনের অসহায় বিরক্তি। মনে মনে বলে,
“এই জন্যই নারীজাতিকে ভয় লাগে, তারা কিছু না হতেই চিৎকার শুরু করে দেয়। এদিকে সিয়ার একদম পছন্দ না যখন কেউ তাকে তার হাইট নিয়ে অপনাম করে। এটা সে একদমই সহ্য করতে পারে না। কিন্তু পিছন থেকে একটা গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর আসতেই সিয়া থেমে যায়,
–” কাই, হোয়াটস গোয়িং অন দেয়ার?”
কাইলিন পিছনে আরজের দিকে তাকায়,
–“নাথিং, বস। একটা পিচ্চি…মানে ওনি ম্যানশনে হারিয়ে গেছেন”
–“জ্যাক কোথায়?”
–“কন্ট্রোল রুমে”
আরজের তরফ থেকে আর কোনো শব্দ এলো না। দুজনেই চলে যায় কন্ট্রোল রুমের দিকে।
এদিকে সিয়া নিজের মুখ ঢেকে একপাশে সরে যায়। সে আগে আরজের ফ্যান ছিল ইভেন এখনো আছে। কিন্তু সামনাসামনি দেখে তার কেমন যেন ভয় হচ্ছে। এদিকে কাইলিন আরজের পিছনে যেতে যেতে তাকে শুনিয়ে বলে,
–“ছোট মরিচের ঝাঁজ বেশি”
সিয়া দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা হজম করে নিল, কিন্তু তারা দৃষ্টিগোচর হতে না হতেই চিৎকার করে গালি ছুঁড়তে থাকে কাইলিনের দিকে।
ব্ল্যাক ম্যানশন রাতের অন্ধকারে ডুবে গেছে পুরোপুরি। চারদিক নিস্তব্ধ, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেও লুকিয়ে আছে কঠোর নিরাপত্তা। আজকের ঘটনার পর, আরজে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। পুরো ম্যানশনের সব গার্ড বদলে দিয়েছে সে। সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে, প্রতিটা করিডোর, প্রতিটা গেট, সব কিছু আবার চেক করেছে। সব কাজ শেষ করে সে গিয়েছিল আরভির রুমে। ছোট্ট আরভি গভীর ঘুমে ডুবে আছে শান্ত ভাবে।আরজে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল তার দিকে। তার চোখের সেই কঠিনতা একটু নরম হয়ে আসে। ধীরে গিয়ে সে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করে,
–“আই প্রমিস… কেউ তোমার কাছে পৌঁছাতে পারবে না”
তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে যায়। সকালের এই ঘটনার পর সানা আর একবারও সামনে আসেনি। আরজে নব ঘুরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে যাবে তার আগে দরজাটা ভেতর থেকে খুলে যায়। আরজে এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা রমণী কে দেখে। সে নিঃশব্দে তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে যেন নিজেকে বিশ্বাসই করাতে পারছে না। খুব আস্তে ফিসফিস করে আওড়ায়,
–“ওয়াইফি…”
