হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৭
সাবা খান
গভীর নিশুতি নিস্তব্ধ রাতে শহরের অদূরে দাঁড়িয়ে আছে ‘জাওয়ান ম্যানশন’ যেন অন্ধকারের ভেতর এক বিশাল নিঃশব্দ দানব , কিন্তু ভেতরে ভেতরে জীবন্ত। উপরে থেকে দেখলে মনে হবে সব শান্ত, কিন্তু এই শান্তির নিচেই লুকিয়ে আছে নরক। ম্যানশনের নিচে বিস্তৃত বেজমেন্ট জুড়ে রয়েছে একটা না, দুটো না স্তরের পর স্তর লোহার মোটা দরজা, মরিচা ধরা তালা, আর স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল। অনেকগুলো কামরা কিছু ছোট, কিছু বড়, কিছু এমনও আছে যেগুলোর দরজা বছরের পর বছর খোলেনি। ভেতরে আলো ঢোকে কি না সেটাও সন্দেহ। কোথাও শুকনো র*ক্তের দাগ, কোথাও পচা গন্ধ, কোথাও দেয়ালে নখের আঁচড়, যেন কেউ বের হওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়েছিল। কিছু কামরায় নিঃশব্দে বসে আছে কিছু মানুষ, যাদের আশা ফুরিয়ে গেছে এখান থেকে বের হওয়ার। চোখে আলো নেই, মুখে শব্দ নেই শুধু নিঃশ্বাস চলছে কিনা তাও বোঝা দায়। এই জায়গাটা জাওয়ানদের অন্ধকার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়।
ঠিক সেই সময় ধাম করে ভারী দরজাটা খুলে যায়। ভেসে আসে লোহার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার শব্দ। ঝড়ের মতো ভেতরে ঢোকে সোফিয়া জাওয়ান। তার হাঁটার শব্দই যেন বেজমেন্টের দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে তার কানে। সোফিয়ার চোখ দুটো র*ক্তলাল, শ্বাস ভারী, চোয়াল শক্ত। তার পেছনে কয়েকজন আলফা সেনা দৌড়ে আসছে। কিন্তু আজ কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। সোফিয়া একদম সোজা এগিয়ে যায় বেজমেন্টের গভীরে, তার ব্যক্তিগত মিউজিয়ামের দিকে।
দরজা খুলতেই নজরে আসে এক কোণায় চেয়ারে বসে তালহা আদিল ঝিমাচ্ছে। দরজা খোলার শব্দে সে চোখ তোলে এক পলক তাকায় সোফিয়ার দিকে। তারপর আবার চোখ নামিয়ে ফেলে। এই সব এখন তার কাছে স্বাভাবিক। সোফিয়া যেকোনো সময় এখানে চলে আসে আর এখানে কখন রাত কখন দিন তা বুঝার উপায় নেই কেননা এখানটা সবসময় অন্ধকারে ডুবে থাকে।
সোফিয়া কোনো কথা না বলে শুধু একবার হাত নেড়ে ইশারা করে। ব্যাস, তার গার্ডরা এগিয়ে এসে তালহাকে টেনে তোলে। তালহা কোনো প্রতিরোধ না করে চুপচাপ চলে যায়। দরজা আবার বন্ধ হয়ে যায় এবার পুরো ঘরে শুধু সোফিয়া। আর সামনে রাখা একটা বড় কাঁচের বক্স। ভেতরে ইকবাল জাওয়ানের নিথর দেহ সংরক্ষিত করে রাখা।
সোফিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার দিকে। তার হাত পা কাঁপছে, চোখে অদ্ভুত এক উন্মাদনা। সে কাঁচে কাঁপা কাঁপা হাত রাখে। তারপর এক ঝটকায় চিৎকার করে ওঠে,
–“ইকবাল…”
শব্দ গুলো যেন তার কণ্ঠ ফেটে বের হচ্ছে। সে পাগলের মতো বলতে থাকে,
–“রনো এটা কিভাবে করলো…? বলো…
ও কিভাবে বেঁচে আছে…?
ওর তো মরে যাওয়ার কথা ছিল”
তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। সোফিয়া বারবার কাচে আঘাত করে বলতে থাকে,
–“তুমি তো আমার ছিলে… শুধু আমার। আমি তোমাকে কারো সাথে ভাগ করবো না… না। ওই ছেলেটা… ওই ছেলেটা কে…? তোমার… অবৈধ সন্তান?”
হঠাৎ সে হেসে ওঠে একটা ভয়ংকর পাগলামিতে ভরা অট্টহাসি হাসি,
–“কিভাবে বেঁচে থাকতে পারে সে…?
আমি তো সব শেষ করে দিয়েছিলাম। আমি কাউকে তোমার জায়গা নিতে দেবো না…
কাউকে না…আমি শেষ করে দেবো…
ওকেও… তার মাকেও…একে একে সবাইকে”
এক পর্যায়ে সোফিয়া নিজের চুল আঁকড়ে ধরে টানতে থাকে বারবার। চোখে মুখে ফুটে ওঠেছে র*ক্তিম উন্মাদনা। শেষমেশ সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। দু’হাতে নিজের চুল চেপে ধরে মাথা নিচু করে হাঁপাচ্ছে। তার চারপাশে ভারী নিস্তব্ধতা। কিন্তু সেই নীরবতার বেদ করে শোনা যাচ্ছে তার ভাঙা কণ্ঠের বিড়বিড়ানি,
–“কাউকে… তোমাকে নিতে দেবো না…
কিভাবে… কিভাবে বেঁচে থাকতে পারে ও…?
আমি তো ওকে শেষ করে দিয়েছিলাম, আমি নিজে ওকে মেরে দিয়েছিলাম। তুমি কেন ওকে বাঁচিয়েছ, কেন ইকবাল? বলো আমাকে কেন?”
তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। তার হাত কাঁপছে সাথে শ্বাসও কাঁপছে। শব্দ গুলো যেন বহু কসরতে বের হচ্ছে,
–“ও বেঁচে থাকতে পারে না, কোনোমতেই না
আমি মে*রেছি ওকে, আমি নিজে মেরেছি। রনো কেন ওকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। কাল ও সবার সামনে এসে তোমার সাথে ঐ মহিলাটার নাম নিবে, না না না, এসব কিছুই হবে না। আমি তোমার সাথে কারো নাম নিতে দিব না, ও অবৈধ,,,অবৈধ…”
কতক্ষণ সোফিয়া এভাবে বসে থাকে তার হিসাব নেই।এই অন্ধকার, এই পাগলামি, এই শূন্যতা সবকিছুই তার নিজের তৈরি। এখানে তাকে থামানোর কেউ নেই, সান্ত্বনা দেওয়ার কেউ নেই। সে নিজেই নিজের চারপাশটা এতটা ফাঁকা করে ফেলেছে, যে এখন তার চিৎকারও ফিরে আসে না। ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়িয়ে ইকবাল জাওয়ানের কাঁচের বক্সটার সামনে এসে দাঁড়ায় আবার। ধীরে নিজের কপাল কাঁচে ঠেকিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে বসে পড়ে। তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে। এই জায়গাটাই তার কাছে একমাত্র শান্তি। যেখানে তার পাগলামি থামে, যেখানে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারে। শেষমেশ
ক্লান্ত শরীর আর টিকতে পারে না। সে কাঁচে মাথা ঠেকিয়েই ঘুমে তলিয়ে যায়।
রাত যত গভীর হচ্ছে শহরের ব্যস্ততা ততই কমে যাচ্ছে। কিন্তু অন্ধকারের আড়ালে কিছু জায়গা আছে যেখানে রাতই আসল খেলা শুরু হয়, শুরু হয় হিসাব নিকাশ।
ঢাকা শহরের এক অজানা লোকেশনে, বহুতলের নিচে লুকানো জাইফেরার সিক্রেট রুম। বাইরে থেকে সাধারণ অফিস বিল্ডিং মনে হলেও, ভেতরে প্রবেশ করলেই এটার অন্য রূপ বেরিয়ে আসে। লম্বা করিডোর পেরিয়ে, বায়োমেট্রিক দরজার ওপারে থাকা কক্ষের দেয়ালে ডিজিটাল স্ক্রিন, বিভিন্ন দেশের ম্যাপ, রেড ডট মার্ক করা লোকেশন যেন পৃথিবীর প্রতিটা অন্ধকার কোণ এখানে ধরা আছে। মাঝখানে একটা লম্বা টেবিল, তার চারপাশে বসে আছে কয়েকজন মানুষ। তাদের সবাই আলাদা আলাদা জগতের, কিন্তু এক জায়গায় এসে মিলেছে তাদের গন্তব্য। টেবিলের একপাশে বসে আছেন মিসেস দিলরুবা খানম। তার পাশে দাঁড়িয়ে তার বিশ্বস্ত সেক্রেটারি রায়ান।
রুমে উপস্থিত বাকিদের মধ্যে একজন সাবেক ইন্টেলিজেন্স অফিসার, যার পুরো টিম এক রাতে উধাও হয়ে গিয়েছিল সোফিয়ার হাতে। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, যাকে ব্ল্যাকমেইল করে নিজের পুতুল বানিয়েছিল সোফিয়া। এমন আরও অনেকই আছে আর তাদের মধ্যেই বসে আছে এসিপি সিতারা আদিল। সারহাদের কথামতো সে এসেছে দিলরুবা খানমের কাছে তার ভাইয়ের জন্য। সবাই অপেক্ষা করছে একজনের জন্য। সিতারা চারপাশে তাকায় সবাই উপস্থিত, কিন্তু একটা চেয়ারে এখনো কেউ বসেনি। সে ভ্রু কুঁচকে ধীরে বলে,
–“আমরা কার জন্য ওয়েট করছি?”
দিলরুবা খানম হালকা হেসে বলেন,
–“যাকে ছাড়া এই খেলা শুরুই হবে না”
রুমে আবার নীরবতা নেমে আসে। হঠাৎ পিছনের হিডেন দরজাটা ধীরে খুলে যায়।অন্ধকারের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে একটা ছায়া বেরিয়ে আসে তারপর আলোয় পড়তেই স্পষ্ট হয় মুখটা,
“সারহাদ চৌধুরী”
দিলরুবা খানমের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা সন্তুষ্টের হাসি ফুটে ওঠে। সারহাদ একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে এসে দিলরুবা খানমের পাশের চেয়ারে বসে পড়ে। যেন সে এখানকারই অংশ। সিতারা একদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে। যেন সে নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। তার বুকের ভেতর ধকধক শব্দটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
দিলরুবা খানম টেবিলে আঙুল ঠুকে বলেন,
–“লেটস বিগেন”
রুমের স্ক্রিনগুলোতে একে একে সোফিয়া জাওয়ানের ছবি ভেসে ওঠে। তারপর ভিডিও ক্লিপ, অস্ত্র পাচার, মানব পাচার, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, বেজমেন্টে বন্দি মানুষদের ফুটেজ। একজন এজেন্ট দাঁড়িয়ে বলে,
–“সোফিয়া জাওয়ান শুধু একটা মাফিয়া কুইন না, সে একটা সিস্টেম। ওর আলফা টিম ওরা ছায়ার মতো কাজ করে। কোন প্রমাণ রেখে যায় না। আর ওরা সংখ্যায় কত তা সোফিয়া ছাড়া কেউ জানে না”
রুমে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে আসে।তারপর সারহাদ ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,
–“শুধু সোফিয়া না, এই গেমে তিনটা নাম আছে”
স্ক্রিনে নতুন করে তিনটা নাম ভেসে ওঠে, সোফিয়া জাওয়ান, জেনারেল ওয়াসিম হায়দার, ভারতের প্রথম সারির ব্যবসায়ী আলী মির্জা। নান গুলো দেখতেই রুমে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। একজন কর্মকর্তা বিস্ময়ে বলে,
–“ওয়াসিম হায়দার!! সে তো মিলিটারি হেড”
সারহাদ ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলে,
–“দিনে দেশ চালায়… রাতে বাজার”
দিলরুবা খানম চুপচাপ শুনছিলেন। এবার তিনি ধীরে বলেন,
–“আমাদের টার্গেট একটাই ওদের একসাথে নামানো”
–“কিভাবে?”
রায়ান সামনে একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলে,
–“প্রমাণ, লোকেশন, ইনসাইড কন্টাক্ট… সব রেডি হচ্ছে। কিন্তু….”
দিলরুবা খানম রায়হানের বাকিটা বলেন,
–“আমাদের দরকার ভিতরের দরজা খোলার চাবি, যেটা মিস্টার চৌধুরীর কাছে আছে”
সারহাদ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝায়। সিতারা আবার অজান্তেই তাকায় সারহাদের দিকে।ঠিক তখনই হঠাৎ সারহাদ আবার মাথা তুলে তাকায়। দুজনের চোখাচোখি হয় কয়েক সেকেন্ড। সিতারা থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেলে। মিটিং এগিয়ে চলতে থাকে, পরিকল্পনা, আক্রমণ, তথ্য সবকিছু নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। কিন্তু এই পুরো সময়টা সিতারার মন বারবার গিয়ে থামে একজন মানুষের দিকে। আর বিপরীতে থাকা সারহাদ, সে যেন সব বুঝেও কিছুই না বোঝার মতো ভান করে আছে।
কাইলিনের থেকে এত বড় অপমান শোনার পর সিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায়নি সেখানে। এমনিতেই সে খুব কম কথা বলে, নিজের মতো থাকতে পছন্দ করে কিন্তু কেউ যদি তার হাইট নিয়ে কথা বলে তখনই তার সহ্য হয় না। তখন সে কাকে কি বলে ফেলে, নিজেও জানে না। তার একটাই প্রশ্ন,
কেন কেউ তার হাইট নিয়ে কথা বলবে?
রমণী কক্ষে প্রবেশ করতেই নজরে আসে এসপি ডিভানে বসে মোবাইলে গেম খেলছে। সানিতা হয়তো ওয়াশরুমে আছে। সিয়া ধপ করে এসপির সামনের সোফায় বসে বলে,
–“ভাইয়া…”
এসপি মোবাইলের থেকে চোখ না তুলেই বলে,
–“হুম, মিস শালিকা”
সিয়া অভিযোগের সুরে বলে,
–“নিচে একটা তালগাছ আমাকে পিচ্চি বলেছে”
এবার এসপি চোখ তুলে এক পলক তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে দুষ্টু হেসে বলে,
–“কিহ…. কে বলেছে? কার এত বড় সাহস যে আমার একমাত্র শালিকার মুখের উপর সত্যি কথা বলেছে”
সিয়া চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে,
–“ভাইয়া….”
–“ওহ, সরি সরি। কে বলেছে, তাকে আমি ছাড়বো না। যে তালগাছ বলেছে তাকে নেক্সট টাইম আমি অবশ্যই বলে দেবো ডিরেক্টলি মুখের উপর না বলতে। শালা ইন্ডিরেক্টলি বলতে পারতো। বাই দা ওয়ে, নাম কি ওই তালগাছের, যার ব্রেনটা হাঁটুর নিচে?”
–“আমি জানব কিভাবে নাম কি? উনি আমাকে হাঁটু সমানও বলেছে”
–“যাই হোক, তার ব্রেইন টা তাহলে হাঁটুর নিচে না। না হয় কিভাবে বুঝলো তুমি হাঁটু সমান?”
বিপরীতের রমণী এবার সারা ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলে,
–“আমি তোমার নামে সানিতা আপুর কাছে বিচার দিব এক্ষুনি”
কে শুনে কার হুমকি? এসপি উল্টো বলে,
–“লিসেন মিস শালিকা, লোকে তোমাকে হাজারটা কথা বলবেই, কিন্তু তুমি কারো কথায় কান না দিয়ে নির্দ্বিধায় সোজা এগিয়ে যাবে হরলিক্স কোম্পানির দিকে। তারপরও যদি কেউ তোমাকে পিচ্চি বলে তাহলে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার সাথে তোমার বিয়ে দিব। তারপর দেখি, শালা বউকে কীভাবে পিচ্চি বলে”
এবার সিয়ার ইচ্ছা করছে হাত পা ছড়িয়ে বাচ্চাদের মতো কান্না করে দিতে। সবাই কেন তাকে এভাবে তার হাইট নিয়ে অপমান করে। সে কিছু না বলে এসপির দিকে একটা বালিশ ছুড়ে মেরে চলে গেল। নেক্সট টাইম সে এসপির কাছে বিচার দিবে না, ডিরেক্ট সানার কাছে বলবে।
এদিকে সিয়া যাওয়ার পিছনে সানিতা ওয়াশরুম থেকে বের হয়। এসপিকে এভাবে হাসতে দেখেই সে বুঝে ফেলে, নিশ্চিত এই আল্লাহর বান্দা আবারও কারো পিছনে লেগেছে। সে মাঝে মাঝে বুঝতে পারে না এসপি কি শান্তি পায় মানুষকে এতটা জ্বালিয়ে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ে।
ব্ল্যাক ম্যানশনের ভেতরের বক্সিং রুমটা যেন আলাদা এক জগৎ। চারপাশে কালো ম্যাট দেয়াল, ছাদের থেকে ঝুলছে ভারী পাঞ্চিং ব্যাগ, আর মাঝখানে উঁচু করে বানানো বক্সিং রিং যার চারদিক ঘিরে শক্ত দড়ি। লাইটগুলো একটু ডিম করা, কিন্তু রিংয়ের উপর স্পটলাইট পড়ে সবকিছু পরিষ্কার করে তুলছে। সেই রিংয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে দুই কপোত-কপোতী, সানা আর আরজে। ঐসময় সানার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল আরজে। কেননা তার পরনে কালো আর লাল মিশ্রিত বক্সিং ড্রেস, ফিটিং ক্রপ টপ, নিচে শর্টস হাঁটু পর্যন্ত। হাত দুটোতে শক্ত করে বাঁধা গ্লাভস। চুলগুলো উঁচু করে বাঁধা, কয়েকটা এলোমেলো বেবি হেয়ার কপালের পাশে পড়ে আছে। মুখে কোনো মেকআপ নেই, কিন্তু রাগে লাল হয়ে ওঠা চোখ আর কপালের ভাঁজ তাকে অন্যরকম মারাত্মক করে তুলেছে। সে ঐসময় কিছু না বলে আরজের দিকে একজোড়া বক্সিং গ্লাভস এগিয়ে দেয় মানে সে আরজের সাথে বক্সিং খেলতে চায়। আরজে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, তার বউ তার উপর নিজের রাগ মিটানোর জন্য এমনটা করছে।
এখানে এসে আরজে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে নিচু স্বরে আওড়ায়,
–“ওয়াইফি…আর ইউ শিউর?”
সানা ঘাড়ের মটকা দুদিকে ফুটিয়ে ঠান্ডা গলায় শুধালো,
–“ফুল শিউর”
আরজের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। সে গ্লাভস পরা হাত তুলে গার্ড নেয়, কিন্তু দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য সরে না রমণীর উপর থেকে,
–“ওকে….”
সানা এগিয়ে এসে বলে,
–“আমি থ্রি বলার সাথে সাথে স্টার্ট হবে, ওয়ান…. টু…”
পরের মুহূর্তেই “ঠাস” রমণী থ্রি বলার আগেই চালিয়ে দিয়েছে। সানার প্রথম পাঞ্চ সোজা এসে পড়ে আরজের কাঁধে। আরজে একটু দুলে ওঠে, কিন্তু পাল্টা আঘাত করে না। শুধু গার্ড তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। বিপরীতে সানা থামে না। তার তরফ থেকে একটার পর একটা পাঞ্চ ছুঁড়ে যায় আরজের দিকে, কখনো বুকের দিকে, কখনো কাঁধে, কখনো গার্ডে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। আর মুখে বলতে থাকে,
–“এইটার জন্য, একটা”
–“এক মাস আমাকে ইগনোর করার জন্য, আরেকটা”
–“আমাকে পাগল বানানোর জন্য, আরেকটা জোরে”
–“এ লিজে এক অর….”
আরজে শুধু হাত তুলে ঠেকাচ্ছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করলেই এড়াতে পারতো, কিন্তু করছে না। তার চোখে অদ্ভুত এক শান্তি। আরেকটা ঘুষি এবার সরাসরি তার বুকে লাগে। আরজে এক পা পিছিয়ে যায়, ঠোঁটে হাসি টেনে নিচু স্বরে বলে,
–“আর কিছু ভিতরে আছে?”
সানাা এগিয়ে এসে আবারও পাঞ্চ মেরে বলতে থাকে,
–“আপনি ভাবেন সব আপনার কন্ট্রোলে তাই না?”
–“সব সময় আপনার ডিসিশন”
–“আমার কোনো কথা নেই”
–“কতবার বলেছি, আমি বিডিতে আসবো না। আমাকে টেনে নিয়ে এসেছেন। এই নেন”
শেষ ঘুষিটা একটু বেশি জোরে পড়ে, যার কারণে আরজের ঠোঁটের কোণে হালকা কেটে যায়। এক ফোঁটা র*ক্ত বেরিয়ে আসে। সানা থেমে যায় এক মুহূর্তের জন্য। সে তড়িঘড়ি করে বিচলিত হয়ে পড়ে,
–“রানভীর, আর ইউ ওকে?”
আরজে হাত তুলে ‘ওকে’ বুঝায়। সানা দাড়িয়ে পড়ে। তার শ্বাস ভারী হয়ে গেছে, সাথে বুক উঠানামা করছে দ্রুত। আরজে জিভ দিয়ে ঠোঁটের রক্তটা ছুঁয়ে হালকা হেসে বলে,
–“শেষ?”
–“না…”
এই বলে সে আবার এগিয়ে এসে পাঞ্চ মারতে যাবে তার আগেই আরজে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে তার গ্লাভস ধরা হাতটা আটকে ফেলে। সানা থমকে গর্জে ওঠে,
–“ছাড়ুন..”
আরজে একটুও না ছেড়ে ধীরে ধীরে তাকে নিজের দিকে টেনে এনে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে আওড়ায়,
–“রাগ শেষ?”
সানা চোখ রাঙিয়ে বলে,
–“না”
আরজে আরও কাছে ঝুঁকে আসে,
–“ওকে দ্যান গো এহেড”
এক মুহূর্ত, তারপর সানা আর ঘুষি মারে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে তার দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। আরজে ধীরে ধীরে তার গ্লাভস পরা হাত দুটো নিচে নামিয়ে তাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে ফিসফিস করে,
–“বেইবি, দ্যাট ড্রেস অন ইউ, ইটস নট জাস্ট হট, ইটস লিথাল”
সানা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে বলে,
–“অসভ্য লোক”
সে হাত ছাড়িয়ে এক ধাক্কা দেয় আরজেকে।
সানা সত্যিই হাঁপিয়ে উঠেছে। তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে গালে, গলা বেয়ে নিচে নামছে। অবশেষে সে আর পারছে না, হাঁটুতে হাত রেখে ঝুঁকে পড়ে ঘন ঘন শ্বাস নিতে থাকে। আরজে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে সে নিজের গ্লাভস খুলে ফেলে। সেগুলো একপাশে ছুঁড়ে দিয়ে রিংয়ের দড়ি টপকে নিচে নামে, তারপর একটা পানির বোতল তুলে আবার সানার দিকে এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে হালকা হেসে বলে,
–“কি ওয়াইফি… ব্যাস এইটুকুই?”
সানা আড়চোখে তাকায় তার দিকে। চোখে বিরক্তি স্পষ্ট নিয়ে বলে,
–“আপনি একদম কথা বলবেন না”
এই বলে সেখানেই ধপ করে বসে পড়ে। আরজে নিচু হয়ে বোতলটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
–“পানি খাও”
সানা কিছু না বলে বোতলটা নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেতে থাকে। কয়েক সেকেন্ড পর বোতল নামিয়ে যখন তাকায়, তখনই থমকে যায়। আরজে তার দিকে কেমন ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সানার বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে। সে অজান্তেই একটু পিছিয়ে যায়, নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে তেরচা চোখে তাকিয়ে বলে,
–“এভাবে তাকাচ্ছেন কেন?”
আরজে একচুলও না সরে, একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে বলে,
–“কেননা… এখন খেলব আমি”
সানা ভ্রু কুঁচকে সোজা হয়ে বসে,
–“কিসের খেলা? আমি আর খেলতে পারব না, হাপিয়ে গেছি। আজকের মতো শেষ। আপনার যদি এতই খেলতে ইচ্ছে করে, কাইলিন বা জ্যাককে ডাকুন, আমি নাই”
আরজে এবার মৃদু হেসে সামনে এগিয়ে এসে হঠাৎ এক হাতে সানার কোমর জড়িয়ে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে। রমণী হকচকিয়ে যায়,
–“এই, কি করছেন”
কথা শেষ করার আগেই আরজে তার চোখে চোখ রেখে নিচু স্বরে বলে,
–“এই খেলা অন্য কারো সাথে হয় না, এই খেলার জন্য শুধু তোমাকেই লাগবে”
সানার বুক ধড়ফড় করতে থাকে। বিরক্তির সুরে বলে,
–“কিসের খেলা হ্যাঁ? পরিষ্কার করে বলুন..”
আরজে ঠোঁট কামড়ে হেসে একটু ঝুঁকে আসে। তার গরম নিঃশ্বাস আঁচড়ে পড়ে সানার গালে,
–“তুমি আগে বলো…এখানে খেলব… নাকি বেডরুমে?”
তার বাক্যটুকু শ্রবণ হতেই সানার চোখ বড় হয়ে যায়। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আরজের কণ্ঠদেশে জোরে কামড় বসিয়ে বলে,
–“আপনি ভালো হবেন না, তাই না”
আরজে এক হাতে তার কব্জি ধরে, অন্য হাতে আরও শক্ত করে নিজের কাছে টেনে আনে,
–“বউ কাছে থাকলে, ছেলেরা কোনোদিন ভালো হয় না”
এই বলে একটানে রমণীর মুখ নিজের দিকে টেনে এনে সানার অধর জোড়া দখল করে নেয়। প্রথমে সানা ছটফট করে ওঠে। তার হাত দুটো আরজের বুকে আঘাত করে। কিন্তু ধীরে ধীরে তার হাতের চাপ কমে আসে। একসময় সেই হাত দুটো নিজে থেকেই উঠে গিয়ে আরজের কাঁধে ঠেকে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যায় দুজনেরই। কিছুক্ষণ পর আরজে হঠাৎ সানাকে কোলে তুলে নেয়। সানা চমকে তার কাঁধে হালকা চাপড় মেরে বলে,
–“নামান আমাকে, আপনি পাগল নাকি”
আরজে হাঁটতে হাঁটতে মুচকি হেসে বলে,
–“হ্যাঁ, তোমার জন্যই..”
সে রিং থেকে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। তার পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে বাজতে থাকে ফাঁকা রুমে। সানা লজ্জায় তার কাঁধে মুখ গুঁজে গজগজ করে,
–“আমি কিন্তু ছাড়ব না আপনাকে”
–“আমি চাইও না, তুমি ছাড়ো”
তারপর ধীরে ধীরে বক্সিং রুমের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
আরজের কক্ষের বড় আরশির সামনে বসে আছে সানা। পিছনে আরজে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে দিচ্ছে তার। সে এদিকে বসে বসে আরজের সব পারফিউমগুলো ট্রাই করে দেখছে। আজ থেকে নাকি আরজে ওই মসেরা পারফিউম ইউজ না করে নতুন পারফিউম ইউজ করবে, আর সেটা নাকি সানা সিলেক্ট করে দিবে। এজন্য সে সবগুলো ট্রাই করে দেখছে।
অন্যদিকে আরজের মাথায় ঘুরছে অন্য কথা। আজকে সানার ব্যবহার সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল তার জন্য। সানা যে কখনো সোফিয়াকে গুলি করবে, এটা তার ভাবনাতেও ছিল না। বা হয়তো কেউই ভাবতে পারেনি এত বড় একটা কাজ না করে বসবে। নাহ, মেয়েটা সত্যি আগের থেকে অনেক চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাকে এসব কে শিখিয়েছে? ওই বারোভাতারিটা?
হয়তো, যতই এসপি মুখে বলুক কিছু করে নাই, কিন্তু আরজের সন্দেহের কাতারে সবচেয়ে আগে এসপির নামটাই থাকে। মনের পাতায় নানা রকম চিন্তা উঁকি দিচ্ছে তার। হঠাৎ সে সানাকে প্রশ্ন করে বসে,
–“ওয়াইফি…”
–“হুম”
–“জাস্ট থিঙ্ক, বন্দুকের সামনে আমি আর ওই…”
এই নামটা সে বলতে চায় না, তারপরও দন্ত চেপে বলে,
–“বারোভাতারিটা আছি, তুমি যে কোনো একজনকে বাঁচাতে পারবে। তাহলে কাকে চুজ করবে?”
রমণী তার এমন উদ্ভট প্রশ্নে ভ্রু কুঁচকালো। মানে এসব কি! এই লোক স্বপ্নেও মনে হয় এসপির পিছনে পড়ে থাকে, আর এসপিটাও। কী দরকার বারবার আরজের কানের কাছে দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলার। সানা একটু ভেবে বলে,
–“এমন হলে আমি থিঙ্ক করা বন্ধ করে দিব। ব্যাস তাহলে আপনারা দুজনেই বেঁচে যাবেন”
–“নো, ইউ ক্যান্ট ডু দিস”
আরজে একরাশ আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে, সানা নিশ্চয়ই তার কথাই বলবে। কিন্তু তার আশাকে ভেঙে দিয়ে রমণী উত্তর করে,
–“তাহলে আমি নিজের জীবন নিয়ে পালাবো”
–“কেন?”
রমণী মনে মনে দুষ্টু হাসি চেপে আওড়ায়,
–“আরে বাবা, কখন আবার বন্দুক আমার দিকে ঘুরে যায় বলা তো যায় না। তাই আগে নিজেকে বাঁচানো ফরজ। নিজে বাঁচলে আরো বিয়ে করা যাবে, এমন আরো কত ফালতু ভাবনা মাথায় আসবে”
রমণী বলতে দেরি এদিকে বিপরীতে মানবের চোয়াল শক্ত হতে দেরি হয়নি। সে হঠাৎ শক্ত হাতে রমণীর পেলব চিবুক চেপে ধরে উপরে তুলে দন্ত পিষে বলে,
–“কি বললে? আবার বলো”
সানা আরজেকে এতটা রাগতে দেখে তড়িঘড়ি করে নিজের বুলি পাল্টে ফেলে,
–“কি কি.. বলেছি আমি?
আহহহ….. কু*ত্তা”
সানা আর কিছু বলার আগেই আরজে ঝুঁকে তার গ্রীবায় দন্ত বসিয়ে দিল। সানা দুই হাতে তাকে সরাতে সরাতে বলে,
–“আরে লাইফেও আর বিয়ে করা তো দূরের কথা, বিয়ের নামসহ ভুলে যাব, ছাড়ুন”
আরজে ছেড়ে দিয়ে সেখানটায় নাক ঘষে কিছু বলার আগেই হঠাৎ তাদের দরজায় করাঘাত পড়ে। কেউ অস্থিরভাবে বারবার ধাক্কা দিচ্ছে। দুজনে ভ্রু কুচকে তাকায়। সানা বলে,
–“এত রাতে আবার কে এসেছে”
আরজে বিরক্ত সূচক কণ্ঠে প্রতুত্তর করে,
–“নিশ্চয়, যার বউ নাই। নাহয় বউয়ের কাছেই থাকতো”
সানা তার।কথা পাত্তা না দিয়ে তাকে সরিয়ে দরজা খুলতেই দেখে এসপি দাঁড়িয়ে আছে। সামনের মানবের চোখে মুখে চিন্তার চাপ। সে কোনো মতে বলে,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৬
–“সানা… ওই সানি..সানি..”
–“কি হয়েছে সানিতার?”
–“আই ডোন্ট নো, তাড়াতাড়ি আয় তুই”
এসপির এমন অস্থিরতা দেখে সানা নিজেও চিন্তিত হয়ে পড়ে। সে আর কিছু না বলে তার সাথে যায়। আরজে ফিসফিস করে আওড়ায়,
–“শালা ব্রেইন ওয়াশ করে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে”
আরজেও সানার পিছু পিছু আসে।
