হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (৫)
সাবা খান
জাওয়ান ম্যানশনের বেজমেন্টের সোফিয়ার সেই অভিশপ্ত কক্ষের ভেতরে যেখানে প্রতিটা দেয়াল যেন ইতিহাস নয়, বরং পাপের সাক্ষী। সোফিয়ার বহু সখের এই মিউজিয়াম, কিন্তু বাস্তবে এটা একটা বিকৃত প্রদর্শনী, যেখানে মানুষকে স্মৃতি হিসেবে নয়, ট্রফি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেই কক্ষে সারহাদ দাঁড়িয়ে চারদিকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে তার কাঙ্ক্ষিত জিনিস টার জন্য। সে সোফিয়ার এমন অদ্ভুত ইচ্ছার ব্যাপারে ভালোভাবে অবগত। তালহা কে একটু আগে আবু নিয়ে গেছে। দীর্ঘ ক্লান্তিকর সময় টুকু কেটে আজ তালহা সত্যিই মুক্তির স্বাদ পেতে চলছে। অন্য দিকে সিতারা দিহানের সাথে মিলে এবিডেন্স কালেক্ট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সারহাদ প্রতিটা কাঁচের বক্স খেয়াল করছে ঘরের নজরে আসে প্রতিটা বক্সের ভেতরে মানব দেহের অঙ্গ পতঙ্গ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। হঠাৎ সারহাদের দৃষ্টি আটকে আছে সামনের পাশাপাশি দুটো বক্সে। তার মনে হচ্ছে সময় যেন হঠাৎ থমকে গেছে কেননা প্রথম বক্সটার কাঁচের ভেতরে সংরক্ষিত দুটি চোখ, জীবনহীন তবুও যেন তাকিয়ে আছে। আর পাশের বক্সে একটা হৃদপিণ্ড। আর দুটো বক্সের নিচে লেখা ফাহাদ চৌধুরী ও আজাদ চৌধুরীর নাম। এক মুহূর্তে সারহাদের বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ে। কণ্ঠনালি ফুঁড়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। সে তার বাবার লাশটুকুও পায়নি, কবর দেওয়ার মতো একটা শরীরও না। আর আজ এইভাবে তার চোখের সামনে তার বাবার চোখ আর তার দাদার হৃদপিণ্ড। তার কৃষ্ণকালো চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে। ধীরে ধীরে এক ফোঁটা জল কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। সে চোখ বন্ধ করে ফেলে এক মুহূর্তের জন্য। অন্ধকারের ভেতর ভেসে ওঠে পুরনো স্মৃতি। পর মুহূর্তে আবার সে চোখ খুলে পেলে। সারহাদ কাঁপা কাঁপা হাতে বক্সটার ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে আওড়ায়,
–“ড্যাড, তুমি শেষ নিঃশ্বাসের আগ পর্যন্ত এই চোখ দুটো আমার সাথে মিলাওনি। আমি কতবার চেয়েছিলাম, একবার…শুধু একবার তুমি আমার দিকে তাকাও…”
সারহাদের আঙুল কাঁচের উপর শক্ত হয়ে যায় সাথে গলাটাও ভারী হয়ে আসছে। সে একটু থেমে ফের আওড়ায়,
–“কিন্তু তুমি তাকাওনি, একবারও না। আর আজ দেখো আঠারো বছর পর, আমি দাঁড়িয়ে আছি, আর তুমি… এইভাবে… আমার দিকে তাকিয়ে আছো”
তার কণ্ঠ ভেঙে যায়, শব্দ গুলো গলায় জড়িয়ে আসছে তারপরও বহু কসরতে বের হয়,
–”ড্যাড, এটাই কি ছিল আমাদের শেষ দেখা হওয়ার নিয়তি। আমি তোমাকে কবর দিতে পারিনি। শেষ বিদায়ও জানাতে পারিনি। কিন্তু আজ….আজ আমি তোমাকে নিয়ে যাবো এই নরক থেকে সম্মানের সাথে”
তারপর ধীরে সে পাশের বক্সটার দিকে তাকায়। হঠাৎ সারহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। এতক্ষণের নমনীয়তা উড়ে গিয়ে আসে হিংস্রতা। পিছনে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে ডাকে,
–“এজাজ… ইয়ান”
দুজন দ্রুত এগিয়ে আসে। সারহাদ চোখ না সরিয়েই বলে,
–“এই দুটো বক্স, অত্যন্ত যত্ন করে নিয়ে যাও। এগুলো আর এখানে থাকবে না। এগুলো তাদের জায়গায় যাবে”
এজাজ আর ইয়ান মাথা নাড়িয়ে অত্যন্ত সাবধানে তারা বক্স দুটো তুলে বেড়িয়ে যায়। সারহাদ এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে চারপাশে তাকায়, এই বিকৃত মিউজিয়ামের দিকে। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে ওঠে। হিসহিসিয়ে বলে,
–“মিসেস সোফিয়া জাওয়ান, এনজয় ইয়োর লাস্ট টাইম”
তারপর সারহাদ একদল ইন্টারপোলের টিম ও তার গার্ড নিয়ে এগিয়ে যায় বেজমেন্টের আরও গভীরে। শেষে একটা দরজার সামনে এসে থামে সে। সারহাদ খুব ভালো করে জানে দরজার ওপারে কে আছে। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা কাটিয়ে সারহাদ ধীরে মাথা কাত করে দরজার দিকে তাকায়। ঠোঁট বাঁকিয়ে ফিসফিস করে
–“আঠারো বছরের হিসাব, আজ মিটাবো”
সমুদ্রের উপর ঘন কালো আঁধারের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে দানবীয় মার্কানের জাহাজ ড্যাসেল। চারদিকে শুধু ঢেউয়ের শব্দ কিন্তু ড্যাসেলের ভেতরে মৃত্যুর গন্ধ, ধোঁয়া, বারুদের তীব্র ঝাঁজ। ঠিক সেই মুহূর্তে আরজে তার কাটার পর একদম নিস্তব্ধতায় চেয়ে যায় পুরো কক্ষ, কোনো বিস্ফোরণ না, কোনো শব্দ না। চারপাশে হঠাৎ এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। সানা শক্ত করে বন্ধ করে রাখা চোখ ধীরে ধীরে খুলে। রমণীর বুক দ্রুত উঠানামা করছে। আতঙ্কিত হাত এখনো কাঁপছে। সে চোখ তুলে চারদিকে তাকায় তারপর দৃষ্টি থামে আরজের দিকে।
বিপরীতে আরজের বুক থেকেও একটা গভীর স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। যেন এতক্ষণ সে নিজের প্রাণটা আটকে রেখেছিল। রমণীর চোখের কোণটা চিকচিক করে ওঠে। আরজে ধীরে হাত বাড়িয়ে সানার কাঁপা হাতটা নিজের মুঠোয় নেয়। তার উষ্ণ আঙুলের স্পর্শে সানার কাঁপুনি একটু থামে। চোখাচোখি হয় দুজনের, কয়েকটা মুহূর্ত কোনো কথা নেই শুধু একে অপরকে দেখছে। ধীরে ধীরে দুজনের ঠোঁটের কোণে একসাথে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি।
এদিকে সানার বুকের সাথে লেপ্টে থাকা ছোট্ট আরভি দুইদিনের না-ঘুম, না-খাওয়া, নির্যাতনের পর ধীরে ধীরে মায়ের উষ্ণতা অনুভব করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। তার ছোট্ট হাতটা এখনো সানার জামা আঁকড়ে ধরা। আরজে ধীরে তাকে নিজের কোলে তুলে নেয়। মুহূর্তে তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। ছেলের শরীরটা কত হালকা হয়ে গেছে, কত নিস্তেজ। সে আরেকটু শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে। এই দুইদিন, প্রতিটা সেকেন্ড তার মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু তার ছেলে ছিল।
আর এখন ছেলেটা তার কোলে নিরাপদ ভাবে আছে। সাথে সাথে তার বুকের ভেতর জমে থাকা আগুন, রাগ, হিংস্রতা সবকিছুর মাঝে একটা শান্তির ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে। সে মাথা নিচু করে আরভির কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে,
–“ড্যাড এসে গেছে, কেউ আর তোমাকে ছুঁতেও পারবে না”
হঠাৎ দুজনের কানে আসে পিছন থেকে ভারী পায়ের শব্দ। এসপি হাপাতে হাপাতে কক্ষে প্রবেশ করে তার কাঁধে ঝুলে আছে জ্যাক। জ্যাকের অবস্থা ভয়ংকর, মুখে আঘাতের চিহ্ন, ঠোঁট ফেটে গেছে, চোখ আধখোলা, শরীর প্রায় নিস্তেজ। পিছন থেকে দুজন গার্ড এসে জ্যাককে ধরে ফেলে। তারা তাকে দুই দিক থেকে কাঁধে তুলে নেয়।
আরজেরা বের হওয়ার আগেই জাহাজের নিচের দিক থেকে একটা বিকট বিস্ফোরণ শব্দ আসে। সাথে সাথে মেঝে কেঁপে ওঠে। আরজের লাগানো বোমগুলো একে একে ফাটতে শুরু করেছে। আরেকটা বোম ফেটে যায়। চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। ধোঁয়া উঠে আসছে করিডোর ভরে।
ড্যাসেলের নিচতলায় মার্কানের বাকি সৈন্য, অস্ত্রাগার, সার্জারি ইউনিট সবকিছু আগুনে গ্রাস হতে শুরু করেছে। আরজে আরভিকে এক হাতে শক্ত করে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে অন্য হাতে সানার হাতটা ধরে বলে,
–“লেটস গো”
সানা কিছু না বলে তার সাথে পা বাড়ায়।
জাহাজের বাইরে তখন বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত রূপ। সমুদ্রের কালো পানির ওপর আগুনের লাল ছায়া প্রতিফলিত হচ্ছে। বিলাসবহুল ড্যাসেল ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে, চারদিকে একে একে হচ্ছে বিস্ফোরণের পর বিস্ফোরণ। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই মার্কান আগেই প্রস্তুত রাখা একটা স্পিডবোটে উঠে পড়েছে। তার সাথে থমাস আর কয়েকজন বাকি গার্ড। থমাসের এক হাত শক্ত করে ধরা ঈশানীর কব্জি। অন্য হাতটা শক্ত করে ধরে আছে মার্কান, যেন সে জানে, এক মুহূর্ত ঢিলে দিলেই ছেলে হারিয়ে যাবে।
থমাস সবার পরে স্পিডবোটে এক পা রাখতেই ঈশানী সুযোগ বুঝে হঠাৎ এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে দেয়। পুরো শক্তি দিয়ে ঠেলে দেয় থমাসকে। থমাস এমনিতেই আঘাতে জর্জরিত তারউপর আকষ্মিক ধাক্কায় ভারসাম্য হারিয়ে স্পিডবোটের ভেতর পড়ে যায়। ঈশানী কোনোভাবে জাহাজের ধারে শক্ত করে ধরে ফেলে। রমণীর চোখ দুটো ভয়ে, রাগে, ঘৃণায় কাঁপছে। থমাস উঠে দাঁড়াতেই আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় জাহাজের দিকে। চিৎকার করে বলে,
–“ঈশা…..”
কিন্তু মার্কান তাকে পিছন শক্ত করে টেনে ধরে কড়া গলায় বলে,
–“স্টপ থমাস, পাগল হয়ে গেছিস?”
তাদের চারপাশটা ইতিমধ্যেই আরজের হেলিকপ্টার গুলো ঘিরে ফেলেছে। উপরে লাল লেজার লাইট থমাসদের গায়ে এসে পড়েছে। চারদিকে আরজের গার্ডরা বন্দুক তাক করে আছে। কাইলিনও এসে পৌঁছে গেছে। মার্কান তড়িঘড়ি করে রিমোটের বাটন চাপল, কিন্তু নাহ, কিছুই হলো না। তার চোখ এক মুহূর্তে বড় হয়ে যায়। বিষয় টা তার বুঝে আসতেই সে দন্ত চেপে আওড়ায়,
–“ডিফিউজ…”
সে বুঝে যায় আরজে বোমটা নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। রাগে সে রিমোটটা ছুড়ে ফেলে দেয় সমুদ্রে। তারপর থমাসকে টানতে থাকে,
–“চল, এখনই”
কিন্তু থমাস নড়ছে না, সে ভয়, মৃত্যুর ঝুঁকি কোনকিছুর তোয়াক্কা না করে আবার জাহাজের দিকে ঝুঁকে শেষ প্রান্তের একটা লোহার শিক শক্ত করে ধরে। ওদিকে ঈশানীও জাহাজের একপাশে ঝুলে আছে। শরীর দুর্বল থাকার কারণে তার হাতও ফসকে যাচ্ছে। ঠিক তখনই কাইলিন দৌড়ে এসে তাকে টেনে তোলে। ঈশানী উঠে এলেও তার চোখ একদৃষ্টিতে থমাসের দিকে তাকিয়ে আছে। থমাসের চোখ এখন আর আগের মতো না।
সেখানে আর সেই সাইকো হাসি নেই,নেই সেই হিংস্রতা। সে তার কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দেয় ঈশানীর দিকে। অনুনয়ের সুরে বলে,
–“ঈশা… প্লিজ, চলে আসো, প্লিজ ঈশা কাম টু মি”
বিপরীতে রমণীর বুক উঠানামা করছে দ্রুত। তার চোখে জল… তবুও মুখ শক্ত করে চিৎকার করে বলে,
–“আমি তোর মতো জানোয়ারের সাথে কখনোই যাবো না”
থমাস যেন শুনছেই না তার একটা বাক্যও। সে আবার হাত বাড়ায় আরো একটু সামনে ঝুঁকে। তারপর ভাঙা ভাঙা স্বরে বলে,
–“এই ঈশা রানী প্লিজ, একবার তাকাও আমার দিকে, একবার শুধু একবার। এই চোখদুটো দেখো, দেখো না, আমি আর ওই মানুষটা নেই। আমি ভেঙে গেছি ঈশা, পুরোপুরি ভেঙে গেছি”
বিপরীতে রমণী চিৎকার করে ওঠে,
–“তোর দিকে তাকাতেও আমার ঘৃণা করছে”
তার মুখ থেকে নিঃসৃত হওয়া প্রতিটা শব্দ যেন থমাসের বুকে ছুরি হয়ে বিঁধছে। তবুও হাল না ছেড়ে আবারও বলে,
–“এই ঈশা, তুমি চলে গেলে আমি বাঁচব না। সত্যি বলছি, আমি তো আগেই মরে গেছি… শুধু তোমার জন্য শ্বাস নিচ্ছি এখনো। এই নয় বছরে, তুই জানিস না আমি কতবার মরেছি। প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত, তোর সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিজের ভালোবাসার চোখে অন্য কাউকে দেখেছি”
–“তোর মতো জানোয়ারের মুখে ভালোবাসা শব্দ টা মানায় না”
এদিকে মার্কান ছেলের উপর একদম বিরক্ত। মৃত্যুর দুয়ারে এসেও সে ভালোবাসা খুঁজছে। তার স্পিডবোটটা অত্যাধুনিক যার কারণে এটা পানির নিচেও চলতে পারে কিন্তু এই পাগল ছেলেটা আসলে তো। সে পেছন থেকে টেনে বলে,
–“থমাস, মাই বয়, লেটস গো’
কিন্তু বিপরীতে মানব ছাড়ছে না। থমাস আবারও অনুরোধের সুরে বলে,
–“আমি জানি আমি খারাপ, খুব খারাপ। আমি জানি তুই আমাকে ঘৃণা করিস, করা উচিত। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই ভালোবাসাটা মিথ্যা না রে ঈশা, একটুও না। আমি প্রথমবার তোর দিকে তাকিয়েই বুঝেছিলাম,
‘তুই আমার সর্বনাশ’ আর আজ দেখ, তুই না থাকলে আমি এক সেকেন্ডও টিকে থাকতে পারছি না। তোর জন্য, শুধুমাত্র তোর জন্য আমি ম্যানেজার হয়েছি নাহলে আমি চাইলেই রওনাক হয়ে ঐ ম্যানশনে থাকতে পারতাম। প্লিজ, আমার হাতটা ধর, আমি আর কিছু চাই না, কিছুই না”
কথা গুলো বলতে বলতে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে তার চোখ থেকে। সে আরেক টু এগিয়ে যায়। তার এই আকুতি ভরা মিনতি শুনে বিপরীতে রমণী কি গললো?
নাহ, ঈশানী মাথা নেড়ে পিছিয়ে যায়,
–‘না”
–“এই ক্ষমতা, এই রক্ত, এই নোংরা দুনিয়া, আমি সব ছেড়ে দেব। আমি তোর সাথে কোথাও চলে যাব, খুব দূরে। যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না। আমি প্রতিটা দিন নতুন করে শুরু করব তোর জন্য। শুধু একবার একবার আমার হাতটা ধর। প্লিজ একটাবার আয় না ঈশা রানী…দেখ, আমি কাঁদছি ঈশা। আমি কখনো কাঁদিনি, আজ কাঁদছি তোর জন্য। আমি ভিক্ষা চাইছি। আমাকে ফেলে যাস না প্লিজ, আমি একা থাকতে পারব না। প্লিজ ঈশা… প্লিজ… চলে আসো। আমি আর কারোর ক্ষতি করব না”
চোখ দিয়ে গরগর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে ঈশানীর। তারপরও নিজের জিদে অটল সে। তাই চিৎকার করে বলে,
–“আমি মরে গেলেও তোর মতো জানোয়ারের সাথে যাব না”
ঈশানীর মুখে মরার শব্দ শুনেই থমকে যায় থমাস। পরমুহূর্তেই আবারও এগিয়ে এসে বলে,
–“ঈশা…..”
তার কণ্ঠ থেকে আর বাকিটা বেরুনোর আগেই পর পর দুটো গুলি চলে যায় থমাসের পায়ে। তার সারা শরীর কেঁপে ওঠে। ব্যথায় মুখ কুঁচকে যায়, তবুও শিক ছাড়ে না। সে প্রায় পড়ে যাচ্ছে। আরেকটা গুলি তার বুকে লাগার আগেই মার্কান ছেলের সামনে এসে দাঁড়ায়। সাথে সাথে গুলিটা তার কাঁধে লাগে। থমাস চিৎকার করে ওঠে,
–“ড্যাড…..”
মার্কান ছেলের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বোটে লুটিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মার্কানের লোকগুলো বন্দুক তাক করে আরজের গার্ডের দিকে। আর থমাস, সে বাবার দেহটাকে পিছনে ফেলে তার দুটো পা চলছে না গুলি লাগার কারণে। তারপরও পা টেনে টেনে ব্যথায় নাক মুখ কুঁচকে শিক ধরে জাহাজে উঠতে যাবে ঠিক তখনই উপরের হেলিকপ্টার গুলো থেকে নেমে আসে গুলির ঝড়। সবগুলো হেলিকপ্টার থেকে একসাথে গুলি ছুঁড়া হচ্ছে। সাথে সাথে ঈশানী সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে ওঠে,
–“না, প্লিজ না…ওকে মেরো না… প্লিজ… ও আমার বন্ধু ছিল। প্লিজ স্টপ……রওনাক….”
চিৎকার গুলো তার গলা ফাটিয়ে বের হচ্ছে। কাইলিন হাত তুলে ইশারা করতেই থেমে যায় সবাই। রমণী কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ে। মাথা নিচু করে কাঁদছে সে। ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। গুলিতে ঝাঁঝড়া হয়ে গেছে থমাসের পুরো শরীর। থমাসের শরীর ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে। তার হাত এখনো বাড়ানো ঈশানীর দিকে। শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ফিসফিস করে আওড়ায়,
–“ঈশা প্লিজ…একটা বার… হাতটা ধরো।
তার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে,
–“একবার… আমার কাছে আসো,
ঈশা রানী….”
তার আঙুলগুলো কাঁপছে, সাথে ধীরে ধীরে শক্তি হারাচ্ছে। ধীরে ধীরে তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু শেষ বারের মতো দুচোখ ভরে দেখে নিল তার ঈশা রানীকে, তার না পাওয়া ভালোবাসাকে। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে তাচ্ছিল্যের একটা হাসি। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে এক ফোটা উষ্ণ অশ্রুজল। ব্যাস, একটা শেষ নিশ্বাস আর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো আরেকটা অপূর্ণ আত্মা। তার শরীরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে যায়, কিন্তু হাতটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়ানোই থাকে ঈশানীর দিকে।
চারদিকে তখন আগুনের লেলিহান শিখা। ড্যাসেল জাহাজটা যেন ধীরে ধীরে নিজের মৃত্যু নিজেই লিখছে। একটার পর একটা বিস্ফোরণ হচ্ছে। ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। এই আগুনের মাঝেই আরজে আর সানা বেরিয়ে আসে। সানার চোখ প্রথমেই খুঁজে পায় নিচে বসে থাকা ঈশানীকে। সে মাটিতে বসে আছে মাথা নিচু করে ‘রওমাক’ বলে চিৎকার করে কাঁদছে, তার চোখের পানি থামছে না। সানা একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তার দিকে এগিয়ে যাবে তার আগেই আরজে তার হাত চেপে ধরে। সানা অবাক হয়ে তাকায়,
–“কি করছেন? ওখানে ঈশানী….”
আরজে কিছু না বলে কোলে থাকা আরভিকে পাশে থাকা এক গার্ডের হাতে তুলে দেয়। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সানাকে তুলে নেয় নিজের কোলে। রমণী বিরক্ত সূচক কণ্ঠে শুধালো
–“রানভীর, আমাকে নামান। আমি ঈশানীর কাছে যাব”
কিন্তু বিপরীতে মানব একটাও কথা না বলে সোজা তাকে নিয়ে এগিয়ে যায় হেলিকপ্টারের দিকে। পেছনে আগুন, বিস্ফোরণ আর সামনে তার নির্লিপ্ত, কঠিন মুখ। আরজে হেলিকপ্টারে উঠে সানাকে পাশে সিটে বসিয়ে দেয়। তারপর আরভিকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে এক হাতে ছেলেকে আঁকড়ে ধরে অন্য হাত দিয়ে সানার কোমর জড়িয়ে টেনে নেয় নিজের কাছে। তার মাথাটা সিটে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। একটা দীর্ঘ শ্বাস বেড়িয়ে আসে ভিতর থেকে। যেন দুই দিনের ঝড় শেষে আজ প্রথমবার সে শান্ত। তার বুকের ভেতর এতক্ষণ ধরে জ্বলতে থাকা আগুনটা ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। কিন্তু পাশে বসা রমণী থামছে না। সে আরজের দিকে তাকিয়ে দন্ত চেপে বলে,
–“আপনি, আমাকে এখানে বসিয়ে রেখেছেন কেন?
ঈশানী ওখানে একা, আমি ওর কাছে যাব।
ওর কি অবস্থা দেখেছেন?
আমি ওকে ফেলে কোথাও যাব না, রানভীর।
শুনছেন আপনি, আমি নামছি…”
সে উঠে দাঁড়াতে গেলে আরজে শক্ত করে তাকে টেনে বসিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
–“সিট ডাউন'”
সানা ক্ষুব্ধ হয়ে তাকায়,
–“আপনি এমন কেন…..”
রমণী কে আর বাকিটা বলতে না দিয়ে আরজে চোখ খুলে তার দিকে তাকায়। তারপর খুব ধীরে বলে,
–“কজ, সামওয়ান ইজ কামিং ফর হার”
সানা থেমে ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
–“মানে…?”
ঠিক তখনই রমণীর চোখ চলে যায় দূরের দিকে।যেখানে অন্ধকার আকাশেট বুক চিরে একটা হেলিকপ্টার দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে। সানার চোখ বড় হয়ে যায়,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (৪)
–“এটা কে…?”
হেলিকপ্টারটা কাছে এসে থামার আগেই সেখান থেকে একজন লাফিয়ে নামে। পুরোপুরি উন্মাদের মতো দৌড়ে যায় ঈশানীর দিকে। সে চারপাশের আগুন, বিস্ফোরণ কিছুই দেখছে না। শুধু এক দিকেই ছুটছে ঈশানীর দিকে। সানা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। আরজে আবার চোখ বন্ধ করে ছেলেকে বুকে চেপে ধরে। তার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা রেখা ফুটে ওঠে যেন সে আগেই জানত, কে আসবে।
এদিকে ঈশানী হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে উপরে তাকায় আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিকে দেখে সে চমকে উঠে। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
