Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৩

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৩

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৩
সাবা খান

আজ সারা পৃথিবী জুড়ে উত্তাল এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কেননা প্রতিটা টেলিভিশনের পর্দা, মোবাইলের স্ক্রিন, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটা ফিড সবখানেই একটাই নাম ঘুরছে,
-“সোফিয়া জাওয়ান”
যে নাম একসময় মানবতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হতো প্রতিটা ক্যামেরার সামনে, আজ সেই নাম উচ্চারিত হচ্ছে ঘৃণা, ক্ষোভ আর বিস্ময়ে। বিশ্বের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো একের পর এক ব্রেকিং নিউজ চালাচ্ছে,
–“গ্লোবাল ক্রাইম সিন্ডিকেট এক্সপোজড”
–“ফিলানথ্রপিস্ট টার্নড মাস্টারমাইন্ড অব ডার্কনেস”
–“দ্য ফল অব সোফিয়া জাওয়ান”
ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে জার্নালিস্টরা নিরেট কণ্ঠে বলছে,

–“যে নারী এতদিন নিজেকে সমাজসেবী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, আজ তার আসল চেহারা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে। আমাদের হাতে এসেছে এমন সব প্রমাণ, যা প্রমাণ করে, তিনি শুধু একজন অপরাধী নন, বরং একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল নকশাকার”
পিছনের স্ক্রিনে একের পর এক ফুটে উঠছে ডকুমেন্ট, ভিডিও, অডিও ক্লিপ, অবৈধ অস্ত্র চুক্তির ফুটেজ, গোপন ল্যাব যেখানে মানুষের ওপর নিষ্ঠুর পরীক্ষা চালানো হয়েছে, ব্যাংকিং রেকর্ড, হাজার হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং, ক্রিপ্টো লেনদেনের গোপন চ্যানেল, ব্ল্যাকমেইল, অপহরণ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো সবকিছুর প্রমাণ জনগণের সামনে খোলাসা করা হচ্ছে।
প্রতিটা বিদেশি সাংবাদ মাধ্যম গুলোতে প্রায় একই কথা বলা হচ্ছে,

–“উই আর নট জাস্ট লুকিং অ্যাট ক্রাইমস… উই আর উইটনেসিং আ সিস্টেম অব হরর”
–“দিস ইজ বিয়ন্ড করাপশন, দিস ইজ অর্গানাইজড ডার্কনেস”
আর এখানে শুধু যে সোফিয়ার মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে তা না, তার সাথে জড়িত ব্যক্তিগণ এক এক করে সামনে আসতে শুরু করেছে। বেড়িয়ে আসছে সেইসব মুখ যারা এতদিন ক্ষমতার শীর্ষে বসে ছিল। দেশের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের নাম ভেসে উঠছে যেমন অর্থমন্ত্রী মন্ত্রী রাশেদ করিম, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাহবুব উল আলম, বাণিজ্য উপদেষ্টা তানভীর হোসেন, ডিজি ইন্টেলিজেন্স আরিফুল কবির প্রমুখ রয়েছেন এই কাতারে। এদের প্রত্যেকের সাথে সোফিয়ার গোপন বৈঠকের ছবি, লেনদেনের প্রমাণ সবকিছু এখন প্রকাশ্যে। এছাড়াও তারা সোফিয়ার প্রাইভেট ফার্ম হাউসের রেগুলার গেস্ট ছিল। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে এই জাল, ভারত সহ ও অন্যান্য দেশের কয়েকজন মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ছবিও পাওয়া গেছে। যাদের মধ্যে আলী মির্জা, রাজীব মেহতা, ভিক্টর আলভারেজ অন্যতম। তাদের সাথে সোফিয়ার অবৈধ অস্ত্র চুক্তির ছবি, বিলাসবহুল ইয়টে গোপন মিটিং, এমনকি ব্যক্তিগত, অশ্লীল ও কেলেঙ্কারিপূর্ণ মুহূর্তের ছবিগুলোও ফাঁস হয়ে গেছে।
প্রতিটা প্ল্যাটফর্মে একটাই আলোচনা,
“এই সাম্রাজ্য কতদিন ধরে চলছিল, আর কারা কারা জড়িত?”
এদিকে আজ হাইকোর্টের সামনে মানুষের যেন ঢল নেমেছে। চারদিক জুড়ে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, আর লোকমুখে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একই স্লোগান,

–“সোফিয়া জাওয়ানের ফাঁ*সি চাই”
–“দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের বিচার চাই”
–“মানবতার নামে প্রতারণার বিচার চাই”
পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে কোনোভাবে জনতাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু উত্তেজনা এতটাই তীব্র যে, যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। মিসেস দিলরুবা খানম আগেই অনুমান করতে পেরেছেন সত্যিটা জানাজানি হলে এমন হবে এজন্য তিনি সোফিয়াকে আকাশ পথে আনার ব্যবস্থা করেছেন নাহয় এই বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে যেকোন সময় যেকোনো অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যেতে পারে।

তাই হাইকোর্ট প্রাঙ্গণের আকাশটা যেন আজ অন্যরকম ভারী। মাটিতে মানুষের ঢল, আর আকাশে ঘুরছে একের পর এক হেলিকপ্টার। হঠাৎই একটা কালো মিলিটারি হেলিকপ্টার নিচে নামতে শুরু করে। প্রচণ্ড বাতাসে চারপাশের ব্যানার উড়ে যায়, আর ছাদের ওপর তৈরি অস্থায়ী ল্যান্ডিং জোনে সেটি ধীরে ধীরে সেটি নামে। চারপাশে আগে থেকেই প্রস্তুত ইন্টারপোলের স্পেশাল ইউনিট, কালো বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট, নাইট ভিশন গগলস, হাতে অত্যাধুনিক রাইফেল নিয়ে প্রতিটা কোণ কভার করে দাঁড়িয়ে আছে তারা।
হেলিকপ্টারের দরজা খুলতেই প্রথমে নামে দুজন ইন্টারপোল অফিসার। তারপর মাঝখানে, শক্ত করে ঘিরে ধরে নামানো হয় সোফিয়া জাওয়ানকে। তার হাতকড়া বাঁধা, কিন্তু মুখে একরত্তি ভয়ের ছিটেফোঁটাও নেই। চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা, আর কোথাও যেন হারিয়ে যাওয়া উন্মাদনা। কাল রাতেই তার সমস্ত নেটওয়ার্ক বিছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে যাতে সে তার লোকেদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে। এই মুহূর্তে সোফিয়ার চারপাশে অস্ত্র তাক করা, স্নাইপাররা ছাদের চার কোণে পজিশন নিয়েছে। এক মুহূর্তের জন্যও ঢিল দেওয়া হচ্ছে না। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না ঠিকমতো। কিন্তু খবর ছড়িয়ে পড়তেই গর্জে ওঠে তারা। তাদের কণ্ঠস্বর এখান পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে,

–“ওই শয়তানকে নামাও”
–“ফাঁ*সি চাই”
–“বিচার চাই”
অন্যদিকে কোর্টের প্রধান গেট দিয়ে একের পর এক আনা হচ্ছে সেইসব মন্ত্রী, কর্মকর্তা, প্রভাবশালী মুখদের। এদের মধ্যে ওয়াসিম হায়দার ও সাজেদুল হকও আছে। ওয়াসিম হায়দার ও আলী মির্জা সোফিয়ার বেশিরভাগ বিজনেসে জড়িত ছিলেন। তাদেরকে গাড়ি থেকে নামিয়ে সরাসরি জনসম্মুখের ভেতর দিয়ে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়েও জনতাকে পুরোপুরি আটকাতে পারছে না। মানুষের শক্তি যেন আজ দ্বিগুণ হয়েছে। তারা ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে তাদের উপর সাথে মুখে বলাবলি করছে,
–“এই চোর”
–“দেশ বিক্রি করেছিস”
–“তোদের জন্য আমরা মরেছি”
কেউ জুতা ছুঁড়ে মারছে তাদের উপর, কেউ পানির বোতল ছুঁড়ছে, কেউ থুথু ফেলছে তাদের দিকে। ওয়াসিম হায়দার মাথা নিচু করে হাঁটছে কিন্তু তবুও জনতার রাগ থামছে না। তারা তাকে উদ্দেশ্য করে বলছে

–“জেনারেল হয়ে এই কাজ?”
–‘লজ্জা করো না?”
পুলিশ প্রাণপণ চেষ্টা কটে ব্যারিকেড দিয়ে জনতা আটকে কোনোমতে তাদের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের যাওয়ার পিছন দিক দিয়েই আরেকটা কনভয় এসে থামে। কালো কাঁচঢাকা গাড়ির দরজা খুলে নামে প্রথমে এজাজ আর ইয়ান। তারা দ্রুত পিছনের দরজা খুলে দাঁড়ায়। সেখান থেকে ধীরে নামে সারহাদ চৌধুরী। তার পেছনের গাড়ি থেকে নামে সিতারা আদিল তার সাথে তালহা আদিল। তালহা হসপিটাল থেকে এসেছে আজকে। সে এতদিন বন্দী ও অনাহার, মানষিক ও শারিরীক অত্যাচারের কারণে সে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
শেষ গাড়ি থেকে নেমে আসেন মিসেস দিলরুবা খানম। এক মুহূর্তেই মিডিয়া, সাংবাদিক, জনতা সবাই তাদের ঘিরে ধরে। মাইক্রোফোন সামনে তুলে ধরে একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়তে থাকে তাদের দিকে,

–“ম্যাডাম, সোফিয়ার শাস্তি কি হবে?”
–“ওকে কি ফাঁসি দেওয়া হবে?”
–“তার সাথে জড়িত সবাই কি গ্রেফতার হবে?”
আরো নানারকম প্রশ্ন করা হচ্ছে তাদের। সিতারা আদিল কিছুক্ষণ চারদিকে তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা স্বরে প্রতুত্তর করে,
–“আইন তার নিজের পথে চলবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যারা দোষী তাদের প্রত্যেককে শাস্তি পেতেই হবে”
পাশ থেকে মিসেস দিলরুবা খানম বলে ওঠে,
–“এই অপরাধের বিচার অবশ্যই হবে। এবং এমন শাস্তি হবে, যা ভবিষ্যতে কেউ করার সাহস পাবে না”
চারপাশে আবার স্লোগানে ভরে উঠে,
–“বিচার চাই, বিচার চাই”
তারপর ধীরে ধীরে পুলিশ, স্পেশাল ফোর্স, ইন্টারপোল সবাই মিলে পথ তৈরি করে দেয়। সারহাদ, সিতারা, তালহা, দিলরুবা সবাই একসাথে এগিয়ে যায় আদালতের ভেতরের দিকে।

ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে ব্ল্যাক ম্যানশনের চারপাশে। রাতের অন্ধকার এখনো পুরোপুরি কাটেনি, কিন্তু আকাশের কিনারে ফিকে সোনালি আলো উঁকি দিচ্ছে। এদিকে ম্যানশনের ভেতরে আরজের রুমে বড় কাচের জানালা দিয়ে ভোরের আলো ঢুকে পড়েছে। ঘরের মাঝখানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সানা। সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। আজ সে কোর্টে যাবে, সত্য বলবে, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে। মিসেস দিলরুবা খানমের সাথে তার সকালেই কথা হয়ে গেছে। ঈশানী কোর্টে যাবে না সে আরভি কে নিয়ে নিজের রুমে খেলছে। রিজভী রাতেই ঈশানী কে রেখে ফিরে গেছে। এসপি বা সিয়া কেউই আসেনি সবাই হসপিটালে। সানাও কোর্ট থেকে ডিরেক্ট হসপিটালে চলে যাবে।
হঠাৎ আয়নায় রমণীর চোখ পড়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরজের দিকে যে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সানার দিকে নিঃশব্দে গভীর দৃষ্টিতে। যেন রমণীর ভিতর সহ পড়ে নিতে চাইছে। সানা এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে তারপর কোনো কথা না বলে আবার মুখ ফিরিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে। আরজে ধীরে ধীরে এগিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় তার পাশে। নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,

–“কোথায় যাচ্ছো?”
বিপরীতে রমণী নিজের কাজে বহাল থেকে নির্বিকার চিত্তে বলে,
–“কোর্টে”
–“কেন?”
–“অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণ দিতে, ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে”
একটু থেমে তারপর যোগ করে,
–“যা করা উচিত, সেটাই করতে”
আরজে তার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ধীরে হাত তুলে সানার কপালের চুল গুলো সরিয়ে তারপর খুব শান্ত স্বরে বলে,
–“তুমি বুঝতে পারছো তুমি কি করতে যাচ্ছো?”
–“খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি”
–“ডু ইউ নো, তুমি কার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছো?”
সানা এবার হাত থামিয়ে আরজের দিকে তাকিয়ে তার চোখে চোখ রেখে নিরেট কণ্ঠে শুধালো,
–“আই আন্ডারস্ট্যান্ড, দ্যাটস ইউর মাদার। বাট, মিস্টার জাওয়ান, ইউ নট আন্ডারস্ট্যান্ড, দ্যাটস মাই এনিমি”
আরজে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে তাকে শোধরে বলে,

–“ক্যান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড”
–“হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঐ একটা হলেই হলো, আমার ভুলের পিছনে পড়া বন্ধ করুন”
তারপর দুজনের দৃষ্টি একে অপরের মধ্যে আটকে থাকে। আরজে ধীরে বলে,
–“সবকিছু এত সহজ না, ওয়াইফি”
–“আমার জন্য খুবই সহজ। ভুল মানে ভুল, অপরাধ মানে অপরাধ”
–“তুমি আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছো”
–“কেননা আমার বিবেক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে”
–“আর যদি এই সিদ্ধান্ত তোমাকে আমার বিপরীতে দাঁড় করায়?”
–“তাহলেও দাঁড়াবো”
–“একবারও ভাববে না আমার কথা?”

–“আপনি কি একবারও ভেবেছেন ওই মানুষগুলোর কথা যারা তার কারণে শেষ হয়ে গেছে?”
এটুকু বলে সানা থেমে সামনের মানবের দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে বোঝার চেষ্টা করেছে। নাহ, বিপরীতে থাকা মানব কে সে বরাবরের মতোই বুঝতে ব্যর্থ। তাই ভ্রু কুচকে সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করে,
–“মিস্টার জাওয়ান, যদি আপনাকে চুজ করতে হয়, আমার আর আপনার মায়ের মধ্যে যেকোন একজন, তাহলে আপনি কাকে চুজ করবেন?”
রমণী প্রশ্ন করার পর কয়েক মুহূর্ত কেটে যায় কিন্তু বিপক্ষে কোন প্রতুত্তর নেই। কক্ষে নেমে আসে ভারী নীরবতা। এদিকে সানা অপেক্ষা করছে তার জবাবের। নাহ, নীরবতা বেদ করে কিছু এলো না। কয়েক পল এভাবে কেটে যাওয়ার পর সানার ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসি টেনে আওড়ায়,
–“দেখলেন, আপনাকে এখনো ভাবতে হচ্ছে”
আরজে এবার চোখ তুলে সরাসরি তার দিকে তাকায়। গম্ভীর স্বরে বলে,

–“উহু আমি ভাবছি, এত কিছু হওয়ার পরও তুমি এই প্রশ্নটা কিভাবে করলে”
–“মানে?”
–“ইউ নো, আই উইল চুজ ইউ”
রমণী ভ্রু কুচকে বলে,
–“আর ইউ শিউর?”
আরজে একটানে তাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে তার চোখে চোখ গেঁথে বলে,
–“অ্যাগেনস্ট দ্য ওয়ার্ল্ড, অ্যাগেনস্ট এভরিওয়ান, ইউ’র দ্য চয়েস আই’ল এভার মেক”
সানা ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে ওঠে তার এমন জবাবে। কিন্তু সে সেটা আরজে কে দেখতে না দিয়ে তার বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলে,
–“মিস্টার জাওয়ান, আপনার ফ্লার্ট দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। এখন এটা ভাবুন, সেই ফাইলগুলোতে আপনার নামও আছে, রানভীর”
বিপরীতে নিস্তব্ধতা তারপর আরজের ঠোঁটে ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সে কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ হাত তুলে সানার ঘাড়ের পেছনে শক্ত করে ধরে একটানে তাকে নিজের দিকে টেনে আনে। সানা অবাক হয়ে কিছু বলার আগেই তার ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় সানার ঠোঁটে।

হাইকোর্টের সামনে তখনো উত্তাল জনসমুদ্র, স্লোগান, চিৎকার, ক্যামেরার ফ্ল্যাশে চারপাশ ঝলসে যাচ্ছে। ঠিক তখনই দূর থেকে শোনা যায় একসাথে বহু ইঞ্জিনের গর্জন। পরপর কালো গাড়ির কনভয় ঢুকে পড়ে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে এমনভাবে, যেন পুরো এলাকাটাকেই ঘিরে ফেলতে এসেছে। একটার পর একটা গাড়ি থামে, দরজা খুলে নেমে আসে সশস্ত্র গার্ডরা। কালো স্যুট, কানে কমিউনিকেশন ডিভাইস, হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র মুহূর্তের মধ্যে তারা চারপাশ ঘিরে জনতাকে সরিয়ে দিয়ে তৈরি করে ফেলে একটা নিখুঁত নিরাপত্তা বলয়।
সামনের গাড়িটার দরজা খুলে নামে কাইলিন। সে ধীরে নিজের কোটটা ঠিক করে তারপর এগিয়ে যায় পিছনের গাড়ির দিকে। পিছনের গাড়ির দরজা খুলতেই ধীরে, স্থির ভঙ্গিতে নেমে আসে কালো স্যুট পরা আরজে। তার চোয়াল শক্ত, চোখে সেই পরিচিত শীতল আগুন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একসাথে জ্বলে ওঠে তার উপর। কিন্তু সে একবারও তাকায় না কারো দিকে। আরজে ধীরে পাশের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে দরজা খুলতেই ভিতর থেকে নেমে আসে সানা। সে নামতেই এক পলক সামনে তাকিয়েই থমকে যায়। নজরে আসে, যে জনসমুদ্র এতক্ষণ আগুনের মতো উত্তাল ছিল, সেই মানুষগুলো এখন নিস্তব্ধ। মুখে কোন চিৎকার নেই, স্লোগান নেই শুধু নিরব দৃষ্টিতে সবাই তাকিয়ে আছে আরজের দিকে।
সানা ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকায়। তার চোখে ফুটে ওঠে স্পষ্ট বিস্ময়। সে তো ভেবেছিল এই জনতা আরজেকে দেখলেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে, হয়তো আক্রমণও করবে। কিন্তু এখানে সবাই নিজে থেকেই সরে দুপাশে রাস্তা করে দিচ্ছে। না কেউ কিছু বলছে আর না কোন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে শুধু তাকিয়ে আছে। সানা ধীরে আরজের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে বলে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২২

–“এটা… কি হচ্ছে?”
আরজে ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টেনে কিছু না বলে তার হাতটা ধরে নিচু স্বরে আওড়ায়,
–“লেটস গো”
সানা গো ধরে দাঁড়িয়ে আছে,
–“না, আগে বলুন, এরা এমন আচরণ করছে কেন?”
–“কি? ভালো লাগছে না তোমার?
তুমি তো এটা নিয়েই টেনশন করছিলে?”
–“আপনি মজা করছেন? আমি সিরিয়াস”
আরজে কোনরূপ প্রত্যুত্তর না করে সানার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় কোর্টের ভেতরের দিকে।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৪