Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩২

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩২

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩২
সাবা খান

রাতের শেষ প্রহরের বৃষ্টিটা যেন ভোরের পৃথিবীটাকে ধুয়ে মুছে একেবারে সতেজ করে রেখে গেছে। আজকের সকালটা অন্যরকম, একদম অন্যরকম। পূর্ব দিগন্তে সূর্য তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কুয়াশার পাতলা চাদর মাটির বুক জড়িয়ে আছে। দূরের গাছগুলোর মাথা আধো আধো ঝাপসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধতায়। রাতভর ঝরে পড়া বৃষ্টির জল এখনো কার্নিশ বেয়ে টুপটাপ নিচে পড়ছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, সেই গন্ধে মিশে আছে শীতের সকালের কাঁপন ধরানো নির্মলতা। কিন্তু প্রকৃতির এই শান্ত সকালের বিপরীতে পুরো দেশজুড়ে আজ যেন এক অদৃশ্য অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। সকাল হতে না হতেই দেশের প্রতিটা সংবাদমাধ্যমে একটাই নাম ঘুরপাক খাচ্ছে,
“দিলরুবা খানম”
টেলিভিশনের পর্দাজুড়ে একের পর এক ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠছে,

—”জাইফেরার গোপন নেটওয়ার্কের ভয়ংকর তথ্য ফাঁস”
—”মিসেস দিলরুবা খানম গ্রেফতার”
—”আন্ডারওয়ার্ল্ড ও ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের দ্বৈত মুখোশ উন্মোচিত”
একেকটা চ্যানেল একেকটা গোপন ফাইল তুলে আনছে, কোথাও পুরনো ছবি, কোথাও গোপন ডকুমেন্ট, কোথাও অস্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ, কোথাও সাবেক এজেন্টদের বয়ান, সোশ্যাল মিডিয়াতেও যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কেউ লিখছে,
“ক্ষমতা মানুষকে অমানুষ বানিয়ে দেয়’
আবার কেউ কেউ সোফিয়া জাওয়ানের পুরনো কেস টেনে এনে তুলনা করছে। কেউ জাইফেরার ব্যবসায়িক শাখাগুলোর বয়কটের ডাক দিচ্ছে। কেউ আবার লিখছে,
“এই পৃথিবীতে আসলে কার মুখ সত্যি আর কার মুখোশ, বোঝা অসম্ভব”
সময়ের চাকা বড় নিষ্ঠুর। কাল পর্যন্ত যে মানুষটাকে সবাই সম্মান করছিল, আজ তার নাম শুনলেই ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আর যাদের নিয়ে গতকাল আলোচনা হচ্ছিল, আজ তারা যেন সময়ের ধুলোয় চাপা পড়ে গেছে। এই পৃথিবীতে সময়ের থেকেও বড় বিচারক আর কেউ নেই। সময় কখন কার মুখোশ খুলে দেয়, আর কাকে অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে কেউ জানে না। একটা নিউজ চ্যানেলের নারী উপস্থাপিকা তখনো গম্ভীর গলায় ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে,

—”প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, জাইফেরা বহু বছর ধরে দ্বৈত পরিচয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল…..”
হঠাৎ টিক করে নিউজটা বন্ধ করে দিয়েছে আরজে। অতঃপর গাড়ির ভেতর একটা ভারী নিস্তব্ধতা নেমে এলো। গাড়ির কাচের বাইরে ভেজা শহরটা দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যুষের হালকা রোদ্দুরে চকচক করছে গোটা শহর। আর সেই ভেজা সকালের মাঝখানে রাজকীয় ভঙ্গিতে ছুটে চলছে কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ির বহর। সামনে দুইটা ও পেছনের দুইটা গার্ডের এসইউভি। মাঝখানে চলতে থাকা গাড়িটা যেন পুরো রাস্তার কেন্দ্রবিন্দু, চকচকে কালো রঙের লেটেস্ট মডেলের রোলস্ রয়েলস।
গাড়ির মধ্যে আরভি জানালার পাশে বসে বাইরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। আজ তার নতুন স্কুলে প্রথম দিন। সকালে আরজে তাকে নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত গ্যারেজে গিয়েছিল। সেখানে সারি সারি দামি গাড়ি দেখে আরভির চোখে কয়েক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় খেলে গেল। সে কখনো এত গাড়ি একসাথে দেখেনি। একটা লাল স্পোর্টস কারের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলেছিল,

—”ড্যাড, এইটা রেসিং কার?”
—”ইয়েস, মাই বয়”
আরজে তাকে তার পছন্দ মতো যেকোনো একটা নিতে বলেছে। শেষমেষ অনেক ভাবনাচিন্তার পর সে এই কালো রোলস রয়েসটাই বেছে নিয়েছিল। কারণ তার ভাষায়,
“এটা ভিলেনের গাড়ির মতো”
আরজে তখন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ঠোঁটের কোণে তীর্যক হাসি টেনেছিল। এখনো সেই হাসির হালকা ছাপ তার মুখে রয়ে গেছে। সে একহাতে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি চালাচ্ছে। অন্য হাতটা আরাম করে জানালার পাশে রাখা। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, চোখদুটো স্থির সামনে। কিন্তু আজ তার মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। আরভি আবারও সিটে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

—”ড্যাড, আমরা কি প্রতিদিন এই গাড়িতে স্কুলে যাব?”
আরজে একপলক তার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় শুধালো,
—”নোপ”
আরভির মুখ সাথে সাথে ছোট হয়ে গেল। কিন্তু পরমুহূর্তেই আরজে ফের যোগ করল,
—”প্রতিদিন আলাদা গাড়িতে যাব”
আরভির চোখ মুহূর্তেই চকচক করে উঠে,
—”রিয়েলি”
—”হুম”
—”ড্যাড, তোমার কাছে কতগুলো গাড়ি আছে?”
আরজে কয়েক সেকেন্ড ভেবে গম্ভীর মুখে প্রতুত্তর করে,
—”গুনে দেখিনি”
আরভি এভাবে একে একে তার ড্যাড কে বিভিন্ন প্রশ্ন ছুঁড়তে শুরু করে আর আরজে শান্ত স্বরে সেগুলোর প্রতুত্ত্যর করতে থাকে।
ঢাকার অভিজাত অঞ্চলের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা, “অরেলাইন ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি” এর বিশাল কালো গেটের সামনে একের পর এক বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামতেই সকালবেলার ব্যস্ততা যেন আচমকা থমকে গেল। চকচকে কাঁচঘেরা বহুতল ভবনের গায়ে তখন কোমল রোদ এসে পড়েছে। স্কুলের প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট বাচ্চাদের হাসি, অভিভাবকদের ব্যস্ত পদচারণা, গাড়ির দরজা খোলার শব্দ সবকিছু মিলিয়ে এক পরিচ্ছন্ন, অভিজাত সকাল। কিন্তু সেই স্বাভাবিক পরিবেশটাকে মুহূর্তের মধ্যেই অস্বাভাবিক করে তোলে কালো রঙের চারটি এসইউভি।

সামনের গাড়ির দরজা খুলতেই প্রথমে নেমে আসে কালো পোশাকে মোড়া কয়েকজন গার্ড। এরপর ধীরে ধীরে মাঝের গাড়ি থেকে নামে আরজে। কালো শার্টের ওপর গাঢ় ধূসর কোট, চোখে কালো চশমা, মুখে সেই চিরচেনা কঠিন নির্লিপ্ততা। তার পাশে ছোট্ট হাতটা ধরে নেমে আসে আরভি। ছোট্ট কালো ব্লেজারে তাকে যেন ক্ষুদ্র সংস্করণের আরজে মনে হচ্ছে। বাচ্চাটার চোখে মুখে উত্তেজনার ঝিলিক, আর আরজের মুখে অদ্ভুত এক কঠিন কোমলতা।
মুহূর্তেই চারপাশের মানুষজনের চোখ যেন তাদের দিকেই আটকে গেল। কেউ হাঁ করে তাকিয়ে রইল, কেউ আবার মোবাইল বের করে ভিডিও করতে শুরু করল, কেউ নিচু গলায় ফিসফিস করতে লাগল,
—”ওইটা কি আরজে না?”
—”ও মাই গড…”
—”ছেলেটা কত কিউট…ঠিক ওর মতো”

কয়েকজন আরজের ফ্যান এগিয়ে আসতেই গার্ডরা দেয়ালের মতো সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের ঠান্ডা দৃষ্টি দেখে কেউ আর সাহস পেল না সামনে যাওয়ার। আরজে সেদিকে একবারও দৃষ্টিপাত করল না। সে শুধু নিজের ছেলের হাতটা শক্ত করে ধরে সোজা ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগল। করিডোর পেরিয়ে তারা পৌঁছে গেল প্রিন্সিপালের কক্ষে। ভেতরে প্রবেশ করতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রিন্সিপাল মিস্টার লুইস হেনরি প্রায় তড়িঘড়ি করে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার মুখে সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম ভদ্রতার প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠে,
—”মিস্টার জাওয়ান, ইট’স ট্রুলি অ্যান অনার। প্লিজ, প্লিজ হ্যাভ আ সিট”
তিনি এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আপ্যায়নে যে নিজের টাই পর্যন্ত ঠিক করতে ভুলে গেলেন। ডেস্কের ওপর রাখা পানির বোতল নিজ হাতে এগিয়ে দিলেন। তারপর তাড়াতাড়ি একজন স্টাফকে ডেকে বললেন,
—”কফি, নো, ওয়েট… বেস্ট কফি, অ্যান্ড স্ন্যাকস”
আরজে ধীর পায়ে এসে চেয়ারে বসল। তার চোখেমুখে কোনো বিশেষ ভাবান্তর নেই। যেন এসব অতিরিক্ত সম্মান তার কাছে স্বাভাবিক। প্রিন্সিপাল নিচু স্বরে আবার বললেন,

—”আপনার ছেলে আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়েছে, এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। উই আর ট্রুলি প্রিভিলেজড”
আরজে মুখে কিছু উচ্চারণ করল না শুধু ছোট্ট করে মাথা নাড়ল। এদিকে আরভি চারপাশটা বড় বড় চোখে দেখছে। তার চোখে কৌতূহল, উত্তেজনা আর শিশুসুলভ আনন্দ একসাথে খেলা করছে। কিছুক্ষণ পর একজন মহিলা টিচার ভেতরে প্রবেশ করলেন। প্রিন্সিপাল দ্রুত পরিচয় করিয়ে দিলেন তাকে,
—”মিস এলিনা, উনি রিশবীর জাওয়ান, মানে আরভি। আজ থেকে আপনার ক্লাসে থাকবে”
টিচার কোমল হেসে আরভির দিকে তাকালেন। কিন্তু আরভি তখনও নিজের বাবার হাত শক্ত করে ধরে আছে। আরজে ধীরে ধীরে উঠে এসে নিজের ছেলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। মুহূর্তের মধ্যেই তার কঠিন মুখশ্রী আশ্চর্যরকম নরম হয়ে গেল। সে আলতো করে আরভির টাই ঠিক করতে করতে বলল,

—”সো, মাই বয়… ফার্স্ট ডে, নার্ভাস?”
আরভি দ্রুত মাথা নেড়ে আওড়ায়,
—”নোপ ড্যাড, কজ আজ আমি ড্যাডের সাথে স্কুলে এসেছি আর এটা আমার ড্রিম ছিল”
কথাটা শুনে আরজের চোখের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠে। সে আবারও জিজ্ঞেস করে,
—”ওকে, শুধু এটুকুই ড্রিম?”
আরভি কিছুক্ষণ ভেবে গম্ভীর মুখে বলল,
—”নো, আমার তাড়াতাড়ি সিস্টার চাই”
আরজে একটা ভ্রু তুলে বলে,
—”কয়টা?”
আরভি আঙুল গুনতে গিয়ে নিজেই গুলিয়ে ফেলে বলল,
—”অনেকগুলো”
আরজে নিচু স্বরে হেসে বলে,
—”ওকে মাই বয়, ডিল। আর কি চাই?”
আরভি এবার উৎসাহ নিয়ে বলতে শুরু করল,

—”আমাকে ড্রাইভিং শিখাবে, রাইডিং শিখাবে, তারপর বন্দুকও। আর আমরা প্রতিদিন রাতে গেম খেলব, আর… আর… তুমি অফিসে গেলে আমাকে সাথে নিবে। কেননা আমি বড় হয়ে তোমার হতে চাই”
আরজে একদৃষ্টে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। তার জীবনে হয়তো প্রথমবার কেউ এত নির্ভরতা নিয়ে তার দিকে তাকিয়েছে। তবে আরভির বলা প্রথম বাক্যগুলো আরজের কাছে স্বাভাবিক থাকলেও শেষের বাক্যটা শোনার পর মুহূর্তে তার অভিব্যক্তি পাল্টে গেল। কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আরজের মুখের হাসিটাও থেমে যায়। তার চোখের গভীরে খুব ক্ষণিকের জন্য অদ্ভুত এক ছায়া নেমে আসে। তারপর সে আরভির মাথায় হাত রেখে নিচু গলায় বলে,
—”আই’ল গিভ ইউ এভরিথিং ইউ এভার উইশ ফর….বাট ইউ উইল নেভার বিকাম লাইক মি”
আরভি গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ল, যেন সে কথাগুলোর গুরুত্ব সত্যিই বুঝে গেছে। তারপর ছোট্ট মুষ্টিবদ্ধ হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিল। আরজে তাকিয়ে ক্ষীণ হেসে নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তার সাথে পাঞ্চ মিলাল,
—”গো রুল দ্য স্কুল, চ্যাম্প”
—”ওকে ড্যাড”

এরপর আরভি টিচারের সাথে হেঁটে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময়ও দু-তিনবার ঘুরে নিজের বাবার দিকে তাকাল। আরজেও তাকিয়ে রইল তার ছেলেটার পেছনে, যতক্ষণ না সে করিডোরের মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল। কক্ষটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে এলো। আরজে ধীরে ধীরে ফিরে এসে প্রিন্সিপালের সামনে চেয়ারে পা তুলে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। প্রিন্সিপাল সঙ্গে সঙ্গে গলা পরিষ্কার করে বলেন,
—”আসলে মিস্টার জাওয়ান… আমাদের নতুন সায়েন্স ব্লকের জন্য কিছু ডোনেশনের…”
আরজে চশমাটা হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে তার কথা কেটে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
—”অ্যামাউন্ট পাঠিয়ে দিবেন”
কথাটা শুনে প্রিন্সিপালের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠে,
—”থ্যাংক ইউ সো মাচ, ইউ আর সো জেনারাস….”
আরজে তাকে শেষ করতে দিল না বাক্যটা তার আগেই সে ধীরে ধীরে চশমাটা চোখে পরে উঠে দাঁড়াল। তারপর একদম ঠান্ডা, ধারালো কণ্ঠে বুলি ছুঁড়ে,

—”আমার ছেলের গায়ে যেন একটা আঁচড়ও না লাগে”
প্রিন্সিপালের ঠোঁটের মেকি হাসিটা মিলিয়ে গেল। আরজে আরও এক পা এগিয়ে এসে ফের বলে,
—নাহয়, এই স্কুলের একটা ইটও দাঁড়িয়ে থাকবে না”
প্রিন্সিপাল ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে আওড়ান,
—”ইয়াহ, অফকোর্স”
আরজে আর কিছু বলল না। কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে আর তার পেছনে শুধু ভারী আতঙ্ক আর নিস্তব্ধতা রয়ে গেল।

সকালের রোদটা আজ যেন অদ্ভুত কোমলতা নিয়ে নেমেছে শহরের বুকজুড়ে। গত ক’দিনের হঠাৎ বৃষ্টি, মেঘ আর বিষণ্নতার পর আজ আকাশটা ধোয়া তুলসীপাতার মতো পরিষ্কার। দিগন্তজোড়া নীলিমার গায়ে সাদা তুলোর মতো কয়েক টুকরো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে তাও অলস ভঙ্গিতে। এই কোমল সকালের বুকেই দাঁড়িয়ে আছে ব্ল্যাক ম্যানশন।বিশাল কালো প্রাসাদটা সামনে বিস্তৃত বাগানজুড়ে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। গোলাপ, লিলি, অর্কিডের সারির উপর এখনো শিশির জমে আছে মুক্তোর মতো। মাঝখানে ছোট্ট ফোয়ারাটা থেকে টুপটাপ জল পড়ার শব্দ মিলেমিশে গেছে সকালের পাখিদের কিচিরমিচিরে। বাগানের মাঝখানে সাদা ছাউনি টাঙানো গোল টেবিলের উপর সাজানো রয়েছে ব্রেকফাস্ট। রূপালি ট্রেতে গরম গরম প্যানকেক, টোস্ট, ফল, জুস, কফি সবকিছু এত সুন্দর করে সাজানো যেন কোনো রাজপরিবারের সকালের আয়োজন। আর সেই টেবিলেই মুখ গোমড়া করে বসে আছে সানা।
রমণীর চোখেমুখে স্পষ্ট ক্লান্তি আর মনখারাপের ছাপ। গত রাতের ঘটনাগুলো এখনো তার মাথার ভেতর ঝড় তুলছে। দিলরুবা খানমের মুখ, তার কান্না, তার কণ্ঠের অসহায়তা সবকিছু বারবার এসে সানার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে যাচ্ছে। যে মানুষটাকে সে এতদিন মায়ের মতো বিশ্বাস করেছে, যার স্নেহে নিজের শূন্যতা ভরাট করেছে সেই মানুষটার ভেতরের কদর্য মুখটা যেন এখনো মেনে নিতে পারছে না সে। সেই কারণেই মূলত আজকের এই আয়োজন।

এসপির দৃঢ় বিশ্বাস, খোলা আকাশের নিচে বসে খাওয়া দাওয়া করলে মানুষের মন হালকা হয়। আর ঈশানী তো সুযোগ পেলেই নাটক করতে প্রস্তুত। এজন্যই ভোরবেলা দুজনে মিলে প্রায় জোর করেই সানাকে বিছানা থেকে টেনে তুলেছে। যেখানে সানা তখনো কম্ফর্টার মুড়ি দিয়ে আরামের ঘুমে ডুবে ছিল। আজ আরভির স্কুলের প্রথম দিন, এটা জানার পরও সে ওঠেনি। বরং আরো শক্ত করে কম্ফর্টার টেনে মাথা ঢেকে ফেলেছিল। কিন্তু ওই দুই শয়তান তাকে রেহাই দেয়নি। সানার ওই মুহূর্তে সত্যিই ইচ্ছে করছিল এসপি আর ঈশানীর কানের নিচে এমন বাজান বাজাতে যাতে দুজনেই সোজা হাসপাতালের বেডে গিয়ে ওঠে। কিন্তু সে কিছু বাজায়নি কেননা সে জানে এরা হসপিটালের বেড থেকে উঠে হলেও তাকে জাগাবে। একারণে সে ভালো ভদ্র মেয়ের মতো মুখ ফুলিয়ে এসে বসে পড়েছে।
এসপি তার পাশের চেয়ারে বসে অবলীলায় প্যানকেকের উপর জ্যাম মাখাতে মাখাতে বলল,

—”দেখ পেস্ট্রি, জীবনটা হচ্ছে নদীর মতো। কখনো পানি বাড়বে, কখনো কমবে। কিন্তু নদী কি থেমে যায়? যায় না, সুতরাং তুইও থামবি না”
সানা নির্বিকার মুখে কফির কাপের দিকে তাকিয়ে রইল। এসপি ফের আওড়ায়,
—”আরেকটা কথা মনে রাখবি… পৃথিবীর সবথেকে বড় প্রতিশোধ হচ্ছে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা”
সানার থেকে এবারও কোনো উত্তর গেল না। এসপি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঈশানীর দিকে তাকিয়ে বলে,
—”দেখুন না মিসেস নাগিন, মেয়েটা মনে হয় ব্রেকআপ করে এসেছে”
ঈশানী মোবাইলের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। আর এসপি তার দিকে ভ্রু কুচকে তাকায়, কী হলো এটা? আজকে ঈশানীকে মিসেস বলাতেও রাগ করল না কেন?
তবে বিষয়টা নিয়ে বেশি ঘাটার আগেই সানার বিরক্ত চোখের দিকে তাকাতেই এসপি আবার দ্রুত সিরিয়াস হয়ে গেল। সে এবার আলতো করে সানার প্লেটে জ্যাম লাগানো টোস্ট এগিয়ে দিয়ে বলল,
—”খা…নারে আমার মা, না খেলে আরো শুকিয়ে ভূতের মতো হয়ে যাবি। তখন রাতে তোকে দেখে আমিই ভয় পেয়ে হার্ট অ্যাটাক করব”
সানা এবারও মুখ গোমড়া করেই বসে রইল। কিছুক্ষণ পর এসপি তাকে লক্ষ্য করে বলে,

—”কিরে কটকটি কি ভাবছিস এত?”
সানা দুই গালে হাত রেখে মুখটাকে বাংলার পাঁচ করে দূরের ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবুক গলায় বলল,
—”বিটকেল… আমার না এই মুহূর্তে বই পড়তে ইচ্ছা করছে”
বাক্যটুকু সানা উগরে দিতে দেরি, কিন্তু বিপরীতে এসপি চমকে উঠতে দেরি হয়নি। তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম, যেন অসম্ভব কিছু সে গলাধঃকরণ করেছে। তাই অবিশ্বাস্য সুরে আবারো জিজ্ঞেস করে,
—”কিহ? কিহ, কিহ, আবার বল, আবার বল”
সানা ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
—”কি আবার বলব?”
—”যেটা এখন বলছিস সেটা আবার বল”
সানা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে ফের শুধালো,
—”আমি বলছি আমার বই পড়তে ইচ্ছা করছে”
এসপি আর কোনো রূপ বাক্য ব্যবহার না করে সে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকে,
—”আরিব্বাস, ভূতোর মুখে রাম রাম…
এই মিসেস নাগিন….”
এতক্ষণ ধরে ফোনে ডুবে থাকা ঈশানী ‘মিসেস’ শুনেই ভীষণ চটে গেল। সে যদিও আগের বার শুনতে পায়নি তবে এবার চিৎকার করে ওঠে,

—”মিস, মিস নাগিন….”
তার এমন হঠাৎ চিৎকারে সানার সকল ভ্রম ছুটে যায়, রমণী একদম প্রস্তুত ছিল না এইরকম কিছুর জন্য। সে তড়িঘড়ি করে বুকের বাম পাশে হাত রেখে বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে গর্জে উঠে,
—”শালী কালনাগিনীর বাচ্চা, আরেক বার আমার কানের নিচে এভাবে চিৎকার করলে গুনে গুনে বিশ হাজার টাকা দিবি”
সানার মুখে টাকার কথা শুনে সাথে সাথে দমে গেল ঈশানী। সে ফের নিজের মুঠোফোনে মনোনিবেশ করল। এদিকে এসপি দুই রমণী কে উপেক্ষা করে বলে,
—”ওকে মিস নাগিন, একটা ভালো কানের ডাক্তার নিয়ে আসেন তো, আর না হয় কবিরাজ। আমি নিশ্চিত হয় একে ভূতে ধরেছে নাহয় আমার কান কম শুনছে”
এদিকে বসে থাকা সানা এসপি যে তার মজা উড়াচ্ছে সেটা বুঝতে পেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
—”কুত্তা, কানের নিচে চারটা বাজালে ঠিকই শুনতে পারবি”
সানা রেগে গেছে এটা বুঝে এসপি আবার দ্রুত বসে পড়ল। ঠোঁটে মেকি হাসি টেনে শুধায়,
—”এখন আমার বিশ্বাস হচ্ছে তুই সত্যিই প্রেগন্যান্ট”
সানা চোখ কুঁচকে তাকায়,

—”মানে?”
—”মানে, এইজন্যই তুই উল্টোপাল্টা কথা বকছিস। নাহলে তো তুই মরে গেলেও বইয়ের দিকে ফিরেও তাকাতি না। বই তো তোর কাছে ছিল জানের শত্রু। উল্টো বেগম রোকেয়াকে গালি দিতি সারাদিন, মেয়েদের পড়াশোনা বের করার জন্য”
সানা এবার টেবিলের উপর থাকা চামচ তুলে মারার ভঙ্গি করতেই এসপি দ্রুত দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করে বলে,
—”আচ্ছা আচ্ছা, সরি। কিন্তু সত্যি বল, হঠাৎ বই পড়ার শখ কেন?”
সানা এবার একটু চুপ করে রইল। তারপর নিচু গলায় জানাল,
—”জানি না… মাথার ভেতর অনেক কিছু ঘুরছে। মনে হচ্ছে যদি কিছুক্ষণ অন্য একটা জগতে ডুবে থাকতে পারতাম…”
কথাটা শুনে এসপি’র মুখের হাসিটা কিছুটা নরম হয়ে এলো। সে এবার সত্যিই শান্ত স্বরে বলে,
—”তুই যত ভাবছিস, তত একা না। আমি আর মিসেস নাগিন আছি তো তোকে জ্বালানোর জন্য”
সানা বিপরীতে কিছু বলল না। ঠিক তখনই হঠাৎ দুজনের কথাবার্তা থেমে যায় তাদের পাশ থেকেই ভেসে আসা চাপা, লাজুক হাসির শব্দে। দুজনে একসাথে ঘুরে তাকাতেই নজরে আসে ঈশানী নিজের মুঠোফোনের দিকে তাকিয়ে একা একাই হেসে যাচ্ছে। তার গাল দুটো হালকা লাল হয়ে উঠেছে। ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি লেগে আছে। এসপি ধীরে ধীরে চোখ ছোট করে তাকিয়ে তারপর সন্দেহভরা গলায় বলল,
—”ওহহহ… ব্যাপার কি মিসেস মানে মিস নাগিনের”
এদিকে ঈশানী হঠাৎই টের পায়, সামনে বসে থাকা দুই জোড়া চোখ তার উপর এমনভাবে গিয়ে আটকে আছে, যেন কোনো ভয়ংকর অপরাধে হাতেনাতে ধরা পড়েছে সে। তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা লাজুক হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। তাড়াতাড়ি নিজের সাদা দন্তপাটি ভেতরে ঢুকিয়ে গম্ভীর মুখ বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে সে। মোবাইলটা উল্টো করে টেবিলের উপর রেখে কাশির ভান করে গলা পরিষ্কার করে বলে,

—”আমি… আমি আসলে…”
সে তোতলাতে শুরু করে। সামনে বসে থাকা এসপি ধীরে ধীরে চোখ সরু করে তাকায়। তার মুখভঙ্গিটা এমন, যেন সে এইমাত্র কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেছে। সানাও দুই হাত টেবিলের উপর রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারপর চোখ ছোট ছোট করে ঈশানীর দিকে তাকিয়ে বলে,
—”কে? নাম বল, এখনই বল, অনলি নেম, নেম, নেম। আবার নতুন কাকে ফাঁসিয়েছিস তাড়াতাড়ি বল?”
সানা একনাগাড়ে প্রশ্ন করেই গেল। বিপক্ষে ঈশানী একটু ইতস্তত করে,
—”আরে কিছু না…”
এসপি সাথে সাথে আঙুল উঁচিয়ে সানার দিকে তাকিয়ে বলে,
—”মিথ্যা, স্পষ্ট মিথ্যা, এই হাসি সাধারণ মানুষের হাসি নয় লা, এই হাসি প্রেমে পড়া মানুষের হাসি”
ঈশানী এবার সত্যিই লজ্জা পেয়ে যায়। তার গাল দুটো হালকা লাল হয়ে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি জুসের গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে বলল,

—”উফ, তোমরা না…”
সানা এবার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
—”আমরা না কি? কার সাথে কথা বলছিলি?”
ঈশানী এবার ধরা পড়া ছাত্রীর মতো মুখ করে নিচু গলায় বলল,
—”আরে ইয়ার, তোদের রিজভীর কথা বলেছি না, ওর সাথে…”
কথাটা বলা মাত্রই এসপি টেবিলে চাপড় মেরে হো হো করে হেসে উঠে,
—”তো আমাদের মিসেস মানে মিস নাগিন সত্যিই প্রেমে পড়েছে। আমি ভাবলাম টাইম পাস”
ঈশানী সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে তাকায়,
—”চুপ, অসভ্য ছেলে”
এদিকে সানা নাক সিটকে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
—”এই বয়সে প্রেমে পড়েছিস?”
ঈশানী সাথে সাথে ভাব নিয়ে চুল কাঁধের পিছনে সরিয়ে বলল,
—”হ্যাঁ, তোরা কি বুঝবি প্রেমে পড়ার মানে”
এসপি হাসতে হাসতে বলে ওঠে,
—”বেডি মানুষ…..”

বাক্যটা শেষ করতে পারে না সে। কারণ পরমুহূর্তেই সানা তার দিকে এমন রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে যে এসপির হাসি গলায় আটকে যায়। সে সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে, শুধু ঈশানী না, সে পুরো নারীজাতিকেই অপমান করে ফেলেছে। এসপি তড়িঘড়ি করে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলে,
—”আরে না না, বেডি মানুষ না…নাগিন, নাগিন, একদম খাঁটি কালনাগিন’
সানা দাঁতে দাঁত চেপে তার দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে ঈশানীর দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে ধূর্ত হাসি ফুটিয়ে বলে,
—”কাল নাগিনীর বাচ্চা, তাড়াতাড়ি বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চা পয়দা কর। আমি আমার ছেলের সাথে তোর মেয়ের বিয়ে দিবো। বেয়াইন হয়ে তোকে লুটবো”
ঈশানী কথাটা শুনে নাক-মুখ কুঁচকে তাকায়। তারপর মুখ বাঁকিয়ে বলে,
—”তুই দুদিন আগেই তো বললি এসপির মেয়েকে তোর ছেলের সাথে বিয়ে দিবি। এখন আবার আমার না হওয়া মেয়ের পিছনে পড়ছিস কেন?”
সানা খুব ভাব নিয়ে নিজের চুলগুলো সাইডে ক্লিপ করতে করতে বলল,

—”ভুলে গেছিস, ছেলেরা চার বিয়ে করতে পারে”
এসপি এবার হো হো করে হাসতে শুরু করে। ঈশানীর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। সে ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঝুঁকে নিচু গলায় বলে,
—”আচ্ছা… যদি আরজে করে তাহলে?”
বাক্যটা যেন সোজা এসে বিস্ফোরিত হয় সানার মাথার ভেতর। মুহূর্তের মধ্যে তার কল্পনায় ভেসে ওঠে, আরজে অন্য কোনো মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে… বিয়ে করছে… কারো দিকে তাকিয়ে হাসছে…দৃশ্যগুলো মাথায় আসতেই তার বুকের ভেতর হঠাৎ দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সে তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবনাগুলো সরিয়ে দেয়। তারপর চোয়াল শক্ত করে ঈশানীর দিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে বলে,
—”বউয়ের সাত খুন মাফ… আর সাতবারই আমি ওই রানভীরকে খুন করবো। শালা, একবার নাম নিয়ে দেখুক বিয়ে করার”
সানার কথা শুনে পাশে বসা এসপি সাথে সাথে কাশতে শুরু করে। মনে মনে ভাবে, কি ডেঞ্জারাস মেয়ে রে বাবা, সাতবার নাকি খুন করবে। সে নিচু গলায় ফিসফিস করে,

“বেচারা বেঁচে থাকতে আর বিয়ের নামও নিবে না। নিলেও বিয়ে করার জন্য আর বেঁচে থাকবে না”
বাক্যটা শুনে সানা এবার অনেকক্ষণ পর একটু হেসে ফেলে। আর সেই হাসিটা দেখেই ঈশানী আর এসপি দুজনেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কারণ সকাল থেকে এই প্রথম সানার মুখে সত্যিকারের হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু ঠিক তখনই ম্যানশনের বিশাল গেটের দিক থেকে বিকট শব্দ ভেসে আসে। শব্দটা এত হঠাৎ আর তীব্র যে তিনজনই চমকে ওঠে। তাদের দৃষ্টি একসাথে গেটের দিকে ঘুরে যায়। আর নজরে আসে, ধূসর রঙের একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার প্রায় ঝড়ের বেগে ভেতরে প্রবেশ করছে। চাকার ঘর্ষণে ভেজা কংক্রিটের উপর কড়া শব্দ উঠছে। গাড়িটার গতি এতটাই উন্মত্ত যে সামনের ফুলগাছগুলো পর্যন্ত বাতাসে নড়েচড়ে ওঠে। গাড়িটা এসে থামতেই পরমুহূর্তেই দরজা খুলে ভেতর থেকে নেমে আসে রানা মির্জা।

তার চোখেমুখে এমন তীব্র রাগ জমে আছে, যেন এখনই কাউকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। কপালের শিরাগুলো টানটান হয়ে ফুলে উঠেছে, চোখ দুটো রক্তবর্ণ, চোয়াল এত শক্ত হয়ে আছে যে দাঁত কিড়মিড় করার শব্দ পর্যন্ত যেন শোনা যাচ্ছে। সে একবারও চারপাশে তাকায় না বরং ধুপধাপ ভারী কদম ফেলে সোজা ম্যানশনের ভেতরের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে। তাকে দেখে বসে থাকা সানা, এসপি আর ঈশানী তিনজনেরই ভ্রু কুঁচকে যায়।
রানা প্রবেশ করতেই সে চিৎকার করে ওঠে,
—”আরজে, কুত্তারবাচ্চা, তোর এত বড় সাহস কীভাবে হলো আমার বাপকে মারার। শালা, তোকে আজ….”
তার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই তার সামনে এসে দাঁড়ায় সানা। কোমরে দুই হাত রেখে, চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল করে সে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এই মুহূর্তে রানার ঘাড় মটকাবে। সে এক পা এগিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে ওঠে,
—”শালা রানের বাচ্চা রান, মুরগির রান,

মান না মান, আজকে তুই না আমার মেহমান।
আজকে তোর কানের নিচে এমন বাজান বাজাবো,
রান থেকে সোজা খানখান হয়ে যাবি”
সানার কবিতা শুনে পিছন থেকে এসপি আর ঈশানী দুজনেই বাহবা দিতে শুরু করে,
—”আরিব্বাস কটকটি, লা জবাব”
এদিকে রানা কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এমনিতেই তার মাথা ক্রোধে জ্বলছে। তার উপর এই মেয়েটাকে দেখার সাথে সাথেই যেন সেই আগুনে আবারও পেট্রোল ঢালা হয়। সে গরম নিঃশ্বাস ফেলে গর্জে ওঠে,

—”এই ধানি লঙ্কা, মুখ সামলে কথা বলবে। না হয়….”
সানা আরও এক কদম এগিয়ে যায়। এমনভাবে এগিয়ে যায় যেন ভয় নামক জিনিসটা তার অভিধানেই নেই। সে আঙুল তুলে রানার বুকের দিকে তাক করে বলে,
—”না হয় কী? কী করবি তুই? বল শালা, সাহস থাকলে এদিকে আয়”
রানা হতবাক হয়ে যায়। এই মেয়েটার সাহস প্রতিবারই তাকে নতুন করে অবাক করে। মনে মনে বহুবার ভেবেছে, যদি এই মেয়েটা আরজের স্ত্রী না হতো, তাহলে অনেক আগেই সে এই উদ্ধত জিহ্বাকে থামিয়ে দিত। কিন্তু এখন?
এখন সে শুধু দাঁত চেপে নিজের রাগটাকে গিলে নিচ্ছে, কেননা এই মেয়ের দিকে হাত বাড়ালেই আরজে তার অবস্থা তার বাপের থেকেও খারাপ করে ফেলবে এটা সে ভালো করেই জানে। তাই সে পাশ কাটিয়ে ভেতরের দিকে এগোতে যাবে, কিন্তু সানা তাকে সেই সুযোগটুকুও দেয় না। হঠাৎ ঘুরে এসপির দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে ওঠে,

—”এসপি, ভালো করে এই ব্যাটাকে বেঁধে ফেল। এর কিডনি বিক্রি করে এবার আমি কারোরপতি হবো। এর দুইটা কিডনি দুই দুই করে পাঁচ কোটি তো হবেই”
ঈশানী সাথে সাথে মুখ চেপে হাসতে শুরু করে। আর এসপি চিন্তিত বিজ্ঞানীর মতো ভ্রু কুঁচকে বলে,
—”কিরে, দুই দুই করে তো চার হয়। তুই পাঁচ কেন বললি?”
সানা সাথে সাথে চোখ রাঙিয়ে বলে,
—”জানতাম তুই নাক গলাবি, এজন্যই তোর একটা আগেই ধরে রেখেছি আমি”
এসপি মনে মনে কিছু একটার হিসাব কষে সন্দেহ জনিত স্বরে আওড়ায়,
—”প্রশ্ন এটা না তুই একটা ধরে রেখেছিস, প্রশ্ন এটা ওই মুরগির রানের একটা কিডনি দুই কোটি, আর আমার একটা কেন এক কোটি?”
সানা তার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা প্রশ্ন সে করেছে। তারপর ধৈর্য ধরে বোঝানোর সুরে বলে,

—”আবে ইয়ার, তোর একটা কিডনির মধ্যে আমার অর্ধেক অধিকার আছে। আর সানিতার অর্ধেকের জন্য সানিতা এক কোটি নিবে, আমি এক কোটি নিবো। এবার বুঝতে পেরেছিস?”
এসপি গভীর ভাব নিয়ে মাথা ওপর নিচ নাড়িয়ে বলে,
—”হুম… বিজনেসের দিক থেকে চিন্তা করলে যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু এই মুরগির রানের দুইটা কিডনিই যদি নিয়ে নিই, তাহলে তো এ বাঁচবে না। তখন বাকি জিনিসগুলো কী করবো?”
সানা নির্বিকারভাবে বলে,
—”আর কী করবো? বিজনেস করব বিজনেস”
এটা বলে সে টেবিলের উপর রাখা জুসের গ্লাস সরিয়ে এমন ভঙ্গিতে হিসাব করতে বসে, যেন আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ করছে,
—”ঠিক আছে বিটকেল…এর আর কী কী বিক্রি করা যাবে? হুমমম বারোটা চোখ….”
ঈশানী সাথে সাথে তাকে ধাক্কা দিয়ে বলে,
—”মানুষের দুইটা চোখ হয়”
সানা দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
—”কাল নাগিনীর বাচ্চা, হিসাব করতে দে। দুইটা চোখ কত হতে সেটা পারে বল?”
—”কম করে একটা চোখ এক কোটি তো হবেই”
সানা সারা আদল সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে শুধালো,
—”আচ্ছা, তাহলে দুইটা চোখ দুই কোটি… কিডনি দুইটা চার কোটি… মানে হচ্ছে চার দুকনে আট কোটি”
ঈশানী এবার বিরক্ত হয়ে কপাল চাপড়ে বলে,
—”আজ আরভি স্কুলে গেছে, তুই কেন ওর সাথে যাসনি? নিজেই একটু যোগ বিয়োগ শিখে আসতে পারতি”
সানা সাথে সাথে তার দিকে রক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করে বলে,
—”কাল নাগিনীর বাচ্চা, কত হয়েছে সেটা বল। আর যখন আমি কোটি টাকার হিসার করব তখন তুই পড়াশোনার মতো ছোটলোকি কথা বলবি না। শুধু মনে রাখবি, দিস ইজ সানা’স বিজনেস”
ঈশানী অপমানিত মুখে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

—”ছয় কোটি হয়েছে”
সানা সাথে সাথে নাক মুখ কুঁচকে বলে,
—”মাত্র ছয় কোটি? এসপি, এর আর কী কী বিক্রি করা যায় বল”
এসপি এবার গভীরভাবে রানার দিকে তাকিয়ে উপর নিচ পর্যবেক্ষণ করে বলে,
—”এর হৃদয়টা কোনো প্রেমে পাগল মেয়ের কাছে বিক্রি করা যেতে পারে”
সানা সাথে সাথে তার বাহুতে চাপড় মারে এত জোরে যে ব্যথায় এসপি নাক মুখ খিঁচিয়ে নিল কিন্তু কিছু বলল না। সানা হাসতে হাসতে বলে,
—”ঠিক বলেছিস, আর এর নাকটা? দেখ না কী সুন্দর শেপ। এটা নিলামে তুললে কয়েক কোটি তো হবেই”
এদিকে রানা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে যে এখানে আরজের উপর রাগ ঝাড়তে এসেছে সেটাই যেন ভুলে গেছে। মুখ হাঁ করে শুধু এদের কথাবার্তা শুনছে। তারপর অবশেষে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে ওঠে,
—”আমি জলজ্যান্ত মানুষ দাঁড়িয়ে আছি আর এরা আমার সামনে আমার কিডনি নিয়ে ব্যবসা করছে?”
সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তাদের দিকে তেড়ে আসবে ঠিক তখনই ম্যানশনের বিশাল গেটের বাইরে পরপর কয়েকটি কালো গাড়ির বহর এসে থামে। চারপাশের বাতাস যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে। মাঝখানের কালো রোলস রয়েসের দরজা খুলে সেখান থেকে নেমে আসে আরজে। কালো শার্টের উপর গাঢ় ধূসর কোট, আর চোখে সেই অন্ধকারের মতো ঠান্ডা দৃষ্টি। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে রানাকে এখানে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলে। তারপর চোখের পলকে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। রানা মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে কিন্তু তার আগেই আরজে গার্ডদের দিকে সামান্য ইশারা করে। পরমুহূর্তেই দুইজন গার্ড ঝাঁপিয়ে পড়ে রানার উপর। রানা চিৎকার করে,

—’এই ছাড়, ছাড় বলছি…. শালা একেক টাকে মেরে ফেলব আমি….”
রানা চিৎকার করতে থাকে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। তাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আরজে স্থির দৃষ্টিতে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখের ভেতরে অদ্ভুত এক রক্তপিপাসু অন্ধকার জমে ওঠে। মনে হচ্ছে আজকের রাত কোনো অশুভ ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছে। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে তীর্যক একটা শীতল এক হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু পরমুহূর্তেই ঘাড় ঘুরিয়ে সে সানার দিকে তাকায়। আর আশ্চর্যজনকভাবে মুহূর্তের মধ্যে তার চেহারার সমস্ত নির্মমতা গলে যায়। সেই শয়তানি অন্ধকারের জায়গায় নেমে আসে কোমলতা, নরম, গভীর, একান্ত ব্যক্তিগত কোমলতা। তবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এসপিকে দেখতেই আবার তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সে বিরক্ত চোখে একবার এসপির দিকে তাকায়। তারপর কোনো কথা না বলে সোজা এগিয়ে এসে সানাকে কোলে তুলে নেয়। সানা সাথে সাথে চমকে ওঠে,
—”এই নামান, সবাই দেখছে”
আরজে নির্বিকার গলায় শুধায়,
—”দেখুক”
এসপি মুখ বাঁকিয়ে নিচু গলায় বলে,
—”হায়রে প্রেম… মানুষকে কী না করায়”
ঈশানীও ঠোঁট চেপে হেসে ফেলে। আরজে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সানাকে কোলে নিয়েই ধীর পায়ে ম্যানশনের ভেতরের দিকে চলে যায়।

রাতটা যেন আজ অদ্ভুত রকমের কোমল। শীতের হালকা কুয়াশা মিশে আছে বাতাসে। দূরের আকাশ জুড়ে আধখানা চাঁদ ঝুলে আছে নিস্তব্ধ কোনো কবিতার মতো। ব্ল্যাক ম্যানশনের চারপাশ আজ অস্বাভাবিক শান্ত না আছে বন্দুকের শব্দ, না আছে কোনো রক্তাক্ত চিৎকার। যেন বহুদিন পর অন্ধকারের রাজপ্রাসাদটাও আজ একটু ভালোবাসার নিশ্বাস ফেলছে। আর সেই নীরব, মায়াবী রাতের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে সানা।
আরজের বিশাল কক্ষের মাঝখানে, উষ্ণ হলদে আলোয় মোড়ানো ঘরে, চোখে কালো সিল্কের পট্টি বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে রমণী। তার শরীরে জড়ানো রক্তিম লাল জর্জেটের শাড়িটা যেন রাতের বুক চিরে ওঠা কোনো জ্বলন্ত গোলাপ। পাতলা জর্জেটের আবরণে তার দেহের কোমল বাঁকগুলো আবছাভাবে ফুটে উঠছে। শাড়ির আঁচলটা হালকা বাতাসে দুলছে ঠিক রক্তিম কোনো প্রজাপতি ডানা মেলার মতো। তার কানে ছোট্ট ডায়মন্ডের ঝুমকা দুলছে। খোলা চুলগুলো ঢেউ খেলানো হয়ে পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। ঠোঁটে হালকা লাল আভা, চোখে গাঢ় কাজল যদিও সেই চোখদুটো এখন কালো পট্টির আড়ালে বন্দি। তবুও তাকে দেখলে মনে হচ্ছে কোনো অন্ধকার রাতের বুকেই বুঝি পূর্ণিমা নেমে এসেছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে রমণী ভীষণ চটে আছে।কিছুক্ষণ আগেই আরজে এসে রহস্যময় ভঙ্গিতে বলেছে,

—”ওয়াইফি, আই’ভ আ সারপ্রাইজ ফর ইউ”
তারপর এই শাড়িটা পরতে বলেছে, নিজ হাতে তাকে সাজিয়েছে, আর শেষে এসে চোখে এই কালো পট্টিটা বেঁধে দিয়েছে। এখন সে দাঁড়িয়ে আছে বহুক্ষণ ধরে। কী হচ্ছে, কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে, কিছুই জানে না। সানা বিরক্ত হয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলে উঠতে যাবে,
—”রানভীর, আমি কিন্তু….”
তার আগেই হঠাৎ তার ঘাড়ে এসে আঁচড়ে পড়ে কারো গরম নিঃশ্বাস, নাকে এসে বারি খায় কফি আর ভ্যানিলার ঘোর স্মেল। সানার পুরো শরীরটা কেঁপে ওঠে। পরমুহূর্তেই পিছন থেকে দুটো শক্ত পুরুষালী বাহু তাকে জড়িয়ে ধরে। আরজে নিজের মুখটা তার ঘাড়ের ভাঁজে ডুবিয়ে নাক ঘষতে ঘষতে ঘোরলাগা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে,
—”ওয়াইফি… সারপ্রাইজটা কাল দিলেও চলবে। এখন তোমাকেই খেতে ইচ্ছে করছে”
সাথে সাথে লজ্জায় সানার কান টকটকে লাল হয়ে যায়। শরীরের ভেতর দিয়ে কেমন এক বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে যায়। বুকের ভেতরটা ধকধক করে ওঠে। কিন্তু সে সবটা আড়াল করে শক্ত গলায় ধমক দিয়ে ওঠে,
—”চুপ করুন, অসভ্য লোক একটা। এখন বলুন কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন”
আরজে মনের কোণে উঁকি দেওয়া নিষিদ্ধ ইচ্ছা টাকে ধামাচাপা দিয়ে আওড়ায়,

—”চলো”
—”কিভাবে যাব? আপনি যে চোখে এটা লাগিয়েছেন, আমি সামনে যাবো, না পিছনে যাবো? নাকি আপনার মাথায় চড়ে বসবো?”
আরজে স্পষ্ট বুঝতে পারে তার ওয়াইফি রেগে গেছে। সে আর কোনো উত্তর না দিয়ে হঠাৎ এক হাত দিয়ে সানাকে কোলে তুলে নেয়,
—”আআআ, রানভীর”
সানা তড়িঘড়ি করে তার গলা জড়িয়ে ধরে। আরজে নিচু স্বরে হেসে বলে,
—”তোমার রানভীর থাকতে তোমার টেনশন কিসের, সোনা?”
সানা বারবার জিজ্ঞেস করতে থাকে,
—”কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? কি করছেন? বলুন তো”
কিন্তু আরজে শুধু একটাই উত্তর দেয়,
—”সারপ্রাইজ, সুইটহার্ট”

শেষমেশ সানা হাল ছেড়ে দেয়। ধীরে ধীরে নিজের মাথাটা আরজের কাঁধে হেলিয়ে দেয়। তার বুকের শব্দ শুনতে শুনতে চুপ করে থাকে। আরজে তাকে কোলে করেই নিচে নিয়ে যায়, তারপর গাড়িতে।
গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে রাতের নিস্তব্ধতা আবারও গাড়িটাকে ঘিরে ধরে। বাইরে শহরের আলো একে একে পিছিয়ে যেতে থাকে। সানা চোখে পট্টি বাঁধা অবস্থায় শুধু অনুভব করে গাড়ি ক্রমশ শুনশান কোনো পথের দিকে এগোচ্ছে। কিয়ৎক্ষণ পর গাড়ি এসে থামে এক অজানা ঠিকানায়। আরজে ধীরে ধীরে তাকে আবার কোলে তুলে নামিয়ে আনে। চারপাশ একদম নিস্তব্ধ, না কোনো মানুষের শব্দ, না কোনো গাড়ির আওয়াজ, শুধু দূরের বাতাসের শব্দ। আরজে তাকে খুব যত্ন করে মাটিতে নামিয়ে দাঁড় করায়। তারপর কানের কাছে মুখ এনে গম্ভীর স্বরে ফিসফিস করে,
—”এখন পট্টিটা খোলো”
সানা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে চোখের কালো কাপড়টা খুলে ফেলে। আর খুলতেই নজরে আসে চারপাশে শুধু ঘন অন্ধকার, আরজে কোথাও নেই আর না কেউ। সানার বুক ধক করে ওঠে। সে কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে চারদিকে তাকায়,
—”রানভীর…?”
বিপরীতে কোনো উত্তর নেই। তার গলায় এবার ভয় জমে ওঠে,
—”রানভীর, রানভীর কোথায় আপনি?
আমি সত্যি বলছি, একবার আপনাকে হাতের কাছে পেলে কানের নিচে এমন বাজান…..”

এই বলে সে কয়েক কদম সামনে বাড়াতেই হঠাৎ চারপাশটা আলোকিত হয়ে ওঠে। একসাথে হাজারো আলো জ্বলে ওঠে চারদিকে। সানা চমকে হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলে। কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে চারদিকে তাকাতেই তার নিঃশ্বাস থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যায়। চারপাশটা যেন কোনো স্বপ্নরাজ্য। খোলা বিশাল মাঠের মাঝখানে পুরো জায়গাটা সাজানো হয়েছে অসংখ্য উষ্ণ ফেয়ারি লাইট দিয়ে। গাছের ডাল থেকে ঝুলছে সোনালি আলোর মালা। মাটির দুপাশে সারি সারি মোমবাতি জ্বলছে। লাল, সাদা আর কালো গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সরু পথ। মাঝখানে কাঁচের তৈরি সুন্দর ডাইনিং সেটআপ। চারদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে গোলাপ আর ভ্যানিলার মিশ্র সুগন্ধ। উপরে খোলা আকাশ, নিচে হাজারো আলো। মনে হচ্ছে পৃথিবীর বুক থেকে আলাদা করে কেউ একটা ছোট্ট প্রেমের রাজ্য বানিয়ে ফেলেছে।
সানা বিস্ময়ে চারদিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ তার দৃষ্টি যায় আকাশের দিকে আর পরমুহূর্তেই তার ডাগর ডাগর চোখজোড়া অধিক বিস্ময়ে বড়বড় হয়ে যায়। কেননা অনেকগুলো ড্রোন আকাশজুড়ে একত্র হয়ে জ্বলজ্বল করে লিখছে,
“HAPPY BIRTHDAY, WIFEY”

সানার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। সে নিজেই ভুলে গিয়েছিল আজ তার জন্মদিন কিন্তু আরজে ভুলেনি, একটুও ভুলেনি। ঠিক তখনই আবারও তার ঘাড়ে এসে লাগে সেই পরিচিত গরম নিঃশ্বাস। কানের পাশে গম্ভীর, গভীর স্বর ভেসে আসে,
—”হ্যাপি বার্থডে, মাই লাভ”
বলেই আরজে ধীরে করে তার ঘাড়ে একটা চুম্বন এঁকে দেয়। সানার বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। আরজে ধীরে ধীরে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। দুজনের চোখাচোখি হতেই সানা স্তব্ধ হয়ে যায়। এই মানুষটার চোখে আজ কোনো অন্ধকার নেই আছে শুধু ভালোবাসা, গভীর, তীব্র, নিঃশেষ করা ভালোবাসা। রমণী ফিসফিস করে,
—’আপনি… মনে রেখেছেন?”
আরজে হালকা হেসে তার গাল ছুঁয়ে আওড়াশ,
—”আমি তোমার নিশ্বাস গুনে রাখতে পারি, আর তোমার জন্মদিন ভুলে যাব?”
সানার চোখ তীব্র অনুভূতির শিহরণে টলমল করে ওঠে। ঠিক তখনই পিছন থেকে ধীরে ধীরে একটা স্লো মিউজিক ভেসে আসে,
“টু টা জো কাবিতারা… সাজনা বে…”
আরজে ধীরে ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে এক হাত পিছনে রাখে, তারপর অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে সানার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

—”মে আই হ্যাভ দিস ড্যান্স, মিসেস জাওয়ান?”
সানা মুগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর নিঃশব্দে নিজের হাতটা আরজের হাতে রেখে দেয়। পরমুহূর্তেই আরজে তাকে আলতো টানে নিজের কাছে নিয়ে আসে। দুজন পায়ে পা মিলিয়ে গানের ছন্দের তালে তালে ধীরে ধীরে নাচতে শুরু করে। চারপাশে গোলাপের সুগন্ধ, ফেয়ারি লাইট, উপরে অসীম আকাশ। আর সেই আকাশের নিচে একটা দানব আর তার ভালোবাসার মানুষ, নিজেদের পৃথিবী ভুলে শুধু একে অপরের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে গানটার সুর স্তিমিত হয়ে আসে।
চারপাশে ঝুলে থাকা হাজারো ফেয়ারি লাইটের আলো তখনো রাতের অন্ধকারে জোনাকিদের মতো জ্বলজ্বল করছে। ঠান্ডা বাতাসে গোলাপের পাপড়িগুলো উড়ে এসে কখনো সানার শাড়ির আঁচলে, কখনো আরজের কাঁধে গিয়ে পড়ছে। দূরে আকাশজুড়ে ড্রোনগুলোর আলো নিভে গিয়ে আবারও রাতটাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছে। নাচ থামতেই আরজে ধীরে ধীরে নিজের কপালটা সানার কপালে ঠেকিয়ে দেয়। তার বড় বড় উষ্ণ নিশ্বাস এসে আছড়ে পড়তে থাকে সানার মুখে, বিপরীতে রমণী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই মানুষটার চোখের দিকে তাকালে তার কেন জানি মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর দানবটাও হয়তো কোনো একজন মানুষের কাছে এসে নিঃশেষ কোমল হয়ে যেতে পারে।
আরজে ধীরে ধীরে সানার ললাটে একটা দীর্ঘ চুম্বন এঁকে তারপর গম্ভীর, ভারী কণ্ঠে শুধালো,

—”থ্যাংকস, মাই লাভ”
সানা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকায়,
—”কিসের জন্য?”
আরজে চোখ বন্ধ করে আবারও একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে আওড়ায়,
—”আমার লাইফে আসার জন্য, আমার অন্ধকারটাকে আলো বানানোর জন্য। রিশের জন্য আর আমাদের অনাগত বেবিটার জন্য। তুমি জানো না, তুমি আমার লাইফটা কত সুন্দর করে দিয়েছো, ওয়াইফি। আমি তো ভাবতাম আমার ভাগ্যে শুধু রক্ত আছে, মৃত্যু আছে, অন্ধকার আছে। কিন্তু তুমি এসে সব বদলে দিয়েছো”
সানার বুকটা হঠাৎ কেমন কেঁপে ওঠে। আরজে তার নাকের ডগায় নিজের নাক ছুঁইয়ে হালকা হাসে। তারপর হঠাৎ খুব শান্ত, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
—”ওয়াইফি… চলো আরেকবার বিয়ে করি”
সানা থমকে যায়। তার চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে। পরমুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে মাথাটা একটু কাত করে বলে,

—”সত্যি, মিস্টার জাওরা?”
শব্দটা কানে যেতেই আরজের মুখের সমস্ত কোমলতা মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যায়। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, চোখদুটো সরু হয়ে আসে। সে ধীরে ধীরে রুক্ষ স্বরে বলে,
—”কি? কি বললে তুমি?”
বিপরীতে রমণী দাঁত দিয়ে জিব কাটে, হয়তো সে একটু বেশিই বলে ফেলেছে। সে তোতলানি শুরু করে,
—”না মানে… ইয়ে মানে…”
—”আবার বল”
—”মি-মিস্টার… জাওয়ান…”
আরজে ভ্রু কুঁচকে সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর সন্দেহ জনিত সুরে বলে,
—”সত্যি করে বলো… আমার এই নাম আগে কে রেখেছে? তুমি নাকি ওই বারোভাতারিটার বুদ্ধি এটা?”
সানা ঠোঁট কামড়ে ফেলে। তারপর ইনিয়ে বিনিয়ে বলে,
—”না মানে… মুখের ফসকে বেরিয়ে গেছে আর কি…”
আরজে সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,

—”আমি জানতাম, এটা তুমিই হবে”
তারপর কয়েক সেকেন্ড স্থির থেকে আবার নিজেকে সংবরণ করে ফেলে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবারও সানার কপালে চুমু খেয়ে বলল,
—”বাট দোষ তোমার না, ওই বারোভাতারিটার। ও সাথে ছিলে বলেই এসব শিখেছো”
তারপর নিচু স্বরে বলে,
—”এখন চলো… আমরা বিয়ে করি”
সানার ঠোঁটে আবারও হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু তাদের থেকে কিছুটা দূরে, অন্ধকারের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা এসপির অবস্থা তখন করুণ। তার চোয়াল প্রায় ঝুলে পড়ার উপক্রম। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে আরজের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছে,
“এই জাওরার সমস্যা কোথায়? এর বউ যেখানে যাবে, যাই করবে, সব দোষ শেষে আমার ঘাড়েই চাপাবে”
তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সানিতা। সেও উঁকিঝুঁকি মেরে সব দেখছে। আসলে সবাই মিলে আজকের এই সারপ্রাইজটা প্ল্যান করেছে। কিন্তু আরজের ‘পার্সোনাল টাইম’ এর কারণে কেউ সামনে যেতে সাহস পায়নি। তাই দূরে দাঁড়িয়ে সবাই চুপচাপ দেখছিল। কিন্তু ‘জাওরা’ নামটা শোনার পর সানিতাও ধীরে ধীরে এসপির দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সন্দেহজনক চোখে তাকায়,

—”তুমি আরজেকে জাওরা বলেছো… তাই না?”
এসপি তার দিকে কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। সানিতা কেন আরজের বিষয়ে এত নাক গলাবে? এটা একদম অপছন্দ তার। তাই দন্ত পাটি পিষে বলে,
—”হ্যাঁ বলেছি তো, তো কি করবি? তোর বাপকে বলবি”
সানিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে সামনে তাকিয়ে থাকে। আর এসপি দাঁতে দাঁত চেপে আরজের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে,
—”শালা… একশ বার বিয়ে করলেও ঠিক হবে না। শেষে ঘুরেফিরে আমার ঘাড়েই দোষ চাপাবে”
ঠিক তখনই পাশ থেকে সানিতা নরম গলায় বলে,
—”ফারাদ ভাই…”
“ভাই” শব্দটা কানে যেতেই এসপি যেন জ্বলে ওঠে, তার রাগটা আরো একধাপ বেড়ে যায়। সে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বলে,
—”কিহ? কাকে বললি ভাই? তোর এই ভাই ডাকার চক্করে দুদিন পর আমার মেয়ে আমাকে মামা ডাকবে”
সানিতা জিভে দাঁত কেটে তাড়াতাড়ি নিজেকে শুধরে নেয়,
—”আচ্ছা আচ্ছা… ফারাদ…আমি না আবার বিয়ে করবো”
বাক্যটা শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই এসপি সাথে সাথে তার চিবুক শক্ত হাতে চেপে ধরে কাছে টেনে আনে। চোখ লাল করে বলে,
—”কি বললি? আবার বল”
সানিতা কোনোমতে তার হাত সরিয়ে বিরক্ত হয়ে বলে,
—”আরে পাগল, তোমাকেই আবার বিয়ে করবো”

মুহূর্তেই এসপির মুখে ফুলের মতো হাসি ফুটে ওঠে। সে সাথে সাথে সানিতার গালে হাত রেখে আদুরে স্বরে বলে,
—”এটা আগে বলবি না পাগলি? আমি তো এখানে একটা চর দিয়েই ফেলতাম”
সানিতা রেগে তার হাত ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয়। আর এসপি সঙ্গে সঙ্গে তার রাগ ভাঙানোর মিশনে লেগে যায়।
এদিকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ঈশানী, রিজভীও, সিয়া কাইলিন সব দেখছে। আর তাদের থেকেও দূরে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক ও ইবেলিনা। যদিও জ্যাক আদৌ এখানে আসতে চায়নি। তার মতে, “বসের পার্সোনাল টাইমে উপস্থিত থাকা ঘোর অপরাধের মতো” কিন্তু ইবেলিনার জেদের কাছে হার মেনে শেষমেশ আসতেই হয়েছে। এখন সে বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রল করছে। মাঝেমধ্যে মাথা তুলে তাকিয়ে আবার বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে নিচ্ছে।
এদিকে সানা অবশেষে আরজেকে “হ্যাঁ” বলতেই পিছন থেকে হঠাৎ সবাই একসাথে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে,

—”ওওওওওওওও”
সানা চমকে উঠে এক ধাক্কায় আরজেকে সরিয়ে দেয়। আরজেও আকষ্মিক ধাক্কায় দু এক কদম পিছিয়ে যায়। তারপর সবার দিকে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে সে প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে গুলি করতে প্রস্তুত। কিন্তু কেউই তার দৃষ্টিকে পাত্তা দেয় না। বরং সবাই একসাথে বলে ওঠে,
—”হ্যাপি বার্থডে, সানা….এন্ড শাদি মোবারক”
বিপরীতে সানাও হেসে ফেলে। তারপর হঠাৎ হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে বলে,
—”আমি একা বিয়ে করতে পারবো না, চলো সবাই মিলে বিয়ে করি”
আরজে সঙ্গে সঙ্গে তার হাত টেনে বলে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩১ (৩)

—”কি? সবাই মিলে মানে?”
—”আবে ইয়ার, সবাই মিলে মানে সবাই নিজের নিজের পার্টনারকে বিয়ে করবে”
তারপর দুই হাত ছড়িয়ে হেসে ওঠে,
—”সবকো শাদি মোবারক হো”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৩