হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮
সাবা খান
বিশাল পাভিলিয়নের তৃতীয় তলার করিডোরটা নিচের পার্টির একদম বিপরীত। নিচে যেখানে আলো, শব্দ আর মানুষের ভিড়, এখানে সেই জায়গায় নীরবতা আর মৃদু আলো। দূর থেকে ভেসে আসছে মিউজিকের ক্ষীণ আওয়াজ। সানা দরজা খুলে দ্রুত রুমে ঢুকে পড়ে। এই নিস্তব্ধ প্রাসাদসম অট্টালিকার প্রতিটা রুম বেশ বড়, নরম উষ্ণ আলোয় ভরা এক একটা লাক্সারি সুইট। ডান পাশে বড় একটা কাচের জানালা, সেখান থেকে দূরের শহরের আলো দেখা যাচ্ছে। বাম পাশে কিং সাইজের বিছানা।
দরজা বন্ধ করে রমণী একটা গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, কণ্ঠস্বর থেকে নিঃসৃত হয়,
-“উফ…, শান্তি….”
মনে হচ্ছিল যেন অবশেষে এই কোলাহল থেকে একটু মুক্তি পেল। কিন্তু সেই স্বস্তি মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলো। কারণ সে যখন ধীরে ধীরে সামনে তাকায়, তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
কেননা সোফার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। কালো স্যুটে, বুকের উপর হাত গুটিয়ে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সানার বুকটা ধক করে উঠল, মনে মনে ভাবছে,
“এই লোক এখানে আসল কীভাবে? রুম তো ভিতর থেকে বন্ধ ছিল, তাহলে!”
কিন্তু তার বিস্ময়, সেটা মুখে প্রকাশ করল না। বরং তার চোখ একবার দ্রুত রুমটা স্ক্যান করল, বিছানার দিকে, জানালার পাশে, সোফার পেছনে, তার চোখ তাড়াহুড়ো করে খুঁজছে আরভিকে। কিন্তু না, ছেলেটাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
কই গেল, রুমেই তো থাকার কথা!
কিন্তু তার মুখে সেই চিন্তার ছাপ নেই। সে যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। চোখ চারদিক থেকে ঘুরে আরজের উপর স্থির হয়। সে ধীরে বলে,
-“আপনি… এখানে?”
আরজের তরফ থেকে কোন প্রত্যুত্তর এলো না, সে শুধু তাকিয়ে রইল তারদিকে, তার সেই দৃষ্টি যেন সানাকে পড়ে ফেলতে চাইছে। সানা সাবধানে আবার রুমের ভেতর চোখ বুলাল। যেন কিছু খুঁজছে, কিন্তু সেটা বোঝা না যায় এমনভাবে। তার বুকের ভেতর ধুকপুক বাড়ছে। মনের ভিতর অসংখ্য প্রশ্ননা ভিড় জমাচ্ছে,
“আরভি কোথায়?”
“সে তো এখানেই ছিল…”
সে আরেকটু এগিয়ে আসে, আর ঠিক তখনই মাথা গিয়ে ধাক্কা খায় আরজের বুকের সাথে। রমণী আরভিকে খুঁজতে খুঁজতে টেরই পেল না কখন আরজে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এসেছে। সানা একপলক বিরক্ত সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার উপর কারণ আরজে এখন ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে। এতটাই কাছে যে তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা সরাসরি সানার মুখে আঁচড়ে পরছে। সানা অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেল। আর তার পিঠ গিয়ে ঠেকল দরজায়। পরের মুহূর্তেই আরজে দুহাত তুলে দরজার দুপাশে রেখে দিল। রমণী এখন পুরোপুরি ঘেরা আরজের বাহুবন্ধনে। বাম পাশে আরজের হাত, ডান পাশেও আরজের হাত। সানা অনুভব করল তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন আরও জোরে বাজছে।
সে নিজের হাত মুষ্টি বদ্ধ করে, চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলাচ্ছে। তারপর ধীরে চোখ খুলতেই নজরে আসে আরজে তখনও তাকিয়ে আছে সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। যেন সে সানার মাথার ভেতর ঢুকে পড়তে চাইছে। সানা দুই হাতে তাকে সরানোর বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো, তাতে আরজের মতো বলিষ্ঠ মানবকে একটু টলাতে পারল না বরং আরজে রমণীর এমন ছটফটানি দেখে এতে আরও বেশি আনন্দ পাচ্ছে। সানা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে শক্ত কণ্ঠে শুধালো,
-“সমস্যা কি আপনার?”
বিপরীতে কোন শব্দ এলো না, সানা ফের প্রশ্ন ছুঁড়ে,
-“আপনি আমার রুমে কেন?”
আরজে এবার হালকা মাথা কাত করে প্রত্যুত্তর করে,
-“এটা কি আপনার রুম?”
সানা ভ্রু কুঁচকাল,
-“আপনি জানেন এটা আমার রুম”
তার বিপরীতে আরজে ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
-“পৃথিবীতে এত মানুষ থাকতে, আপনিই কেন আমার…
সে ঝুঁকে একদম কানের কাছে গিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
-“এক্স ওয়াইফের মতো”
সানার মনে হচ্ছে কেউ তার কাটা গায়ে বারবার নুনে ছিটা দিচ্ছে, আর সে কেউ টা হচ্ছে আরজে। ইচ্ছা করছে এক থাপ্পড়ে গাল লাল করে দিতে। তারপরও মুখ ফুটে কিছু বলল না শুধু পাশ কাটিয়ে বেরোতে চাইল। কিন্তু আরজে একটুও সরে দাঁড়াল না। বরং আরও একটু ঝুঁকে এল। এবার তাদের মাঝে প্রায় কোনো দূরত্ব নেই। সানা দ্রুত চোখ ঘুরিয়ে রুমটা আবার দেখল। তার ভেতরে অস্থিরতা বাড়ছে।
কোথায় গেল আরভি?
আরজে দেখলে তো এক দেখায় চিনে ফেলবে, যেভাবে বাপকে কপি করেছে, যে কেউ দেখলেই বলবে, এটা আরজে।
কিন্তু মুখের ভাব একদম নির্লিপ্ত। আরজে সেটা লক্ষ্য করে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করে,
-“আপনি কিছু খুঁজছেন?”
সানা তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়িয়ে বলে,
-“না.. না.. না তো, কেন?”
-“কারণ আপনি রুমে ঢোকার পর থেকেই চারদিকে তাকাচ্ছেন”
তার প্রতিটা নিঃশ্বাস সানার গালে এসে পড়ছে। রমণীর অজান্তেই মুঠো করা হাত আরও শক্ত হয়ে ওঠে। সে চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
-“সরে দাঁড়ান”
-“কেন?’
-“আমি বের হব…”
আরজে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখ এবার সানার কৃষ্ণকালো চোখে স্থির। তারপর খুব নিচু স্বরে বলে,
-“আপনি কি আমার থেকে পালাচ্ছেন?”
সানার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। কিন্তু তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। সে ঠান্ডা স্বরে জবাব দেয়,
-“আপনি নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন”
-“মে বি..”
সানা দাঁত চেপে বলে,
-“আপনি আমার রুমে কেন এসেছেন?”
-“আমার এক্স ওয়াইফ কে খুব মিস করছিলাম, তাই ভাবলাম একটু দেখে যাই”
সানা এবার ভীষণ বিরক্ত, শুধু একবার মিসেস দিলরুবা খানম তাকে বলবে ‘মিশন শেষ’ আর সে সাথে সাথে এই লোকের সব গুলো চুল আগে একটা একটা করে ছিঁড়বে পরে কথা হবে। সে চোখ সরিয়ে আবার এক ঝলক রুমটা দেখল। তার বুকের ভেতর উদ্বেগ বাড়ছে।
“ভীর… কোথায় গেলে তুমি?”
তার ভাবনার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে হঠাৎ আরজে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার হাত দুটো দরজার দুপাশ থেকে সরিয়ে নিল। তারপর সে একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দরজার লক খুলে ফেলল। সানা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সে ভেবেছ, আরজে হয়তো আরও কিছু বলবে, হয়তো আবার তাকে আটকাবে। কিন্তু নাহ, আরজে শুধু একবার তাকাল তার দিকে, সেই তীক্ষ্ণ, গভীর দৃষ্টিতে। তারপর একটুও পিছনে না তাকিয়ে ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। দরজাটা নরম শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
কক্ষে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সানা কিছুক্ষণ ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দরজার দিকে, ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মনে অদ্ভুত একটা প্রশ্ন জাগে,
“এত সহজে… চলে গেল?”
“এত তাড়াতাড়ি?”
সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎ নিজেই বিরক্ত হয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের কপালে হালকা চাপড় দিয়ে বলে,
-“উফ সানা, কি সব ভাবছিস তুই?
চলে গেছে তো গেছে
তোর কি সমস্যা?”
সে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তারপর হঠাৎই তার মনে আবার একটা চিন্তা ফিরে এল,
“আরভি”
তার বুকটা আবার ধক করে উঠে, সে দ্রুত রুমের দিকে তাকায়, বিছানা, সোফা, জানালা, বাথরুম কোথাও নেই। তার কপালে চিন্তার রেখা পড়ে,
“কোথায় গেল বাচ্চাটা…”
অস্থির ভাবে ডেকে ওঠে তাকে,
-“ভীর, সোনা কোথায় তুমি?
ভীর, ভীর….”
নাহ, বিপরীতে নিস্তব্ধতা বেদ করে কোন শব্দ ফিরে এলো না। হঠাৎ তার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ভীর তো তাকে বলা ছাড়া কোথাও যাওয়ার ছেলে না, তাহলে?
মুহূর্তে তার মনে পড়ে পার্টিতে যাওয়ার আগে তো আরভিকে সানিতার কাছেই রেখে গিয়েছিল। আরভি তখন খেলছিল। তার ঠোঁটে হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল,
-“নিশ্চয়ই ওখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
এই বাচ্চাটাও না, সব বাপের মতো হলেও ঘুমটা পেয়েছে ঠিক আমার মতো। যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে”
তার বুকের ভেতরের টানটা একটু কমল। সে আর কিছু না ভেবে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সানা দরজা খুলে বেরোবে, ঠিক তখনই একটা শক্তপোক্ত পুরুষালী বুকের সাথে ধাক্কা খেয়ে পিছিয়ে যাবে আর তার আগে সেই ব্যক্তি তার কোমর চেপে ধরে তাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। রমণী তড়িঘড়ি করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে তৎপর হয়ে উঠে। সে উপরে তাকাতেই দৃষ্টি মিলিত হয় একজোড়া ঠান্ডা শীতল বাদামী চোখের সাথে, যে তার দিকে কেমন ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
এক মুহূর্তের জন্য যেন সব থমকে গেল, শুধু তারা দুজন ছাড়া। সানা একটা ফাঁকা ঢুক গিলে কিয়ৎকাল তার দিকে তাকিয়ে থাকল, তার ইচ্ছে করছে, সব ভুলে সামনের মানবের বুকটায় মাথা রেখে কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো এই উত্তপ্ত হৃদয়টা একটু শান্তি পেত। এদিকে ঘোরে থাকা আরজে ধীরে ধীরে নিজের মুখটাকে নামিয়ে আনে, দৃষ্টি তার অধরের দিকে। রমণী নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল। হঠাৎ আরজে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
-“গুড নাইট, এক্স ওয়াইফ”
তড়াক করে সানা নিজের চোখ খুলে নিল। এই লোকটার ওপর এখন তার এত পরিমাণ রাগ হচ্ছে যে বলার বাহিরে। পর মুহূর্তে আরজেকে এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। হঠাৎ এমন ধাক্কায় আরজে কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। সানা তার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে। এটা দেখা মাত্র আরজের ঠোঁটের কোণের হাসি চওড়া হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবছে, হয়তো সানা এখনই রিয়েক্ট করবে, চিৎকার করবে। কিন্তু তার বিভ্রম ছুটিয়ে সানা একটা মেকি হাসি দিয়ে বলে,
-“গুড নাইট, মিস্টার জাওয়ান”
সানার তরফ থেকে আরজে এমন স্বাভাবিক শব্দ মোটেও আশা করেনি। না, এরকম শান্ত ব্যবহার। মুহূর্তে তার ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে গেল, সাথে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ইচ্ছে করছে এই মেয়েটাকে যে কী করতে… সে নিজেও জানে না। সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা চালাল। আবার আরেক হাতে নিজের ঘাড় ঘষছে। এদিকে সানা ভ্রু কুঁচকে তার হাবভাব বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু তা বুঝে ওঠার আগে হঠাৎ আরজে তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে। এমন আকস্মিক হামলার জন্য রমণী মোটেও প্রস্তুত ছিল না। আর পর মুহূর্তে আরজে নিজের দন্ত বসিয়ে দিল তার গ্রীবাদেশে। সানার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ব্যথাতুর শব্দ,
“আহহহ…”
আরজে নিজের মুখ তুলে তার দিকে একপলক র*ক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে তারপর ভারী ভারী কদম ফেলে চলে গেল। এদিকে সানা নিজের ব্যথা পাওয়া জায়গায় হাত দিয়ে নিজের দাঁত খিঁচিয়ে আরজের দিকে গা*লি ছুঁড়ে,
-“কু*ত্তা……”
তৃতীয় তলার নিস্তব্ধতাকে দূরে ঠেলে শুধুমাত্র একটা রুমে চলছে ফিসফিসানি। সানার রুমে এক গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে বসেছে তিনজন। সানা একটু আগে তাদের কে নিজের রুমে ডেকেছে। এখন তার মনে হচ্ছে এদের ডেকে সে অনেক বড় ভুল করেছে। এরা দুজন প্রথমে ডিভোর্সের কথা শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, সাথে এসপি বলে,
“ওই জাওরা লাইফেও সাইন করবে না, যদি করে থাকে তাহলে সে নিজ পকেটের টাকা দিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে মসজিদে জিলাপি বিতরণ করবে”
ঈশানীও এটাই বলছে, সানারও কোথাও না কোথাও মনে হচ্ছে আরজে সাইন করেনি, কিন্তু ঐ যে বারবার তার কানের কাছে এসে বলছে, “এক্স ওয়াইফ, এক্স ওয়াইফ”। শব্দটা শুনলেই তার মাথা গরম হয়ে যায়।
ঈশানী পুরো একটা সোফা জুড়ে বসে, তার পাশে কতগুলো চকলেট, চিপস আর অনেক গুলো ফাস্টফুড নিয়ে বসে আছে। পার্টিতে লুকাতে গিয়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে সে খেতেও পারেনি। তাই এখন এগুলো নিয়ে বসে একটা পর একটা মুখে পুরছে। সানা কে খাওয়ার জন্য বলেছে, তার পরিবর্তে সে নিজেই একটা তালের বড়া খেয়ে বসে আছে। সানিতাকে ডেকেছে সানা, কিন্তু সে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। এমনিতেই সে প্রেগন্যান্ট, তার ওপর কিছু সমস্যার কারণে একগাদা ঔষধ খেতে হয়। তাই একবার ঘুমালে তার আর দিন দুনিয়ার খবর থাকে না। আরভি তার সাথে আছে। আর অন্যদিকে এসপি পুরো ডিভান জুড়ে হাত পা ছড়িয়ে বসে মোবাইলে গেম খেলছে।
সে ঐসময় পার্টি থেকে ভীষণ কষ্টে বেড়িয়েছে। পার্টির ভেতর তখনও আলো, শব্দ আর মানুষের ভিড়। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যেই এসপি একদম অন্যরকম সতর্ক হয়ে চলছিল। সে মাথা নিচু করে হাঁটছে। বারবার কাঁধের উপর দিয়ে তাকাচ্ছে। মনে মনে বলছে,
-“ধুর… আজকে যদি ধরা পড়ি, তাহলে সরাসরি কবরে”
এসপি একটা টেবিলের আড়াল থেকে আরেকটা টেবিলের আড়াল। একবার ওয়েটারের ট্রলি ঠেলে সামনে এগিয়ে গেল। আরেকবার দুজন অতিথির মাঝখান দিয়ে সরে গেল। কোনোমতে হলরুমের দরজাটা পার হলো। করিডোরে এসে সে এক লম্বা শ্বাস ফেলে আওড়ায়,
-“উফ… বেঁচে গেলাম মনে হয়”
এদিকে সানা সারা কক্ষ জুড়ে পায়চারি করছে। সে নিজের পা থামিয়ে এদের দিকে বিরক্তিসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। কোথায় তার মাথা চিন্তায় ফেটে যাচ্ছে আর এরা বসে বসে নিজেদের কাজ করছে। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে চিৎকার করে বলে,
-“তোদের আমি কী জন্য ডেকেছি? তোরা কি সিরিয়াস হবি নাকি আমার হাতে মার খাবি?”
সানার এমন চিৎকারে মুহূর্তে দুজনেই সোজা হয়ে বসে। এসপি ভ্রু কুঁচকে বলে,
-“তুই নিজে সিরিয়াস তো?”
সানা জোর দিয়ে বলে,
-“হ্যাঁ, আমি শতভাগ সিরিয়াস”
সানার মুখে এমন অভাবনীয় বাক্য শুনে শোনা মাত্রই দুজনই ফিক করে হেসে দিল। দুজনে হাসতে হাসতে বলে,
-“তুই সিরিয়াস, এটা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে? তোর মুখে সিরিয়াস শুনে আমাদের হাসিই থামছে না। আ…”
এসপির বলা বাক্যটুকু থেমে গেল, সানার হুডির হাত গুটানো দেখে, দুজনেই বুঝে নিল এরপর কী হতে চলছে। মুহূর্তে দুজনে একদম সিরিয়াস ভঙ্গিতে বসে পড়ে। ঈশানী নিজের হাতে থাকা সবগুলো চিপস মুখে পুড়ে একবারে বহু কষ্টে গিলে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
-“তুই শিওর আরজে ডিভোর্স পেপারে সাইন করেছে? না মানে আরজেকে দেখে মনে হচ্ছে না ও কোনোদিনও সাইন করবে বলে”
তার বিপরীতে সানা নিজের দন্ত চেপে প্রত্যুত্তর করে,
-“আমি কী জানি, ওই কু*ত্তা তো আমাকে দেখলেই কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে “এক্স ওয়াইফ” বলে বলে। ইচ্ছা করে কানের নিচে এমন বাজান বাজাই”
এসপি বুঝল আজ কটকটি সিরিয়াস। তাই ফোনটা রেখে বলে,
-“তাহলে তুই চারটা লাগালি না কেন?”
-“কেননা আমি এখন সানা নই। সুনেহনা, সুনেহনা, যদি সানা হতাম তাহলে ‘এক্স’ বলার আগে এক ধাবাং থাপ্পড়ে সব দাঁত মাটিতে ফেলে দিতাম”
রমণীর এমন হুমকি শুনে এসপি মিনমিনিয়ে বলে,
-“যাই বলিস, আমার কিন্তু জাওরার জন্য দুঃখ হচ্ছে। কেমন ডেঞ্জারাস মেয়ে তার কপালে জুটেছে পৃথিবীর সাড়ে চারশো কোটি মেয়ের মধ্যে”
সানা আড়চোখে একবার তার দিকে তাকায়, তারপর ঈশানীকে বলে,
-“কালনাগিনী, এর কানের নিচে চারটা লাগিয়ে আয় তো”
কিন্তু ঈশানীর তার কথায় কোনো কান নেই। সে গভীর চিন্তায় মগ্ন। হঠাৎ উচ্ছ্বাস করা কণ্ঠে বলে ওঠে,
-“থাক ডাইনি, দুঃখ পাস না। আমরা কাল সকালে আবার তোর বিয়ে দেব, কী বলো এসপি”
তড়াক করে এসপির ঝিমিয়ে থাকা চোখ জোড়া সজাগ হয়ে ওঠে। সে তাকে বাহবা দিয়ে বলে,
-“বাহ মিসেস নাগিন, বাহ….”
-“মিস, মিস নাগিন…”
-“আচ্ছা বাবা সরি, মিস নাগিন।
লাইফে প্রথমবার আপনি ঠিক বলেছেন। আমরা কটকটিকে আবার বিয়ে দেব। কিন্তু এবার ছেলে হবে একদম আমার পছন্দের। কোনো জাওরা টাওরার জায়গা হবে না”
-“হা হা, একদম ঠিক বলেছ। কাল থেকে আমরা বর খোঁজা শুরু করে দেব”
এসপি কিয়ৎকাল কিছু একটা ভেবে আবার বলে,
-“আচ্ছা যদি ছেলেটা আমার ভাইয়ের মতো হয় তাহলে কেমন হবে?”
-“তাহলে তো ফাটাফাটি হবে। আফটার অল,
স্যার ইজ আ জেন্টলম্যান”
এসপি শার্টের কলার উঁচিয়ে ভাব নিয়ে বলে,
-“দেখতে হবে না ভাই কার? যাই হোক, আমাদের ওর বিয়ের ডেকোরেশন এখন থেকেই সিলেক্ট করা উচিত”
-“আমি কিন্তু ওর বিয়েতে একদম লাল টকটকে লেহেঙ্গা পরব”
বিপরীতে এসপি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে,
-“মানে বুঝলাম না, বিয়ে হবে ওর, তাহলে আপনি কেন লাল পরবেন?”
-“কেন, তাতে তোমার সমস্যা কী? আমি কি তোমার বউয়েরটা পরব?”
-“সমস্যা হলো…..”
ব্যাস, এই নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে বেঁধে গেল কথা কাটাকাটি। এদিকে সানা শুধু নিজের নাক মুখ কুঁচকে নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাদের দুজনের দিকে। ইচ্ছে করছে দুটোকে চড়িয়ে দাঁত ফেলে দেয়। কেমন অল ব্রিটিশ! সে এত বড় বিপদে ফেঁসেছে আর তারা তার বিয়ে দিচ্ছে। এক বিয়ে সামলাতেই তার খবর হয়ে যাচ্ছে, এখন নাকি আরেকটা বিপদ নিজে ডেকে এনে মাথায় তুলবে। আর সহ্য হলো না তার, তাই সে গর্জে ওঠে,
-“ব্যাস, আমি তোদের দুঃখ করতে নিয়ে এসেছি আর তোরা আমার বিয়ের প্ল্যান করছিস,
লাইক সিরিয়াসলি”
ঈশানী তাকে বুঝানোর সুরে বলে,
-“ডাইনি তুই বুঝতে পারছিস না…”
-“আমি বুঝতেও চাই না। তোরা দুজন এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে থেকে যাবি”
-“পেস্ট্রি আমাদের কথাটা তো….”
-“আউট, যেটা থাকবে এটার কানের নিচে এমন বাজান বাজাবো…না, না কানের নিচে বাজাবো না… প্রতি সেকেন্ডের জন্য আমাকে পাঁচশ টাকা দিবি, তাড়াতাড়ি দেয়”
সানার মুখে টাকার কথা শুনে দুজনে আর এখানে নেই, সুরসুর করে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু এসপি দরজার সামনে গিয়ে আবারও ঘাড় কাত করে তাকায়, ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-“আচ্ছা ভাবিজি, আমি আপনার বিয়েতে লাল শেরওয়ানি পরব নাকি সাদা শেরওয়ানি?”
বিপরীতে রমণী কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে চারপাশে কিছু একটা খোঁজা শুরু করে দিল। না, কিছু খুঁজে পেল না। এসপি তার খোঁজাখুঁজি দেখে ফের বলে,
-“কি খুঁজছিস? শেরওয়ানি তো আমার কাছে… কোনটা পরলে মানাবে সেটা বল”
-“তুই ডান পায়ের টা দিয়ে খাবি নাকি বাম পায়ের টা দিয়ে খাবি? কোনটা দিয়ে খেলে চলবে?”
-“মানে?”
সানা তার এমন জবাবে নিজের ডান পায়ের জুতাটা খুলে হাতে নিতে এসপি বুঝে এক ঝটকায় বাইরে চলে যায়। সানা জুতাটা গিয়ে বারি খায় বন্ধ দরজায়। রমণী নিজের দাঁত চেপে গালি ছুড়ে তাদের দিকে,
-“কু*ত্তা, তোরা আর আমার সামনে আসিস, দেখে নেব সবকটাকে”
এসপি বোঝে না মেয়েদের এতগুলো সুটকেস কেন লাগে। ঈশানী প্রায় চারটা নিয়ে এসেছে। মাত্র সাত দিন থাকবে, তার জন্য এতগুলো। সে তো শুধু নিজের জন্য সানিতার ব্যাগের এক কোণায় কয়েকটা পোশাক নিয়ে এসেছে। তাহলে মেয়েদের এত কিছু লাগে কেন?
ঐসময় এসপি সানার রুম থেকে বেরুতেই ঈশানী বলে তার নাকি আরেকটা সুটকেস পার্কিং লটে গাড়িতে রাখা আছে। ঐসময় তাড়াতাড়ির জন্য ভুলে গিয়েছে। এসপি যেন একটু এনে দেয়। আর সেটা আনার জন্যই এসপি দ্রুত লিফটের দিকে হাঁটতে লাগল।
লিফটের সামনে পৌঁছে সে দ্রুত বোতাম চাপল, লিফট ওপরে উঠছে। ডিসপ্লেতে সংখ্যা বদলাচ্ছে,
৪… ৫… ৬…
এসপি অস্থিরভাবে পা নাচাচ্ছে,
-“চল না বাবা… তাড়াতাড়ি”
লিফট এসে থামে দরজা ধীরে ধীরে খুলে যায়। এসপি মাথা তুলে ভেতরে ঢুকতে যাবে, আর ঠিক তখনই সে জমে গেল। লিফটের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে দুই মানব। একজন দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো, যন্ত্রমানব, জ্যাক। আরেকজন হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এসপির মতে সাইনিজ সান্ডা, কাইলিন। দুজনের চোখই তার উপর। কাইলিন ধীরে হেসে বলে,
-“ওয়াও…আমরা তো তোমাকেই খুঁজছিলাম।
এত তাড়াতাড়ি নিজেই এসে পড়লে?’
এই বলে দুজনে পকেট থেকে মাস্ক বের করে পড়ে নিল। কাইলিন একটা স্পে বের করে দু কি তিনবার স্পে করে দিল। এসপির চোখ বড় হয়ে গেল। তার মুখ থেকে শুধু একটা শব্দ বের হলো,
-“ওহ শিট….”
তারপরই তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। পরের মুহূর্তেই ‘ঢপ’ সে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।
এসপির ধারণা নেই কতক্ষণ পরে ধীরে ধীরে তার জ্ঞান ফিরে। প্রথমে মাথাটা ভারী লাগছে। সে টেনে চোখ খুলে চারদিকে নজর বুলায়। অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই তার দৃষ্টিতে আসে না। নাকে বারি খায় একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। সে নড়তে গিয়েও পারল না। কারণ তার হাত-পা শক্ত করে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা। এসপির চোখ এবার পুরো খুলে গেল,
-“এইটা আবার কোথায় এলাম আমি…”
তার সামনে একটা মৃদু আলো জ্বলছে। আর সেই আলোয় একটা ছায়া বসে আছে চেয়ারে। পায়ের উপর পা তুলে শান্তভাবে।এসপি চোখ কুঁচকে তাকায় আর তখনই নজরে আসে আরজে চেয়ারে বসে আছে।
দৃষ্টি একদম স্থির তার উপর কিন্তু তার চোখ লাল হয়ে আছে রাগে। সে ধীরে সামনে ঝুঁকল। ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে দাঁত চেপে বলে,
-“তো বল…কি দিয়ে ম*রতে চাইবি?”
সে টেবিল থেকে একটা পিস্তল তুলে ঘুরাতে ঘুরাতে ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,
-“স্নাইপার?”
আরেকটা মেশিনগানের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“নাকি মেশিনগান?”
এসপি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তারদিকে। কিয়ৎকাল ভেবে একটা কুবুদ্ধি বের করল। তারপর বিরক্ত মুখে বলে,
-“শা*লা… আমি তো এখানে বউয়ের সাথে হানিমুন করতে এসেছি”
রুমে এক মুহূর্ত ভারী নীরবতা নেমে এলো। জ্যাক আর কাইলিন দুজনেই তাকিয়ে আছে। আরজের ভ্রু ধীরে কুঁচকে গেল। তার স্বর থেকে বের হয়,
-“হানিমুন! তাও ফ্যাশন শোতে?”
সে সামনে ঝুঁকে হিসহিসিয়ে বলে,
-“আর সেটা করতে করতে চার বছর লাগিয়ে ফেলেছিস?”
-“কেন? ফ্যাশন শোতে হানিমুন করা নিষেধ নাকি?”
কাইলিন মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করেও পারছে না সে মাথা নেড়ে জ্যাকের কানের কাছে ফিসফিস করে,
-“এই পুঁচকে মরার আগেও জোক মারছে…”
জ্যাকের তরফ থেকে কোন শব্দ এলো না, সে অনুভূতিহীন চিত্তে তাকিয়ে আছে শুধু। কাইলিন আবার নিজের জায়গায় ফিরে গেল। সে মাঝে মাঝে বুঝতে পারে না, জ্যাক এতটা কাঠখোট্টা পুরুষ কেন?
এমন মনে হচ্ছে একটু হাসলেই যেন পাপ হয়ে যাবে। এদিকে আরজে দাঁত চেপে উঠে ধীরে ধীরে এসপির সামনে এসে দাঁড়ায়। তার চোখে এখন স্পষ্ট রাগ। সে পি*স্তলটা টেবিলে ঠক করে রাখল
-“চুপচাপ বল, জীবনের শেষ ইচ্ছা কি?
জাস্ট একটা বাক্যে বলবি”
এসপি কয়েক সেকেন্ড ভাবার ভান করল। তারপর ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলে,
-“আমার নাতির বিয়ে দেখতে চাই”
কাইলিন এবার সত্যিই শব্দ করে হেসে দিল। আরজের কপালের শিরা ফুলে উঠেছে। সে কাইলিনের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই সে বহু কসরতে সাথে সাথে হাসিটাকে গিলে নিল। আরজে দন্ত চেপে বাক্য ছুঁড়ে,
-“একদম চালাকি করার চেষ্টা করবি না। তাহলে গু*লি দ্বিগুণ হবে”
এসপি দ্রুত বলে,
-“আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে….
তাহলে… আমার মেয়ের মুখ দেখতে চাই”
তার এমন বাক্য কক্ষে যেন বোম ফাটালো, স্বয়ং জ্যাক অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে আছে। কাইলিনের তো চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। না মানে, সে এখনো বিয়ে করতে পারল না। আর এই পুঁচকে ছেলে নাকি বাপ হয়ে বসে আছে। আরজের পা ও থেমে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে বলে,
-“তোর… মেয়ে?”
এসপি মাথা নাড়িয়ে জোড়ালো কণ্ঠে শুধালো,
-“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার মেয়ে”
আরজে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ বলে,
-“এক মিনিট, প্রশ্ন এটা না তোর মেয়ে,
প্রশ্ন এটা, তুই আমার আগে বাপ কিভাবে হলি?”
আরজের এমন প্রশ্নে এসপি অবাক হয়ে তাকায়, এর কোন জবাব তার কাছে সেই। তারপর দাঁত খিঁচিয়ে বলে,
-“শা*লা, আগে হাত খুল তারপর আবার বাপ হয়ে দেখাবো কীভাবে বাপ হয়েছি”
আরজে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুঝতে চাইলো কোন অ্যাঙ্গেলে মিথ্যে বলছে না তো? নাহ, এসপির চোখ সত্যিই বলছে, তারমানে এসপি সত্যিই বাপ হতে চলছে, মানে সে এই বারোভাতারির কাছে হেরে গেছে। কথাটা কেন জানি হজম হচ্ছে না তার। জ্যাক পাশ থেকে বলে,
-“বস, এখনই গুলি করব?’
আরজে হঠাৎ হাত উঁছিয়ে থামিয়ে দিল তাকে। আজকে সত্যিই সে কিছু না কিছু একটা করে দিত এই বারোভাতারির, কিন্তু মেয়ে আছে শুনে, সে কেন জানি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এসেছে। মনে মনে নিয়ে নিল কঠিন এক সিদ্ধান্ত,
যেহেতু এই বারোভাতারির কাছে হেরে-ই গিয়েছে সেহেতু সে একসাথে দুই বাচ্চার বাপ হবে। না, না, দুইটা না বারো তেরোটা নিতে হবে, তাহলে সানা আর তার থেকে পালিয়ে যেতে পারবে না। সে কাইলিনকে হাত দিয়ে ইশারা দিল, এসপিকে খুলে দিতে। এসপি ছাড়া পেয়ে দরজার সামনে গিয়ে একবার পিছন ফিরে মনে মনে বলে,
-“শা*লা বিচারটা আমি ঠিক জায়গায় দিব, ঠিক কটকটির কাছে, যে তোর বারোটা বাজাবে ঠিক সময়ে”
এসপি বের হতেই কাইলিন জ্যাকের কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
-“দেখেছো তুমি বিয়ে করেছ তিন বছর কিন্তু এখনো গোল দিতে পারো নাই। আর এই পুঁচকে বিয়ে করে গোল দিয়ে দুদিন পর এ্যাওয়ার্ড ও কোলে নিয়ে হাঁটবে। তোমরা শুধু দেখেই থাকবে”
জ্যাক একবার তার দিকে বিরক্তি সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকে খোঁচা মেরে বলে,
-“আমরা তো খেলার মাঠে ঢুকেছি, তুমি এখনো মাঠেও ঢুকতে পারোনি”
কাইলিন মুহূর্তে চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকায়, ততক্ষণে জ্যাক আরজের সাথে বেরিয়ে পড়েছে। সে মনে মনে ভাবছে, জ্যাক কি তার বিয়ে না করা নিয়ে খোটা দিল। না, না, এই সব সহ্য করা আর সম্ভব না। সে কালকেই কোন চাইনিজ মেয়েকে ধরে বিয়ে করে নেবে। কত বড় কথা বলেছে তাকে। তারপর জ্যাককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তার আগে সে বাপ হবে।
তৃতীয় তলার করিডোর তখন প্রায় নিস্তব্ধ। নিচে পার্টি এখনো চলছে, পার্টির শব্দ এখানে এসে কেবল মৃদু কম্পনের মতো শোনা যায় দূরের মিউজিক, মাঝে মাঝে মানুষের হাসির প্রতিধ্বনি। সানার রুমের ভেতরটা অন্ধকারে আধা ঢাকা। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে শহরের আলো এসে বিছানার এক কোণে পড়েছে। সেই আলোতেই দেখা যাচ্ছে, সানা গভীর ঘুমে ডুবে আছে। সারাদিনের ক্লান্তি, মানসিক চাপ সব মিলিয়ে তার নিঃশ্বাস ধীর হয়ে এসেছে। তার চুলগুলো ছড়িয়ে আছে বালিশের উপর। মুখে একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব।
কিন্তু সেই শান্তির মাঝেই হঠাৎ ক্লিক করে দরজার লক খুব আস্তে খুলল। দরজাটা মিলিমিটার মিলিমিটার করে খুলছে। একটা অন্ধকার ছায়া নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার পদক্ষেপ এতটাই নরম যে কার্পেটের উপর কোনো শব্দই হলো না। সে ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করে তারপর স্থির দাঁড়িয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। যেন নিশ্চিত হতে চাইছে,
ঘরের ভেতর আর কেউ নেই, সবকিছু শান্ত। তারপর সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। জানালার আলোয় এবার তার ছায়াটা বড় হয়ে বিছানার উপর পড়ল। সেই ছায়া এসে থামল সানার মুখের কাছে। লোকটা নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। চোখ তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ করছে রমণীর প্রতিটি মুখের রেখা, নিঃশ্বাসের ছন্দ। একটা অদ্ভুত কৌতূহল যেন তার চোখে। কয়েক মুহূর্ত পর সে খুব ধীরে হাত বাড়ায়, এক হাত সানার কাঁধের নিচে, আরেক হাত হাঁটুর নিচে।অভ্যাসগত ভঙ্গিতে তাকে তুলে নিল কোলের মধ্যে। সানা হালকা নড়ে ওঠে, কিন্তু ঘুম ভাঙল না তার। লোকটা এক সেকেন্ড থামল। তারপর আবার ধীরে পা বাড়ায় দরজার দিকে। আর সানাকে কোলে নিয়েই করিডোরে বেরিয়ে পড়ল। লম্বা কার্পেটের উপর দিয়ে সে দ্রুত নিঃশব্দে হেঁটে চলছে। তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, শুধু ছায়া। সানার মাথাটা তার কাঁধে হেলান দিয়ে আছে। সবকিছু যেন নিঃশব্দে ঘটছে, ধীরে ধীরে তারা মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
তারা দৃষ্টিগোচর হতেই করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে একটা অন্ধকার কোণা আছে। সেখানে এতক্ষণ ধরে আরেকটা ছায়া দাঁড়িয়ে ছিল সে ধীরে ধীরে বেড়িয়ে আসে। সে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল। যখন সেই লোকটা সানাকে নিয়ে করিডোর পার হয়ে দূরে চলে গেল তখন সেই অন্ধকার কোণা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসেছে। লম্বা, স্মার্ট স্যুট পরা, তার চোখে ঠান্ডা একটা দৃষ্টি,
“থমাস স্টিফেন”
সে কিছুক্ষণ করিডোরের দিকে তাকিয়ে রইল। যেদিকে লোকটা সানাকে নিয়ে চলে গেছে। তার ঠোঁটে হালকা একটা রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। তারপর সে পকেট থেকে ফোন বের করে। স্ক্রিনে একটা নাম জ্বলছে, ‘ড্যাড’
সে দ্রুত কল লাগায়, দুবার রিং হতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর একটা কণ্ঠ ভেসে এল,
-“হ্যাঁ, থমাস?”
থমাস নিচু গলায় প্রত্যুত্তর করে,
-“ড্যাড…ওটা সানাই ছিল, যাকে দিলরুবা খানম নিজের মেয়ে বলেছে”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সেই কণ্ঠ আরও ঠান্ডা হয়ে উঠে,
-“আর ইউ শিউর”
-“ইয়াহ, আমি নিজ চোখে দেখেছি”
বিপরীত পাশ থেকে কঠিন নির্দেশ এল,
-“তাহলে সময় নষ্ট করো না। আরজের বাচ্চাটাকে খুঁজে বের করো, আর মে*রে ফেলো”
করিডোরের বাতাস যেন মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল। থমাসের চোখে এক ঝলক অন্ধকার নেচে উঠে, সে ধীরে বলে,
-“ওকে ড্যাড”
-“অ্যান্ড, থমাস বি কেয়ারফুল। ওই মহিলা, দিলরুবা খানম থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকবে। ওটা সোফিয়ার থেকে কম না, ভীষণ ডেঞ্জারাস, আর রাস্তায় আসলে ঐ ডক্টরের মতো কাহিনি খতম করে দিবে”
এপাশে থাকা থমাসের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা পৈশাচিক হাসি ফুটে ওঠে। ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,
-“ডোন্ট ওয়ারি, ড্যাড। বাই….”
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৭
কলটা কেটে গেল, থমাস কয়েক সেকেন্ড ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দিল। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা শিকারীর হাসি ফুটে ওঠে। সে ধীরে করিডোর ধরে হাঁটা শুরু করে, হাতে কতগুলো রুমের কার্ড। সে একটা একটা করে প্রতিটা রুম চেক করতে লাগল। করিডোরের নীরবতার মধ্যে শুধু দরজা খোলার শব্দ। আর থমাস স্টিফেনের ধীর পদক্ষেপ।
