Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯
সাবা খান

অরোরা গ্র্যান্ড পাভিলিয়নের উপরতলাগুলোতে তখন রাতের নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হয়ে এসেছে। রাত যেন ধীরে ধীরে নিজের গাঢ় কালো চাদর মেলে দিয়েছে পুরো ভবনের ওপর। এই অট্টালিকা নিচের সাততলা তুলনামূলক কম লাক্সারি উপরের দিকের থেকে। তারপর শুরু হয় প্যাভিলিয়নের আরেকটা জগৎ ‘উপরের তলাগুলো’।
এই তলাগুলো সাধারণ কারো জন্য নয়। এখানে আছে একের পর এক বিলাসবহুল লাক্সারি সুইট। প্রতিটা সুইট যেন একটা ছোট্ট প্রাইভেট জগত, অসাধারণ সাজসজ্জা, দামি আসবাব, নরম কার্পেট, স্বয়ংক্রিয় আলো আর সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে ঘেরা। এই তলাগুলোর সিকিউরিটিও অন্যরকম। প্রতিটা ফ্লোরে আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রাইভেট কার্ড অ্যাক্সেস, সিসিটিভি নজরদারি সবকিছু মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ যেখানে বাইরের কেউ সহজে ঢুকতে পারবে না। সেই লাক্সারি সুইটগুলোর একদম উপরের দিকের একটা রুমে অন্য সব কক্ষের তুলনায় এই রুমটা যেন আরও নির্জন।

ভিতরে একটা ল্যাপটপের সামনে বসে আছেন মিসেস দিলরুবা খানম। তার চোখ স্থির সামনে, স্ক্রিনে একের পর এক ফাইল খুলছে, ছবি, ডকুমেন্ট, কিছু স্ক্যান করা রিপোর্ট, কিছু এনক্রিপ্টেড ডাটা। কখনো তিনি স্ক্রিনে জুম করছেন, কখনো একটা ছবি দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখছেন।
হঠাৎ রুমের দরজায় হালকা নক পড়ে, তিনি চোখ না তুলেই বললেন,
-“কাম ইন”
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল এক তরুণ, গাঢ় স্যুট পরা, হাতে একটা ট্যাবলেট। মিসেস দিলরুবা খানমের সেক্রেটারি, সে এগিয়ে এসে বলে,
-“চিফ”
মিসেস দিলরুবা খানম এবার স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে তাকালেন। শান্ত স্বরে বলে,
-“রায়ান, কিছু খবর?”
-“জি, চিফ। আমরা জেবির ফাইলগুলোতে ঢোকার চেষ্টা করছিলাম”
দিলরুবা খানম ভ্রু তুলে তাকালেন,

-“তারপর?”
-“খুলতে পারিনি, একটাও না”
সে ট্যাবলেটটা টেবিলের উপর রেখে ফের বলে,
-“ওগুলো এমনভাবে সিকিউর করা হয়েছে যে সাধারণ ডিক্রিপশন টুল দিয়ে সম্ভব না”
-“কোন লেভেলের সিকিউরিটি?”
-“মাল্টি লেয়ার এনক্রিপশন, স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে এই ফাইলগুলো খুব ইচ্ছা করেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে”
দিলরুবা খানাম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার আঙুল টেবিলের উপর ধীরে ধীরে টোকা দিচ্ছিল। রায়ান আবার বলে,
-“আর একটা আপডেট আছে। ডক্টর সাইয়েদার খু*নের ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য পেয়েছি”
দিলরুবা খানামের চোখ সরু হলো। ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,
-“মার্কান?”
রায়ান মাথা নাড়িয়ে প্রত্যুত্তর করে,

-“জি, চিফ, খু*নটা মার্কানের লোকজনই করেছে। আর এই ব্যাপারে ডক্টর সাইয়েদার ছেলে রিজভীও কিছু জানে না”
রুমে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এল। দিলরুবা খানম ধীরে পেছনে হেলান দিলেন। তার চোখে ঠান্ডা হিসেবি দৃষ্টি। রায়ানের তরফ থেকে আবারও শব্দ আসে,
-“চিফ, আর একটা বিষয়, মার্কানের লোকগুলো এই বিল্ডিংয়ের ভেতরেই ছড়িয়ে আছে”
বাক্যটা শ্রবণ হওয়া মাত্রই দিলরুবা খানামের ভ্রু কুঞ্চিত করে প্রশ্ন করে,
-“কতজন?”
-“এখন পর্যন্ত তিনজনকে ধরেছি। বাকি কয়েকজন এখনও ট্র্যাকের বাইরে, সবার চেহারা একরকম, প্লাস্টিক সার্জারি”
দিলরুবা খানম ধীরে বললেন,

-“ওরা কি খুঁজছে?”
-“নিশ্চিত না, কিন্তু সম্ভবত, আরভি কে”
দিলরুবা খানামের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা ছায়া নেমে এল। তিনি ধীরে বলেন,
-“সানার ছেলে!”
কিছুক্ষণ তিনি চুপ থেকে ফের বলেন,
-“রায়ান, ওই বাচ্চাটার পাশে গার্ড বসাও।
-“আরভির পাশে?”
দিলরুবা খানাম মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝান, তারপর দৃঢ় গলায় বলেন,
-“আমি চাই না ওই বাচ্চাটার কিছু হোক। ও নির্দোষ, এমনিতেই আমি চাই না ওই সানা এসবের মধ্যে জড়াক। এই কারণেই সাইয়েদা ওকে এখানে পাঠিয়েছিল, বিডিতে থাকলে নিজের ছেলেকে বাঁচানোর জন্য হলেও সানাকে র*ক্তে হাত ভেজাতে হতো”
রুমটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রায়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আবার পেশাদার ভঙ্গিতে বলে,

-“চিপ, আর একটা বিষয়”
দিলরুবা খানম তাকালেন, রায়ান ট্যাবলেটের স্ক্রিনে দিকে যেখানে কয়েকটা ডাটা দেখা যাচ্ছে,
-“মার্কানের ফিনান্সিয়াল মুভমেন্টগুলো ট্রেস করছি। মনে হচ্ছে সে বড় কিছু প্ল্যান করছে”
দিলরুবা খানমের ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি ফুটে ওঠে,
-“ইউ নো, তোমাকে কী করতে হবে”
রায়ান হালকা মাথা নাড়িয়ে বলে,
-“আন্ডারস্টুড, চিফ। আমি গার্ডের ব্যবস্থা করছি”
সে ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দিলরুবা খানম আবার বলেন,
-“সবকিছু নজরে রাখো, বিশেষ করে…
আরজে কে”
-“ওকে চিফ”
তারপর সে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে যায় আর রুমে আবার নিস্তব্ধতা নেমে আসে।

অরোরা গ্র্যান্ড পাভিলিয়নের তৃতীয় তলা তখন অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ। লম্বা করিডোরে হালকা হলুদ আলো পড়েছে। দূরে কোথাও লিফটের দরজা খোলার ক্ষীণ শব্দ, আবার নিস্তব্ধতা। এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে থমাস স্টিফেন। তার হাতে একটা ছোট কালো ডিভাইস ‘ইলেকট্রনিক লক ওপেনার’ সে এক একটা দরজার সামনে থামে। দরজার লকের কাছে ডিভাইসটা লাগিয়ে খুলে দেখছে।
করিডোরের আলোয় তার মুখে বিরক্তির ছায়া ফুটে ওঠে। সে নিচু গলায় নিজেকেই বলে,
-“কোথায় লুকিয়ে রেখেছে বাচ্চা টাকে”
তার চোখে ঠান্ডা আ*গুন। সে আবার হাঁটতে শুরু করে। করিডোরের শেষের দিকে একটা বড় স্যুট রুম। সে এগিয়ে গিয়ে লকের কাছে ডিভাইসটা তুলে। ঠিক তখনই তার নজর হঠাৎ সরু হয়ে এল। দূরে করিডোরের বাঁক ঘুরে কয়েকজন মানুষ দেখা যাচ্ছে। পরনে কালো পোশাক, কানে কমিউনিকেশন ডিভাইস, হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। তাদের ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায়, এরা সাধারণ সিকিউরিটি না, প্রশিক্ষিত এজেন্ট। থমাস ধীরে মাথা একটু কাত করে আরও ভালো করে দেখল। তার ঠোঁট ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে,

-“মিসেস দিলরুবা খানম…”
তার চোখে অন্ধকার ঝলসে উঠল। সে আবার তাকাল সেই দরজার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
-“তার মানে আরজের বাচ্চাটা এখানেই আছে,
চালাকি করছেন, হ্যাঁ?
আপনি কাজটা ভালো করেননি, মিসেস খানম”
এক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো সে হয়তো এগিয়ে যাবে। কিন্তু নাহ, সে থেমে গেল। তার চোখ দ্রুত চারপাশে হিসাব করে, এখানে একটা ছোট ভুল মানেই ধরা পড়া। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। রাগে তার পুরো শরীর যেন কাঁপছে। তার মুঠি শক্ত হয়ে উঠল।
নখ প্রায় হাতের তালুতে ঢুকে যাচ্ছে। সে শেষবারের মতো সেই দরজার দিকে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়, নিঃশব্দ পায়ে আবার করিডোর ধরে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

অরোরা গ্র্যান্ড প্যাভিলিয়নের সেই নীরব করিডোরের মাঝ দিয়ে এক মানব হাঁটছে। তার বাহুতে ঘুমন্ত সানা। সানার মাথা তার বুকের পাশে হেলে আছে, চুলগুলো কাঁধে ঝুলে পড়েছে, রমণীর নিঃশ্বাস শান্ত, গভীর। করিডোরের শেষ মাথায় পৌঁছে সে লিফটের সামনে থামে, কয়েক সেকেন্ড পর লিফটের দরজা খুলে গেল। সে ভেতরে ঢুকে পড়ে, এখনও সানাকে বুকের কাছে ধরে আছে শক্ত করে।
লিফট থামে ঠিক দশম তলাতে গিয়ে। এ তলার করিডোর আরও নিস্তব্ধ, আরও ব্যক্তিগত। এখানে শুধু ভিআইপি স্যুটগুলো আছে। লোকটা ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে একটা দরজার সামনে থামে, কার্ড দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। রুমটা বিশাল, একটা বড় প্যানোরামিক জানালা পুরো শহরকে সামনে মেলে ধরেছে। নরম আলোয় সজ্জিত রুম, মাঝখানে বড় কিং-সাইজ বেড। লোকটা ধীরে ধীরে সানাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। সানার মাথাটা নরম বালিশে পড়ে সে একটু নড়ে চড়ে আবারও ঘুমে তলিয়ে যায়। লোকটা কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল, লোকটা আর কেউ নয় স্বয়ং আরজে।

তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সানার উপর স্থির। যেন বহু বছর পরে কোনো হারানো জিনিস ফিরে পেয়েছে। ধীরে ধীরে সে বিছানার পাশে বসে পড়ে। হাত উঠে সানার কপালের উপর আলতো করে ছুঁল। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে সানার মুখের উপর বুলিয়ে যাচ্ছে প্রথমে কপাল, তারপর ভ্রু, চোখের কোণ, গাল দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিটা জায়গা ছোঁয়ে যায়। তারপর সে ঝুঁকে সানার কপালে দীর্ঘ একটা চুমু রাখে, তারপর গালে, চোখের কোণে।
এমনভাবে যেন বহুদিনের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। সে সানার চুলের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে দিল। গভীরভাবে বারবার শ্বাস টেনে নিচ্ছে যেন সেই পরিচিত গন্ধ তাকে কোথাও ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে ওঠে। পুরুষালি হাস্কি কণ্ঠে সে ফিসফিস করে আওড়ায়,
-“মাই পার্সোনাল মেডিসিন…”

কিছুক্ষণ সে শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই সে খুব সাবধানে সানার জামাটা বাম কাঁধ থেকে একটু নামায়, নজরে আসে সেখানের একটা ছোট তিল। যেটা সে ঐ সময় ওয়াশরুমে খুঁজেছে। সানার ড্রেস অফ শোল্ডার হওয়ার দরুন সে কাঁধেও মেকআপ করেছে যার কারণে আরজে সেটা দেখতে পায়নি। সেই তিলটা দেখেই তার বুকের ভেতর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। সে ঝুঁকে তিলটার উপর খুব আলতো করে একটা চুমু খায়। আরজে ধীরে ধীরে সেই জায়গাটার দিকেও তাকায় যেখানে কিছুক্ষণ আগে সে রাগে দাঁত বসিয়েছিল। ত্বকটা লাল হয়ে উঠেছে, একদম টাটকা দাগ যেন ছোট্ট এক আগুনের ছাপ। কিছুক্ষণ সে নীরবে তাকিয়ে রইল। তারপর অদ্ভুত এক তৃপ্তির হাসি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল তার ঠোঁটের কোণে। সে ধীরে নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে এল, আর ঠিক সেই লাল হয়ে থাকা জায়গাটায় খুব আস্তে করে একটা চুমু খেল।
তারপর সানার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে। এই মেয়েটাকে যতবার সে দেখে, ততবারই যেন নতুন করে আবিষ্কার করে। আজ তার চোখে আরেকটা বিষয় ধরা পড়ল, সানা যেন আগের চেয়ে একটু ফর্সা হয়ে গেছে। আগের সেই নরম শ্যামল রঙের মুখটা এখন কেমন মোলায়েম ফর্সা হয়ে উঠেছে। হয়তো চায়নার আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে।

কিন্তু আরজের কাছে, তার সেই পুরনো শ্যামল রঙটাই ছিল সবচেয়ে প্রিয়। এই মুখটা দেখলেই তার মনে পড়ে যায় বহু বছর আগের একদিনের কথা। সেই দিনটা, যেদিন সে প্রথমবার সত্যিকারের কোনো খেলা দেখেছিল ছোট্ট সানার সাথে তার হাড়ি পাতিল দিয়ে।
আরজে তখন ষোল বছরের কিশোর।।সে খেলেনি, শুধু পাশে বসে বসে দেখছিল চুপচাপ, নিঃশব্দে। কেউ যদি সেই দৃশ্যটা দেখত, নিশ্চয়ই হাসত। কে বিশ্বাস করবে
ষোল বছরের একটা ছেলেও হাঁড়ি পাতিলের খেলায় মুগ্ধ হয়ে বসে থাকতে পারে?
কিন্তু কেউ জানত না ওটাই ছিল তার জীবনের প্রথম খেলা। কারণ সোফিয়া কোনোদিনও তাকে খেলতে দেয়নি। শৈশব তার কাছে কোনোদিন শৈশব ছিল না। সোফিয়া মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে যেত বিশাল বিশাল টয় মলে। সেখানে তাকে বলা হতো,

-“যা পছন্দ হয়, নিয়ে নাও”
ছোট্ট আরজে তখন পুরো শপিংমল ঘুরে ঘুরে খেলনা বেছে নিত। গাড়ি, রোবট, বন্দুক, যা তার চোখে ভালো লাগত সব কেনা হতো। কিন্তু বাড়িতে ফিরে আসার পর, সেই খেলনাগুলোর ভাগ্যে কী হতো, তা ছিল আরও ভয়ংকর। সোফিয়া তাকে নিজের হাতেই সেগুলো আ*গুনে ফেলে দিতে বাধ্য করত। আ*গুনের শিখা ধীরে ধীরে খেলনাগুলোকে গলিয়ে ফেলত। প্লাস্টিক গলে যেত, ধোঁয়া উঠত, আর ছোট্ট আরজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকত।
প্রথম কয়েকবার সে ফেলতে চাইত না। তখন তাকে শাস্তি দেওয়া হতো। তাকে বন্দী করে রাখা হতো সেই ভয়ংকর অন্ধকার সেলে।যেখানে আলো ঢুকত না, সময় থেমে থাকত, আর ভয় নিঃশ্বাসের মতো চারপাশে ঘুরে বেড়াত। ধীরে ধীরে সে অভ্যস্ত হয়ে গেল।

খেলনা আ*গুনে ফেলা, মুখ বন্ধ রাখা, কিছু না বলা। ধীরে ধীরে তার ভেতরের শিশুটাও পুড়ে ছাই হয়ে গেল। তার সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল তার খেলা। একসময় সে হাসতে ভুলে গেল, তারপর কাঁদতেও ভুলে গেল, সে প্রায় কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল। তার পৃথিবী হয়ে উঠেছিল শুধু, র*ক্ত, খু*ন, অন্ধকার, আর নি*ষ্ঠুরতা। ওই বিশাল ম্যানশনের বাইরে পা রাখা তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। দুনিয়াটা তার কাছে ছিল একটা খাঁচা।।তারপর, একদিন এক টুকরো আলোর মতো তার জীবনে প্রবেশ করল সানা। সেই মেয়েটা, যে নিজের ছোট্ট পৃথিবীতে সবসময় ব্যস্ত থাকত, যার কারো দিকে কোন খেয়াল ছিল না। আরজের এখনো মনে পড়ে, সানা ছোটবেলা থেকেই ভীষণ কৃপণ ছিল। মানে নিজের জিনিস কাউকে ছুঁতেও দিত না, তার খেলনা, তার চকলেট, তার বই, সবকিছু সে বুকের মধ্যে আগলে রাখত।

প্রথম যখন সানার বয়স আঠারো হলো ঠিক তখনই আরজের জীবনে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আরজের চাপে পড়ে ইকবাল জাওয়ান একদিন নিজের অহংকার ভেঙে ফেললেন। তিনি নিজের বন্ধুর কাছে হাত পাতলেন শুধু একটা কারণে। তার ছেলের জন্য সানাকে বৌমা করে আনতে। কিন্তু সানার বাবা সরাসরি না বলে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি সোফিয়া ও আরজের ব্যাপারে সব জানতেন। এই অন্ধকার, এই র*ক্ত, এই নিষ্ঠুর ইতিহাস। পৃথিবীর কোনো বাবাই চাইবে না তার মেয়েকে এমন একজন ছেলের হাতে তুলে দিতে। আরজে নিজেও কয়েকবার গিয়েছিল তার কাছে। কিন্তু ওনাার সিদ্ধান্ত বদলায়নি। মোশতাক খানের চোখে আরজে ছিল একটা বিপজ্জনক অন্ধকার। পরবর্তীতে
একদিন হঠাৎ সব বদলে যায়। সানার বাবার মৃত্যু হয়। আর ঠিক তার কিছুদিনের মধ্যেই আরজে সানাকে বিয়ে করে। কেউ জানে না ওই বিয়ের পেছনে অব্যক্ত ভালোবাসা কতটা ছিল আর অন্ধকার কতটা। কিন্তু একটা সত্যি ছিল আরজের নিষ্ঠুর, র*ক্তমাখা জীবনে
সানা ছিল একমাত্র মানুষ, যার জন্য সে এখনো মানুষ হয়ে থাকতে চায়।
ভাবনা গুলোকে একপাশে সরিয়ে আরজে কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রইল। যেন সেই মুহূর্তটাকে মনে গেঁথে নিতে চাইছে।আবার চোখ খুলে তার দৃষ্টি এবার নেশার মতো। সে ফাঁকা গলায় বলে,

-“কতটা কাবু করেছো আমায়… দেখছো?
আমি নিজেকে কতবার বুঝানোর চেষ্টা করেছি তোমাকে ঘৃণা করতে।
নিজেকে বলি ‘এই মেয়েটাকে ঘৃণা কর।
এই মেয়েটাই তো তোকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল”
তার আঙুল আবার সানার গালের উপর বুলিয়ে শক্ত হয়ে আসে, ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে মাথা নাড়িয়ে আওড়ায়,
-“কিন্তু তোমাকে দেখলেই…আমার সব ঘৃণা গলে যায়”
তার চোখে অদ্ভুত এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ফুটে ওঠেছে সে নিচু স্বরে বলে,
-“তুমি জানো এটা কতটা বিরক্তিকর?
একটা মানুষকে একই সাথে ভালোবাসা, আর ঘৃণা করা”
সে আবার সানার চুলে হাত বুলাল, তার গলাটা এবার ভারী হয়ে আসে,
-“তুমি কেন চলে গেলে ওয়াইফি,
একবারও ভেবেছিলে আমার কি হবে?
জানো তোমার যাওয়ার পরে আমি কি হয়েছিলাম? পাগল, একদম পাগল”
সে মাথা নিচু করে আবার সানার দিকে তাকায়। তার আঙুল সানার ঠোঁটের কাছে এসে থামে। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,

-“আমি নিজেকে হাজারবার বলেছি, যদি আবার কখনও তোমাকে পাই, আমি তোমাকে ধ্বংস করে দেব, তোমাকে কাঁদাবো, তোমাকে বুঝাবো ‘আমাকে হারানোর দাম কি’
কিন্তু এখন, তোমাকে সামনে পেয়ে বুঝছি,
আমি কিছুই করতে পারব না”
সে মাথা নাড়িয়ে নিজের উপর বিরক্ত হয়ে একটু থেমে ফের বলে,
-“কারণ তুমি আমার কাছে শুধু একজন মানুষ নও, তুমি আমার ওষুধ, আমার আসক্তি,
তুমি সেই রোগ, যেখান থেকে মুক্তি নেই।
আর আমি সেই মানুষ,
যে স্বেচ্ছায় এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বাঁচতে শিখেছি”
রুমের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। শুধু শহরের আলো জানালার বাইরে জ্বলছে। আর বিছানার পাশে বসে আরজে নেশাগ্রস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সানার দিকে। যেন বহু বছরের হারানো পৃথিবী আজ আবার তার সামনে ফিরে এসেছে।

আরজে এভাবে কতক্ষণ নীরবে তাকিয়ে ছিল তা অজানা। হঠাৎই তার ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু হাসি ফুটে উঠে। মনে মনে দুষ্ট বুদ্ধি এটে ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকে এল। পরের মুহূর্তেই আচমকা তার দুই আঙুল দিয়ে সানার নাকটা শক্ত করে চেপে ধরে। হঠাৎ করে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সানার শরীর তড়াক করে কেঁপে উঠে। পরের মুহূর্তেই সে ধড়ফড় করে উঠে বসতে গেল, কিন্তু পুরোপুরি বসার আগেই সামনে থাকা কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে আবার থেমে গেল। কিছু সেকেন্ড সে একদম স্থির হয়ে বসে রইল। চোখ দুটো আধখোলা, নিঃশ্বাস ভারী। যেন সে ঠিক বুঝতে পারছে না সে কোথায় আছে। কাঁচা ঘুম ভাঙ্গাতে মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি পরিষ্কার হতে থাকে। রমণী চারপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, নজরে আসে ঘরটা অচেনা না কি চেনা বুঝতে পারছে না। তারপর হঠাৎই চোখের সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখতে পায়। প্রথম মুহূর্তে তার মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। তাই সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই আরজে ধীরে ঝুঁকে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বাঁকা হেসে বলে,

-“হ্যালো… এক্স ওয়াইফ”
এই শব্দটা রমণীর কানে যেতেই যেন বাস্তবতা বজ্রপাতের মতো মাথায় নেমে এলো তার। সানার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে দ্রুত সোজা হয়ে বসে রাগ মেশানো কণ্ঠে বলে,
-“আপনি আমার রুমে কি করছেন?”
আরজে ভ্রু তুলে তার দিকে তাকায়। একটু আগের সেই কাতর স্বরে বলা আরজের ছিটেফোঁটাও এখন নেই। তারপর ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ঠোঁটে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটিয়ে বলে,
-“আপনার রুম? ভালো করে চারপাশটা দেখবেন? মিস সুনেহনা…..”
সানা একটু থমকে গেল। আরজে হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
-“তারপর বলবেন… এটা কার রুম”
সানা চারদিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করল, তার ভ্রু ধীরে ধীরে কুঁচকে উঠে। মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক মিলছে না। হ্যাঁ, তার ভুলার রোগ আছে কিন্তু এতটাও ভুলোমন না যে সে অন্য কারো রুমে এসে পড়বে। আরজে এবার ঠান্ডা গলায় ফের শুধালো,

-“নাকি এখনো অ্যাক্টিং চালিয়ে যাবেন?”
সানা বিরক্ত মাখা কণ্ঠে আওড়ায়,
-“আমি কোনো অ্যাক্টিং করছি না। আমি ঘুমাচ্ছিলাম……..”
রমণী বাক্য সম্পন্ন করার আগেই আরজে তাকে থামিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে বিছানার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
-“ঠিক তাই, আপনি ঘুমাচ্ছিলেন। কিন্তু সমস্যাটা হলো এই বেডটা আমার”
সানা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার এখনো সবটা স্বপ্ন মনে হচ্ছে নাহয় সে কীভাবে আরজের রুমে আসবে। আরজে আবার বলে,
-“রুমটা আমার, আর…”
সে হাত তুলে সানার দিকে ইশারা করে চোখে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ নিয়ে বলে,
-“আর আপনিও…খুব সুন্দর করে আমার রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়েছেন”
সানার মুখে অবিশ্বাসের সুরে বের হয়,

-“কি?”
আরজে ঠান্ডা হাসি দিয়ে সামনে এগিয়ে এসে বলে,
-“আপনার অ্যাক্টিং খারাপ না। কিন্তু একটা সমস্যা আছে। আমি এসব নাটক বহুবার দেখেছি”
সানা এবার সত্যিই হতবাক হয়ে গেল,
-“আপনি কি বলছেন! আমি….”
-“আপনি আমার রুমে এসেছেন, আর এখন এমন ভাব করছেন যেন কিছুই জানেন না”
সানা মাথা নাড়িয়ে শক্ত কণ্ঠে শুধালো,
-“আমি আমার রুমেই ছিলাম”
-“অবশ্যই ছিলেন, তারপর হঠাৎ হাঁটতে হাঁটতে ভুল করে আমার রুমে ঢুকে পড়লেন, তাই না?”
সানা এবার পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার মাথায় যেন কিছুই কাজ করছে না। সে মনে করার চেষ্টা করছে, ঘুমানোর আগে সে সত্যিই নিজের রুমেই ছিল। তাহলে এখানে এল কিভাবে? তার নীরবতা দেখে আরজে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে আবার বলে,

-“জানেন, আমার এক্স ওয়াইফের একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল”
শব্দটা শুনে সানার বুক ধক করে উঠে। আরজে সানার চোখে চোখ রেখে বলে,
-“যখন কোনো ঝামেলায় পড়ত তখন এমন চুপ করে থাকত”
সে কিয়ৎকাল ভাবার ভান করে বলে,
-“হুবহু আপনার মতো”
রমণী এবার আর কোনো কথা বলতে পারল না। তার ভেতরে রাগ, অপমান আর বিভ্রান্তি একসাথে জমে উঠছে। আরজে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে, ঠান্ডা স্বরে বলে,
-“আপনার চোখ দুটোও ঠিক তার মতো,
যখন ধরা পড়ত, তখন এমনই তাকিয়ে থাকত”
সানা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার চোখে স্পষ্ট রাগ, অপমান আর অদ্ভুত এক অসহায়তা জমে উঠছে। সে যেন আরজের দিকে তাকাতেই চাইছে না। যেন তাকালেই ভেতরের সব কিছু ভেঙে পড়বে। আরজে সেটা লক্ষ্য করেই ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি টেনে বলে,
-“এভাবেই মুখ ফিরিয়ে নিতো আমার এক্স ওয়াইফ”
শব্দটা আবারও ছু*রি হয়ে গিয়ে বিঁধল সানার বুকে। সে তড়াক করে আবার তার দিকে তাকায়। চোখ দুটো লাল হয়ে উঠছে। আরজে যেন সেটারই অপেক্ষা করছিল। সে ভ্রু তুলে ধীরে বলে,

-“হ্যাঁ… ঠিক এভাবেই তাকিয়ে থাকতো”
সানার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। সে আর কিছু না বলে হঠাৎ দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। মনে হচ্ছে সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। যেন আর একটুও কিছু শুনলে বা বললে সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু আরজে সে থেমে নেই, তার কণ্ঠস্বর থেকে আর কোন বাক্য নিঃসৃত হওয়ার পূর্বেই
হুট করে সানা আঙুল তুলে তাকে সতর্ক করে দিল বিরক্তি ভরা কণ্ঠে,
-“একদম এটা বলবেন না… যে এভাবেই মুখ ঢাকতো”
কয়েক সেকেন্ডর নীরবতা, তারপর আরজে অবাক হওয়ার ভান করে ভ্রু উঁচু করে। তার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলে,
-“অ্যাবসোলিউটলি, এভাবেই মুখ ঢেকে থাকতো”
সানা ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে নেয়, তার চোখে এখন খাঁটি বিরক্তি। তার ইচ্ছা করছে এই লোকের সব গুলো দাঁত ভেঙে ফেলতে কিন্তু মুখে আর কিচ্ছুটি বলল না। আরজে যেন ঠিক এটাকেই চাচ্ছিল। সে আবার সানার দিকে ঝুঁকে এসে বলে,

-“আমার এক্স ওয়াইফের আরেকটা সমস্যা ছিল জানেন? ও খুব সহজে রেগে যেত। তারপর রেগে গেলে… এমন চুপ হয়ে যেত যেন পৃথিবীর সব দোষ অন্যদের। নিজের দোষ কখনো স্বীকার করত না”
সানা এবার কষ্টে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে। এদিকে আরজে সানার এমন অবস্থা দেখে তার মনের কোণে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে ওঠে। আরজে আবার বলে,
-“আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার কি জানেন?
ও যখন মিথ্যা বলত তখন তার চোখ এভাবেই কাঁপত”
সানা এবার মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকায়, সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে আরজে ইচ্ছা করেই এসব বলছে, তাকে রাগানোর জন্য, কষ্ট দেওয়ার জন্য। সামনের মানব আবারও বলে,
-“ওয়ান মোর থিং, আমার বউ যখন খুব নার্ভাস হতো তখন এভাবেই ঠোঁট কামড়াত”
সানা মুহূর্তেই ঠোঁট ছেড়ে দিল। আরজে শব্দ করে হেসে দিল,

-“ওহ… সরি, আপনি তো বলেছিলেন আপনার সাথে তার কোনো মিল নেই”
সানা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না, সে চোখে আ*গুন নিয়ে তাকাল তার দিকে। কিন্তু তবুও কোনো কথা বলল না। আরজে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রমণীকে পড়ার চেষ্টা করল, বুঝতে পারছে তার প্রেয়সী এত সহজে মুখ খুলবে না। তাই আরজে আবার বলে,
-“হোয়াট এভার, এখন তো আমাদের ডিভোর্স হয়েই গিয়েছে, তাই এখন আমি সিঙ্গেল”
আরজে রমণীর খুব কাছে ঝুঁকে এল, তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। নিচু স্বরে আওড়ায়,
-“আর আপনিও সিঙ্গেল, মিস সুনেহনা খানম,
তাহলে সমস্যা কোথায়?”

সানা হাতে ভর দিয়ে একটু পিছিয়ে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। আরজে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলে,
-“আমরা দুজনই ফ্রি মানুষ, কোনো সম্পর্ক নেই, কোনো দায়িত্ব নেই”
সানার কানে ফিসফিস করে বলে,
-“তাহলে যদি আমাদের মধ্যে… কিছু হয়…
তাতে সমস্যা কি?”
বাক্যটুকু শ্রবণ হতেই মুহূর্ত সানার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, আর পর মুহূর্তেই,
“ঠাস”

সানার হাত ঝড়ের মতো উঠল, একটা জোরালো থাপ্পড় পড়ে আরজের গালে। কয়েক সেকেন্ড দুজনেই স্থির। আরজের মুখ একটু অন্যদিকে ঘুরে গেছে। তার গালে লাল দাগ ফুটে উঠছে। রমণীর সারা শরীর যেন রাগে কাঁপছে। এতক্ষন না হয় “এক্স ওয়াইফ” বলে ঠিক আছে, কিন্তু এখন সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। আরজে তার সামনে তাকেই প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছে। এক মুহূর্তে সে দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপর কোনো কিছু না ভেবে আরজের দিকে এলোপাতাড়ি হাত চালাতে শুরু করে। আরজে তার হাত চেপে ধরতেই রমণী দিক্বিদিক কিছু না ভেবে পরপর নিজের দাঁত বসিয়ে দিল আরজের পুরুষালী উন্মুক্ত বুকে। ব্যথায় আরজে নিজের চোখ কুঁচকে নিল। সানা আচ্ছামতো নিজের রাগ মিটিয়ে র*ক্তচক্ষু নিয়ে তার দিকে তাকায়। তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। এখন তাকে একদম খ্যাপা সিংহীর মতো লাগছে।

পরমুহূর্তে আরজের কে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল। সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুত দরজার দিকে দৌড়ে গেল। দরজা খুলে এক ছুটে বেরিয়ে যায়। করিডোরে তার পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল। রুমে আবার নীরবতা নেমে আসে।আরজে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ড সে স্থির। তারপর হঠাৎ সে মাথা তুলে জোরে হেসে উঠল। যেন সে এইটাই চেয়েছিল। সে ধীরে ধীরে হাত তুলে নিজের বুকে হাত রাখে যেখানে এখনো সানার কামড় গুলো জ্বলছে। সে দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
-“আমিও দেখতে চাই, আর কতক্ষণ তুমি মুখ না খুলে থাকতে পারো, ওয়াইফি….”

রাত আরও গভীর হয়েছে। অরোরা গ্র্যান্ড পাভিলিয়নের উপরের তলাগুলো প্রায় নিস্তব্ধ। করিডোরের নরম আলোয় দৌড়ে আসছে সানা। তার শ্বাস দ্রুত, চোখে এখনও অপমান, রাগ আর অস্থিরতা। সে এসে থামে এসপির রুমের সামনে। এক ন্যানো সেকেন্ড অপেক্ষা না করে দ্রুত নক করে। বিপরীতে কোনো সাড়া নেই। সে আবার নক করল, এবার আরও জোরে।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলে গেল।দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এসপি, চোখে ঘুমের ছাপ, মুখে ক্লান্তি। সে অবাক হয়ে বলে,
-“তুই, এই সময়…”
কিন্তু সানা তাকে শেষ করতে দিল না। সে তাড়াহুড়ো করে বলে,
-“ভীর কোথায়? ওকে দেয় আমাকে”
-“কেন?”
সানা প্রায় তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
-“আমি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকবো না।
আমি আমার ছেলেকে নিয়ে চলে যাচ্ছি।”

এসপি সরু চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, এই মাঝরাতে কোন ভুতে টুতে ধরল নাকি? না পাগল হয়ে গিয়েছে এই মেয়ে? তার ভাবনার মধ্যে আবারও আসে সানার চিৎকার,
-“তাড়াতাড়ি ভীরকে দে, আমি ভ্যালিতে চলে যাব এক্ষুনি”
এসপি তড়িঘড়ি করে দরজাটা মিলিয়ে দিল, তারপর সানার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,
-“কি করছিস? আস্তে, ভিতরে সানি আর আরভি ঘুমিয়ে আছে। কি হয়েছে সেটা তো বল। রাতবিরাতে এমন পাগলামি করছিস কেন?”
সানা জোর করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে দাঁত চেপে বলে,
-“ওই কু*ত্তা থাক নিজের ইগো নিয়ে, আমি আমার ছেলে নিয়ে থাকব, ভেবেছি ছেলে দেখাব, এবার দেখাবও না”
-“কোন কু*ত্তা…..?”
সাথে সাথে সানার কঠিন চক্ষু দেখে এসপি বাকি কথা গিলে নিল। মুহূর্তে বুঝে গেল কার কথা বলছে। তাই ফের বলে,

-“ওই জাওরা আবার কি করেছে? তোর স্বপ্নে এসে ‘এক্স ওয়াইফ’ বলেছে নাকি?”
বিপরীতে রমণীর থেকে কোনো প্রত্যুত্তর এলো না। সে এখনো নাকের পাতা ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে। ব্যাস, পর মুহূর্তে এক ন্যানো সেকেন্ড অপেক্ষা না করে রমণী হামলা চালায় এসপির চুলে, দুই-তিনটা টান মেরে, তারপর বাহু আর পিঠে পড়ে গেল ধুমধাম কয়েকটা। এসপি তড়িঘড়ি করে এক লাফে অন্যদিকে চলে গেল,
-“আরে আরে, আমার মা, থাম। রাগ জাওরার উপর মিটিয়ে আয়, আমার উপর কেন মেটাচ্ছিস?”
সানা কিছু না বলে দরজা খুলে ভিতরে চলে যায়। এসপিও তার পিছু পিছু যায়।
-“সানা, রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তুই এখন কোথায় যাবি? শোন, সকাল হোক, তারপর যা করার করবি”
বিপরীতে রমণীর চোখে স্পষ্ট জেদ, সে মাথা নাড়িয়ে কঠিন স্বরে বলে,
-“না, আমি এখনই যাব”
-“কোথায় যাবি?”
-“স্যার সন্ধ্যায় আমাকে কল করেছিল। বলেছিল উনি শহরে এসেছেন, আরভিকে দেখতে চান”
এসপি বিস্মিত স্বরে বলে,

-“ব্রো…”
-“হুম, আমি একটু আগে উনাকে ফোন করেছি। উনি আসছেন আমাদের নিতে। আমি ভ্যালিতে ফিরে যাব”
এসপি এবার পুরোপুরি জেগে উঠে,
-“ইয়ার, তুই পাগল নাকি? এত রাতে বাচ্চা নিয়ে রাস্তায় বের হবি? সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা কর।”
কিন্তু সানা তার একটা কথাও কানে তুলছে না। তার চোখে এখন শুধু একটা জেদ, এখান থেকে চলে যাওয়া। সানা বিছানার কাছে গিয়ে আলতো করে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। আরভি আধো ঘুমে গুনগুন করে ওঠে, সানা তার পিঠে স্নেহের হাত বুলিয়ে আওড়ায়,
-“মম, মম, ঘুমাও সোনা”
তারপর আরভি আবার মাথা মায়ের কাঁধে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। সানা তাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
-“সানিতার খেয়াল রাখ, আমার পিছু পিছু আসার দরকার নেই। স্যার একটু পর এসেই পড়বেন”
এসপি আবার নিচু স্বরে বলে,
-“সানা, ওর বাপকে একবার বললে ভালো হতো না?”

তার বিপরীতে রমণীর তরফ থেকে কোন শব্দ আসলো না। সে দ্রুত করিডোর ধরে হাঁটা শুরু করে, কিছুক্ষণ পর হোটেলের লবি।বড় কাঁচের দরজা দিয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকছে। সানা দ্রুত বেরিয়ে এল।আরভি এখনও ঘুমিয়ে আছে তার কোলের মধ্যে। সে হোটেলের গেটের দিকে হাঁটতে লাগল। বাইরে রাস্তায় আলো কম, শহরের রাত ধীর, শান্ত। চারদিকে অনেক ঠান্ডা পড়ছে। সানা আরভিকে আরেকটু আগলে ধরে যাতে ঠান্ডা না লাগে। সে প্রায় গেটের কাছে পৌঁছে গেছে, দূর থেকে সারহাদের গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখা যাচ্ছে, ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠ ভেসে এল,
-“তোমার কাছে কি শুধু একটাই প্ল্যান আছে?”
সানার পা থেমে গেল। তার শরীর হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। পিছনের মানব ফের বলে,

-“পালিয়ে যাওয়া
সত্যিটা কখনোই ফেস করতে পারো না তুমি।
ওই সাহসটুকু তোমার নেই”
সানার বুক ধক করে উঠে সে ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকায় আর তারপর সে একদম স্থির হয়ে গেল। কারণ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। হোটেলের আলো তার পেছনে পড়েছে। তার মুখে কঠিন রেখা গুলো ফুলে ওঠেছে। সানা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোলে থাকা আরভিকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরল। যেন কাউকে লুকিয়ে ফেলতে চাইছে। তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক, আরজে সেটা লক্ষ্য করে তার চোখ সরু হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার দৃষ্টি আটকায় সানার কোলের দিকে, ঘুমন্ত বাচ্চাটার উপর। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮

-“এটা কে?”
সানার বুক কাঁপছে, তার আঙুলগুলো আরও শক্ত হয়ে গেল বাচ্চাটার চারপাশে। কয়েক সেকেন্ড সে চুপ করে রইল। তারপর সে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে মাথা একটু তুলে সরাসরি আরজের চোখে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে আওড়ায়,
-“আমার ছেলে….”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০