৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৯
রুপান্জলি
২৭-০৫-২০১৯
,,, আজ টানা দুই দিন পর পুরোপুরি জ্ঞান ফিরলো দ্বীপের। এই দুই দিন সে মরার মতো ঘুমিয়েছে,, পারুর ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ শুনার সাথে সাথেই দ্বীপের হৃদপিণ্ড অচল হয়ে পরেছিলো,, এটাকে ডক্টরের ভাষায় মাইনোর হার্ট এটাক বলা হয়। অতিরিক্ত শক আর টেনশনে দ্বীপের হৃদযন্ত্রের রক্ত সঞ্চালন ক্রিয়া ব্লক হয়ে যাওয়ার দরুন সাথে সাথে দ্বীপ দম আটকে পাথরের ন্যায় হয়ে গিয়েছিলো। যার ফলে সেদিন রাতে তার সার্জারি অভ এন্জিউপ্লাস্টি-স্টেন্ড করানো হয়। ভাগ্য ভালো ছিলো ডক্টর সাথে সাথে দ্বীপের অবস্থা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন নয়তো আরেকটু সময় পেরুলেই হার্ট পেশি পুরোপুরি ব্লক হয়ে যেতো। তখন হয়তো বিরাট আকারের সার্জারীর প্রয়োজন পরতো,, আল্লাহ সহায় হয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ!!!
তারপর থেকে টানা দুই দিন দ্বীপ পুরোপুরি জ্ঞান শুন্য হয়ে হসপিটালের বেডে পরে ছিলো,, এমন নয় যে এর মাঝে একবারো দ্বীপের জ্ঞান ফিরেনি। ফিরেছে, যতবার ফিরেছে ততোবার পারু পারু বলে হসপিটালে ঝড় তুলে দিয়েছে,, কাউকে কাছে ঘেষতে দেয়নি,, কারোর কথা শুনতে চায়নি,, অতিমাত্রায় পাগলামি যাকে বলে,, এসব করার কারনে ওর অনেক ক্ষতিও হয়েছে,, হাত পায়ের অনেক জায়গায় কেটে কুটে গিয়েছে। কখনো কখনো সে নিজেই নিজেকে আঘাত করেছে,, সেসব ঠেকাতেই তাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু এটা তো সবসময় চলতে পারেনা, একদমই অসম্ভব। একটা মানুষকে প্রতিদিন ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে শান্ত করাটা অনুচিত, এতে রুগির স্বাস্থের ক্ষতি হওয়ার আসঙ্কা প্রবল। অগত্যা আজ আর ইন্জেকশন দেওয়া হলো না দ্বীপকে। দ্বীপের জ্ঞান ফিরতেই প্রতিদিনকার মতো আজকেও পাগলামি শুরু করে দিয়েছে, সে পারুর কাছে যাবে, যাবে মানে যাবেই। ওদিকে পারুর অবস্থা বড্ড সুচনীয়, সারাক্ষণ লাইফ সাপোর্টে রাখতে হচ্ছে।
দ্বীপকে আবারও পাগলামি করতে দেখে নার্সরা গিয়ে মাহিদ মির্জাকে ডেকে পাঠালেন। পারু ভর্তি হওয়ার পর থেকে খাওয়া ঘুম, কাজ বাজ ফেলে হসপিটালেই পরে আছেন তিনি, সাথে আরও একজন পুরুষ রয়েছেন, তিনিও একজন বাবা, পারুর বাবা। আগেরদিন সবাই যখন জানতে পারলো পারুর ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ,, তখনি বিহান গিয়ে নিজ দায়িত্বে উনাদের নিয়ে আসেন। পারুর বাবা হামিদ হোসেন ভালোবাসা, প্রনয় অপছন্দ করলেও আজ উনার কিছুই বলার নেই। যেই মেয়েটা কদিনের মাথায় উনাদের ছেড়ে পরপারে চলে যাবে তার সাথে কি রাগ করা যায়? নাকি ন্যায় অন্যায়ের হিসেব নিকেস করা যায়? মেয়েটাকে তিনি বড্ড ভালোবাসেন। দুটো মেয়ে আর একটা ছেলের মধ্য থেকে একটা তো ছোট কালেই পালিয়ে গেলো এখন যেটা আছে সেটাও পালানোর বাহানা সাজাচ্ছে। এ জীবন কঠিন,, তার চেয়েও কঠিন নিয়তির লিখন। নার্সরা এসে খবর পাঠাতেই মাহিদ মির্জা হামিদ হোসেনকে পারুর ক্যাবিনের সামনে বসিয়ে রেখে ছেলের ক্যাবিনের দিকে পা বাড়ালেন।
,,, দ্বীপ বেডের উপর বসে চুল খামচে ধরে রেখেছে, নিশ্চয়ই খুম কষ্ট হচ্ছে ছেলেটার? ইসস!! মাহিদ মির্জার যদি কোনো দৈব বল থাকতো, তাহলে ছেলের কষ্ট তিনি এক লহমায় মুছে দিতেন। মাহিদ মির্জা এগিয়ে গিয়ে ছেলের পাশে বসলেন, চুলের ভাজে হাত রাখতেই মাথা উচিয়ে উপরে তাকালো দ্বীপ। বাবাকে সামনে দেখে দ্বীপের পাগলামি যেনো আরও বাড়লো। সে উমাদের মতো বাবার হাত দুহাতের ভাজে নিয়ে ঘষতে ঘষতে বললো — প, পারু? পারু এখন কেমন আছে আব্বু? ঠিক আছে? ও কথা বলছে? শ্বাস নিচ্ছে তো,? আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই,, আমি আমার পারুর কাছে যাবো, প্লিজ!! আমার, আমার দম আটকে আসছে আব্বু। পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। বুকের এদিকটায় খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। ও কি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? আমরা সংসার করবোনা? ও আমায় বলেছিলো আমাদের সুন্দর একটা সংসার হবে।
আমি তো সংসার মানে বুঝতাম না আব্বু, ও বুঝিয়েছিলো, তাহলে এখন এতো পালাই পালাই কেনো করছে? আমি মরতে চাই আব্বু, ওর আগে মরতে চাই। আমি ওকে সাদা কাফনে দেখতে পারবোনা,, একদম পারবো না। আমাকে মেরে ফেলোনা তুমি,, প্লিজ মেরে ফেলো। আমার কষ্ট হচ্ছে আব্বু,, আম্মু মরার দিনের চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে,, কিভাবে বুঝাবো? কি করলে বুঝবে তোমরা? আমার কেমন যন্ত্রণা হচ্ছে,, তোমরা কেনো বুঝতে চাওনা? আমাকে একটু ওর কাছে যেতে দিতে বলো। আমি ওকে একটু ও বিরক্ত করবো না, শুধু দেখবো আর জানতে চাইবো, কেনো সে আমার সাথে এতো বড়ো বেঈমানিটা করলো? আমি তো ওকে ভালোবাসি,, খুব খুব ভালোবাসি। আমার এক আকাশ পরিমান ভালোবাসার পরিবর্তে ও আমার হাতে ওর কাফনের কাপর ধরিয়ে দিতে পারেনা। আমি মানবোনা ওসব,,ওকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে নয়তো ওকে সুস্থ হতে বলো। আমার কাছে ফিরতে বলো। ওকে ছাড়া বাচতে পারবোনা আমি,, মরে যাবো।
,,,, মাহিদ মির্জা হাত উচিয়ে ছেলের গালে হাত রাখলেন, স্নেহের সহিত হাত ভুলিয়ে দিয়ে নরম স্বরে বললেন– দ্বীপ, আব্বু!! শান্ত হও বাবা। এভাবে পাগলামি করতে হয়না। নিজেকে শক্ত করো,, ঠিক মতো চিকিৎসা চললে আমাদের পারু আরও অনেকদিন বাচবে,, যতগুলো দিন বাচবে ততোগুলো দিন ওকে ভালো রাখতে হবেনা? ওর স্বপ্ন গুলো পূরন করতে হবেনা? ওর তো একটা সংসারের স্বপ্ন ছিলো, তুমি ওর স্বপ্ন টুকুন পূরন করবে না? পারুর জ্ঞান ফিরলে আমি দাড়িয়ে থেকে তোমাদের বিয়ে দিবো বাবা, পারুকে বাড়ি নিয়ে যাবো। শান্ত হও দ্বীপ, তোমার কষ্ট আমার সহ্য হয়না,, তুমি আমার এক মাত্র সন্তান, তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই। বাবার কথাটা একটু ভাববে না? তোমার কিছু হলে কি নিয়ে বাচবো আমি?
,,, দ্বীপ ছোট বাচ্চার মতো বাবার কোলে মুখ লুকালো মাহিদ মির্জা ছেলের মাথায় থুতনি রেখে নিজেও চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। ছেলেটার নিয়তি বরাবর ছেলেটাকে ঠকায়,, কেনো এতো অবিচার? আল্লাহ যদি একটু সহায় হতেন, পারু যদি ঠিক হয়ে যেতো? তাহলে জীবনটা কত সুন্দর হয়ে উঠতো তাইনা? দ্বীপ পারুর বিয়ে হতো,, একটা সুন্দর সংসার হতো,, বাচ্চা কাচ্চা হতো,, সেই বাচ্চা কাচ্চারা মিলে হইচই করে মির্জা বাড়ির হলরুম চষে বেড়াতো। তাতো আর হওয়ার নয়,, এতোটা সুখের দিন আসার নয়।
,,,, বহু মিনতির পর দ্বীপকে পারুর রুমে এলাও করা হলো,, এমনিতে সচারচর আই সি ইউ রুমে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়না তার উপর পারুকে সর্বোক্ষন লাইফ সাপোর্টে রাখা হচ্ছে। এমতা অবস্থায় দ্বীপকে ঢুকতে দেওয়া বড্ড রিস্কি হয়ে যায়, তবুও সে মির্জা বাড়ির সন্তান তার উপর এমপি, মন্ত্রীর ভাতিজা। সেই সুবাধে ওকে আটকানোর মতো শক্তি বোধয় হসপিটাল কমিটির নেই। তাই শাহিন মির্জা অনুমতি চাইতেই ওকে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়া হলো। দুই দিন পর মানুষ জনদের দেখা পেলো দ্বীপ। ক্যাবিন থেকে বেরুতেই পুরো পরিবারকে দেখতে পেলো। সবাই তার দিকেই অসহায় ভাবে তাকিয়ে আছে। ছেলেকে দেখে ছুটে এলেন রোমানা বেগম, দ্বীপের গাল দুটো আকরে ধরে কপালে অসংখ্য চুমু আকলেন। দ্বীপ মাকে সামলে কয়েকপা বাড়াতেই দুজন অচেনা ব্যাক্তিকে দেখতে পেলো। একজন বোরখা পরা মহিলা আর অন্যজন মধ্যবয়ষ্ক পুরুষ। পুরুষটির চেহারা অনেকটাই পারুর সাথে মিলে। বুদ্ধি সম্পন্ন দ্বীপ সহসা বুঝে গেলো এটা পারুর আব্বু। লোকটাকে দেখে রাগে ফেটে পরলো দ্বীপ, তেড়ে গিয়ে লোকটার কলার ধরতে চেয়েও ধরলোনা,, দ্বীপের হঠাৎ আক্রমণে চমকে গেলেন হামিদ হোসেন,, চমকে কয়েকপা পিছিয়ে গেলেন। দ্বীপকে এমন করতে দেখে বিহান, মাহিন মির্জা, শাহিন মির্জা এসে ওকে টেনে ধরতেই দ্বীপ তিব্র রাগে ফোসতে ফোসতে বললো —
,,, আপনাকে আমি ছাড়বোনা, আর না আপনার ওয়াইফকে। আপনারা ভালো বাবা মা নন, আমার পারুর খেয়াল রাখেননি। পাঁচটা বছর ধরে আমার পারু রোগে ভোগছে আর আপনারা তার খবর রাখেন নি,, নেক্সট টাইম আমার সামনে পরবেন না, একদম খুন করে দিবো। আই’ল কিল ইউ, ট্রাস্ট মি, পারুর বাপ বলে ছেড়ে দিবোনা। আই’ল কিল ইউ, কিল ইউ ডেমন ইট!! ( খেকিয়ে উঠে)
,,,পারুর মা শব্দ তুলে কেদে দিলেন,, হামিদ হোসেনের চোখেও পানি। তিনি সত্যি ই ব্যার্থ বাবা,, মেয়েটা বছর দুই ধরেই মাথা ব্যাথার কথা বলতো কিন্তু তিনি সেটাকে সিরিয়াসলি নেননি। ব্যাথার ঔষধ এনে দিতেন,মেয়েটাও খেতো, কখনো অভিযোগ করেনি,, বলেনি আব্বু ডক্টরের কাছে নিয়ে যাও। এই আক্ষেপ তিনি কোথায় লুকাবেন? মেয়েটাকেই বা মুখ দেখাবেন কি করে? পারু নিশ্চয়ই দ্বীপের মতোই উনাকে ভুল বুঝবে?কিন্তু তিনিও তো বুঝতে পারেনি,, এতো বড়ো রোগ সম্পর্কে তো কোনো ধারনাই ছিলোনা হামিদ হোসেনের। তাহলে অতদূর পর্যন্ত ভাবনা পৌছাবে কি করে? ভাবতে ভাবতে আরও দু ফোটা চোখের পানি ছাড়লেন এক ব্যার্থ বাবা। মাহিদ মির্জা এগিয়ে এসে হামিদ হোসেনের কাছে অনুনয় করে ক্ষমা চাইলেন,, দ্বীপের মাথা ঠিক নেই, কি থেকে কি বলে ফেলেছে হিসাব নেই।
,,,, আকাশি রঙা হসপিটালের ড্রেস পরিহিত পারুকে কিযে সুন্দর লাগছে,, দ্বীপের চোখ জোড়া জুড়িয়ে এলো। অসুস্থ হয়ে পারু এতো সুন্দর হয়ে গেলো নাকি দ্বীপের চোখে আজ পারুকে এতোটা সুন্দর লাগছে? ওহ, হে!! আজ তো তেলোবতীর মুখে তেল নেই, হাতে পায়ে তেল নেই,, দ্বীপ চুলে হাত দিয়ে দেখলো,, হুম চুলে একটু একটু তেল আছে। এজন্যই পারুকে এতোটা সুন্দর লাগছে? তবে, দ্বীপ তো তেলোবতীর প্রেমে পরেছিলো,, যার পুরো বদন খানা সূর্যের আলোয় চকচক করছিলো,, তৈলাক্ত চুলের বেনুনিটা দ্বীপের কাছে প্রেমের ফাস মনে হয়েছিলো, যেই ফাসে সে ইচ্ছা করেই ফেসেছে। আজো সেই বেনুনি আছে,, দ্বীপ আবারও ফেসে গেলো। এইতো, এইমাত্র আবারও পারুর প্রেমে ফাসলো দ্বীপ। পারুর দিকে এতোক্ষণ ঝুকে ছিলো দ্বীপ এখন আয়েশ করে মেঝেতে বসলো। মেয়েটাকে সে মন ভরে দেখবে, দুটোদিন হলো পারুকে দেখে না, সময় নিয়ে দেখতে হবেনা? দ্বীপ চেয়ারে বসে পারুর দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকালো। নাক মুখ অক্সিজেন মাক্স দিয়ে ঢাকা,, হাতে তিন চারটা ক্যানালো, তাতে কিসব যেনো হচ্ছে,, মাথায় ও কিসের একটা যন্ত্র লাগানো,, বুকের এদিকটায় ও তিনটে চিকন নল লাগানো। এসব কেনো লাগিয়েছে দ্বীপ জানেনা, সে শুধু জানে পারুকে সুন্দর লাগছে। আকাশ থেকে নেমে আসা হুর-পরীর মতো লাগছে। দ্বীপ হাত উচিয়ে একটু করে পারুর গাল ছুয়ে দিলো,, পরপর ঠোট বাকিয়ে হাসতে চেয়ে ঝরঝর করে কেদে দিলো। পারুর মাথার কাছে মুখ ঠেকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললো —
,,, আমার জীবনে কেনো এলি পারু? আসলি ই যখন, এখন চলে যেতে চাস কেনো? তুই তো পালিয়ে গিয়ে বেচে যাবি, আমার কি হবে পারু? আমি কি নিয়ে বাচবো? বলনা!! বলে যা। তকে ছাড়া কিভাবে বাচবো শিখিয়ে দিয়ে যা নয়তো তর সাথে আমাকে নিয়ে যা। আমায় একা ফেলে যাসনা পারু, প্লিজ সোনা,, প্লিজ!! আমার উপর একটু মায়া কর, থেকে যা। আমার এতো বড়ো সর্বনাশ টা করিস না,, জানরে,, থেকে যা না,,প্লিজ থেকে যা।
,,,ওপাশ থেকে উত্তর এলোনা, পারুটা সেভাবেই পরে রইলো। একটাবার নজর তুলে কন্দরত দ্বীপকে দেখলো পর্যন্ত না। দ্বীপ অসহায়ের মতো কেদে গেলো,, আল্লাহ এর কাছে খুব করে আরজি জানালো,, পারুটা যেনে থেকে যায়,, আল্লাহ যেনো তারা হায়াত বাড়িয়ে দেন।
৫-০৬-২০১৯
টানা সাত দিন পর জ্ঞান ফিরলো পারুর , এতোদিন তাকে সম্পূর্ণ লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিলো, সাথে রেডিয়েশন থ্যারাপি, ইমিউনো থেরাপি, কেমো থেরাপি এবং টিউমার ট্রিটিং ফিল্ডস থেরাপি ছিলো সর্বোক্ষনের সাথি। ৮ জন ডক্টর সম্মিলিত ভাবে পারুর ট্রিটমেন্ট চালাচ্ছে। আজ ৭ দিন পর পারুর রেসপন্স ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে,, ব্রেনের পারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টিউমার গুলোর বংশবিস্তারে বাধা প্রয়োগ করার ফলে সেগুলো এখন সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। থ্যারাপির প্রভাবে সদ্য জন্ম নেওয়া বার্তি কোষ গুলো প্রায় নিস চিন্হ। এভাবে রেগুলার থেরাপি নিলে আল্লাহ চাইলে পারু ২-৩ মাস বেচে থাকবে। তবে, কোনো কারনে অতিরিক্ত চাপ পরলে বা টেনসন করলে যখন তখন যা খুশি হয়ে যেতে পারে। তাই আপাতত পারুর কাছে সবাইকে হাসিখুশি থাকতে হবে। সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট, পারুকে তার রোগ সম্পর্কে বলা নিষেধ, সে কোনোভাবে এটা জানতে পারলে ব্রেইনে চাপ পরে মৃত্যু অনিশিকার্য। অগত্যা কেউ আর তাকে জ্বালালো না,, সবাই এক বুক হাহাকার চাপিয়ে রেখে খুশি খুশি দেখা করলো পারুর সাথে। পারুর বাবা, মা বহু কষ্টে কান্না আটকে মেয়েকে আদুরে স্পর্শে বহুবার রাঙিয়ে দিয়েছেন।
পারুর মা কতো করে জানতে চাইলেন, পারু কি চায়? কি খেতে চায়? মেয়েটা শুধু ঠোট বাকিয়ে হাসলো,, অত্যন্ত নিশ্পাপ ছিলো সেই হাসি। এই হাসিটুকু হামিদ হোসেন বরাবর পছন্দ করতেন,, আজো তিনি মন ভরে মেয়ের হাসি মুখটা দেখলেন। আর কতোদিন দেখতে পারবেন এই হাসি? আর মাস দুয়েক? হুম, ডক্টর রা তো তাই বললেন। ইসস!! তারপর এই পারুটা তার বাবা মাকে ফেলে চলে যাবে বুঝি? নিয়তি এতো নিষ্ঠুর কেনো? বাবার হাতে সন্তানের কাফন,,কাধে সন্তানের খাটিয়া,, এর চেয়ে বড়ো যন্ত্রণা আর হয়না,,সত্যি ই হয়না। হামিদ হোসেন যখন বুকে পাথর চেপে পারুর মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন,, পারু তার বাবার কাছে কি চায়? পারু তখন আবদার ভরা কন্ঠে দ্বীপকে চেয়েছিলো। বলেছিলো সে দ্বীপের সাথে সংসার করতে চায়। বাবা যেনো ওদের সম্পর্ক টা মেনে নেয়,, যেনো রাগ না করে। মেয়ের এরুপ কথা শুনে কান্না আটকাতে পারলোনা পারুর মা,, তিনি কাদতে কাদতে ক্যাবিন থেকে বেড়িয়ে গেলেন।
পারু অসহায় মুখ করে মায়ের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে থেকে বাবার কাছে ছোট ভাই রাহাতের খোজ জানতে চাইলে হামিদ হোসেন মেয়েকে আশ্বাস দিলেন, পরের বার ছেলেকে নিয়ে আসবেন। পারু তখন বাবার দিকে তাকিয়ে বাচ্চাদের মতো মুখ করে জিজ্ঞেস করলো,, তাকে আর কতোদিন হসপিটালে থাকতে হবে? সে সুস্থ হবে কবে? তার কি রোগ হয়েছে? মেয়ের কথায় উত্তর দিতে পারলেন না হামিদ হোসেন,,, এসব প্রশ্নের উত্তর যে উনার কাছে নেই। হামিদ হোসেন নিজেকে সামলাতে চেয়েও পারছেননা,, সামলাতে না পেরে পারুর মাথায় হাত ভুলিয়ে ক্যাবিন থেকে বেড়িয়ে গেলেন। বাবা চলে যেতেই কেমন করে হাসলো পারু,, সে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে,, সে আর সুস্থ হবেনা। হয়তো বেশিদিন সবার মাঝে থাকবেও না। পরোক্ষনেই ঠোটের হাসি টুকু মিলিয়ে গেলো,, পারু এতোদিন পর চোখ মেলে তাকালো,, সবাই দেখা করতে এলো,, দ্বীপ এলোনা যে?
ও কোথায়? কখন আসবে? দ্বীপ কি তবে পারুকে দেখতে আসবেনা? পারুর তো দ্বীপের জন্য বুক পুড়ছে,, লোকটাকে দেখতে মন চাচ্ছে খুব। পারুর ভাবনার মাঝেই ক্যাবিনের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো দ্বীপ। বিদ্ধস্ত, ভঙ্গুর দ্বীপকে দেখে পারুর বুকটা খা খা করে উঠলো। ইসস!! লোকটার এ কেমন হাল হলো? বিড়াল চোখা নয়ন দুটো লাল হয়ে ফুলে আছে। উনি কি কেদেছেন? খুব কেদেছেন? দেখেই তো বুঝা যাচ্ছে। দ্বীপ এগিয়ে গিয়ে পারুর পাশে মেঝেতে হাটু গেড়ে বসলো,, মেয়েটা তার দিকে ডাগর ডাগর দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে আছে। দ্বীপ ওর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো,, পারুর নাকে অক্সিজেন নল লাগানো,, দ্বীপ হাত বাড়িয়ে পারুর নাকে টোকা মেরে জিজ্ঞেস করলো —
,,,অবাধ্য প্রেমিকার ঘুম ভাঙলো তবে? তুমি এতো অবাধ্য কেনো পারু? সবসময় আমাকে পোড়াও।
,,, দ্বীপের ঠোঁটে হাসির রেখা দেখে পারু ও ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো,, বাচ্চা বাচ্চা মুখ করে আবদার জুড়ে দিয়ে বললো — আমায় একটু তুলে দিবে? তোমার বুকে মাথা রাখবো।
,,,দ্বীপ মলিন হাসলো,, বুকের ভিতরে চলা তোলপার দমাতে বহু কষরত করতে হচ্ছে। তবুও নিজেকে ঠিক রেখে পারুর মাথায় হাত ভুলিয়ে বললো — বেবি!! তুমি তো অসুস্থ,, আরেকটু সুস্থ হয়ে নাও, তারপর তোমাকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরবো। কেমন?
,, পারু কাতর চোখে চাইলো,, চোখ জোড়া ছল ছল করে উঠলো। ক্যানেলো লাগানো ডান হাতটা এগিয়ে দিলো দ্বীপের দিকে,, হাতটা কাপছে খুব, নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে,, পারুর বাড়ানো হাতটা দ্বীপ আলতো করে ধরে নিজের গালে ঠেকালো। পারু ছল ছল করা দৃষ্টি ফেলে দ্বীপের গালে হাত ভুলিয়ে কাপা কন্ঠে প্রশ্ন করলো — আমার কি হয়েছে খারাপ পুরুষ? আমি কি মরে যাবো? আমাদের সংসার হবেনা? বিয়ে করবোনা? বলোনা, বেবি! আমার কি খুব বড়ো রোগ হয়েছে? কয়দিন বাচবো আমি?
,,,, দ্বীপের চোখ জোড়াও ছল ছল করে উঠলো, নিজেকে সামলানো দায়। মেয়েটা এভাবে কথা বলে কেনো? এসব কথা বললে দ্বীপ তো ঠিক থাকতে পারবেনা। যেই শক্ত খোলসে নিজেকে আবৃত করে রেখেছে,, তাতো এক লহমায় ভেঙে গুড়িয়ে যাবে।নিজেকে ঠিক রেখে পারুর হাতে ঠোট ছুয়ালো দ্বীপ। অত্তন্ত আদুরে কন্ঠে বললো — এসব বলেনা সোনা। তোমার কিছুই হয়নি, শুধু একটু মাথা ব্যাথা। ব্যাথাটা সেরে গেলেই আমরা বাড়ি ফিরে যাবো। তারপর সুন্দর একটা সংসার সাজাবো।
,,, পারু বাচ্চাদের মতো মুখ করেই বললো –বিয়ে করবোনা?
,,, পারুর মুখোভঙ্গি দেখে হাসলো দ্বীপ,, মাথা নুইয়ে পারুর চোখের ভাজে চুমু একে দিয়ে বললো — করবো তো,, আমরা এখোনি বিয়ে করবো। আমরা অনেক গুলো দিন, একসাথে বাচবো বেবি,, একটা সুন্দর সংসার হবে আমাদের। তুমি আমি মিলে রান্না করবো, খাবার খাবো,, পরিবারের সকলকে রান্না করে খাওয়াবো। আর সেই খাবার খেয়ে মির্জা বাড়ির সকলে তোমার প্রশংসা করবে।
,,,পারু চোখ ছোট ছোট করে বললো — এখন মানে? আমরা এখানে বিয়ে করবো? হসপিটালে কেউ বিয়ে করে?
,,,দ্বীপ মাথা ঝাকিয়ে সায় জানালো,, পারুর অক্সিজেন নলটা ঠিক করে দিয়ে গায়ের জামাটা ঠিক করে দিতে দিতে বললো — হুম, দ্বীপ মির্জা আর পারমিতা হামিদ করে। আমরা করবো,, এই মুহুর্তে, এখন,হসপিটালে বিয়ে করবো আমরা। বুঝছো বউ?
,,, বউ ডাক শুনে লজ্জা পেলো পারু, মনটা সুখে সুখে ভরে যাচ্ছে। তবুও মুখটা একটু মলিন করে বললো —কিন্তু, আমি তো এভাবে বিয়ে করতে চাইনি,, আমি চাই বাড়ির সবার উপস্থিতিতে,, বাড়িতে থেকে বিয়ে করতে। এভাবে বিয়ে করবোনা বেবি, আমি সুস্থ হয়ে নেই তারপর বিয়ে করি? প্লিজ!!
,,, দ্বীপ ফোস করে নিশ্বাস ফেললো পরপর বুঝানোর মতো করে বললো — তুমি সুস্থ হলেই আমরা ঝাকঝমক ভাবে বিয়ে করবো বেবি। তার আগে এখন বিয়েটা করে নেই? এখন কিন্তু তোমার আব্বু ও উপস্থিত আছেন। আমাকে প্রত্যাক্ষান করোনা জান, প্লিজ!!
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৮
,,, পারু মিষ্টি করে হাসলো,, কিযে সুন্দর লাগলো হাসি খানা, একদম নজর কারার মতো। দ্বীপ পারুর বালিশে মাথা হেলিয়ে পারুর দিকে তাকিয়ে রইলো। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো তার ওয়েলি লেডিকে। কিছুক্ষণনের মাঝেই বিহান কাজি নিয়ে হাজির হবে। তারপর দ্বীপ পারুর বিয়ে হবে,, কে বলে দ্বীপ পারুর সংসার হবেনা? হবে,, বেশিদিনের না হোক, অল্প দিনের জন্য হলেও সংসার করবে তারা। পারুর যত স্বপ্ন, ইচ্ছা আকাঙ্খা রয়েছে সব পুরন করবে দ্বীপ, সব। এক জীবনে পারুকে যতটা ভালোবাসা দেওয়ার কথা ছিলো তার থেকে হাজার গুন বেশি ভালোবাসা এই কদিনে উজার করে দিবে সে।
