৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৮
রুপান্জলি
,,, টিক টিক করে ঘড়ির কাটা পেরুচ্ছে আর ধীরে ধীরে সময় গড়াচ্ছে,, এতো যে সময় পেরুচ্ছে তবুও ভালো সময়ের দেখা নেই। সুখের সময় গুলো কোথায় যেনো পালিয়ে গেলো,, কেমন যেনো অধরার খাতায় নাম লেখালো তারা,,তাদের যেনো ছুতে চেয়েও ছোয়া যায়না। দ্বীপ একদৃষ্টিতে আই সি ইউ এর আওতায় থাকা একটা ক্যাবিনের দিকে তাকিয়ে আছে,,পারুকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। দ্বীপ জানেনা পারুর কি হয়েছে,, ডক্টর রাও এখনো শিউর নয় তবে তারা নাকি অনেক কিছুই আন্দাজ করতে পেরেছে। হসপিটালে আসার সময় পারু তীব্র ব্যাথায় রক্ত বমি করতে করতে জ্ঞান হাড়িয়েছিলো।
তারপর আর চোখ খোলেনি মেয়েটা,, কিছু সময় পর হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিলো, শ্বাস প্রশ্বাস ও বন্ধ,, দাতে দাতে খিলি লেগে গিয়েছিলো,, বুঝাই যাচ্ছিলো পারুর অক্সিজেনের ঘাটতি পরছে।দ্বীপ তখন কৌশলে অক্সিজেন না দিলে হয়তো ভালো মন্দ কিছু একটা হয়েই যেতো। দ্বীপের চোখ জোড়া লাল হয়ে আছে,, খুব কোদেছে ছেলেটা,, নাক মুখ টকটকে লাল রং ধারন করেছে,, কাদতে কাদতে ক্লান্ত প্রায় দ্বীপ থম মেরে পারুর ক্যাবিনের সামনে দাড়িয়ে আছে। কিছু মাস আগেও তারা এই হসপিটালে এসেছিলো,,, দুজনেই অসুস্থ ছিলো তখন,, তবে দ্বীপ পারুর তুলনায় একটু বেশি অসুস্থ ছিলো। কই তখন তো দ্বীপ পারুর ডাক কে অগ্রাহ্য করে শুয়ে থাকেনি? পারু ডাকার সাথে সাথে সে প্রচন্ড ব্যাথাকেও দূরে সরিয়ে উঠে বসেছিলো, পারুকে বক্ষপিঞ্জিরায় আকরে ধরেছিলো। তাহলে পারু কেনো তার সাথে বেইমানি করছে? দ্বীপ কতোবার করে ডাকলো ওকে,, মেয়েটা কেনো তার ডাকে সারা দেয়না?
কেনো একটুখানি কথা বলেনা? দ্বীপের বুকের বাম পাশটা তো ফাকা পরে আছে,, অনেক ফাকা ফাকা লাগছে,, পারু কেনো সেখানে ঝাপিয়ে পরে ফাকা স্থানটা ভরপুর করে দিচ্ছেনা? পারুটা কি বেইমান হয়ে গেলো? দ্বীপকে ভালো থাকার প্রলোভন দেখিয়ে ছেড়ে যাবে নাতো? দ্বীপ তো তার মাকে ছোট বেলায় হাড়িয়েছিলো, তখন তার বয়স কত হবে? ৭ কি ৮? ঐ বয়সেই মা তাকে একা করে আল্লাহ এর কাছে চলে গেলেন। দ্বীপ কতো কাদলো, মাকে যেতে মানা করলো,, চলে যাওয়ার পরেও কত শত বার ডাকলো যেনো ফিরে আসে। মা এলোনা, দ্বীপের কষ্ট ও লাঘোব হলো না। হয়তো মেঝো আম্মু তাকে কখনো মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি, তবুও মা তো মা ই হয়। মাকে হারানোর পর দ্বীপ যতোখানি কষ্ট পেয়েছিলো তাতো মেঝো আম্মুকে পেয়ে কিছুটা কমে গিয়েছিলো,কিন্তু পারুকে সে হাড়াবে কি করে? পারু হাড়িয়ে গেলে দ্বীপ বাচবেই বা কি করে? অতিরিক্ত টেনশনে পাগল পারা দ্বীপ,, ডক্টর রা যা আসঙ্কা করছে তা যদি সত্যি হয়,, তাহলে? আর ভাবতে পারলোনা দ্বীপ।
চোখ থেকে অজোর ধরায় কয়েক ফোটা অস্রু গড়ালো,, আল্লাহ কি তবে সহায় হবেন না? দ্বীপ কি আবারও সব হাড়িয়ে সর্বোহাড়া পথিকের মতো জীবন কাটাবে? এতো বড়ো জীবনটা একা একা বহন করা যে বড্ড কঠিন,, সে আর পারবেনা। পারুর কিছু হলে সে সেচ্ছায় জীবন ত্যাগ করবে,, যে জীবনে পারু নেই সেই জীবন রেখে কি লাভ? দ্বীপ যখন নীর হাড়া পাখির মতো ছটফট করতে করতে, গ্লাস করা ক্যাবিনের ফাক ফোকর দিয়ে পারুর ভঙ্গুর মুখশ্রী অবলোকন করতে ব্যাস্ত তখন ওর কাধে হাত রাখলো কেউ। পিছন ফিরে তাকালো না দ্বীপ , সে জানে পিছনে দাড়ানো লোকটা কে? কাধের উপরে থাকা হাতটা এক হাতে শক্ত করে ধরে পারুর ক্যাবিনের দরজায় অন্য হাত ভুলিয়ে ব্যাথিত স্বরে আওড়ালো — আব্বু!! সি ইজ মাই হার্ট, মাই লাইফ, এভরিথিং। হার্ট ছাড়া একটা মানুষ কখোনো বাচতে পারে? পারেনা আব্বু!! ডক্টর রা কেনো এসব আজে বাজে আশঙ্কা করছে? আম্মুর বেলায় ও ওরা এমনটাই করেছিলো, তারপর আম্মু আমাদের ফাকি দিয়ে চলে গেলো। ওদের নিষেধ করে দিন আব্বু, আমার পারুর কিছু হয়নি,, পারু ঠিক হয়ে যাবে। সবাই এভাবে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার প্লান সাজায় কেনো আব্বু? আমি কি খুব জঘন্য? পাপি? আমার পারু আমাকে খারাপ পুরুষ বলে ডাকতো,, কিন্তু ও তো আমার সকল খারাপ গুনকে মেনেই ভালোবেসেছিলো। তাহলে এখন কেনো ছেড়ে যেতে চায়? এভাবে আমার সর্বনাশ করবে বলেই কি সে এসেছিলো? এভাবে দ্বীপ মির্জার দীপ্তি ফুড়িয়ে দেওয়ার জন্যই কি এই অবাধ্য নারীর আগমন? আমার কিছুই ভালো লাগছেনা আব্বু, আমার বেলায় আপন জনরা এতো পাষান হয় কেনো? তাদের কি আমার জন্য মায়া হয়না? আমি কি এতোটাই খারাপ?
,,, দ্বীপের মতো মানুষের এরকম কাতরতা সহ্য করার নয়। মাহিদ মির্জা নিজ পুত্রকে কখনো এতোটা ভঙ্গুর হতে দেখেনি। দ্বীপের মা রাহিতা মির্জা যেদিন মারা গেলেন সেদিন ঠিক এতোটাই কাতর ছিলো দ্বীপ। তারপর কিভাবে কিভাবে যেনো ছেলেটা পাথরে পরিনত হয়েছিলো। কাতরতা, কষ্ট, কান্না সেসব যেনো দ্বীপকে ছুতেই পারতোনা। যেই ছেলেটা ঠান্ডা মাথায়, রিল্যাক্সে মানুষকে কঠিন থেকে কঠিন ভাবে জখম করতে পারে, তার হৃদয়ে এতো বড়ো যখম হবে,, কেউ কি কখনো কল্পনা করতে পেরেছিলো? ছেলেকে নিয়ে বড্ড আতঙ্কে আছেন মাহিদ মির্জা। দ্বীপ যখন ১৪ বছর বয়সে ছোট চাচাকে সেইভ করতে গিয়ে ৪ জনকে গুলিবিদ্ধ করে বাড়ি ফিরেছিলো সেদিনো এতোটা বুক কাপেনি মাহিদ মির্জার,, যতটা আজ কাপছে। ছেলের আহাজারি,, চোখ লাল করা কান্না, অসহায় হয়ে একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা, কাতর হয়ে বলা প্রতিটি বাক্য মাহিদ মির্জার মনটা বিষিয়ে দিচ্ছে। দ্বীপের মা ও ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলেন যেটা পারুর বেলায় ও ডক্টর রা আসঙ্কা করছেন। ডক্টরদের মতে এমনটা হওয়ার আসঙ্কা ৬৬% বাকিটা এম. আর. আই. এবং বাইয়োপ্সি রিপোর্ট আসলে বুঝা যাবে। আচ্ছা!! উনার ছেলের জীবনটা কি তবে উনার পথেই যাবে? উনি তো দ্বীপের মুখ দেখে একটা জীবন কাটিয়ে দিলেন,, দ্বীপ কার মুখ দেখে কাটাবে? তার তো সন্তান নেই আর না পারুর সাথে তার বিয়ে হয়েছে। আল্লাহ এবার অন্তত ছাড় দিক, ছেলেটা এতো বড়ো ধাক্কা নিতে পারবেনা। সকল ভাবনাকে সাইডে রেখে তিনি দ্বীপের হাতটা শক্ত করে ধরে কাধে হাত রেখে বললেন —
,,,চলো দ্বীপ, রিপোর্ট চলে এসেছে, ডক্টরদের সাথে মিটিং করাটা ইম্পর্ট্যান্ট। ডক্টরদের সব আশঙ্কা সত্যি হয়না আব্বু, আমার কথা শুনো, একটু শান্ত হও। চলো!!
,,দ্বীপ কথা বাড়ালো না, সে একবার পারুকে দেখে নিয়ে বাবার সাথে পা বাড়ালো। আল্লাহ এবার নিষ্ঠুর না হোন,,পারুর যেনো কিছু না হয়,, ও যেনো বেচে থাকে, ডক্টরদের আসঙ্কা যেনো ভুল প্রমানিত হয়। এমন হাজারটা দোয়া করতে করতে এগিয়ে গেলো ডক্টরের চেম্বারে।
,,,, নিউরোসার্জন আসফাক মোহাম্মদ এর চ্যাম্বারে বসে আছে দ্বীপ, বিহান আর মাহিদ মির্জা। আসফাক মোহাম্মদ ই সন্ধা রাতে পারুকে দেখেছিলেন। আপাতত উনার সাথে নিউরো অনকোলজিস্ট সোরাভ শামন্ত এবং রেডিওশন অনকোলোজিস্ট সুমন তাহের ও আছেন। এই তিন জন সম্মিলিত হয়েই দ্বীপদের ডেকে পাঠিয়েছেন, উদ্দেশ্য পারুর রোগ নিয়ে কথা বলা। এতো এতো ডক্টর দেখে মাহিদ মির্জার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না তাদের কাছে কেমন খবর আসতে চলেছে। কোনো এক কালে তিনিও তো একসাথে এমন অনেক ডক্টরের সরনাপন্ন হয়েছিলেন। দ্বীপ অসহায়ের মতো তাকিয়ে সবাইকে দেখছে, বুদ্ধি সম্পন্ন দ্বীপ এতোটাও অবুঝ নয় যে এতো কান্ডের মিনিং বুঝবেনা। তবুও সে না বুঝার মতো মুখ করে বসে রইলো,, যেনো সে বুঝতে না চাইলেই পারু সুস্থ হয়ে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে। পুরো ৩০ মিনিট যাবত রিপোর্ট নিয়ে ঘাটাঘাটি করার পর আসফাক মোহাম্মদ মুখ খুললেন,, তিনি সোজা মাহিদ মির্জার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন —
,,, মাহিদ!! মেয়েটা তোমার কে হয়?
,,, মাহিদ মির্জা সরাসরি বললেন –আমার ছেলের হবু বউ,, ইনশাআল্লাহ!! ভবিষ্যতে ওদের বিয়ে হবে।
,,, আসফাক মোহাম্মদ বোধয় বিষয়টা আগেই ধরতে পেরেছিলেন,, দ্বীপের আচরন দেখে একটা বাচ্চাও বলে দিতে পারবে মেয়েটা দ্বীপের বিশেষ কেউ। তাই তিনি এবার রয়ে সয়েই বললেন — দ্বীপ!! তুমি এর আগে পারমিতার মাঝে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ করেনি? কিংবা আগে মাথা ব্যাথা হয়নি? এই ক্ষেত্রে কিন্তু বার বার মাথা ব্যাথা হওয়াটা মেন্ডাট্যোরি। তাহলে এতোদিন তোমরা কিছুই আন্দাজ করতে পারোনি? এমনটা তো হওয়ার কথা নয়, অবশ্যই আগে থেকে সিমটোম ধরা দিয়েছে। তোমরা কি ওকে ভালো মতো খেয়াল করোনি? বিষয়টা আমাকে খুব হতাশ করছে, সত্যি।
,,,দ্বীপ হতবুদ্ধের ন্যায় চেয়ে রইলো, তার মুখ থেকে কথা বের হতে চাচ্ছেনা। যেনো কথা বলার মতো একটু বিন্দু পরিমান শক্তি ও কন্ঠনালীতে নেই। দ্বীপকে কিছু বলতে না দেখে বিহান বললো — আঙ্কেল!! আমরা পারুকে চিনি আজ সারে তিন মাস হবে,, ও এবার অনার্স ফাস্ট ইয়ার। এমনিতে কখনো ওর মাঝে তেমন কোনো সিমটোম লক্ষ করিনি। বাকিটা জোহান মানে দ্বীপ বলতে পারবে,,, ভাই!! আঙ্কেলকে বল কিছু জানলে।
,,, দ্বীপ মাথা নত করে বললো — ও মাঝে মধ্যেই খুব জেদ করতো, একদম বাচ্চাদের মতো। ভালো খারাপ মানতো না, হুটহাট কিছু চেয়ে বসতো আর ওটা করতেই হতো। না করলে হাইপার হয়ে যেতো,, এতোটাও না,, সামান্য পরিমান হাইপার হতো। আমি ভাবতাম,,পারু বোধয় স্বভাবতই এমন, তাই কখনো সন্দেহ হয়নি।( একটু থেমে) আঙ্কেল!! আমার পারুর কি হয়েছে? ও বাচবে তো?
,,, দ্বীপ কথাটুকুন বলে কেমন করে যেনো আসফাক মোহাম্মদের দিকে তাকালো,, ওর তাকানোতে কত শত অসহায়ত্ব লুকিয়ে রয়েছে তা বোধয় সে নিজেও জানেনা। আসফাক মোহাম্মদ একজন ডক্টর হলেও তিনি মানুষ, আবেগ উনারো কাজ করে। দ্বীপের মনের ভিতরে চলা ঝরটুকু হয়তো আনদাজ করতে পারছেন তিনি কিন্তু কিছু করার নেই। কারোর মন রক্ষার্থে চাপিয়ে রাখার মতো সত্যি এটা নয়। আসফাক মোহাম্মদ ইশারা করতেই ডক্টর শোরাব সামন্ত এম. আর. আই. রিপোর্ট টা ভিউ বক্সে রেখে কলমের সাহায্যে পারুর মাথার দিকটা ইশারা করে বললেন–
,,, এটা মিস পারমিতা হামিদের ব্রেইন, আর এর চারপাশে যেই ছোট ছোট বল আকৃতি চিন্হ গুলো দেখতে পাচ্ছেন সেগুলো হচ্ছে Glioblastoma Multiforme যাকে সংক্ষেপে আমরা (GBM) বলে আক্ষা দেই। এটি হলো মস্তিষ্কের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক এবং দ্রুত বাড়তে পারে এমন একটি টিউমার। এটি যখন খুব ছোট ছিলো মানে মাত্র জন্ম নিয়েছিলো তখন হয়তো মিস পারমিতার মাঝে তেমন কোনো অস্বস্তি ধরা দেয়নি কিন্তু এটি যখন ধীরে ধীরে আকার বৃদ্ধি করলো তারপর এর শাখা প্রশাখা পুরো ব্রেইনে ছড়িয়ে দিলো, তখন তো পারমিতার শরীরে অবশ্যই পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সেটা কেউ লক্ষ করেনি, হয়তো করেছে তবে সিরিয়াসলি নেয়নি। এখন আপনারা যেহেতু উনাকে মাত্র তিনমাস যাবত চিনেন সেহেতু আপনাদের কাছে এটা ধরা না পরাটা স্বাভাবিক। তবে পারমিতার পরিবারের তো বিষয়টা লক্ষ্য করা উচিৎ ছিলো। আগে থেকে চিকিৎসা করলে হয়তো ব্যাপারটা এতোদূর গড়াতো না। উনার পরিবারের বেখেয়ালি আচরন নিয়ে আমি বড্ড আপসেট।
,,,দীর্ঘ বক্তব্য শেষ করে দম নিলেন শোরাভ সামন্ত,, উনার কথার প্রেক্ষিতে কারোর মুখে কথা নেই। দ্বীপের লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটোর চার পাশ থেকে জল জমতে শুরু করেছে একটা সময় ওর চোখ জোড়া নোনা পানিতে ভরপুর হলো। মাহিদ মির্জা অস্থির চিত্তে আসফাক মোহাম্মদ এর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন —
,,, ওর এখন কোন স্টেজ চলছে? সার্জারী করলে কতোদিন বা,,
,,, কথাটা শেষ করতে পারলোনা মাহিদ মির্জা, তার আগেই দ্বীপের চোখ জোড়া থেকে টুপ করে এক ফোটা পানি পরলো। বিহান সেটা লক্ষ করে মাহিদ মির্জার হাত ধরে অস্ফুট স্বরে ডাকলো — বড়ো আব্বু!!
,,, থেমে গেলেন মাহিদ মির্জা তবে উনার করা প্রশ্ন টুকুন ডক্টররা বুঝলো। অগত্যা ডক্টর সুমন তাহের বললেন— প্রথমেই বলবো, দ্বীপ!! আপনি একজন ম্যাচিউর্ড পারশন , নিজেকে শক্ত করুন। এই মুহুর্তে আপনার শক্ত থাকাটা জরুরি,, মিস পারমিতা হামিদ লাস্ট স্টেজে ব্রেইন ক্যান্সারে আক্রান্ত। এটা তিনি বহুদিন ধরে বহন করে যাচ্ছেন,, কম করে হলেও ৪ থেকে ৫ বছর যাবত ব্রেইনে এই রোগটা পোষছেন তিনি। এই মুহুর্তে উনার ব্রেইনের এমন কোনো পাশ নেই যেখানে Glioblastoma Multiforme এর শাখা ছড়িয়ে নেই। এর মধ্যে কিছু কিছু টিউমার ফেটে গিয়ে পচন ধরে গিয়েছে। এমতাবস্থায় সার্জারী করা মানে উনার অবশিষ্ট হায়াত টুকুন নিজ হাতে নষ্ট করা। আমরা চাইনা এমনটা হোক তবুও বলতে হচ্ছে উনি কম বেশি,, ধরুন আনুমানিক আড়াই বা তিন মাস আমাদের মাঝে থাকবেন। সময় এদিক সেদিক ও হতে পারে সবটা আল্লাহ এর হাতে আর উসিলা হিসেবে আমরা তো আছি ই।
আপাতত উনাকে রেডিয়েশন থ্যারাপি দিতে হবে,, অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে কেমো থ্যারাপি আর সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট যেটা, সেটা হলো প্যালিয়োটিভ কেয়ার। যেটাকে আমরা সহজ ভাষায় বলি রুগির মন রক্ষায় নিয়োজিত শেবা। আজকে থেকে রুগিকে সকল পরিমান দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখতে হবে,, ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করানো,, মন ভালো রাখা,, উনার পরিবারকে ডেকে পাঠান। তাদের সাথে সময় কাটালে উনার ভালো লাগবে,, এক কথায় উনার জীবনের শেষ দিনগুলো কিভাবে সুন্দর করা যায় সেই ব্যাবস্থা করুন। উনার ছোট ছোট ইচ্ছা কিংবা বড়ো কোনো শখ থাকলে তা পুরুন করুন। উনার সামনে কান্নাকাটি নট এলাউয়েড,, আপনারা কাদলে মিস পারমিতার ব্রেইনে চাপ পরবে তখন বিপদ আরও বাড়বে। তাই সাবধান , উনাকে কোনোভাবেই নিজের রোগ সম্পর্কে জানতে দেওয়া যাবেনা। তাহলে উনি ভয়,,
,,,কথাগুলো বলতে বলতে ডক্টর সুমন তাহের যখন দ্বীপের দিকে তাকালেন হুট করেই উনার জবান বন্ধ হয়ে গেলো,, টেবিলের উপরে রাখা দ্বীপের হাতটা কেমন থর থর করে কাপছে,, দ্বীপের নজর এমআর আই রিপোর্টের দিকে স্থির, চোখের পলক পরছেনা। এক পর্যায়ে খেয়াল করলেন দ্বীপের বুকের উঠানামা কমে আসছে,, মুখের রং বদলে যাচ্ছে,, কোলে ঘাম জমছে , এই মুহুর্তে ওকে একদম পাথরের মুর্তির মতো দেখাচ্ছে। সুমন তাহের কথা বাদ দিয়ে তারাহুরো করে নার্সদের ডাকতে ডাকতে বললেন —
,,, ওয়ার্ড বয়!! ওয়ার্ড বয়!! কুইকলি স্ট্রেচার আনুন, দ্বীপ মির্জাকে এখোনি এডমিট করাতে হবে হয়তো। বিহান!! দ্বীপের বুকে মাসাজ করুন, আই গেইজ উনি স্ট্রোক করে বসবেন,, কুইক!! ওয়ার্ড বয়!! ওয়ার্ড বয়!!
,,,এতোক্ষণ ডক্টরের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো সবাই হঠাৎ দ্বীপের সম্পর্কে এমন কথা শুনে সবাই দ্বীপের দিকে তাকালো। বিহান তারাহুরো করে দ্বীপের বাহু টেনে কিছু বলতে নিবে তার আগেই বিহানের দিকে হেলে পরলো দ্বীপ। হকচকিয়ে উঠলো সবাই, বিহান দ্বীপের বুকে ঘষতে ঘষতে কন্দরত কন্ঠে ডাকলো — ভাই!! এই ভাই!! জোহান!! কি হলো তর? এই জোহান !! কি পাগলামি শুরু করলি? পারুর কিছু হবেনা, ডক্টর যা বলেছে সব ভুল। আমরা ওকে অনেক ভালো হসপিটালে নিয়ে যাবো, দরকার পরলে লনডন নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করবো তাও তুই ভেঙে পরিস না। ভাই!! জোহান!!
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৭
,,, ডক্টর রা ছুটে এসে দ্বীপকে প্রথমিক ভাবে স্টেবল করার ট্রাই করছেন। মাহিদ মির্জা কি করবে ভেবে পাচ্ছেন না, একবার ছেলেকে দেখছে আরেকবার ডক্টরদের। অতি শোকে বোধহয় মানুষের এরুপ হাল ই হয়। সেকেন্ডের গতিতে স্ট্রেচার নিয়ে হাজির হলো ওয়ার্ড বয়রা, দ্বীপকে দ্রুততার সাথে শুয়ানো হলো তাতে। দ্বীপের বলিষ্ঠ শরীর টা তুলতে বেশ কষরত করতে হয়েছে ওয়ার্ড বয়দের । দ্বীপকে তারাহুরো করে নিয়ে যাওয়া হলো, হয়তো এখন চিকিৎসা চলবে। সেসব নিয়ে ভাবতে পারলেন না মাহিদ মির্জা। তিনি এতো বড়ো ছেলের এই করুন হাল দেখতে পারবেন না। সবাই যেতেই মেঝেতে ধপ করে বসে পরলেন মাহিদ মির্জা,, অস্ফুটে স্বরে আওড়ালেন — এতোটা নিষ্ঠুর না হলেও পারতেন আল্লাহ !! আমার ছেলেটাকে আর কষ্ট দিবেন না, একটা ম্যাজিক করুন আর সেই ম্যাজিকে পারুকে সুস্থ করে দিন। নয়তো এইবারে আমার ছেলেটা শেষ হয়ে যাবে সাথে আমিও। ছেলেটা বাধে আমার তো কেউ নেই,,
