৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৭
রুপান্জলি
২৫/০৫/২০১৯
,,, সন্ধার আকাশে সূর্য বিলিন হয়েছে বহুক্ষণ আগেই,, ধরনীতে আধার নেমেছে,, রোডের কোনায় কোনায় স্ট্রিট লাইট জ্বলেছে,,পাখিরা নীল আকাশ ত্যাগ করে নীরে ফিরেছে,,শুধু বাড়ি ফিরার তাগিদা নেই দু জোড়া কপত কপতির। ঢাকার মোস্ট ফেমাস পার্ক, রমনা পার্কে থাকা দুটো বসার জায়গা দখল করে বসে আছে তারা। একটাতে বিহান আর মেধা, তারা কি নিয়ে যেনো খুনসুটিতে মেতেছে। অন্যটিতে দ্বীপ আর পারু,, দ্বীপ ফোনে কি যেনো একটা কাজ করছে, হয়তো ব্যাবসায়িক কোনো বিষয় হেন্ডেল করতে ব্যাস্ত। দ্বীপের কাধে মাথা রেখে বসে আছে পারমিতা। তার মনটা খুব ভার,,ইদানিং পারুকে খুব মন মরা দেখা যায়, যেনো বুকের ভিতর অজানা কোনো কষ্ট কিংবা ভয় লুকিয়ে রেখেছে। বিষয়টা দ্বীপ সাত আট দিন ধরেই খেয়াল করছে,, বহুবার জানতেও চেয়েছে কিন্তু মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলেই সে সুনিপুণ ভাবে কথা কাটিয়ে অন্য কথায় চলে যায়। পারুর বাহানা গুলো এতোদিন মেনে নিলেও আজ মেনে নিতে পারছেনা দ্বীপ। সকাল থেকে মেয়েটার মন অন্যদিনের তুলনায় বেশি খারাপ। চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে অনেকটা সময় ধরে কেদেছে। দ্বীপ এদিক ওদিক তাকিয়ে পার্কটার অবস্থান বুঝে নিলো। এখন অনেকটাই আধার নেমে এসেছে,, তাই আপাতত পার্কে তেমন কেউ নেই। দ্বীপ মোবাইলটা পকেটে রেখে পারুর একটা হাত টেনে নিজের হাতের ভাজে নিলো,, পারু এতোক্ষণ অন্য মনোষ্ক হয়ে গাছ পালা দেখছিলো,,হঠাৎ হাতে টান পরতেই চমকে দ্বীপের দিকে তাকালো। দ্বীপ হাত উচিয়ে পারুর সামনে আসা চুল গুলো কানের পিঠে গুজে দিয়ে আদুরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো — কি হয়েছে বেবি? তোমার মন খারাপ কেনো?
,,, বিনিময়ে পারু হেসে কথা কাটাতে চেয়ে বললো — কই মন খারাপ? আমি তো মন দিয়ে পরিবেশ দেখছিলাম। বলো কি বলবে?
,,, ওহুম!! আজ নয়, অনেক দিন যাবত দেখছি তুমি বরাবরি মন খারাপ করে থাকো, মুখ জুড়ে কেমন উদাস উদাস ভাব। বলোনা বেবি, কি হয়েছে তোমার?
,,, দ্বীপের বলা এতো সুন্দর এবং কোমল কন্ঠ ও পারুর মন গলাতে পারেনি, সে ফের কথা কাটাতে বললো — বললাম তো বেবি, আমি ঠিক আছি।
,,,বার বার কথা কাটানোতে রাগ হলো দ্বীপের। সে সাথে সাথে নিজের নরম খোলস বদলে রাগি কন্ঠে বললো — নাটক মারাও? তর নাটক দেখতে বসে আছি আমি? সাত আট দিন ধরে দেখছি তর মন খারাপ। কিছু জিজ্ঞেস করলেই কথা ঘুরাস, এই তর ব্যাপার কি? আমাকে তর ছাগল মনে হয়? চুপ চাপ বল কি হয়েছে, নয়তো আমাকে ভালো করেই চিনিস পারু , আমি কিন্তু ভালো মানুষ না।
,,, দ্বীপের ধমকে কেপে উঠলো পারু, হুট করেই ঠোট চেপে কেদে দিলো। তার নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে। সে ভাবতেই পারেনি তার সাথে এমন কিছু হবে। পারুকে কাদতে দেখে রাগ হলো দ্বীপের, রাগি কন্ঠে কিছু বলতে নিয়েও বললো না। মেয়েটাকে রাগ দেখালে আরও ভয় পাবে,, মন খুলে কিছুই বলতে পারবেনা। সহসা পারুর মাথায় হাত রাখলো দ্বীপ, চুলের ভাজে হাত চালিয়ে বললো —
,,, বেবি!! আমাকে বলো কি হয়েছে? না বললে সমাধান করবো কি করে?
,,পারু কান্না আটকাতে চেয়ে থেমে থেমে বললো — তেমন কিছু না বেবি, এতো চিন্তা করোনা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
,,,দ্বীপ বুঝলো কিছু তো একটা হয়েছেই,,এবার কি হয়েছে সেটা জানতে হবে। অগত্যা ধীরোস্থির ভাবে প্রশ্ন করলো — কেমন কিছু? কি হয়েছে, বলো আমায়।
,,,, এটা খুব সেনসিটিভ একটা ইস্যু বেবি, আমি তোমাকে বলতে পারবোনা।
,,, রাগ বাড়লো দ্বীপের, সে হালকা ধমকের স্বরে বললো — কি এমন ব্যাপার যা আমায় বলা যায়না? পারু!!
,,, পারু ঠোট কামরে কান্না আটকাতে চেয়েও পারছেনা। এরকম একটা কথা সে কিভাবে বলতে পারে? দ্বীপ নিশ্চই ওকে ভুল বুঝবে, অবিশ্বাস করে ছেড়ে যাবে। কিন্তু সত্যি তো কখনো চাপা থাকেনা। আজ না বললেও একদিন না একদিন তো বলতেই হবে। পারু দ্বীপের হাতার কাছের শার্ট খামচে ধরে চোখ খিচে এক নিশ্বাসে বললো— আমার মনে হচ্ছে আমি প্রেগন্যান্ট!!
,,, পারুর কথাটা যেনো বর্ষার আকাশে বাজ পরার চেয়ে তিখ্ন ছিলো,, দ্বীপ নিজেকে সামলাতে না পেরে বোকার মতো মুখ করে তাকিয়ে রইলো,, পরপর নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে অবাক কন্ঠে বললো — হোয়াট? কি বলছো এসব? আমাদের মাঝে তো তেমন কিছুই হয়নি পারু, আমি তো তোমাকে কখনো সেভাবে,,
,,, পারু দুহাতে মুখ চেপে ঝরঝর করে কেদে দিলো,, ওর কান্নার শব্দে বিহান আর মেধা এগিয়ে আসতে চাইলে দ্বীপ তাদের ইশারায় চলে যেতে বললো। দ্বীপ এখনো অবাকতা কাটাতে পারছেনা। এখনো তাদের মাঝে জাস্ট জড়িয়ে ধরা আর কিস করা ব্যাতিত কিছুই হয়নি তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব? দ্বীপ পারুর মুখ থেকে হাত সরাতে নিতেই পারু সেটা স্থির রেখে বললো — আমি জানিনা বেবি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি প্রেগন্যান্ট। প্রেগ্ন্যাসির সকল বৈশিষ্ট্য আমার মাঝে লক্ষ করছি আমি। কিছু খেতে পারিনা, দিনে ছয় থেকে সাতবার বমি হয়,, মাছ, মাংসের ঘ্রাণ নিতে পারিনা, সারাক্ষণ প্রেসার আপ ডাউন করে,, তেতুল খেলে ভাললাগে। সেই সাথে,,
,,,সেই সাথে? ( ভ্রু উচিয়ে)
,,, তিন মাস ধরে অফ যাচ্ছে।
,,,বলতে বলতে আবারো ফুপিয়ে উঠলো পারু,,দ্বীপের মন অন্য কথা বলছে,, এসব ভালো লক্ষন নয়। ম্যাক্সিমাম টাইকে জরায়ুতে টিউমার হলে প্রাগন্যান্সি কীটে দুটো দাগ উঠে কিন্তু সেই ক্ষেত্রে এতোটাও সিমটোম দেখা দেয়না। তাহলে পারুর এরকম হওয়ার কারন কি? পারু কি কোনো ভাবে কারোর ধারা? না না!! তা কি করে হয়? এরকম হলে তো দ্বীপ জানতো, সে তো পারুর সম্পর্কে সকল ডিটেইলস জেনেছে। সেই ছোট বয়স থেকে আদো পর্যন্ত ওর কি হয়েছে, কখন হয়েছে, সবটা দ্বীপের জানা। তাহলে বেবির কথা কেনো আসছে? আর ভাবতে পারলোনা দ্বীপ,, আপাতত পারুকে শান্ত করতে হবে। দ্বীপ পারুর মাথায় হাত ভুলিয়ে শান্ত করতে বললো — আমার বোকা পারু, এমনি এমনি বেবি হয়না। তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছো।
,,,পারু দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — ট্রাস্ট মি, আমি ভুল বলছিনা। সন্দেহ বসত সকালে প্রেগ্নেন্সি কীট ইউজ করেছিলাম,, পজেটিভ এসেছে।
,,,পারুর কথায় অবাক চোখে তাকালো দ্বীপ,, আজ যেনো তার অবাকতা শেষ হওয়ার নয়। তাহলে কি সত্যি ই পারুর জড়ায়ুতে টিউমার হয়েছে? ভাবতে গিয়েও দ্বীপের কলিজা মোচর দিয়ে উঠছে,, এরকম কিছু হলে তো সার্জারী করতে হবে আর তারপর পারু কোনোদিন মা হতো পারবেনা। বাচ্চার কথাটা নাহয় সাইডে রাখা যাক কিন্তু পারু এতো বড়ো সার্জারী সামলাতে পারবেতো? ওফ!! কিসব ভাবছে সে? পারুর কিছু হবেনা। আল্লাহ সব ঠিক রাখবেন। কিন্তু সবার আগে তাদের ডক্টরের স্বরনাপন্ন হতে হবে। সেটা ভেবেই দ্বীপ উঠে দাড়িয়ে পারুর হাত টেনে বললো– এসব কিছু না পারু,,, এভাবে শুধু শুধু বেবি হয়না। এগুলো অন্য রোগের সিমটোম,, আমার খুব ভয় লাগছে বেবি, চলো আমরা এখোনি ডক্টরের কাছে যাবো।
,,, দ্বীপের কথায় না চাইতেও রেগে গেলো পারু,, তার কথার বিপরীতে দ্বীপের কথা বলাটা বোধয় পারুর পছন্দ হয়নি। সে জেদ নিয়ে বললো — আমি বল্লাম না, আমি শিউর আমার বেবি হবে?
,,, অধৈর্য দ্বীপ আরও অধৈর্য হলো,, এসব নিয়ে খামখেয়ালি করছে এই মেয়ে? এদিকে চিন্তায় তার মাথা ফেটে যাচ্ছে আর এই মেয়ে কিনা আজাইরা বকবক করে যাচ্ছে? দ্বীপ পারুর বাহু চেপে ধমকে বললো — এভাবে বেবি হয়নারে বাপ, এর জন্য বিয়ে করতে হয়, সংসার করতে হয়। তুই কিছু বুঝিস না? বাচ্চা তুই? চল এখোনি ডক্টর যাবো।
,,,হাত ধরে টেনে নিতে চাইলে পারু ওর হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের চুল খামচে ধরলো, তার মাথায় ব্যাথা হচ্ছে। সে চুল টেনে ফাপরের ন্যায় শ্বাস টেনে বললো —
,,, বল্লাম না আমার বেবি হবে? মানছেন না কেনো আপনি? বল্লাম তো আমি মা হবো, বেবি হবে আমার।
,,, পারুর অবস্থা দেখে দ্বীপ ঠোঁট কামরে ভাবুক হলো,, এই মুহুর্তে পারুর বিরুদ্ধে যাওয়াটা ভালো হবেনা। একটা মাস ধরে দ্বীপ খেয়াল করছে মেয়েটা মাঝেমধ্যেই অস্বাভাবিক জেদ করে। ওর মন মতো কিছু না হলেই কেমন যেনো করতে থাকে,এতোদিন এগুলোকে বাচ্চামি মনে হলেও এখন কেমন যেনো দ্বীপের বুক কাপছে। পারুর কোনো বড়ো সরো অসুখ হলো নাতো? যদি হয় তখন তার কি হবে? সে কিভাবে বাচবে? না না!! আল্লাহ এতো বড়ো নিষ্ঠুর হবেন না। দ্বীপ আপাতত পারুকে শান্ত রাখতে ওর কথায় শায় জানাতে চেয়ে ওকে কাছে টেনে নিলো, চুল থেকে পারুর হাত দুটো সরিয়ে মাথায় হালকা মাসাজ করে দিতে দিতে বললো —
,, আচ্ছা!! ঠিক আছে, বুঝলাম তোমার বেবি হবে। আমি মানলাম সেটা। এখন,, বেবি হলে এতো চিন্তার কি আছে? আমি আছিনা? আমি সবটা সামলে নিবো।
,,, পারু ভাবলো দ্বীপ বোধয় পারুকে এভোর্সন করতে বলবে, সাথে সাথে হাইপার হয়ে উঠলো মেয়েটা। দ্বীপের থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলো,, সন্তর্পনে তল পেটে হাত রেখে ঘনঘন শ্বাস টেনে বললো — ম মা ,মানে? মানে কি করবে তুমি?
,,, দ্বীপ হাত বাড়িয়ে পারুকে আবার আগের চেয়েও বেশি কাছে টেনে চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো — কি করবো আবার? বিয়ে করে নিবো।
,,, দ্বীপের কথায় কিছুটা শান্ত হলো পারু, অত্তন্ত অসহায় কন্ঠে বললো — কিন্তু, তোমার-আমার মাঝে তো তেমন কিছুই হয়নি। এমনকি অন্য কেউ ও আমাকে,,
,,, বলতে গিয়ে থেমে গেলো পারু, দ্বীপ আশ্বাস দিয়ে বললো — আই নো পারু!! আমার পারুকে কেউ ছোয়নি, আমি ছাড়া কেউ ছুতেও পারবেনা। যদি বাচ্চা আসেও তাহলে সেটা আমার পারুর বাচ্চা!! একান্ত পারুর। যেখানে পারু পুরোটাই আমার, সেখানে পারুর বাচ্চাটা অন্যের হতে যাবে কেনো? শান্ত হও বেবি, শান্ত মাথায় আমার কথা শুনো। একদম রিল্যাক্স, কোনো টেনশন নেই, আমার চোখের দিকে তাকাও।
,,,পারু গভীর শ্বাস টেনে দ্বীপের চোখের দিকে তাকালো, দ্বীপ পকেট থেকে রুমাল বের করে পারুর সম্পূর্ণ মুখটা ভালো মতো মুছে দিয়ে বললো — বাচ্চা যদি সত্যি ই আসে? তাহলে সেটার জন্য আমাদের ডক্টর দেখানো উচিৎ। বেবি কেমন আছে সেটাও দেখা উচিৎ,, সাথে তোমার হেল্থ চেক করাটাও দরকার। চলো বেবি, আমরা এখনি আমাদের বাচ্চা টাকে দেখে আসি। প্লিজ!! ( কাতর কন্ঠে)
,,, পারু দ্রুত মাথা ঝাকিয়ে না করে বললো — না না যাবোনা। ডক্টর যদি জানতে চায় আমার হাসবেন্ড কে?আমি কি করবো দ্বীপ? আমি তো অবিবাহিত, তখন আমাকে ডক্টর খারাপ ভাববে না?
,,, দ্বীপের মেজাজ খারাপ হলো। পারুটা কি সত্যি এতো অবুজ নাকি ওর বুঝতে প্রবলেম হচ্ছে? এভাবে বাচ্চা হয়? নিশ্চয়ই পারুর কোনো রোগ হয়েছে। দ্বীপের নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে, সে ঠোট কামরে নিজের বুকের ভিতর চলা ভয় যুক্ত তান্ডব টুকু দমাতে চেয়ে পারুর গাল আকরে ধরে কাতর কন্ঠে বললো —- আচ্ছা!! চলো তাহলে এই মুহুর্তে বিয়ে করে নেই, তাহলে তোমার আর কোনো সংশয় থাকবেনা। প্লিজ পারু, তর পায়ে ধরি বাহানা করিস না। চল আমরা হসপিটালে যাবো, এখোনি।
,,, পারু জেদ দেখিয়ে দ্বীপের হাতটা গাল থেকে ছাড়িয়ে দিলো,,তার কেনো যেনো দ্বীপের কথা গুলো পছন্দ হচ্ছেনা। মাথায় চাপ পরছে, সে দুপা পিছিয়ে ঝাজালো স্বরে বললো— খালি বিয়ে বিয়ে করেন কেনো আপনি? আমাকে ভো*গ করতে মন চায়? আপনাকে ভালো ভেবেছিলাম আর আপনি? ছি ছি!! দূরে সরুন, আমার ভালো লাগছেনা।
,,, পারুর ব্যাবহারের আগা মাথা বুঝতে পারছেনা দ্বীপ, তার মাথাও কাজ করছে না। সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে, পারু এসব ইচ্ছা করে বলছেনা। কি হয়েছে পারুর? এসব কেনো বললো? সেসব ভাবনা মাথায় আনতে চাইলোনা দ্বীপ, সে তাদের মধ্যকার দূরত্ব মিটিয়ে পারুকে বুকে সাথে মিশিয়ে ভেজা কন্ঠে বললো — পারু!! তুমি বুঝতে পারছোনা, আমাদের ইমিডিয়েট ডক্টরের স্বরনাপন্য হওয়া উচিৎ। তোমার শরীরে যেসব সিমটোম দেখা দিচ্ছে সেসব ভালো লক্ষন নয়। আমার সোনা, একটু বুঝো। প্লিজ!! আমার ভয় করছে, জান। একটু বুঝ আমাকে, তুই ছাড়া আমি শেষ পারু।
,,,পারু জোর খাটিয়ে দ্বীপকে নিজের থেকে সরাতে চেয়ে বললো — আমাকে ছাড়ুন, অস্বস্তি হচ্ছে। আমি বুঝে গেছি আপনি আমার বাচ্চাকে এভোর্ট করতে চাচ্ছেন। আপনি আমার বাচ্চাকে পৃথিবীতে আসতে দিবেন না। দূরে সরুন, দূরে সরুন। ওহ আল্লাহ!! আল্লাহ গো! ”
,,বলতে বলতে মাথার চুল টেনে ধরলো পারু, তার মাথা ব্যাথা করছে। এ পর্যায়ে এসে পারু অনুভব করলো প্রতিবারের তুলনায় এখন অনেকটা ব্যাথা বাড়ছে, পারু সহ্য করতে না পেরে চুল খামচে ধরে আর্তনাদ করে মাটিতে বসে পরলো। পারুর কান্ডে হকচকিয়ে গেলো দ্বীপ,, দূর থেকে পারুর আর্তনাদ শুনে দৌড়ে এলো বিহান- মেধা। দ্বীপ তারাহুরো করে পারুর পাশে মাটিতে বসে পরলো। পাগলের মতো পারুর মাথা ঘষতে ঘষতে বললো — কি হয়েছে বেবি,, ও পারু, তর কি হয়েছে? এমন করছিস কেনো? বলনা পারু,, কোথায় কষ্ট হচ্ছে? আমি আসবোনা, কাছে আসবোনা। আমি মানলাম তর বাচ্চা হবে, সব মানলাম,, বিশ্বাস কর!! আমি তর বাচ্চার কোনো ক্ষতি করবোনা। বলনা পারু, কি হয়েছে, মাথা ব্যাথা করছে? মাথায় কষ্ট হচ্ছে? পারুরে,, পারু!!
,,,, পারু সেসব কথা কানে তুললোনা, সে পাগলের মতো চুল টানছে আর মাথা ঘসছে,, দ্বীপ তার দিকে হাত বাড়ালে সেটা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। পারুর সব বিরক্ত লাগছে,, মনে হচ্ছে তার মাথায় কেউ হাতুরি দিয়ে আঘাত করছে,, ফেটে যাচ্ছে মাথাটা। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পারু উন্মাদের মতো বলতে থাকলো — ব্যাথার ঔষধ, আমাকে একটা ব্যাথার ঔষধ আর ঘুমের ঔষধ দাও, প্লিজ!! মরে যাবো আমি, ব্যাথায় মরে যাবো। আল্লাহ গো, আজ এতো ব্যাথা করছে কেন? আমাকে কেউ একটা ঘুমের ঔষধ আর ব্যাথার ঔষধ দে, প্লিজ!! আল্লাহ!! ওহ আল্লাহ !!
,,,মেধা দৌড়ে এসে পারুকে ধরতে নিলে পারু ওকেও নিজের থেকো দূরে সরিয়ে দিলো। দ্বীপ আবারও এগিয়ে গিয়ে পারুকে শক্ত করে নিজের বুকে চেপে ধরে বললো — কিসের ব্যাথার ঔষধ? তুমি আগেও ব্যাথার ঔষধ খেয়েছো? ঘুমের ঔষধ খেয়েছো? নাম কি ঐগুলার। একটু বলো পারু, ঐগুলা খেলে তুমি ঠিক হয়ে যাবে? বলোনা পারু।
,,, পারমিতা আবারও ধাক্কা দিয়ে দ্বীপকে দূরে সরিয়ে দিলো, তার এখন সব অসহ্য লাগছে, সব। দ্বীপ এগুতে চেয়েও পারছেনা, সে এগুলে পারু আরও হাইপার হয়ে যাচ্ছে, দ্বীপ নিজেকে সামলাতে না পেরে মাটিতে পা ছেড়ে বসে পরলো। আল্লাহ এ কি দিন দেখাচ্ছে তাকে? দ্বীপকে এভাবে বসে পরতে দেখে বিহান এগিয়ে এসে ওর পাশে বসতেই দ্বীপ পারুর দিকে তাকিয়ে বিহানের কাছে নালিশ করার মতো করে বললো — ওর কি হয়েছে বিহান? আমার সাথে এমন করছে কেনো? আমাকে সহ্য করতে পারছেনা। তুই ওকে বলনা ঔষধের নাম বলতে, আমার ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে। আমার পারু এমন করে কেন? আমার পারুর কি হয়েছে ভাই? ওকে ঠিক হয়ে যেতে বল। ঔষধের নাম বলতে ব,,
,,,দ্বীপ কথাটা শেষ করার আগেই পারু গনবিদারক চিৎকার দিয়ে উঠলো। ব্যাথায় চোখ মুখ লাল ছাড়িয়ে নীল হয়ে গিয়েছে। পারু পাগলের মতো মাথায় আঘাত করছে আর আল্লাহ আল্লাহ করে চিৎকার করছে। পারুর অবস্থা দেখে দ্বীপ ও শব্দ করে কেদে দিলো। এই মেয়েটাকে ভালোবেসে তার অবস্থা পথের পাগলের চেয়েও খারাপ। একটা মাস আগেও এই মেয়ের জন্য সে মরতে বসেছিলো, আর আজ আবার নতুন কাহিনী শুরু করে দিয়েছে। এবার সে মরবে, সত্যি ই মরবে, আল্লাহ না নিলে নিজে নিজেই চলে যাবে। এই মেয়ের কাহিনি আর ভালো লাগছেনা তার। পারুর অবস্থা দেখে মেধাও ফুপিয়ে উঠলো। কি হয়েছে মেয়েটার? একটু আগেও তো ঠিক ছিলো, এভাবে পাগলামি করছে কেনো? সবার কান্নাকাটি আহাজারিতে বিহানের নিজেকে পাগল মনে হচ্ছে। একটু আগের সেই সুন্দর পরিবেশ টা কোথায় হাড়িয়ে গেলো? কতোটা ভালোবাসাময় ছিলো সময়টুকু। বিহান নিজেকে সামলে দ্বীপকে উদ্দেশ্য করে বললো —
,,,ভাই!! নিজেকে সামলা, পারুর অবস্থা করুন। ওকে এখোনি হসপিটালে নিতে হবে, তুই ওকে নিয়ে পার্ক থেকে বের হো আমি গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছি।
,,,বলতে বলতে দৌড়ে গেইটে দিকে চলে গেলো বিহান,, দ্বীপ শার্টের হাতায় চোখ মুছে তারাহুরো করে পারুকে পাজা কোলে করে নিলো। এবার আর ওকে সরাতে পারলোনা মেয়েটা, ব্যাথায় চুল খামচে মাথায় আঘাত করেই কুল পাচ্ছেনা দ্বীপকে সরাবে কোন শক্তিতে? পারুর আহাজারি, অস্থিরতা দ্বীপের ভিতরটা ভেঙে চুরে খাক করে দিচ্ছে। ওর কান্নার দমক এতোটাই প্রখর ছিলো যে আশ পাশ থেকে লোকজন জমতে শুরু করেছে,, একেক জনের একেকটা প্রশ্ন। লোকেদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে মেধা হাপিয়ে উঠছে। দ্বীপ সেসব এরিয়ে দ্রুততার সাথে পার্কের ইট দ্বারা তৈরি রাস্তা পোরোতে লাগলো। রমনা পার্ক টা এমনিতেই আয়তনে বিশাল,, তার উপর পারশোনাল স্পেসের জন্য তারা অনেকটাই ভিতরে চলে গিয়েছিলো। যার ফলে পথ যেনো ফুরাতেই চাচ্ছেনা। এই পর্যায়ে এসে পারু বোধয় দ্বীপকে একটু বুঝতে চাইলো,, সে এক হাতে চুল খামচে ধরে অন্য হাতে দ্বীপের গালে হাত রেখে সেখানে চাপর মেরে আস্ফুটে স্বরে জানতে চাইলো —
,,,আমি কি মরে যাবো বেবি? আমার সংসার হবেনা? তোমার সাথে একটা সংসার হবেনা? মরে যাবো? আমার মাথাটা ছিড়ে যাচ্ছে,, খুব কষ্ট হচ্ছে,, গলাটা শুকিয়ে কাঠ,, আমায় একটু পানি দাওনা,,একটা ঘুমের ঔষধ অন্তত দাও,, নয়তো আমাকে অজ্ঞান করে দাও,,আমি আর সহ্য করতে পারছিনা। আমি মরে যাচ্ছি দ্বীপ,, আধারে ডুবে যাচ্ছি, তোমার আলোয় আলোকিত করে দাওনা। দ্বীপ, দ্বীপ!!! আল্লাহ!!
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৬
,,, পারুর আর্তনাদে দ্বীপ আবারও শব্দ করে কেদে দিলো, ওকে আরও শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরলো যেনো, এখোনি ওকে বুকের ভিতর লুকিয়ে সকল কষ্ট থেকে মুক্তি দিবে। কিন্তু কাজ হলোনা, মেয়েটা একটু ও শান্তি পেলোনা। দ্বীপ আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললো — আল্লাহ!! রহম করেন, আমার পারুর কষ্ট কমিয়ে দেন প্লিজ!! প্লিজ আল্লাহ!! পারুরে,, আমি বাচবোনারে। তকে ছাড়া সত্যি ই মরবো আমি,, আমার এতো বড়ো সর্বনাশ করিসনা। মরে যাবো, আল্লাহ!! মরে যাবো।
,,, পারু সেসব শুনতে পারলো না, কানেই পৌছালোনা। সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে নিজের ব্যাথা সহ্য করতে ব্যাস্ত। এ ব্যাথার যেনো নিস্তার নেই,, উপসম নেই,, আত্মা বেড়িয়ে যাওয়ার মতো কষ্ট হচ্ছে।
