৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৬
রুপান্জলি
২৮/ ০৪/২০১৯
,,, ৮ থেকে ১০ বার কলিং বেল চাপার পরেও ওপাশ থেকে দরজা খোলার নাম নেই। পারু জানে দ্বীপ ইচ্ছা করেই এমন করছে,, নিশ্চয়ই ডোর ক্যামেরা দিয়ে দেখেছে ও যে এসেছে,, এজন্যই দরজা খুলছেনা। পারু ও হাড় মানার পাত্রি নয়, আজ এই লোক কিভাবে দরজা না খুলে থাকে সেও দেখতে চায়। অগত্যা এক সমানে যত ইচ্ছা সুইচ টিপতে লাগলো। পারুর কান্ডে এবার বোধয় ওপাশের মানুষ টা বিরক্ত হলো আর ধাম করে দরজা খুলে দিলো। দরজার ওপাশে মেধাকে দেখে ভ্রু কুচকে নিলো পারু। সে এতোক্ষণ ধরে কলিং বেল বাজাচ্ছে আর মেধা ভিতরে থেকেও খুললো না কেনো? এরকম করার মেয়ে তো মেধা নয়। পরোক্ষনেই ভাবলো মেধা বোধয় কোনো কাজে বিজি ছিলো তাই দরজা খুলতে দেরি করেছে। অগত্যা কোনো ভনিতা ছাড়াই মেধার দিকে তাকিয়ে সহাস্যে প্রশ্ন করলো –
,,, কি হয়েছে মেধা? দরজা খুলছিলে না কেনো? কখন থেকে কলিং বেল বাজাচ্ছি।
,,,মেধা পারুর দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো — কেনো খুলবো দরজা? তোমার এখানে কি কাজ? যাও, চলে যাও। আপাতত তোমার মুখ দেখারো ইচ্ছা নেই আমার।
,,,এই প্রথম মেধাকে এতোটা রেগে যেতে দেখে পারু অবাক লোচনে তাকিয়ে রইলো, মেধা তাকে রাগ দেখাচ্ছে? মেধাও কি তবে পারুকে ভুল বুঝলো? কিন্তু পারু তো নিরুপমায় ছিলো। পারু অসহায় কন্ঠে বললো — তুমিও আমায় বুঝবেনা মেধা? তুমি না বুঝলে তোমার ভাইকে কিভাবে বুঝাবো বলো?
,,, পারুর কথায় তেতে উঠলো মেধা, সহসা পারুর হাত ধরে টানতে টানতে দ্বীপের রুমের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললো — কি বুঝবো তোমাকে? বলো কি বুঝবো? তোমার জন্য আমার ভাই মরতে বসেছে। আজ পাচটা দিন পেরুলো তোমার একটা কল দেওয়ার নাম নেই। কি বলে বাড়ি গিয়েছিলে বলো। বলে যাওনি দুদিন পর ফিরে আসবে? আমার ভাইকে প্রতিদিন কল দিবে? কেনো দিলেনা? বলো। আমার ভাইয়া পাঁচটা দিন ধরে এখানে থেকে শুধু পাগলামি করে গিয়েছে। বার বার তোমার কাছে যেতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি। তুমি নাকি যাওয়ার সময় আমার ভাইকে কসম দিয়ে গিয়েছো? যেনো আমার ভাই তোমার বাড়ি না যায়? কেনো পারু? কি পেয়েছো আমার ভাইকে? যা খুশি করে নিবে? যেভাবে খুশি কষ্ট দিবে? তুমি জানো ভাইয়া বড়ো আব্বুর কতোটা আদরের? ভাইয়া কষ্ট পাবে বলে দ্বিতীয় বার বিয়ে পর্যন্ত করেনি। যুবক বয়সে বউ হাড়ানোর পর কোন লোক এমন করতো বলো? আর সেই আদরের ছেলেকে তুমি এভাবে কষ্ট দিচ্ছো?এসব যদি মেঝো আম্মু আর বড়ো আব্বু জানতে পারে তখন তোমার কি অবস্থা হবে ভাবতে পারছো? ভাইয়ার খুশির জন্য বড়ো আব্বু সব করতে পারে, আর তুমি কিনা আমার ভাইয়াকে পাগল বানানোর প্লান করছো? যদি আমার ভাইয়ার কিছু হয় পারু, বুইঝো!! আমি নিজ হাতে তোমাকে কবর দিবো, বলে রাখলাম।
,,,বলতে বলতে দ্বীপের দরজার সামনে দাড় করিয়ে দিলো পারুকে,, পারুর চোখে উপচে পরা পানি। সে কান্না দমাতে না পেরে ফোঁপাত ফোঁপাত বললো — কি হয়েছে দ্বীপের? ও কি আবারো নেশায় ঢুবে ছিলো? বিশ্বাস করো মেধা আমি নিরুপায় ছিলাম। আমার কাছো তো বাটন ফোন নেই,, স্মার্ট ফোন ও এখানে রেখে গিয়েছিলাম। আবুর ফোনটা কিছুতেই কালেক্ট করতে পারিনি আর আব্বু আসতেও দিচ্ছিলোনা। আমি কি করতাম বলো?
,,,মেধা ক্রোধিত নয়নে পারুর দিকে তাকিয়ে বললো — — কিছু করতে হবেনা, যা করে ফেলেছো তাতেই আমার ভাইয়ার যা তা অবস্থা। পাঁচটা দিন ধরে কিসব খেয়ে যাচ্ছে,, ভালো খাবার তো মুখেও তুলেনা। দুটো তিনটে ঘুমের ঔষধ তার রেগুলার রুটিন হয়ে উঠেছে। আজ আসতে গেলে কেনো? আরও দুটো দিন পরে আসতে,, আমার ভাইটা মরলে একেবারে দাফন কাফনের ব্যাবস্থা করে দিতে।
,,,মেধার কথায় আতকে উঠলো পারু,, শব্দ তুলে কেদে দিলো। সে জানতো না দ্বীপের এরকম অবস্থা হবে,,জানলে যে করেই হোক কারোর না কারোর ফোন থেকে একটা কল দিতোই দিতো। পারু এক প্রকার হামলে পরলো দরজার উপর ধাক্কাতে ধাক্কাতে উন্মাদের মতো দ্বীপকে ডাকতে লাগলো। পারুর মাথা ব্যাথা করছে,, এই মুহুর্তে দ্বীপ দরজা না খুললে পারুর মনে হচ্ছে মাথা ব্যাথা আরও বাড়বে। তার নিজেকে পাগল পাগল লাগছে,, ওর ডাকাতিতে বিহানের রুম থেকে বিহান বেড়িয়ে এলো। পারুর অবস্থা নাজেহাল। মুলত পারু দ্বীপ দুটোই পাগল,, এদের পাগলামি দেখলে বিহান অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মেধা রানীটা কেনো এতো পাগলামি করেনা? মেধা রানী পাগলামি করলে সে একটু আদটু পাগলামি করতে পারতো। আফসোস!! তার মেধা রানি তার জন্য ততোটাও পাগল নয়। অগত্যা সব ভাবনা রেখে ডুবলিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে দিলো বিহান। পারু কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে একবার বিহানের দিকে তাকালো পরপর ঠাস করে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে গেলো। পারু রুমে ঢুকার সাথে সাথে মেধাকে নিয়ে চলে গেলো বিহান,, এই মেয়ে আজ ক্ষেপেছে,, এটাকে ভালোবাসা নামক শরবত না খাওয়ালে ঠিক হবেনা।
,,, দ্বীপ মেঝেতে বসে খাটের এক কোনায় মাথা হেলিয়ে ঘুমাচ্ছে,, রুম জুড়ে বিদঘুটে ম*দ সি*গারেটে ঘ্রান। পারুর কেমন বমি বমি পাচ্ছে,, তবুও বহু কষ্টে মুখে উড়না চেপে দ্বীপের দিকে এগিয়ে গেলো। দ্বীপের বিদ্ধস্ত রুপ দেখে পারুর বুকটা মোচর দিয়ে উঠলো,, ইসস কি হাল হয়েছে লোকটার। পারু সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে দ্বীপের পাশে গিয়ে বসলো। সেও বিছানায় মাথা হেলিয়ে ঘুমন্ত দ্বীপের মুখটা অবলোকন করলো,, দেখে মনে হচ্ছে বহুদিনের অসুস্থ কোনো রুগি ঔষধের অভাবে মৃত্যু কামনা করছে। পারু হাত উচিয়ে দ্বীপের মুখে হাত ভুলিয়ে দিলো। এই লোকটা তার জন্য এতো পাগল কেনো? এতো পাগলামি করতে হবে কেনো? আচ্ছা!! আল্লাহ না করুর পারু যদি কখনো মরে যায় তখন এই লোকের কি হবে? এই পাচ দিনেই যদি লোকটার এরকম হাল হয় তাহলে পারু একেবার না থাকলে তো উনাকে বাচানোই যাবেনা। পারু মনে মনে আল্লাহ এর কাছে দোয়া করলো,, আল্লাহ যেনো তাকে অনেক গুলো বছর বাচিয়ে রাখে আর সে যেনো তার দ্বীপকে সন্ধা রাতে জ্বলা প্রদীপের মতো জ্বালিয়ে রাখতে পারে। দ্বীপের মুখে হাত ভুলিয়ে ওর বুকে মাথা রাখলো পারু,, ঘুমন্ত দ্বীপের নাসারন্ধ্রে পারুর ঘ্রাণ পৌছাতেই চোখ মেলে তাকালো। বুকের উপর পারুকে দেখে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলো। তার মনে হচ্ছে সে ভ্রম দেখছে,,তাই আলতো করে পারুর শরীর টা ছুয়ে দিলো। নাহ!! প্রতিবারের মতো এবার মিলিয়ে যায়নি পারু,, তারমানে পারু এসেছে,, সত্যি ই এসেছে? মনে মনে কথাটাকে বিশ্বাস করানোর জন্য পারুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ভাগ্যিস আজ সে একটা ঘুমের ঔষধ খেয়েছিলো,, দু তিনটে খেলে তো সে মরার মতো ঘুমাতো তাহলে নিশ্চয়ই পারুকে দেখতে পেতোনা? ভালোই হয়েছে বেশি ঘুমের ঔষধ খায়নি। দ্বীপ পারুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ ডুবিয়ে ফুপিয়ে উঠলো। এই প্রথম দ্বীপকে কাদতে দেখলো পারু, এমন শক্ত পোক্ত একটা লোক এতোটা অসহায় ভাবে কাদছে। কতোটা ভালোবাসলে মানুষ এরকম করতে পারে জানা নেই পারুর। সে হাত উচিয়ে দ্বীপের পিঠে হাত ভুলিয়ে বললো — বেবি!! বেবি শান্ত হও। আমি চলে এসেছি, তোমাকে রেখে আর কোথাও যাবোনা। প্লিজ বেবি,, এরকম করোনা আমার কষ্ট হচ্ছে।
,,,পারুর কথা শুনলোনা দ্বীপ, আরও শক্ত করে আকরে ধরলো মেয়েটাকে। দ্বীপের কলিজাটা পুড়ে যাচ্ছে,, এই মেয়েটাকে ছাড়া তার দম আটকে আসে। এই পাচ দিনে সে খুব ভালো করে বুঝে গিয়েছে,,এই মেয়েকে ছাড়া দ্বীপের পক্ষে বাচা ইম্পসিবল,, একেবারে ইম্পসিবল। দ্বীপকে বাচ্চাদের মতো কাদতে দেখে পারু ও কেদে দিলো। দীর্ঘ আধা ঘণ্টা কান্নাকাটির পর থেমে গেলো দ্বীপ। সাথে সাথে ফিরে এলো নিজের চিরোচারিত কঠিন রুপে। পারুকে এতোটা কাছে দেখে সহসা নিজের থেকে সরিয়ে বাহু চেপে ধরে বললো —
,,,এখানে কেনো এসেছিস? দয়া দেখাতে? তর দয়া আমার চাইনা। যাহ, তুই তর বাড়ি চলে যা। দ্বীপ মির্জা একাই বাচতে পারে,, বাচার জন্য তর মতো সস্তা চিপ মেয়েকে দ্বীপ মির্জা প্রয়োজন নেই। সর, যাহ এখান থেকে। এই মুহুর্তে আমার রুম থেকে বের হো তুই।
,,, কথাটা বলেই ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিলো,, পারুর হয়েছে মহা জ্বালা। এমন একটা লোককে সে ভালোবাসলো,, যে কিনা রাগ হলেই তাকে ধমকে দূরে সরিয়ে দিবে, আবার সেই ধমক শুনে পারু যদি চলে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়ায় তাহলে তেড়ে এসে দু চারটে চর থাপ্পড় দিয়ে আবার কাছে টেনে নিবে। এটাই দ্বীপ,, ভিপি দ্বীপ জোহান মির্জা। এই লোককে সামলানোর মতো কঠিন কাজ এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি হয়না। পারু নিজেকে ধাতস্থ করে দ্বীপের দিকে এগিয়ে গেলো,, গালে হাত দিতে নিলে দ্বীপ সেটা ঝটকা মেরে দূরে সরিয়ে দিলো। পারু হার মানলো না,, এটাকে মানাতে হলে বার বার বেহায়ার মতো কাছে যেতে হবে। নয়তো এই লোককে সামলানো দায়। পারু আবারো হাত বাড়ালো, শক্ত করে দ্বীপের গাল আকরে অনুনয়ের স্বরে বললো —
,,সরি বেবি, আমি আর কখনো এমন করবো না। আর কখনো তোমায় ছেড়ে দূরে যাবোনা। প্লিজ বেবি, মাফ করে দাও,, সরি, সরি!!
,,,বলতে বলতে ঝাপিয়ে পরলো দ্বীপের বুকে। এবার বোধয় কিছুটা শান্ত হলো দ্বীপ, পারুকে কাছে না টানলেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না। এভাবেই অনেকটা সময় পেরুনোর পর পারুর মাথায় হাত রাখলো দ্বীপ, এক হাতে ওর কোমর জড়িয়ে কোলের উপর বসিয়ে দিলো। আজ পাঁচ পাঁচটা দিন পর মেয়েটাকে কাছে পেয়েছে সে , এই এতোগুলো দিনে চোখের দেখা তো দূর একটুখানি কথাও হয়নি দুজনার। এই পাঁচটা দিন দ্বীপের কাছে পাঁচ যুগের মতো লগেছে,, তার বুকে কি পরিমান যন্ত্রণা হয়েছে তা এই মেয়েটা বুঝবেনা। আল্লাহ বাদে কেউ জানবেনা সেই খবর। পারুকে কাছে পেয়ে দ্বীপ এবার কিছুটা নরম হয়ে এলো,,, পারুর চুলের ভাজে অসংখ্য চুমু দিতে দিতে হালকা ঠোঁট নাড়িয়ে বললো –
,,, আমার খুব ভয় হয় তকে হাড়িয়ে ফেলার ,, তকে ছাড়া এক প্রহর হাজার প্রহর মনে হয়। তুই না থাকলে আমার মৃত্যু যন্ত্রণা হয় পারু,, তুই যাসনা, আমাকে একা রেখে আর কোথাও যাসনা। আবারও এরকম করলে আমি মরে যাবো,,বিশ্বাস কর,, সত্যি ই মরে যাবো।
,,, পারু মাথা উচিয়ে দ্বীপের থুতনিতে কপাল ঠেকিয়ে বললো,,
,,, আর যাবো নাতো, একটু শান্ত হও। এরকম পাগলামি কেউ করে? এগুলো কি করেছো? ঘরের ভিতর কতো বিদঘুটে গন্ধ, আমার কতো অস্বস্থি হচ্ছে জানো? খুব বমি পাচ্ছে,, মাথা খারাপ লাগছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
,,,দ্বীপ পারুর মুখটা তুলে খর খরা হাতে চোখ মুখ মুছে দিলো,পরপর বুকের মধ্যিখানে মুখটা চেপে ধরলো যেনো এই রুমে থাকা বিদঘুটে ঘ্রাণ পারুর নাসারন্ধ্র বেধ করতে না পারে। তবুও পারুর বমি পাচ্ছে, কারন সেই বিধঘুটে ঘ্রাণটা দ্বীপের মুখ, শার্ট এমনকি শরীর থেকেও আসছে। পারু সহসা দ্বীপের থেকে দূরে সরে গেলো, এতোক্ষণ কষ্ট করে বসে থাকলেও এখন কেমন যেনো তার গা গুলাচ্ছে। পারুকে এভাবে নাম সিটকাতে দেখে দ্বীপ তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বললো —
,, তুই সার্থপর পারু, তুই খুব সার্থপর। বাবা মায়ের কাছে গিয়ে আমাকে কিভাবে ভুলে যেতে পারলি? তর কি একবারও মনে হয়নি? তকে না দেখে, কথা না বলে আমি কিভাবে থাকবো? যদি ফিরে এসে দেখতি আমি দুনিয়াতে আর নেই? তখন কি করতি? আর এতোদিন পর আমার কাছে ফিরে এসেও কি করছিস দেখ,, আমাকে দেখে নাক ছিটকাচ্ছিস, অথচ আমার এই অবস্থার জন্য দায়ি তুই। তুই এতোটা অবহেলা না করলে আমি কিন্তু এসব নিয়ে পরে থাকতাম না। আমাকে যখন তর এতোটাই অসহ্য লাগে তখন চলে যা, আমার কাছে থা,,
,,,আর বলতে পারলোনা দ্বীপ তার আগেই পারু দ্বীপের নরম উষ্ঠ যুগল দখল করে নিলো। এটাই প্রথমবার তাও পারুর তরফ থেকে। পারুর এহেন কান্ডে থমকে গেলো দ্বীপ। সে এতোটাও আশা করেনি,, এতোটাও না। সময় পেরুলো কিছুটা, দুজনের অবিব্যাক্তি শান্ত,, দুজনের চোখ দুজনার মাঝে নিবদ্ধ। পারুর জ্বল জ্বল চোখে তাকিয়ে বললো — আমি তোমাকে ভালোবাসি,, সব ভাবে, সব অবস্থাতেই ভালোবাসি। তুমি ভাবলে কিভাবে আমি তোমাকে দেখে নাক ছিটকাবো? আমি তো শুরু থেকেই জানতাম তুমি বাজে নেশায় আসক্ত ,, তবুও আমি তোমার মায়ায় পরেছি। তোমার সব খারাপ গুনকে নিজের মনে করে ভালোবেসেছি দ্বীপ। আর কখনো এসব বলবেনা,, কোনোদিন না, ঠিক আছে?
,,,দ্বীপ এখনো তব্দা খেয়ে তাকিয়ে আছে,, একটু আগে ওটা কি ছিলো? কিভাবে হলো? কেনো হলো? কিছুই বুঝলো না। এবার সে একটু বুঝতে চাইলো আর বুঝার জন্য দ্বিতীয় বারের মতো নিজ উদ্দমে পারুর উষ্ঠ যুগল দখল করে নিলো। তারপর সময় পেরোলো অনেকটা। মনের নৃগুড় চাহনা, সকল রাগ, অভিযোগ পেড়িয়ে মনমাস্তিক শান্তি নিহিত হওয়া পর আলাদা হলো দুজন।দ্বীপের কান্ডে লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে রাখা পারুর গাল আকরে ধরলে দ্বীপ, এদিক ওদিক তাকিয়ে ছোট করে বললো —
,,,,ইদার কয়ি নেহি রেহতাহে,, ডারাও মাত,, কিসিনে নেহি দেখা।
( অর্থ: এখানে কেউ নেই, ভয় পেওনা,, কেউ দেখেনি)
,,,পারু চোখ তুলে মিহি কন্ঠে বললো —
,,,,কয়ি দেখে ইয়া না দেখে,, কয়ি ফারক নেহি পাদাথা,, মেইন তোমহারে হোন, তুম মেরে হো। পুরে দুনিয়াকো পাতা চাল জা,, সাবকো দেখ জা,, মে কয়ি ফারক নেহি পাদাথা।,,,
(অর্থ: কেউ দেখুক বা না দেখুক, কিছু এসে যায়না। আমি তোমার, তুমি আমার। পুরো পৃথিবী জানুক, সবাই দেখুক, আমি পরোয়া করিনা )
( এটুকু পড়ে অর্পনা চোখ বুঝে নিলো,, কেউ কাউকে এতোটা ভালোবাসতে পারে জানা ছিলোনা তার,, অর্পনা বিরবির করে বললো,,, আপকা পেয়ার অমর রাহে,, আপকা আন্ত বেহাড খুব সুরাত হো। আমিন! আমিন! সুম্মা আমিন!! )
,,, পাঁচ দিনের হাহাকারে বিহানের ও তেমন খাওয়া দাওয়া নেই। দ্বীপ বা বিহান যখন আহত হয় কিংবা বিদ্ধস্ত হয় তখন তারা এই ফ্লাটে থাকে। এই বিষয়টা পরিবারের কেউ জানেনা, জানলে মাহিদ মির্জা এতোক্ষণে দুজনের অবস্থা খারাপ করে দিতো। বিহান কয়েক পা এগিয়ে দ্বীপের রুমের দিকে উকি দিতে নিতেই মেধা হাত টেনে ধরে কিছুটা ধমকের স্বরে বললো — ওদিকে কই যাও? অন্যের পারশোনাল মোমেন্টে লাল বাতি না জ্বালালে ভাল্লাগেনা?
,,, বিহান পেটে হাত দিয়ে বেহায়ার মতো করে বললো — পারু তো চলে এসেছে, এবার তর ভাইয়াকে বল বেড়িয়ে আসতে।ওর জন্য আমার নাওয়া খাওয়া বন্ধ। ছেক্কা খাবে তর ভাই, আর বেকা হয়ে পরে থাকবো আমি।
,,,মেধা ফুসে উঠে বললো — আমার ভাই, তোমার কি চাচা লাগে?
,,, বিহান মেধাকে কাছে টেনে বললো — নাহ! ওটা আমার ভাই আর তোমার ভাসুর লাগে।
,,, বিহানের কান্ডে লজ্জা পেলো মেধা, বিহান সেই লজ্জা রাঙা মুখটা দু আঙ্গুলের সাহায্য উপরে তুলে যেইনা চুমু খেতে নিবে তখনি পারু হালকা কাশি দিয়ে সতর্ক বানী ছুড়ে রান্না ঘরে যেতে যেতে বললো —
,,, এখানে প্রেমালাপ না করে নিজেদের ভাই ভাসুরের রুমটা গিয়ে পরিষ্কার করে ফেলুন। আমি ওসবের ঘ্রান নিতে পারিনা, আপনারা তো শুনে অভ্যস্ত। যান গিয়ে ওসব বাজে জিনিস গুলো ফেলে ম*দের আস্তানাকে মানুষের থাকার জায়গা বানিয়ে দিন।
,,,পারুর কন্ঠ শুনে দুজন দুদিকে সরে গেলো। বিহান পারুর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকালো। এরা যে এতোক্ষণ প্রেম করেছে তারা একবার বাধা দিতে গিয়েছিলো? যায়নিতো, তাহলে ওরা যখন একটু প্রেম করতে নিলো তখনি কেনো পারুকে আসতে হলো? আপাতত সেসব বললো না,, একেবার খেতে বসে দুজনকে একসাথে পচানি খাওয়াবে। এখন আপাতত ভাইয়ের ঘরটা পরিষ্কার করা দরকার,, ওখানে কাজ করতে করতে যদি কোনো ফাঁকফোকর মিলে তখন নাহয় মেধা রানীর সাথে একটু প্রেম করে নিবে। অগত্যা মেধার হাত ধরে দ্বীপের রুমের দিকে পা বাড়ালো। মেধা যেতে যেতে পারুর দিকে তাকিয়ে ছোট করে সরি জানালো,, পারু ও সহাস্যে সব ভুলে গেলো। মেধা যাই করেছে সবটা দ্বীপের জন্য আর দ্বীপ তো পারুর ই। নিজের জিনিসের জন্য দশ পাচটা কথা শুনা এমন কোনো ব্যাপার না।
,,, ভাত বসিয়ে গোস্ত রান্নার প্রসেসিং চালাচ্ছে পারমিতা। এই ফ্লাটে সে তাদের জন্য বহুবার রান্না করেছে। ধরতে গেলে বিয়ে ছাড়াই ছোট খাটো সংসার সাজিয়েছে পারমিতা। তার একটা সংসারের খুব শখ। এরকম পার্ট টাইম সংসার না একেবারে সর্বোসময়ের জন্য সুন্দর একটা সংসার সাজাবে সে,, তাও তার ভালোবাসার মানুষ রাগি, অধৈর্য দ্বীপ মির্জার সাথে। এই অধৈর্য, বেপোরোয়া, এক রোঘা পুরুষকে সে একদিন সংসারি বানাবে, মারাত্মক আকারের সংসারি। যেদিন পারু সুন্দর এক খানা শাড়ি পড়বে আর সেই শাড়ির আচল কোমরে গুজে পুরো মির্জা বাড়ির জন্য রান্না করবে। তখন এই রাগি দ্বীপ মির্জাকে একটা ইয়া-বড়ো বাজারের ব্যাগ আর বাজারের লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে বলবে। “” এইযে খারাপ পুরুষ!! যাও গিয়ে বাজার করে নিয়ে আসো,, আসার সময় আমার জন্য এক মোঠ চুড়ি এনো তো, এক সিসি আলতাও এনো,, কোনো এক বেলায় সেসব পরে তোমায় দেখাবো,, তুমি মন ভরে দেখবে আর আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসবে। “” দ্বীপ যখন বাজারের থলে হাতে ঘেমে চুপচুপা হয়ে বাড়ি ফিরবে তখন পারু বাচ্চাদেরকে সামলে দ্বীপের হাত থেকে বাজারের থলেটা নামিয়ে রাখবে। তারপর কোমরে গুজে রাখা শাড়ির আচলটা খুলে দ্বীপের মুখে জমে থাকা ঘাম টুকুন সন্তর্পণে মুছে দিবে। পারু যখন তার সংসার নিয়ে কল্পনায় ডুবে,, তখনি পিছন থেকে দ্বীপ গম্ভীর কন্ঠে মোহনিয় স্বরে ডাকলো–
,,মাই ওয়েলি লেডি!!
,,, দ্বীপের শীতল করা ডাকে কেপে উঠলো পারু,, কল্পনার জগত থেকে বেড়িয়ে এসে দ্বীপের দিকে তাকাতেই দেখলো সে তোয়ালে দিয়ে চুল মুচছে আর মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকেই দেখছে। পারু তোয়ালেটা টেনে নিয়ে দ্বীপের চুল মুছে দিতে দিতে বললো — একদিন আমরা সংসার করবো,, একটা সুন্দর সংসার। করবে তো বেবি? আমি যেমন করে চাইবো তেমন ভাবে সংসার করবে তো?
,,,দ্বীপ অবাক কন্ঠে বললো — সংসার তো সংসার ই হয়, তুমি আবার কেমন সংসার চাও?
,,, পারু মুচকি হেসে বললো — আছে, আমি সব ভেবে রেখেছি, কিভাবে কি করবো সবটা।
,,, আমিও ভেবে রেখোছি।
,,, কি ভেবেছো?
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৫
,,, আমরা সংসার করবো, সারাদিন তোমাকে আদর করবো,, অনেক অনেক আদর করবো। আদর করা শেষ হলে আদর করবো,, তারপর আবার আদর করবো,, একটু পর আবার আদর করবো, তারপর আবার আদর করবো,,যখন ইচ্ছা আদর করবো মন চাইলেও আদর করবো, না চাইলেও আদর করবো, তারপর আব,,
,,,পারু দ্বীপের মুখে আঙুল চেপে ধরে বললো — থামো থামো, তোমার আর বলা লাগবেনা। সবসময় খালি উল্টা পাল্টা চিন্তা।
,,দ্বীপ টুপ করে পারুর হাতে চুমু খেয়ে মুচকি হেসে আবারও চুল মুছতে মুছতে রুমের দিকে পা বাড়ালো। ওয়াশ রুম থেকে বেরোনোর সময় দুটোকে কাজ করতে দেখেছিলো,, এখন বোধয় রুম গুছানো শেষ। গিয়ে দেখতে হবে কতোটা কি ঠিক হলো।
