৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৫
রুপান্জলি
১৯/০৩/২০১৯
,,,দ্বীপ!! দ্বীপ!!? দ্বীইইইপ!!
,,,দ্বীপের নাম জপতে জপতে চিৎকার করে উঠলো পারমিতা, চোখ খুলে নিজেকে হসপিটালের বেডে দেখে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলো। সে হসপিটালে? কিন্তু কেনো? তার কি হয়েছে? দ্বীপ কোথায়?দ্বীপের তো গুলি লেগেছিলো। গুলি কোথায় লেগেছে? দ্বীপ ঠিক আছে তো? টেনসনে পারুর মাথা ব্যাথা করছে,, সে বিচলিত হয়ে দ্বীপ দ্বীপ বলে চেচাতে লাগলো। ওর চেঁচামেচিতে দরজা খুলে দ্রুত গতিতে ভিতরে এলো নার্স,, বিচলিত কন্ঠে সুধালো —
,,,, ম্যাম!! আপনি উঠছেন কেনো? আপনার শরীরে এখনো খুব জ্বর। শান্ত হোন,, উঠবেন না।
,,,পারু নার্সকে দেখে কিছুটা শান্ত হয়ে এলো, এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রশ্ন করলো — দ্বীপ কোথায়? ও,ওর তো গুলি লেগেছিলো। আমি দ্বীপের কাছে যাবো,, আমাকে নিয়ে চলুন।
,,, নার্সটি পারুর দিকে তাকিয়ে ভ্রু গুটিয়ে নিলো। এই মেয়েটাকে গতকাল বিহান মির্জা এবং মেধা মির্জা ভর্তি করিয়েছেন। মির্জা বাড়ির লোকেরা যেহেতু ভর্তি করিয়েছে সেহেতু নির্ঘাৎ এই মেয়ের সাথে তাদের কোনো না কোনো কানেকশন আছে, তাই সাবলীল ভাবেই জবাব দিলেন — ম্যাম!! স্যারের রাতে অপারেশন হয়েছে,, এই মুহুর্তে তিনি ঘুমাচ্ছেন। ঘুম থেকে উঠলেই সবার সাথে দেখা করতে দেওয়া হবে।
,,,পারু মানলো না,, তার দ্বীপকে দেখতে মন চাচ্ছে।এখন দেখতে মন চাচ্ছে মানে সে এখোনি দেখবে। শান্ত শিষ্ট পারু হুট করেই অশান্ত হয়ে উঠলো,, সে হাতে থাকা স্যালাইনের নলে হাত দিয়ে হুমকি স্বরুপ বললো —
,,, আমি এখন যাবো, এখন দ্বীপের সাথে দেখা করবো। আমাকে না নিয়ে গেলে আমি স্যালাইনের নল খুলে ফেলবো,, সত্যি!! তারপর, তারপর,, ( পাশ থেকে সার্জিক্যাল ক্যাচি নিয়ে) আমি এখনি এটা হাতে ঢুকিয়ে দিবো,,তারপর মরে যাবো,, বলে দিলাম। ভালো চাইলে,, আমাকে এখোনি দ্বীপের কাছে নিয়ে যান, আমি আমার দ্বীপকে দেখতে চাই।
,,,ধীরে ধীরে পারুর পাগলামি বাড়ছে, একটা সামান্য কারনে এভাবে পাগলামি করতে দেখে নার্সটি বিচলিত হয়ে পরলো। সে তারাহুরো করে আরেকটা নার্সকে দিয়ে বিহানের কাছে খবর পাঠালো। পরপর পারুর দিকে এগিয়ে বুঝানোর মতো করে বললো — কেচিটা আমাকে দিয়ে দিন ম্যান। এখোনি বিহান স্যার আসবেন,, উনি অনুমতি দিলেই আপনাকে দ্বীপ স্যারের রুমে নিয়ে যাওয়া হবে। প্লিজ ওটা ফেলে দিন।
,,,পারু ফেললো না বরং আরও শক্ত করে ওটা রগের ঠিক উপরে রাখলো যেনো কেউ ওর কথা না শুনলে ডিরেক্ট আত্মহত্যা করতে পারে। পারু স্বভাবত কিন্তু এমন মেয়ে নয়,, সে বরাবরি শান্ত কিন্তু ইদানীং তার কি যেনো হয়ে যায়,,হুট হাট রাগ উঠে যায়,, মত বদলে যায়। দ্বীপকে নিয়ে সে এতোটাই পসেসিভ হয়ে উঠেছে,, ওকে হারানোর কথা উঠলেই নিজেকে শেষ করে দিতে মন চায়। নার্সের থেকে খবর পেয়ে মেধা আর বিহান ছুটে এসেছে। হসপিটালে আপাতত ওরা দুজন আর কয়েকটা ছেলেপুলে ব্যাতিত তেমন কেউ নেই। বিহান এখোনে বাড়িতে এসব জানায়নি তবে শিগ্রই জানাতে হবে। ভাগ্য ভালো গুলিটা দ্বীপের মেরুদন্ডের পাশে লেগেছে, যদি কোনোভাবে সেটা মেরুদন্ডে লেগে যেতো তাহলে দ্বীপকে বাচানো অসম্ভব হয়ে পরতো। বিহান আসার পর পারু আরও বেশি পাগলামি শুরু করে দিয়েছে। দ্বীপ যেই অবস্থাতেই থাকুক না কেনো পারু দ্বীপের কাছে যাবেই। যাবে মানে যাবেই। এট লাস্ট না পেরে পারুকে নিয়ে যাওয়ার পারমিশন দেওয়া হয়,, যেহেতু দ্বীপ এখন বিপদ মুক্ত সেহেতু ওর সাথে দেখা করাই যায়। অগত্যা পারুর হাত থেকে সেলাইনের নল খুলে তাকে দ্বীপের কেবিনে নিয়ে যাওয়া হলো।
,,,, পিঠে গুলি লাগায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে দ্বীপ, কর্ড়া ঔষধের প্রভাবে রাত থেকেই ঘুমাচ্ছে। পারু কাদতে কাদতে দ্বীপের পাশে বসলো,, কোনো কিছু না ভেবেই দ্বীপের উন্মুক্ত বাহু ঠেলতে ঠেলতে ডাকতে থাকলো — বেইব!” বেইব!! বেইব উঠো না। আমার মাথা কেমন যেনো লাগছে,, তুমি না উঠলে আরও বেশি খারাপ লাগবে। উঠোনা বেইব,, উঠো
,,,কারোর ফ্যচফ্যাচে কান্নার স্বর আর ডাকাডাকিতে চোখ মেলে তাকালো দ্বীপ। কর্ড়া ডোজের প্রভাবে চোখে ঘুম থাকলেও চোখ মেলে বাচ্চাদের মতো ডাকাডাকি করা পারুকে দেখে ঠোঁট বাকিয়ে সুক্ষ হাসলো। পরপর এক হাত উচিয়ে পারুর চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বললো — কি হয়েছে আমার পারুর!! এরকম বাচ্চামি করছে কেনো? আমার পারু কি বরাবরই এরকম বাচ্চামি করে? নাকি আমার সামনে এলেই বাচ্চা হয়ে যায়?
,,,পারু এখনো কাদছে,, সে দ্বীপের বেন্ডেজ করা স্থানে হাত ছুইয়ে বললো — খুব ব্যাথা করছে?
,,, দ্বীপ মাথা ঝাকিয়ে না বুঝালো,, পারু দ্বীপের বাহু টেনে বায়না করার মতো করে বললো — ব্যাথা না করলে উঠে বসো, আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরবো। উঠো, উঠোনা, উঠো।
,,, পারুর কান্ডে না চাইতেও হেসে ফেললো দ্বীপ, আবারও পারুর সারা মুখে হাত ভুলিয়ে দিয়ে বুঝানোর মতো করে বললো — আমার তো পিঠে গুলি লেগেছে সোনা, এখন আমি উঠতে গেলেই ব্যাথা পাবো।
,,,পারু নাক ফুলিয়ে জেদ করে বললো — আমি কিছু জানিনা!! তুমি উঠবে মানে উঠবেই,, তুমি না উঠলে আমি কিন্তু নিজেকে শেষ করে দিবো।
,,, ধমকে উঠলো দ্বীপ– পারু!! থাপরে গাল লাল করে দিবো তোমার,, এসব বলতে নিষেধ করেছি না? আর কখনো এসব বলবে না।
,,,বলতে বলতে বহু কষ্টে উঠে বসলো দ্বীপ,, যদিও এসব নতুন কিছুই না। রাজনৈতিক জীবনে এই ১১ বছরে সে শতোবার আহত হয়েছে,, কতোবার মরতে মরতে বেচেছে সেসবের হিসেব খুব কম। দ্বীপ উঠে বসতেই পারু আছতে করে দ্বীপের বুকে মাথা রাখলো,, এখন তার খুব শান্তি লাগছে,, এতোক্ষণ বুকের ভিতরটা কেমন জ্বলে যাচ্ছিলো। পারু আছতে করে মাথা রাখলেও দ্বীপ ওকে টেনে অনেকটা কাছে এনে মাথায় আদুরে হাত ভুলিয়ে দিলো — এতো পাগলামি করছিস কেনো? এখন যদি আমিও তকে পাগল বলি? রাগ করবি?
,,,পারু দ্বীপের উন্মুক্ত বুকে নাক ঘষে বললো — রাগ করবো কেনো? আমি তোমার জন্য হাজারবার পাগলের উপাধি পেতে রাজি।
,,, পারুর একেকটা কান্ডে অবাকে চরম পর্যায়ে পৌছে যাচ্ছে দ্বীপ। কতো অবলীলায় মেয়েটা তার বুকে মিশে যাচ্ছে,, তুমি করে পর্যন্ত বলছে সাথে বেইব বলেও ডাকছে । এতো এতো ভালোবাসা যেনো দ্বীপ সামলাতেই পারছেনা। ওরা যখন ভালোবাসা বিনিময় করতে ব্যাস্ত তখনি কেবিনের দরজা খুলে ভিতরে ডুকলেন মাহিদ মির্জা, শাহীন মির্জা, মাহিন মির্জা আর দুজন মধ্যে বয়স্ক মহিলা। আগের বারের মতো ছেলে আর পারুকে একই অবস্থায় দেখে মাহিদ মির্জা মুখে বিরক্তিকর ছাপ ফেলে অন্যদিকে তাকালেন। ছেলেটার কি কোনো কান্ডজ্ঞান নেই? এই অবস্থায় ও কিসব করে যাচ্ছে। এদিকে শাহিন মির্জা আর মাহিন মির্জার গর্ভে বুক ফুলে উঠেছে। আহা!! এক মাস আগেও ভাতিজা এই মেয়েকে জোর করে নিজের কাছে আটকে রেখেছিলো আর এখন মেয়েটা কিনা নিজ থেকে দ্বীপের বুকে,, সাব্বাস ভাতিজা,, তুই বরাবরই আমাদের মান রেখেছিস। এরকম হাজারটা সাবাসি ভরা বাক্য মনে মনে ছুড়ে দিচ্ছেন দু ভাই। দ্বীপ এতোক্ষণ চোখ বন্ধ করে পারুর ভালোবাসায় ডুবে ছিলো,, কেবিনে অন্য কারোর প্রবেশ বুঝতে পেরেই চোখ মেলে তাকালো। বাবা চাচা আর আম্মুদের দেখে পারুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো — আপনার শ্বশুর শ্বাশুড়ি এসেছে মেডাম,, পিছনে তাকান।
,,, দ্বীপের কথা কর্ণগোচর হতেই সন্তর্পণে দূরে সরে গেলো পারু,, পিছন ফিরে দ্বীপের বাবা চাচা আর দুজন মহিলাকে দেখে লজ্জায় লাল হয়ে গেলো মেয়েটা। কি থেকে কি হয়েছে,, সে কি কি পাগলামি করেছে সবটা মনে আসতেই আরও লজ্জায় কুকুরে গেলো। দ্বীপ পারুর হাত ধরে সবার দিকে ইশারা করে বললো — আব্বু আর বড়ো চাচ্চুকে তো চিনোই। আর ওটা আমার ছোট চাচ্চু। পাশেরটা আমার আম্মু ,, তার পাশেরটা ছোট আম্মু। সবাইকে সালাম দাও।
,,,পারু সবাইকে চোখ উচিয়ে দেখলো,, শ্বশুর নামক লোকটা বাধে সবাই ওর দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে,, পারু এবার নিজ উদ্দমেই সহবতের সহিত সবাইকে সালাম দিলো। সবাই খুশি খুশি সালামের উত্তর নিলো। সব ঠিক ঠাক থাকলেও মাহিদ মির্জার মুখে অন্ধকার ,, বাবাকে এমন মুখ করে দাড়িয়ে থাকতে দেখে দ্বীপ কিছুটা দুষ্টুমি ভরা কন্ঠেই বললো — আপনি মুখ ফুলিয়ে রেখেছেন কেনো আব্বু? এতোদিন তো বউমা বউমা করে মাথা খেয়ে নিচ্ছিলেন,, এখন বউমার সালাম গ্রহণ করছেন না যে?
,,, মাহিদ মির্জা অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন — তোমার সাথে কথাই বলতে চাইনা আমি,, পারু!! তুমি কোন বুঝে এই সন্ত্রাসকে পছন্দ করেছো, বলবে আম্মু? এর কোনো ভবিষ্যত আছে? আজ মরতে মরতে বেচেছে কাল যে কিছু হবেনা তার গ্যারান্টি কে দিতে পারে? তুমি বরং একটা ভদ্র ছেলে দেখে বিয়ে করে নেও। এই সন্ত্রাস তোমাকে ডিসার্ভ করেনা।
,,,পারু লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখলো,, দ্বীপের পরিবারের লোকজনরা কত্তো ভালো। পারুর পরিবার পরিজন, অবস্থান, ক্লাস না মেপেই এক লহমায় তাকে কেমন আপন করে নিচ্ছে। পারু কোনোদিন ভাবতে পারেনি তার জীবনে এতো ভালো ভালো মানুষের আগমন ঘটবে। পারুকে মাথা নত করে রাখতে দেখে দ্বীপ বাবার উদ্দেশ্যে বললো — আপনি কি কোনো ভাবে আমার বিয়ে ভাঙার পায়তারা করছেন আব্বু? তাহলে বলবো,, এসব করেও লাভ নেই,, পারু সবটা জেনে শুনেই আমাকে ভালোবেসেছে এবং সারা জীবন বাসবে।
,,, পারু লজ্জা আরও সিটিয়ে গেলো,, ওখানে থাকা প্রত্যেকে পারুর মনের অবস্থাটা বুঝতে পারলো। তাই মাহিদ মির্জা ছেলের দিকে তাকিয়ে রাগি কন্ঠে বললেন– নির্লজ্জের বাচ্চা!! থাপরে তোমার গাল লাল করে দিবো আমি। এই রোমানা,সাথী!! মেয়েটাকে নিয়ে তার ক্যাবিনে যাও। এই ছেলের সাথে থাকলে মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
,,, সাথে সাথে এগিয়ে এলো দুজন। দ্বীপের আম্মু এসে দ্বীপের মাথায় হাত ভুলিয়ে কপালে চুমু একে দিলেন। দ্বীপ সন্তর্পনে মায়ের বুকে মাথা রাখতেই ঝরঝর করে কেদে দিলেন রোমানা বেগম। তিনি এই ছেলের আপন মা না হলেও ছোট থেকে বিহানের থেকে এক চুল পরিমান ও আলাদা নজরে দেখেনি। বড়ো ভাবি যেদিন মারা গেলেন সেদিনের পর থেকে তো উনি মনে মনে দ্বীপকে নিজের ছেলেই মেনেছেন। আর দ্বীপ তাকে আপন মায়ের জায়গা দিয়েছে,, ভালোবেসে সর্বদা বিহানের মতো আম্মু বলে ডেকেছে। সেই ছেলের এমন অবস্থা দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না তিনি। ছেলেকে বুকে নিয়ে কতো শত অভিযোগ করলেন তার ইয়োত্তা নেই। পারু দুচোখ ভরে দেখলো মা ছেলের কান্ড,, পারু এখনো জানেনা এই মহিলা যে দ্বীপের নিজের মা নয়। দ্বীপ বহু কষ্টে মায়ের কান্নাকাটি মিটিয়ে পারুকে মায়ের সাথে যাওয়ার আদেশ দিতেই পারু ও বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নত করে রোমানা বেগম আর সাথী বেগমের সাথে চলে গেলো,, ওরা যেতেই দ্বীপ বাবা চাচার দিকে তাকিয়ে রাগি কন্ঠে বললো — বউকে বুকে নিবো বলে এতো কষ্ট করে উঠে বসলাম আর আপনারা এসে সেই কষ্টে জল ঢেলে দিলেন? আমি যদি আপনাদের আব্বু হতাম না? তাহলে সবকটাকে বিয়ে ছাড়া ব্যাচলর বানিয়ে রেখে দিতাম। তখন বুঝতেন বউ ছাড়া থাকা কতো কষ্টের।
,,,মাহিদ মির্জা ছেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসে বুকের কাছের বেন্ডেজ ঠিক করে দিতে দিতে বললেন — বাপ হলেই সব করা যায় না। এই যেমন আমার এখন তোমাকে আর তোমার চাচাদের পায়ের সেন্ডেল খুলে পিটাতে ইচ্ছা করছে,, আমি কি একটাবারো সেন্ডেল খুলতে গিয়েছি?
,,,মাহিদ মির্জার কথায় মুখ থুবড়ে পরলো দুই ভাই। ভাইজান এইভাবে বলতে পারলেন? যতই হোক তারা একজন সম্মানিয় লোক। তাদের মতো এমপি মন্ত্রীদের যদি বড় ভাই সেন্ডেল দিয়ে পিটায় তাহলে জনগনের কাছে তাদের মুখ থাকবে? নাহ!! একদমি থাকবেনা। সবদিক ভেবে মাহিন মির্জা মুখ লটকে বললেন — ভাইজান!! মারতে হলে চটি দিয়ে মারবেন ওসব কমদামি সেন্ডেল দিয়ে মারলে আমার সম্মানে লাগবে।
,,, শাহিন মির্জা মাথা ঝাকিয়ে ছোট ভাইয়ের সাথে সহমত পোষন করে বললেন — হে ভাইজান!! আপনি চাইলে গুচ্ছি কিংবা জিমিচু ব্রেন্ডের জুতা ইউজ করতে পারেন। ঐগুলো খুব সুন্দর এবং ভালো মানের।
,,, বিহান ক্যাবিনের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো — এগুলো অনেক দামি হয় যায়না? আরেকটু সস্তা দেখে নাম বলেন,, এতো দামি জোতা আবার আপনাদের সাথে যায়না।
,,, সবার কনভারসেশনের হালোয়াত দেখে মেজাজ খারাপ হলো মাহিদ মির্জার। কতো বড়ো সাহস একেকটার,, উনার সাথে কিনা মজা নেয়? মাহিদ মির্জা সবকয়টাকে একবার একবার দেখে দাতে দাত চেপে বললেন — তোমাদের সবকটাকে আমি বাথরুমের সেন্ডেল দিয়ে পিটিয়ে,তারপর রাজনীতির ভুত মাথা থেকে নামাবো। বেয়াদবের হাড্ডি গুলো।
( এটকু পড়ে শব্দ করে হেসে দিলো অর্পনা। আল্লাহ!! এতো সুন্দর পরিবার বাস্তবে হয় নাকি? তার তো জানা ছিলোনা। জানবে কি করে? অর্পনার তো পাপ্পা ছাড়া কেউ নেই।)
২৩/০৪/২০১৯
,,, মাঝে কেটেছে একটা মাস। দ্বীপ আর পারুর সম্পর্কে এখন বারবারন্ত ভালোবাসা। দুজনের ভালোবাসার বিশেষত হচ্ছে তারা দুজনেই পাগল। এই এক মাসে এদের একজনের প্রতি আরেকজনের পাগলামি দেখে বিহান আর মেধা হাপিয়ে উঠেছে। সাথে মনে মনে দোয়া করেছে,, আল্লাহ যেনো সারাজীবন তাদের এই ভালোবাসাকে বাচিয়ে রাখে। আগে দ্বীপ সারাদিন রাজনিতী, ছেলেপুলে আর সি*গারেট নিয়ে মেতে থাকলেও এই একমাস ধরে সে বেশিভাগ সময় পারুর সাথেই কাটিয়েছে। দ্বীপ আর পারুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোমেন্ট গুলো লাইব্রারিতে বন্দি। একসাথে বই পড়া থেকে শুরু করে এসাইনমেন্ট তৈরি,, পারুর পড়া লেখায় সাহায্য করা,,মেধা আর বিহানকে নিয়ে আড্ডা দেওয়া আর সবকিছুর ফাকে দুষ্ট মিষ্টি প্রেম আলাপ করা,, এভাবেই কেটে গিয়েছে একটা মাস। আজকেও লাইব্রারিতে বসে আছে পারু, তার দৃষ্টি রাগান্বিত চেহারায় তাকিয়ে থাকা দ্বীপের দিকে স্থির। দ্বীপকে রাগে ফোস ফোস করতে দেখে পারু ভ্রু কুচকে বললো —
,,, কি হয়েছে দ্বীপ? এরকম খেপে আছো কেনো? কিছু বলবে?
,,, দ্বীপ চোখ গরম করে পারুর দিকে তাকালো পরপর দাতে দাত চেপে বললো — কাল রাতে ওসব কি বলেছিস?
,,, পারু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো — কি বললাম আবার?
,,,দ্বীপ রাগে কটমট করে পারুর হাত ধরে টেনে বুক সেল্ফের পিছনে নিয়ে এলো। এদিকটায় আপাতত কেউ নেই, সে নিজের মন মতো রাগ দেখাতে পারবে। বুক সেল্ফের পিছনে গিয়ে পারুকে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বললো — কই যাবি তুই?
,,, দ্বীপের কান্ডে একটু ও ভরকায়নি পারু,, এই লোকের কাজ ই এসব। কিছু হলেই খালি কাছে টেনে রাগ দেখাবে। তাই স্বাভাবিক স্বরেই বললো — ওহ ওটা? বাড়ি যাওয়ার কথা বলছি, দুমাস হয়ে গেলো বাড়ি যাইনা। আম্মু আব্বু বার বার কল দিচ্ছে বাড়ি যাওয়ার জন্য।
,,, দ্বীপ জেদি কন্ঠে বললো– যেতে হবেনা, না করে দে।
,,, পারু মাথা নত করে বললো — আমারও আব্বু আম্মুর কথা খুব মনে পরছে। কতোদিন হয়ে গেলো ওদের দেখিনা।
,,,দ্বীপ বিরক্তিতে কপাল কুচকালো। কি জ্বালা!! পারু চলে গেলে সে থাকবে কি করে? তার তো পারুকে ছাড়া দম বন্ধ বন্ধ লাগে। দ্বীপ পারুর গালে হাত রেখে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো– বাড়িতে যাবি যা, এরপর আমি কিভাবে থাকবো সেটাও বলে যা। তকে ছাড়া আমার দম বন্ধ হয়ে আসে পারু,, পাগল পাগল লাগে।
,,,দ্বীপের সরল স্বীকারোক্তিতে প্রশন্ন হাসলো পারু,, সে পা উচিয়ে দ্বীপের গলা জড়িয়ে বললো — দুটো দিন থেকেই চলে আসবো বেইব,, একটু মেনেজ করে নেও।
,,, এই দুটো দিন কিভাবে থাকবো? সেটা বলে যা।
,,, দ্বীপের মুখে বারবার তুই তুকারি শুনে পারু কিছুটা রাগি কন্ঠে বললো— তুই তুকারি করছো কেনো? তুমি এভাবে তুই তুকারি করলে আমিও তোমাকে আপনি আপনি করে বলবো। বলবো? বলো, বলবো?
,,,দ্বীপ পারুর চুলের বেনি হাতে পেচিয়ে শক্ত করে ধরে মুখটা একদম নিজের মুখের সমানে এনে বললো — বলে দেখ,, মেরে ফেলবো একদম।
,,, তুমি বলতে পারলে আমিও পারবো। ( মুখ বাকিয়ে)
,,, দ্বীপ অসহায় কন্ঠে বললো — যাসনা বেইব,, আমি থাকতে পারবোনা।
,,, পারু হাত উচিয়ে দ্বীপের গালে আদুরে হাত ভুলিয়ে বললো — প্লিজ বেইব!! আমি তোমাকে প্রতিদিন কল করবো। প্লিজ এমন করোনা, যেতে দাও।
,,,, যেতে দিলে আমাকে কি দিবি? কি পাবো আমি?
,,,কি চাই তোমার?
,,, দ্বীপ পারুর নাকে নাক ঘষে মাদকিয় কন্ঠে বললো — কাছে চাই, খুব কাছে, যতটা কাছে এলে আমাদের মাঝে চুল পরিমান দূরত্ব থাকবেনা।
,,,দ্বীপের কথার মানে বুঝতেই লজ্জায় লাল হয়ে গেলো পারু, সে আমতা আমতা করে বললো — আগে বিয়ে হোক, তারপর।
,,,দ্বীপ মুচকি হাসলো, এই মেয়ে কি ভেবেছে? সে বিয়ের আগেই পারুকে কাছে চাইবে? দ্বীপ কি এতোটাই অভদ্র? ওহুম!! একদমনা। দ্বীপ আরেকটু নরম স্বরে আবদার ভরা কন্ঠে বললো — তাহলে চলো বিয়ে করি, তুমি বললে এখন এই মুহুর্তে বিয়ে করবো।
,,, পারু সাথে সাথে নাকোচ করে বললো — এখন না বেইব,, কটাদিন সময় দেও, আমি আব্বুর অনুমতি ব্যাতিত বিয়ে করতে পারবোনা।
,,,তাহলে তোমার বাড়িতে আব্বু আর চাচ্চুকে পাঠাই? আমাদের বাড়ি থেকে প্রস্তাব পাঠালে তোমার বাবা নিশ্চয়ই তিনি অস্বীকার করবেনা?
,,, বেইব !! বুঝার চেষ্টা করো, আব্বু এখন আমার বিয়ের কথা মানবে না। যতো ভালো জায়গাই হোক সোজা না করে দিবে।
,,, পারুর নাকোচে অশান্ত হলো দ্বীপ, সে অত্তন্ত আবেগি কন্ঠে বললো — আমাদের ভালোবাসার কথা বললেও বুঝবেনা? চলোনা বেবি, বিয়ে করে নেই। আমার তোমাকে ছাড়া ভালো লাগেনা।
,,, পারু দ্বীপের গালে হাত ভুলিয়ে বুঝানোর মতো করে বললো — আমাদের ভালোবাসার কথা আব্বু জানলে খুব কষ্ট পাবে দ্বীপ। আমার আব্বু অন্য পাঁচ জন ব্যাক্তির মতো না গো,, তিনি খুব আত্মসম্মানি লোক। এসব প্রেম ভালোবাসা পছন্দ করেনা।
,,, অধৈর্য হলো দ্বীপ,, আবারো পারুর চুল টেনে হিসহিসিয়ে বললো — তাহলে আমি কি করবো? বল কি করবো? আমার তো তকে ছাড়া ভালো লাগেনা পারু,, এক কাজ করি,, মরে যাই আমি। তুই ও শান্তি পাবি আর তর বাপ ও শান্তি পাবে।
,,, দ্বীপের পায়ের উপর পা রেখে উচু হয়ে দাড়ালো পারু,, পরপর আদুরে কন্ঠে বললো — বেইব !! এসব বলেনা, আমাকে একটা বছর সময় দাও,, তোমার এক্সামটাও শেষ হোক। এর মধ্যে আমি ঠিক কিছু না কিছু করে আব্বুকে মানিয়ে নিবো। প্লিজ বেবি!! তুমি আমাকে না বুঝলে কে বুঝবে বলো?
,,, পারুর কান্ডে থমকে গেলো দ্বীপ,, মেয়েটা তার এতো কাছে চলে এসেছে যে দ্বীপ নিজেকে ঠিক রাখতে পারছেনা। সে খেই হাড়িয়ে পারুকে আরও উপরে তুলে নিজের সাথে মিশিয়ে দাড় করালো। কিছুটা উচু হতেই পারু দ্বীপের চোখে মুখে শব্দহীন চুমুতে ভরিয়ে দিলো। পরপর দ্বীপ ও পারুর চোখে মুখে ছোট ছোট চুমু খেয়ে চুলের ভাজে নাক ডুবিয়ে দিতেই ততক্ষণাৎ বুক সেল্ফের অপর পাশ থেকে বিহান গলা খাকারি দিয়ে বললো — আপনাদের প্রেম করা শেষ হলে ক্যান্টিনে আসুন, আম্মু খাবার পাঠিয়েছে।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৪
,,পারু ছিটকে দূরে সরে গেলো, পরপর দৌড়ে লাইব্রারির থেকে প্রস্থান করলো । পারু যেতেই বিরক্তিকর দৃষ্টি ফেললো দ্বীপ। এদের জন্য শান্তিতে একটু প্রেম ও করা যায় না। পারুকে একটু ভালোবাসতে নিলেই সবার ডাকাডাকি শুরু হয়ে যায়।
