Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১১

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১১

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১১
তোনিমা খান

পুরোনো দিনের অভিজ্ঞতা হয় আগামী দিনের পথচলার চাবিকাঠি। বিগত দিনের বাজে অভিজ্ঞতায় তপোবন আজ ফজরের আজানের আগেই উঠে বসে আছে। ফ্রেশ হয়ে জায়নামাজ নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বের হয়ে ছেলের ঘরে ঢুকলে অবাক হলো। ছেলে বিছানায় নেই, এমনকি ঘরেই নেই। সে পুরো ঘরময় খুঁজে দারোয়ান চাচার থেকে জানতে পারল তানশান তার দাদুভাইয়ের সাথে কিছুক্ষণ আগেই মসজিদে গিয়েছে। তপোবনের ললাটে ভাঁজ পড়ল এত তাড়াতাড়ি তো তারা মসজিদে যায় না। আর তাকে না বলে তো তানশান কখনো যাবেই না, তবে? গতকালের কথা মনে পড়তেই সে ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়, ছেলে কি তাকে এড়িয়ে চলছে? সে একাই মসজিদে গেল নামাজ পড়ল, অতঃপর বাবা আর ছেলের সাথেই বের হয়। তপোবন দেখলো ছেলেটা তার থেকে দৃষ্টি লুকাচ্ছে। সে ছেলের হাত আঁকড়ে ধরে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তানশান তখনো নত শির চুপটি করে দাঁড়িয়ে। তপোবন জানে ছেলে তার চুপচাপ ভীষণ নরম— তবে অস্বাভাবিক আচরণ ও ধরতে পারে। তপোবন ছেলের খোলা লালচে কানে নিজের গলার মাফলার খুলে পেঁচিয়ে দিতে দিতে ডেকে ওঠে,

–“আব্বু! কি হয়েছে? শরীর খারাপ করছে?”
–“নো পাপা! আমি ঠিক আছি। চলো দাদুভাইয়ের কাছে যাই।”, তানশান ক্ষীণ স্বরে বলেই জোর কদমে তকদির সিকদারের কাছে চলে গেল। তপোবন সেদিকে তাকিয়ে থাকে স্থির দৃষ্টিতে—সন্তান বাবার থেকে দৃষ্টি লুকায়, এড়িয়ে চলে এর থেকে কঠিন দৃশ্য বোধহয় আর কিছু নেই পৃথিবীতে। সে তপ্ত শ্বাস ফেলে ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। অভ্যাস অনুযায়ী এক হাতে বুকের সাথে আগলে দাঁড়ায়। সম্মুখের বুজুর্গ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধার সাথে সালাম বিনিময় করে আলাপে মগ্ন হয়। প্রাতঃকালের বাকি পুরোটা সময় তানশান যেভাবে পেরেছে বাবাকে এড়িয়ে চলেছে। যেন সে একা চলতে শিখছে।
বেলা গড়িয়ে তখন সকাল দশটা। আজ সরোবর অতিথির আগমনে মুখরিত। নতুন বউ আর ছেলের আগমনে নির্জনা বেগম সবাইকে ফোন দিয়ে দিয়ে সুসংবাদ জানিয়েছে। তন্মধ্যেই কিছু নিকটস্থ স্বজনরা ছুটে এসেছে তাদের দেখতে। আজ দ্বিতীয়বার আবারো রূপকথার কাঁধে বিশাল দায়িত্ব পড়েছে রান্নাবান্নার। তবে আজ মৌনতাকে রান্নাঘরে ঢোকার আর রূপকথাকে সাহায্য করার অনুমতি দিয়েছে নির্জনা বেগম।

পুরো কোম্পানির মূল চালিকাশক্তি তপোবন হওয়ায় তার কাজে গাফলতি দেয়ার কোন সুযোগ নেই। তাই সময় হতেই তাকে ছুটতে হয় জীবিকার তাগিদে। আর তানশান সে ছোট ছোট স্বাভাবিক বিষয়েও বাবার অবজ্ঞা খুঁজে নিচ্ছে নিজের অজান্তেই। কোনমতেই ম্যাথে মনোযোগ দিতে পারছে না সে। মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক টানাপোড়েন, প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার ভয় ক্রমশই তার মস্তিষ্ক গ্রাস করে নিচ্ছে। মস্তিষ্কে শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খায় মাম্মার পরে কি তবে বাবাও তার থেকে দূরে সরে যাবে?
একটাসময় মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক টানাপোড়েনে অতিষ্ট হয়ে তানশান ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। একটু অস্থিরতা কমাতে, শান্তি খুঁজতে। তবে পরিস্থিতি আর শান্তি যেন এই মুহূর্তে বিপরীতমুখী তানশানের জন্য।
–“বউমার বয়স কি একটু বেশিই কম হয়ে গেল না, ভাবিজান? কম বয়সী মেয়ে এর জন্যই বুঝি তপোবন এত বছর পর বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়ল, তাও এত অল্পসময়ের মধ্যে?”

–“আমারো সেটাই মনে হচ্ছে ভাবিজান। এই বয়সে এসে এমন যুবতী মেয়ে পেয়েছে দেখেই তপোবন তাড়াহুড়ো করে বিয়েটা করে নিলো।”
–“পড়াশুনা কতোদূর করেছে? বিয়ের পড়েও কি পড়াশুনা করাবেন? এতোটুকু মেয়ে ঘর সংসার পড়াশুনা সব একসাথে সামলাবে কি করে?”
–“মেয়েদের আর বয়স! বিয়ে হলে তারা আর ছোট থাকে না। স্বামী সংসারের দায়িত্ব মাথায় পড়লে আপনাআপনি তারা বড়ো হয়ে যায়। আর পড়াশুনার কি দরকার? স্বামীর সামার্থ্য থাকলে মেয়েমানুষের ঘর থেকে না বের হওয়াই ভালো। দিনকাল যা খারাপ!”

এমনি একের পর এক অনেক মানুষের তিক্ত কথোপকথনে তানশানের অন্তরালের তিক্তরা যেন আরো উস্কানিমূলক বার্তা পেল। অন্তরালে বাবার বিয়ে নিয়ে তিক্ততা গভীর থেকে গভীর হতে লাগলো। ঝিমিয়ে পড়া দেহ টেনে তানশান ধীরস্থির দোতালার করিডর থেকে উঁকি দিয়ে তাকায় নিচে। লিভিং রুমে অতিথিরা ভীড় জমিয়েছে। সকলের এই আগমনের কারন ,উৎসুকতা এবং মধ্যমনিকে দেখে বুঝতে বাকি রইলো না—যে অভ্যন্তরীণ শান্তি খুঁজতে এসে অশান্তি, অস্থিরতা, ক্লেশ আরো বেড়ে গিয়েছে।
নির্জনা বেগম গম্ভীর থমথমে মুখটি তুললেন। অতিথির দিক থেকে চোখ সরিয়ে, মেজো বউয়ের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু বলতেই মৌনতা নিরবে রূপকথাকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। নির্জনা বেগম হাতের কুশিকাটা চালাতে চালাতে অতিথিদের উদ্দেশ্যে গমগমে স্বরে বললেন

–“আমার বাড়ির বউদের কাছে স্বামী, সংসার হয় তাদের মাথার তাজ, তাদের সম্মান। তাদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয় স্বামী, সংসার। এইসব পড়াশুনা তো শুধু আক্ষরিক জ্ঞান যা আমার পুত্রবধূদের পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। আর প্রয়োজন নেই। এই নিয়মটি সকলের জন্যই প্রযোজ্য। আর আমার তপোবন বিগত দশ বছরে যখন নিজের স্বার্থ খোঁজেনি, তখন এই বিয়ের পেছনেও তার কোন স্বার্থ খুঁজো না। তার কাছে তার মায়ের কথাই শিরধার্য। সে আমার কথায় বিয়ে করেছে, আশাকরি তোমাদের অযাচিত কৌতুহল মিটেছে। তোমরা মিষ্টি মুখ করো কথা তো হবেই।”
নির্জনার সুস্পষ্ট গম্ভীর কন্ঠে অতিথিদের মুখটা ছোট হয়ে গেল। তারা কৃত্রিম হেসে মিষ্টি মুখে তুলে নেয়। তবুও দমে না গিয়ে পুনরায় বলেন,

–“না আমি তো আপনার ভালোর জন্য বলছিলাম, ভাবিজান। অল্পবয়সী মেয়েদের চাহিদা তো আবার অন্যরকম হয় তাই না? তপোবন যদি যুবতী বউয়ের কথায় এসে পড়াশুনা করায়? এর পরিণতি যে খুব একটা ভালো হবে না, তা আপনার থেকে কে-ই বা ভালো জানে!”
নির্জনা বেগমের হাত থেমে গেলো। মস্তিষ্কে উল্টেপাল্টে গেল কিছু বিদঘুটে স্মৃতিরা। বুক জুড়ে হাহাকার জুড়তে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয় নির্জনা বেগম। পুনরায় হাত চালাতে চালাতে থমথমে মুখে বললেন,
–“আমি থাকতে এমন কিছু কখনো হতেই দেবো না।”
–“সেটা তো জানিই ভাবিজান। আপনার এই ঘর সংসার কতোটা মূল্যবান আপনার জন্য। তপোবনকে বলবেন শিঘ্রই বাচ্চা নিয়ে নিতে। বউমাও তাহলে সংসারে মনোযোগী হবে আর তানশানের তো বয়স হচ্ছে।”
–“আর এরোজের দিকেও এবার একটু মনোযোগ দিন ভাবিজান। একটা বিয়ে দিয়ে ঘর সংসারের প্রতি মনোযোগী করেন।”

সিকদার পরিবার নিয়ে রাজ্যের সব চিন্তা স্বজনদের-ই। নির্জনা বেগম কোন জবাব দেয় না। সে নীরবে নিজ কর্মে লিপ্ত থাকে। তানশানের কর্নদ্বয়ে বারি খেল বাবার নতুন একটি পরিবারের কথা শুনতেই। মস্তিষ্কের চিন্তারা দূর্বার গতিতে বিস্তৃত হতে লাগল। বাবা! তপোবন তার বাবা। কিন্তু বাবার এখন একটা নতুন পরিবার হবে, যেই পরিবারের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ থাকবে সে। সেই পরিবারটিতে কি তার কোন অবস্থান থাকবে? না-কি তানশান মিলিয়ে যাবে অবহেলার আড়ালে। পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকা অজশ্র কু-চিন্তা, বাবার ভালোবাসা হারানোর ভয় দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে। দুশ্চিন্তা ক্রমেই অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণায় পরিনত হতেই তানশান অস্থির হয়ে পড়ল। কিছু ভালো লাগছে না, কোন শান্তি নেই; কোথায় যাবে এখন তানশান? কার কাছে শান্তি খুঁজবে? একটাই জায়গা। টলমলে দৃষ্টি ফেলে রেলিং ছেড়ে তানশান ছুটে যায় নিজের ঘরে। মায়ের মৃত্যুর পরেও মা তানশানের মন ভালো করার বহু উপায় রেখে গিয়েছে। যেগুলো তানশানের ঠুনকো মন খারাপকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়ার সামার্থ্য রাখে। আজো তানশান তার-ই সহায়তা নিলো তবে মন ভালো করার জন্য নয়। আজ যে তার মন খারাপ নয়। বাবার থেকে দূরত্ব তৈরির যন্ত্রনায় সে তরপাচ্ছে। ক্ষিপ্র হাতে বিছানার বালিশ গুলো উল্টেপাল্টে নিতেই কাঙ্খিত ডাইরিটা বেরিয়ে আসল। তানশান সেটি খপ করে আঁকড়ে ধরে ব্যস্ত হাতে ডাইরির পৃষ্ঠা উল্টিয়ে সর্বশেষ পৃষ্ঠার তিন পৃষ্ঠা পূর্বে সমাপ্তি পৃষ্ঠাটা বের করে। গোটা গোটা অক্ষরে মায়ের বিচ্ছেদের যন্ত্রণা বর্ণনা পড়তে লাগলো সে। যেন যন্ত্রণা আরো গভীর হয়!

❝তানশান…! আব্বু…! ~কথাটিতে লুকিয়ে ছিল এক না বলতে পারা, না বোঝাতে পারা এক দীর্ঘশ্বাস।
মা ইদানিং খুব অসুস্থ থাকি আব্বু। ডক্টর বলেছে তোমার ভাই-বোন আর আমি ঠিক নেই। কতক্ষণ ঠিক থাকব তারা জানে না, আব্বু। তুমি যখন বড় হবে তখন তোমার পাপার মতো তুমিও মাম্মার উপর অভিমান করবে তাই না? আমি তোমার অভিমানের হকদার, আব্বু! আমি আর তোমার পাপা তো খুশি ছিলাম তোমায় নিয়ে—তবে কেন আমি জেদ করলাম, আর কেনই বা তোমার পাপার অবাধ্য হলাম! আমার জেদ যে এমন ভয়ঙ্কর পরিণতির কারন হবে আমি বুঝতে পারিনি, আব্বু। মৃত্যু যন্ত্রনা ও হয়তো আমায় এতটা কষ্ট দিতে পারবে না, যতটা কষ্ট আমি এটা ভাবলে পাই—যে তুমি আমায় ছাড়া বড়ো হবে। তুমি তো আমায় ছাড়া ঘুমাও না আব্বু, তুমি কিভাবে ঘুমাবে? তোমায় কে খাইয়ে দেবে? তোমায় গোসল করিয়ে দেবে কে? তুমি হেসে কার বুকে মুখ লুকাবে? তোমার মন খারাপ হলে কার কাছে এসে অভিযোগ করবে তুমি? আমি তখন বারংবার মৃত্যু যন্ত্রনা অনুভব করব, যখন তুমি আমায় খুঁজবে কিন্তু আমায় কাছে পাবে না। কখনো ছুঁতে পাবে না মাকে। মা তোমায় আর তোমার পাপাকে খুব মিস করব, তানশান। তোমায় বড় হতে দেখতে না পারার অতৃপ্ততা নিয়েই আমায় যন্ত্রনাদ্বায়ক এক মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে। সৃষ্টিকর্তা আমার জেদের মাশুল হিসেবে আমায় এতো কঠিন মৃত্যু কেন দিল, তানশান?❞
নীরবে পড়তে পড়তেই তানশান হেঁচকি তুলে কেঁদে উঠল। অশ্রুসিক্ত নয়নে পুরো পৃষ্ঠাটিতে এলোপাথাড়ি চুমু দিয়ে ভাঙা কন্ঠে অনুনয় করে বলতে লাগল

–“মাম্মা? মাম্মা আই মিস ইউ। আই মিস ইউ ব্যাডলি। তোমাকে আমার খুব প্রয়োজন, মাম্মা। আমায় একা ফেলে চলে গেলে কেন? আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে। একটু আসো না আমার কাছে। তুমি নেই, পাপাও যদি আমার থেকে দূরে সরে যায় তবে আমি কিভাবে থাকব?”
মায়ের কাছে আহাজারি করতে করতেই তানশান ডায়রিটা বুকে জড়িয়ে গুটিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়।

চাপিয়ে রাখা দরজা খুলতেই আবছা অন্ধকার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। তানশান ধীরপায়ে ঘরে ঢুকে দরজাটা পুনরায় চাপিয়ে রেখে বারান্দার কাছে এগিয়ে যায়।
বারান্দার থাই গ্লাস আবৃত পর্দা খুলে দিতেই আলোয় ঝলমলিয়ে উঠলো পুরো ঘর। সেই আলোয় দৃশ্যমান কোমড়সমান কম্ফোর্টারের আড়ালে থাকা সুবিশাল নগ্ন দেহাবয়ব। চোখে মুখে আলো পড়তেই এরোজ চোখমুখ কুঁচকে নিলো। তানশান এগিয়ে যায় বিছানার কাছে। ভাঙা গলায় ডাকে।
–“ছোট পাপা? তুমি কি আরো ঘুমাবে?”
মাদকের কারণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এরোজ মৃদু নড়েচড়ে উঠল তানশানের ডাকে। তানশান আরো কয়েকবার ডাকলো।

–“ছোট পাপা, আমায় একটু সাহায্য করবে?”
পুনরায় তানশানের অনুনয় ভরা কন্ঠে এরোজ তড়াক চোখ মেললো। সাথে সাথেই দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ধূসর বর্নের দুটো চোখ। সিকদার বাড়িতে চারজনের চোখের মনির রং ধূসর বর্নের। তপোবন, তানশান, এরোজ আর নায়েলের। আর কারের চোখ এমন সাদাটে ধূসর বর্নের নয়। এরোজ জড়ানো দৃষ্টিতে পিটপিট করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে সে কোথায়! মাথা সঠিক জায়গায় আসতেই তানশানের বিবর্ণ মুখটি দেখে এরোজের চোখেমুখে উদ্বিগ্নতা ছেয়ে গেল। সে তড়িৎ উঠে বসে। একহাত তানশানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জড়ানো কন্ঠে শুধায়,
–“কি হয়েছে আব্বু, চোখেমুখের এই অবস্থা কেন? কেঁদেছো?”
চাচার বাড়িয়ে দেয়া হাতটিতে হাত রাখতেই এরোজ একহাতে আগলে নেয় তানশানকে। পুনরায় আদুরে গলায় শুধায়,
–“কি হয়েছে আব্বু?”
–“আমায় একটু নানুর বাসায় দিয়ে আসবে ছোট পাপা?”, তানশানের ভাঙা গলায় এরোজ অবাক চোখে তাকায় তার দিকে।

ক্রন্দনরত তানশান, এরোজ সহ বাড়ির সকলের কাছে বিরল। বছরে ঠিক কয়েকবার নির্দিষ্ট ক্ষনেই তানশানকে কাঁদতে দেখা যায়। আর সেটা হলো নিজের জন্মদিনে, মায়ের জন্মদিনে আর মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে। তবে আজ তো তেমন কিছুই না তাহলে কাঁদছে কেন? এরোজ যতোই মাতাল, উগ্র, রাগচটা হোক না কেনো তানশান আর নায়েলের জন্য সে পানির ন্যায় সরল, স্বচ্ছ। তাদের জন্যই তো এতদূর ছুটে আসা। বিশেষ করে তানশানের জন্য। তানশান হ্যাঁ বললে হ্যাঁ, না বললে না। এরোজ গভীর দৃষ্টিতে তাকায় তানশানের ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখা থমথমে মুখটির দিকে। ফর্সা বরণ বাবা চাচার মতো ফোলা ফোলা মুখের নিষ্পাপ আদল লালচে বরণ ধারণ করেছে। আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেই হয়তো ভারী হয়ে আসা চোখ মুখ ঠিকরে কান্না বেরিয়ে আসবে। উদ্বিগ্নতা সামলে এরোজ বিছানা থেকে নামে। ঘুমের ঘোরে শীত অনুভূত না হলেও এখন নগ্ন দেহে শিরশির জাগাচ্ছে শীতল আবহাওয়া। দ্রুত গায়ে টিশার্ট জড়িয়ে তানশানকে বুকে আগলে নেয়। ভার হয়ে আসা মুখটি ঠেকলো প্রশস্ত বক্ষে। কাঁটা কাঁটা চুলগুলোতে হাত গলিয়ে এরোজ নম্র কন্ঠে শুধায়,

–”কেঁদেছো কেন আব্বু? কিছু হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?”
বুকে মাথা ঠেকিয়ে তানশান না বোধক মাথা নাড়ে। এরোজ পুনরায় শুধায়,
–”তবে কি হয়েছে? ছোট পাপাকে বলা যাবে না?”
এবারেও তানশান না বোধক মাথা নাড়লো। এরোজ আর জেরা করে না।
–”নানুর বাসায় যাবে এখুনি?”
তানশান হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে। এরোজ অবিলম্বে রাজি হয়ে গিয়ে বলল,
–”ঠিক আছে, এখুনি যাবে নানুর বাসায়। আমি ফ্রেশ হয়ে আসি তুমি ততক্ষণে তৈরি হয়ে নাও।”
তানশান মাথা নেড়ে নিরবে পা বাড়ায়। এরোজ ম্লান কন্ঠে পিছু ডেকে উঠল,
–”তানশান?”
তানশান ফিরে তাকায়। এরোজ বেডসাইড ছোট্ট কাবার্ডের ড্রয়ার থেকে একটা চকলেট বের করে সেটি তানশানের হাতে দেয়। এরোজ নিগুঢ় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে তানশানকে। তবে পছন্দের চকলেটটি পেয়েও রোজকার মতো সেই কামনীয় প্রতিক্রিয়াটি তানশানের মাঝে দেখতে পেলো না এরোজ। তানশান চকলেটটির দিকে এক পলক তাকায় বলল,

–”ধন্যবাদ ছোট পাপা।”
বলেই সে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। গভীর ভাবনায় পড়তে হয় এরোজকে। তানশান সহজে এমন অস্বাভাবিক আচরণ করে না। সে ম্লান দৃষ্টিতে তানশানের গমনের পথে তাকিয়ে থাকে। সকালে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কারোর মুখে অস্পষ্ট শুনেছিল বড় ভাইজান নাকি কচি মেয়ে পেয়ে তাড়াহুড়ো করে বিয়ে করেছে। মস্তিষ্ক তখন এই কথাটিকে একটুও গুরুত্ব না দিলেও, এখন সেই কথাটির’ই আধিপত্য মস্তিষ্ক জুড়ে। ছেলেটাকে এতোটা ভঙ্গুর কখনো লাগেনি তবে আজ কেন এমন লাগছে? মস্তিষ্কে ছেপে গেলো কিছু যন্ত্রনাময় স্মৃতি, যেখানে ছোট্ট এরোজ মায়ের জন্য তড়পাতে তড়পাতে আজ মা নামক শব্দটি আজ তার কাছে অনুভূতিহীন। তবে কি তানশান ও তার মতো তড়পাচ্ছে? এই কষ্টে সে কিভাবে দেখবে ছেলেটাকে, যেই অসহনীয় কষ্ট সে নিজে অনুভব করে এসেছে। কখনোই না! সে যেটা সহ্য করেছে সেটা তানশানকে কখনো সহ্য করতে দেবে না।
সে দৃষ্টি সরিয়ে বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করে এরোজ। কাউকে একটা বার্তা পাঠিয়ে পুনরায় সেটি বিছানায় রেখে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।

নায়েলকে গোসল করিয়ে, ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে, পোশাক পরিয়ে তাকে বারান্দার রোদে বসিয়ে দিয়েছে মৌনতা। তাকে বসিয়ে নিজেও চটজলদি গোসল করে নেয়। নায়েলকে গোসল করাতে গেলে সেও ভিজে যায়। মৌনতা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। তার দৃষ্টি গিয়ে আটকায় বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নায়েলের ছলছল নয়নদ্বয়ের দিকে। মৌনতা বোকাসোকা হাসলো নায়েলের হাতে চকলেটের খালি বক্সটা দেখে। নায়েল টলমলে আঁখি তুলে মায়ের দিকে তাকায়। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাতের বক্সটি দেখিয়ে রাগান্বিত স্বরে শুধায়,
–”তুমি আবালো আমাল চকলেট খেয়ে ফেলেছো?”
মৌনতা ভুবন ভোলানো হেসে আহ্লাদি গলায় বলল,
–”আসলে মা হয়েছিল কি তুমি তো ওটা অর্ধেক খেয়ে রেখে দিয়েছিলে। এগুলো বেশিদিন রাখলে তো নষ্ট হয়ে যায়, তাই আরকি আমি খেয়ে ফেলেছি।”
নায়েল মোটেই শুনলো না মায়ের মন ভুলানো কথায়। সে আঁটকে রাখা কান্না ছেঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। মা সবসময় এমনি করে, তার চকলেট খেয়ে ফেলে। মৌনতা তড়িঘড়ি করে মেয়েকে কোলে তুলে নেয় অপরাধী কন্ঠে বলল,

–”মা দুঃখিত! দুঃখিত! চকলেট কি একটা আর দুইটা? তুমি তোমার ছোট পাপার কাছে যাও, সে এখনি তোমায় অনেকগুলো চকলেট দেবে।”
–”না, আনবো না। আনলেই তুমি খেয়ে ফেলবে।”, নায়েল কাঁদতে কাঁদতে জেদি গলায় বলল। মৌনতা মেয়েকে এটাসেটা বলে বুঝ দিতে লাগল। অতঃপর মেয়ের কান্না থামল, তাও একটা শর্তে। সেটা হলো মা আর তার চকলেট খেতে পারবে না আর মাকে দশ বার কান ধরে উঠবস করতে হবে। মৌনতা অবিলম্বে মেনে নেয় মেয়ের শর্ত। ছোট ভাইজান সবসময় একটা চকলেট পাঠায় বিদেশ থেকে যেটা খুবই সুস্বাদু। তানশান আর নায়েলের পছন্দের চকলেট। এর জন্যই মূলত নিয়ম করে ছোট ভাইজান এই চকলেট পাঠায়। যেটা তার-ও খুব পছন্দের। তাই নায়েলকে যখনি এরোজ এই চকলেট দেয় তখনি তাতে অর্ধেক ভাগ বসায় সে। নায়েলের কথামতো মৌনতা পাঁচ বার উঠবস করতেই হাঁফিয়ে উঠল। সে হাঁফ ছেড়ে বলল,
–”মা, আর পারছি না। পায়ে ব্যাথা মা, ছেঁড়ে দাও। এবারের মতো স্যরি। আর কখনো তোমার চকলেট খাবো না।”
নায়েলের থমথমে মুখটি ঠিকরে তখন খিলখিলিয়ে হাসি বের হয়ে আসল, মাকে হাঁফিয়ে যেতে দেখে। ব্যঙ্গ করে বলল,

–”তুমি উঠবস করতেও পালো না? তোমাল তো কোন শক্তি নেই। তুমি জানো আমি বিশ বাল উঠবস করতে পালি।”
–”ইশশ! নায়েল তো মায়ের থেকে বেশি শক্তিশালী।”
মৌনতা দুঃখি মুখ করে তাকালো মেয়ের দিকে। নায়েল মাকে তাড়া দিয়ে বলল,
–”হুম, আমি শক্তিশালী। আমি এখন যাই ছোট পাপাল কাছে যাই। দুই টা চকলেট নেবো তাল কাছ থেকে।”
বলেই সে একছুট লাগায়।
আরশিতে ভেসে ওঠা উদাম সুবিশাল অবয়বের আদ্যোপান্ত চোখ বুলায় এরোজ। ম্লান হাসি ফুটে ওঠে তার ওষ্ঠপুটে। দেখতে শুনতে এই সুগঠিত দেহটাকে ইদানীং বয়ে চলতে ইচ্ছে হয় না। দেহের আড়ালে বিষন্ন ঐ মনটি যে সর্বহারা। সেই মনটি হাসতে জানে না, খুশি হতে জানে না, তার মধ্যে বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই, জীবন উপভোগ করার ইচ্ছা নেই। এভাবে সেভাবে শুধু দিন গুনছে কবে অন্তঃস্থলের অসহ্য দহন থেকে মুক্তি পাবে। মৃত্যু ব্যতীত যে এই দহন ফুরাবার উপায় নেই। আর সে মৃত্যুর অপেক্ষায়। সৃষ্টিকর্তার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করবে কেনো তার মনে ক্ষণকালের ঐ অনুভূতিগুলোর এতো তীব্র রাজত্ব? আর কেনই বা সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেকবার তার প্রিয় মানুষগুলোর ক্ষীণ অনুভূতি অনুভব করিয়ে তার থেকে কেড়ে নেয়।

–”তুমি কি আমায় দু’টো চকলেট দেবে? তাহলে আমি তোমায় দু’টো আদল দেব।”
লেনাদেনার দারুণ অফারে এরোজের উদাসীনতা ভঙ্গ হলো। শীতল দৃষ্টিতে তাকায় আয়নায় ভেসে ওঠা ছোট্ট অবয়বের দিকে। মুখে স্নেহের হাসি ফুটে উঠলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কোমড়ে পেঁচিয়ে রাখা তোয়ালে আরেকটু জোরদার করে সে পিছু ফিরে তাকায়। দরজার বাইরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে নায়েল। এরোজ সেখানেই দাঁড়িয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বলল,
–”আগে দাও, তারপর দিচ্ছি।”
–”এখানে, কাছে এসো দিচ্ছি।”, নায়েল হাত নেড়ে ডাকল। এরোজ একই ভাবে বলল,
–”প্রয়োজন তোমার, তুমি এসো।”
–”তুমি খুবই দুষ্টু ছোট পাপা। তুমি জানো না তোমাল ঘল থেকে পঁচা গন্ধ আসে, আমাল ভালো লাগে না?”, নায়েল ঘরে ঢুকে রাগান্বিত গলায় বলল। এরোজ নির্বিকার দাঁড়িয়ে। নায়েল হাত নেড়ে তাকে নিচু হতে বলল। এরোজ হাঁটু গেড়ে বসে এবং সাথে সাথেই দুটো পাতলা ঠোট ছুঁয়ে গেল খোঁচা খোঁচা দাড়ি যুক্ত দুই গালে। এরোজ স্মিত হেসে তানশানকে দেয়া সেই একই ড্রয়ার থেকে দু’টো চকলেট বের করল। সেটি হাতে রেখেই নায়েলকে জিজ্ঞাসা করে,
–”গতকাল যে এক বক্স দিলাম সেগুলো কোথায়? আজ আবার দু’টো কেন? ”

নায়েল ভুবনভুলানো হাসি উপহার দিল। বিলম্বহীন মাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে, অভিযোগ করে বলল,
–”আমি গুড গাল, ছোট পাপা। মাম্মা ব্যাড গাল। মাম্মা সবসময় আমাল চকলেট খেয়ে ফেলে। আজো আমার চকলেট খেয়ে ফেলেছে। আমি বেশি চকলেট খাই না। দাও, এই দু’টো আমায় দাও।”
এরোজ শীতল দৃষ্টিতে তাকায় নায়েলের দিকে। অতঃপর ড্রয়ার থেকে আরো একটা চকলেট বের করে তিনটা চকলেট নায়েলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
–”আগামী তিনদিনে যেনো তোমায় চকলেটের ধারেকাছে না দেখি। প্রতিদিন একটার বেশি চকলেট পাবে না।”
–”তিনদিন?”, নায়েলের কন্ঠে বিস্ময়। এই চকলেট তো এক নিমিষেই শেষ হয়ে যাবে। তিনদিন সে এই চকলেট ছাড়া থাকবে কি করে? এরোজ মাথা নেড়ে বলল,

–”হুঁ, তিনদিন।”
নায়েল মানতে পারলো না। সে বিরোধিতা করে বলল,
–”আমি বলেছি তো, আমি বেশি চকলেট খাই না। এগুলো মাম্মা খেয়ে ফেলেছে নয়তো আজ আল চকলেট চাইতাম না। তবে তুমি কেনো আমায় পানিশ কলছো?”
–”নো মোর আর্গুমেন্ট নায়েল।”, এরোজের গম্ভীর কণ্ঠ।
–”ইউ আল আ ব্যাড বয়, ছোট পাপা।”, নায়েল অসন্তোষের সাথে বলল।
–”তোমার ইংলিশ খুব বাজে নায়েল।”
–”নো, গুড।”
নায়েল কোমড়ে হাত দিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল। সে নিখুঁত ভাবে পরখ করে সেই ফুলানো মুখ। দৃষ্টি তার ম্লান থেকে ম্লান হতে লাগলো। মনস্পটে ভেসে উঠলো ক্ষণপরিচিত একটি ফুলানো মুখ।

দুপুর গড়াতেই খাবার টেবিল জুড়ে মুখরোচক খাবারের সমাহারে সেজে উঠল। নির্জনা বেগম ঘরের পুরুষদের আগে থেকেই বলে দিয়েছিল যেনো দুপুরে সকলে ঘরে খাবার খায়। তকদির সিকদার বাড়িতে এসেছে অনেক্ষণ। অতিথিদের সাথে একসাথে বসে সবাই খাবে। বসার ঘরে নির্জনা বেগম সদ্যই আসল, হাতে তার একটি কুশিকাটার সোয়েটার। সে সোফায় বসতে বসতে জবার উদ্দেশ্যে শুধায়,
–”নায়েল কোথায়, জবা?”
–”মেজো ভাবি নায়েল’কে গোসল করাইতে নিয়া গেছে, চাচি।”
–”দেখ তো গিয়ে, হলো কি-না!”
জবা মাথা নেড়ে উপড়ে যায়। অর্ধেক সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই দেখতে পায়, নায়েল ছুটতে ছুটতে নামছে। পড়নে তার ফেলালোনের একটি ফ্রক আর প্যান্ট। ভেজা চুল গুলো পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। জবা সাবধানী কন্ঠে বলল,

–”সাবধানে আইসো নায়েল, এতো ছোটাছুটি কইরো না। পইড়া যাবা।”
নায়েল অপরিবর্তিত ভাবেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে জবার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাসিমুখে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–”কোলে নাও, আন্টি।”
–”এইটুকুন জায়গা হাঁটতে পারবা না?”, জবা কপাল কুঁচকে শুধায়‌।
নায়েল কোমড়ে হাত দিয়ে নাকোচ করে বলল,
–”না। মাম্মা ও কোলে নিতে চায় না, তুমিও কোলে নিতে চাও না; আমার কষ্ট হয় না এত হাঁটাহাঁটি করতে?”
–”হইছে হইছে আইসো, কোলে আইসো। তোমার মায়ের তো পায়ে ব্যথা তাই তোমারে কোলে নিতে পারে না।”
নায়েলকে কোলে নিয়ে জবা নিচে নেমে আসে। তাদের পিছু পিছু ততক্ষণে মৌনতাও নেমে আসে।
জবা নির্জনা বেগমের কাছে যেতেই, নায়েল লাফিয়ে দাদুমনির কোলে চলে যায়। নির্জনা বেগম মুখশ্রী থেকে গাম্ভীর্যতা সরে গিয়ে স্নেহের হাসি ফুটে উঠল। সে নায়েলকে কোলে বসিয়ে বললেন,
–”এই সুন্দর সোয়েটার টা তোমার জন্য বানিয়েছি দাদুমনি, পড়বে?”
নায়েল দাদুমনির হাতে থাকা সোয়েটারটি নেড়েচেড়ে অবুঝ কন্ঠে শুধায়,

–”সোয়েটাল?”
–”হুঁ, পড়বে?”
নায়েল হাসিমুখে মাথা নেড়ে বললো,
–”পলবো দাদুমনি।”
মৌনতা এসে শাশুড়ির পাশে বসল। সেও সোয়েটারটি ছুঁয়ে বলল,
–”অনেক সুন্দর হয়েছে, আম্মা! নায়েলকে খুব সুন্দর লাগবে পড়লে।”
–”আমি জানি তো! আমার দাদুমনিকে সবকিছু পড়লেই সুন্দর লাগে।”, নির্জনা বেগম আহ্লাদি গলায় বললেন। সে সোয়াটারটা খুলে নায়েলকে পড়িয়ে দিয়ে মৌনতাকে জিজ্ঞাসা করেন,
–”তোমার না-কি পায়ে ব্যাথা বেড়েছে?”
–”হুঁ কিছুদিন যাবৎ অনেক বেশি পায়ে ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে, একটু বেশি হাঁটলে ডান পা’টা ব্যথা অনুভব হয় ভীষণ।”
নির্জনা বেগম চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকায় মেজো বউয়ের দিকে। চিন্তিত কন্ঠেই বললেন,
–”বাগেরহাটে বসেও কিছু খেতে পারতে না, বমি হয়, এখন আবার পায়ে ব্যাথা বাড়ছে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছ না কেন? শরীর তো আর আগের মতো নেই তোমার। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছ।”
মৌনতা মলিন হাসল। ইদানিং তার শরীর ক্রমশই ভেঙে পড়ছে। পুরো শরীর জুড়ে কেমন অসোহ্য জ্বলন, গিঁটে গিঁটে ব্যাথা, ক্লান্তি অবসাদ কাজ করে। একটু কাজ করলে পরবর্তী এক ঘন্টা সে একদম দূর্বল হয়ে পড়ে। সে মৃদু হেসে বলল,

–”আপনার ছেলে আসুক আম্মা, তার সাথে যাব।”
–”ইমরোজের আসতে দেরি, তুমি ওর জন্য অসুখ পালন করবে কেন?”
–”তার আসতে দেরি নেই আম্মা। গতকাল ভাইজানের সাথে কথা হয়েছিল। বলল আজকে কিংবা কলকের মধ্যেই চলে আসবে।”
মৌনতা’র উদাসীন কন্ঠে নির্জনা বেগমের চোখেমুখেও উদাসীনতা ছেয়ে গেলো। মেজো ছেলে এবং মেজো বউয়ের দাম্পত্য জীবন যে অনেক মাস যাবৎ ই খুব একটা ভালো যাচ্ছে না সেটা তার ও দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে। আড়ষ্টতা ভাঙলো নির্জনা বেগম। নায়েলকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে বরাবরের মতো একই পরামর্শ দিল,
–“স্বামী, সংসার সময় থাকতে আগলে নাও, মেজো বউ মা। নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নাও।
সুস্থ শরীর আর স্বামী ছাড়া একটা মেয়ের জীবনে সুখ শান্তি থাকে না।”
–“জি আম্মা।”
–“ইমরোজ এলে, পুরোটা সময় তাকে, নিজেকে আর নায়েলকে দেবে। বড় বউমা এখন সংসার সামলে নিতে পারবে।”
মৌনতা আজ আর তর্ক করে না। নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সিঁড়ি বেয়ে রূপকথা আর রোজ ও নামছে তখনি। মৌনতা রোজকে তাড়া দিয়ে বলল,

–”রোজ তোমার স্পেশাল রায়তা বানিয়ে ফেলো* সকলে খেতে বসবে।”
–”আসছি মৌন বউ, তার জন্যই এসেছি। তোমার এতো বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে না। সুযোগ পেলেই শুধু আমার পেছনে লাগবে না। আমি তোমার মতো মন ভুলা মানুষ নই।”, রোজ সিঁড়ির রেলিং ঘেঁষে নামতে নামতে মুখ বাঁকিয়ে বলল।
–”ওহ্ আচ্ছা? আমি তোমার পেছনে লাগি নাকি তুমি লাগছো? কুটনী ননদিনী!”, মৌনতা কপাল কুঁচকে বলল।
–”কি বললে আমি কুটনী? তোমার কতো বড় সাহস! আম্মা দেখেছো তোমার মেজো বউয়ের কান্ড? আমি নাকি কুটনী!”, রোজ বিস্ময় নিয়ে বলল। নির্জনা বেগম বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টিতে তাকায় মেয়ের দিকে। গম্ভীর মুখে বলেন,
–”সবসময় এমন করে কেন কথা বলো, রোজ? মৌন বউ কি? ভাবি ডাকবে।”
–“সে তোমাদের জন্য মেজো বউ , আমার জন্য তো মৌন বউ। আমি ওসব ডাকব না তাকে।”, রোজ বিরোধিতা করে বলল। নির্জনা বেগম ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় মেয়ের দিকে। রোজ রান্নাঘরে ঢুকে যায় রায়তা বানানোর জন্য। ঘরের সকলে তার বানানো রায়তা খুব পছন্দ করে। তাই এই দায়িত্বটা সবসময় তার। রূপকথা মৌনতার সাথে হাত বাটাতে এলেই মৌনতা তাকে বারন করল।
–”অনেক করেছ রূপকথা। এখন এতোটুকু আমি করি, তুমি বসো।”
রূপকথা শোনেনা বারন করা সত্ত্বেও, সে একটু আধটু হাত বাটায়। মৌনতা টেবিল সাজাতে সাজাতে রূপকথাকে নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করল,

–”তোমার কি তানশানের সাথে কি পরিচয় হয়েছে রূপকথা?”
এই দিনগুলোতে রূপকথা শুধু লোকমুখে ছেলেটির নাম ই শুনে গিয়েছে। না ছেলেটি তার সাথে কথা বলেছে, আর না সে যেচে কথা বলার সাহস জোগাতে পেরেছে। সে না বোধক
মাথা নাড়লো।
–”তোমার ছেলে তানশান। এখন পর্যন্ত পরিচয় হয়নি, তাই না?”
রূপকথা না বোধক মাথা নাড়লো। মৌনতা বললো,
–”আচ্ছা এখন সকলে খেতে আসবে, তখন পরিচয় করিয়ে দেব।”
রূপকথার বক্ষস্থলের স্পন্দন ক্ষীণ বেড়ে গেল। আরো একবার অন্তরালে কড়া নাড়লো সে কারোর দ্বিতীয় স্ত্রী, কারোর সৎ মা। বিদঘুটে এক অনুভূতি! সম্পর্ক গুলো খুব ভারী! ঠিক কিভাবে নেবে ঐ ছেলেটি তাকে? খুবই খারাপ ভাবে হয়ত। আরো এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিলো অন্তঃস্থল।
তকদির সিকদার খাবার টেবিলে আসে। নির্জনা বেগম ও নায়েলকে নিয়ে বসতে বসতে বললেন,
–”জবা, তানশান আর এরোজকে ডেকে নিয়ে আয় তো। সকালে নাস্তা খেয়ে যে উপড়ে গেল দাদুভাই, তারপর আর একবারও নিচে আসল না। আমার ও যাওয়া হলো না। তাড়াতাড়ি যা।”
–”আমি একবার গেছিলাম কিন্তু দরজা ভিতর থিকা বন্ধ ছিল, চাচি। আমার মনে হয় তানশান কোন কারনে মন খারাপ করছে, চাচি।”, জবা সতর্ক দৃষ্টি ফেলে চাপা স্বরে বলল। নির্জনা বেগম একবার আড়চোখে দেখে নেয় মৌনতার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথাকে। সে দৃষ্টি সরিয়ে জবার দিকে শানিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,

–”সবসময় বেশি কথা বলা তোর বদঅভ্যাস। তোকে যেটা বলেছি তুই সেটা করবি।”
জবা চুপসে গেল। তখনি তপোবন সদর দরজা দিয়ে লম্বা লম্বা কদম ফেলে ঢুকল। নির্জনা বেগমের মুখে হাসি ফুটে উঠল তপোবনকে দেখে। সকালে অনুরোধ করে বলে দিয়েছিল যেন দুপুরে ঘরে খেতে আসে। এতো বছর পর স্ত্রীর হাতে রান্না খেতে দেখবে ছেলেটাকে। এখন আর তপোবন একা নয়। তপোবনের ও স্ত্রী, সন্তান রয়েছে একটা সংসার রয়েছে। এভাবেই তো দেখতে চেয়েছিল ছেলেটাকে। সে প্রফুল্ল চিত্তে ডেকে উঠল ছেলেকে,
–”তপোবন এসেছ? ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি খেতে এসো। তানশানকে নিয়ে এসো।”
তপোবনের গতি রোধ হলো। এরোজ আর তানশান ও নিচে নেমে আসলো ততক্ষণে। তপোবন এক পলক তাকায় চাচার হাত ধরে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের দিকে। আজ সে কি বিদঘুটে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে! ছেলেটা তার দিকে তাকাতেও ইতস্ততা বোধ করছে। নিজেকে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বাবা মনে হচ্ছে তপোবনের। ছেলের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে বসার ঘর থেকে মায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করে গম্ভীর গলায় বলল,
–”তানশান আর আমি ওর নানুর বাসায় যাচ্ছি আম্মা, সেখানেই খাবো।”
নির্জনা বেগম মৃদু অবাক হলো। অবাক কন্ঠেই শুধায়,
–”এই দুপুর বেলা সেখানে যাবে কেন?”
তপোবন মিহি স্বরে বলল,

–”তানশানের স্কুল খুলে যাবে তখন আর সুযোগ পাবে না যাওয়ার। তাই এখন নিয়ে যাচ্ছি। আপনারা খাওয়া দাওয়া করুন।”
–”এরোজ তুমি কোথায় যাচ্ছো? খাবে না?” ,মায়ের প্রশ্নে এরোজ অবিচল কন্ঠে বল,
–”আমিও যাচ্ছি, আম্মা। সেখানেই খেয়ে নেব। ভাইজান চলো।”
বলেই তপোবন সহ এরোজ আর তানশান বেরিয়ে গেল। খাবার ঘরের সকলের মুখ মলিন হয়ে গেল এতে। অতিথিদের গুজব করার মতো আরো বিষয়বস্তু মিলে গেল। তকদির সিকদার ডানে বামে মাথা নেড়ে বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টিতে তাকায় স্ত্রীর দিকে। কি হলো, এতে করে তো নতুন বউকে অসম্মানিত হতে হলো এতগুলো মানুষের সামনে। যাদের জন্য রান্না করল তারাই তো তাকে এবং তার রান্নাকে কোনপ্রকার গুরুত্ব দিল না। মৌনতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় রূপকথার নির্জীব মুখটির দিকে। তার মধ্যে বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না, সে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। মৌনতা তার হাত আঁকড়ে ধরে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১০

–”মন খারাপ করো না, কথা। রাতে সকলে একসাথে খাব।”
রূপকথা মৃদু হাসলো মৌনতার কথায় কোনো জবাব দেয় না। সকলে তাকে কেনো এতো দুর্বল ভাবে? সে তো দুর্বল নয়। যেখানে কারোর দ্বিতীয় স্ত্রী, কারোর সৎ মা হয়ে বাঁচার ক্ষেত্রেই তার মন খারাপকে গুরুত্ব দেয়নি সেখানে এইসব তো তুচ্ছ বিষয়। এতোটুকুতে তার মন খারাপ হয় না। সে নিজেকে প্রস্তুত করছে এর থেকেও আরো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার জন্য। কেননা দিনশেষে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো সে একজন সৎ মা। আর সে জানে এই সম্বোধনের ভার কতটা কঠিন!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১২