অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১২
তোনিমা খান
বাবারাও বহুরূপী হয়? পৃথিবীতে বাবাদের ও ভিন্ন ভিন্ন রূপ রয়েছে; এই বাক্যটি যদি পুরোপুরি মিথ্যা হতো তবে কতোই না সুন্দর হতো, তাই না? বাবারা হবে শ্রদ্ধেয়, নম্র, সন্তানদের জন্য সর্বদা শক্ত একটি ঢাল, যেকোন মূল্যে সন্তানদের নিজের আশ্রয়স্থলে আগলে রাখবে, তাদের মুখের হাসির কারণ হবে। কিন্তু সবসময় বাস্তবিকতা এই বর্ণনা অনুসরণ করে না। বাস্তবে তো বাবাদের কত শত নিকৃষ্ট রূপ রয়েছে আবার কত শত মনোমুগ্ধকর রূপ ও রয়েছে। তেমনি বাবাদের তিনটি রূপ বহন করে তানশানের বাবা , রূপকথার বাবা , নায়েলের বাবা। অথচ দিনশেষে তিনজন-ই বাবা। তবে তাদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক!
এই যে গতকাল থেকে তপোবন শুধু চেষ্টা করে যাচ্ছে যেনো তার পিতৃত্বে কোন ক্ষত সৃষ্টি না হয়। তার সন্তানটির মনে বাবার পিতৃত্ব নিয়ে কোন শঙ্কা না তৈরি হয়। কিন্তু সফল হলো কি তপোবন!
পুরোটা রাস্তা তানশান একটিবারের জন্য ও বাবার চোখে চোখ রাখেনি, এমনকি মুখের দিকেও তাকায়নি। ফ্রন্ট মিররে কিছুক্ষণ পর পর তপোবন তাকাচ্ছে যেন একটু দেখতে পারে, তার ছেলেটা তার দিকে তাকিয়েছে। কিন্তু নাহ্, তানশান একটিবার ও তাকায়নি
জীবন তৃতীয়বারের মতো তপোবনকে ভেঙেচুরে চুরমার করতে সফল।
পথিমধ্যে তপোবন শশুর বাড়ির জন্য কিছু জিনিস কিনে নিলো।
দুইবার কলিং বেল বাজালেই সদর দরজাটি খুলে যায়। ভেসে ওঠে একটি মায়াভরা হাস্যোজ্জ্বল পৌঢ় মুখ। পারমিতা একগাল হেসে স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকায় তপোবনের দিকে। তপোবন মৃদু হেসে বয়সে ভারী হওয়া দেহটাকে আলতো হাতে আগলে নিলো নিজের সাথে। বিনম্র কন্ঠে শুধায়,
–”কেমন আছো আম্মা?”
–”ভালো আছি। তোরা এসে গিয়েছিস, আমি এখন আগের থেকে আরো ভালো আছি। আয় ভেতরে আয়। আমার নানুভাই কোথায়?” , পারমিতার আদরমাখা কন্ঠে বাবার পেছন থেকে টলমলে আঁখি বের করে উঁকি দিয়ে তাকায় নানুমনির দিকে। পারমিতা বেগমের দৃষ্টি ছলছল করে উঠল এতো দিন পরে নাতিকে দেখে। সে তপোবনের থেকে সরে এসে তানশানের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। তানশান মৃদু হেসে বিলম্বহীন লেপ্টে যা নানুমনির বুকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে শুষে নেয় নানুমনির দেহের সুবাস। কথায় আছে খালার দেহে না-কি মায়ের সুবাস পাওয়া যায়। কিন্তু তার যে পোড়াকপাল, তার কোন খালা নেই। আর না আছে মা। মায়ের কোনকিছু তার ধরাছোঁয়ার মধ্যে নেই, আছে শুধু এই পৌঢ় নানুমনি। তাই সে নানুমনির মাঝেই মাকে খুঁজে বেড়ায়। নানুমনির গায়ের সুবাস ও তার খুব প্রিয়। পারমিতা বেগম অনবরত হাত বুলায় তানশানের মাথায়। মিহি স্বরে শুধায়,
–”আমার নানুভাই কি তার নানুমনিকে খুব বেশি মিস করছিল?”
তানশান নির্বাক ঘন ঘন মাথা নাড়ে। তপোবন ম্লান হেসে নানি নাতনিকে সেখানেই রেখে ভেতরে চলে যায়।
পূর্বাদের বাড়ি নিরালায়। গাড়িতে তাদের বাড়ি থেকে বিশ পঁচিশ মিনিটের দূরত্বে নিরালা। পূর্বারা তিন ভাই বোন। পূর্বা সবার বড় আর তার দুই ভাই ছোট। তপোবন সোজা শশুরের ঘরে চলে গেল। এই ঘরটিতে আসলে তার দেহ ম্লান হয়ে আসে। এতো এতো মানুষ গুলোর মাঝখান থেকে মেয়েটি কিভাবে সকলকে ছেঁড়ে চলে গেল?
পারমিতা তানশানের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ম্লান হাসল। তপোবনের বিয়ের ব্যাপারে সে জানে। নির্জনা বেগম বিয়ে ঠিক করার সাথে সাথেই তাদের সব জানায়। তারা ভেবেছিল এই বিষয়টা খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না তানশানের উপর—তবে তারা ভুল ছিল। বহুবছর পূর্বেই তারা তপোবনকে এই বিষয়ে আগাতে বলেছিল। জীবনের প্রথম পর্যায়েই বিপত্নীক হয়ে গোটা জীবনটা একাকী কাটানোর সিদ্ধান্তে তাদের ঘোর আপত্তি ছিল।
–”ঘরে চলো, নানুভাই।”, পারমিতা নম্র কন্ঠে
তানশান মাথা নেড়ে সরে আসে তার থেকে। পারমিতা তাকে আগলে নিয়ে ঘরে ঢোকে তখনি ভেসে আসে এরোজের ভারী কন্ঠ,
–”আমায় না নিয়েই চলে যাচ্ছো সুন্দরী?”
পারমিতা কপাল কুঁচকে তাকালেও তা মসৃন হয়ে গেলো এরোজের হাসিমুখ দেখে। তার চোখেমুখে বিস্ময় ছুঁয়ে গেল।
–”এই পাজি ছেলে তুই কবে এসেছিস? আমায় কেউ বলেনি কেন? সুন্দরীর কথা মনে পড়েছে এত বছর পরে? এমনিসময় তো তোকে এই মুখো হতে দেখি না।”
এরোজ হাসিমুখে ঘরে ঢুকলো। পারমিতাকে এক হাতে আগলে নিয়ে আহ্লাদ করে বলল,
–”বছর আর মাস! তোমার টানে আমায় একদিন না একদিন এই মুখো হতেই হবে সুন্দরী। তোমায় ছাড়া আমার চলে না।”
পারমিতা হেসে উঠে চাপড় মারে এরোজের বাহুতে।
–“চার বছর পর এসে তুই আমায় প্রলেপ লাগাচ্ছিস, পাজি ছেলে? আজ দেখি আমার বাড়িতে ঈদ লেগেছে। আয় আয়, তোদের জন্য চুই ঝাল দিয়ে গরুর মাংস রান্না করেছি। মজা করে খাবি।”
–”ইশশ! তোমার হাতের চুই ঝালের গরুর মাংস খাওয়ার জন্যই আমি গত এক চার বছর যাবৎ উপস করে আছি সুন্দরী। চলো চলো আজ পেটপুরে খাবো।”
–”তোর ফাজলামো যতোসব আমার সাথেই । কি করেছিস নিজের এরোজ? বিদেশে পাঠালে মানুষ বিলেতি সৌন্দর্য নিয়ে ফেরে আর তুই দেখছি সব সৌন্দর্য খুইয়ে এসেছিস? একবারো নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছিস? নিজের প্রতি তোর এতো উদাসীনতা কেন?”
পারমিতা এরোজের মুখশ্রী ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। এরোজ ম্লান হাসলো পারমিতার কথায়। সন্তপর্ণে প্রশ্নটি এড়িয়ে বলল,
–”খিদে পেয়েছে, সকাল থেকে না খেয়ে আছি। খাবার দাও।”
–”তুই না খেয়ে এসেছিস? আমিও কি সব নিয়ে পড়লাম। আয় আয় আমি এখনি খাবার দিচ্ছি।”
পারমিতা ব্যস্ত কন্ঠে বলল। সে তাদের ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটলো।
শশুরের কক্ষে ঢুকতেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে খবরের কাগজ পড়তে থাকা একজন বয়স্ক লোক দৃষ্টি কাড়লো। তার শশুর তেমন একটা হাঁটা চলা করতে পারে না। দিনের বেশিরভাগ সময় বিছানাতেই কাটে। তপোবন হাতে করে আনা ওষুধের প্যাকেটটা টেবিলে রেখে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করে,
–”আব্বু, কেমন আছেন?”
তপোবনের কন্ঠে মোজাম্মেল হোসেন মুখের ওপর থেকে খবরের কাগজ সরিয়ে তাকায়। হাসিমুখে বললেন,
–”আল্লাহ রেখেছে, তপোবন। তুমি দেরি করে এসেছো। আমি অপেক্ষা করছিলাম তোমার সাথে নামাজ পড়বো।”
তপোবন মাথা নাড়লো। এরোজ যখনি জানিয়েছে তানশানের কথা, সে তখনি এই বাড়িতে জানিয়ে দিয়েছে তারা আসছে। সে শশুরের পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
–”দুঃখিত আব্বু। আমি কাজে ব্যস্ত ছিলাম। সেগুলো সম্পন্ন করেই তানশানকে বাসা থেকে নিয়ে এখানে আসলাম।”
মোজাম্মেল হোসেন তপোবনের হাত ধরে নামতে নামতে বললেন,
–”সমস্যা নেই, চলো নামাজ পড়ে নেই। মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছা করে জামায়াতে গিয়ে নামাজ পড়তে, কিন্তু তা আর এই শরীরে হয়ে ওঠে না। তোমার শ্যালক দু’টো হয়েছে হাঁড়ে বজ্জাত। তাদের শুধু কাজ আর পড়াশুনা। এতো বলি আমার সাথে মাঝেমধ্যে একসাথে নামাজ পড়। তখন আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।”
–”পিয়াল আর প্রনয়কে আপনার সাথে নামাজ পড়তে বলে দেব, আব্বু। আপনাকে আমি অনেকবার বলেছি একটা হুইলচেয়ার আনাই। অন্তত জামায়াতে নামাজ তো পড়তে পারবেন।”
তপোবন তাকে আঁকড়ে ধরে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দেয়।
মোজাম্মেল হোসেন মলিন হেসে বললেন,
–”ওসবের দরকার নেই, আব্বু। হুইলচেয়ার আমার অপছন্দ। দেখলেই নিজেকে পঙ্গু পঙ্গু লাগে।”
–”সব মনের দোষ।”, তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো। সে ওজু করে কাবার্ড থেকে জায়নামাজ নিয়ে শশুরের পাশে দাঁড়িয়ে গেল।
পারমিতার কোলে গুটিয়ে শুয়ে আছে তানশান। চোখ বেয়ে তার নিরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। গতকাল থেকে মনের মধ্যে তৈরি হওয়া সকল বিষন্নতা, বাবার ভালোবাসা হারিয়ে ফেলার ভয় কান্নারুপে বেরিয়ে আসছে। সেদিকে ব্যাথিত নয়নে তাকিয়ে আছে পারমিতা। একহাত তার এঁটো। তানশানের জন্য ভাত মেখে বসে আছে কিন্তু সে খাওয়াতে পারেনি। পারমিতা আদুরে গলায় বললেন,,
–”কি হয়েছে নানুভাই? সেই থেকে কাঁদছো কেনো? ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে খেয়ে নাও।”
তানশানের কান্নার বেগ বাড়ে। সে দুই বাহুতে চোখমুখ মুছতে লাগলো। নানুমনির দিকে তাকিয়ে বলল,
–”আমি তোমার কাছে থাকবো।”
–”আচ্ছা থাকবে। তাতে কান্না করার কি আছে? এত বড় ছেলে এইটুকু ব্যাপারে কাঁদে?”,
তানশান কিছু বলল না। অনুভূতি প্রকাশের অজ্ঞতা থাকায় সে এখনো নানুমনিকে বলতে পারেন— এই কান্না এতোটুকু বিষয়ের জন্য নয় বরং বাবার ছত্রচ্ছায়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ের জন্য। সে টলমলে দৃষ্টি ফেলে জড়তার সাথে ধিমি স্বরে শুধায়,
–”পাপা কি আমায় আর ভালোবাসবে না নানুমনি?”
মাথায় বুলাতে থাকা একহাত থেমে গেল পারমিতার। সে মৃদু হেসে মিহি স্বরে বলল,
–”তোমার কি মনে হয়? পাপা তোমায় আর ভালোবাসবে না? তোমায় ভুলে যাবে? এতোদিনে এই চিনেছো পাপাকে?”
তানশান জবাব দেয় না পারমিতার প্রশ্নের। নিজ ভাবনায় অটল থেকে পুনরায় শুধায়,
–”পাপার যদি নতুন একটা পরিবার হয়, তবে কি পাপা আমায় ভুলে যাবে?”
পারমিতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
–”তোমায় একটা গল্প বলি, হ্যাঁ? বাস্তব গল্প! তোমার মায়ের গল্প, আমার ছোট্ট নানুভাইয়ের গল্প। তোমার মা যখন আমাদের ছেড়ে চলে যায় তখন তুমি ছিলে তিনবছরের একটি ছোট্ট শিশু। যে আধো আধো কন্ঠে কথা বলতো, দুষ্টু করতে। তখন তোমার খেয়াল কে রাখবে এই ভেবে আমি তোমায় আমার কাছে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বাবা আমায় দেয়নি। বরং সে জোরগলায় বলেছিল সে তোমায় দেখে রাখবে। তারপর থেকেই তুমি তোমার পাপার সাথে থাকো , এমনকি একটা দিন ও তোমায় কাজের লোকের ভরসায় কিংবা পরিবারের কারোর ভরসায় রাখেনি। নিজে হাতে তোমার খাবার বানানো, গোসল করানো, ঘুম পাড়ানো, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া এবং নিজের অফিস সামলেছে। এবং সেই থেকে আজ পর্যন্ত একা তোমার দেখাশোনা সবকিছু করছে। এতকিছুর পরেও তোমার যদি পাপার উপর, পাপার ভালোবাসার উপর আস্থা না থাকে— তবে আমি বলব তুমি এখনো তোমার পাপাকে চিনতে পারোনি। তোমার এখনো অনেক সময়ের প্রয়োজন তাকে চিনতে। যদি তুমি তাকে চিনতে তবে কখনোই তোমার মনে এই প্রশ্ন আসত না। তুমি যে এইগুলো ভেবে বাবাকে কষ্ট দিচ্ছ, এটা বাবা বুঝতে পারলে খুব ব্যাথিত হবে, নানুভাই। তার এত বছরের কষ্টের ফল হিসেবে সে কি অর্জন করলো? কিছুই না। তার সন্তানের তো বিশ্বাস-ই নেই তার বাবার ভালোবাসার উপর।”
তানশান নিরুত্তর ভাবুক হয়ে তাকিয়ে রইল নানুমনির দিকে। সে কি সত্যিই অতিরিক্ত ভাবছে? পাপার প্রতি তার ভালোবাসার প্রতি কি তার সত্যিই কোন বিশ্বাস নেই?
দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবনের দেহাবয়ব ম্লান হয়ে আসে ছেলের কথায়। ছেলেটা গতকাল থেকে এতো বিদঘুটে অনুভূতি লালন করছিল তার জন্য? সে কি বাবা হিসেবে আসলেই ব্যর্থ? তপোবন স্বচ্ছ, ম্লান দৃষ্টিতে তাকায় এরোজের দিকে। ম্লান কন্ঠে শুধায়,
–”আমি কি খুব খারাপ বাবা এরোজ? তানশান এই কঠিন কথাগুলো কিভাবে বলতে পারল? আমি ওকে ভুলে যাব? আমার সন্তানটিকে?”
এরোজ ভাইয়ের হাতটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলে,
–”তুমিও কি তানশানের মতো অবুঝ হয়ে গিয়েছ? ও ছোট ভাইজান। ওর জীবনে তুমি একমাত্র মানুষ! যার সাথে ওর প্রতিটা ক্ষণ, সুখ-দুঃখ পার হয়। আর এই সময়টাতে ওর মাঝে পরিবর্তন আসছে। তাই হঠাৎ জীবনে এই পরিবর্তন স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারছে না। ওর উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ভাবছে ও তোমায় হারিয়ে ফেলবে ধীরে ধীরে। তুমি বলো তুমিকি এমন কিছু করবে কখনো?”
এরোজের কথায় তপোবন অনুজ্জ্বল শুকনো মুখটি তুলল। ডানে বামে মাথা নেড়ে দৃঢ় কন্ঠে বলল,
–”আমার মৃত্যু ব্যতীত আমার সন্তানটির উপর থেকে তার বাবার ছায়া কখনো নড়বে না।”
–”তবে? তোমার উচিৎ এখন ওর মনের এই ভুল ধারনা দূর করে দেওয়া।”, এরোজ মৃদু হেসে বলল। বড় ভাবি মারা যাওয়ার পরে ছোট্ট তানশানকে নিয়ে ভাইজানের এক একটি কঠিন দিন পার হতে দেখেছে সে। তেমনি তানশানকেও মায়ের জন্য তরপাতে দেখেছে। এই দুইজনের কষ্ট সে কোনক্রমেই সহ্য করতে পারে না।
তপোবন ধীরপায়ে কক্ষে প্রবেশ করে। তানশান থমথমে মুখে বসে আছে বিছানায়। ফোলা ফোলা ফর্সা চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। পারমিতা তাকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে। তপোবন নিরবে ছেলের পাশে বসল। ছেলের ব্যান্ডিজরত হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শুধায়,
–”আজ এখানে থাকবে?”
তানশান চোখ না তুলেই হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। তপোবন রাজি হয়ে যায়। বলল,
–”আচ্ছা ঠিক আছে, থাকবে। পাপার সাথে একটু বাইরে যাবে? আধা ঘন্টার জন্য। আবার আমি ড্রপ করে দিয়ে যাব।”
তানশান চোখ তুলে তাকায় বাবার দিকে। তপোবন পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
–”যাবে?”
তানশান মাথা নাড়ে।
–”ঠিক আছে খেয়ে বের হও আমি বসার ঘরে আছি।”
গাড়িটি থামল ঠিক রূপসা ব্রিজের মাঝ বরাবর এক কিনারায়। তপোবন গাড়ি থেকে বের হতেই তানশান ও বেরিয়ে আসে। এরোজ আর বের হয় না, সে গাড়িতে বসে বসেই ফোন ঘাঁটতে লাগলো। ইতিমধ্যে তার দলবলের ছেলেপুলে তাকে তলব করেছে। সকলে উৎসুক এত বছর পর তাকে পেয়ে।
জানুয়ারির শীতে রূপসা ব্রিজের উপর দাঁড়ালে মনে হয় প্রকৃতিই যেন ধীর ছন্দে নিশ্বাস নিচ্ছে, ঠান্ডা, কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ আর নদীর বিশালতা মিলেমিশে এক অদ্ভুত শান্ত, পরিবেশ তৈরি করে। মাঝেমধ্যে সেই শান্ত পরিবেশ অশান্ত করে তুলছে দ্রুতগামী যানবাহন গুলো!
ব্রিজের ওপর শীতল বাতাসের আধিপত্যে শীতের প্রকোপ যেন আরো বাড়তে লাগলো। ব্রিজের কিনারা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবন পাঞ্জাবীর উপরে পড়া চাদরটি আরেকটু জড়িয়ে নিয়ে পাশে দাঁড়ানো ছেলের দিকে তাকায়। বুকে হাত গুঁজে শীতে কেমন গুটিয়ে গিয়েছে। পড়নে পাতলা একটা ফুল হাতার টিশার্ট।
বাড়িতে তেমন শীত থাকে না বিধায় পোশাকের এই অবস্থা। এমনিতেও খুলনার তাপমাত্রা একটু বেশি হয় সবসময়, সেক্ষেত্রে শীত কম অনুভব হয় ঘরে। তপোবন দু’হাত মেলে বুকের কাছের চাদর সরিয়ে দিয়ে ছেলেকে কাছে ডাকলো,
–”আব্বু, এখানে চলে এসো।”
তানশান ফিরে তাকায় বাবার দিকে। বিনা
দ্বিরুক্তিতে সে বাবার দুই হাতের মাঝে বুকের সাথে পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তপোবন নিজের চাদরের আড়ালে দু’হাতে জড়িয়ে নেয় ছেলেকে। তার থুতনি ঠেকলো তানশানের মাথায়। মুহুর্তেই বাবার উষ্ণতায় তানশানের শীত পালাল। কিছুটা পল বাবা ছেলের সেভাবেই নিরবে, নির্বাক কেটে যায় রূপসা নদীর মাঝে লঙ্গর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোস্টার গুলো এবং স্বচ্ছ থৈ থৈ পানি দেখতে দেখতে।
বেশ কিছুক্ষণ পর তপোবন নিরাবতা ভাঙল। নম্র, ভারী কন্ঠে বলে ওঠে কিছু বিষাদময় স্মৃতির কথা।
–”আমি তখন দশ বছর বয়সের একটি ছোট ছেলে ছিলাম। তখন তোমার মেজো পাপা ছয় বছর বয়স ছিলো আর তোমার ছোট পাপা দুই বছরের। তোমার দাদুমনি দাদাভাই নিয়ে আমারা একটি সুখী পরিবার ছিলাম। খুব সুন্দর হাসি, তামাশা আনন্দ, হৈ-হুল্লোড় করে দিন কাটতো আমাদের। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই হাসিখুশি সংসারটা একদিন থমকে গেল। যেদিন তোমার দাদুমনি আমাদের ছেঁড়ে চলে যায়।”
শুরু থেকে স্বাভাবিকভাবেই বাবার কথা শুনলেও শেষের কথাটিতে মৃদু হকচকালো তানশান। সে ঘাড় ঘুরিয়ে বাবার দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে শুধায়,
–”দাদুমনি ছেঁড়ে চলে গিয়েছে মানে? দাদুমনি তো বাসায়।”
তপোবন ম্লান হাসলো ছেলের অবুঝ কন্ঠে। মিহি স্বরে বলল,
–”সে তোমার ছোট দাদুমনি। আমার মা নয়।”
তানশান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। আকস্মিক এমন কথা সে সহজে হজম করতে পারল না। আজ পর্যন্ত সে এই কথা কখনো শোনেনি। সে তো জানতো নির্জনা বেগম-ই তার দাদুমনি। সে পুনরায় শুধায়,
–”তবে তোমার মা কোথায়?”
–”নেই, আমার মা নেই। আমার মা এই পৃথিবীতে নেই।”, নদীর দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে তপোবন অশান্ত দৃঢ় কন্ঠে বলে।
তানশান বুঝলো সে মৃত। সে পুনরায় সামনে তাকায়। তপোবন লম্বা শ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করল,
–”তোমার দাদুভাই তখন রাজনীতিতে মগ্ন ছিল। আমাদের সময় দিতে পারত না। তখন তোমার ছোট পাপা মাত্র দুই বছরের একটি বাচ্চা ছিল। সে শুধু ছটফট করতো মায়ের জন্য। আমার জামা ধরে টানতো আর বলতো ভাই মা, মা আনো। মাকে না আনলে সে খেতে চাইতো না, কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ত না খেয়ে। তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। কাজের মহিলা আর আমার পক্ষে খুব কষ্টকর ছিল তাকে সামলানো। ঠিক তোমার মতো। তুমিও এমন ছটফট করতে মায়ের জন্য। পাপার হাতে খেতে চাইতে না, ঘুমাতে চাইতে না, সারাদিন শুধু কাঁদতে।”
এতোটুকু বলে তপোবন থামে। গলা ধরে আসছে কেমন যেন। তানশানের মুখশ্রী জুড়ে মলিনতায় আচ্ছন্ন হতে লাগলো। তপোবন বলতে লাগল,
–” তার একমাসের মধ্যে তোমার দাদুভাই আবার বিয়ে করে। আর সেই হলো তোমার দাদুমনি। সে এসে আমাদের তিনজনের কঠিন জীবনটা একদম সহজ করে দেয়। কিন্তু সেই সহজ জীবন আমাদের তিনজনের কারোর-ই কামনীয় ছিল না। আমরা সকলেই আমাদের আগের জীবন চাইতাম। তবে সেটা তো অসম্ভব তাই না? তখন আমিও তোমার মতো এমনি ভয় পেতাম। বাবা যদি আর আমাদের ভালো না বাসে? এই ভেবে। ঠিক এমনটাই হয়েছিল। মায়ের অনুপস্থিতিতে বাবা একদম ছন্নছাড়া হয়ে যায়। সে নিজের কাজে এতোটাই ব্যস্ত থাকত যে আমাদের সাথে ঠিক মতো কথাও বলতেন না। ভোরে বেরিয়ে যেত, আর গভীর রাতে ঘরে আসত। মাঝেমধ্যে খুব অভিমান হতো বাবা-মায়ের ওপর। একা একা কাঁদতাম। কিন্তু কখনো বলা হয়ে উঠত না কাউকে। এভাবে করেই বাবা-মা নিয়ে অন্য এক স্বপ্নের দুনিয়া গড়ি আমি নিজের মনে। যেখানে সুখ আর সুখ কোন দুঃখ থাকতো না, আর না আমি আসতে দিতাম। ততদিনে আমি কলেজে পা দিয়েছি। জীবনের প্রারাম্ভতে একটা ধাক্কা খেয়ে ভঙ্গুর আমির জীবনের মানেই ছিল পড়াশুনা, এরোজ ইমরোজকে দেখা আর নিজের স্বপ্নে গড়া ঐ দুনিয়াটি।
সেই স্বপ্নের দুনিয়াটিকে একদিন বাস্তবে রূপান্তরিত করে তোমার মাম্মা। ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু, বখে যাওয়া ব্যাকবেঞ্চার ছিল সে। পড়াশুনা আর সে দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিল। তবে সে প্রতিদিন ক্লাসে উপস্থিত থাকত। যার মূল কারন ছিল ক্লাসের টপার তপোবন সিকদারকে টিজ করা। ক্লাস টপার, স্বল্পভাষী গম্ভীর, সবচেয়ে ভদ্র ছেলেটির সাদাসিধে জীবনে প্রতিদিন আনন্দমুখর করে তোলা, তাকে জ্বালানোই ছিল তার কাজ। তবে বোর্ড এক্সামের আগে সে বুঝতে পারে আমাদের পথ আলাদা হয়ে যাচ্ছে শিঘ্রই। তখন তার মধ্যে পরিবর্তন আসে। বোর্ড এক্সামের আগের লাস্ট দুই মাস সে আমার হাতে পায়ে ধরে আমার কাছে পড়াশুনা করে। আমার মতো ফলাফল না করতে পারলেও, অনেক ভালো ফলাফল করেছিল। আমি তার থেকে এতটা ভালো ফলাফল আশা করিনি। এরপর ভর্তি পরীক্ষার জন্য ও আমার কাছে পড়াশুনা করে। তবে আমি কখনো বুঝতাম না তার এই পরিবর্তনের কারন। কিন্তু সেদিন যখন ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়, আমি আর তোমার মাম্মা দু’জনেই খুলনা ইউনিভার্সিটিতে আর্কিটেক ডিপার্টমেন্টে চান্স পাই। সেদিন সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলেছিল, সে আমার সাথে পড়ার জন্য এতো কষ্ট করেছে। আমি তখন অবাক হয়ে গিয়েছিলাম জানো! কেউ কত উন্মাদ হলে এতটা দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে পারে। তবে তাকে পড়ানোর সেই সময়টুকুর ব্যবধানে সেই টপারটি যে অচিরেই সেই ব্যাকবেঞ্চারের প্রেম পড়ে যায়। শুরু হয় দু’জনের আরেকটি পথচলা। যেখানে সে আবার পড়াশুনা ছেড়ে বখাটে পানা, ব্যাকবেঞ্চার হয়ে যায়। তার হাতে পায়ে ধরে, ভয় দেখিয়ে আমায় পড়তে বসাতে হতো তাকে।
সময়গুলো সেভাবেই কাটে। গ্রাজুয়েশনের লাস্ট ইয়ারে আমরা বিবাহ করি। আর্লি এইজ! তার এক বছর পর তুমি আসো আমাদের কোল জুড়ে। যে বয়সে সকলে ক্যারিয়ার গড়তে ছোটাছুটি করছিল সেই বয়সে আমরা বাবা-মা হয়েছি। তবে এটা নিয়ে আমার কোনদিন কোন আফসোস ছিল না। বরং মনে হয়েছিল জীবনে আমি সবার থেকে এগিয়ে আছি।
কেননা তোমার মাম্মা আমার সেই স্বপ্ন পূরন করেছে যেটা আমি একটু একটু করে অন্তরালে গড়ে তুলেছি। আমার একটা পরিবার থাকবে, সন্তান থাকবে
আর আমি একজন ভালো বাবা হবো। আমার জীবনে যা কিছু ঘটে যাক না কেন! আমি সবসময় আমার সন্তানের সাথে বন্ধুর মতো থাকব, তার মাথার উপর ছায়ার মতো থাকব। আমার যতোটুকু ভালোবাসা রয়েছে তার জিম্মায় রাখব। আর সেটা আমি পেয়েছিলাম খুব অল্প বয়সে। সকলের থেকে শ্রেষ্ঠ বাবা হওয়ার জার্নিটা সেখানেই শুরু হয়। মনে জেদ ছিল— যে আমি আর পাঁচটা বাবার থেকে ভিন্ন হব। কিন্তু দেখো সৃষ্টিকর্তার আমার খুশি সহ্য-ই হয় না। দ্বিতীয়বার মতো আনন্দে ঝলমল করা আমার জীবনটা ম্লান করে সে কেড়ে নেয় তোমার মাকে। দ্বিতীয়বারের মতো ধাক্কা সামলে আমি আবার নিজের একটা দুনিয়া গড়ে তুলি তোমায় নিয়ে। তবে দেখো সৃষ্টিকর্তার এখানেও নারাজি। সে আমার এতোবছরের গড়া বাবা ছেলের দুনিয়াটাকেও ম্লান করে দিল। আমার তো এতোটুকু ছাড়া আর কিছু নেই, তবে সে কেন এমন করছে বলোত? কেন আমার শেষ সম্বল টুকুর থেকেও দূরত্ব সৃষ্টি করছে?”
তানশান নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে মস্তিষ্কে ঘুরপাক খায় বাবার এক একটি কথা। ছেলেকে জড়িয়ে রাখা হস্তদ্বয় আরো দৃঢ় হলো তপোবনের। কাটা কাটা চুলগুলোতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে ধিমি, কাতর কন্ঠে বলল,
–”পাপা কি খুব খারাপ তানশান? অনেক খারাপ কাজ করেছি তাই না? আমি ভেবেছিলাম আমার তানশানের তার পাপাকে নিয়ে তার মনে কোন শঙ্কা নেই। ভেবেছিলাম জীবনে যাই ঘটে যাক না কেন! তানশান বলবে, আমার পাপা সবসময় আমার। কিন্তু দেখো দিনশেষে আমি ভুল। আমার তানশান পাপাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে কান্না করছে, পাপার থেকে দৃষ্টি লুকাচ্ছে। আমার এই কাজটির কারণে কারোর জীবনের জটিলতা হয়তো দূর হয়ে যাবে, আব্বু। তুমি যেমন একটা সুন্দর জীবনযাপন করো, সেও হয়ত একটা সুন্দর জীবনযাপন করতে পারবে। পাপাকে ক্ষমা করা যায় না, তানশান? তোমার মনে হয় তোমার পাপা তোমায় কখনো ভুলে যেতে পারি? পাপার একটামাত্র সম্বল তুমি তানশান। কি করে বোঝাব আমি তোমায়? পাপা সবসময় তোমার ছিলাম, তোমার আছি। আমার সন্তান আমার জন্য এতটা ঠুনকো নয়—যে কারোর আগমনে আমি তাকে ভুলে যাব। পাপার থেকে দূরত্ব তৈরি করো না, প্লিজ। পাপা যে মরে যাব, তানশান।”
বাবার কাতর কন্ঠের প্রেক্ষিতে তানশান একটা শব্দ ও বিনিময় করল না। ছেলের নিরবতায় তপোবনের মুখশ্রীতে অমানিশা নেমে আসল। এই যাত্রায় ছেলের মনের শঙ্কা কি আর দূর হবে না? ছেলের সাথে ক্ষীণ এই দূরত্ব কি বাড়তেই থাকবে? হাহাকার জুড়লো তপোবনে’র অন্তঃস্থল। আর কত? প্রত্যেকবার কেন তার জীবনের গতিবিধি নিজের আমূল বদলে নেয়? কেন-ই বা প্রত্যেকবার তার প্রিয় মানুষগুলো কে কেড়ে নেয়?
নির্বাক তানশানকে আর কিছু বলল না, তপোবন। সাঁঝ নেমেছে। ব্যর্থতা আঁকড়েই তানশানকে নানুর বাসায় রেখে, তপোবন আর এরোজ বেরিয়ে আসে। এরোজ ভারাক্রান্ত, বিষন্ন মনে ভাইয়ের পাণ্ডুর, থমথমে মুখটি দেখে যায়। তপোবন মাথা নত করে হাঁটছে। গাড়ির কাছে আসতেই এরোজ তপোবনকে বলল,
–”আমি ড্রাইভ করছি, ভাইজান।”
তপোবন মাথা নেড়ে সায় জানায়। তবে ফ্রন্ট সিটে বসতে নিলেই সুশ্রাব্য একটি পিছুডাক কর্নকুহরে আন্দোলিত হলো। এরোজ পিছু ফিরে তাকায়। সোয়েটার পড়তে পড়তে তানশান দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছে এদিকে। তপোবনের চোখেমুখে উজ্জ্বলতা বাড়তে লাগলো ছেলের কন্ঠে। পিছু ফেরার আগেই প্রবল বেগে তানশান আঁছড়ে পড়ল বাবার পৃষ্ঠদেশে। দু’হাতে বাবার পৃষ্ঠদেশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুধায়,
–”তুমি আমায় আগের মতো ভালোবাসবে?”
তপোবন আলতো ঘাড় ঘুরিয়ে ছলছল নয়নে তাকায়। ঘন ঘন মাথা নেড়ে বললো,
–”মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাপা তোমার কাছে একই রকম থাকবে, যেমনটা তুমি চাও।”
–”কখনো আমায় অবহেলা করবে না?”
–”কখনো না।”
–”তুমি সবসময় আমার ম্যাথের টিচার থাকবে?”
–”সবসময় থাকব।”
–”তোমার নতুন পরিবার হলেও, তুমি কখনো আমায় ভুলে যাবে না।”
–”পাপা নিজেকে ভুলতে পারি কিন্তু তানশানকে কখনো নয়। পাপা আর তানশান নতুন পরিবারের ঢাল হব। হবো তো তানশান?”, বাবার কথায় তানশান জোরে জোরে মাথা নাড়লো। সে হবে। তপোবনের ওষ্ঠপুটে বিশ্বজয়ের হাস ফুটে উঠল। ছেলের সঙ্গ তার সাথে রয়েছে তবে আর কি প্রয়োজন!
বাবাকে জড়িয়ে ধরেই তানশান নাক টেনে কেঁদে উঠল। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
–”স্যরি পাপা। আ’ম রিয়েলি ভেরি স্যরি। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। মাম্মা চলে গিয়েছে, তুমিও যদি আমায় ভুলে যাও তবে আমি কি নিয়ে থাকব? তাই ভুল করে ফেলেছি। আমি তোমায় আর কখনো কষ্ট দেবো্ না।”
তপোবন ছেলেকে পেছন থেকে টেনে সামনে নিয়ে আসে। বুকে জড়িয়ে নিয়ে দু হাতের আজলায় ছেলের ক্রন্দনরত মুখটি নিয়ে, কপালে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–”এমন চিন্তাভাবনা আর কখনো মাথায় আনবে না। পাপার প্রতিটা পথচলা তোমায় সাথে নিয়ে হবে। পাপার জীবনের শেষ যাত্রা পর্যন্ত তোমার সঙ্গে হবে। শেষযাত্রায় পাপাকে কাঁধে তুলতে হবে না?”
–”এমন কথা কেন বলছো?”, তানশান আ’ত’ঙ্ক নিয়ে শুধায়। তপোবন ম্লান হাসলো ছেলের আ’ত’ঙ্কিত মুখটি দেখে। চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিতে দিতে বলল,
–”এটাই তো অনিবার্য। পাপা সবসময় তোমায় নিজের পাশে চাই। থাকবে তো?”
–”সবসময় থাকব।”, তানশান দৃঢ় কন্ঠে বললো। তপোবনের ঠোঁটের কোনে তৃপ্তির হাসি। এরোজ বুকভরা উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল বাবা ছেলের আলিঙ্গনে। সে উদাসীন কন্ঠে বললো,
–”বাবা ছেলের হলে চাচাকেও একটু জড়িয়ে ধরো। নিজেকে অনাথ অনাথ লাগছে।”
তপোবন ধারাম করে এক কিল বসিয়ে দেয় এরোজের পিঠে। এরোজ আর্তনাদ করে উঠল। তপোবন হাত বাড়িয়ে তাকেও বুকে জড়িয়ে ধরে। এরোজ হাসিমুখে তানশানকেও নিজেদের সাথে জড়িয়ে নেয়। অদূরে দাঁড়ানো পারমিতা ওষ্ঠকোনে স্নিগ্ধ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ধীরপায়ে এগিয়ে আসে তাদের কাছে। এরোজ আর তানশান গাড়িতে উঠে বসে। পারমিতা তপোবনের কাছে গিয়ে তার হাতে একটা খাম দেয়। তপোবন ভ্রু কুঁচকে তাকায় খামটির দিকে। অবুঝ কন্ঠে শুধায়,
–”এটা কি দিয়েছো?”
পারমিতা অভিমানী কন্ঠে বলল,
–”তাকে আনলি না কেন? আমাকে দেখানো যাবে না? না-কি আমি তোকে জেলে পাঠিয়ে দেব? এটা আমার তরফ থেকে উপহার তার জন্য। আমি খুশি হয়ে দিয়েছি। দেখতে যেতে পারছি না, তোর বাবার শরীর খারাপ তার এটা সেটা প্রয়োজন হয় সবসময়।”
তপোবন কপাল কুঁচকে নাকোচ করে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু পারমিতা শাসিয়ে বলল,
–”খবরদার তপু! সে আমার মেয়ের মতো। আমি তাকে খুশি হয়ে দিয়েছি তুই নাকোচ করার কে?”
তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
–”ঠিক আছে। তবে এটা তুমি নিজের হাতে দিলে ভালো হতো। আমি এসে নিয়ে যাব তোমায় আর আব্বুকে।”
–”সে পরে যাবো। কিন্তু তুই এটা এখন দিস। আর আমার দোয়া আছে সবসময় তোদের জন্য। তানশান ছোট তাই হয়তো ও এমনটা ভাবছে, তবে আমি তো আমার ছেলেকে চিনি। সে নিজেকে ভুলতে পারে কিন্তু আমার নানুভাইকে নয়।”
এক আদুরে আলিঙ্গন করে তপোবন শাশুড়ির থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। নেই কোন শঙ্কা!
সম্পর্কের এক দীর্ঘ ছেদ বিচ্ছেদ কাটিয়ে বাবা-ছেলে সন্ধ্যায় হাসিমুখে ঘরে ফিরে আসে। কারোর মুখে নেই কোন মলিনতা। নির্জনা বেগম, মৌনতা, রূপকথা আর রোজ বসার ঘরের সোফায় এখানে সেখানে বসে ছিল। তাদের আগমনে সকলে নড়েচড়ে উঠল। তপোবন তানশানকে বলল,
–”উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।”
তানশান মাথা নেড়ে উপড়ে চলে যেতেই মৌনতা সোফা থেকে উঠে এসে তপোবনের কাছে দাঁড়ায়। উদ্বিগ্ন, নিচু কন্ঠে শুধায়,
–”তানশানের কি কিছু হয়েছে ভাইজান?”
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–”তোমার কি মনে হয় আমি ওর কিছু হতে দেব? কিছু হয়নি, চিন্তা করো না। জবাকে এক কাপ কফি দিতে বলো না, মৌন। আমি বের হব। এক কাপ কফি খেয়ে বের হই। আর তানশানকে বেশি করে লেবু দিয়ে একটু থাই স্যুপ করে দিতে বলবে। ওর সর্দি হয়েছে। ”
–”আমি দিচ্ছি, ভাইজান। আপনি বসুন।”
“তোমার দরকার নেই মৌন। জবাকে বলো। শুনলাম তোমার নাকি পায়ে ব্যাথা। ডাক্তারের কাছে চলো ভাইজান নিয়ে যাই। ইমরোজের তো কোন খোঁজখবর নেই। কন্সট্রাকশনের কাজ শেষ আরো তিনদিন আগে। ও এখনো আসছে না।”, তপোবন অসন্তোষ মাখা কণ্ঠ। মৌনতা ম্লান হাসলো। ইমরোজের কথা এড়িয়ে গিয়ে বলল,
–”এতোটাও ব্যাথা নয়, ভাইজান। আপনি চিন্তা করবেন না। মাঝেমধ্যে একটু ব্যথা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বসুন আমি আনছি কফি।”
নির্জনা বেগম ততক্ষণে ছেলের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মৌনতার দিকে তাকিয়ে বললো,
–“তুমি গিয়ে চুপচাপ বসো, মেজো বউ। বড় বউমা আছে না? সে কি শুনছে না কফি করে দেয়ার কথা?”
রূপকথা কফি বানাতে পারে না, তাই হাত গুটিয়ে বসে ছিল। শাশুড়ির কথায় মৌনতা বলল,
–”আম্মা কথা পারবে..”
–”পারবে না-কি পারবে না সেটা আমি দেখে নেবো মেজো বউ মা।”
নির্জনা বেগম ব্যগ্র কন্ঠে বলেই রূপকথাকে আদেশ মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
–” বড় বউ মা, আমার সাথে এসো।”
শাশুড়ির তলবে রূপকথা আড়ষ্টতা ভেঙে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। নির্জনা বেগম রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। তপোবন সোফায় বসে একপলক রূপকথার দিকে তাকায়। কিছু একটা মনে পড়তেই সে পিছু ডাকলো রূপকথাকে। ক্ষণপরিচিত ভারী কন্ঠে ডাকে রূপকথার বুকের মাঝে আড়ম্বরতা সৃষ্টি হয়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তপোবনের দিকে। তপোবন পকেট থেকে খাম’টা বের করে এগিয়ে যায় রূপকথার কাছে।
খাম টা রূপকথার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১১
–”এটা তোমার, তানশানের নানু দিয়েছে। সাথে ভালোবাসা আর দোয়া।”
রূপকথা খামটির দিকে তাকিয়ে এক পলক তপোবনের দিকে তাকায়। প্রতিক্রিয়াহীন খামটি নিয়ে ক্ষীণ কন্ঠে বললো,
–”ধন্যবাদ।”
