Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৩

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৩

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৩
রুপান্জলি

১৮/ ০৩/২০১৯
,,,কেটে গিয়েছে পাঁচ টা দিন। এই পাচ দিনে পারু আর দ্বীপের একটা বারো দেখা হয়নি। পারু যতটা সময় ক্লাসের বাহিরে থেকেছে প্রতিটা সময় শুধু দ্বীপকেই খুজেছে। পারু ভেবেছিলো সেদিনের মতো দ্বীপ আবারো তার কাছে আসবে। কিন্তু তার ধারনাকে ভুল প্রমান করে দিয়ে দ্বীপ এলোনা,, তার কাছে আসা তো দূর,, তাকে ক্যাম্পাস, ক্যান্টিন, এন্ট্রি গেইট,, কোথাও দেখা যায়নি। পারুর কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে,, একটা লোক যখন প্রতিদিন তাকে নানান ভাবে বিরক্ত করতো তখন তার খুব বিরক্ত লাগতো। আর এখন যখন লোকটা বিরক্ত করা ছেড়ে দিলো তখন যেনো আরও বেশি বিরক্ত লাগছে। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে পারুর। কই চলে গেলো লোকটা?পারুর কথা কি তার একটু ও মনে পরেনা? সত্যি ই কি আর কোনোদিন পারুর কাছে আসবেনা? ভালোবাসার আবদার জানাবেনা? আদর করে অবাধ্য প্রেমিকা বলেও ডাকবেনা? অধিকার খাটিয়ে জড়িয়ে ধরবেনা? বুকের মাঝে শক্ত করে আকরে ধরে চোখ বুঝে বলবেনা?

ভালোবাসি। আর কখনোই মাঝরাস্তায় সেই মেয়েটিকে দিয়ে এক থোকা ফুল পাঠাবেনা? পারুকে দিয়ে জোর করে বেইব ডাকাবেনা? আচ্ছা!! এরপর কি উনি অন্য কাউকে ভালোবাসবেন? পারুকে আর কখনো দেখতেও চাইবেন না? দেখবে কেনো? পারু তো সস্তা হয়ে গিয়েছে, সে তো রাস্তার মেয়ে। আর সস্তা, রাস্তার মেয়ে তো দ্বীপের চাইনা। সে ভালোবাসলে একটা আত্মসম্মান ওয়ালা মেয়েকে ভালোবাসবে। পারু আর ভাবতে পারলো না,, চোখ ফেটে জল গড়ালো। আজ পাঁচদিন যাবত পারু ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমায়,, কি করবে? তার যে ঘুম হয়না। সারাক্ষণ দ্বীপের মুখটা ভাসে ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে নিজ থেকে দ্বীপের বাহুডরে লুটিয়ে পরতে। বুকের পাশে মুখ গুজে বলতে,, আমি হেড়ে গিয়েছি,, আপনার ভালোবাসার কাছে হেড়ে গিয়েছি খারাপ পুরুষ। আমি আপনার থেকে এভাবে ইগনর পেতে পারছিনা,, কষ্ট হচ্ছে খুব। সেসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমের দেশে পারি জমালো পারু। এই পাঁচটা রাত তার এভাবেই কেটেছে। পারু কষ্ট খুব ভয় পায়,,, শরীর আর মনকে কষ্টে থাকতে দেখতে পারেনা তাই কষ্ট পাবেনা বলে সামান্য মাথা ব্যাথা হলেও সে ঘুমের ঔষধ খেয়ো ঘুমায় আর এটা তো মনের ব্যাথা। এই ব্যাথা কমাতে ঘুমের ঔষধ বড্ড প্রয়োজনীয় জিনিস। তাইতো ঘুমের ঔষধকে রাতের সঙ্গী করে নিয়েছে সে।

১/০৪/২০১৯
,,, এখন আর ভার্সিটিতে যাওয়ার মুড পায়না পারু,, গেলেই কেমন ফাকা ফাকা লাগে, তবুও পড়ালেখার খাতিরে যেতেই হয়। এতোদিন দ্বীপের দেখা না পেলেও আজ ক্যাম্পাসে পা রাখতেই দ্বীপ আর তার গ্যাংকে দেখতে পেলো। লোকটা এখনো সিগারেট খাচ্ছে, আর বন্ধুদের সাথে দাড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। একটা মানুষ এতো সিগারেট কিভাবে খেতে পারে পারুর জানা নেই। আজ ছয়দিনের মাথায় দ্বীপকে দেখে পারু নিজেকে আটকাতে পারলোনা। পাশে দাড়িয়ে থাকা মেধার হাত ধরে জিজ্ঞেস করলো — মেধা!! বিহান ভাইয়ের কাছে যাবে?
,,, পারুর কথায় চোখ উচিয়ে চাইলো মেধা ভ্রু নাচিয়ে বললো — কেনো বলোতো? আমার তো ঐ লোকের সাথে দিন রাত ২৪ ঘন্টাই দেখা হয়,, এখন দেখা করতে যাবো কেনো?
,,, পারু কি বলবে ভেবে পায়না। সে তো বিহানের কাছে নয় দ্বীপের কাছে যেতে চায় কিন্তু সেটাতো মুখ তুলে বলতে পারবেনা। বললেই মেধা সেটা নিয়ে মজা উড়াবে কিংবা লজ্জায় ফেলার চেষ্টা করবে। ভেবেই আমতা আমতা করে বললো — না মানে,, সেদিন তো বিহান ভাইকে গিফ্ট টা দেওয়া হয়নি তাই আরকি,, চলোনা গিফ্ট টা দিয়ে আসি!!
,,, মেধা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো পরপর কি ভেবে যেনো ঠোটে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বললো — চলো তাহলে,,, গিফ্ট টা দিয়ে আসা যাক।

,,, বলেই পারুর হাত ধরে এগিয়ে গেলো,, পারু মনে মনে সস্থির নিশ্বাস ফেললো। ভাগ্যিস আগে ভাগেই কলমটা কিনে রেখেছিলো। যদিও সে জানতোনা এই কলমটাই তাকে দ্বীপের কাছে পৌছাতে সাহায্য করবে। তবুও মনে মনে কলমটাকে দুটো চুমু ছু্রলো পারমিতা। সে কাছে গেলে নিশ্চয়ই দ্বীপ কিছু না কিছু বলবে? কিছু না বলুক সামনাসামনি একটু দেখা তো হবে? এই অনেক। দ্বীপরা যেহেতু ক্যাম্পাসের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে ছিলো ওদের কাছে পৌছাতে পারমিতাদের মিনিট খানিক সময় লেগেছে। মেধা পারুকে নিয়ে একদম বিহানদের সামনে গিয়ে দাড়াতেই গ্যাং এর সকলে সম্মানের সহিত গলা উচিয়ে বললো —
,,,আসসালামু আলাইকুম ভাবি!! ভালো আছেন?
,,, মেধা হেসে ফেললো,, এরা সর্বকালেই তাকে ভাবি বলে সম্মোধন করে। মেধা মাথা ঝাকিয়ে বললো — ওয়ালাইকুম আস-সালাম,, ভালো আছি আপনারা নিশ্চয়ই ভালো?
,,, সবাই মাথা ঝাকিয়ে শায় জানিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান নিলো। এখানে আপাতত থাকা নিষিদ্ধ,, ভাই ভাবিরা যখন কথা বলে তখন তারা সর্বদাই সেখানে থেকে প্রস্থান নেয়। ভাই ভাবিদের কতো পারশোনাল কথা থাকতে পারে। সেসব তো আর দাড়িয়ে দাড়িয়ে শুনা যায়না, তাইনা ? সবাই যেতেই মেধা একবার বিহান আরেকবার দ্বীপকে দেখে বিহানের উদ্দেশ্যে বললো — পারু তোমায় কিছু দিতে চায়।

,,, বিহান অমায়িক হেসে পারুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো — কি দিবেন ভাবি? দিয়ে দেন।
,,, ভাবি ডাক শুনে লজ্জা পেলো পারমিতা,, তেল চকচকে গাল দুটোতে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পরলো। ওকে এরকম লজ্জা পেতে দেখে মেধা আর বিহান একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসলো। পারমিতা ব্যাগ হাতরে কলমটা বের করে এগিয়ে দিতেই বিহান সহাস্যে সেটা গ্রহন করে দ্বীপকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো — থ্যাংক ইউ ভাবি!! আমি ভাবতেও পারিনি আপনি আমাকে আবারও গিফ্ট করবেন। সেদিন তো একজন আমার গিফ্ট টা একদম ছিনিয়ে নিয়ে পকেটে পুরে রেখেছিলো,, তাও আবার বুক পকেটে। যেনো ওইগুলো তার হৃদপিণ্ড!! যাই হোক ভাবি আপনি কি একটু এখানে দাড়াবেন? আমি মেধার সাথে একটু দূরে গিয়ে কথা বলি?

পারু মাথা ঝাকিয়ে সায় জানালো,, সে তো এরকম কিছুই চাচ্ছিলো। সবাই দূরে চলে গেলে সে দ্বীপের সাথে একটু আলাদা কথা বলতে পারবে। মেধা আর বিহান কিছুটা দূরে চলে যেতেই পারু মাথা উচিয়ে দ্বীপের দিকে তাকালো। দ্বীপ গাছে হেলান দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে সি*গারেট খাচ্ছে। পারুর কি যে রাগ লাগলো,, মন চাচ্ছে টান দিয়ে মুখ থেকে সি*গারেট টা কেরে নিতে। কিন্তু সাহসে কুলালো না। আর সাহস থাকলেও তারতো সেই অধিকার নেই। দ্বীপ তাকে অধিকার দিতে চাইলেও পারু সেটা গ্রহন করতে চায়নি,, এখন সে নিজেই অধীকার পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে যাচ্ছে। পারু দুপা এগিয়ে দ্বীপের সামনে দাড়ালো। দ্বীপ একবার পারুকে আড়চোখে দেখে আবারও অন্যদিকে তাকিয়ে সি*গারেট খাওয়ায় মন দিলো। এই পর্যায়ে এসে সে আবারও সেদিনের মতো সি*গারেট অনেক সময় ধরে টেনে ধুয়া গিলে নিতে থাকলো। সেসব দেখে পারুর রাগ আরও বাড়লো,, মরবে নাকি এই লোক? সবসময় এমন করে কেন?পারুর রাগ হলেও সে রাগ দেখাতে পারছেনা। কতোদিন পর দেখলো লোকটাকে,, মুখ চোখে কেমন মলিনতা বিরাজ করছে। মায়াবী চোখ জোড়া লাল হয়ে ফুলে আছে,, খারা নাকটাও লাল,, জাম রঙা ঠোঁট দুটো কালচে রং ধারন করেছে। আচ্ছা!! লোকটা কি কেদেছে? ছেলেরা কাদে নাকি? কাদতেও পারে। পারু তো আগে থেকে দ্বীপকে ভালোবাসেনি তবুও এই পাচদিনে তার অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। আর লোকটা তো তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে তাহলে উনার না জানি কেমন লেগেছে এই পাঁচদিন। পারু গলা উচিয়ে হালকা ধমকের স্বরে বললো– ধোয়া গিলে নিচ্ছেন কেনো? মরার সখ হয়েছে?

,,,দ্বীপ কিছু বললো না। আগের মতোই অন্য দিকে ফিরে রইলো।
,,, আপনাকে আমি কিছু বলছি,, কথার উত্তর দিচ্ছেন না যে?
,,, (—-)
,,,, দ্বীপকে উত্তর দিতে না দেখে পারুর খুব মন খারাপ হলো। উনি কি আর ওর সাথে কথা বলবেনা?পারু একবার দ্বীপের হাতের দিকে তাকালো,, পাঁচদিন আগে হাত কেটে গিয়েছিলো এখনো অনেক জায়গায় দাগ পরে জখম হয়ে রয়েছে। পারু আবারও মিনমিনে স্বরে বললো — হাতের অবস্থা কেমন? এখনো ব্যাথা করে?
,,,,( নিশ্চুপ)
,,, দ্বীপকে এখনো কিছু বলতে না দেখে পারু অসহায় কন্ঠে সুধালো — আমার সাথে আর কথা বলবেন না?
,,, ( নিশ্চুপ)
,,,পারু কন্ঠে অনুতপ্ততা ঢেলে বললো — ঐদিনের করা কাজের জন্য আমি সরি। আসলে,, বিষয়টা নিয়ে আমি এতোটাও গভীর ভাবে ভাবিনি। যখন ভাবলাম, তখন আমি আমার অপরাধ টা বুঝতে পেরেছি। আমি আর কখনো এরকম করবোনা। প্রমিজ!!
,,, পারুর বলতে ইচ্ছে করলো, দ্বীপ যেনো আবার আগের মতো হয়ে যায় কিন্তু পারলোনা। ঐ কথাটা বললে নিশ্চয়ই দ্বীপ ওকে বেহায়া ভাববে? পারু দীর্ঘ বাক্য ব্যায় করে থেমে যেতেই দ্বীপ পকেট থেকে ফোন বের করে কাকে যেনো কল দিলো। ওপাশ থেকে কল ধরতেই দ্বীপ সি*গারেট টা দূরে ছুড়ে মেরে বললো — আম্মু!! বিয়ে করার জন্য মেয়ে দেখতে চেয়েছিলে না? দেখা শুরু করো। বিয়ে করতে কোনো আপত্তি নেই আমার। আর হে!! খেয়াল রেখো,, মেয়ে সুন্দর হোক বা না হোক!! নাচনেওয়ালি যেনো না হয়। ওসব হাজার পুরুষের সামনে নাচানাচি করা সস্তা মেয়েদের আমার পছন্দ না।

,,, লাস্টের কথাটা পারুর দিকে তাকিয়ে বললো। পারুর চোখে উপচে পরা জল। দ্বীপ কি তবে সত্যি আর তাকে ভালোবাসবেনা? ভুলে যাবে? ভুলে যাবে কি? ভুলেই তো গিয়েছে। পারু তো সস্তা,, নাচনেওয়ালি,, হাজার পুরুষের মাঝে নেচে বেড়ায়। তার মতো সস্তা মেয়ে তো দ্বীপের পছন্দ না। ভালোই হয়েছে,, দ্বীপ বরং একটা ভালো আত্মসম্মানি মেয়ে খুজে নিক। যে তাকে খুব ভালো রাখবে,, খুব শান্তিতে রাখবে,, তার মতো এতো ইগনর করবেনা,, কষ্ট দিবেনা। দ্বীপ অন্য কাউকে ভালোবাসবে ভেবে আরও কান্না পাচ্ছে তার, কান্না আটকাতে একটা বড়ো সরো ঢোক গিললো পারু। হালকা শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে মলিন কন্ঠে বললো —
— বিয়ে করছেন? ভালোই হবে,, আপনার অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবো।
,,,দ্বীপ এবারো প্রতিত্তোরে করার প্রয়োজন মনে করলো না। পারুকে এক প্রকার না দেখার মতো করেই সেখান থেকে চলে গেলো। পারু অসহায় চোখে দ্বীপের প্রস্থান দেখলো,, তার বুকের ভিতর তান্ডব চলছে। এতো এতো প্রায়োরিটি দেওয়া মানুষটা হুট করে ইগনর করলে বুঝি এমনি কষ্ট হয়? পারু আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলোনা। নাক টেনে টেনে নিজের কান্নাকে দমাতে চাইলেও কোনো লাভ হলোনা। দ্বীপ বিয়ে করছে,, কদিন পর সংসার ও করবে,,, অন্য কাউকে ভালো ও বাসবে এসব মানা খুব কঠিন হয়ে পরেছে পারুর জন্য। তার এখন কি করা উচিৎ? নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে বেহায়ার মতো দ্বীপকে ফিরে আসতে বলা উচিৎ? না না!! সে এটা পারবেই না। পারুর ভাবনার মাঝেই তার কাধে হাত রাখলো মেধা। পারু তারাহুরো করে চোখ মুছে মেধার দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বললো — কথা বলা শেষ? চলো তাহলে যাওয়া যাক।

,,, পারুর কথায় মেধা মলিন হেসে বললো — ভাইয়ার সাথে কিছু ঠিক হয়নি তাইনা? আমি বুঝতে পারছি তুমি ভাইয়াকে পছন্দ করো,, সব ঝামেলা মিটিয়ে নাও পারু। ভাইয়াও তোমাকে ছাড়া কষ্ট পাচ্ছে।
,,,পারু বিনিময়ে মৃধু হেসে বললো — তোমার ভাইয়া বিয়ে করছে মেধা,, তাকে আমার হয়ে অভিনন্দন জানিয়ে দিও। আমি তার যোগ্য না,, সে ভালো থাকুক।
,,, মেধার নিজেকে পাগল পাগল লাগলো,, ওদিকে ভাইয়া বাড়িতে সারাদিন ভাঙচুর করে,, খাওয়া দাওয়া ছেড়ে সি*গারেট, ম*দ নিয়ে পরে থাকে। এদিকে পারু কষ্ট চেপে ভালো থাকার অভিনয় করছে। মেধা পারুকে বুঝানোর মতো করে বললো — তোমরা দুজন যদি এরকম জেদ করো কিছু ঠিক হবেনা পারু। দোষটা যেহেতু তোমার সেহেতু তোমার কম্প্রোমাইজ করা উচিৎ।
,,, পারুর খুব কান্না পাচ্ছে,, সে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে বললো — আমি সস্তা নাচনেওয়ালি মেধা। তোমার ভাইয়া সস্তাদের পছন্দ করেননা। তাই আমি আর কথা বাড়াতে চাইনা। সে তার মতো থাকুক, আমি আমার মতো। আমাদের মাঝে তো তেমন কিছুই হয়নি, শুধু একটা মাসের পরিচয়, এই যা। উনি আমাকে ভদ্র, ভালো মেয়ে মনে করে ভালোবেসেছিলেন। যখন দেখলেন আমি উনার ভাবনার থেকে আলাদা ওমনি দূরে সরে গেলেন। এর মাঝে নাহয় আমি বোকা পারু তোমার ভাইয়াকে মন দিয়ে বসেছি,, এটা আমার দোষ,, এখানে সবটাই আমার দোষ, বুঝলে? মেধা জানো!! একটা সরল সাদাসিধে মেয়ে সর্বদা ছন্নছাড়া, বেপোরোয়া পুরুষের মাঝে আটকে যায়। কিভাবে আটকায় সে নিজেও জানেনা তবুও আটকে যায়। ( কান্না আটকে গভীর শ্বাস টেনে) সমস্যা নেই,, তোমার ভাইয়া ভালো থাকুক। আমি সর্বদা উনার মঙ্গল কামনা করবো,, বিবাহিত জীবনে সুখি হোক উনি।
,,,বলেই সামনের দিকে হাটা দিলো পারু,, আপাতত সে হোস্টেলে ফিরে যাবে। ভার্সিটিতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

২২/০৪/২০১৯
,,,মাঝে কেটেছে আরও তিনটে দিন। সর্বদা চুপচাপ থাকা পারু এখন আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। ভার্সিটিতে এলে সারাক্ষণ মন মরা হয়ে ক্লাসে বসে থাকে। তাকে জোর করেও ক্যাম্পাসে নিয়ে যাওয়া যায়না। ক্যাম্পাসে কিভাবে যাবে সে? ওখানে তো দ্বীপ আছে। যেই দ্বীপকে বিভা, সিমরান আর অথৈ এর সাথেও প্রয়োজন ব্যাতিত কথা বলতে দেখেনি পারু। সেই দ্বীপ এখন যেকোনো মেয়ের সাথে কথা বলে, হাসাহাসি করে,,, আড্ডা দেয়। পারু তো জানতোই না দ্বীপ যে হাসতে জানে, এখন মেয়েদের দৌলতে সময়ে অসময়ে দ্বীপের হাসি দেখতে পায়। এই বিষয়গুলোই কাদায় পারুকে। এতো দহন সহ্য করার নয়। একটা সময় দ্বীপ কাছে এলে পারু বিরক্ত হতো,, এমনকি দ্বীপের ভয়ে পারু ভার্সিটি ছেড়ে দেওয়ার পন ও করেছিলো। অথচ আজ দেখো,, ঐ লোকটাকে কাছে পাচ্ছেনা বলে পারুর ভার্সিটি নয় বরং পুরো দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে মন চাচ্ছে। দ্বীপ যে তার মনটাকে এভাবে গ্রাস করে নিবে বিষয়টা ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি মেয়েটা। এখন কি করবে সে? এই দহনের শেষ কোথায়? তার কি মরে যাওয়া উচিৎ? মরে গেলে আব্বু আম্মুকে দেখবে কে? পারুর তো বড়ো কোনো ভাই নেই। পারু যখন ক্লাসে বসে হাজারো ভাবনায় বিভোর তখন সিমি তার বান্ধবীদের নিয়ে পারুর ডিপার্টমেন্টে হাজির হয়। পারুকে মনমরা হয়ে মেধার কাধে মাথা রেখে বসে থাকতে দেখে সবাই টেনে হিচরে দুজনকে নিয়ে বের হয়। আজকে তারা পারুর মন ভালো করেই ছাড়বে। প্রয়োজনে দ্বীপ মির্জাকে টেনে হিচরে পারুর সামনে এনে ফেলবে তবুও পারুর মন ভালো হওয়া চাই মানে চাই। বান্ধবীদের পাগলামিতে পারু ও না করতে পারলোনা। অগত্যা সবার সাথে ফুচকা স্টলে গেলো,, আজ নাকি সবাই মিলে ঝাল ঝাল করে ফুচকা খাবে। পারুর অবশ্য এতে আপত্তি নেই, গ্রামের মেয়ে হওয়ার দরুন তার ঝাল খাওয়ার অভ্যাস আছে। ফুচকা ওলা মামা সবার জন্য ফুচকা বানিয়ে দিতেই যে যার মতো খাওয়া ধরলো। অতিরিক্ত ঝাল হওয়ায় মেধা নাক মুখ কুচকে বললো — আল্লাহ!! তোমরা এতো ঝাল কিভাবে খাও আমার তো হাওয়াই টাইট হয়ে যাচ্ছে।

,,,সিমি বললো — আমরা বরিশালের মেয়ে বইন,, এরকম ঝাল খাওয়া আমাদের প্রতিদিনকার ব্যাপার।
,,, মেধা ঝালের তোপে নাক ডলতে লাগলো ,,ততক্ষণাৎ বিচলিত পায়ে এগিয়ে এলো বিহান। ফুচকাওয়ালা মামার থেকে পানি নিয়ে মেধার দিকে এগিয়ে দিয়ে শাসিয়ে বললো — কি ব্যাপার এতো ঝাল খাচ্ছো কেনো? দিবো একটা ঠাটিয়ে?
,,, আকষ্মাৎ বিহানকে দেখে ভরকে গেলো সবাই পরক্ষণেই মেধার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলো। পারু এদিক ওদিক তাকিয়ে দ্বীপকে খুজলো,, সারাক্ষণ তো বিহান ভাইয়ের সাথেই থাকে ঐ লোক ,, তাহলে এখন কই গেলো? এদিকে মেধা পানিটা খেয়ে আবারও লাল হয়ে যাওয়া নাকটা ডলে কান্না ঝরা কন্ঠে বললো — আমার খুব ঝাল লাগছে,, মনে হচ্ছে ঝালে মরেই যাবো।
,,,মেধার এহেন কথায় চোখ পাকিয়ে তাকালো বিহান পরপর মেধার দিকে ঝুকে ফিসফিস করে বললো — একটু নিরালায় চলো,, ঝালটা কমিয়ে দেই।

,,, মেধার কাছাকাছি দাড়িয়ে থাকার দরুন বিহানের ফিসফিস করে বলা কথাটা কানে গেলো পারুর,, সে না চাইতেও ঠোট প্রসারিত করে হেসে দিলো। আজ বহুদিন পর একটু হাসলো মেয়েটা তবে সেই হাসি দীর্ঘস্থায়ি হলো না। দ্বীপকে মেয়ে নিয়ে ফুচকা স্টলে ঢুকতে দেখে পারুর মুখে আধার নেমে এলো। দ্বীপ আর সেই মেয়েটার মধ্যেকার বন্ডিং, কথা বলার ধরন দেখলে যে কেউ বলবে তারা হাসবেন্ড ওয়াইফ বা গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড। পারু বিহানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা নির্লজ্জের মতোই প্রশ্ন করলো — উনার সাথে থাকা মেয়েটা উনার কি হয়?
,,,বিহান চোখ উচিয়ে ফুচকাওয়ালা মামার ওখানে দাড়িয়ে থাকা দ্বীপ আর সাথের মেয়েটাকে দেখে ছোট করে বললো — ওর সাথে দ্বীপের বিয়ে ঠিক হয়েছে,, সামনের সপ্তাহেই বিয়ে।

,,, বিহানের কথা শুনে মেধা অবাক হয়ে বিহানের দিকে তাকালে বিহান চোখের ইশারায় কিছু একটা বুঝালো। দমে গেলো মেধা,, আপাতত কিছুই বলার নেই। বিহানের কথা শুনে মলিন হাসলো পারু,, দ্বীপের সাথে থাকা মেয়েটা খুব ভদ্র,, পড়নে গোলাপি গাউন,, পিঠ সমান চুলগুলো খুব সুন্দর, একদম সোজা হয়ে পরে আছে। গায়ের রং ও দ্বীপের মতো ধপধপা ফর্সা,, অন্যদিকে ফিরে থাকার দরুন চেহারাটা ভালোভাবে দেখা যাচ্ছেনা তবে একপাশ দেখেই বুঝা যাচ্ছে মেয়েটা বড্ড সুন্দরী। পারু তো ঐ মেয়ের ধারে কাছেও যায়না।ভালোই হয়েছে দ্বীপ যেমন সুন্দর তার বউ ও তেমন সুন্দরী। আল্লাহ ওদের সংসার জীবন সুন্দর করুক,, পারু নাহয় ভেসে যাক কচুরিপানা হয়ে। পারু আর থাকতে পারলো না সেখানে,, কাউকে কিছু না বলে সিমির হাতে ফুচকার প্লেট টা ধরিয়ে দিয়ে তারাহুরো করে সেখান থেকে চলে গেলো। সে আর কোনোদিন ভার্সিটিতে আসবে না, কালকেই বাড়ি চলে যাবে। এই ঢাকা শহরে আর না।

,,,রাত ১১ টা,,
,,ব্রিজে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে পারমিতা,, তার পরনে দ্বীপের দেওয়া সেই কালো শাড়ী,, হাতে কালো রেশমি চুড়ি,, কানে গলায় মাটির জুয়েলারি,, তেল দেওয়া লম্বা চুলগুলো রাতের বাতাসে মৃধু গতিতে উড়ছে। এই ব্রিজটা ভার্সিটির খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে ( গল্প ক্ষেত্রে দেওয়া, এর কোনো সত্যতা নেই।)
পারু হাতে থাকা বাটন ফোনটা তুলে খারাপ পুরুষ নামে সেইভ করা নম্বরে পঞ্চম বারের মতো কল ঢুকালো,, আল্লাহ এর অশেষ মেহেরবানিতে এইবার ওপাশ থেকে কল উঠালো দ্বীপ। পারমিতা তারাহুরো করে সালাম দিলো, ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলোনা। এপর্যায়ে কান্না আটকাতে না পেরে ফুপিয়ে উঠলো পারু,, কাদতে কাদতে বললো —
,,, আমার সাথে একটু কথা বলবেন? প্লিজ!! শেষ বার?
,,, ( নিরবতা)
,,, পারু শব্দ তুলে কান্না করতে করতে বললো — আমার শরীরে খুব জ্বর,, জ্বরে হাত পা কাপছে।
,,,ওপাশ থেকে শুধু শ্বাসের শব্দ শুনা যাচ্ছে। এই শ্বাসের গতি পারুর চিনা,, দ্বীপ যতোবার ওর কাছে এসেছে ততোবার এই শ্বাসের শব্দ অনুভব করেছে সে। পারু আবারও কান্না আটকে ফোঁপাতে ফোপাঁতে বললো— বুকেও ব্যাথা করছে,, মনে হচ্ছে এখোনি মরে যাবো।

,,,, ওপাশ থেকে এবার শব্দ ধেয়ে এলো। দ্বীপ অত্যন্ত কর্কষ শব্দে উচ্চারন করলো — আমি কি ডক্টর? আমাকে শুনাচ্ছিস কেনো? নেক্সট টাইম আমাকে কল দিবিনা,,,অসহ্য লাগছে তকে।
,,,বলেই কল কেটে দিলো। পারু অবাক হয়ে শুনলো দ্বীপের বলা কথাটুকু,,পারুকে অসহ্য লাগছে দ্বীপের? লাগবেই তো। সে তো আর পারুকে ভালোবাসেনা। তার তো সুন্দরী হবু বউ আছে,, পারু মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। অতিবো ভীতু মেয়েটা সাহস করে ব্রিজের রেলিঙে উঠে দাড়ালো। জ্বরের তোপে হাত পা কাপছে,, সেই কাপা হাতেই দ্বীপের নম্বরে একটা টেক্সট পাঠালো — বেইব!! আলবিদাহ।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১২

,,,,পরপর শারীরের থরথরে কাপনি আর দূর্বলতায় ফোনটা ধরে রাখতে সক্ষম হলো না। সহসা ফোনটা হাত ফসকে পানিতে পরে গেলো। চাদের আলোয় সচ্ছ পানি মুক্তর ন্যায় জ্বল জ্বল করছিলো,, সেই পানিতে ফোনটা পরতেই টুপ করে একটা শব্দ হলো। সেই শব্দ খানা পারুর মনে সাহস যোগালো,, সে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে আওড়ালো — আমায় মুক্তি দাও পৃথিবী!! তুমি আগেই জানতে পারু কষ্ট সহ্য করতে পারেনা তবুও তাকে কষ্ট দিবে বলে পারুর জীবনে দ্বীপের আগমন ঘটিয়েছিলে। পারু কষ্ট পেয়েছে,, এবার তোমার সাধ মিটেছে তো? মিটে থাকলে আমায় এবার মুক্তি দাও,,, আমায় মাফ করবেন আল্লাহ!!
,,,বলেই পানিতে ঝাপ দিলো পারমিতা সাথে সাথে শুনা গেলো পারমিতার মরন বিদারক চিৎকার।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১৪