৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৯
রুপান্জলি
আজ পাঁচ দিন ধরে একপ্রকার আঠার মতো চিপকে আছে রাত্রি, যেনো কোনো মতেই অরুন তাকে একা না পায়। রাত্রির একটাই ভয় যদি সত্যি সত্যি অরুন তাকে একা পেয়ে মারে কিংবা উল্টা পাল্টা কিছু করে। এই ছেলেটা বরাবরি এরকম, নাহ ছেলেটা নয় বরং ওদের সম্পর্ক টা এরকম। ওরা একসাথে আছে আজ তিন বছর পেরুতে যাচ্ছে, প্রথম দুই বছর তারা দুজন শত্রুর মতো ঝগড়া করতো,, কখনো কখনো সেটা মারামারির পর্যায়ে ও পৌছে যেতো কিন্তু বছর খানিক পেরুতেই অরুন কেমন যেনো হয়ে যায়। সাথে রাত্রি নিজেও অরুনের মাঝে হাড়িয়ে যায়। তারপর থেকে দুজনের মাঝে ঝগড়ার চেয়ে মান অভিমান বেশি হয়।
রাত্রি অযথাই রাগ করে আর অরুন হন্নে হয়ে সে রাগ ভাঙায়। অরুনের রাগ ভাঙানোর ধরন টা আলাদা,, সবাই আদুরে আদুরে কথা বলে রাগ ভাঙালেও অরুন সর্বদা ধমকায়, জোর করে,, কখনো কখনো অল্প সল্প ছুয়ে দেয়। এই ছোয়াটাই সবচেয়ে বেশি আহত করে রাত্রিকে। ও বার বার ডুবে যায় এই ছোয়াতে, আর সেই ভয়েই পাচদিন ধরে ইরার সাথে চিপকে চিপকে থাকছে। কিছুতেই সে ঐ বদমাশ ছেলেটার কাছে ধরা দিবে না। ফ্রেন্ড সার্ক্যালেরের সবাই জানে ওদের বিষয়টা,, এসব নিয়ে মজাও নেয়। পল্লব তো মাঝে মধ্যেই ওদেরকে জামাই-বউ বলে ডাকে। এতে রাত্রি লজ্জা পেলেও অরুন বেশ মজা নেয়, সে যেনো এসব শুনার জন্য মুখিয়ে থাকে। তাদের মাঝে কনভারসেশন গুলো ও যেনো কেমন হয়ে গিয়েছে,, তারা কেনো যেনো সাধারন মানুষের মতো ঝগড়া করতে পারেনা। দুজনেই জানে দুজনের মনে কি চলে,, একে অপরকে কতোটা ভালোবাসে,, কিন্ত কেউ স্বিকার করেনা। এই ভালোবাসি কথাটা বলা ব্যাতিতই বাকি প্রেমিক প্রেমিকার চেয়েও বেশি প্রেম করে ওরা দুজন। রাত্রি যখন ইরার হাত ধরে এসব ভাবতে ভাবতে করিডর দিয়ে হাটছিলো তখনি হাওয়ার বেগে অরুন ওদের সামনে এসে দাড়ালো। রাত্রি ভয়ে ইরার পিছনে চলে গেলো, অরুনের ঠোঁটে বাকা হাসি। ওকে এভাবে দাড়াতে দেখে ইরা ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো — কি সমস্যা? এখানে কি চাই? ক্লাস তো শেষ। ক্যাম্পাসে চল, ওখানে আড্ডা দিবো।
,,,, অরুন কোনা চোখে পিছনে জরোসরো হয়ে দাড়িয়ে থাকা রাত্রিকে দেখে বললো — ওটাকে রেখে যা, একটু পর নিয়ে আসছি।
,,,রাত্রি খপ করে ইরার উড়না টেনে ধরলো, রেখে না যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত দিতেই ইরা ঠোট টিপে হেসে বললো — কেনো? ওকে দিয়ে কি কাজ? যাতো অরুন, মেয়েটা ভয় পাচ্ছে।
,,, অরুন ঠোঁট কামরে হেসে বললো– ওর ভয় কাটাতেই তো নিজের কাছে রাখতে চাচ্ছি। পাঁচ দিন ধরে কোন স্পেশালের কথা বলে যাচ্ছে জানতে হবেনা? আমার চিরো শত্রু কার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে তাকে দেখতে হবেনা? দেখার পর আবার তাকে সাইজ করতে হবেনা? যা না ইরা নয়তো তকেও দুটো চর দিবো।
,, রাত্রি ইরার পিছন থেকে ফিসফিস করে বললো — বোন না ভালো, যাসনা। এই পাপি আমাকে মেরেই ফেলবে।
,,,ইরা ফিসফিস করে বললো — ছেলেটাকে এতো জ্বালাস কেনো? জানিস তকে নিয়ে উইক,, তুই কেনো ওসব স্পেশাল টিসপেশাল বলে ওকে খোচাতে যাস?
,,, রাত্রি ব্যাঙ্গ করে বললো — তকে বলছে সে আমার প্রতি উইক? আন্তাজে।
,,, ওদের গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর দেখে অরুণ ভ্রু কুচকে বললো — সলাপরামর্শ করা ক্ষতম? এবার যা ইরাদ। নয়তো দেখিস, সত্যি সত্যি মার খাবি।
,,, ইরা ঠোট উল্টে রাত্রির হাত থেকে উড়নাটা ছাড়িয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালো, সাথে অরুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কঙ্গ্রাচুলেশন জানিয়ে নিজের মতো হেটে চলে গেলো।ইরাকে যেতে দেখে রাত্রি ও ওর পিছন পিছন যেতে নিবে তক্ষুনি ওর হাত টেনে ধরলো অরুন। রাত্রি হাত ছাড়াতে চেয়ে ত্যজি কন্ঠে বললো — ছাড় অরুন, আমি কিন্তু ডি এইচের কাছে বিচার দিবো।
,,,অরুণ ওকে টেনে ক্লাসের ভিতর নিয়ে দরজা আটকে দিয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাড় করিয়ে বললো — কি বিচার দিবি? তকে কি করেছি আমি? কিছুই করিনি। বলার মতো কিছু নেই,, কিন্তু এখন করবো। বিচার দেওয়ার মতো অনেক কারন বানিয়ে দিবো।
,,, কথাটা বলে একদম রাত্রির কাছে গিয়ে দাড়ালো,, একদম অনেকটা কাছে, তাদের মাঝে দু- তিন ইন্চি দূরত্ব। রাত্রি হাসফাস করে উঠে বললো — অরুন! দূরে যা নয়তো, নয়তো আমি কিন্তু ক্যারাটে জানি।
,,,অরুণ ভালো করেই জানে, এই ননির পুতুল ওসব কিছুই পারেনা। শুধু পারে তার সাথে রাগ করতে,, খোচা দিতে আর জ্বালাতে,, সাথে ঝগড়া করা যেনো রক্তে মিসে আছে। যদিও এসব ঝগড়া অরুনের ভালোই লাগে, খোচা দিলেই এরকম আটকে দিয়ে,,, ভেবেই বাকা হাসলো। পরপর ভয় পাওয়া ভঙ্গি করে বললো — ওপ্স!! ভয় পেলাম, মারিস না প্লিজ।
,, রাত্রি নাক মুখ কুচকে বললো –নাটক না করে সর অরুন,, তুই অত্যন্ত অভদ্র।
,,, অরুন একটু ঝুকে ফিসফিস করে বললো — তাহলে আরেকটু অভদ্রতা করি?
,,, আবেশে চোখ পিটপিট করে উঠলো রাত্রির, তবু কন্ঠ ঝাজালো করে বললো — অসভ্য একটা!! ছাড় বলছি, কিসব করে যাচ্ছে। ওফ্ফ!! ছাড়না।
,,, অরুন রাত্রির মুখের একদম কাছে মুখ নিয়ে গরম নিশ্বাস ফেলে বললো– দিবোনা, আগে বল কে তর সেই স্পেশাল পারশন? আমি একটু তার খোরমাটা দেখতে চাই।
,,, রাত্রি মুখ বাকিয়ে ভাব নিয়ে বললো– আছে, তকে কেনো বলবো? সরতো অরুন।
,,,বলেই অরুনের বুকে হালকা করে ধাক্কা দিতেই অরন সেই হাতটা আটকে দিলো, সজত্নে হাতটা টেনে নিয়ে তাতে ঠোট ছোয়ালো, কেপে উঠলো রাত্রি। আরও বার কয়েক ঠোট ছুইয়ে নিজের গলার ভাজে রেখে অন্য হাত দিয়ে রাত্রির অপর হাত কব্জা করে নিলো। হাতের আঙুলে আঙ্গুল গলিয়ে দিয়ে দেয়ালের সাথে সেট করে রাখলো,, পরপর ঝুকে গিয়ে রাত্রির কানের লতিতে চুমু খেলো। এবার নিজেকে সামলানো দায়, রাত্রি আবেসে চোখ বন্ধ করে অরুনের ধরে থাকা হাতটা শক্ত করে ধরলো। হাসলো অরুন, এই ভীতু হরিনির সকল লম্ফঝম্প ওর একটু ছোয়াতেই ই শান্ত হয়ে যায়। অনেকটা সময় নিরব থাকার পর রাত্রি ভাঙা কন্ঠে বললো– এসব কেমন ব্যাবহার অরুন? এসব কিন্তু ঠিক না।
,,, অরুন রাত্রির চুলে নাক ঠেকিয়ে আলতো চুমু খেয়ে বললো– আমার ব্যাবহার এমোনি,,বার বার তর সাথে এমন করবো। খুব কাছে আসবো আর ছুয়ে দিবো,, কিন্তু তুই বাধা দিতে পারবিনা কারন তুই বাধা দিলে আমি আরও বেশি করে আসবো। ইউ নো না? অরুন কতোটা জেদি?
,,, রাত্রি ভ্রু কুচকে রাগি কন্ঠে বললো — আমার কাছে কেনো আসতে হবে?পৃথিবীতে কি মেয়ের অভাব পরেছে? ওদের কাছে যা।
,,, এবার যেনো রাগ হলো অরুনের,, এসব কথা তার একদম পছন্দ না। সে কি সব মেয়েকে ভালোবাসে নাকি? যে ওদের কাছে যেতে যাবে? সে তো এই ঝগড়াটে মহিলার মাঝে মন হাড়িয়েছে,, তাই ওর কাছে আসে। রাগ সামলাতে না পেরে দাতে দাত চেপে বললো — তর কাছে এসেছি বলে এই কথাটা বললি তো? আমাকে তর ওসব বাজে ছেলেদের মতো মনে হয় তাইনা? ঠিক আছে, অপবাদ যখন দিয়েছিস, তখন মেনে নিলাম। আজকেই যাবো, তাও এখোনি।
,,, কথাটা বলে অরুন রাত্রির হাত ছেড়ে দূরে সরতে নিলে রাত্রি ওর শার্টের কলার চেপে ধরলো। রাগে নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, কন্ঠে ঝাজ মিশিয়ে বললো — এই কোথায় যাবি তুই? কার কাছে যাবি? বল!! কে আছে তর?
,,, অরুন কলার থেকে রাত্রির হাত ঝাড়া মেরে বললো — একটু আগেই তো বললি যেনো অন্য মেয়েদের কাছে যাই, তাহলে এখন আবার জানতে চাইচিস কেনো? উত্তর তো তর কাছেই আছে।
,,,রাত্রি ছলছল দৃষ্টিতে তাকালো, অরুন তার দিকেই তাকিয়ে,,, ওর ছলছল দৃষ্টি দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলো। রাত্রি ঠোঁট ভেঙে নাক টেনে ভাঙা কন্ঠে বললো — যা তবে, কার কাছে যাবি যা। আর কখনো আমার সামনে আসবিনা তুই, আমিও মাম্মাকে বলে এই ভার্সিটি থেকে টিসি নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো,, প্রয়োজনে মরে যাবো তবু,
,,,ফুসে উঠলো অরুন, রাত্রির হাতের কনুই চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে দাতে দাত চেপে বললো — তুই কি চাস আমি তকে আরও গভীর ভাবে ছুয়ে দেই? তর উদ্দেশ্য ভালো ঠেকছেনা রাত,, আমার আম্মুর ভদ্র সভ্য ছেলেটার চরিত্রে দাগ লাগানোর পায়তারা করছিস? আমার কিন্তু সমস্যা নেই, শত্রুর জন্য নাহয় একটা দুইটা বদনাম কামালাম। মানুষ তো শত্রুর জন্য কতোকিছুই করে, আমি নাহয় অস্তিত্বে কালি-মা লেপন করলাম। আই সয়্যার রাত!! আর কখনো এসব বললে অনেকটা কাছে চলে আসবো, অনেকটা মানে অনেকটা। কোনো বাধা, বিবেধ মানবোনা। কি হবে না হবে নিজেও জানিনা।
,,, রাত্রি অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো,, এগুলো কি ছিলো? হুমকি নাকি প্রপোজ? এভাবে কেউ হুমকি দেয়? এসব কথায় কে ভয় পায় ভাই? রাত্রির খুব হাসি পেলো। সে হাসি আটকে ভ্রু কুচকে বললো — তুই এমন কেনো অরুন? মানুষে মারার হুমকি দেয়, আরও বলে,, এসব বললে একদম খুন করে ফেলবো। আর তুই? কিসব আজেবাজে থ্রেট।
,,,ঠোঁট কামরে হাসলো অরুন, আরেকটু কাছে গিয়ে গালে গাল ঠেকিয়ে গভীর শ্বাস টেনে বললো — তুই তো আমি কাছে গেলেই খুন হয়ে যাস, সেদিক থেকে থ্রেট টা তো একি হলো তাইনা? আর কখনো এসব বললে, তকে একদম নিজের সাথে পিষে দম আটকিয়ে মেরে ফেলবো।
,,,অনুভূতির দোলাচলে ডুবে যাচ্ছে রাত্রি,, অরুন টা এমন কেনো? যা বলার একদম সরাসরি বলে দেয়। এসব কি মেনে নেওয়ার মতো? রাত্রির বুঝি অস্বস্তি হয়না? ভিতরটা তো অনুভুতির জোয়ারে উলট পালট হয়ে যায়। রাত্রি ঢোক গিলে বললো — কেউ চলে আসবে,, চলনা নিচে যাই। কেউ দেখলে কি ভাববে বলতো?
,,, অরুন ঠোঁট কামরে বলো — কি আর ভাববে? ভাববে দুজন শত্রু কাছাকাছি এসে পারসোনাল মিটিং করছে,, দেট্স ইট।
,,, রাত্রি অযথাই লজ্জায় নুইয়ে গেলো, অতিমাত্রায় ফর্সা গালটা গোলাপি গোলাপি ভাইব দিচ্ছে। রাত্রির চেহারায় কাটায় কাটায় সৌন্দর্য,, এই সৌন্দর্যের মোহে কত পুরুষ ফেসেছে তার ইয়ত্তা নেই। তবুও রাত্রি অরুনকে ভালোবাসে,, সারাদিন মুখে বলে কোরিয়ান ড্রামার নায়কদের মতো ছেলে পেলে বিয়ে করবে নয়তো না। অথচ মন প্রান দিয়ে বসে আছে এক তমাটে বর্নের ছেলেকে। একেই বোধয় মনের আন্দোলন বলে,, এটা হুট করেই কার জন্য আন্দোলিত হবে সেটা বোধহয় মনটা নিজেও জানেনা।
,,,, সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে নিতেই আদ্রিয়ানকে উপরে উঠতে দেখা গেলো। ইরা থমকে দাড়িয়ে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইলো। লোকটার চোখ মুখ বড্ড মলিন দেখাচ্ছে,, চোখের নিচে কালো দাগ পরে আছে, কে জানে কতোদিন ভালো মতো ঘুমায়না লোকটা। দুজন মুখোমুখি হতেই আদ্রিয়ান এক নজর ইরার দিকে তাকালো পরপর চোখ নামিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করলো– অর্পনা আজ আসেনি?
,, ইরা আদ্রিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো — এখোনো ওর খোজ খবর কেনো নেন আপনি? ও তো মেরিড। আই গেইজ অর্পনা ওর হাসবেন্ডকে ভালোবেসে ফেলেছে। আপনি মুভ অন করে নিজের মতো বাচার চেষ্টা করুন, নতুন করে জীবন শুরু করুন।
,,, আদ্রিয়ান মলিন হাসলো, সেই হাসিতে কত শত অসহায়ত্ব, দেখলেই ইরার বুক কাপে। ইরা এদিক ওদিক নজর সরিয়ে বললো — আপনাকে খুব বিদ্ধস্ত লাগছে,, আপনার সত্যি ই মুভ অন করা উচিৎ।
,,,, আদ্রিয়ান ঠোঁট চেপে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করে বললো — অর্পনা কি আজকেও হসপিটালে যাবে? সেজন্যই আসেনি? কয়টার দিকে যাবে কিছু বলেছে?
,,,ইরার রাগ হলো, যে উনার ভালোবাসার মুল্য দেয়না তার জন্য এক সাগর ভালোবাসা নিয়ে বসে আছে অথচ যে ওনার একটু খানি নজরের কাঙাল তাকে দেখারো প্রয়োজন মনে করছেনা। আসলেই, মানুষ মরিচিকার পিছনে ছুটতে বেশি পছন্দ করে,, যেমনটা সে নিজেও করছে। ইরা হালকা মেজাজ দেখিয়ে বললো — জেনে কি করবেন? আবারও হসপিটালের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন? কি দরকার এই এক ঝলক দেখার? ওকে দেখলে আপনার ক্ষত কমবে? নাহ, বরং আরও বাড়বে।
,,,ইরার মুখে এসব কথা শুনে ভ্রু কুচকালো আদ্রিয়ান, পরপর মুখে রাগ ফুটিয়ে বললো — এতো কথা বলছো কেনো মেয়ে? তোমাকে বোন মনে করি বলে তোমার কাছে জানতে চাই নয়তো আদ্রিয়ান কাইসার কারোর কাছে নিজের গুপ্ত অনুভূতি প্রকাশ করার মতে দূর্বল মানব নয়। বলতে না চাইলে এখন আসতে পারো, ওর খোজ নেওয়ার হাজারটা ওয়ে আছে আমার কাছে।
,,,কথাটা বলে আদ্রিয়ান সামনে হাটা ধরলো, ইরা তপ্ত শ্বাস ফেলে গলাটা হালকা উচিয়ে বললো — শুনেছি ২ টায় যাবে, এখন বোধয় রওনা দিয়ে দিয়েছে।
,,, আদ্রিয়ান থেমে গেলো, দ্রুত বেক করলো নিচের দিকে। এক প্রকার হন হন করে হেটে গেইটের দিকে চলে গেলো। আদ্রিয়ানের অবস্থা দেখে ইরার চোখ জোড়া ছল ছল করে উঠলো। নিজে ভিন্ন ধর্মি হওয়ার পরেও একজন মুসলিম ব্যাক্তির প্রতি ভালোবাসা অনুভব করার মতো পাপ সে করে ফেলেছে। আদ্রিয়ান যখন অর্পনার মাঝে ভালোবাসার প্রবাহ ছড়িয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় মেতে থাকতো আর অর্পনা বরাবর আদ্রিয়ানকে ইগনর করতো। তখন ওকে দেখলে খুব মায়া হতো ইরার। সেই মায়া থেকে ধীরে ধীরে ভালোবাসা তৈরি হওয়ার পর ইরা যখন সেই অনুভুতির আচ পেলো তখন নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হলো। সে যদি মুসলিম ঘরের সন্তান হতো তাহলে নাহয় কিছু একটা ভাবা যেতো,, ভালোবাসা টুকু প্রকাশ করা যেতো। কিন্তু তাতো হওয়ার নয়। একটা খ্রিস্টান ধর্মের মেয়ে হয়ে সে কিছুতেই নিজের অবেক্ত অনুভুতি টুকু ব্যাক্ত করতে পারবেনা। তাই খুব করে ইশ্বরের নিকট আবদার করেছিলো যেনো ভালোবাসার মানুষটা ভালো থাকে। অর্পনা যেনো আদ্রিয়ানকে মেনে নেয় কিন্তু সেটাও হলোনা। শেষ মুহুর্তে অর্পনা দ্বীপকে বিয়ে করে নিলো। সে তো খুব চেষ্টা করেছিলো, অর্পনাকে অনুরোধ করেছিলো যেনো দ্বীপকে বিয়ে না করে। কিন্তু অর্পনা তার কথা শুনলোনা বিয়েটা করেই নিলো,, এখন ভালোবাসার মানুষ টাকে এতোটা পুড়তে দেখে তার ভিতরটা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই পোড়া গন্ধ টুকু নিজ বুক পাজরেই আটকে রেখেছে ইরা,, মাঝে মধ্যেই দম বন্ধ হয়ো আসে। নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে। কিন্তু আফসোস!! কিছুই যে করার নেই। না সে আদ্রিয়ানের কষ্ট কমাতে পারবে,, আর না নিজের মনের যন্ত্রণা।
,,, মাঝে কেটেছে আরও দুইমাস,,,
,,, ইদানীং বসন্তের রাত গুলোকে খুব ভালো লাগে অর্পনার। আগে এরকম অনুভূতি কখনো আসেনি, হয়তো এসেছিলো কিন্তু সেগুলো অনুভুতির তিক্ততায় চাপা পরে গিয়েছে। এখন নতুন করে ভালো লাগা কাজ করে, মাঝে মাঝে দ্বীপের বারান্দায় থাকা ক্যাকটাস গাছটাকেও বড্ড মনোরোম ঠেকে তার কাছে। লোকে বলে কিশোর বয়সে নাকি ছেলে মেয়েরা প্রেমে পরলে চোখে সর্ষে ফুল দেখে,, তখন নাকি যাই দেখে তাতেই মুগ্ধতা খুজে পায়, করলা ভাজিতেও নাকি মিষ্টি মিষ্টি সাধ পাওয়া যায়। কিন্তু অর্পনা তো কিশোরী বয়স ছেড়ে রমনিতে পরিনত হয়েছে। এখন আর সেসব আবেগ টাবেগ মানায় নাকি তাকে? সে নাহয় তার তিন কবুল করা হাসবেন্ডের প্রেমে পরেছে তাতে কি? এর জন্য কাটা যুক্ত ক্যাকটাস টাকেও ভালো লাগতে হবে? নিজো মনের অবান্তর চিন্তাগুলোকে দূরে সরিয়ে বারান্দা থেকে বেড়িয়ে এলো অর্পনা। রুমে এসে এদিক ওদিক চোখ ভুলানোর পরেও দ্বীপকে খুজে পেলোনা। হালকা চিন্তিত হলো, লোকটা তো ঘুমে ছিলো তাহলে হঠাৎ করে কই গেলো? ভালো করে পরখ করতেই দেখলো ওয়াশরুমের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। অর্পনা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো, লোকটা তবে ওয়াশরুমে আছে। ভেবেই স্টাডি টেবিল থেকে দুটো বই নিয়ে সোফায় বসে পড়ায় মনোযোগ দিলো। সামনের মাসেই সেমিস্টার ফাইনাল। এই মুহুর্তে পড়ালোখায় মনোনিবেশ করা খুব জড়ুরি। মিনিট কয়েক বাধেই ওয়াসরুম থেকে বের হলো দ্বীপ, দরজা খোলার আওয়াজ হওয়ার পরেও চোখ তুলে তাকালোনা অর্পনা। দ্বীপের বোধহয় বিষয়টা পছন্দ হলোনা, তাই সে দরজাটা শব্দ করে লাগালো। অর্পনা বইয়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো,, লোকটা একটু বেশি ই জেদি। এখোনি এতো জেদ করে সুস্থ হলে না জানি কি করবেন। ভাবতেই ঠোঁটের হাসি টুকু মিলিয়ে গেলো,, দ্বীপের সুস্থ হওয়া মানে অর্পনার বিদায় নেওয়া। তখন তো চাইলেও এসব জেদ দেখতে পারবেনা। তপ্ত শ্বাস ফেলে আবারও বইয়ে মনোযোগ দিলো অর্পনা। দ্বীপ যেনো ইগনরটা মেনে নিতে পারলোনা। সে ধুপ ধাপ পায়ে এগিয়ে এসে অর্পনার কোল থেকে বইটা কেড়ে নিয়ে মোঝেতে ছুড়ে মারলো,, ভ্রু কুচকে তাকালো অর্পনা। হালকা রাগি স্বরে বললো — এটা কি হলো? বই কেউ মেঝেতে ছুড়ে মারে? বিদ্যাকে সম্মান করতে হয়, জানেন না?
,,,দ্বীপ অর্পনার দিকে ক্ষুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কয়েকপা এগিয়ে বইটা তুলে আবার ফিরে এসে অর্পনার হাতে ধরিয়ে দিলো। পরপর মুখ কালো করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো, হতাশ হলো অর্পনা। আজ তার পড়া লেখা চুলোয় গিয়েছে,, আর পড়তে হবেনা। এই মুহুর্তে ঐ লোকের কাছে না গেলে একটু পরে উঠে ভাঙচুর শুরু করে দিবে। অর্পনা তারাহুরো করে বই দুটো স্টাডি টেবিলে রেখে, গায়ের ব্লাক স্যুুট টা খুলে ঝুটি করা চুল গুলো ছেড়ে দিলো। সে আবার চুল বেধে ঘুমাতে পারেনা, দিনের বেলায় মাথাব্যাথা করে। রুমের লাইট অফ করে চোখের চিকন ফ্রেমের চসমাটা সাইড টেবিলে রেখে দ্বীপের পাশাপাশি বসে পরলো। দ্বীপ ওইপাশে ফিরে শুয়ে আছে, অর্পনা কম্ফোর্টারটা একটু তুলে ভিতরে ঢুকে পাশাপাশি শুয়ে পরলো। কিছু সময় পেরুনোর পরেও যখন দ্বীপের কোনো সাহারা পেলোনা বিরক্ত হলো অর্পনা। ইসস!! এভাবে ঘুম হয় নাকি? এই মুহুর্তে বনমানুষটা তার দিকে ফিরে, বুকের ভিতর লুকিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে না ধরলে কিছুতেই ঘুম হবেনা। অগত্যা কোনো উপায় না পেয়ে দ্বীপের হাত টেনে নিজের দিকে ফিরাতে চাইলো। আজো শক্তিতে পেরে উঠলো না মেয়েটা,, অর্পনা বুঝেনা এই লোক যখন রাগ করে তখন তার শক্তি এতো বেড়ে যায় কি করে? নরমাল সময়ে তো গেন্জি ধরে টান দিলেই ওর দিকে চলে আসে। অর্পনা ঠোট উল্টে কমফোর্টারের ভিতরেই উঠে বসলো, এক প্রকার ইদুরের ছানার মতো দ্বীপের পেট বেয়ে ওর সামনে গিয়ে পৌছালো। দ্বীপ তখনো বুকে হাত ভাজ করে অনর হয়ে শুয়ে আছে যেনো হাত সরালে মহাভারত অসুদ্ধ হয়ে যাবে। অর্পনা জোর খাটিয়ে দ্বীপের ভাজ করা হাতটা একটু উপরে তুলে ফাকা জায়গাটায় মাথা ঢুকিয়ে দিলো। দুহাতের ফাকে মাথা আটকে থাকায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়, অর্পনা জোরে জোরে শ্বাস টেনে আস্ফোট স্বরে বললো — আল্লাহ! মরে যাচ্ছি, হাতটা একটু ঢিলে করুন।
,,,, ওপাশ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলোনা, অর্পনা ছটফট করে নড়ে উঠতেই দ্বীপ হাতের ভাজ থেকে এক হাত সরিয়ে অর্পনার কোমর পেচিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে এক পা অর্পনার উপরে তুলে দিলো। এবার শান্তি লাগছে অর্পনার। গত চার মাস ধরে এভাবে ঘুমাতে ঘুমাতে এক প্রকার অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে সে। প্রথম প্রথম যখন এই দানব আকৃতির লোকটা তাকে সাপের মতো পেচিয়ে ধরতো তখন মনে হতো এখোনি দমটা বেড়িয়ে আত্মাটা আল্লাহ এর নিকট চলে যাবে। আর এখন,,এভাবে পেচিয়ে না ধরলে অস্বস্তি হয়, ফাকা ফাকা লাগে।
,,,,অর্পনা বারান্দা থেকে প্রস্থান নিয়েছে কম করে হলেও আধা ঘন্টা হবে। আদ্রিয়ান এখনো বারান্দার দিকে এক দৃষ্টিতে আছে,, চোখ দুটো অনর হয়ে অর্পনাকে আরও এক নজর দেখার প্রত্যাসা চালাচ্ছে কিন্তু সেই পাষান মানবীর আসার নাম নেই। আসার কথাও না, এতোক্ষণ তো দাড়িয়ে কফি খাচ্ছিলো, খাওয়া শেষ চলে গিয়েছে, আসার তো কথা নয়। তবুও মন মানলোনা আদ্রিয়ানের, সে চেয়েই রইলো। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে খেয়াল করলো হুট করেই রুমের লাইট অফ হয়ে গিয়েছে, খানিক বাধেই রুম জুড়ে ফুটে উঠলো হালকা স্বর্ণালী আভা। মলিন হাসলো আদ্রিয়ান, তার জানেম এখন অন্য কারোর বুকে গরম নিশ্বাস ফেলবে, আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরবে, হয়তো চুমু ও খাবে। আর ভাবতে পারলোনা আদ্রিয়ান, তার চোখ ফেটে জল গড়ালো, বুকের ভিতর কষ্টরা দামামা বাঝাচ্ছে। মন চাচ্ছে এই মুহুর্তে হৃদয়টাকে বক্ষ পিন্জর থেকে বের করে কেটে ফালা ফালা করে দিতে। কেনো এতো যন্ত্রণা হয় এখানে? আদ্রিয়ান চোখের পানি মুছে গাছের উপর থেকে ধপ করে নিচে নামলো। গাছটা বেশ উচু, এর মাঝামাঝি ঢাল থেকে সরাসরি দ্বীপের বারান্দাটা দেখা যায় তবে মির্জা বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় ওই বারান্দায় থাকা মানবিকে স্পষ্ট বুঝা যায়না। তবুও রোজ আসে আদ্রিয়ান,, আগে যেই মেয়েটাকে যখন তখন দেখতে পেতো এখন সেই মেয়েটাকে দেখতে তার কতোইনা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। হায়রে নিয়তি,,
,,,আদ্রিয়ান হাটতে হাটতে একবার মির্জা বাড়ির দিকে তাকালো,, চারপাশে কালো পোশাক ধারি গার্ডের ছড়াছড়ি। বাড়িটি দেখে নিজের উপর তাচ্ছিল্য হাসলো আদ্রিয়ান,, একটা সময় সামান্য ডিটেকটিভের মেয়ে বলে কাইসার বাড়ি থেকে অর্পনাকে অপমান করে, মারধর করে বের করে দেওয়া হয়ছিলো। অতচ সে আজ মির্জা বাড়ির বউ, লোক মুখে শুনা যায় দ্বীপ মির্জা সুস্থ থাকলে নাকি এতোদিনে মন্ত্রীত্ব গ্রহন করতেন। তাহলে অর্পনা হতো মিনিস্টারের ওয়াইফ। অর্থ কিংবা পাচুর্জের দিক দিয়ে কাইসার রা মির্জাদের টক্কর দিতে পারলেও ক্ষমতায় মির্জারা এগিয়ে। অর্পনা আদ্রিয়ানকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কাইসার রা রত্ন ডিসার্ভ করেনা। তারা শুধু কষ্ট পেতে জানে আর যন্ত্রণার অনলে পুড়ে ছারখার হতে পারে। আদ্রিয়ান আরেকবার তাকালো মির্জা বাড়ির দিকে, চোখ মুছে অস্ফুট স্বরে বললো —
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৮
,,, তুমি আর আমি পাশাপাশি থাকা দুটো রেল লাইনের মতো। তুৃমি চাও বা না চাও,, অনুমতি দাও বা না দাও,, আজীবন তোমার পাশে পাশেই থেকে যাবো। হয়তো ছুতে পারবোনা,,দূরত্ব মিটবেনা,, দেখতে তো পাবো?
