Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৮

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৮


৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৮
রুপান্জলি

মাঝে কেটেছে দুটো মাস,, দ্বীপের মানসিক অবস্থার অনেকটা উন্যতি হয়েছে। সে এখন অনেক গুলো বাক্য একসাথে করে কথা বলে,, অর্পনার সাথে বারান্দায় যায়,,একসাথে কফি খায়,, আগের মতো পাগলামি করেনা,, অর্পনার টুকটাক খেয়াল রাখে, যদিও এটা সে প্রথম দিন থেকেই করতো, আজো তাই করে যাচ্ছে। দ্বীপ এখন আর পারুকে খোজেনা, এখন সে তার ভেলোরাকে খোজে। দ্বীপ যখন তীব্র অস্বস্তিতিতে ভোগে,, আগের কিছু দৃশ্য মান্সপটে ভাসে কিংবা হেলোসুলেট করে তখন তার ঔষধ হয় ভেলোরা।

ভেলোরার গায়ের মিষ্টি ঘ্রাণ,,কোমল হাতের স্পর্শ,, মসলিন কামরের চেয়ে কোমল বধনের মিষ্টি ছোয়া,, ভেজা চুলের শীতল আভা,, ডাগর ডাগর চোখের আবেগি দৃষ্টি আর নিশ্বার্থ টান, এগুলোই বরাবর ঔষধ হিসেবে কাজ করে দ্বীপের। অর্পনার এই উদারতা আর ধৈর্য দেখে মির্জা বাড়ির সবাই এখন আর অবাক হয়না, এতোদিনে তারা এটুকু বুঝে গিয়েছে,, তাদের ছেলের বউটা সত্যি ই খুব ভালো। দ্বীপের বিষয়ে ডক্টরের সাথে পরামর্শ করার পর ডক্টর জানিয়েছেন এই মুহুর্তে দ্বীপের মন মানসিকতা কাউন্সিলিং এবং থ্যারাপি নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। এতে অর্পনা বেশ খুশি হয়েছে,, মন জুড়ে চলেছে প্রাপ্তির আনন্দ। লোকটা তবে সুস্থ হওয়ার পথে? ভালোই হলো,, অর্পনার সাথে আলোচনা করে বিহান একজন ভালো কাউন্সিলরের সাথে যোগাযোগ করেছে। এই ডক্টর টাও এভার কেয়ার হসপিটালেই কর্মরত আছেন। ডক্টরের এপোয়েনমেন্ট অনুযায়ী দ্বীপের কাউন্সিল মিটের সময় পরেছে সন্ধা ছয়টায় তাই আজো ভার্সিটিতে এসেছে অর্পনা। যদি সকালে কিংবা দুপুরে পরতো তাহলে সপ্তাহে একদিন ভার্সিটি কামাই করতো। ইদানীং অর্পনার কি যেনো হয়েছে,, সে দ্বীপকে ছাড়া কিছুই বুঝেনা। মন জুড়ে সারাক্ষণ দ্বীপের আন্দোলন চলতে থাকে,, মেয়েটা বোধয় ভালোবাসার মতো পাপ করেই ফেলেছে। অর্পনার ভাবনার ঘোর কাটলো ইরার প্রশ্নে,,

,,, অর্পন!! দ্বীপ ভাইয়ার শরীর এখন কেমন? ঠিক আছেন উনি? এখোনো পাগলামি করেন?
,,, অর্পনা ইরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো- আলহামদুলিল্লাহ!! উনি এখন অনেকটা স্টেবল। আজ থেকে কাউন্সিল শুরু, এরপর ধীরে ধীরে উনি সুস্থ হবেন ইনশাআল্লাহ!!
,,,অর্পনার মুখের শরল হাসি টুকু সবার নজর কাড়লো,, অরুন বললো — ইদানীং তকে খুব সুখী মনে হয় অর্পনা। আল্লাহ তর সুখ দীর্ঘস্থায়ি করুন।
,,, হুম!! আগে অর্পনার মুখে হাসি ফোটানো যেনো বিশ্ব জয় করার চেয়েও কঠিন ছিলো। আর এখন সে কথা বলার আগেই মুচকি হাসে। ( ইরা)

,,, অর্পনা ঠোট বাকিয়ে হেসে বললো– আরে উনাকে কমফোর্ট ফিল করাতে হাসতে হয়,, হাসি মুখে কথা না বললে উনি আবার আমার কথায় পাত্তা দেয়না। যেনো আমি কোনো বিনগ্রহের বাসিন্দা,, আমাকে খালি চোখে দেখা যায়না এমন একটা ভাব করে চলেন। আমিও বা কি করতে পারি? উনাকে তো কথা শুনাতেই হবে, তাই জোর করে হাসতে হয়। এখন উনার সাথে সবসময় হাসতে হাসতে তদের সাথেও,, এই আরকি।
,,,রাত্রি কোনা চোখে অরুনকে দেখে মুখটা বাংলার পাচ বানিয়ে বললো — দ্বীপ ভাই নিরব থেকেও তকে কেমন পাল্টে দিলো, বল!! অথচ এমন কিছু মানুষ আছে,, যারা পাল্টে দেওয়া তো দূর, খোটা দিয়েই কুল পায়না।
,,, অরুন ঠিক বুঝলো কথাটা ওকেই বলেছে। সে সহসাই রাত্রির দিকে তাকিয়ে রাগি কন্ঠে বললো — এই!! তুই কি আমার বউ? যে তকে পাল্টাতে যাবো। অর্পনা যেভাবে দ্বীপ ভাইয়ের সেবা করে তুই করিস? অর্পনা সারাক্ষণ দ্বীপ ভাইকে জড়িয়ে ধরে থাকে,, তুই থাকিস? ( বিরবির করে – একটু পায়ে পা দিলেই ছেত করে উঠে,, হাত ধরতে নিলে সরিয়ে নেয়,, কাধে নিশ্বাস ফেললে )

,,,আর বলতে পারলো না অরুন, রাত্রি দাত কটমট করে তাকালো ওর দিকে। ওকে এভাবে তাকাতে দেখে ঠোঁট কামরে ভ্রু নাচালো অরুন,, মানে এভাবে তাকানোর কি হলো? সে কি ভুল কিছু বলেছে নাকি? সত্যি ই তো, একটু টাচ করলেই ছ্যাত করে উঠে। ওদের তাকানোর মাঝেই পল্লব নাক ছিটকে বললো — ছিহ!! এসব কি অরুণ? রাত কেনো তকে জড়িয়ে ধরতে যাবে? ও কি তর বউ? আর ও যাই বলে তুই কেনো নিজের গায়ে মাখিস ভাই? খোটা তো ওকে আমিও দেই,, আমাকেও তো বলতে পারে? তাইনা রাত!!
,,, রাত্রি আরও দ্বীগুন হাড়ে নাক ছিটকিয়ে বললো — ওয়াক!! তর মতো আঠারো বেডির জামাইয়ের সাথে আমি? আল্লাহ !! এই নাশকতা হতে দূরে রাখুন। আমি তদের কাউকেই বলিনি,, আমি বলেছি আমার স্পেশালকে।
,,,রাত্রির এহেন কথায় তেতে উটলো অরুন,, সহসাই চেপে ধরলো রাত্রির হাতের কনুই। ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো রাত্রি। অরুন দাতে দাত চেপে বললো– স্পেশাল? কে তর স্পেশাল? রাত!! কার সাথে কি চলে তর? এজন্যই আমার কল ধরিস না? কি হলো উত্তর দে। ইরা, অর্পন!! ওকে মুখ খুলতে বল। নয়তো থাপরে গাল ফাটিয়ে দিবো। বলে দিলাম!!

,,, রাত্রি হাতের ব্যাথায় চোখ মুখ কুচকে বললো — তর কি? তুই কেনো এতো রিয়্যাক্ট করিস? হাত ছাড় অরুন,, কথায় কথায় মারা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে তর? সবসময় সহ্য করবোনা বলে দিলাম,, ছাড়!! ছাড়না, আল্লাহ!! কুতা বাছা ছাড়!!
,,, ঝারা মেরে হাতটা ছেড়ে দিলো অরুন,, পরপর কন্ঠ খাদে নামিয়ে দাতে দাত চেপে বললো — সাহস খুব বেড়েছে না? একা পাই খালি একবার!! তারপর বুঝাবো আমার রিয়্যাক্ট করার কারন কি? একদম হাড়ে হাড়ে টের পাওয়াবো।
,,,রাত্রি আমতা আমতা করে বললো- ক, কি করবি? একা পেলে কি করবি তুই?
,,, চল দেখাই, কি করতে পারি।
,,, তকে আমি খুব ভদ্র ভেবেছিলাম।
,,, অথচ আমি তর সাথে সবচেয়ে অভদ্র হতে চাই। ( ফিসফিস করে)
,,,ওদের কান্ড দেখে পল্লব পকেট থেকে ফোন বের করে কার নম্বরে যেনো ডায়ল করে কল ঢুকালো। কিছুক্ষন বাদে বললো — হেলো! রাসেল ভাই। ঢাবির কার্যন হলের সামনে একজন কাজী পাঠান তো,, তারাতাড়ি পঠাইয়েন।
,,, ইরা পল্লবের বাহুতে চাপর মেরে বললো — তুই এই সময় কাজী দিয়ে কি করবি ভাই? বিয়ে সাদি করবি নাকি? মেয়ে দেখবো?

,,, নাহ!! আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই অবিবাহিত জামাই বউকে এবার বিবাহিত বানিয়ে দিবো। ঝগড়া করার হলে নিজেদের বাড়িতে গিয়ে করবে,, ফ্রিতে আমাদের কান টা একটু নিস্তার পাবে। (পল্লব)
,,, ইরা ঠোট টিকে বললো — এই দুটোকে বাসর ঘরে বসিয়ে দিলেও ঝগড়া করবে। আর ওদের ঝগড়ার যা ধরন!! মানুষে ঝগড়া করে,, মারামারি করে টপকে থাকে আর ওরা ঝগড়া করতে করতে প্রেমালাপ করে। তদের সাথে পরিচয় না হলে এই বিনদন টা মিস করে যেতাম ভাই, সত্যি!!
,,,বাসর ঘরের কথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেলো রাত্রি। নিজেকে সামলে হালকা কটাক্ষ করে বললো– ওর সাথে প্রেমালাপ? আর আমি? মোটেও না। আমি প্রেমালাপ করলে আমার স্পেশালের করবো।
,,, অরুন ধমকে বললো — রাত!! মেজাজ খারাপ করিস না।
,,তর কি? ( মুখ বাকিয়ে)
,,, বুঝাবোনে, আমার কি। ( বাকা হেসে)
,,, সবার ঝগড়া জাটি দেখো অর্পনা হালকা রাগত স্বরে বললো — ভাই, থাম তরা। কি বাচ্চাদের মতো শুরু করে দিয়েছিস? যে যার ক্লাসে যা, আমিও এখন ফিরবো। লেইট করলে উনি আবার রাগ করে থাকবেন।
,,, অর্পনার স্বামি প্রিতি দেখে অবাক হলো সবাই, পল্লব হাত তালি দিয়ে বললো — বাহ বাহ!! অতিনিষ্ঠ পতি ভক্ত নারী। তকে দেখলে আমার বিয়ে সাদি করার আগ্রহ জাগেরে,, তর মতো একটা পতি ভক্ত নারী ঝুটলেই আমার জীবন ধন্য।
,, অর্পনা হাত উচিয়ে জামার কলার টেনে ভাব নিয়ে উঠে দাড়ালো,, ওর সাথে সবাই উঠে পরলো। অর্পনাকে তারা রিকশায় তুলে দিয়ে তারপর ক্লাস করতে যাবে। অর্পনার কথাগুলো শুনে অরুনের খুব ইচ্ছা করছে রাতকে বলতে যেনো অর্পনার থেকে স্বামির মন রক্ষার টিপ্স গুলো শিখে নেয়। কিন্তু বলতে গেলেই সবার সামনে ছ্যাত করে উঠবে এই মেয়ে,, বেয়াদব তো? নাছোরবান্দা একটা। এখন থাক, যত খুশি উড়ে বেরাক,, একবার একা পেলে একদব সব মাথার ভিতর সেট করে দিবে।

,,,সন্ধা নাগাত বের হলো চারজন,, উদ্দেশ্য এভার কেয়ার হসপিটাল। সামনের সিটে বসেছে বিহান আর মেধা।পিছনের সিটে দ্বীপ অর্পনা। রমনা থেকে বসুন্ধরা পোছাতে ঘন্টাখানিক লাগবে,, সাথে যদি জ্যামে আটকে যায় তাহলে সেটা অন্য হিসেব। সময়টা শীতের মাঝামাঝি হওয়ায় বিকাল বিকালি চারপাশ কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছে। সেই সাথে আজকের তাপমাত্রা ও বড্ড কম, অগত্যা সকলেই শীতের জামা দিয়ে নিজেদের মুড়িয়ে রেখেছ। অর্পনা একবার কোনা চোখে দ্বীপকে দেখলো সে সবসময়কার মতো অর্পনার দিকেই তাকিয়ে। সামনে বিহান মেধা থাকায় চুপচাপ বসে আছে, বিহানকে দ্বীপ এখন আর ভয় পায়না তবে কথাও বলেনা। মেধার ব্যাপারটা আলাদা কারন মেধা নিজেই দ্বীপকে ভয় পায়। দ্বীপের পড়নে গ্রে কালারের লেদার স্যুট, গ্রে পেন্ট আর স্যুটের ভিতরে থাকা শার্ট টা হোয়াইট কালার। অর্পনা যখন দ্বীপকে রেডি করিয়েছিলো তখন মন ভরে দেখার পরেও কেনো যেনো তার তৃষ্ণা মিটছেনা। ঘুরে ফিরে নজর বার বার দ্বীপের মাঝেই আটকাচ্ছে। গাড়ি স্টার্ট হতেই শাই শাই করে বাতাস ছুটে এলো ভিতরে,, তীব্র শীতে কেপে উঠলো অর্পনা তার গায়ে শুধু সামান্য কাশ্মেরি শাল। অগত্যা ভিতর থেকে ঝানালাটা অফ করে দিলো,, গাড়িটি হাই রোডে পৌছাতেই দ্বীপ অর্পনার হাত খামচে ধরলো। আজ দুই মাস পর বাহিরে এসে বড়ো বড়ো যানবাহন দেখে দ্বীপ আবারও ভয় পাচ্ছে,, বিষয়টা বুঝতে পেরে অর্পনা রোড সাইডে চলা যানবাহন সম্পর্কে অনেক কথা বললো যেনো দ্বীপের ভয়টা কমে যায় কিন্তু এতে তেমন কোনো লাভ হলোনা। দ্বীপ এখনো ভয় পাচ্ছে,, কোনো উপায় না পেয়ে অর্পনা হাত বাড়িয়ে কাছে আসতে বললো,, দ্বীপের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটলো,, সে এক লহমায় ঢুকে গেলো অর্পনার শালের ভিতর। অনেকটা সময় বাহিরে থাকায় দ্বীপের হাত বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে,, সেই ঠান্ডা হাত অর্পনার পেট গলিয়ে পিঠে রাখলো দ্বীপ,, এমনিতেই বরফের মতো ঠান্ডা হাত তার উপর দ্বীপের এহেন স্পর্শ, থর থর করে কেপে উঠলো অর্পনা। শক্ত পোক্ত ঢোক গিলে দ্বীপের স্যুট চেপে ধরলো। দ্বীপ অবুজের মতো মুখ করে তাকিয়ে আছে,, যেনো কিছুই বুঝেনা,, একটা নাদান বাচ্চা তিনি,, অর্পনার কিযে অস্বস্তি লাগছে,, অস্বস্তি কাটাতে দ্বীপের হাতটা সরাতে চাইলে বাধা দিয়ে দ্বীপ আরও শক্ত করে ধরলো। অবুজের মতো মুখ করে বললো — এমন করো কেনো? ঠান্ডা লাগছে।

,,, অর্পনা অসহায় ভঙ্গিতে দ্বীপের দিকে তাকালো,, বলি দেওয়ার জন্য দ্বীপ সবসময় ওর মাথাটাই কেনো বেচে নেয়? আল্লাহ মালুম!! অর্পনার অস্বস্তিকে আরও কয়েক দাপ উপরে তোলার জন্য ওর গলায় মুখ গুজে দিলো দ্বীপ। কেপে উঠলো অর্পনা, চোখের সামনে নিজের অঘোষিত সর্বনাশ টের পেয়ে দ্বীপের মাথাটা সরাতে চাইলে দ্বীপ ওম ওম শব্দ করে বললো — মুখ ও ঠান্ডা।
,,,অর্পনা হালকা মেজাজ দেখিয়ে বললো — আমি কি গ্যাসের চুলা নাকি ওভেন,, যে নিজের মুখ হাত গরম করতে আমাকে ব্যাবহার করবেন?
,,, দ্বীপ অর্পনার গলায় গাল ঘষে বললো — ওহুম!! তুমি ভেলোরা,, আমার ভেলোরা।
,,আর কি বলবে অর্পনা কিছু বলার মতো ভাষা রাখে নাকি এই লোক? সবসময় উল্টা পাল্টা কাজ করে বাচ্চা সেজে বসে থাকেন। আর যত ঝড় ঝাপ্টা পেরুনোর সেটা একমাত্র অর্পনাকেই পেরুতে হয়। অর্পনা বিরবির করে বললো — জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক আছে,, বদমাশ লোক একটা। আর জীবনে যদি বিয়ে করেছি তাহলে আমার নাম সকিনা।

,,, দ্বীপ আবারও তার খরখরা গাল খানা অর্পনার ঘাড়ে ঘষে বললো– না তুমি সকিনা না,, তুমি ভেলোরা।
,,, বার বার কেপে উঠছে অর্পনা, দম আটকে আসছে। সে দম ফেলে হালকা বিরক্তি স্বরে বললো — আপনার মাথা।
,, দ্বীপ আবারও একি কাজ করে বললো– মাথা না, তুমি ভেলোরা।
,,, হয়েছে হয়েছে থামেন এবার। আমি ভেলোরাই, ( মনে মনে) আপনার ভেলোরা।
,,, অর্পনা আর দ্বীপের খুনসুটি দেখে হাসছে মেধা,,বিহান ফ্রন্ট মিররে তাকিয়ে দেখছে সেই হাসি,, কখনো কখনো সরাসরি দেখছে। একসময় মেধার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো। তাদের বিয়ের আজ চার বছর পেরুতে যাচ্ছে অথচ এখনো কেউ কারোর কাছাকাছি আসেনি। মেয়েটি সর্বক্ষণ নিজেকে বিহানের থেকে আড়াল করে রাখতে চায়। বিহান ও কখনো জোর করেনি। সে চায়না মেধা কষ্ট পাক। কাছে আসা আসি একটা অপশনাল বেপার,, হলে হলো না হলেও সমস্যা নেই,, ভালোবাসার মানুষটা ঠিক থাকুক,, কাছে থাকুক,, খুব সুখে সুখ ভাগ করে নিক আবার খুব দুঃখে কাদার জন্য নিজের কাধটা বাড়িয়ে দিক। ভালোবাসা খুব সুন্দর,, যদি সেটা সুন্দর নজরে দেখা যায়। মেধা বিহানের স্যুটের কলার ধরে ওর দিকে তাকালো,, বিহান কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো — তুমি খুব সুন্দর মেধা রানী!! একদম আমার মনের মতো।
,,,মেধা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো — কিন্তু আমার মুখের এক পাশ তো ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পরে আছে।
,,, বিহান মুচকি হেসে মেধার গালে ঠোট ছুইয়ো বললো — ওটা জাস্ট দাগ, দাগ তো চাঁদের গায়েও আছে সোনা। দাগ আছে বলে কি চাঁদের সৌন্দর্য বিলিন হয়ে গিয়েছে? হয়নি,, তুমি আমার সেই চাঁদ মেধা। তোমার মুখের এক পাশ কেনো? পুরো শরীর ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেলেও তুমি আমার অনন্যা, আমার রুপসী।

,,, ৪৮ মিনিটের কাউন্সিলিং শেষে দ্বীপকে নিয়ে ডক্টরের রুম থেকে বেড়িয়ে এলো অর্পনা। ওয়েটিং রুমে আরও অনেক রুগিরা ওয়েট করছে হয়তো। তথ্য মন্ত্রীর পরিবার বলে দারুন ফ্যাসিলেটিস পেয়েছে তারা। চাইলে ডক্টরকে বাড়িতে ডেকে পাঠিয়ে কাউন্সিলিং এর ব্যাপারটা কবার করা যেতো কিন্তু অর্পনা তা চায়নি। দ্বীপের এবার বাহিরে বেরুনো উচিৎ,, খোলা পরিবেশে নিজেকে মেলে ধরা উচিৎ,, লোকজনের ভিরে যেদিন নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে সেদিনি সম্পূর্ণ সুস্থ একটা জীবন উপভোগ করতে পারবে। অর্পনা দ্বীপকে নিয়ে ডক্টরের চ্যাম্বারের সামনের করিডরে চলে গেলো,, সেদিকটা ওদের জন্য খালি করে দেওয়া হয়েছে। আপাতত ওরা যতক্ষণ এখানে থাকবে বাহির থেকে কোনো লোক আসবেনা। ওদেরকে যেতে দেখে মেধা ওদের পিছন পিছন যেতে নিলে ওর হাত টেনে ধরলো বিহান। ওর কান্ডে চোখ উচিয়ে তাকালো মেধা, তার চোখে প্রশ্ন বিত্তমান। বিহান নরম স্বরে বললো —
,,, চলো আমার সাথে।
,,, কোথায় যাবো?
,,,ডক্টরের চেম্বারে!!
,,, কিন্তু কেনো? আমি কেনো যাবো?
,,, বিহান বুঝানোর মতো করে বললো — মেধা!! তোমার জন্য ও এপোয়েনমেন্ট নেওয়া হয়েছে,, আমরা একটু ডক্টরের সাথে কথা বলবো, জাস্ট ইট।

,,, বিহানের কথায় তেতে উঠলো মেধা, অবিশ্বাস্য কন্ঠে বললো– হোয়াট? আমার জন্য এপোয়েনমেন্ট নিয়েছেন মানে? আমি, আমি কি পাগল? আমাকে পাগল মনে হয় আপনার? বিহান!! আপনি আমাকে পাগলের ডাক্তার দেখাতে এনেছেন? আমার মুখ ছিন্ন ভিন্ন হতে পারে, আমার মগজ নয়। ছাড়ুন আমার হাত,আমি বাড়ি যাবো।
,,,কথাটা বলে হাত মুচরাতে লাগলো মেধা, বিহান ওর হাত টেনে ওকে বুকে জড়িয়ে নিলো। এক হাতে শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে রেখে অন্য হাতে মাথার ঘোমটা ফেলে মাক্সটা খুলে দিলো। মেধা রাগে ফুসছে, বিহান এক হাতে ওর ছিন্ন ভিন্ন মুখ খানা আগলে নিয়ে বললো — এটা পাগলের ডক্টর নয় জান, এখানে সবাই আসতে পারে। যারা চিন্তাগ্রস্ত, মানসিক ভাবে হতাশায় ভোগে, নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে সবাই আসতে পারে। তুমি শুধু আমার সাথে যাবে, ডক্টর যা যা জিজ্ঞেস করে তার সবটা উত্তর দিবে তারপর ডক্টর তোমার সাথে কিছু কথা বলবে। দেট্স ইট!! জান আমার, বায়না করিস না। তর বিহান তর খারাপ চাইবে বল? সোনারে, একটু ট্রাস্ট কর আমায়।
,, শুনলোনা মেধা, কাদতে কাদতে বিহানকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দৌড়ে গেলো অর্পনার কাছে। কিছুটা দূরেই দ্বীপ অর্পন দাড়িয়ে ছিলো। মেধা দৌড়ে গিয়ে অর্পনাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো, হঠাৎ এমন হওয়ায় ফিরে তাকালো অর্পনা। মেধাকে এরকম বিদ্ধস্ত দেখে ওকে টেনে সামনে আনলো অর্পনা, চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বললো — কি হয়েছে মেধাপু? এভাবে কান্নাকাটি করার করন কি? বিহান ভাই কিছু বলেছে?
,,,মেধা ঢোক গিলে ফোপাঁতে ফোপাঁতে বললো — তো,তোমার ভাই আমাকে পাগল ভাবছে অর্পনা। আমি কি পাগল? আমি কেনো পাগলের ডাক্তার দেখাবো? বলো!! এটা কেমন আবদার উনার? আমি এসব কেনো মানবো? বলো।

,,, অর্পনা মুচকি হেসে বললো — বোকা মেধা রানী!! তোমায় কে বলেছে এটা পাগলের ডাক্তার? এখা,
,,,,অর্পনাকে বলতে দিলোনা বেধা, গাল থেকে হাত সরিয়ে বললো — জানি, শুনেছি ওসব। তোমার ভাই বলেছে আমাকে,, আমাকে বাহানা দিচ্ছো তোমরা? আসলে তোমরা আমাকে পাগল ভাবো। ভাইয়া অবুজ, তাকে তুমি যা খুশি বুঝাতে পারো, আমায় পারবেনা। আমি ওসব মানবোনা অর্পনা। আমি এখোনি বাড়ি যাবো,, তোমাদের বিশ্বাস করে এখানে আসাটা আমার সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিলো।
,,, কথাটা বলেই পিছাতে চাইলো মেধা, অর্পনা ওর বাহু শক্ত করে চেপে ধরে সামনে এনে দাড় করালো। নিয়মিত ক্যারাটে, জগিং করার ফলে অর্পনা শরীরের প্রতিটি হাড় সতেজ এবং শক্তিধর। তাই ওর শক্তির সাথে পেরে উঠলো না মেধা, জলজল চোখে অর্পনার দিকে তাকিয়ে ফোপাঁতে লাগলো। অর্পণা আবারও ওর চোখ মুছে দিয়ে দাগ পরা গালটায় হাত ভুলিয়ে বললো — এটুকু,, শুধু এটুকু দাগ তোমায় দমিয়ে রাখছে মেধাপু। আজ ছয়টা বছর পেরোতে যাচ্ছে, একটাবার বাহিরের নরম হাওয়া গায়ে মেখেছো তুমি? বিহান ভাইয়ের সাথে কোথায় ঘুড়তে গিয়েছো? ভালোবাসাময় সময় কাটিয়েছো? তোমার কি সুস্থ স্বাভাবিক জীবন কাটাতে মন চায়না? বিহান ভাইয়ের সাথে সংসার সাজাতেও ইচ্ছা করেনা? মেয়েদের নাকি মা হওয়ার খুব শখ থাকে? যদিও আমার নেই,, সেসব নিয়ে ভাবা হয়নি কোনোদিন। তুমিও কি ভাবোনি? সন্তান সন্ততি চাওনা? পারু থেমে গিয়েছিলো বলে তুমিও থেমে যাবে? এতে পারু শান্তি পাবে? পাওয়া সম্ভব? কেনো অবুঝের মতো আচরন করছো? বিহান ভাইয়ের ভালোবাসার খাতিরে নিজেকে ভালোবাসতে শিখো মেধাপু।

,,,মেধা সমানে ফোপাচ্ছে,, কিছু বলতে চাচ্ছে তবে পারছেনা। কান্নারা গলায় দলা পাকিয়ে রেখেছে। অর্পনা মেধার মাথায় হাত ভুলিয়ে পিঠে হালকা চাপর মারতেই শব্দ করে কেদে দিলো মেধা। নিজেকে সামলাতে অর্পনার হাত খাপচে ধরলো , ব্যাথা পেলো অর্পনা তবে সেসবে পাত্তা দিলোনা। সে তো মির্জা বাড়ির সুখ সাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে দিতেই এসেছে তাহলে এটুকু আঘাত সহ্য করতে পারবেনা কেনো? একটা পরিবার ঠিক করা চারটে খানি কথা নয়। টানা পাচ- সাত মিনিট কাদার পর মেধা ভাঙা স্বরে বললো — আ,আমি ও,ওখানে গেলে কি ঠিক হয়ে যাবো? আ,আম,আমার চেহারা ঠিক হয়ে যাবে? কোনো সার্জারী ছাড়া সব ঠিক হবে অর্পনা?

,,, অর্পনা ফের মুচকি হেসে শকৃত কন্ঠে বললো — নাহ!! তোমার চেহারা ঠিক হবেনা তবে তুমি ঠিক হবে। তোমার মনের ভয়, ভিতি, হিনমন্নতা সব কেটে যাবে আপু। লক্ষি আগারওয়্যালের কথা শুনেছো? আচ্ছা!! উনাকে না চিনো,,, “চাপ্পাক” মুভি তো দেখেছো তাইনা? ঐ মুভিটা উনাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে। লক্ষি আগারওয়্যালকে ১৫ বছর বয়সে এসিড ছোড়া হয়,, ঝলসে যায় উনার মুখ। কত্ত কটাক্ষ, বাজে পরিস্থিতির মুখে পরেছের তার ধারনা আমি তুমি কেউ করতে পারবোনা। একমাত্র ভুক্তভোগী ই জানেন সেসব। তার পরেও লক্ষি আগারওয়্যাল থেমে থাকেনি মেধাপু। তিনি মনের জোড়ে সেই আদ পোড়া মুখ নিয়েই এডিডের বিরুদ্ধে লড়েছেন। আইনের নতুন প্রথা তৈরি করার জন্য লড়াই করেছেন। যেখানে ঐ ঝলসে যাওয়া মুখ নিয়ে তিনি এতোটা লড়াই করতে পেরেছেন সেখানে তুমি একপাশের কাটা দাগ গুলো নিয়ে ছয়টা বছর ধরে পিছিয়ে আছো। তোমাকে তোমার চেহারা নয় নিজের মনকে পরিবর্তন করতে হবে,, নিজেকে ভালোবাসতে হবে,, কনফিডেন্ট হতে হবে। সামান্য রুপ বিনষ্ট হওয়া মেয়েদের দমাতে পারবেনা আপু। বি স্ট্রং, বি সিরিয়াস!! রুপ সৌন্দর্য লাইফের মেইন মিনিং হতে পারেনা। এটুকু জাস্ট অপশনাল। সৌন্দর্য যদি সুখ এনে দিতো তাহলে প্রিন্সেস ডায়না পতি হীনা হতো না। নিজেকে নিয়ে ভাবো আপু, সুন্দর জীবনের কথা ভাবো।
,,, অর্পনার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলো মেধা, আবারও ঝাপটে ধরলো অর্পনাকে। কাদলো অনেকটা সময়,, তার কি নিজেকে ভালোবাসা উচিৎ? অর্পনার কথাগুলো শুনা উচিৎ? দোলাচলে ভোগছে মেয়েটা। বিহান এগিয়ে এসে অর্পনার থেকে মেধাকে টেনে নিলো,,বুকের মাঝখানটায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো — আয় না সোনা,, আমার জন্য অন্তত একটু কষ্ট কর।

,,, মেধা মাথা ঝাকালো মানে সে যাবে। বিদ্ধস্ত মেধাকে কোলে তুলে নিলো বিহান। এটুকু তার তরফ থেকে মেধাকে দেওয়া ভরসা,, যেই ভরসা টুকুন প্রতিটা মেয়ে তার হাসবেন্ডের কাছে আশা করে। বিহান মেধাকে নিয়ে চলে যেতেই অর্পনা তৃপ্ত হাসলো। আজ এখানে পাপ্পা উপস্থিত থাকলে অবাক হতোনা? হতোই তো। তার অগোছালো, ছন্নছাড়া, বেপোরোয়া, অভদ্র মেয়েটাও কাউকে গোছিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। অর্পনা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো,, দ্বীপ তার থেকে পাঁচ হাত দূরে গিয়ে মুখ ঘোমরা করে দাড়িয়ে আছে। সহসা অর্পনার ভ্রু কুচকে এলো। সে দ্বীপের কাছে এগিয়ে গিয়ে হাত ছুতে নিলে দ্বীপ সেটা ঝারা মেরে ফেলে দিলো। ঠোঁট উল্টালো অর্পনা, এই লোকের আবার কি হলো? আবারও হাত ধরতে নিলে একি কাজ করলো দ্বীপ। অর্পনা এগিয়ে গিয়ে দ্বীপকে পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাহুর ফাক দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দ্বীপের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো —

,,, হেললো,, হাসবেন্ড!! কাহিনি কি? মুখটা এরকম রাগু রাগু টাইপ করে রাখা কেনো? ভেলোরা কি কোনো অপরাধ করেছে? বলে ফেলুন, আপনার বেলায় ভেলোরা খুব একটা বুঝদার নয়।
,,,দ্বীপ উত্তর করলোনা। আগের মতো অনর হয়ে দাড়িয়ে রইলো। অর্পনা আদুরে স্বরে বললো — ঐ, বলেন না। খালি এমন করে, না বললে বুঝবো কি করে?
,,,দ্বীপ অভিমানি স্বরে বললো — ও তোমায় জড়িয়ে ধরলো কেনো? তুমি ওকে আদর করলে কেনো? সরো, লাগবেনা তোমায়।
,,,অর্পনা ঠোঁট টিপে হাসলো,, নিজের বোনকে নিয়ে জোলাস হচ্ছে এই লোক? অর্পনা নিজেও অভিমান করার চেষ্টা করে বললো — ওকে, লাগবেনা যখন। তাহলে থেকে আর কাজ কি? যাই তাহলে আমি? দ্বীপ মির্জা একা থাকুক, টাটা!!

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৭

,,,বলে অর্পনা দ্বীপের বাহু থেকে মাথা ছাড়াতে নিবে। দ্বীপ শক্ত করে চেপে ধরলো, টেনে সামনে এনে বাচ্চা বাচ্চা মুখ করে বললো — তাহলে ওর থেকে বেশি আদর করে দাও।
,,অর্পনা মুচকি হাসলো,, ঝাপটে ধরলো দ্বীপের প্রসস্থ বুক। বুকের বাম পাশে দুটো চুমু ও খেলো তবে দ্বীপকে বুঝতে দিলোনা। ঐটুকু নিরবে নিবৃত্তে ছিলো, যার শাক্ষি আল্লাহ ব্যাতিত কেউ নয়।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৯