Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৭

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৭

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৭
রুপান্জলি

,খ্রিস্ট ধর্মের অতিবো সম্মানীত বংসের মেয়ে রুমজাহিন ইরাদ,,তাকে পারিবারিক ভাবে জাহিন নামে ডাকলেও সবার কাছে সে ইরা নামেই পরিচিত। ইরার পারিবারিক মর্যাদা অত্তন্ত প্রখর,, ইরার পর-দাদা ছিলেন জিসু-খ্রিস্টের পরম ভক্ত,, অন্যান্য খ্রিস্টানদের থেকে ইরাদের পরিবার একটু বেশি ই ধর্মকে মান্য করে চলে। সেই সাথে ন্যায় নীতির দিক দিয়েও ইরাদের পরিবার সিলেট শহরে বেশ নাম করা। ইরা ভার্সিটি পড়ার খাতিরে ঢাকা থাকলেও বাবা মায়ের দেওয়া শিক্ষার বাহিরে আজো পর্যন্ত কখনো পা বাড়ায়নি। তবে আজ বোধয় সেই শিক্ষার বাহিরে পা বাড়াতে বাধ্য হলো ইরা। রমনা শহরের শেষ প্রান্তে একটা নাম করা বার আছে,, বারটির নাম ” রেড মুন TG”। সেই বারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইরা।

ভিতরে যেতে তার খুব অস্বস্তি ফিল হচ্ছে,, তবুও তাকে যেতেই হবে,, না গেলে হয়তো ঐ লোকটা ওসব খেতে খেতে মরেই যাবে। ইরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেলো। এলকোহলের তীব্র ঘ্রানে মাথা ঘুরে উঠলো ইরার। চারদিকে ছেলে মেয়েরা নাচানাচি করছে আর নে*শা দ্রব্য পান করছে। ইরা সবাইকে এড়িয়ে বারের প্রথম দিকে গিয়ে পৌছালো। এদিক ওদিক নজর বুলাতেই এক কোনায় বিদ্ধস্ত আদ্রিয়ানকে দেখলো। তার সামনে দুটো খালি ওয়াইনের বোতল, আরও একটা রানিং চলছে। ইরা আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে গেলো,, অন্যদিকে যুবক ছেলে মেয়েদের ছড়াছড়ি থাকলেও এদিকটায় তেমন কেউ নেই। ইরা আদ্রিয়ানের সামনে গিয়ে ওর হাত থেকে ওয়াইনের গ্লাসটা কেড়ে নিলো। হুট করে এমন হওয়ায় আদ্রিয়ান চকিতে সামনে তাকালো,, আবছা আবছা দৃষ্টিতে সামনে কোনো মেয়েকে দেখতে পেয়ে ধমকে বললো — হেই!! হাউ ডেয়ার ইউ ব্লাডি বিচ! গিব মাই ওয়াইন।

,,,ইরা সেসবে পাত্তা দিলোনা,, ওয়াইনের গ্লাসটা টেবিলে রেখে আদ্রিয়ানের হাত টেনে ধরলো। কোনো মেয়ে তার হাত ধরেছে বিষয়টা মাথায় আসতেই হাত ছাড়াতে চাইলো আদি বাট ওর নে*শা টা একটু বেশি ই চড়ে গিয়েছে। যার ফলে বার বার ডলে পরে যেতে নিচ্ছে কিন্তু নিজের শক্ত পোক্ত সন্জোমের জন্য কোনো মেয়ের কাধে ঢলে পরার মতো ভুল সে করতে চাচ্ছেনা। আদ্রিয়ান নিজেকে সামলাতে না পেরে চেচিয়ে বললো — হু আর ইউ? লিভ মাই হেন্ড,, প্লিজ। আই লাভ অর্পন,, অনলি ওয়ান্ট টু টাচ হার,, ডন্ট এনি ওয়ান এল্স। ওয়েটার,, ওয়েটার!!
,,, আদ্রিয়ানের ডাক শুনে একজন ওয়েটার এগিয়ে এসে কিছু বলতে নিলে ইরা রাগান্বিত কন্ঠে বললো — হি ইস মাই হাসবেন্ড, প্লিজ লিভ!!
,,,ওয়েটারটি সরে গেলো, ইরা আদ্রিয়ানের একহাত নিজের কাধে রেখে অন্য হাতে আদ্রিয়ানের কোমর জড়িয়ে ধরলো। ইরার খুব অস্বস্তি হচ্ছে,, ওয়েটারকে যতই বলুক আদ্রিয়ান তার হাসবেন্ড। সত্যি বলতে আদ্রিয়ান তো তার কেউ হয়না,, হওয়ার কথাও না। যেখানে দুজনার ধর্ম আলাদা তার উপর আদির মন প্রান জুড়ে অর্পনার বসবাস সেখানে এসব অলিক চিন্তা ভাবনা করা বোকামি।

,,,রোড সাইডের উচু জায়গা বসে আছে ইরা আর তার কাধে মাথা রেখে অগনিত বার, সরি জানেম,, সরি জানেম!! শব্দটা আওড়িয়ে যাচ্ছে আদ্রিয়ান। ইরা হাত ঘরিতে সময় দেখলো রাত ১ টা ২২। এই সময় সে কোনোদিন হোস্টেলের বাহিরে থাকেনি অথচ আজ রাস্তার ধারে বসে আছে তাও একটা ছেলের সাথে। আদ্রিয়ানের মুখে বার বার সরি শব্দটা শুনে ইরার কৌতুহল হলো, সে কন্ঠটা একটু নিচু করে বললো —
,,, অর্পনা তো আপনাকে ঠকিয়েছে তাহলে আপনি কেনো বার বার ওকে সরি বলছেন? সরি বলার হলে ও আপনাকে বলবে,, আপনি নয়।
,,, নে*শায় বুধ আদ্রিয়ান মলিন হেসে বললো — আমি কষ্ট দিয়েছি তো,, ওর ভালোবাসার মুল্য দেইনি। সময় থাকতে ওকে বুঝতে চাইনি তাই সেও আমায় বুঝেনি।
,,,আদ্রিয়ানের কথায় অবাক হলো ইরা,, অর্পনা আদ্রিয়ানকে ভালোবাসতো? কই, তারা তো তিন বছর ধরে অর্পনার সাৎে আছে কখনো তো এমন কোনোকিছু আচ করতে পারেনি? ইরা দ্বিধান্বিত কন্ঠে সুধালো — অর্পন আপনাকে ভালোবাসতো? সিরিয়াসলি?

,,, আদ্রিয়ানের সেই ভালো ব্যাবহারকে প্লাস পয়েন্ট মনে করে অর্পনা ঠিক করলো আদ্রিয়ানকে তার ভালোবাসার কথা জানাবে। কিন্তু ব্যাচারি বুঝতেই পারছিলো না কিভাবে কি করতে হয়। নানির বাড়িতে এতো এতো কাজিন থাকা সত্ত্বেও কেউ তার সাথে ভালো করে কথা বলে না। কারোর কাছে যে এই বিষয়ে সাহায্য চাইবে তারো কোনো ওয়ে নেই,, অগত্যা কোনো উপায় না পেয়ে কাইসার বাড়ির ছাদের এক প্রান্তে পাঁচ টা মোমবাতি জ্বালিয়ে আর কয়েকটা বেলুন এব্রো থেব্রো ভাবে রেখে সাজানোর চেষ্টা করলো। সাথে নিজেকেও সাজানোর চেষ্টা করেছে। এর আগে অর্পনা কখনো সাজেনি,, মেয়েদের ড্রেস কিংবা ফ্যাশন নিয়ে তেমন কোনো ধারনা ছিলোনা। তাই টিশার্ট আর ট্রাউজার পরেই রেডি হয়ে নিলো, সাথে ঠোটে গাড়ো লিপস্টিক,, কানে একটু বড়ো আকারের দুল,, হাতে চুরি পড়লো,,অথচ মেয়েটা জানেই না যে টিশার্ট- ট্রাউজারের সাথে এসব চুরি, বড়ো কানের দুল স্যুট করেনা। জানবে কি করে? সে তো কখনোই এসব পরেনি আবার কাউকে পরতেও দেখেনি,, ছোট বেলায় মা হীনা বাবার কাছে মানুষ হয়েছে। মাম্মা কাছে থাকলে হয়তো অর্পনা এমন হতো না, সেও মেয়েদের মতো সাজতো, নিজেকে সাজাতে পারতো, মেইলি আচার আচরন জানতো,, কিন্তু সবার ভাগ্য তো ভালো হয়না। অর্পনার তো মা নামক মানুষ টা থেকেও নেই। অগত্যা সে নিজেকে ওরকম অগোছালো ভাবেই সাজিয়ে আদ্রিয়ানের জন্য ছাদে অপেক্ষা করতে লাগলো। তখন সময়টা রাত ১২ টার কাছাকাছি। অর্পনা আদ্রিয়ানকে টেক্স্ট পাঠায় যেনো ইমিডিয়েটলি ছাদে আসে। কিন্তু আদ্রিয়ান এসেছিলো তারো মিনিট তিরিশ পরে। আদ্রিয়ান ছাদে এসে অর্পনাকে খুজতে লাগলো,, কারন কাইসার বাড়িটা বিশাল আকারের, যার ফলে তার ছাদটাও বড়ো,, আধুনিক ডিজাইনের ফলে এক পাশে থেকে অন্য পাশ দেখার সিস্টেম নেই। অর্পনা যেহেতু ছাদের উত্তর পাশের এক কোনায় অপেক্ষা করছিলো সেহেতু ওকে খুজে বের করতে আদ্রিয়ানের একটু সময় লেগেছিলো। কিন্তু যখন অর্পনাকে এরুপ জায়গায় এরুপ সাজে দেখলো সহসাই ভ্রু কুচকে নিলো আদ্রিয়ান । আদ্রিয়ানের অবাকতাকে আর গভীর করে দিতে অর্পনা সহসা মাটিতে হাটু গেড়ে বসে আবেগের সহিত বললো —

,,, আমি আপনাকে ভালোবাসি আদি ভাই, আপনাকে যখন প্রথম দেখেছিলাম তখন আমার মন আমাকে সিগন্যাল দিয়েছিলো “ইউ ফল ইন লাভ ” আমিও আমার মনের কথা শুনেছি। আই লাভ ইউ আদি ভাই।
,,, আদ্রিয়ান অনেকটা সময় ভ্রু কুচকে অর্পনাকে দেখেছিলো,, পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে এক পর্যায়ে শব্দ করে হেসে দিলো। আদ্রিয়ানের এরুপ হাসির মানে বুঝতে পারলোনা অর্পনা তবে তার মুখের সেই লাজুক হাসিটা মিলিয়ে গেলো। অর্পনা বোকা বোকা চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে,,আদ্রিয়ান অর্পনার পাশাপাশি বসে কপালে হালকা করে ঠোয়া মেরে আবারও হাসিতে ফেটে পরে বললো —
,,,এসব কি পরেছো তুমি? এভাবে কেউ সাজে ? সাজগোজের মিনিং জানোনা? জানোনা যখন সাজতে গেলে কেনো? আর কি যেনো বলেছিলে,, আমাকে ভালোবাসো? ওটা কি ছিলো অর্পনা? আমি তোমাকে কখনোই ওসব নজরে দেখিনি,, আর দেখা সম্ভব ও না।

,,,অর্পনার মুখটা সহসা মলিন হয়ে গেলো,, আদি ভাই তাহলে তাকে পছন্দ করেনা? অর্পনা ভাবনা কাটিয়ে নরম স্বরে বললো — আগে দেখেননি তো কি হয়েছে?, এখন থেকে দেখবেন। আমি আপনাকে সত্যি ই ভালোবাসি আদি ভাই,, যখন আপনাদের বাড়িতে প্রথম এসেছিলাম সেদিন থেকেই ভালোবাসি। অনেক অনেক বছর ধরে ভালোবাসি।
,,, অর্পনার কথা শুনে দ্রুত গতিতে উঠে দাড়ালো আদ্রিয়ান,, অন্যদিকে মুখ করে বললো — নো!! তেমাকে নিয়ে ওসব ভাবতে যাবো কেনো? তুমি ফুপাতো বোন হিসেবে ঠিক আছো কিন্ত বউ হিসেবে তোমার মতো মেয়েদের আমার পছন্দ না অর্পনা।

,,,অর্পনা উঠে দাড়িয়ে আদ্রিয়ানের মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করলো — তাহলে? কেমন মেয়ে পছন্দ আপনার?
,,,অদ্রিয়ান ছাদের রেলিঙের দিকে হেটে গিয়ে রেলিং ধরে বললো — অবশ্যই সুসিল, নম্র – ভদ্র, যে খুব সুন্দর হবে,, যার মুখ জুড়ে মায়া থাকবে,, কন্ঠে থাকবে স্নিগ্ধতা সাথে মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট তার কোমর সমান লম্বা চুল থাকতে হবে। সে অবশ্যই মেয়েদের মতো শাড়ি কিংবা সালোয়ার স্যুট পরবে।যাকে দেখলেই অন্তর থেকে বউ বউ একটা ফিল আসবে এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করবো আমি।
,,, কিশোরি অর্পনা দ্রুত এগিয়ে গেলো আদ্রিয়ানের নিকট,, সেও রেলিং ধরে উৎসাহি কন্ঠে বললো —- আদি ভাই!! আপনি তো জানেন ইনা, আমার চুল খুব বড়ো হয়ে যায়,, একদম হাটু ছাড়িয়ে যায়,, কিন্তু আমি সামলাতে পারিনা বলে পাপ্পা ছোট করে কেটে দেয়। আমি এরপর থেকে আর চুল কাটবোনা। শাড়ি কিভাবে পরতে হয় আমি তো জানিনা আবার সালোয়ার স্যুট ও কখনো পরিনি। আপনি আমাকে বিয়ের পর শিখিয়ে দিয়েন আমি আপনার সব কথা শুনবো। প্রমিস!!

,,, অর্পনার উৎসাহিত কন্ঠের বিপরিতে শুনা গেলো আদ্রিয়ানের তিক্ত কিছু কথা — সেটা তোমার ইচ্ছা!! তুমি চাইলেই নিজেকে পরিবর্তন করতে পারো। কারন তোমার আচার আচরণ অত্যন্ত অভদ্র, অসভ্য আর বেপোরোয়া। তোমার মাঝে আমি কোনো সিষ্ঠাচার দেখিনা অর্পনা। ফুপাতো বোন হিসেবে এটুকু এপ্রিসিয়েট করতে পারি কিন্তু ভালোবাসা অন্য বিষয়। তোমার সাথে আমার যায়না।
,,, অর্পনা বেশ ভালো করে বুঝতে পারছে আদ্রিয়ান তাকে প্রতিনিয়ত অপমান করে যাচ্ছে ,, কিন্তু সে সেসব গায়ে মাখলোনা। আবেগে বসি ভুত হয়ে বললো– পসিবল আদি ভাই,, আমি নিজেকে পরিবর্তন করে নিবো। নিজের মাঝে সকল পরিমান সিষ্ঠাচার আনার চেষ্ঠা করবো। আপনি শুধু আমাকে ফিরিয়ে দিয়েন না। প্লিজ আদি ভাই, প্লিজ!!
,,,আদ্রিয়ান তার বিপরীতে কিছুই বলোনি শুধু হনহন করে ছাদ থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিলো। অর্পনা জানে আদ্রিয়ান তাকে রিজেক্ট করেছে তবুও সে সেটা মনকে বিশ্বাস করাতে নারাজ। সে মনকে জোর যবরদস্তি করে বুঝালো,, আদ্রিয়ান তাকে সুযোগ দিয়েছে, তাকে ভদ্র পোষাক পরে আদ্রিয়ানের মনের মতো হতে হবে। অগত্যা সব অপমান লাঞ্চনা দূরে সরিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করার কাজে লেগে পরলো। ইউটিউব ঘেটে ঘেটে মেয়েরা কিভাবে সাজগোজ করে,, কি কি প্রোডাক্ট ইউজ করে,, কিসের সাথে কি পরতে হয় সব শিখে নিলো। পরদিন মার্কেটে গিয়ে শাড়ী, চুরিদার, গাউন,, বিভিন্ন মেকআপ প্রোডাক্ট সব কিনে আনলো। সন্ধা হতেই অর্পনা শাড়ী নিয়ে পড়ার ট্রাই করলো কিন্তু পেরে উঠলো না। টানা দুই ঘন্টা ট্রাই করার পরেও যখন সম্ভব হলোনা তখন ব্লাউজ এর উপর টিশার্ট পরে ছুটে গেলো মায়ের রুমে। সুষ্মিতা কাইসার তখন তার নতুন সংসারে জন্ম নেওয়া ছেলে মেয়েদের পড়াতে ব্যাস্ত। কতো সুন্দর করে আদর করে পড়াচ্ছেন ওদেরকে,, মাঝে মাঝে শাসন ও করছেন অথচ এরকম একটা দিন অর্পনারো হওয়ার কথা ছিলো। অর্পনা মন খারাপ বাদ দিয়ে মায়ের সামনে দাড়িয়ে আবদার ভরা কন্ঠে বললো —

,,, মাম্মা!! তুমি কি বিজি? আমাকে একটু শাড়িটা পড়িয়ে দাওনা।
,,,সুস্মিতা কাইসার চোখ মুখ কুচকে অর্পনাকে একবার দেখে নিয়ে বললেন– তুমি হঠাৎ শাড়ী পরবে কেনো? এসব তোমার দ্বারা হবেনা। যাও ঘরে গিয়ে বসে থাকো। আগামিকাল আমি শ্বশুর বাড়ি চলে যাবো,, তারপর আর এখানে পরে থেকোনা। জানোই তো, মা ছাড়া নানির বাড়ির কোনো মূল্য থাকেনা।
,,,মায়ের শ্বশুর বাড়ি, ইসস!! কথাখানা বড্ড লাগলো কিশোরীর মনে। অর্পনার চোখ ছাপিয়ে পানি গড়ালো,, খুব ভালো করেই বুঝতে পারে মাম্মা তার প্রতি বিরক্ত। মন খারাপ নিয়ে রুমের দিকে এগিয়ে গেলো অর্পনা। আরও দুই ঘন্টা চেষ্টা করার পর মোটামুটি আকারে শাড়ীটা পরে নিলো। ইউটিউব দেখে দেখে মেকআপ করে নিজেকে পরিপাটি করে নিলো। আজ সে ভদ্র মেয়ে সেজেছে,, আদ্রিয়ান ভাই আর তাকে অভদ্র বলতে পারবেনা। ভেবেই খুশি মনে আদ্রিয়ানের ঘরে গেলো। ঘরে যেতেই একটা অযাচিত মুহুর্তের শাক্ষি হয় অর্পনা,, আদ্রিয়ান মাত্রই শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়েছে তার পরনে টাওয়াল ব্যাতিত কিছুই নেই। কিশোরী অর্পনা,, মন ভূলা হয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সুষ্ঠব যুবকের পানে। এরকম টাইমে অর্পনাকে দেখে আদ্রিয়ানের মাথায় রাগ চড়ে গেলো,, সে দ্রুত পোষাক নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে মিনিট খানিকের মাঝেই বের হয়ে একদম অর্পনার সামনে এসে দাড়িয়ে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো

,,, তুমি এইসময় এখানে কি করছো? রাত কয়টা বাজে ধারনা আছে তোমার?
,,,অর্পনা চোখ উচিয়ে দেওয়ালে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো — ১০ টা ২৫ বাজে। আপনি রাগ করেছেন আদি ভাই? আসলে শাড়ি পড়তে গিয়ে এতোটা লেইট হয়ে গিয়েছে।
,,, অদ্রিয়ান মুখ বিকৃত করে একবার অর্পনাকে দেখলো পরপর বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো — তোমাকে শাড়ী পরতে কে বলেছে? আর পরেছোই যখন তখন আমার রুমে কি করছো?
,,, অর্পনা শাড়ীর আচল টেনে হাতের চুড়ি ঠিক করতে করতে বললো — আপনাকে বলেছিলাম না, আপনার মনের মতো হবো? এজন্যই তো শাড়ি পরে আপনার রুমে এসেছি,, আমাকে কেমন লাগছে আদি ভাই?
,, আদ্রিয়ান বেডের উপর বসে মুখে তিক্ততা ঢেলে বললো — কাক ময়ুর সাজার চেষ্টা করলেই ময়ুর হতে পারেনা অর্পনা। তোমাকে খুব একটা ভালো দেখাচ্ছেনা,, শাড়ীও এলোমেলো হয়ে আছে, যাও রুমে যাও।

,, অর্পনা শুনলোনা সেসব,, সে এগিয়ে গেলো আদ্রিয়ানের দিকে কিন্তু আদ্রিয়ানের কাছাকাছি পোছাতেই বিপত্তি বাধলো। হুট করেই শাড়ির সাথে পা হরকে আদ্রিয়ানের বুকের উপর পরে যায় অর্পনা। এই ঘটনা টুকু যেনো আদ্রিয়ানের মাথায় আগুন ধরিয়ে দিলো,, সে এক মুহুর্ত ও অপেক্ষা না করে অর্পনার মাথায় ধাক্কা মেরে ওকে এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিলো। ছিমছাম গড়নের অর্পনা, তখন তার উজন আনুমানিক ৩৫-৩৬ এর মতো হবে। হঠাৎ এরকম ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পরলো,, যার ফলে কপালে, ঘাড়ে, হাতের কনুইতে অনেকটা চোট পেয়েছে। আদ্রিয়ান এতেই থেমে থাকেনি, সে অর্পনাকে এক ঝটকায় মেঝে থেকে তুলে হাত ধরে টানতে টানতে রুমের বাহিরে নিয়ে এলো,, শিরি দিয়ে নামতে নামতে সুস্মিতা কাইসারের উদ্দেশ্য চেচাতে চেচাতে বললো — ফুপি, ফুপি!! কাম হেয়ার। মম, পাপ্পা,, গ্রেনি!! গ্রেন্ডপা!! হোয়্যার আর অল অফ ইউ? কাম হেয়ার।
,,, আদ্রিয়ানের ডাকে সবাই ঘর থেকে বেড়িয়ে লিভিং রুমে জড়ো হলে,, আদ্রিয়ান আবারও ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো অর্পনাকে। লজ্জা, অপমান,শরীরের ব্যাথায় ফুপিয়ে উঠলো অর্পনা। আদ্রিয়ান আবারও সুস্মিতা কাইসারকে ডাকতেই তিনি সামনে এসে দাড়ালেন। আদ্রিয়ান অর্পনার দিকে ঘৃনিত দৃষ্টি ফেলে বললো — তোমার মেয়ে আমার ঘরে নো*রামি করতে গিয়েছে। এতোই যখন হাসবেন্ডের প্রয়োজন তখন বিয়ে দিয়ে দাও। আমাকে কেনো রাত বিরেতে এসব উদভট সাজ দেখিয়ে বিরক্ত করতে যায়? পৃথিবীতে মেয়ের অভাব পরেছে? যে তোমার এই অশালীন মেয়েকে ভালোবাসতে হবে আমায়?

,,,আদ্রিয়ানের কথা শুনে অবাক চোখে তাকালো অর্পনা,, সে উনার ঘরে নো*রামি করতে গিয়েছিলো? অর্পনা তো আদ্রিয়ানকে ভালোবাসে, তার ভালোবাসায় তো কোনো পাপ নেই। আদি ভাই তার ভালোবাসাকে এভাবে অপমান করছেন? অর্পনার ভাবনার মাঝেই ওর গালে পরপর চারটা চর পরলো। তীব্র গাল ব্যাথায় শব্দ করে কাদলো অর্পনা,, ঝাপসা চোখে আদ্রিয়ানের মাকে দেখতে পেলো। বিদেশিনী এখনো রাগে ফুসছেন, নিশ্চই আরো মারতে চাচ্ছেন। অর্পনার মাথা ঘুরে উঠলো, যার ফলে সে মাথা ঘুরে আদ্রিয়ানের পায়ের কাছে গিয়ে পরলো। চোখ উচিয়ে সুষ্ঠব মানবের পা দুখানা দেখে অর্পন সেটা চেপে ধরলো,,আদ্রিয়ানের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বললো– আদি ভাই!! আমি আপনাকে ভালোবাসি,, এতে কোনো মিথ্যা নেই,, আমার ভালোবাসায় কোনো পাপ নেই আদি ভাই। আমি আপনার সাথে অসৎ কাজ করতে যাইনি বিশ্বাস করুন। আপনি ওদেরকে বলুন , আমি আপনার সাথে অসৎ কিছু করিনি, বলুন না আদি ভাই!! সবাই আমাকে খারাপ ভাবছে।
,,, অর্পনার কথার প্রতিত্তোর করলোনা আদ্রিয়ান, সে অর্পনার হাতের বাধন থেকে পা সরাতে চাইছে। অর্পনা আরও শক্ত করলো আদির পা, ফোপাঁতে ফোপাঁতে বললো — আমি আপনাকে ভালোবাসি আদি ভাই,, খুব ভালোবাসি। আমার মনটা ভেঙে দিবেন না,, প্লিজ, আদি ভাই!! প্লিজ!!

,,, আদ্রিয়ানের রাগ তখোনো আকাশচুম্বী, সে বিরক্তিতে কপাল কুচকে এক প্রকার জোরেই অর্পনার হাতের ভাজ থেকে পা ছাড়িয়ে নিলো। কিন্তু অর্পনার পাতলা গরন সেই ধাক্কাটা সহ্য করতে পারেনি,, ছিটকে পরে মেঝেতে। পা ছাড়িয়ে হন হন করে উপরে চলে যায় আদ্রিয়ান। থমকে যায় অর্পনা,, জলজল চোখে আদ্রিয়ানের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আদ্রিয়ান তাকে লাত্থি মারলো? অর্পনা কি এতোটাই নিকৃষ্ট? এতোটা? একটুখানি ভালোবাসা চাওয়ার বিনিময়ে তাকে এভাবে অপমানিত হতে হলো? কি দরকার এই ভালোবাসার? ভালোবাসা ভালো না। অর্পনার অবাকতার মাঝেই শুনতে পেলো কাইসার বাড়ির প্রতিটা সদস্যের অপমান জনক কথা বার্তা। কেউ কেউ তো ওকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও করেছে। কিশোরীর মনে ঘন আধার নামলো,, সেই আধার আরও গভীর হলো যখন দেখলো তার নিজের মা তাকে এতোটা লাঞ্চিত হতে দেখেও চুপ চাপ দাড়িয়ে আছে। অর্পনার অবাকতার মাঝেই ওর চুল টেনে ধরলো কেউ। চোখ উচিয়ে দেখলো এটা তার মায়ের বোন,,সম্পর্কে খালামনি হয় না? লোকে বলে,, মায়ের পর খালারা নাকি সবচেয়ে আপন হয়। যেখানে মা ই আপন নয় সেখানে খালা, মামা, নানা, নানি তারা তো,, আর বলার নয়। অর্পনা তখোনো কাদছে, কাদতে কাদতে মায়ের দিকে তাকাচ্ছে,, মাম্মার কি একটু ও মায়া হচ্ছেনা তার জন্য? যতই নতুন সংসার, ছেলে মেয়ে হোকনা কেনো? অর্পনা তো তারি সন্তান। নিজের সন্তানের জন্য একটুখানি মায়া দেখানো কি পাপ? অর্পনার মনটা অভিমানে ছেয়ে গেলো। অর্পনার তাকিয়ে থাকা দেখে সুস্মিতা কাইসারের মায়া হলো কিনা জানা নেই, তবে তিনি এগিয়ো এলেন। বোনের হাত থেকে অর্পনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে টেনে সদর দরজার বাহিরে নিয়ে গিয়ে বললেন —

,,,তুমি আর কখনো আমার কাছে আসবেনা। তোমার আর আমার সম্পর্ক এই পর্যন্তই,, বাহিরে গিয়ে তোমার পাপ্পাকে কল দিয়ে বলবে যেনো এসে নিয়ে যায়। ভালো থেকো।
,,,কথাটা বলেই অর্পনার হাত ছেড়ে ভিতরের দিকে চলে গেলেন। বিদ্ধস্ত অর্পনা চেয়ে চেয়ে দেখলো মাকে। মনে মনে তাচ্ছিল্য হাসলো। মাম্মার যদি তার উপর মায়া থাকতো তাহলে কোনোদিন তাদের সুখের সংসার ছেড়ে চলে আসতে পারতোনা। আসার আগে অন্তত ছোট্ট অর্পনার কথা ভাবতো। অর্পনা সেদিন বেড়িয়ে এসেছিলো,, হাটতে হাটতে হাতের চুড়ি, কানের দুল, গলার ছোট্ট পেন্ডেট ছুড়ে মেরেছিলো রাস্তায়। কাদতে কাদতে মুছে দিয়েছিলো সকল সাজ সজ্যা। সেদিন বৃষ্টি হয়েছিলো,, খুব খুব বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়েছিলো এক কিশোরির ভালোবাসা, ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস। হাড়িয়ে গিয়েছিলো তার আবেগ, অনুভুতি। সেদিন বৃষ্টির পানির সাথে বয়ে গিয়েছিলো কিশোরীর চোখোর পানি। এরপর আর কাদেনি মেয়েটা, শত কষ্টেও চোখ বেয়ে জল গড়ায়না তার। অর্পনার এই অবনতির জন্য দায়ি আমি,, এই আদ্রিয়ান কাইসার। সেদিন যদি আমি ওকে একটু বুঝতাম, সম্মান করতাম তাহলে আমাদের জীবনটা খুব সুন্দর হতো। প্রতিটা মানুষের জীবনে ট্রাজেডি থাকে কিন্তু আমার আর অর্পনার জীবনে সবচেয়ে বড়ো ট্রাজেডি কি জানো? আমরা দুজনেই কাদলাম,, অর্পনা যখন কাদলো আমি তাকিয়ে দেখলাম না। আজ আমি যখন কাদছি তখন অর্পনা দেখলোনা। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসলাম তবে আলাদা আলাদা সময়ে। অর্পনা যখন আমায় ভালোবাসলো তখন আমি বুঝিনি আমাকে কতোটা ভালোবাসা হয়েছিলো,, আজ অর্পনা বুঝতে চাইছেনা তাকে ঠিক কতোটা ভালোবাসা হচ্ছে।
জীবন!! আহা,জীবন!!

,,,বলতে বলতে ফুপিয়ে উঠলো আদ্রিয়ান,, ওর চোখের পানিতে ইরার কাধের জামাটা ভিজে গিয়েছে। কাদছে ইরাও, ভালোবাসায় এতো যন্ত্রণা কেনো? মানুষের জীবনে কেনো ট্রাজেডি থাকতে হয়? কেনো থাকে? এইতো তার জীবনেও আছে,, একটা অলিখিত, অঘোষিত ট্রাজেডি। যার তল কেউ জানেনা,, কেউনা।
ইরার ভাবনার মাঝেই শুনা গেলো আদ্রিয়ানের আফসোস ভরা কন্ঠ– হলোনা!! আমার জানেম আমার হলোনা। তার সংসার হলো ঠিকি, তবে আমাদের হলোনা। আমায় ক্ষমা করলে খুব পাপ হতো জান? এই পৃথিবীর নিয়ম বদলে যেতো?কেনো ভালো বাসলেনা পাখি? কেনো বুঝলেনা আমায়?
,,, তবু সাধের পাখি, দিলো উড়াল
,,,,এতো কিছুর পর,,
,কারে করলো জানি আপন,,
আমায়,, কইরা দিয়া পর,,
,,কি তুমি চাওরে পাখি,,
কি আর তুমি চাও?
ভাঙলা হৃদয়,,ভাঙলা সবই
আর কি দিতে চাও?,,,

,,,অতিতের তিক্ত সৃতি গুলো ভাবতে ভাবতে চোখ থেকে দুফোটা পানি গড়ালো অর্পনার। আগে সে কতো বোকা ছিলো,, বাচ্চাদের মতো কি ন্যাকামি গুলোই না করেছিলো,, আর সেসবের সুযোগ নিয়ে কতো মানুষ তাকে অপমান করেছিলো। কতোকিছু সহ্য করতে হয়েছে তাকে। অর্পনা যখন নিজের ব্যাথিত হৃদয় নিয়ে চিন্তিত, তখনি কানে এলো দ্বীপের গম্ভীর স্বরের ডাক,,,
,,,ভেলোরা!!!
,,, দ্বীপের ডাক শুনে কেপে উঠলো অর্পনা। এই সময় তো লোকটা গভীর ঘুমে থাকে, তাহলে আজ কি হলো? কোনো অসুবিধা হচ্ছেনাতো? ভেবেই দ্বীপের দিকে হালকা ঝুকে পরখ করে নিলো,, নাহ!! জাগেনি তবে ঘুমের মধ্যেই বার বার ভেলোরা ভেলোরা বলে ডাকছে। অর্পনার মনটা শীতলতায় ছেয়ে গেলো। কিছুদিন আগেও দ্বীপ ঘুমের মাঝে পারু পারু করতো কিন্তু আজ, দ্বীপ ওর নাম নিচ্ছে,, ভেলোরা বলে ডাকছে। অর্পনা মনের আনন্দটুকু প্রকাশ করতে দ্বীপের প্রশস্ত বুকে মাথা রাখলো,, কাধের কাছের টিশার্ট টা অল্প করে আকরে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে আবদার ভরা কন্ঠে বললো —

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৬

,,, আমি যদি কখনো মরে যাই আমার কবরটা পারুর পাশে দিবেন। যতবার আপনি পারুর সাথে সাক্ষাৎ করতে যাবেন,, যেনো আমিও আপনার সাক্ষাৎ পাই।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৮