Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৫

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৫

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৫
রুপান্জলি

, রাত ৮ টা বেজে ৩ মিনিট,,,
,,, পুরো রুম পরিষ্কার করে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বেডের উপর বসলো অর্পনা,, তার পা ব্যাথা করছে। করাটা স্বাভাবিক,, এতোক্ষণ মনের জোরে চললেও এখন যেনো পেরে উঠছে না। তার একটা ফোনের খুব প্রয়োজন, নিজের ফোনটা তো বাড়িতেই রেখে এলো। কিছুক্ষণ আগে মেধা তার ফোনটা দিয়ে গিয়েছিলো। অর্পনা ফোনটা হাতে নিলো। ডায়াল ফাংশনে গিয়ে রাত্রির নাম্বার ডায়াল করে কল ঢুকাতেই নম্বর বিজি দেখালো। অর্পনা সময় নষ্ট না করে আবার ইরার নম্বরে ডায়াল করলো,, সাথে সাথে রিসিভ করলো ইরা। ইরা যেহেতু খ্রিষ্ট ধর্মের তাই সালাম দেওয়া নেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে সোজা সাপ্টা বললো,, যেনো আগামীকাল একটু সময় করে রাত্রিকে নিয়ে কিছু ড্রেস, একটা ফোন আর প্রয়োজনীয় প্রোডাক্ট কিনে মির্জা বাড়িতে দিয়ে যায়। গিটারটা নাহয় সে পরে কিনে নিবে,, আপাতত যা প্রয়োজন তা পেলেই চলবে। ইরার সাথে কথা বলা শেষ করে ফোনটা আবারও পাশে রেখে দিলো অর্পনা। দ্বীপ এতোক্ষণ বিছানায় বসে শান্ত দৃষ্টিতে অর্পনাকেই দেখছিলো। অর্পনা কাছে এসে বসতেই আবারও ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। দ্বীপকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অর্পনা মুচকি হেসে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো —

,,,কি হয়েছে? এভাবে তাকিয়ে থাকা কেনো? আপনার তো লাক ভালো মিষ্টার মির্জা। যেই আমি ২২ বছরের জীবনে এক কাপ কফি বানিয়ে পর্যন্ত খাইনি,, সেই আমি এখন আপনার ঘর গুছিয়ে দিচ্ছি। আমি মনে হয় ইদানীং খুব ভালো হয়ে যাচ্ছি, তাইনা?
,,,দ্বীপ কিছু বললো না,, কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে একটু একটু করে অর্পনার দিকে এগিয়ে গেলো। অর্পনা মুগ্ধ দৃষ্টিতে দ্বীপকে দেখছে,, আসার পর ফ্রেস করিয়ে একটা ব্লাক স্যুট পরিয়ে দিয়েছিলো। বর্তমানে মহাশয়কে পুরো বিটিএস ব্যান্ডের ভি এর মতো লাগছে। অর্পনার আবার ভি কে খুব পছন্দ। মাঝে সাজেই বিটিএস ম্যাম্বারদের পারফরমেন্স দেখা হতো,, তখন ঐ সাতজনের মাঝে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করতো ভি এর ইনোসেন্ট ফেইসটা। বর্তমানে দ্বীপের মাঝেও তেমন একটা ইনোসেন্ট ইনোসেন্ট ভাইব দিচ্ছে। দ্বীপকে এগিয়ে আসতে দেখে ভ্রু কুচকালো অর্পনা,, দ্বীপ এগিয়ে এসে একদম অর্পনার কাছাকাছি বসে আবারও ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। দ্বীপের হাবভাব দেখে কিছু একটা বুঝলো বোধয় অর্পনা,, সে সহসাই দু হাত ফাক করে দ্বীপকে ইশারা করলো। সাথে সাথে ওকে ঝাপ্টে ধরলো দ্বীপ । এতোক্ষণ অর্পনাকে বকাবকি করতে দেখে বড্ড নার্বাস হয়ে গিয়েছিলো বেচারা,, ভেবেছে অর্পনা বোধয় খুব রাগ করেছে তাই নিজে থেকে ওকে জড়িয়ে ধরতে পারছিলোনা। দ্বীপের কান্ডে আবারও ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো অর্পনা। হাত উচিয়ে দ্বীপের চুলের ভাজে হাত ভুলাতে ভুলাতে বললো — রাত হয়ে গেলো,, খাবার খাবেন না?

,,,দ্বীপ দুদিকে মাথা ঝাকিয়ে নিষেধ করলো, মানে খাবেনা। অর্পনা ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করলো — কেনো? খাবেন না কেনো? এখোনো আমার উপর রাগ করে আছেন?
,,,দ্বীপ আবারও মাথা ঝাকালো,, মানে রাগ করে নেই। অর্পনা আরেকটু উদ্দেগ নিয়ে প্রশ্ন করলো — তাহলে? কি হয়েছে, আমায় বলুন।

,,,দ্বীপ অর্পনার বুকে এতোক্ষণ মাথা গুজে ছিলো এখন ঘাড়টা একটু কাত করে অর্পনার দিকে তাকালো,, অর্পনা নিজেও ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো, দুজনার চোখাচোখি হতেই আবারও ঘোরের ভিতর চলে গেলো অর্পনা। লোকটা তাকে দৃষ্টি দিয়েই হিবনোটাইজ্ড করে দিচ্ছে। দ্বীপ অর্পনার হাত টেনে কামর দেওয়া জায়গাটাতে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ,, অবাক হলো অর্পনা। এই লোক যে তাকে কামর দিয়েছে, সে নিয়ে কি অনুতপ্ত হচ্ছেন উনি? অর্পনার ভাবনাকে সত্যি প্রমান করে দিয়ে দ্বীপ ওর হাতের ক্ষততে হাত ছোয়ালো। তীব্র শক্তিতে কামর দেওয়ার ফলে জায়গাটা লাল হয়ে রক্ত জমাট বেধে আছে। সেখানে হাত ভুলিয়ে দিয়ে আবারও অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। দ্বীপের কান্ড দেখে অর্পনা শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো,, তার কেমন যেনো অনুভত হচ্ছে,, যেটা হওয়ার নয়,, হওয়া ঠিক নয়। অর্পনা মনে মনে আওড়ালো,,, এতো মায়ায় জড়াচ্ছেন কেনো দ্বীপ?সেই তো অবেলায় ছেড়েই যাবেন।

,,,দ্বীপ অর্পনার হাতটা আরেকটু টেনে জায়গায় জায়গায় চোখ ভুলিয়ে প্রতিটা ক্ষততে হাত ছোয়াতে ছোয়াতে ছোট্ট করে বললো — ঔষধ!!
,,, অর্পনা আলগোছে জড়িয়ে ধরলো দ্বীপকে,, লোকটা দুদিনেই কেমন মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছে। অর্পনা ভাবতেই পারছেনা, সে কারোর জন্য পাপ্পার সাথে ঝামেলা করে বাড়ি থেকে একেবারে বেড়িয়ে এসেছে।দ্বীপ আবারও অর্পনার হাত ছুতে নিলে অর্পনা বাধা দিয়ে বললো — এটুকু ক্ষততে আমার কিছু হয়না মিষ্টার,, আপনার বউ খুব স্ট্রং। এর থেকে কতো বড়ো বড়ো ক্ষত সামলে নিয়েছি জীবনে, এটুকু তো কিছুই না।
,,দ্বীপ শুনলো না,, ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে হাত টেনে সামনে আনলো,, আবারও ছুয়ে দিলো ক্ষততে। জেদি দ্বীপ এখনো জেদি হয়েই আছে,, তার অসুস্থতা তাকে জেদ থেকে দূরে করতে পারেনি। অর্পনা দ্বীপের জেদকে পাত্তা না দিয়ে পাশ থেকে ফোন নিয়ে বাড়ির লেন্ড লাইনে কল করলো।

ওপাশ থেকে কল ধরতেই অর্পনা উপরে খাবার পাঠাতে বললো। কলটা ধরেছিলো রোমানা বেগম। তিনি দৌড়ে গেলেন খাবার টেবিলে,, আজকে তিনি মন ভরে ছেলের জন্য রান্না করেছেন। কতোদিন ছেলেটাকে রান্না করে খাওয়ানো হয়না। খাবার নিয়ে নিজেই ছুটলেন ছেলের রুমে, এই সুযোগে যদি ছেলেটাকে একটু দেখা যায়। রুমে আসতেই একটা মনোরম দৃশ্যের শাক্ষি হলেন তিনি। অর্পনা দ্বীপকে জড়িয়ে ধরে কি নিয়ে যেনো আলোচনা করছে আর দ্বীপ মন দিয়ে সেসব শুনছে। এই মেয়েটাকে দেখলে বার বার অবাক হোন রোমানা বেগম। এতো সুন্দর,, মিষ্টি একটা মেয়ে কি করে নিজো ইচ্ছায়, একটা মানসিক বিদ্ধস্ত লোককে বিয়ে করে আগলে রাখতে পারে? রোমানা বেগম হালকা ঝড়তা নিয়ে একদম দ্বীপ আর অর্পনার কাছে গিয়ে পৌছালো। এখনো দ্বীপ দেখেনি উনাকে,,সে মন দিয়ে অর্পনার কথা শুনতে ব্যাস্ত।

রোমানা বেগম খাবারটা সাইড টেবিলে আস্তে করে রেখে কাপা কাপা হাতে দ্বীপের চুলের ভাজে হাত ছোয়ালো। উনাকে হাত বাড়াতে দেখে হাত সরিয়ে নিয়েছে অর্পনা,, যেনো দ্বীপ বুঝতে না পারে তার মাথায় অন্য কেউ হাত রেখেছে। রোমানা বেগম অর্পনার দিকে তাকিয়ে প্রশন্য হাসলেন,, কিছুক্ষণ দ্বীপের মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে চলে যেতে নিলে ওনার আচল টেনে ধরলো দ্বীপ। অবাক চোখে তাকালেন রোমানা বেগম। দ্বীপ যখন ছোট ছিলো তখন কোনোকিছুর আবদার করার আগে এভাবে আচল টেনে ধরতো। আজো কি ছেলেটা কোনো আবদার করবে? ভেবেই ফিরে তাকালেন রোমানা বেগম,, অত্যন্ত আদুরে স্বরে বললো —

,,, কিছু লাগবে আব্বু? বলো আম্মুকে।
,,,দ্বীপ অর্পনার হাত টেনে রোমানা বেগমের সামনে এনে বললো — ঔষধ!!
,,,দ্বীপের কথায় অর্পনার মাঝে শীতল স্রোত বয়ে গেলো,, শান্ত দৃষ্টিতে দ্বীপের ব্যাথাতুর মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলো,,লোকটা তাকে নিয়ে ভাবছে,, তাও এতোটা? এটুকু টান কি তার জন্য নাকি পারুর জন্য? বোকা অর্পনা,, তার জন্য কেনো ভাববে?দ্বীপ তো তার মাঝে পারুকে খোঁজে। ভেবেই তাচ্ছিল্য হাসলো অর্পনা। ওর ভাবনার মাঝেই হাত টেনে নিলেন রোমানা বেগম,, হাতের অনেক জায়গায় ছিলে রক্ত জমাট বেধে আছে। রোমানা বেগম আতঙ্কিত কন্ঠে বললেন– কি হয়েছে আম্মু? এভাবে হাত কাটলো কি করে? দ্বীপ তোমার হাতে কামর দিয়েছে? ইসস!! কতো জায়গায় কেটে গিয়েছে।
,,, রোমানা বেগম কথাগুলো একটু জোরেই বলেছেন,, যার ফলে দ্বীপ ভয় পেয়ে অর্পনাকে শক্ত করে ঝাপটে ধরে কেপে উঠলো। অর্পনা সেটা খেয়াল করে রোমানা বেগমের উদ্দেশ্যে নরম স্বরে বললো– একটু আস্তে কথা বলুন আন্টি,, ওনি ভয় পাচ্ছেন। আর হাতের ক্ষত নিয়ে চিন্তিত হবেন না,, উনি ঘুমিয়ে পরলে আমি বায়োডিন লাগিয়ে নিবো।

,,, অর্পনা নিষেধ করলেও শুনলেন না রোমানা বেগম,, তিনি অতি যত্নের সহিত অর্পনার হাত ওয়াস করে দিয়ে বায়োডিন লাগিয়ে দিলেন। অর্পনা মনোযোগ দিলোনা সেসবে,, এমনি একজনের মায়ায় প্রতিনিয়ত আটকে যাচ্ছে,, এর সাথে যদি আরও কয়েকজন এড হয়, তাহলে হয়তো এদেরকে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হবে। ঔষধ লাগানো শেষ হলে চলে গেলেন রোমানা বেগম। উনি যেতেই অর্পনা দ্বীপকে নিজের থেকে সরিয়ে খাবার খাইয়ে দিলো। খাওয়াতে খাওয়াতে অনেক কথা বললো অর্পনা,, দ্বীপ বরাবরের মতো সেসব কথা মন দিয়ে শুনলো। অর্পনা আগে কখনোই এতো কথা বলতো না,, বেশি কথা বলা তার স্বভাবের বিপরীতে। কিন্তু এখন বলতে হচ্ছে,, দ্বীপের জন্য স্বভাবের বিপরীতে গিয়ে বকবক করতে হচ্ছে। দ্বীপের সামনে যদি অর্পনা অনেক কথা বলে তখন দ্বীপ ও কথা বলতে চাইবে,, ধীরে ধীরে সব জড়তা কেটে যাবে। এরকম আশা থেকেই এটা ওটা নিয়ে বকবক করে অর্পনা। খাওয়া শেষ হলে ঔষধ খাইয়ে দিয়ে দ্বীপকে ঘুমাতে বললে সে বাধ্য ছেলের মতো শুয়ে পরলো কিন্তু চোখ বন্ধ করার নাম নেই। ওকে চোখ বন্ধ কটতে না দেখে অর্পনা হালকা ঝুকে প্রশ্ন করলো — কি? এভাবে তাকিয়ে থাকেন কেনো? ঘুমাবেন না?

,,,দ্বীপ অর্পনাকে জড়িয়ে ধরে অর্পনার হাত টেনে মাথায় রাখলো। দ্বীপের মনোভাব বুঝতে পেরে অর্পনা ওর পাশাপাশি শুয়ে মাথায় হাত ভুলিয়ে দিতে দিতে নির বির করে গাইলো।
,,,ঢেকে রাখে যেমন কুসুম,,
পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম!!
তেমনি তোমার নিবিড় চলায়
মরোম এর মুল পথ ধরে,,,
,,আমার ভিতরো বাহিরে
অন্তরে অন্তরে,,আছো তুমি,,,
হৃদয় জুড়ে,,,

,,,মাঝে কেটেছে পাঁচ দিন,, এতোগুলো দিন গেলো রাত্রি কিংবা অর্পনা কারোরি ভার্সিটিতে আসার নাম নেই। এর আগে কখনোই এমন হয়নি,, অর্পনার বিষয়টা নাহয় সবার জানা। কিন্তু রাত্রির কি হয়েছে? সে কেনো আসেনা? তার কি পড়ালেখার কোনো প্রয়োজন নেই? সারাটাদিন শুধু ড্রামা আর সাজগোজ নিয়ে থাকে। এরকম হাজারটা অভিযোগ করতে ব্যাস্ত অরুন। ওর অভিযোগ গুলো মন দিয়ে শুনছে ইরা আর পল্লব । অরুনের রাগারাগি দেখে পল্লব হালকা হেসে ইরার কানে কানে কিছু একটা বললো, কথাটা শুনে পেট চেপে হাসতে লাগলো ইরা। ওদের কান্ড দেখে রাগ হলো অরুনের, সে চোখ ছোট ছোট করে বললো — কি ব্যাপার, এতো হাসাহাসির কি হলো? তরা আমাকে ছাড়া কি নিয়ে ডিসকাছ করছিস,আমাকেও বল।

,,,, ওকে পাত্তা দিলোনা দুজন,, তারা নিজেদের মতো গুজুর গুজুর করতে ব্যাস্ত। মুলত তারা কিছুই বলছেনা,, শুধু অরুনকে ব্যাবাচেকা খাওয়ানোর জন্য ফিসফিস করে কথা বলার ভান ধরছে। ওদের কান্ড দেখে অরুন দাত কটমট করে তাকিয়ে হাতের বইটা পল্লবের দিকে ছুড়তে নিবে তখনি পল্লব পিছনের দিকে ইশারা করে বললো — ঐতো তর রাত্রি চলে এসেছে,, এবার ওকেই জিজ্ঞেস করেনে , কেনো সে এতোদিন আসেনি?
,,,তর রাত্রি কথাটা শুনে থতমত খেয়ে গেলো অরুন,, ওরা কি তবে অরুনের মনের হুদিস পেয়ে গেলো? ওরা পেলে রাত্রির ও তো পাওয়ার কথা। কিন্তু সে তো তাকে বুঝতেই চায়না,, সারাক্ষণ ভুল বুঝে থাকে। সেদিনের পর এতো করে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে? কেনো ওভাবে কান্না করেছিলো? একপ্রকার না শুনার মতো এড়িয়ে গিয়েছে মেয়েটা। যেনো অরুন তার পর ,, ওকে চিনেই না। থাক, বলতে না চাইলে না বলুক,, চাইলেই তো সবার আপন হওয়া যায়না। অরুনের ভাবনার মাঝেই ওদের পাশাপাশি এসে বসলো রাত্রি । অরুন কোনা চোখে একবার রাত্রির দিকে তাকিয়ে হাতে থাকা বইয়ে মুখ গুজলো। অরুনকে হঠাৎ বইয়ে মুখ গুজতে দেখে পল্লব পিন্চ মেরে বললো — কিরে ভাই!! এতোক্ষণ রাত্রি রাত্রি করে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিলি,, এখন রাত্রি আসার পর বইয়ে মুখ গুজে দিলি কেনো? জিজ্ঞেস কর, তর রাত্রি এতোদিন কেনো আসেনি।

,,, অরুন সেভাবেই বইয়ে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করে বললো — কেউ আমার না, আমিও কারোর না। যার যেমন ইচ্ছা তেমন ভাবে চলবে,, আমি কইফিয়ত চাওয়ার কে?
,,অরুনের বলার ধরন দেখে পল্লব ইরার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো,, ইরা ঠোট টিপে হেসে বললো — এভাবে কথা বলছিস কেনো অরুন? আমরা তো ফ্রেন্ড তাও বেস্ট ফ্রেন্ড,, কফিয়ত চাইতেই পারি।
,,,তাহলে চা, আমায় কেনো বলছিস? আর আমি কারোর জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছিলাম না,, শুধু এটুকুই বললাম,, রেগুলার ক্লাস না করলে পড়ালেখায় পিছিয়ে যাবে। এতে এতো নাটক করার কি হলো? ( অরুন)
,,, কিন্তু আমরা তো এতোক্ষণ ধরে তর হাজারটা অভিযোগ শুনছিলাম। রাত্রি এই করেনা সেই,, বলতে বলতে থেমে গেলো ইরা। তার দৃষ্টি করিডরের দিকে স্থির। হুট করে ওকে থেমে যেতে দেখে সবাই ওর দিকে তাকালো। ইরার মুখদ্বয় মলিন,, হঠাৎ মুখ মলিন করায় সবাই ওর দৃষ্টি অনুযায়ী তাকালো,,, আদ্রিয়ান করিডরে দাড়িয়ে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। নিশ্চয়ই অর্পনাকে খুজছে ? আদ্রিয়ানের জন্য খুব মায়া হয় তাদের। শুধু অর্পনার জন্য বাংলাদেশের মাটিতে পরে আছে ছেলেটা,, ওকে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে চোখে চোখে রাখবে বলে ভার্সিটিতে বিনা বেতনে জব নিয়েছে। অথচ যার জন্য এতোকিছু করলো সেই কিনা ওর ভালোবাসাকে মুল্য না দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিলো? এই বিষয়টাতে ওরা বন্ধু মহল বড্ড অসন্তুষ্ট অর্পনার প্রতি। ওদেরকে তাকিয়ে থাকতে দেখে চলে গেলো আদ্রিয়ান,, পল্লব সিচুয়েশন স্বাভাবিক করতে রাত্রির উদ্দেশ্যে বললো —

,,, এতোদিন কই ছিলি মামা? তর তো কোনো খোজ খবর ই নেই।
,,,রাত্রি মলিন হেসে বললো — বাসা চেন্জ করেছি দুদিন আগে,, এর আগের তিনদিন বাসা খুজেছি। পাওয়ার পর সেটা গুজগাজ করতে দুদিন লেগে গিয়েছে।
,,,হঠাৎ বাসা চেন্জ করতে গেলি কেনো? আগের বাসাটা তো ভালোই ছিলো ( ইরা)
,, আই গেইজ বাসার আসেপাশের লোক গুলো ভালোনা,, আমার ধারনা কি ভুল রাত? ( অরুন)
,,,রাত্রি কিছুই বললো না, মাথা নিচু করে ঘাসফুল নাড়াচাড়া করতে লাগলো। অরুন খেয়াল করে দেখলো আজ খুব একটা সাজেনি রাত্রি,,মুখে সামান্য প্রসাধনী ব্যাতিত তেমন চাকচিক্য নেই। মুখের সেই মন মাতানো হাসিটাও মিসিং,, অরুণ কন্ঠটা একটু নিচু করে রাত্রির কানের পাশে মুখ নিয়ে ঘাড়ে হালকা করে ফু দিয়ে ফিসফিস করে বললো — আকাশে মেঘ করেছে,, বৃষ্টি হবে হবে ভাব,, কি হয়েছে বলতো রাত? আকাশটা এতো মলিন কেনো? সাজগোজ ও মিসিং,, লিপস্টিক দিতেও ভুলে গিয়েছে বোধয়। এতো উদাসীন কেনো প্রকৃতি?

,,, অরুনের কান্ডে কেপে উঠলো রাত্রি,, এই ছেলেটা ওকে এতো জ্বালায় কেনো, আল্লাহ মালুম। আগে কথায় কথায় ঝগড়া করতো, এখন উল্টা পাল্টা কাজ করে। ওদের কান্ড দেখে পল্লব চোখে হাত রেখে নাটকিয় ভঙ্গিতে বললো — ইয়া আল্লাহ!! এ কি দেখে নিলাম আমি? আমাদের মতো পাক পবিত্র সিঙ্গেলদের সামনে এসব করতে একটু ও বাদলো না তর? ছি ছি!! এমন দৃশ্য দেখার আগে আমার ১৭ নাম্বার এক্স মরে কেনো গেলো না? এসব দেখানোর চেয়ে এক ঘন্টা জোর করে অনন্ত জলিল আর বর্ষা আপার মুভি দেখিয়ে হার্ট এটাক করিয়ে দিলেও পারতি। আমি একটু নার্সদের ভালোবাসার সাগরে হাবুডুবু খেয়ে আসতাম,,

,,, পল্লবের কথায় লজ্জা পেলো রাত্রি, অরুন দেখলো সেই লজ্জা রাঙা মুখ,, মেয়েটাকে লজ্জা পেলে খুব মানায়,, একটু বেশি ই মানায়। রাত্রির থেকে চোখ সরিয়ে পল্লবের দিকে এবার সত্যি সত্যি বই ছুড়ে দিলো অরুন। দাতে দাত চেপে বললো — ক্যারেক্টারলেস।
,,,, পল্লব মুখটাকে ইনোসেন্ট ফেইসে কনভার্ট করে বললো — আমার ক্যারেক্টার খারাপ নারে পাগলা,, আমার তো মন বড়ো।

,,, সময়টা বিকালের শেষ প্রান্ত, কফি হাতে দ্বীপের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে অর্পনা। দ্বীপ দুপুরে খাবার পর ঘুমিয়েছে। প্রতিনিয়ত কড়া ডোজের ঔষধ খাওয়ার ফলে দিনের বেশিভাগ সময় ঘুমিয়ে থাকে দ্বীপ। এই পাঁচ দিনে কিছু কিছু পরিবর্তন এসেছে দ্বীপের মাঝে। আগে সে তেমন একটা কথা বলতো না, যাই বলতো এক বাক্যে,, তবে আজ সকালে অর্পনা যখন ওর সামনে এটা ওটা নিয়ে কথা বলছিলো তখন দ্বীপ ও কয়েক বাক্য একসাথে উচ্চারন করেছিলো। সেই সাথে বিহানের প্রতি ভয়টা অনেকটাই কমে এসেছে,, এখন আর দ্বীপের গোসলের পর অর্পনাকে দাড়িয়ে থাকতে হয়না। রোমানা বেগম ও তিন বেলা খাবার এনে দিয়ে যায়,, এতেও ভয় কমেছে দ্বীপের। এভাবে একটু একটু ইম্প্রুভ করলে দুই মাসের মাথায় কাউন্সিলিং আর থেরাপি দিতে হসপিটালে নিয়ে যাবে সে। অর্পনা যখন দ্বীপের হেল্থ নিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন তখনি রুম থেকে দ্বীপের হালকা স্বর শুনা গেলো। সে পারু পারু বলে অর্পনাকে ডাকছে। ডাক শুনে অর্পনা বারান্দা থেকে রুমে যেতেই দেখলো দ্বীপ ঘুম থেকে উঠে বসে আছে। অর্পনা এগিয়ে আসতেই দ্বীপ ওর কোমর জড়িয়ে বেকুল স্বরে ডাকলো — পারু!!

,,অর্পনার কেনো যেনো ভালো লাগলোনা,, বুকের ভিতর সুক্ষ ব্যাথা অনুভব হলো,, সে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে হালকা রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বললো — এই পারু কি হা? আমাদের বিয়ে হয়েছে না? আমি আপনার কি হই?
,,,অর্পনার রাগি কন্ঠ শুনে দ্বীপ বোকার মতো তাকিয়ে রইলো, ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অর্পনা দ্বীপের গালে হাত ছুইয়ে আদুরে কন্ঠে বললো– আমি আপনার বউ হই, আজ থেকে আমাকে বউ বলে ডাকবেন।
,,দ্বীপ অবুঝের মতো জিজ্ঞেস করলো– বউ?
,, দ্বীপের প্রশ্নে হালকা কনফিউস্ড হলো অর্পনা,, একটু ভাবুক হয়ে বললো— না! বউ ডাকটা বড্ডো পুরোনো। উয়াইফি ডাকটা এখন ট্রেন্ডে আছে কিন্তু এটাতো এখন সবাই ডাকে। দাড়ান ইউনিক কিছু ভাবি।
,,,দ্বীপ আবারও অবুঝের মতো জিজ্ঞেস করলো—ইউনিক?
অর্পনা দ্বীপের কাধে হাত রেখে হালকা রাগি কন্ঠে বললো– ইউনিক নারে গাধা, ভেলোরা। আপনি আমাকে আজ থেকে ভেলোরা বলে ডাকবেন? ওকে?

,,, দ্বীপ আবার জিজ্ঞেস করলো — ভেলোরা?
অর্পনা মুচকি হাসলো, নিজের মাঝে একটু ভাবসাব এনে বললো — হুম!! ভেলোরা মানে সুন্দর, কোমল। আমি সুন্দর না?
,,দ্বীপ আবারো আগের ন্যায় অবুজ কন্ঠে
বললো —সুন্দর?
বার বার প্রশ্ন করায় হতাশ হলো অর্পনা,, বিরক্তিকর মুখ করে বললো —তর নানির বিয়া , শালা!!
,,, এবারেও একি কাজ করলো দ্বীপ,, অর্পনাকে বিরক্তির অসীম পর্যায়ে পৌছে দিয়ে প্রশ্ন
করলো — নানি?
,,, বিরক্তিতে অর্পনা কপাল চাপরাতে মন চাইলো,, অবুজ লোক একটা,, যা বুঝায় তা তো বুঝেইনা, উল্টো কিসব নানি টানি ডাকা শুরু করে দিয়েছে। অর্পনা তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো — থামুন, আপনাকে কিছু ডাকতে হবেনা। বলুন, ডাকছিলেন কেনো? কিছু লাগবে?
,,, দ্বীপ অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেমে থেমে বললো —–সি*গারেট!!
,,, অর্পনা মুখে রাগ ফুটিয়ে তুলে প্রশ্ন করলো — কি বললেন? কি খাবেন আপনি?
,,, সি*গারেট!!

,,, দ্বীপকে আবারও প্রতি উত্তর করতে দেখে নাক ফুলালো অর্পনা,, বহু কষ্টে এই পাঁচ টা দিন দ্বীপকে সি*গারেট থেকে দূরে রেখেছে। কতো বুঝ দিলো,, কথা বলবেনা বলে হুমকিও দিলো,, সেসব হুমকি শুনে এতোগুলো দিন চুপ ছিলো। এখন কিনা এই লোক আবারও সি*গারেট খাওয়ার দাবি করে? অর্পন দ্বীপের হাতটা কোমর থেকে ছাড়িয়ে,, এগিয়ে গিয়ে ড্রয়ার থেকে সি*গারেটের প্যাকেট আর লাইটার এনে দ্বীপের পাশে বিছানায় রেখে বললো — না করার পরেও খাবেন বলেছেন না? আচ্ছা খান। এসব খাওয়ার পর একদম পারু পারু করবেন না,, আমি আসবোনা,, আপনার সাথে কথাও বলবোনা। এসব স্মোকার আমার পছন্দ না,, গন্ধ শুনলেই বমি পায়। সারাজীবন অরুন আর পল্লবকে স্মোক না করার শর্ত দেওয়ার পর এখন দেখি নিজের হাসবেন্ড ই স্মোক করে। খা তুই, তর সংসার আমি করবোনা।

,,, বলেই এক প্রকার মুখ কালো করে বাহিরের দিকে পা বাড়াতে নিলে দ্বীপ সি*গারেটের প্যাকেট টা মেঝেতে ছুড়ে মেরে অসহায় কন্ঠে বললো — ভেলোরা!!
,,, নিজের পছন্দ করা নাম দ্বীপের মুখে শুনে অবাক চোখে ফিরে তাকালো অর্পনা,, প্যাকেট টা ছুড়ে মেরে সমানে ফোপাতে লাগলো দ্বীপ, ওকে এমন করতে দেখে দ্রুত কদমে এগিয়ে গেলো অর্পনা। দ্বীপের সামনে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো — কি হলো ছুড়ে ফেল্লেন কেনো? খাবেন না?
,,, দ্বীপ অর্পনার পেট জড়িয়ে মাথা ঝাকিয়ে বললো — যাবিনা, যাবিনা, কোথাও যাবিনা।
,,, আপনি আর এসব খেতে চাইবেন?
,,, দ্বীপ আবারো মাথা ঝাকিয়ে না বুঝালো,, মানে সে খেতে চাইবেনা। অর্পনা প্রশন্য হেসে দ্বীপের চুলগুলো বেক ব্রাস করতে করতে বললো — মাই হিরো!! বেলকনিতে যাবেন?বাহিরে কুয়াশা পরেছে,, বারান্দায় সকাল সন্ধা ফুল ফুটেছে। চলেন দেখে আসি।

,, বলেই হাত বাড়ালো অর্পনা,, দ্বীপ স্থির থেকেই হাত রাখলো অর্পনার হাতে। অর্পনা ওকে টেনে তুলে ঠেলে ঠেলে বারান্দায় নিয়ে গেলো। বারান্দার এক কোনায় দোলনা রাখা আছে,, অর্পনা দ্বীপকে ঠেলে নিয়ে দোলনায় বসিয়ে দিলো। এমনিতে তার ফুলের প্রতি কোনো জোক নেই কিন্তু দ্বীপকে সহজ করতে প্রকৃতির ছোয়া খুব প্রয়োজন। অর্পনা এগিয়ে গিয়ে ৮ টা সকাল সন্ধা ফুল, ৪ টা অপরাজিতা, ৫ টা টাগর ফুল এনে দ্বীপের সামনে দাড়ালো। একটা একটা ফুল দেখাচ্ছে আর ফুলের বর্ননা দিচ্ছে। বর্ননা দেওয়া শেষ হলে দ্বীপের চুলের ফাকে ফাকে একটা একটা ফুল গুজে দিলো,, অর্পনার কান্ডে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো দ্বীপ।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৪

হাসিটা ক্ষিন ছিলো,, খুব অল্প সময়ের জন্য অথচ এই হাসিটা চোখে ঠেকতেই প্রান ভরে শ্বাস নিলেন মাহিদ মির্জা। তিনি নিজের বারান্দায় থেকে ছেলে আর ছেলের বউকে দেখছেন,, আল্লাহ এতোদিনে পুরোপুরি সহায় হয়েছেন বোধহয়,, তাইতো অসুস্থ ছেলেটার জন্য এরকম ধৈর্যশীল একটা মেয়েকে পাঠালেন। অথচ মাহিদ মির্জা জানেন ই না, অর্পনার মতো অধৈর্য, বেপোরোয়া, বদমেজাজি মেয়ে এই পৃথিবীতে কম ই আছে।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৬