৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪১ (২)
রুপান্জলি
এক ভঙ্গুর কিশোরী তার নিরবিচ্ছিন্ন মন নিয়ে হেটে যাচ্ছে চেনা পথ ধরে। ক্ষনে ক্ষনে দু-হাতে চোখ মুচছে,, ঝর ঝর করে বৃষ্টি পরার দরুন চোখের পানি বৃষ্টির পানি মিলিত হয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। হাতের চুরিগুলো জোর দিয়ে খোলার দরুন অনেক জায়গায় ছিলে গিয়েছে,, বৃষ্টির পানিতে বার বার সেসব জ্বালা করে উঠছে। মোবাইলটা সাথে নেই,, আদি ভাইয়ের জন্য সাজগোছ করার সময় সেটা ড্রেসিং টেবিলে রাখা হয়েছিলো আর নেওয়া হয়নি। অর্পনা এদিক ওদিক তাকিয়ে ধীরে ধীরে পরিচিত পথ ধরে হাঁটতে লাগলো। এখান থেকে তাদের ফ্লাটের কাছে পায়ে হেটে পৌছাতে গেলে ৪৫-৫০ মিনিটের মতো লাগবে। যদিও শরীরটা ভেঙে আসছে, তবুও সে পারবে, একবার পাপ্পার কাছে পৌঁছাতে পারলে সব কষ্ট হাওয়ার সাথে মিলিয়ে যাবে। আজ একটা কথা খুব করে বুঝতে পারলো অর্পনা, তার পাপ্পা ব্যাতিত এই পৃথিবীতে কেউ তাকে ভসলোবাসেনি।
মাম্মাও বাসেনি,, আজকের পর সেও মাম্মাকে ভালোবাসবেনা,, মাম্মাকে দেখতে চাইবেনা,, মাম্মা থাকুক নিজের সংসার আর তিন সন্তান নিয়ে। এসব ভাবতে গেলেও অর্পনার কেমন বুক পুড়ে যাচ্ছে,, সত্যি ই কি মাম্মা তাকে ভালোবাসেনা? সেও কি মাম্মাকে ভুলে থাকতে পারবে? ভালোবাসবেনা? মাকে ভালো না বেসে থাকা যায়? মা যতই খারাপ হোক, তাকে ঘৃণা করা যায়? যায় না তো,, অর্পনা হয়তো দূরে থাকার চেষ্টা করতে পারবে তবুও কোনোদিন ঘৃণা করতে পারবেনা। আর আদি ভাই!! সে একটা ভুল ছিলো,, অর্পনার জীবনে করা সবগুলো ভুলের মাঝে আদি ভাই ছিলো সবচেয়ে বড়ো ভুল। তাকে নিয়ে আর ভাববে না সে,, হয়তো অপমানিত হয়েছে,, অপমানগুলো গায়ে লেগে না থাকলেও মনে ঠিকি দাগ কেটে থাকবে, তবুও সে নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করবে। পাপ্পা তো সবসময় বলে অর্পনা স্ট্রং, তার মতো স্ট্রং মেয়ের এতোটা ভাঙ্গন মানায়না। এরকম হাজারটা বুঝ দিয়ে নিজেকে স্ট্রং প্রমান করার চেষ্টা চালাচ্ছে অর্পনা। তবে তার তৈরি করা শক্ত খোলসটা আরও হাজার গুন ভেঙে দেওয়ার পায়তারা বোধহয় প্রকৃতি করেছিলো তার বর্ষন আর মানব দ্বারা। অর্পনা হাঁটতে হাঁটতে যখন চিপা গলির ভিতর প্রবেশ করলো তখনি নজর আটকালো একটা চায়ের দোকানে,, সেখানে তিনজন লোক বসে সিগারেট আর চা খাচ্ছে,, এক হাতে সিগারেট অন্য হাতে চা। সাথে দোকানদার ও খোশ মেজাজে গল্প করছে তাদের সাথে। নির্বোধ অর্পনা সেই লোক গুলোকে পাপ্পার মতো ভালো মানুষ মনে করে এগিয়ে গেলো,, উদ্দেশ্য একটা ফোন চেয়ে নিয়ে পাপ্পাকে ফোন করা। অগত্যা সে দোকানের কাছে এগিয়ে গিয়ে নরম স্বরে বললো — আঙ্কেল!! আপনাদের কারোর কাছে একটা ফোন হবে? জাস্ট একটা কল করবো।
,,, অনাকাঙ্ক্ষিত সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জিনিস পেয়ে যেনো লোক গুলোর চোখ চকচক করে উঠলো। সেখানে থাকা সবচেয়ে মোটা লোকটা লুঙ্গির ফাক থেকে মোবাইল বের করে অর্পনাকে কাছে আসার ইশারা করে বললো — আসো আম্মা!! ভিতরে আইসা কারে ফোন দিবা দেও।
,,, ভঙ্গুর অর্পনা আম্মা ডাক শুনে খুব ভরসা পেলো। এগিয়ে গেলো দোকানের ভিতর,, লোকটার কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতে চাইতেই লোকটা খপ করে ওর হাত ধরে নিলো। হতবুদ্ধ হয়ে গেলো অর্পনা। ওকে আরও অবাক করে দিয়ে পাশে বসা আরেকটা লোক অর্পনার শাড়ীর আচল টেনে ধরে বললো– কারে ফোন দিবা আম্মা? কা*স্টমার? এতো রাতে বাহিরের কা*স্টমার দিয়া কি করবা? আমরা আছিনা? চলো তোমারে,এএ,
,,,শেষের কথাটুকু টেনে বলতে বলতে মুখে বিশ্রী হাসি ঝুলিয়ে অর্পনার দিকে নি*কৃষ্ট দৃষ্টিতে তাকালো। লোকগুলোর দৃষ্টির মানে বুঝতে পেরে ঝারা মেরে দূরে সরে গেলো অর্পনা। ভাগ্যক্রমে লোকটার ফোনটা অর্পনার হাতে এসে পৌঁছেছে। এতে বড্ড খুশি হলো অর্পনা, ফোনটা শক্ত করে ধরে দৌড়ে দোকান থেকে বেড়িয়ে গেলো। ততক্ষণাত পিছন থেকে লোকগুলোর কন্ঠ শুনা গেলো — এই পালাইতাছে, ধর!!
,,,বলতে বলতে তিনজন পিছু নিলো অর্পনার। বিষয়টা বুঝতে পেরে অর্পনা একবার পিছন ফিরে তাকালো। লোকগুলোকে এগিয়ে আসতে দেখে দৌড়ের গতি বাড়িয়ে তারাহুরো করে আরশাদ জামানের ফোনে কল করলো তবে ফোন ওপাশ থেকে বিজি বলছে। শব্দ করে কেঁদে দিলো অর্পনা, তার সাথে কেনো বার বার এমন হয়? কি করবে এখন সে? এতো বিপদেও ভেঙে পরলোনা মেয়েটা,, ধৈর্য নিয়ে গুনে গুনে চার বার কল করলো তবে চারো বার ওপাশ থেকে একই কথা ভেসে আসছে। হতাশ হলো সে,, মনে শক্তি থাকলেও শরীরে দৌড়ানোর শক্তি টুকু পাচ্ছেনা। বার বার মাথা ঘুরে পরে যেতে নিচ্ছে, পিছনের লোক গুলো ও খুব নিকটে এসে পৌছেছে। অর্পনা দৌড়াতে দৌড়াতে মাম্মার ফোনে কল করলো,, মাম্মার ফোন ও বিজি। ইসস!! সবাই হুট করে এমন বিজি হয়ে গেলো কি করে? ভাগ্য কি তবে অর্পনাকে ভেঙে চুরে গুরিয়ে দিতে চাচ্ছে? নাহ!! সে প্রয়োজনে আত্মসম্মান বিসর্জন দিবে তবুও নিজের সতিত্ব বিলিন হতে দিবেনা। এরুপ ভাবনা মনে আসতেই সকল অপমান সাইডে রেখে শেষ ভরসা স্বরুপ আল্লাহা আল্লহা করতে করতে আদ্রিয়ানের ফোনে কল করলো। প্রথমবার রিং হলো কিন্তু ওপাশ থেকে রেসপন্স পাওয়া গেলোনা, অর্পনা আবারও কল করলো, এইবার কল রিং হতে হতে যখন শেষ পর্যায়ে পৌছালো তখন ওপাশ থেকে শুনা গেলো কঠোর মানবের নরম স্বর–
,,, আসসালামু আলাইকুম!! কে বলছেন?
,,, আদির কন্ঠ শুনে কান্নার মাঝেই হাসি ফুটলো অর্পনার ঠোটে,, সে এক হাতে চোখ মুছার বৃথা চেষ্টা করে বললো — আ,আদি ভাই!! আমি অর্পন,না। আমি খুব বিপদে পরেছি। আমার পিছনে,, আমার পিছনে কিছু লোক ধাওয়া করেছে। আজ বোধহয় আমি বাঁচতে পারবোনা আদি ভাই , প্লিজ একবার আসবেন? প্লিজ!! আমার খুব ভয় করছে, আদি ভাই!!
,,, অর্পনার কাতর স্বরটা বোদয় বিশ্বাস হলোনা আদির। তাই নিজের নরম স্বর বদলে কন্ঠে তিক্ততা ঢেলে বললো — আমায় কল করেছো কেনো? তোমার বাবাকে করো। জন্ম দিয়ে ছেড়ে দিলে হবে? কর্ম করতে হবেনা?
,,, আদির বলা কথাটা অর্পনার মনে খুব লাগলো,, তবে নিজের পরিস্থিতির কথা ভেবে রাগ করতে পারলো না। এই মুহুর্তে তার সম্মান টা আসল,, সম্মান বাচলে আত্মসম্মান নিয়ে ঠিক ভাবা যাবে। অর্পনা ফোঁপাতে ফোঁপাতে পিছনে তাকালো। লোক গুলো তার থেকে ১০ কি ১৩ হাত দূরে। অর্পনা গায়ের সব শক্তি খরচ করে পায়ের গতি বাড়িয়ে কাতর স্বরে বললো– আপনি আমায় পরেও অপমান করতে পারবেন আদি ভাই। আমি চুপচাপ সহ্য করবো সেসব,, দয়া করে একবার আসুন। আজ আমার সতিত্ব হাড়িয়ে গেলে কাল সমাজে বেঁচে থাকা হবেনা। আ,আদি ভাই, একবার আসুন না। আমার খুব ভয় হচ্ছে।
,,,, এবারেও বোধয় বিশ্বাস করলো না পাষান মানব,, ওপাশ থেকে ভেসে এতো তাচ্ছিল্য ভরা স্বর — আর ইউ মেড অর্পনা,, সতিত্ব আর তোমার? তুমি মেয়ে নাকি? শরীর দেখে তো বুঝাই যায়না। কোনো গড়ন আছে তোমার? কি দেখে আকৃষ্ট হবে লোকজন? শুধু চেহারা থাকলেই হয়না, পরিপূর্ণ নারী হতে গেলে অনেক কিছুর প্রয়োজন। তাও যদি মেয়েদের মতো সাজতে, তাহলে ভেবে দেখতাম। তোমার মাঝে আছেই কি আর নিবেই বা কি? দয়া করে নাটক বন্ধ কর আর নি,,
,,, তিব্র ধাক্কায় পিচ ঢালা রাস্তায় মুখ থুবড়ে পরলো অর্পনা, মুখ বারি খেলো শক্ত কনক্রিটের রাস্তায়,, ফোনটা ছিটকে পরলো দূরে। অর্পনা নিজেকে বাঁচাতে ঘুড়ে উঠার চেষ্টা করলো,, উঠে বসতেই বুক বরাবর লাত্থি মারলো কেউ। ধাম করে রাস্তায় পরলো আবার,, এবারে মাথার পিছনটা ব্যাথায় মুচরে উঠলো, কানের কাছে প্রতিদ্ধনি হতে থাকলো আদির বলা কথা গুলো। তার মাঝে কিছু নেই? আকৃষ্ট হওয়ার মতো কিছুই না? তাহলে সামনে দাড়ানো তিনজনের চোখে এই লুলুপ দৃষ্টি কেনো? কেনো ছিন্ন ভিন্ন করতে চাচ্ছে অর্পনার কোমল অস্তিত্ব? চোখে ভাসছে লোক তিনটার ফ্যাসফ্যাসে হাসি। অর্পনা বহু কষ্ট উঠে বসলো, লোক গুলো এগিয়ে আসছে,, ওদের এগুতে দেখে বসে থেকেই পিছাতে লাগলো মেয়েটা। বৃষ্টির স্রোত, অগোছালো শাড়ী, ভঙ্গুর শরীরটা তালগোল পাকিয়ে অর্পনাকে নিশ্ব করে দেওয়ার পায়তারা করছে। সে পিছাতে পিছাতে হাওমাও করে কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করে বললো —
,,,আঙ্কেল!! আপনারা না আমায় আম্মা ডেকেছেন? আম্মা তো মাকে ডাকা হয়। নিজের মাকে রেহাই দিন। আমার নিজের বলতে সম্মান ব্যাতিত কিচ্ছু নেই। এটুকু কেরে নিবেন না, দয়া করুন।
,,,, সাথে সাথে ওপাশ থেকে ভেসে এলো লোকগুলোর বিশ্রি হাসি। রাতের আধার, বৃষ্টির শব্দ আর লোক গুলোর হাসি মিলিয়ে ঝঙ্কার তুলছে অর্পনার কানে। অর্পনা ভয়ার্ত ঢোক গিলে আবারও কিছু বলতে নিবে ততক্ষণাৎ মুখ বরাবর লাত্থি মারলো কেউ। আবারও ধাম করো রাস্তায় পরে গেলো,, এবার মাথার ব্যাথায় চিৎকার করে ডাকলো — মা আহ!! মাগো,, ও মা।
,,, মেয়েটার আত্মচিৎকারে যেনো শান্তি খুজে পেলো তিনজন,, একজন এগিয়ে এসে অর্পনার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুললো, অর্পনা কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করলো ছেড়ে দেওয়ার জন্য। লোকটা ঠাস ঠাস করে চর বসালো অর্পনার গালে। ততক্ষণাত শাড়ির আচল টেনে নিলো একজন। অর্পনা নিভু নিভু দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো লোকটাকে। বয়সটা তার পাপ্পার সমান অথচ তাকে নো*রা স্পর্শ করতে দ্বিমত করছেনা। ঘাড়ে, গলায়, পেটে, অ*যাচিত স্থানে আ*চর পরলো গভীর ভাবে। অর্পনার গনবিদারক চিৎকারে শহর কেঁপে উঠলো তবুও কাঁপলো না পাষান, চ*রিত্রহীন লোকদের অন্তর। প্রতিটি নো*রা স্পর্শে মা মা বলে চেঁচালো মেয়েটা। মা শুনলো না, মা আসলো না,, কেউ শুনছেনা তার আর্তনাদ। এক পর্যায়ে অর্পনার স্থান হলো রাস্তায়, অনুভব করলো কেউ উঠে এসেছে তার উপরে,, শরীরে তখন ছিন্ন ভিন্ন ব্লাউজ, পেডিকোড। হাত দুটো অসার হয়ে পরলো কনক্রিটের রাস্তায়। সেই অসার হয়ে আসা হাতখানা চাপা পরলো কারোর পায়ের তলায়। কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়ে আসা চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকালো অর্পনা, ঠোঁট নাড়িয়ে বির বির করে বললো,– আল্লাহ!! আমায় বাঁচাবেন? এখনো যতটা রয়ে গিয়েছে ততোটা আগলে দিন,, এবার অন্তত ফিরিয়ে দিবেন না। আমার জন্য তো কাউকে দিলেননা, আপনি অন্তত আগলে নিন। আপনি ছাড়া আমায় কেউ দেখতে পাচ্ছেনা,, রক্ষা করার মতো আপনি ছাড়া কেউ নেই। আপনার নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে? আমারও খুব কষ্ট হচ্ছে,, আর কষ্ট দিয়েন না মালিক। আমার দে*হটা অ*পবিত্র হলেও স*তিত্বটা নষ্ট হতে দিবেন না। ইয়া রহমান!! আমার উপর রহম করুন, একটু রহম করুন।
,,, এই পর্যায়ে এসে আল্লাহ বোধহয় অর্পনার দোয়া কবুল করলো। অর্পনা অনুভব করলো, কেউ এসেছে, যে খুব সন্তর্পণে তার উপরে থাকা লোকটাকে সরিয়ে দিয়েছে। আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে আগন্তুকের দিকে তাকালো অর্পনা,, এই নৃগুড় অন্ধকারেও আগন্তুককে চিনতে পারলো মেয়েটা। পাপ্পাকে ফাইট করতে দেখে চোখ বেয়ে দু ফোটা আনন্দ অশ্রু বয়ে গেলো। একবার আকাশ তাকিয়ে আল্লাহ এর নিকট শুকরিয়া আদায় করে নিশ্চিন্তে চোখ বুঝে নিলো। ৪ বছর আগের সেই অতিত স্বপ্নে ভাসতেই ঘুমের মাঝে ফুঁপিয়ে উঠলো অর্পনা৷ দ্বীপ সোফায় বসে নির্বাচনের পোস্টার ডিজাইন করছিলো। প্রতিবার নির্বাচনের আগে পোস্টারের ডিজাইন, তাতে লিখা প্রতিটি বাক্য দ্বীপের তৈরি করা। সে যেমন ভাবে পোস্টার রেডি করে দেয় তেমন ভাবেই সেটা পাবলিস্ট করা হয়। হঠাৎ অর্পনার ফোঁপানোর স্বর শুনে দ্রুত পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে গেলো দ্বীপ। দুহাতে আগলে নিলো বক্ষ ভাজে,, গালে চাপর মারতে মারতে বিচলিত কন্ঠে সুধালো — কোমল!! এই পিয়াসা!! কি হয়েছে তোমার? কাদছো কেনো? খারাপ স্বপ্ন দেখেছো? জান!”
,,,, চাপর মারতে মারতে খেয়াল করলো ছোট্ট ছিমছাম গড়নের মেয়েটার চোখ দুটো ভিজা,, এক হাতে বালিশ খামচে ধরে রেখেছে,, শরীর প্রচন্ড গরম। মেয়েটার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে অথচ সে জানেই না । কেমন হাসবেন্ড হলো সে? দ্বীপ মাঝে মধ্যেই টুকটাক অবাক হয়ে যায়,, সে অর্পনাকে খুব একটা বুঝতে পারেনা। মেয়েটার মনে কখন কি চলে? কি হয়? কেনো হয়? কিছুই ধরতে পারেনা। এইতো সন্ধায় শপিং মল থেকে ফিরে সে এক পাক্কা অভিনেত্রী হয়ে উঠলো। জ্ঞান ফিরার পর এমন একটা ভাব নিলো যেনো তার মতো চিল মুডে থাকা মানুষ এই পৃথিবীতে খুব কম ই আছে,, সে সবচাইতে সুখি। বাড়িতে এলো, সবার জন্য কিনে আনা পোশাক গুলো একে একে সবাইকে দিলো। সবার সাথে ডিনার করলো,, তার সাথে টুকটাক কথা বললো তারপর ঘুমিয়ে পরলো। মেয়েটা যতই নিজেকে শক্ত দেখানোর পায়তারা করুক না কেনো? ঘুমের ঘোরে ঠিকি তার আসল রুপটা বেড়িয়ে এসেছে। দ্বীপ উঠে গিয়ে মেডিসিন বক্স নিয়ে এসে জ্বরের টেবলেট নিয়ে অর্পনাকে খাইয়ে দিলো।
তারপর ওকে বালিশে শুইয়ে একটা তোয়ালে নিয়ে সেটা ওয়াসরুম থেকে ভিজিয়ে এনে অর্পনার পাশাপাশি বসলো। মেয়েটা এখনো সমানে ফুপিয়ে যাচ্ছে,, দ্বীপ অর্পনার চোখে মুখে অগোছালো হয়ে পরে থাকা চুলগুলো সরিয়ে মুখটা ভেজা রুমাল দিয়ে মুছে দিলো। পরপর ধীরে ধীরে হাত পা মুছে দিতে লাগলো। পা মুছতে গিয়ে কিছুটা বিপত্তি বাধলো,, অর্পনার পরনে থ্রি-পিস,, সালোয়ারটাও পেন্ট কাট তাই নিচের দিকটা চিকন। সে চাইলেও সালোয়ারটা উপরে তুলতে পারছেনা আর না পা বের করার অন্য কোনো উপায় আছে। এই মুহুর্তে কি করা যায়? অনেক ভাবনা চিন্তার পর ঠিক করলো মেধাকে ডেকে অর্পনার ড্রেস চেঞ্জ করিয়ে দিবে। ভাবনা অনুযায়ী অর্পনার গাল, গলা, হাত মুছতে মুছতে মেধাকে কল করলো। কল করার কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে কল ধরলো বিহান। দ্বীপের কিছুটা সংকোচ বোধ হলো,, এতো রাতে হাসবেন্ড ওয়াইফের মাঝখানে কল করাটা কি আদেও ঠিক হলো ? দ্বীপ যা ভেবেছিলো ব্যাপারটা আংশিক সত্যি প্রমাণ হলো। বিহান ওপাশ থেকে কল ধরে বললো — বিজি আছি, পরে কল দিস।
,,, তিব্র সংকোচে দ্বীপের চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো। ইদানীং টুকটাক ভুল করে ফেলছে সে,, যেটা করা উচিৎ নয়। অগত্যা চুপচাপ কল কেটে দিয়ে অর্পনার দিকে তাকালো,, জ্বরের তোপে মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে। দ্বীপের তাকিয়ে থাকার মাঝেই চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। দুহাতে মাথা চেপে ধরে উঠে বসলো,, মাথা টলছে, যখন তখন পরে যাবে যাবে ভাব। ওকে এরকম টলতে দেখে তারাহুরো করে আগলে নিলো দ্বীপ। অর্পনা ধীরে ধীরে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে গালে হাত রেখে বাচ্চাদের মতো করে বললো — পাপ্পা!! এতোক্ষন কোথায় ছিলে তুমি ? আমি তোমায় খুব মিস করছিলাম।
,,, অর্পনার মুখে পাপ্পা ডাক শুনে থতমত খেয়ে গেলো দ্বীপ। এতোদিন তো কথার ফাঁকে ফাঁকে ভাই বলে ডাকতো, এখন কিনা ডিরেক্ট পাপ্পা। আল্লাহ!! এমন দিন না দেখালেও পারতেন। মনে মনে তীব্র অনিহা জমিয়ে রেখে অর্পনার উদ্দেশ্যে হালকা ধমকের স্বরে বললো — এই মেয়ে!! আমি কেনো তোমার বাপ হতে যাবো? আমি দ্বীপ,, তোমার বিয়ে করা হাসবেন্ড। জ্বরের ঘোরে পাগল হয়ে গেলে?
,,, অর্পনা চোখ পিট পিট করে ঘাড় বাকিয়ে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বললো — হাসবেন্ড? কিন্তু আমি তো বিয়েই করিনি, আমি তো আনমেরিড।
,,,, দ্বীপ বুঝলো অর্পণা হুসে নেই তাই এরকম ভুল ভাল বকছে। অগত্যা তপ্ত শ্বাস ফেলে অর্পনার ভুল ভাঙাতে বললো–ওহুম, আমি তোমার স্বামী। আট মাস আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে, মনে করার চেষ্টা করো
,,, অর্পনা ঠোট উল্টে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো — মনে পরছেনাতো,, আমি সত্যি ই বিয়ে করিনি,, আমি এখনো অবিবাহিত।
— অর্পনার মুখভঙ্গি দেখে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো দ্বীপ। তার মিসেস এরকম ভাবেও কথা বলতে পারে? জ্বর না এলে তো জানাই যেতো না। দ্বীপ অর্পনার কপালে উপচে পরা চুলগুলো সরাতে সরাতে বললো— হুম!! বাসর করা হয়নি বলেই নিজেকে এখোনো অবিবাহিত মনে হচ্ছে৷ বাসরটা ঠিক ঠাক হয়ে গেলেই সব মনে পরে যাবে।
,,,,এবার কিছুট ভাবুক হলো অর্পনা,, দ্বীপের হাত ধরে উৎসুক দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করলো — সত্যি ই আমার বিয়ে হয়েছে? তুমি আমার স্বামী?
,,, অর্পনার মুখে তুমি শুনে দ্বীপের অন্তকরন শীতল হয়ে এলো,, কিছুক্ষন থম মেরে অর্পনার বাচ্চা বাচ্চা মুখটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললো — হু!! আ’ম ইউর হাসবেন্ড!!
,,, অর্পনা মাথা ঝাকিয়ে বললো — আচ্ছা!!
— কি আচ্ছা?
,,, দ্বীপের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না মেয়েটা। ধীরে ধীরে গা হেলিয়ে দিলো দ্বীপের বুকে, কপাল ঠেকালো দ্বীপের গলার ভাজে। সেখানে কপাল ঘষতে ঘষতে বললো — ওমম!! ঠান্ডা,, এটা খুলে ফেলি?
,,, দ্বীপের টিশার্ট ধরে কথাটা বলতেই ভ্রু গুটালো দ্বীপ,, মেয়েটা কি সত্যি ই সব হুস জ্ঞান হাড়িয়ে ফেলেছে? আচরন তো তাই বলছে। যদিও দ্বীপের ভালোই লাগছে,, আগে জানলে কখনোই মেডিসিন খাওয়াতো না। সারা রাত এরকম পাগলামি করতো,, তার তো কঠোর বউকে এরকম বাচ্চা রুপে দেখতে ভালোই লাগছে। দ্বীপের ভাবনার মাঝে ওর টিশার্ট উপরের দিকে তুলে নিলো অর্পনা,, ওকে সাহায্য করতে নিজ উদ্দমে টিশার্ট খুলে বেডের সাইডে রেখে দিলো দ্বীপ। অর্পনা যেনো এতে বড্ড খুশি হয়েছে। সে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে দ্বীপের বুকে মুখ ঘষে তাতে কপাল, গাল ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বললো — ওমম,, ঠান্ডা!! ভালো লাগছে।
,,, অর্পনার কান্ডে হাসফাস করে উঠলো দ্বীপ,, চোখ মুখ শক্ত করে বড়ো সরো ঢোক গিললো। নিজেকে ঠিক রাখতে অর্পনাকে জড়িয়ে ধরলো। অর্পনাও আলগোছে জড়িয়ে ধরলো দ্বীপের প্রসস্থ বুক তবে খুব একটা সুবিধা করতে পারলো না। মুখটা আবার কাঁদো কাঁদো করে নিলো অর্পনা, পিঠ থেকে হাত এনে দ্বীপের বাইসেপ্সে রাখলো। সেখানে আলতো করে হাত ছুইয়ে বললো — আপনি অনেক মোটা আর ভারি, যখন আমায় ঝাপটে ধরেন আমার দম নিতে কষ্ট হয়। আমিও আপনার মতো মোটা হতে চাই,, আর আপনাকে ঝাপটে ধরে দম আটকে দিতে চাই।
,,, দ্বীপ ভারি শ্বাস টেনে বললো– আমার দম আটকাতে তোমার সামান্য স্পর্শই এনাফ ভেলোরা। আই অলসু ফল ফর ইউর সফ্ট টাচ!!
,,, দ্বীপের বেগতিক শ্বাস পর্যবেক্ষণ করলো অর্পনা, আবারও ঘাড় বাকিয়ে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো — কি হয়েছে স্বামী? আমি তো তোমায় ঝাপটে ধরিনি,, তোমার কি দম নিতে কষ্ট হচ্ছে?
,,, মাথা ঝাকিয়ে শায় জানালো দ্বীপ, মানে তার সত্যি ই দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। অর্পনা থমথমে মুখ করে নিজের দিকে তাকালো,, সে তো মোটা হয়ে যায়নি আর স্বামিকে ঝাপটেও ধরেনি তাহলে স্বামীর কষ্ট হচ্ছে কেনো? কোলে বসার কারনে কষ্ট হচ্ছে নাকি? হতে পারে। এরকম ভাবনা ভেবে অর্পনা ঠোঁট উল্টে দ্বীপের থেকে সরে আসতে চাইলে দ্বীপ ওকে টেনে আবার বুকে এনে ফেললো,, গলার ভাজে এক হাত গলিয়ে নরম স্বরে বললো — ওহুম যেওনা, ভালো লাগছে।
,,, অর্পনা মাথা ঝাকিয়ে না করলো মানে সে থাকবেনা। পরপর সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে বললো — তোমার তো শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে,, তাইতো সরে যেতে চাচ্ছি।
,,, রাগি দৃষ্টিতে তাকালো দ্বীপ,, তীব্র শক্তি প্রয়োগ করে অর্পনাকে শক্ত বাধনে আবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো — হোক, তাতে তর কি? তকে বলেছি দূরে গিয়ে কষ্ট কমাতে? আমার কষ্ট করতে ভালো লাগছে,, চুপচাপ বসে বসে পাগলামি কর।
,,, দ্বীপের রাগি দৃষ্টিতে ঠোঁট উল্টে কান্না করে দিলো অর্পনা। দ্বীপের বুকে কিল মারতে মারতে হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠলো। সোজা হয়ে থাকতে না পেরে দ্বীপের কাধে মাথা হেলিয়ে দিলো,, ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো — আপনি আমায় বকেছেন,, আমি আপনাকে স্বামী বলে মানবো না,, তালাক দিন।
,,, এই অবস্থায় ও একই ডাইলগ আওড়াতে দেখে হালকা শব্দ করে হাসলো দ্বীপ,, অর্পনার গালে চুমু খেয়ে বললো — আচ্ছা আর বকবো না।
,,,অর্পনা দ্বীপের গলায় ঠোঁট চেপে রেখে বললো– তাহলে আদর করে দিন।
,,, করলাম তো।
,,, আরও!!
,,, আরও? আর কতোটা আদর লাগবে তোমার?
,,, অনেকটা!!
,,, দ্বীপ অর্পনার মুখটা তুলে চোখে মুখে অগণিত চুমু খেয়ে বললো — এবার হয়েছে?
,,, অর্পনা মাথা নাড়িয়ে বললো — ওহুম!! আরও,
,,, দ্বীপ আবারো চুমু খেতে খেতে বললো– এবার হবে?
,,, ওহুম। অনেকটা,, অনেক অনেক আরও অনেক।
,,, অর্পনার মুখটা দু’হাতে আকরে ধরে কপালে কপাল ঠেকালো দ্বীপ,, মেয়েটার শরীর ধীরে ধীরে ঘেমে যাচ্ছে। নিশ্চই জ্বর নেমে যাবে? তারপর ঘুমিয়ে যাবে অর্পনা৷ ঘুম থেকে উঠে আবার আগের মতো কঠোর হয়ে যাবে,, বাচ্চামি করবেনা, পাগলামি করবেনা, ঠোঁট উল্টাবেনা, এভাবে ঝাপটে ধরবেনা। ভেবেই তপ্ত শ্বাস ফেললো দ্বীপ, অপর পাশ থেকে শুনা গেলো হালকা বাচ্চামি ভরা স্বর– আদর ক,,
,,,, কথার মাঝেই অর্পনার ঠোট জোরা আগলে নিলো দ্বীপ। কোমল স্পর্শে ভরিয়ে তুললো নিজ অর্ধাঙ্গিনীর উষ্ঠধর। প্রশ্রয় স্বরুপ অর্পনা এক হাত দ্বীপের কাঁধে রেখে অন্য হাতে চুল আকরে ধরলো। অনেকটা সময় পর অর্পনার গলার খাঁজে মুখ ডুবালো দ্বীপ,, নাক টেনে লম্বা শ্বাস টানলো। উষ্ঠ ছোয়ালো কন্ঠ নালির প্রতিটি ভাজে ভাজে। অর্পনা চোখ বুঝে অনুভব করলো স্বামীর করা সুক্ষ আদর গুলো। ঔষধের প্রভাবে শরীর ঘেমে উঠলো,, হুস জ্ঞান হাড়িয়ে যতটুকু শক্ত ছিলো মেয়েটা, এখন জ্বর নেমে যাওয়ায় শরীরটা অসার হয়ে এলো। আবারও মাথা হেলিয়ে দিলো দ্বীপের ঘাড়ে,, বিষয়টা বুঝতে পেরে অর্পনাকে টেনে বুকে নিয়ে শুয়ে পরলো দ্বীপ । মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো– ঘুমাও জান,, ঘুম ভাঙলে সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে।
,,, অর্পনা মাথা ঝাকিয়ে না করলো, মানে হয়ে যাবেনা। পরপর উদাস কন্ঠে বললো — সব কষ্ট ঘুমালেই মিটে যায়না স্বামী,, কিছু কিছু যন্ত্রটা ঘড়িতে চলমান সেকেন্ডের কাটার চেয়েও দ্রুত গতিতে হৃদয় ক্ষত বিক্ষত করে দেয়।
,, দ্বীপ বুঝলো তার অর্ধাঙ্গিনী নিজের হুসে ফিরে আসছে,, সে অর্পনার জীবন বৃত্তান্তের অনেকটাই জানে। এতোটাই জানে যতটা অর্পনা নিজেও জানেনা। তবুও বউয়ের মনে চলমান কষ্ট টুকু আঁচ করতে চাইলো দ্বীপ,, উৎসুক কন্ঠে সুধালো — তোমার হৃদয়কে কতোখানি যন্ত্রণারা মিলে ক্ষত বিক্ষত করে আমার জান?
,,, কতটা যন্ত্রণা!! কতটা? সীমা নেই, অপরিসীম যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে আমার ছোট্ট বুকটায়। আমার মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানেন? আমার জীবনে যন্ত্রণারা নয় বরং এক সাগর যন্ত্রণার মাঝে আমার জীবন নামক তরীটা বৈঠা হীনা ভেসে যাচ্ছে। কখনো একুল কখোনো ওই কূল, তবে কোনো কূলেই ঠাই মিলেনি আমার। নিজের মায়ের কাছেও মিলেনি। শুনেছি, পৃথিবীতে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা গেলেও নাকি মা মেয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করা যায়না। অথচ আমার মাম্মা আমায় ভালো বাসেনা,, ফিরেও তাকায়না,, আমায় যখন সবাই মিলে মারলো, অপমান করলো মাম্মা কিছু বললো না। মাম্মা খুব সুখে আছে,, নতুন সংসারে তার তিনটে সন্তান,, তাদের কতো ভালোবাসে। পথ ঘাটে যখন ঘুরে বেড়াই দেখতে পাই মাম্মা তার ছেলে মেয়েকে নিয়ে ঘুরছে,, ফুচকা খাচ্ছে,, পার্কে যাচ্ছে, রেস্টুরেন্টে যাচ্ছে। মাম্মাও আমায় দেখে জানেন? তবুও দুটো কথা বলেনা। আমার খুব কষ্ট হয়,, আমিও তো তার সন্তান,, প্রথম সন্তান। আমায় কেনো ভালো বাসেনা? আমার জন্য কি একটুখানি অন্তর পুড়ে না তার? আমার তো পুড়ে,, মাকে ছাড়া ঘুম হয়না আমার। খুব ইচ্ছা করে মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে। কিন্তু পাইনা, আমার মা আসেনা। আমি বোধহয় খুব খারাপ সন্তান, খারাপ বউ, খারাপ মানুষ। আমি আগা গোড়া পুরোটাই খা
,, অর্পনার মুখটা বুকের সাথে চেপে ধরলো দ্বীপ,, শুনতে ইচ্ছে করছেনা। মেয়েটার কষ্ট দ্বীপের সহ্য হয়না। একটা মানুষকে ঘিরে কেনো এতোটা যন্ত্রনা থাকতে হয়? অর্পনার যন্ত্রণা গুলো তরতাজা,, যার কোনো নিরাময় নেই। দ্বীপ চাইলেও মেয়েটার কষ্ট গুলো মন থেকে মুছে দিতে পারবেনা। সেসব কথা গুলো বলতে পারবেনা যেসব অর্পনার অজানা। পারবেনা অর্পনার মাম্মাকে অর্পনার জীবনে এনে দিতে। পারবেনা অর্পনার মাম্মা পাপ্পাকে আবার এক করে দিতে। তবে সবটা না পারলেও কিছুটা যন্ত্রণা মুছে দিবো সে। সবার জীবন ডেস্ট্রয় করে হলেও তার ভেলোরার জীবনে কিছুটা সস্তি এনে দিবে। ভাবতে ভাবতে অর্পনার চুলে বিলি কাটতে লাগলো দ্বীপ, নরম স্বরে আওড়ালো —
,,,ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান,,
ঘুমাও আমার কোলে,,
ভালোবাসার নাও ভাসাবো
ভালোবাসি বলে,,
,,, এক ভঙ্গুর নারী তার নিরবিচ্ছিন্ন মন নিয়ে স্বামীর বক্ষ ভাঁজে পরে আছে। মেয়েটাকে নৃগুড় আলিঙ্গনে আগলে রেখেছে তার স্বামী নামক মানুষটা,, ক্ষনে ক্ষনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আবার কখনো চুমুতে ভরিয়ে দিচ্ছে মেয়েটার চুলের ভাজ। ভালোবাসা চারটে শব্দের সংমিশ্রণে তৈরি। কেউ ভালোবাসার জন্য মরে আবার কেউ মারে। কখনো কখনো কেউ হয় উন্মদ আবার কখনো সব হাড়িয়ে পাগল। শব্দটা ছোট্ট অথচ এর গভীরতা অসীম। যার তল খুজতে গিয়ে অনেকেই হাড়িয়ে যায় নীরবে নিবৃত্তে। যেমন করে চার বছর আগে হাড়িয়ে গিয়েছিলো এক ১৮ বছরের কিশোরী। ভালোবেসেছিলো এক লোহ মানবকে,, যার মন ভরা অহংকার ব্যাতিত কিছু ছিলো না।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪১
এক্সিডেন্টলি হলেও সোদিন সেই মানবের কারনেই অপবিত্র হয়েছিলো একটি পবিত্র সত্তা। সতিত্ব না হাড়ালেও ছিন্ন ভিন্ন হয়েছিলো একটা কোমল দেহ। চার বছর আগে সেই ঘটনার পর টানা এক বছর ট্রমায় ছিলো মেয়েটা। সারাক্ষণ নিজেকে গুটিয়ে রাখতো, বাহিরের দুনিয়ায় পা রাখা তো দূর সূর্যের আলো পর্যন্ত গায়ে পাখতো না। প্রথম ছয়টা মাস সে তার সবচেয়ে বিস্বস্ত বন্ধু, বাডি, জন্মদাতা পিতাকেও ভয় পেতো। কাছে গেলে পিছিয়ে যেতো। নিজ সন্তান যখন নিজেকে ভয় পায় তখন একটা বাবার মন কতোখানি পুড়ে তা বোধয় একটা বাবাই জানে। এই যন্ত্রণা ব্যাক্ষা করার নয়, সত্যি ই ব্যাক্ষা করার নয়।
