৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৯ (২)
রুপান্জলি
দ্বীপ চরম বিরক্ত,, কাজে মনোযোগ দিতে পারছেনা,, ফাইল ওপেন করলেই শুধু অর্পনার কন্দনরত মুখটা ভেসে উঠছে। সারাক্ষণ মনটা একই কথা আওড়াচ্ছে,, কেনো রাগ উঠলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারিসনা দ্বীপ? অর্পনা তো তর,, ও হাজারটা ভুল করলেও তর। এতোটা খারাপ ব্যাবহার কি আসলেই প্রাপ্পো ছিলো মেয়েটা? একটু বেশি বেশি হয়ে গেলো না? মনের কথায় দ্বীপ কিছুটা টললেও হুট করেই মস্তিষ্ক বলে উঠে “” তর নারীকে অন্যকেউ স্পর্শ করেছে আর তর নারী সেটা চুপচাপ সহ্য করেছে। তর নারী পরপুরুষের সাথে একই বাড়িতে থেকেছে,, আদ্রিয়ান ২৪ ঘন্টা দেখেছে তর নারীকে,,একপ্রকার দুই বছর সংসার করেছে দুজন।””
এরুপ কথা মাথায় আসতেই দিক বেদিক শুন্য হয়ে পরে দ্বীপ,, মাথায় তীব্র যন্ত্রণা হয়,, পাগল পাগল লাগে নিজেকে। যার ফল স্বরুপ কিছুটা দূরে চূর্ন বিচূর্ণ অবস্থায় পরে আছে দ্বীপের সেলফোন খানা। অফিস রুমে সজ্জিত কাচের তৈরি নানান আসবাব পত্রের ও একই হাল। এই কক্ষটায় এক প্রকার ঝড় বইছে সকাল থেকে,, বাড়িতেও এক ধাপ ভাঙচুর করে এসেছে দ্বীপ। যখনি অর্পনা আর আদ্রিয়ানের কথা মাথায় আসছে তখনি একটা একটা আসবাব ভেঙে রাগ মিটাচ্ছে। দ্বীপ একবার ভাঙা ফোনটার দিকে তাকালো পরপর কিছু দূরে পরে থাকা টেলিফোনের দিকে তাকালো,, এটাও কিছুক্ষণ আগে দ্বীপের রাগের শিকার হয়েছে। এই পর্যায়ে দ্বীপের তীব্র আফসোস হলো,, ফোনটা না ভাঙলে এতোক্ষনে গার্ডদের থেকে হলেও অর্পনার একটা খোজ নেওয়া যেতো। মেয়েটা কি আদেও ভার্সিটিতে গিয়েছে নাকি রুমে বসে বসে কাদছে? অর্পনা তো অসুস্থ,, নিজেকে আঘাত করবে নাতো? অর্পনা নিজেকে আঘাত করতে পারে এই কথাটা মাথায় আসতেই অনুভুতি শুন্য হয়ে পরলো দ্বীপ। একহাতে মুঠো করে ধরলো নিজের এলোমেলো চুলগুলো,, ঠোঁট ফুরে বেড়িয়ে এলো দুটো শব্দ — সিট, সিট, সিট!! এটা আমি কি করলাম? আমার অর্পন,, আমার জান।
,,,, বলতে বলতে বিচলিত পায়ে উঠে দাড়ালো,, নিজের উপর উঠা রাগ মিটাতে আবারও ভাঙা ফোনটা পা দিয়ে পিষে গুরো করে ক্যাবিনের ডোর ওপেন করতে যাবে তৎক্ষণাৎ হুরমুরিয়ে ভিতরে ঢুকলো বিহান। দ্বীপকে সামনে দেখে হুট করেই ঘুষি বসালো দ্বীপের চোয়াল বরাবর,, আকষ্মিক আক্রমণে দ্বীপ পিছিয়ে গেলো কিছুটা। বিহান দ্বীপের কলার ধরে টেনে দাতে দাত চেপে বললো– ব্লা*ডি এসহোল। তর ফোন কই? তকে যে সবাই কখন থেকে কল দিচ্ছে ধরছিস না কেনো? মরে গিয়েছিলি?
,,, অতর্কিত হামলায় রেগে গেলো দ্বীপ,, বিহানের বুকে ধাক্কা মেরে বললো — কি সমস্যা? গায়ে হাত দিচ্ছিস কেনো? দূর থেকে কথা বলতে পারিস না? এতোটা কাছে শুধু অর্পনা আসবে,, স্রেফ ও। ওকে?
,,, বিহান তাচ্ছিল্য হাসলো, দ্বীপের বুকে ফিরতি ধাক্কা মেরে বললো — তর অর্পনা বাচলে তো তর এতোটা কাছে আসবে,, ও তো মরতে,,
,,, বিহানের মুখ থেকে কথাটা বেরুনোর সাথে সাথে চোয়ালে পরপর দুটো ঘুষি পরলো,, কাচের গ্লাসে ছিটকে পরলো বিহান,, ঠোট কেটে রক্ত গড়ালো। দ্বীপ তেড়ে গিয়ে ফের মারতে নিলে বিহানের কথায় থেমে গেলো।
,,, অর্পনা জেনে গিয়েছে আরশাদ জামান তার বাবা না,, জানার পর থেকে অনবরত নোজ ব্ল্যাডিং হচ্ছে। তার উপর দিয়া বাড়ির মেইন রোডে ফ্লাই ওভারের উপরে সুস্মিতা কাইসারকে প্রকাশ্যে স্যুট করেছে সে। এরপর বাইক নিয়ে কোথায় গিয়েছে কেউ জানেনা,,
,,, দ্বীপ যেনো হুট করেই হিতাহিত জ্ঞান শুন্য হয়ে পরলো। এতোগুলো দিন যেই ভয়টা তাকে বরাবর দূর্বল করে দিতো আজ সেটাই হলো। আজই হতে হলো,, আজ দ্বীপ একটু রাগারাগি করেছে,, অর্পনা কষ্ট পেয়েছে,, আর আজি হতে হলো এটা? আর কোনো সময় ছিলো না? দ্বীপ রাগের তোপে নিজেই নিজের মাথায় ঘুষি বসালো। পরপর অর্পনার কথা মাথায় আসতেই আর এক মুহুর্ত ও দাড়ালো না দ্বীপ,, বিহানের হাত থেকে বিহানের ফোনটা নিয়ে এগুতে এগুতে আওড়ালো — প্রিপিয়ার দ্যা হেলিকপ্টার,, ইমেডিয়েটলি।
দিয়া বাড়ি থেকে মালিবাগের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার,, বাইকে পৌঁছাতে গেলে কম করে হলেও আধা ঘন্টার ব্যাপার তবে সেই আধা ঘন্টার পথ ১৫ মিনিটেরো কম সময়ে পারি দিয়েছে অর্পনা,, এসে থেমেছে সি আই ডি হেড কোয়ার্টার্স এর সামনে। নাক দিয়ে অনবরত রক্ত ঝরছে,, মাথা ঘুরছে মেয়েটার,, কপালের মাঝখানটা কেমন বিষাক্ত যন্ত্রণায় বুধ হয়ে আসছে আর বুকের বাম পাশের হৃদপিণ্ডটা যেনো কেউ খামচে ধরেছে। অর্পনার শ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে,, সে গেইটের সামনে এসে বাইক থামালো। এতোক্ষণে রক্ত ঝরে তার পরনের অফ হোয়াই শার্টের অনেকাংশ রক্তাক্ত হয়ে উঠছে,, বাহুতে বার বার নাক মোছার দরুন সেই জায়গাটা আরও রক্তাভ রং দারন করেছে। অর্পনাকে খুব ভালো করেই চিনেন এখানকার সিকোরিটি গার্ড,, ছোট থেকে দেখছে বলে কথা। মেয়েটার সাথে উনার কিছু কিছু মিষ্টি মুহুর্ত ও রয়েছে। যখনি আরশাদ স্যারের সাথে কোয়ার্টারে আসতো তখনি বাচ্চা মেয়েটা উনার কাছে এসে নানান উদ্ভট প্রশ্ন করে বিরক্ত করতো,, আর উনি বিরক্ত হয়ে ধমক দিতো। মেয়েটা কেনো যেনো ধমক শুনতে বেশ পছন্দ করতো,, শুধু ধমক শুনার খাতিরে প্রতিবার উনাকে জ্বালাতে আসতো। কিন্তু বড়ো হওয়ার পর মেয়েটাকে খুব একটা এদিকে দেখা যায়নি,, অর্পনার এহেন হাল দেখে কেপে উঠলো দাড়োয়ান,, ছুটে কাছে আসতেই অর্পনা বাইক থেকে নামলো,, মাথা টলছে তার,, শক্তি পাচ্ছেনা, হুট করেই গেইটের সামনে হাটু ভাজ করে বসে পরলো মেয়েটা। এক হাত ঠেকালো রাস্তায়। সেই হাতে নিজের শরীরের সকল ভার ছেড়ে দিয়ে ঘনঘন নিশ্বাস নিতে থাকলো। দাড়োয়ানকে বিচলিত হয়ে এগিয়ে আসতে দেখে অর্পনা আস্ফুট স্বরে আওড়ালো — আম, আমমার পাপ্পাকে একটু ডেকে দিবেন দা,দু, প্লিজ।
,,, তখনি গেইট খুলে হন্তদন্ত পায়ে বেড়িয়ে এলো আরশাদ জামান আর তার এসিস্ট্যান্ট তুহিন,, দ্বীপ মাত্রই কল দিয়ে জানালো সবটা। ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে জেনেছে অর্পনা নাকি সি আই ডি হেডকোয়ার্টার্সের দিকে আসছে,, মানে উনার কাছে। অর্পনা নিভু নিভু দৃষ্টিতে দেখলো তার পাপ্পাকে,, এই পাপ্পাটা তার না? তার নিজের না? অর্পনার চোখে ভাসলো কিছু সৃতি,, ছোট্ট অর্পনা গোসল করবেনা বলে ফ্লাটের এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে আর পাপ্পা তার পিছন পিছন ছুটছে। গোসল শেষে সে আর পাপ্পা একসাথে ছাদে কাপর মেলছে,, কাপর মেলতে মেলতে অর্পনা দুষ্টুমি করলে পাপ্পা তাকে কোলে তুলে নিয়ে দড়িতে ঝুলিয়ে দেবার ভয় দেখাচ্ছে। অর্পনা ভয় পেয়ে পাপ্পার গলা জড়িয়ে ধরে পাপ্পার কাছে পাপ্পার নামেই অভিযোগ করছে। ওইতো ছোট্ট অর্পনা এক্সারসাইজ করতে রাজি হচ্ছেনা দেখে পাপ্পা ধমকে ধামকে তাকে এক্সারসাইজ করতে বাধ্য করছে।
অর্পনা স্কুল যাবে তাই পাপ্পা অদক্ষ হাতে তার চুলে ঝুটি করে দিচ্ছে। অর্পনার স্কুল ছুটি হওয়ার পরেও পাপ্পা ওকে নিতে আসেনি বলে অর্পনা গাল ফুলিয়ে ক্লাসে বসে ছিলো। তক্ষুনি পাপ্পা এসে তার মান ভাঙাতে কান ধরে সরি বললো,, তারপরেও যখন অর্পনার মান ভাঙলো না তখন পাপ্পা তাকে এক ঝটকায় কাধে তুলে নিলো। এরপর স্কুল ক্যান্টিন থেকে আইসক্রিম,, চকলেট, চিপ্স আরও কতো রকম খাবার কিনে দিলো। অর্পনা তো সেসব দুহাতে ধরতেই পারছিলোনা,, ও ছোট না? ছোটরা কি অতো খাবার একসাথে নিতে পারে? অগত্যা পাপ্পার মাথার পিছনে আর অর্পনার পেটের কাছে যেই জায়গাটুকু ছিলো,, সেখানেই রেখে দিলো সব খাবার। চিপ্সটা খুলে রাখলো,, সেখান থেকে একটা একটা চিপ্স নিয়ে মুখে পুরছে আর পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে ক্লাসের সবচেয়ে কর্কশ ধ্বনির ম্যামের নামে নালিশ করছে। ম্যামটা খুব পাজি কিনা? অর্পনা একটু দুষ্টামি করলেই ব্যান্চের উপরে কান ধরে দাড় করিয়ে রাখে। আজ সে একটু ম্যামের সাদা শাড়িতে কলমের কালি লাগিয়ে দিয়েছিলো সে নিয়ে ম্যাম তাকে কতো বড়ো ধমক দিলো । এসব মানা যায়? ম্যাম কি জানেনা? অর্পনা কার মেয়ে? এখন যদি অর্পনার পাপ্পা ম্যামকে জেলে ঢুকিয়ে দেয়? ম্যাম কি ছাড়া পেতে পারবে? পারবে নাতো। হেলুসিনেশন করতে করতে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো অর্পনা,, হাসিটা বড্ড মিষ্টি লাগলো দেখতে। আরশাদ জামান ছুটে এসে মেয়ের সামনে হাটু গেড়ে বসে পরলেন। অর্পনার এই হাল দেখে কেপে উঠলেন তিনি,, মেয়েকে তাড়াহুড়ো করে বুকে জড়িয়ে নিতেই অর্পনা ঠোট নাড়িয়ে আওড়ালো — তুমি আমার ব্যাকবোন ছিলে পাপ্পা,, তুমি হীন অর্পনা, একটা ম্যারুদন্ড হীন প্রানী। তুমিও আমায় দয়া করলে? ভালোবাসলে না? আমার কেউ নেই? একজন ও না? আমি একটা শুন্য? বিরাট আকারের একটা শুন্য আমি?
,,, আরশাদ জামান মেয়ের কথার উত্তর দেবার ফুসরত পেলোনা,, দ্রুত গতিতে কোলে তুলে নিলেন মেয়েকে,, এগুতে লাগলেন পার্কিং লটের দিকে,, অর্পনা তখনো বিরবির করে যাচ্ছে। আরশাদ জামানের চোখ থেকে পানি গড়ালো,, ছুটতে ছুটতে মেয়ের কপালে গাড়ো চুম্বন করে বললো — মা, আমার মা তুই। নিজের মাকে কে দয়া করে বল? আমি ই তর বাবা,, আমি নিজে তকে জন্ম দিয়েছি। সুস্মিতা যা বলেছে সব মিথ্যা। তুই স্ট্রেস নিস না জান বাচ্চা,, তর কিছু হলে আমি কার জন্য বাচবো? বল। তুই ছাড়া তর পাপ্পার আর কে আছে?
,,, আরশাদ জামানের এসিস্টেন্ট তুহিন ততোক্ষণে পার্কিং এড়িয়া থেকে গাড়ি বের করে রোডে নেমে গিয়েছে,, আরশাদ জামান দ্রুত গতিতে গাড়ির বেক সিটে উঠে বসলো। অর্পনা যেনো বাবার স্পর্শ পেয়ে দূর্বল হয়ে উঠলো। এতোক্ষণ যেই মনের জোরে বাইক চালিয়ে এখানে এসেছিলো সেই মনের জোরটা কোথায় মিলিয়ে গেলো কে জানে? মুহুর্তেই খিচুনি উঠে গিয়েছে মেয়েটার,, দাতে দাতে খিলি লেগে হাত পা বেকে আসছে,, তুহিন দ্রুত গতিতে কার স্টার্ট করে পানির বোতলটা এগিয়ে দিলো। আরশাদ জামান সমানে মেয়ের হাত মালিস করে মা মা বলে ডেকে আহাজারি করছেন। এই একটা নারী,, এই একটা নারী শুরু থেকে উনার জীবনটা বরবাদ করে দিচ্ছে। উনার কি অপরাধ? বাবা হওয়ার ক্ষমতা নেই বলে কি উনি মহা পাপ করে ফেলেছেন? বাবা হতে তো স্পার্ম লাগেনা, বাবা হতে একটা মন লাগে। এইতো তার কোলে শুয়ে থাকা মেয়েটার বাবা তিনি,, এই মেয়েটার যন্ত্রণায় উনার যে বুক ফেটে যাচ্ছে,, ভিতরে থাকা আত্মাটা তরপাচ্ছে। অর্পনার আসল বাবার বুঝি এর থেকেও বেশি কষ্ট হতো? আরশাদ জামান অর্পনাকে যেভাবে মানুষ করেছে,, অর্পনার আসল বাবা বুঝি এর থেকেও ভালো করে মানুষ করতে পারতো? আরশাদ জামানের মতো এতেটা প্রশ্রয় দিতো কি? সকল আবদার মেনে নিতো? নাহ!! পারতো না,, আরশাদ জামানের চেয়ে বেশি তার প্রিন্সেসকে কেউ বালোবাসতে পারবে না,, কেউ না,, নো ওয়ান। আরশাদ জামানের আহাজারির মাঝেই অর্পনা একদম শান্ত হয়ে গেলো,, শরীরটা একদম কাঠের ন্যায় শক্ত আর দরদর করে গাম ছুটছে,, শীতল হয়ে আসছে দেহখানা,, শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ,, বক্ষস্থল উঠা নামা করছে না। তুহিন ড্রাইভ করতে করতে মিরর থেকে অর্পনাকেই দেখছিলো,, সে এবার বিচলিত কন্ঠে আওড়ালো — স্যার!! বিষয়টা সুবিধার লাগছে না। ওর বুকে চাপ প্রয়োগ করুন,, আই গেইজ হার্ট এটাক,,
,,, তুহিনের কথা ফুরোনোর আগেই শব্দ করে কেদে উঠলেন আরশাদ জামান। মেয়ের বুকে একটার পর একটা চাপ প্রয়োগ করে আওড়ালেন — মাগো!! তুই আমাকে এতো বড়ো শাস্তি দিসনা। পাপ্পা সরিতো,, খুব সরি,, আর কখনো আমি আমার মাকে বকবো না। অর্পনরে,, মা,, একটু নিশ্বাস নে,, তর পাপ্পা তকে ছাড়া মরেই যাবে।
,,, কিছু পথ এগুতেই তুহিন গাড়ি থামিয়ে দিলো,, চকিতে তাকালেন আরশাদ জামান। ঘরঘর শব্দ তুলে মাঝরাস্তার ধুলো উড়িয়ে হেলিকপ্টার ল্যান্ড করা হচ্ছে,, পাইলট মাউথ স্পিকারের সাহায্যে রাস্তায় চলাচল করা জানবাহন চালকদের শতর্ক বার্তা প্রদান করছে। মুহুর্তেই জ্যাম বেধে গেলো রাস্তার এপারে ওপারে। কোনো বার্তা ছাড়া হেলিকপ্টার ল্যান্ড হয়েছে তো, তাই। হেলিকপ্টারটি রাস্তার কনক্রিট ছোয়ার আগেই লাফিয়ে নামলো দ্বীপ ,, মুখোমুখি দাড়িয়ে থাকা গাড়িটি থেকে অর্পনাকে নিয়ে নেমে এলো আরশাদ জামান,, দ্বীপ এগিয়ে গিয়ে এক ঝটকায়ে কোলে তুলে নিলো অর্পনাকে। পরপর ছুটে গেলো হেলিকপ্টারের উদ্দেশ্য,, আরশাদ জামান এই প্রথম মেয়ের জামাই বড়োলোক হওয়ার সুবিধা নিলেন। আজ আর নিজের আত্মসম্মানের পরোয়া করলেন না তিনি। উনার মেয়েটা যে অসুস্থ,, এই সময় আত্মসম্মান দিয়ে কি করবেন তিনি? হেলিকপ্টার টেক অফ করতেই অর্পনার ঠোঁট ঠোটে দাবিয়ে দিলো দ্বীপ,, এক হাতে চাপতে লাগলো অর্পনার হৃদযন্ত্রস্থল। অক্সিজেন ঘাটতি লাঘোবে কিছু সময়ের মাঝেই লম্বা দম নিলো অর্পনা। পরপর ঘন ঘন নিঃশ্বাসে বুক উঠা নামা করতে লাগলো। দ্বীপের নজর আটকালো অর্পনার বাম গালটায় সেখানে পাঁচ আঙুলের দাগ স্পষ্ট। দাতে দাত চেপে চোখ বন্ধ করে নিলো সে,, সুস্মিতা কাইসারকে ছাড়বে না দ্বীপ,, উনার সন্তানদের এবার এতিম হওয়ার পালা। অর্পনার এখনো নোজ ব্ল্যাডিং হচ্ছে,, দ্বীপ ব্যাস্ত হাতে মুছে দিলো রক্তগুলো। মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরলো বুকের সাথে,, দ্বীপের বুকটা অনিয়ন্ত্রিত হাড়ে কাপছে,, বুকের একাংশে কিযে যন্ত্রণা হচ্ছে,, গলায় কি যেনো আটকে আছে,, এটা কি কান্না? দ্বীপের কি কান্না পাচ্ছে? অর্পনাকে হাড়ানোর ভয়ে বুকটা এভাবে কাপছে বুঝি?
আরশাদ জামান সমানে পানি ঘষছেন মেয়ের মাথায়। বার বার ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে নিতে আবারও থেমে গেলো অর্পনা,, দম আটকে এলো,, দ্বীপ আবারও অর্পনার উষ্ঠ যুগল দখল করে নিলো। বিহান পাইলটের উদ্দেশ্যে চিৎকার করলো — হোয়াট ডেম্ন ব্রো,, আর কতক্ষণ লাগবে?
,,, বিহানের কথায় আশ্চর্য হলো পাইলট,, বিহান খুব ভালে করেই জানে কতক্ষণ লাগবে তাও এমন প্রশ্ন কিভাবে করছে? এতোটা অধৈর্য হলে তো চলবে না। অর্পনা আবারও লম্বা দম নিলো,, মুখ সরিয়ে আনলো দ্বীপ,, কপালের মাঝখানটায় তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। দ্বীপ তর্জনী আঙুল দিয়ে কপাল ঘষে অর্পনার দিকে বিরক্তিকর চোখে তাকালো পরপর দু আঙুলে অসুস্থ অর্পনার চোয়াল চেপে হিসহিসালো — মরে দেখ খালি,, মর তুই,, তর মরা শরীর আমি কুকুর দিয়ে ছিড়ে খুরে খাওয়াবো। আমার সাথে চালবাজি না? আমাকে তর ছাগল মনে হয়? তর মা কার সাথে কি করলো,, কার সাথে থাকলো,, তর বাপে তকে জন্ম দিলো কিনা,, তাতে আমার কি? আমি কেন সাফার করবো? উত্তর দে,, আমি কেনো তকে এভাবে দেখবো? তুই জানিস না তুই আমার কে? তকে ছাড়া যে আমার নিশ্বাস আটকে আসে? জানার পরেও এসব সামান্য ব্যাপার নিয়ে আমাকে কেনো পোড়াবি? আমি আর পুড়তে রাজি না। তর কিছু হলে তর মাকে আমি ক্যাসিনোতে সেল করে দিবো,, দেখিস। তখন দেখবো কয়টা নিজের বাচ্চা জন্ম দিতে পারে তর মা। সি ইজ অ্যা বিচ,, স্রেফ অ্যা বিচ। ( দাতে দাত চেপে)
,,, সুস্মিতার ব্যাপারে এরুপ জঘন্য কথা শুনার পরেও আজ কষ্ট হলো না আরশাদের৷ এই মুহুর্তে তার নিজেরো ইচ্ছে করছে ঐ ঠকবাজ রমনিকে কেটে কুটি কুটি করে লবন মরিচ ছিটিয়ে দিতে। ঐ নারীকে ভালোবেসে একটা জীবনের কষ্ট ছাড়া কিছুই পেলেন না তিনি। এতো বছর পর কি দরকার ছিলো মেয়েটাকে এসব বলার? আরশাদ তো যায়নি ঐ মহিলার কাছে,, বলেনি নতুন করে অর্পনার দায়িত্ব নিতে। সে একাই তো মানুষ করছিলো নিজের মেয়েকে। তাহলে আজ কেনো সবটা এলোমেলো করে দিলো সুস্মিতা কাইসার? কি পেলো এটা করে? কি লাভ হলো তার?
,,, আবারও সাত বছর পর আই সি ইউ ক্যাবিনের সামনে দাড়িয়ে আছে দ্বীপ,, তার কোনো হেলদোল নেই,, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ক্যাবিনের দরজার মধ্যবর্তি স্থানে থাকা গ্লাসটার দিকে যা দ্বারা এক পাষান রমনিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রমনিকে অসংখ্য লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। দ্বীপ ভাগ্যের উপর তাচ্ছিল্য হাসলো,, দের ঘন্টায় অর্পনার হার্টে পরপর দুবার এটাক এসেছে,, শরীর ফুলে দ্বীগুন,, এই ফুলো শরীর, গাল মুখ কিযে সুন্দর ঠেকছে। ৪০ কেজির অর্পনা মোটা হয়না বলে দ্বীপ কতো কি খাওয়ালো,, তিনবেলা থেকে সারাবেলাই খাওয়ার উপর রাখলো। এমনো সময় গিয়েছে মেয়েটাকে মেরে ধরে খায়িয়েছে দ্বীপ,, ধমকা ধমকি তো খুবি কমন ছিলো। কই, তখন তো অর্পনা একটু মোটা হলো না,, এক চুল পরিমান ও ওজন বাড়লো না,, তাহলে আজ দের ঘন্টায় শরীরটা এতো ফুলে উঠেছে কেনো? দ্বীপকে বিনাশ করতে? কিন্তু কেনো? দ্বীপের কি অপরাধ? তার সাথে কেনো সবাই এমন করে? সাত বছর আগে পারুটাও এই হসপিটালে, অন্য ক্যাবিনে, এভাবেই পরেছিলো,, দ্বীপ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে,, শতো চেষ্টা করেও নিজের কাছে আটকে রাখতে পারলো না। অবাধ্য প্রেমিকাটা কিভাবে কিভাবে যেনো ছলাকলা করে পালিয়ে গেলো। আজ অর্পনাটাও একই পথের পথিক হচ্ছে। যদি একই পথের পথিক ই হবে তাহলে কেনো এসেছিলো দ্বীপের জীবনে? দ্বীপ তো বলেনি আসতে,, কেনো এলো? এসে আবার এতো নাটক করছে কেনো? দ্বীপকে সামলাতে এসেছিলো না এই মেয়ে? তাহলে আজ নিজের কাজ ভুলে এভাবে শুয়ে থাকবে কেনো? নিজে তো আস্তো এক শুন্য,, দ্বীপের জীবনে এসে তাকে আবারও শুন্য করার পায়তারা করছে। একই পরিক্ষা কতোবার দেওয়া যায়? দ্বীপ বুঝি ক্লান্ত হয়না? দ্বীপের খুব ক্লান্ত লাগছে,, সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দরজার পিঠে গা হেলিয়ে দিলো। আর ভালো লাগছেনা এসব যন্ত্রনা। দ্বীপের কেনো যেনো মনে হলো অর্পনা তার অভিযোগের বিপরীতে বলছে,,
,,, আবারও আফসোস করছেন? এভাবে আফসোস করেন বলেই তো আমি এখানে,, জানেন তো!!
নিজেকে ঠিক প্রমান করার চেয়ে অভিমান নিয়ে বিদায় নেওয়া ডেড় ভালো। কি দরকার অতো এক্সপ্লেইন করার? আপনি ঠিক আমি ই ভুল,, আমি খারাপ, আমি নষ্ট, আমি অপবিত্র, আমি শুন্য, আমি ব্যাথা, আমি যন্ত্রনা, আমি নিশ্ব। ব্যাস!!মেনে নিলাম। আর আফসোস করবেন না,, আমি আর আফসোসের কারন হবো না।
,,,দ্বীপের চোখ জ্বালা করে উঠলো,,এক হাত রাখলো বুকের বাম পাশে। হৃদয়টা আর কতো যন্ত্রণা ভোগ করবে? অর্পনাও নিশ্চিত বুকে এক আকাশ পরিমান অভিমান জমা করে রেখেছে? দ্বীপকে ভুল বুঝেছে কি? অর্পনা তো দ্বীপকে খুব ভালো করে চিনে,, সে তো দ্বীপের না বলা কথাগুলো ও চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে যায়। আজ কি বুঝতে পারেনি দ্বীপ ওসব রাগের মাথায় বলেছে? আজ কি অর্পনা অবুঝ ছিলো? দ্বীপকে একটু ও বুঝেনি? দ্বীপের গভীর ভাবনার মাঝে ওর কাধে হাত রাখলো কেউ, দ্বীপ দেখার প্রয়োজন মনে করলো না। তীব্র জেদ নিয়ে আওড়ালো —
,,,, আমি কোথাও যাবো না,, আমি কোনো ডক্টরের সাথে মিট করতে চাইনা। ওরা ভালো কিছু বলেনা আব্বু,, বরাবর আমার সর্নাশ নিয়ে হাজির হয়। ট্রাস্ট মি,, আমার ভেলোরার কিছু হয়নি,, ও জাস্ট আমার সাথে একটু অভিমান করেছে। আমাকে ভিতরে ঢুকার পারমিশন দিতে বলো,, আমি দুটো ধমক দিলেই ঠিক হয়ে যাবে ও।
,,, দ্বীপের এরুপ বাচ্চামু কথায় কি বলবেন ভেবে পেলেন না মাহিদ মির্জা। অর্পনাকে আই সি ইউ ক্যাবিনে লাইফ সাপোর্টে দেওয়ার পর থেকে দ্বীপ কেমন অবুঝ হয়ে গিয়েছে,, বার বার অর্পনার সাথে থাকার জন্য পাগলামি করছে,, উল্টো পাল্টা বকছে। ক্ষনে ক্ষনে মাথা যন্ত্রণায় মাথা চেপে ধরছে,, হসপিটালে এসেও ভাঙচুর করেছে কিছুক্ষণ। শাহিন মির্জা এগিয়ে এসে দ্বীপের অন্য কাদে হাত রাখলো,, মলিন কন্ঠে আওড়ালো– আব্বা !! আমি জানি অর্পনা ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু এমনি এমনি তো ঠিক হবে না তাইনা? আমাদের তো কিছু করতে হবে। ( শাহিন মির্জার এহেন কথায় ফিরে তাকালো দ্বীপ) তার আগে জানতে হবে অর্পনার কি হয়েছে,, এক্সেক্ট প্রবলেম আইডিন্টিফাই করে তারপর সোলেশন বের করতে হবে। চলো বাবা,, না গেলে সেটা জানবে কি করে?
,,, বলেই দ্বীপকে টানতে চাইলো,, কিন্তু দুভাইকে অবাক করে বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে উঠলো ছেলেটা। দরজার গ্লাস ছুয়ে পাষাণ রমনির দিকে চোখ রেখে আওড়ালো — ও এমন করছে কেনো আব্বু? ওর বাবা মা ওকে ঠকিয়েছে এতে আমার দোষ কোথায়? আমি ওকে বলিনি? ওর দুনিয়ায় কেউ থাকুক বা না থাকুক আমি আছি,, আমার থেকে আপন আর কে আছে ওর? এরপরেও এতো কাহিনি,, আ’ম টায়ার্ড আব্বু,, আর নিতে পারছিনা। আত্মহত্যা কেনো বৈধ হলো না? আমায় মেরে দিবে প্লিজ? আমার শত্রুদের খবর দেও,, দ্বীপ মির্জা আত্মসমর্পণ করতে চায়,, নয়তো আমার ক্রাইম হিস্ট্রি পুলিশের হাতে তুলে দাও,, খুব শীগ্রই ফাসি হোক আমার। আমি এবার মুক্তি চাই,, এই যন্ত্রণা আমায় বড্ড যন্ত্রণা দিচ্ছে।
,,, ডক্টর্স কনফারেন্স রুমে বসে আছে দ্বীপ,, তার একপাশে আরশাদ জামান,, অন্যপাশে মাহিদ মির্জা আর বিহান। পরিচিত সেই ভোতা যন্ত্রণায় প্রতিটি মন বিষাক্ত। সাত বছর আগেও এই কনফারেন্স রুমে বসে ছিলো তারা শুধু পরিবর্তন ছিলো ডক্টর আর রুগির। আজ আবারও বসতে হলো,, এই অনুভুতিটা কতোটা যন্ত্রণার? ওদের মুখোমুখি বসে আছে কার্ডিওলজিস্ট বিভাগের ডক্টর সাগর সাহ ,, কার্ডিয়াক সার্জন ডক্টর ইয়াসিন মাহমুদ আর হার্ট ফেইলিউর স্পেশালিস্ট অরিন্দম ঘোস। তাদের হাতে এক গাদা রিপোর্ট,,
ECG,, Echocardiogram,,MRI,, CT Scan,,Blood Test,,Angiogram আরও কয়েক ধরনের রিপোর্ট যার সবগুলোই অর্পনার। ডক্টর সাগর সাহ দ্বীপের দিকে নজর স্থির করে মুখ খানা বড্ড গম্ভীর করে প্রশ্ন করলেন — অর্পনা জামান আপনার স্ত্রী?
,,, দ্বীপ উত্তর করলো না,, একভাবে তাকিয়ে রইলো,, হয়তো কোনো ভয়ঙ্কর কথা শুনার জন্য অপেক্ষা করছে। আরশাদ জামান তাড়াহুড়ো করে বললো– হুম!! ও আমার মেয়ের জামাই আর ওটা আমার মেয়ে।
,,, ডক্টর এবার আরশাদ জামানের দিকে নজর তাক করলেন — তিনি প্রতিদিন ঔষধ খেতেন?
,,, হুম!!
,,, কি কি ঔষধ খেতেন কখনো চেক করেছেন?
,,, আরশাদ জামান শায় জানিয়ে বললেন — বছর খানিক আগে অবদি সব ঔষধ আমি নিজেই কিনে আনতাম কিন্তু এক বছর যাবত ওর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর হয়তো ও নিজে থেকেই কিনে নিতো। আ’ম নট শিউর বাট অর্পনা ঔষধ খেতো মাস্ট। ঔষধ না খেলে ও এক বেলাও ঠিক থাকতে পারেনা,
,,, বিহান কিছু কথা যোগ করলো — গত দুই, আড়াই মাস যাবত জোহান নিজ দায়িত্বে কিনে এনেছে সেসব,,তবে এর আগের আট মাসের কথা এক্সক্ট বলতে পারবো না। তখন ওর অসুস্থতা সম্পর্কে আমি কিংবা জোহান, কেউ জ্ঞাত ছিলাম না৷
,,, ওদের কথায় বোধহয় বিরক্ত হলেন প্রতিটি ডক্টর। ড.অরিন্দম ঘোষ বিরক্তির স্বরে বললেন — এটা এক বছরের ব্যাপার না মিষ্টার মির্জা। বলতে গেলে বছরের পর বছর মিসেস অর্পনা জামান অকারনে আনুমানিক Do**xorubicin,, Cyc***lophosphamide,, Pre***dnisolone Ana***bolic steroid,, Pseu***doephedrine এর মতো আরও অনেক ধরনের ঔষধ সেচ্ছায় গ্রহন করে এসেছে। এই প্রতিটি ঔষধ হার্ট ড্যামেজ করতে সক্ষম। আপনারা এটা খেয়াল করেননি কোনোদিন? এটাকে এক প্রকার স্লো পয়জন বলা চলে,, যা ধীরে ধীরে একটা অঙ্গকে শেষ করে দিয়ে শরীরটাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
,, ইয়াসিন মাহমুদ তপ্ত শ্বাস ফেলে বললেন– আই থিংক উনি একেবারে মরতে পারবেনা বিদায় ধীরে ধীরে আ*ত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। পরিবার হিসেবে আপনাদের এটা খেয়াল রাখা উচিৎ ছিলো,, যেহেতু উনি মারাত্মক হাড়ে মানসিক বিকারগস্ত। সেহেতু কখন কোন ঔষধটা খাচ্ছে,, আপনাদের পর্যবেক্ষণ করাটা বড্ড আবশ্যেক ছিলো।
,,, ডক্টরের এহেন কথায় শক্ত পোক্ত ঢোক গিললো দ্বীপ,, কথা বলার শক্তি পাচ্ছেনা যেনো। আরশাদ জামান বোকা বোকা চাহনিতে ডক্টরদের দিকে তাকিয়ে আছেন। মাহিদ মির্জা ভয়ে ভয়ে ছেলেটার দিকে তাকালেন। ছেলেটা না আগের বারের মতো স্ট্রোক করে বসে। বিহান বিরক্ত হলো,, তীব্র বিরক্ত। কোন দুঃখে সে এই শুন্য, নিশ্ব এক নারীকে দ্বীপের জীবনে আনতে গেলো? এখন অর্পনার কিছু হয়ে গেলে দ্বীপকে বাচাবে কি করে সে ? নাহ!! একই ঘটনার পূনরাবৃত্তি হতে দেওয়া অসম্ভব। বিহান চোখে মুখে কাঠন্যতা ফুটিয়ে ডক্টরদের উদ্দেশ্যে বললো — এখন এটা বলবেন না যে অর্পনা আর বাচবে না কিংবা বাঁচানোর রাস্তা নেই। যদি এমন কথা বলেন তাহলে আই সয়্যার,, হসপিটালটা ভেঙে গুড়িয়ে দিতে আমি দুবার ভাববো না। প্রতিবার যদি মৃত লাস নিয়েই ফিরতে হয় তাহলে এই হসপিটালের কি দরকার? আপনারাই বা ডক্টর হয়েছেন কেনো? মরে যান সব আর এই হসপিটাল ও ভেঙে গুরিয়ে যাক।
,,, বিহানের চোখে মুখে স্পষ্ট হিংস্রতা,, সাপের ন্যায় ফুসছে কেমন। দমে গেলেন ডক্টর তিনজন। তারা খুব ভালো করেই জানে,, ক্ষমতার চেয়েও ধাড়ালো হচ্ছে জোহান-বিহানের ব্রেইন আর স্পর্ধা। এরা চাইলে কৌশল করে রাজাকেও পথের ফকির বানাতে সক্ষম। সেখানে তাদের মতো ডক্টররা ছাড়া পাবেনা, এটা একশত ভাগ নিশ্চিৎ। ড. সাগর সাহ কিছুটা বিনয়ী কন্ঠে আওড়ালেন —
,,,, মাথা ঠান্ডা রাখুন, মিস্টার মির্জা। এটা মাথা গরম করার মুহুর্ত না। আপনারা কিংবা রুগি কেউ ই আমাদের সত্রু নয়,, প্লিজ ঠান্ডা মাথায় আমাদের শুনুন।
,,, দমে গেলো বিহান,, একবার দ্বীপের দিকে তাকালো। ছেলেটাকে এতো দূর্বল লাগছে কেনো? মরে টরে যাবে নাকি? ড.অরিন্দম ঘোষ বললেন– দীর্ঘদিন ধরে এসব ঔষধ সেবনের ফলে অর্পনা জামানের হার্ট বর্তমানে End-stage Heart Failure পজিশনে রয়েছে। আই মিন,, উনার হার্ট সম্পূর্ণ রুপে ড্যামেজ হয়ে পরেছে,,খুব শীগ্রই এর সিমটোম দেখা দিতো কিংবা সিমটোম দেখা দিয়েছে,, উনি বুঝেছেন কিন্তু আপনাদের বুঝতে দেয়নি। যেহেতু এই কাজটা তিনি সেচ্ছায় করে এসেছেন তাই কাউকে বুঝতে না দেওয়াটাই স্বাভাবিক। আজ এতো বড়ো ধাক্কা সামলাতে পারেনি বিদায় দের ঘন্টায় পরপর দুবার এটাক এসেছে। বর্তমানে উনার হেল্থ বেশ ক্রিটিকাল কন্ডিশনে রয়েছে। শরীর ফুলে উঠেছে,, হার্ট ঠিকঠাক ভাবে ব্লাড পাম্প করতে পারছে না। অনিয়ন্ত্রিত হাড়ে ব্লাড প্রেশার কমে যাচ্ছে,, যখন তখন কার্ডিয়াক এরেস্ট আসতে পারে,, ফুসফুসে পানি জমাটা অস্বাভাবিক কিছুই না। এই মুহুর্তে একটাই সমাধান,, সেটা হলো মিসেস অর্পনা জামানের হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে তাও ইমেডিয়েটলি। যা আমাদের বাংলাদেশে কোনো মতেই পসিবল না। আপনারা বন্ডে সাইন করে দিলে আমরা সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড সহ আরও অনেক দেশের সনামধন্য হসপিটাল গুলোতে রিপোর্ট পাঠিয়ে ভিসার জন্য এপ্লাই করবো,,
,,, কথা শেষ করার আগেই খেকিয়ে উঠলো দ্বীপ,, টেবিলের উপরে থাকা সকল ফাইল পত্র এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলে কর্কশ কন্ঠে আওড়ালো — এখনো বসে আছিস কেনো? তদের কেউ এতো পটর পটর করতে বলেছে? কোথায় সাইন করতে হবে বল,,
( দ্বীপের হিংস্রতায় কেপে উঠলো সেখানে থাকা প্রতিটি ব্যাক্তি। ডক্টর তিনজন ভীতু ভীতু দৃষ্টিতে তাকাতেই ফের চেচালো দ্বীপ) কি হলো বল!! আরে বলনারে বাপ,, বুঝতে পারছিস না আমি মরে যাচ্ছি? ওটা আমার প্রান,, যেটা প্রতিনিয়ত মৃত্যু যন্ত্রণায় তরপাচ্ছে। প্রান না থাকলে আমি বাচবো কি করে। ওফফ!! বলবি নাকি এখানেই লাস ফেলে দিবো,,
,,, বলতে বলতে রিভলবার বের করে ট্রিগার অন করতেই ভয়ে ককিয়ে উঠলো তিনজন। ইয়াসিন মাহমুদ কাপা কাপা কন্ঠে আওড়ালেন — এ, এখানে না। র,,রি,রিসেপশনে যান,, ওখানে ফাইল রেডি করা আছে। সাইন করে দিলেই আমরা এপ্লাই করা শুরু করে দিবো।
,, কথাটা কর্নকূহর হতেই গান নামালো দ্বীপ ,, কাউকে পরোয়া না করে হন্তদন্ত পায়ে বেড়িয়ে যেতে চাইলে কানে এলো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বাক্য —
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৯
,,, আপনার স্ত্রীর কান্ডিশন লাস্ট স্টেজে,, আর একবার হার্ট এটাক আসলে আমাদের হাতে আর কিছুই করার থাকবে না। এই মুহুর্তে ভিসার থেকেও অধিক প্রয়োজন আপনার স্ত্রীর হার্টের সাইজ অনুযায়ী সেইম সাইজের আরও একটা সুস্থ হার্ট। যা একমাত্র একজন সুস্থ ব্যাক্তি ই ডোনেট করতে পারবে। আমরা আমাদের ডিউটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো,, আপনি আপনার স্ত্রীর জন্য হার্ট ডোনারের ব্যাবস্থা করুন।
