Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬০

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬০

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬০
রুপান্জলি

মির্জাদের নিজস্ব ১১ টি কার্গো জাহাজ,, ২০ টি টাগবোট ও ৯ টি বাল্ক কার্গো ভেসেল রয়েছে ,, এগুলো দ্বারা ভারত হতে বালি, সিমেন্ট, স্টোন চিপস-পাথর,, কয়লা,, ক্লিংকার,, রডের কাঁচামাল,, কাঠ,, সিরামিক্স আরও নানান ধরনের সামগ্রী আমদানি করা হয়। মির্জাদের কনস্ট্রাকশনের বিজনেস হওয়ার দরুন বছরে বারো মাস-ই বুড়িগঙ্গার বুক চিড়ে এগিয়ে চলে প্রতিটি জাহাজ, বোট, ভেসেল। আজ ও তার ব্যাতিক্রম হলো না,, বুড়িগঙ্গার বুক চিড়ে নির্দিষ্ট গতিতে এগিয়ে চলছে বিশাল সাইজের একটি কার্গো জাহাজ,, যার সামনের দিকটা বিভিন্ন মালামালে ভর্তি। মাঝামাঝি স্থানে দাড়িয়ে আছে একটা মাঝারি সাইজের হেলিকপ্টার। তবে ভিতরের চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্যাপ্টেন ও নাবিকদের থাকার জায়গাটা একপ্রকার হসপিটাল বানিয়ে দেওয়া হয়েছে,, কোনায় কোনায় নানান ধরনের হেল্থ টেস্ট-এর মেশিন বসানো। বরাবরের ন্যায় জাহাজের কোনায় কোনায় রয়েছে কালো পোষাক ধারি গার্ড,, যাদের হাতে সোভা পাচ্ছে ১৭ -১৮ ইঞ্চি লাইসেন্স প্রোভ রিভলবার।

ডক্টর উপস্থিত রয়েছেন ৭ জন আর তাদের সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে দ্বীপ মির্জা,, পরনে ছাই রঙা শার্ট আর কালো রঙা পেন্ট,, হাতে ভেপ,, ক্ষনে ক্ষনে ঠোঁটে চাপছে আর নাক মুখ দিয়ে ধোয়া উড়াচ্ছে। তিক্ত হলেও সত্যি,, দ্বীপ মির্জাকে ধোয়া ছাড়ার সময় অসম্ভব সুন্দর লাগে,, শুধুই অসম্ভব না বরং সবচেয়ে সুন্দর লাগে এই সময়টাতে। ( ভেপ নেশা ছাড়ানোর কাজে ব্যাবহৃত হয়) এখানে অর্পনা জামান থাকলে হয়তো আরও একবার বলতে বাধ্য হতো “” এক নে*শাখোরের নে*শা করা দেখে নে*শা দ্রব্য পছন্দ না করা রমনী নে*শায় পরতে বাধ্য হয়েছে””। দ্বীপের চোখে মুখে ব্যাথার রেশ থাকা সত্বেও চেহারায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এক প্রবল নিষ্ঠুরতা যেখানে অন্য কারোর জন্য সামান্য পরিমান মায়ার ছিটাফোঁটা ও নেই। কে মরলো, কে বাচলো, কার জান গেলো,, তাতে তার কিছুই আসে যায় না। সে শুধু জানে তাকে বাচতে হলে অর্পনাকে প্রয়োজন আর অর্পনাকে বাচাতে হলে একটা হার্ট এর প্রয়োজন। এবার সেটা যেভাবেই হোক হাসিল করে ছাড়বে দ্বীপ,, নিজের প্রানকে রক্ষা করতে হাজারটা অন্যায়, পাপ সে নির্দ্বিধায় করে নিবে। এমনিতেও দ্বীপের পাস্ট রেকর্ড যে আহামরি ভালো,, তেমন তো নয়,, সে বরাবরই পাপি,, তার রক্তে রাজনীতি মিশে রয়েছে আর রাজনীতির অপর নাম পাপ।

সেই অর্থে তার রক্তেই পাপ মিশে রয়েছে। দ্বীপের থেকে কিছুটা দূরে জাহাজের শক্ত মেঝেতে পরে আছে মোট ৫৮ জন নর নারী। এর মধ্যে ম্যাক্সিমাম নারীর বয়স ২০-৩০ আর পুরুষের ২৫- ৩৫ এর মাঝামাঝি। এদেরকে রাত নয়টার কাছাকাছি মুহুর্তে সিপে তোলা হয়েছে,, তীব্র পাওয়ারের ঘুমের ইনজেকশন দেওয়ার ফলে প্রতিটি সদস্য ঘুমে কাবু। তারা কোথায় আছে,, কখন এসেছে,, তাদের সাথে ঠিক কি করা হচ্ছে সে বিষয়ে কোনো ধারনা নেই তাদের। এমনকি মিশন সাক্সেস হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ টের পাবে বলেও মনে হয়না। দ্বীপের পাশাপাশি দাড়িয়ে আছে বিহান, তার চোখে মুখে তীব্র বিরক্তি। ব্লাড টেস্ট করার পর ৪৫ জনের গ্রুপ রেসাল্ট এসেছে এ.বি-পজেটিভ,, ৪ জনার এ- নেগেটিভ,, দু জনার ও-পজেটিভ সর্বশেষ ৭ জনার ভাগ্যক্রমে ও- নেগেটিভ এসেছে যেটা অর্পনার ব্লাড গ্রুপের সাথে মিলে। ও- নেগেটিভ এমন একটা ব্লাড গ্রুপ যেটার প্রেরক এবং গ্রহনকারি দুজনের ব্লাড গ্রুপ ই সেইম হতে হয় নয়তো গ্রহনকারী মৃত্যু আবশ্যাক।সাত জনের মধ্যে চারজন ছেলে আর তিনজন মেয়ে। ডক্টর রা একে একে সাত জনার ব্লাড সেম্পল নিয়ে ব্লাড টিস্যু ও অ্যান্টিবডি টেস্ট,, ইকোকার্ডিওগ্রাম,,ইসিজি,, কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন,, ফুসফুস পরীক্ষা,, ইনফেকশন স্ক্রিনিং,, সিটি স্কেন ও এম আর আই করে যাচ্ছেন।

ফলাফল আসতে আরও ঘন্টা খানিক সময় লাগবে। এমনিতেই অর্পনার কান্ডিশন লো পজিশনে,, কখন কি হয়ে যায় বলা যাচ্ছেনা,, এই মুহুর্তে যতো দ্রুত অর্পনার হার্টের সাথে মানানসই একটা হার্ট পাওয়া যায় ততোই মঙ্গল। বিহান খুব ভালো করেই জানে বাংলাদেশে সৎ উপায়ে একটা হার্টের ব্যাবস্থা করা আর মরুভূমিতে বর্ষার কামনা করা একই ব্যাপার। যেখানে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের মতো প্রয়োজনীয় একটি চিকিৎসা বাংলাদেশে এভাইলেবল না বরং হয়না বললেই চলে সেখানে বিভিন্ন হসপিটাল কিংবা সংস্থায় হার্ট পাওয়া অসম্ভব। আর ডোনোটিং প্রক্রিয়া বাংলাদেশের সাথে এক্সিট করেনা,, যেখানে মানুষ আপন মানুষ হয়ে আপন মানুষের ভালো সহ্য করতে পারেনা সেখানে একজন অচেনা মানুষের জন্য নিজের হার্ট কে ডোনেট করবে? কেউ ই করবে না যার ফল স্বরুপ অসৎ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে দ্বীপ। সন্ধা হতে লোক লাগিয়ে নির্জন পথে ঘাটে,, গ্রাম্য অঞ্চলে অর্পনার বয়স ও ওজনের কাছাকাছি যাকে পেয়েছে তাকেই তুলে আনা হয়েছে। আর সবটাই করা হয়েছে সতর্কতার সহিত। এটা তাদের পেশা নয় আর না এদেরকে আটকে দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাদের। ভাগ্যক্রমে একজনার হার্ট ও যদি অর্পনার হার্টের সাথে মিলে যায় তাহলে শুধু তাকেই হত্যা করা হবে তারপর তার বুক চিড়ে হার্ট বের করে OCS পিসার্ভেটিব সুলেশনের সাহায্যে সংরক্ষন করা হবে। ভালো মতো পিসার্ভেটিবে সংরক্ষন করা হলে একটি হার্ট ৪-৬ ঘন্টা বেচে থাকে। ভিসা কনফার্ম, এয়্যার এম্বুলেন্স রেডি, শুধু একটা হার্ট পাওয়া গেলে সিঙ্গাপুর যেতে চার ঘন্টার মতো লাগবে তারপর বাকিটা আল্লাহ এর হাতে।

,, হার্ট পেয়ে যাবার পর বাকিদের আবারও ছেড়ে আসা হবে কোনো নির্জন পথে। হয়তো গন্তব্য স্থলে পৌছে দেওয়া হবে না কিন্তু কোনো এক সেইফ জোনে ছেড়ে আসবে বিহান,, যেনো যে যার গন্তব্য খুজে নিতে পারে। দীর্ঘ এক ঘন্টা চার মিনিট ঠায় দাড়িয়ে রইলো বিহান,, দ্বীপ তখনো ঠোঁটে ভেপ চেপে ধোয়া উড়াচ্ছে যেনো ধোয়ার সাথে উড়িয়ে দিতে চাচ্ছে বুকে জমে থাকা সকল কষ্ট,, ব্যাথা,, যন্ত্রণা।
,,, সাতজনার সবরকম টেস্ট পর্যবেক্ষণ করার পর ডক্টর হতাশ চোখে দ্বীপ আর বিহানের দিকে তাকালো। বিহান চট করেই ধরে নিলো ব্যাপারটা তবে দ্বীপ মানতে চাইলো না। উঠে দাড়িয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো ডক্টরদের এক্সপেরিমেন্ট টেবিলের সামনে,, ভেপে সর্বোচ্চ টান বসিয়ে সামনের ডক্টরের চোখে মুখে ধোয়া ছাড়তেই কেশে উঠলো মধ্য বয়সী ডক্টর। তাদেরকেও লোক দিয়ে তুলে এনেছে দ্বীপ মির্জা,, ক্ষমতার জোর খাটিয়ে দূর্বল জায়গায় পদক্ষেপ ফেলেছেন যার ফল স্বরুপ তাদেরকে শামিল হতে হয়েছে এই পাপের খেলায়। যদিও প্রকৃত পক্ষে দ্বীপ মির্জা নিজের জায়গায় ঠিক রয়েছেন। নিজের ভালোবাসাকে বাচাতে কতোজন ই বা এই রিস্ক নিতে পারে? সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো তার হাতে থাকা রিপোর্ট গুলোর মধ্যে একটা রিপোর্ট দ্বীপ মির্জার নামেও রয়েছে। সেই সাত নরনারীর ব্লাড সেম্পল নেওয়ার আগে দ্বীপ মির্জা নিজের ব্লাড সেম্পল দিয়েছেন। যে পুরুষ নিজের স্ত্রীকে বাচাতে নিজের হার্ট দান করতে দুবার ভাবে না সে নিঃসন্দেহে একজন ভালো স্বামী,, এমন স্বামী পাওয়াটাও ভাগ্য। ডক্টরটি কাশতে কাশতে নিজেকে শান্ত করলো। দ্বীপ ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে সুধালো — রেসাল্ট কি এসেছে? কারোর সাথে হার্ট না মিললে আমি তর হার্ট খুলে নিতে দুবার ভাববো না।

,,, ডক্টরটি ভয়ার্ত ঢোক গিলে বললো– কিন্তু আমার ব্লাড গ্রুপ তো এ.ভি-পজেটিভ। আমার হার্ট দিয়ে আপনার কোনো লাভ হবে না মিস্টার মির্জা বরং এতে আপনার টাইম ওয়েস্ট হবে।
,,, দ্বীপের হিংস্র দৃষ্টি এবার বাকিদের দিকে পৌছালো। সাথে সাথে বাকি ছয়জন ভয়ার্ত ঢোক গিলে বললো — আমাদের কারোর রক্তের গ্রুপ ও- নেগেটিভ না। বিশ্বাস না হলো আপনি চেক করে দেখুন।
,,, দ্বীপ কিছু বলার আগেই বিহান এগিয়ে এসে বললো — কোনো দরকার নেই,, আপনাদের হুল হিস্ট্রি আমাদের আয়ত্তে। এবার রেজাল্ট বলুন কারোর সাথে মিলেনি?
,,, মধ্যবয়সি ডক্টর দুদিকে মাথা নাড়িয়ে একটার পর একটা রিপোর্ট দেখিয়ে বললো — এদের মধ্যে তিনটে ছেলেই নে*শাখোর,, তাদের হার্ট এমনিতেই অর্ধেক নষ্ট হয়ে গিয়েছে,, এগুলো সাইজে মিললেও ম্যামের শরীরে স্থাপন করা সম্ভব না। আর যেই ছেলেটা বাকি থাকে তার ব্লাডে এইচ আই বি পজেটিভ সুতরাং তার সর্বশরীর ই দূষিত। মেয়ে তিনটার হার্ট সুস্থ তবে ম্যামের হার্টের থেকে ছোট ,, হার্ট কিছুটা বড়ো হলেও স্থাপন করা সম্ভব হতো কিন্তু ছোট হার্ট ভালো মতো ব্লাড পাম্প করতে পারবেনা,, হার্ট স্থাপন করলেই কার্ডিয়াক এরেস্ট আসবে। তখন দ্বিতীয়বার হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট সম্ভব না।

,,, ডক্টরের বলা প্রতিটি বচনে দ্বীপের চোখের হিংস্রতা বারলো ফলস্বরূপ ধূসর রঙা বিড়াল চোখ জোড়ার রং বদলে প্রতিটি শিরা লালাভ রং ধারন করেছে। হাতের মুঠো হয়েছে শক্ত,, প্রবল গতিতে ডক্টরের মুখ বরাবর ঘুষি বসাতে নিতেই আটকে দিলো বিহান,, ঠেলেঠুলে দূরে সরাতে নিতেই বিহানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো দ্বীপ। ডক্টরের কলার চেপে ধরে টেনে তুললো,, গলায় বন্ধুকের নল ঠেকিয়ে দাতে দাত চাপলো — বাস্টার্ড!! তর জিহবা আমি টেনে ছিড়ে ফেলবো। সাহস কি করে হয় আমাকে নিরাস করার? এখন আমি হার্ট কোথায় পাবো? ওফফ!! একজনার হার্ট ও কার্যকর হলো না? আমারটা? আমারটা নিতে পারবি না? কি হলো কথা বল,, আমারটা নেওয়া যাবে না?
,, গলায় বন্দুকের নল দেখে থরথর করে কেপে উঠলো লোকটা,, দ্বীপের চোখে চোখ পরতেই আত্মা ছলকে উঠলো তীব্র হাড়ে। দ্বীপকে এখন পশুর থেকেও নির্দয় ঠেকছে তার কাছে,, শক্ত চোয়ালটা কেমন কটমট করছে,, ফর্সা মুখটা লাল,, চোখে অগ্নি, সাপের মতো ফোসফোস করছে কেমন। ডক্টর কাপা কাপা কন্ঠে আওড়ালো– স, স্যার!! আ, আ,আপনার ক্ষেত্রেও তাই,, আ,আপনার হার্ট অসুস্থ, সাইজ ম্যামের হার্টের থেকেও অনেকটা বড়ো,, এনটিবডি ম্যাচ করছে না,, সেই সাথে আপনার হার্ট ম্যামের ব্লাড পাম্প করতে অক্ষম। এই মুহুর্তে আমাদের একটা সুস্থ হার্ট প্রয়োজন,, যার ব্লাড গ্রুপ ও- নেগেটিভ হবে,, টিস্যু ও এটিবডি ম্যাচ করতে হবে, এবং মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট আমাদের এমন একজন ব্যাক্তির হার্ট প্রয়োজন যে কখনোই স্মোক করা তো দূর ছুয়েও দেখেনি।

,,, ডক্টরের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে দ্বীপ চট করেই বিহানের দিকে তাকালো,, দ্বীপ আর বিহানের ব্লাড গ্রুপ সেইম,, অর্পনারো তাই। বিহান দ্বীপের দিকেই তাকিয়ে ছিলো,, মুহুর্তেই তার ঠোঁটে কেমন অদ্ভুত এক হাসির রেখা ধরা দিলো,, যেনো দ্বীপের চাহনি দেখেই মনোভাবটা ঠাওর করতে পেরেছে সে। বিহান খিন হেসে দ্বীপের দিক থেকে নজর সরিয়ে ডক্টরের দিকে হাত এগিয়ে দিয়ে নরম কন্ঠে বললো — আমার ব্লাড ও- নেগেটিভ,, আমি কখনোই স্মোক করিনি,, আশা করি আমার হার্ট সম্পূর্ণ সুস্থ এবং পরিপক্ক৷ বাকি টেস্ট গুলো করে নিন।

,,, ডক্টর দ্বিধান্মিত দৃষ্টিতে একবার দ্বীপের দিকে তাকালো,, কঠিন লোকটা কেমন বোকার মতো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ডক্টর সময় নষ্ট করলো না,, বিহানকে বেডে শুয়ার আদেশ দিতেই বিহান চুপচাপ শুয়ে পরলল।একের পর এক প্রয়োজনীয় টেস্ট সম্পন্ন হওয়ার পর বিহান ও অর্পনার ব্লাড স্যাম্পল এক্সপেরিমেন্ট টেবিলে রাখা হলো। ডক্টরদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে,, অর্পনার শরীর বিহানের হার্টকে গ্রহণ করতে পারবে কি না তা নিশ্চিত করা। ব্লাড গ্রুপ, ক্রসম্যাচ ও টিস্যু কম্প্যাটিবিলিটি রিপোর্টের উপরই নির্ভর করবে সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত। অর্পনা আর বিহানের বয়স ও দেহের গঠনের বেশ পার্থক্য রয়েছে,, ডক্টর ভেবেছিলো অর্পনার ব্লাড বিহানের হার্ট গ্রহণ করবে না,, অপরিচিত ভেবে এটাক করবে তবে তার কিছুই হলো না। ডক্টরকে অবাক করে দিয়ে অর্পনার ব্লাড গ্রহণ করলো বিহান। রিপোর্টের রেসাল্ট দেওয়ার বেলায় ডক্টরদের মুখোয়বে কেমন মলিনতা ছেয়ে গেলো। এবারও তিক্ষ্ন বুদ্ধি সম্পন্ন বিহান বিষয়টা ধরে ফেললো। দ্বীপ তখনো অভিব্যাক্তি শুন্য হয়ে তাকিয়ে আছে,, চোখে মুখের সেই নিষ্টুরতা এখন ব্যাথার রুপ নিয়েছে। অর্পনা তার কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ বিহান ততোটা না হলেও অর্পনার পরের স্থানটা বোধয় বিহানেরি। নিজের প্রান বাচাতে কলিজার একাংশের আত্মবলিদান বড্ড পোড়াবে দ্বীপকে,, সে এটা মানতেই পারবে না। দ্বীপ বিহানের হাত টেনে ধরে শক্ত কন্ঠে বললো — না!! কোনো রেসাল্ট জানার প্রয়োজন নেই,, আমরা আরও মানুষ তুলে আনবো,, কারোর না কারোর সাথে তো অর্পনার ব্লাড গ্রুপ ম্যাচ করবেই।

,,, বিহান ক্ষিন হাসলো,, ছেলেটার এসব উদ্ভট আচরন ভালো লাগছে না দ্বীপের,, কষে দুটো চর বসাতে ইচ্ছা করছে। বিহান বুঝতে পারছে দ্বীপ রেগে যাচ্ছে কিন্তু সেসবে পাত্তা দিলো না বিহান,, বরং দ্বীপের চোখে চোখ রেখে শক্ত কন্ঠে সুধালো — অর্পনাকে ছাড়া বাচতে পারবি?
,,, দ্বীপের বুক ভেঙে এলো,, কথারা কন্ঠে দলা পাকিয়ে আসছে,, সে কোনো মতেই অর্পনাকে ছাড়া বাচতে পারবেনা আবার বিহানকেও হাড়াতে পারবেনা। তার কেনো যেনো মনে হচ্ছে বিহানের হার্ট অর্পনার হার্টের সাথে ম্যাচ করবে আর বিহানকে সে হাড়িয়ে ফেলবে। কিন্তু এটা তো হতে দেওয়া যায় না,, সেই জন্মের পর থেকে দুজন একসাথে থেকেছে,, একসাথে খেয়েছে, কথা বলতে শিখেছে,, হাটতে শিখেছে, দৌড়াতে শিখেছে,, একে অপরের ছায়া হয়ে বেচে ছিলো সারাজীবন। বাকিটা জীবন ও তো একসাথেই বাচার কথা ছিলো তাহলে এখন নিজের সার্থের জন্য বিহানের বলিদান কিভাবে মানবে দ্বীপ? শক্ত পোক্ত ছেলেটা ভাইয়ের হাত আরও নিবির ভাবে আকরে ধরে কেমন ভাঙা কন্ঠে আওড়ালো — তুই ছাড়া আমি নিঃস্ব বিহান।

,,, বিহান দ্বীপের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিলো,, চোখে মুখে কাঠিন্যতা প্রকাশ করে বললো– অনুভুতির উন্মুক্ত প্রকাশ তর সাথে মানায়না জোহান,, অর্পনার কথা ভাব। অর্পনাকে ছাড়া তুই বাচতে পারবি না। আর তর কিছু হয়ে গেলে আমি বেচে থেকেও মরার মতো থাকবো। তকে ছাড়া গতো ৬ টা বছর আমি মরার মতোই বেচে ছিলাম। এখন আর সম্ভব না,, জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করেছিস,, এবার তর একটা সুন্দর সংসার হোক।
,,, বিহানের এই নিঃসার্থ টান দ্বীপকে ভিতর থেকে আরও ভেঙে দিলো,, মনের সাথে সাথে শরীরটাও কেমন অবস হয়ে আসছে,, হাত ফসকে রিভলবারটা নিচে পরে গেলো। একদিকে অর্পনাকে হাড়ানোর ভয়,, অন্যদিকে বিহান। বিহান ও তো একা নয়,, তার একটা সংসার আছে,, একটা মেধা আছে আর তাদের অনাগত বাচ্চা। বাচ্চার কথা মাথায় আসতেই দ্বীপের শরীরের অসার ভাবটা কেমন মুহুর্তেই মিলিয়ে গেলো,, শরীর জুড়ে চললো উত্তপ্ত রাগ। সে রাগের বসে বিধানের কলার টেনে ধরলো,, দাতে দাত চেপে বললো — কাহিনি করিস? তুই হার্ট দিলে আমার বোনের কি হবে? আমার ভাতিজার কি হবে?

,,, ভাতিজা? মেধার তো মোটে দুই- আড়াই মাস চলে। এখনিতো জানার কথা না মেধার পেটে কি বাবু রয়েছে। তবে দ্বীপ বললো যে? বিহানের বুকটা কেমন মুচর দিয়ে উঠলো। মানস্পটে ভাসলো তার নাজুক মেধা রানীর মুখ খানা,, একটা অনাগত বাচ্চার খিল খিল হাসির শব্দ,, সে হাসছে আর বাব্বা বাব্বা বলে ডাকছে। পরক্ষণেই অর্পনার মুখটা ভেসে উঠলো,, যাকে সে বোন মেনেছিলো। মেয়েটা তো নিশ্ব,, কেউ নেই ওর। বিহান যদি মেয়েটার সত্যিকার ভাই হতো? তাহলে বোনের এমন অবস্থায় স্ত্রী সন্তানের চিন্তা করতে পারতো? নাহ!! একদমি না। ভাইয়ের কাধে ভাইয়ের লাশ মানা যায় কিন্তু ভাইয়ের কাধে বোনের লাস। এর থেকে যন্ত্রণার আর কিছু হতে পারেনা। অর্পনার লাস কাধে নিয়ে গোরস্থানে পৌঁছাতে বড্ড কষ্ট হবে বিহানের। বাচ্চা আর মেধার কথা ভেবে চোখ জ্বালা করে উঠলেও অর্পনার কথা ভেবে স্থির হলো বিহান। লম্বা লম্বা কয়েকটা শ্বাস ফেলে দ্বীপের উদ্দেশ্যে বললো– তুই আছিস তো,, আমার বাচ্চাটাকে নিজের বাচ্চার মতো লালন পালন করতে পারবি না? আমার মেধা রানিকে একটু আগলে রাখিস। মেয়েটা বেশ চাপা, মন খুলে কিছুই চাইতে পারেনা, তুই তো চিনিস ই ওকে,, তুই আর অর্পনা মিলে একটু সামলে দিস। ওকে আপাতত আমার কথা বলিস না,, আমাদের বাচ্চাটা পৃথিবীতে আসার পর বলিস নয়তো ও বাচবে না। বাচ্চাটা হয়ে গেলে বাচ্চার মুখ দেখে হলেও পাগলামি করা বাদ দিবে,, বাচ্চার জন্য বেচে থাকবে।

,,, দ্বীপের চোখে মুখের রাগ আরও বাড়লো,, রাগ সামলাতে না পেরে বিহানের চোয়াল বরাবর ঘুষি বসালো। ছিটকে দূরে সরে গেলো বিহান তবে একই সাস্থের অধিকারি হওয়ায় টললো না। দ্বীপ তেড়ে গিয়ে আবারও বিহানের শার্টের কলার টেনে ধরলো,, একটার পর একটা আঘাতে জর্জরিত করে দিলো বিহানের মুখ, বুক, শরীর খানা। বিহান চুপচাপ মেনে নিলো,, ছোট থেকেই তো হয়ে আসছে এসব। বিহান যতোবার দ্বীপের অবাধ্য হয়েছে ততোবার দ্বীপের করা আঘাতের শিকার হয়েছে সে। বিহানকে চুপচাপ মার খেতে দেখে আরও হিংস্র হয়ে উঠলো দ্বীপ,, বিহানের বুক বরাবর লাত্থি মেরে ফুসতে ফুসতে চেচালো — দয়া দেখাস আমাকে? তর দয়ার ধার ধারি আমি? কু*ত্তার বাচ্চা!! এমনি ই মর তুই,, কারোর দয়া চাইনা আমার,, আমি মেনে নিয়েছি আমার ভাগ্যে সুখ নেই আর না ভালোবাসা, সংসার আছে। আমার সুখ আসে ক্ষনিকের জন্য,, যা আমায় তীব হাড়ে বেকাবু করে দিয়ে পালিয়ে যায়।

,,,, বলতে বলতে নাবিক এড়িয়া থেকে বেড়িয়ে গেলো দ্বীপ,, দাড়িয়ে থাকা গার্ডগুলো মাথা নামিয়ে কুর্নিশ জানালো। ডক্টর সাতজনের চোখে মুখে ব্যাথার ছাপ স্পষ্ট। তারা কেমন সম্পর্কের গোলক ধাধায় এসে আটকা পরে গেলো। একজন স্বামী তার স্ত্রীর জন্য নিজের হার্ট দিতে প্রস্তুত ,, এক ভাই তার ভাইয়ের জন্য ভাইয়ের বউকে হার্ট দিতে দুবার ভাবছে না। আর অন্য ভাই ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেনা বলে ভাইকে মেরে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে গেলো। এই ভালোবাসাগুলো অন্যরকম, শতো খুজলেও বোধহয় পাওয়া দুষ্কর।
,,, দ্বীপের থেকে সর্বশেষ লাত্থি খেয়ে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পরেছিলো বিহান,, সে এবার মুখ তুলে চাইলো,, দুহাতে ভর দিয়ে উঠে দাড়ালো। ঠোঁট, কপাল বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে,, সে হাত দিয়ে ঠোটের রক্ত টুকু মুছতে নিতেই পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠলো। বিহান অনিহা নিয়ে ফোনটা তুললো,, অন্য কেউ হলে কল ধরবে তবে বেধা হলে ধরবে না। শেষ সময়ে এসে মেয়েটার কন্ঠ শুনলে দূর্বল হয়ে পরবে সে।ফোনটা সামনে আটনেই এভার কেয়ার হসপিটাল দেখে ভ্রু কুচকে নিলো বিহান। আগ্রহ ভরে ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো রিসেপশনিস্ট এর উচ্ছাসিত স্বর।

,,,, স্যার!! হার্ট পাওয়া গিয়েছে। সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটাল থেকে কল এসেছে,, সদ্য এক্সিডেন্টকৃত এক রমনির ব্লাড গ্রুপ, টিস্যু/ইমিউন,, ক্রসম্যাচ টেস্ট,, হার্টের সাইজ,, হার্টের কার্যক্ষমতা সবটাই মিসেস মির্জার সাথে পারফ্যাক্ট। রুগি এখনো মারা যায়নি তবে আশঙ্কা করা যায় উনি বেশিক্ষণ বাচবেন না। রুগির পরিবার মিসেস মির্জার শরীরের অবস্থা জেনে হার্ট ডোনেট করতে রাজি হয়েছেন। আপনারা যতো দ্রুত সম্ভব চলে আসুন,, আমরা মিসেস মির্জাকে নেওয়ার জন্য রেডি করছি।

,,, আজকের আকাশটা বেশ পরিষ্কার,, সাদা ফকফকা চাদ উঠেছে আকাশে,, চাদের পাশাপাশি বসেছে তাড়ার মেলা। নাবিক এড়িয়া থেকে বাহিরে বেরুতেই বাতাসের ঝাপ্টা এসে দ্বীপের শরীর রাঙিয়ে দিলো। অগোছালো চুল গুলো দোল খেলো অবলিলায়,, পরনের ছাই রঙা শার্টে টা ধপধপ শব্দ তুলে ছড়িয়ে পরলো এদিক ওদিক,, সবসময়কার মতো শার্টের তিনটে বোতাম খোলা থাকায় প্রশস্ত বুকটা দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে। আজকের এই বাতাশ টুকু দ্বীপের শরীর ছুতে পারলেও মন ছুতে পারলো না। দ্বীপ পায়ে পায়ে এগিয়ে জাহাজের তলদেশে ঘূর্নায়মান পাখার কাছে এসে দাড়ালো। সিলভারের তৈরি রেলিঙে হাত রেখে পানির দিকে তাকাতেই দেখলো একটা ধাতব পাখা অবলীলায় পানিকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে তোলপাড় চালিয়ে দিচ্ছে। এই জায়গাটা ভিষন পছন্দ দ্বীপের,, অতীতে যতবার জাহাজ ভ্রমণ করে মাল আমদানির করেছে ততোবার সে সময় সুযোগ পেলে এই জায়গাটায় এসে সস্থির নিশ্বাস নিয়েছে,, আজ বিষয়টা ব্যাতিক্রম।

দ্বীপ রেলিঙে ভর দিয়ে মাথাটা আরও একটু নামালো সাথে সাথে পাখার ঝাপটায় এক দলা পানি এসে ছিটকে পরলো দ্বীপের চোখে মুখে। দ্বীপের ভাবান্তর হলো না,, তার মস্তিষ্ক তাকে একটা দিশা দেখাচ্ছে,, এইযে ধাতব পাখাটা তরল পানীয়টাকেও ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে,, এই পানির জায়গায় দ্বীপ থাকলে তাকে কি করবে? নিশ্চয়ই নিমিষেই ক্ষত বিক্ষত করে দিবে দ্বীপের দেহ খানা? তারপর নিশ্চয়ই দ্বীপের সকল যন্ত্রণা মিটে যাবে? আর কাউকে হাড়ানোর ভয় পেতে হবে না? তার জন্য কারোর সংসার ও ভাঙবে না,, কারোর স্বপ্ন ভেঙে তছনছ হবে না? তাহলে দ্বীপের কি করনীয়? তার কি এখান থেকে লাফ দেওয়া উচিৎ? মরে গেলে নিশ্চয়ই মুক্তি মিলবে,, দ্বীপ অবচেতন মনে হুস হাড়িয়ে আরও খানিকটা ঝুকে গেলো। তৎক্ষনাৎ হাত টেনে ধরলো কেউ,, চোয়ালে শক্ত হাতের ঘুসি পরতেই হুস ফিরলো দ্বীপের। বিহান রাগে ফোসফোস করতে করতে আকস্মিক জড়িয়ে ধরলো দ্বীপকে। শক্ত আলিঙ্গনে বেধে চিৎকার করে বললো — হার্ট পাওয়া গিয়েছে ভাই!! অর্পনা মরবেনা, আমিও মরবো না। আমাদের কারোর কিছু হবেনা। আমরা কেউ কাউকে হাড়াবোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে,, সব।

রাত ৩ টা ১১ মিনিট,,
এয়ার অ্যাম্বুলেন্স!! মুলত যানটিকে আকাশে উড়ন্ত একটি ক্ষুদ্র আইসিইউ বলা চলে যা দ্বারা গুরতর অসুস্থ রুগিদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়৷ বর্তমানে অর্পনাকে নিয়ে সেই এয়ার এম্বুলেন্সে অবস্থান করছে দ্বীপ,, সাথে আরশাদ জামান রয়েছেন। আপাতত তারা দুজনেই পারি জমাবে সিঙ্গাপুর পরবর্তীতে মাহিদ মির্জা এবং শাহিন মির্জা যাবেন। অর্পনাকে যানটির মাঝখানে একটি বিশেষ মেডিকেল স্ট্রেচারে শক্তভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে,, যেনো টার্বুলেন্স কোনোভাবেই নড়াচড়া না করে। স্ট্রেচারের দুপাশে সেট করা আছে নানান ধরনের লাইফ সাপোর্টের মেশিন। হার্ট মনিটর, যেখানে সবুজ রেখা উঠানামা করে হৃদ কম্পনের পরিমাপ নির্ধারণ করছে।অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ভেন্টিলেটরের সাহায্য অর্পনার শ্বাস প্রশ্বাস ঠিক রাখার প্রচেষ্টা চলছে। ইনফিউশন পাম্প,, যা ধীরে ধীরে ওষুধ শরীরে প্রবেশ করায় সাহায্য করে। ডিফিব্রিলেটর!” যা জরুরি অবস্থায় হার্টে শক দেওয়ার জন্য ব্যাবহৃত হচ্ছে । সেই সাথে রয়েছে ছোট ছোট ড্রয়ারভর্তি ইনজেকশন, স্যালাইন ও জরুরি মেডিসিন।

অর্পনার সেবায় একজন নার্স রয়েছে যে সারাক্ষন অর্পনার হার্টবিট, অক্সিজেন লেভেল ও ব্লাড প্রেসারে নজর রাখছে। সাথে একজন ক্রিটিক্যাল কেয়ার ডাক্তার ও কার্ডিওলজিস্ট রয়েছেন। ভিতরের পরিবেশ আপাত নিরব,, শুধু মনিটরের “বিপ… বিপ…” শব্দ আর ইঞ্জিনের ভারী গর্জন শোনা যাচ্ছে,, মাঝে মাঝে অর্পনার হার্টের কম্পন ধীরো হয়ে এলে নার্স অর্পনার কানের কাছে মুখ নিয়ে কিসব যেনো বলছে। হয়তো অর্পনাকে ম্যান্টাল্লি সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
,,, এয়ার এম্বুলেন্স ফ্লাইং করেছে ঘন্টাখানিক হতে চললো,, সিঙ্গাপুর পৌছাতে আরও ঘন্টা চারের ব্যাপার। দ্বীপ ভিমুরো চিত্তে চেয়ে রইলো,, শুরু থেকেই পর্যবেক্ষণ করছে নার্সের প্রতিটি কার্যকলাপ। আরশাদ জামান ও মেয়ের দিকেই তাকিয়ে আছেন,, অর্পনার হলুদ ফর্সা হাতটাতে ক্যানালো লাগানো,, সেলাইন চলছে দুটো,, লাইফ সাপোর্টে থাকার দরুন কতো কতো যন্ত্রপাতির নল যে ছোট্ট দেহটায় আটকানো দ্বীপ সেসব পরখ করতে চাইলো না,, করলে যে তার বুকটা যন্ত্রনায় ককিয়ে উঠবে। দ্বীপ নিজের সিট ছেড়ে অর্পনার পাশে এসে দাড়ালো,, অর্পনাকে রাখা স্ট্রচার টা খুবি ছোট,, অর্পনার পর এখানে আর কেউ বসতে পারবে না,, দ্বীপ সেখানে বসার প্রয়াস ও চালালো না বরং মেঝেতে হাটু গেড়ে বসে পরলো,, দ্বীপকে রুগির এতোটা কাছে যেতে দেখে নার্স কিছু বলতে নিবে তৎক্ষনাৎ বাধা দিলেন আরশাদ জামান,, ইশারায় দূরে থাকতে বললেন। নার্সটি মানতে না চাইলেও মানতে বাধ্য হলো,, তারা চাইলেই দ্বীপ মির্জাকে আটকাতে পারবেনা। বললেও তো শুনবেনা লোকটা,, বলে কি লাভ? দ্বীপ অর্পনার গালে আলতো করে আঙুল ছোয়ালো,, গালটা ফুলে আছে,, দ্বীপ তো মেয়েটাকে এরকম গলুমলু রুপেই দেখতে চেয়েছিলো তাহলে আজ এই রুপটা ভালো লাগছে না কেনো? বুকের ভিতরে থাকা হৃদপিন্ডটাই বা এতো আনচান করছে কেনো? দ্বীপের চোখ থেকে দুফোঁটা পানি গড়ালো। ঠোট ফুরে বেড়িয়ে এলো কয়েকটি অগোছালো বাক্য–

,,, তুমি বলেছিলে তুমি নিঃস্ব,, তোমায় কেউ ভালোবাসেনা,, আমি ভালোবাসলাম। নিজের সবটা উজার করে ভালোবার পর তার বিনিময়ে তুমি আমায় আঘাত করলে,, বাচার প্রলোভন দেখিয়ে আকাশের মতো রং বদলালে। তুমি কি মেঘ? নিশ্ব রমনি!! সত্যি বলতে তুমি মেঘের চেয়েও ধোয়াটে। তোমায় দেখা যায় কিন্তু ছোয়া যায়না,, তুমি ভালোবাসা চাও কিন্তু গ্রহণ করোনা। আমি কি করবো? কি করলে তোমায় আমি আমার মতো করে পাবো? বলোনা,, কিছু একটা বলো,, তুমি আমায় আপনি বলে ডাকবে বলে,, এক পলক চেয়ে দেখবে বলে কতো প্রহর ধরে অপেক্ষায় মরছি,, ফিরে আসোনা,, আমার যে আর ভালো লাগছেনা।

,,, ওপাশ,থেকে উত্তর এলো না তবে চোখ বুঝে রাখা অর্পনার চোখের কার্নিশ ঘেঁষে এক ফোটা পানি গড়ালো। হিসেব মতো অর্পনার হুস নেই,, দ্বীপের কথা কর্ন কিংবা মস্তিষ্ক কোথাও পৌছানোর কথা নয় তাহলে এই পানি টুকু কিসের? তবে কি এটুকু অভিযোগ? দ্বীপ আফসোস করে বলে জমিয়ে রেখেছিলো দ্বীপের সামনে ঝরাবে বলে? দ্বীপ ঠোঁট দাবিয়ে সেই পানিটুকু শুষে নিলো,, মুখ তুলে কপালে গাড়ো চুম্বন করলো। খুব ইচ্ছা করছে অক্সিজেন মাক্সটা সরিয়ে রক্তাভ ঠোঁটে ঠোঁট ছোয়াতে কিন্তু তাতো সম্ভব না। দ্বীপ এই প্রতিটি যন্ত্রের প্রতি কৃতজ্ঞ,, তার প্রানটাকে সাপোর্ট দিয়ে বাচিয়ে রেখেছে যে। দ্বীপ কি কখনো ভেবেছিলো পারুর পর অজান্তেই তার জীবনে এমন কেউ চলে আসবে যে তার মন, মস্তিষ্ক, অস্তিত্ব, সত্তা সব নিজের আয়ত্বে নিয়ে নিবে। দ্বীপ যে অসহায়,, একটা নিশ্ব রমনির নিখাদ ভালোবাসা দ্বীপকে অসহায় করে তুলেছে।

,,, ঢাকার সনামধন্য ব্যাবসায়িকদের মধ্যে জাওয়াদরা বরাবরি বেশ নাম করা,, পুরান ঢাকায় সেই জমিদারি আমল থেকে তাদের ব্যাবসার যাত্রা শুরু যা বর্তমানে বংশ পরম্পরায় আজ এই পর্যন্ত পৌছেছে। আধুনিক যুগে এসেও এর জৌলুশ একটুখানি ও কমেনি। সেই জাওয়াদ বংশের ছেলে অরুন জাওয়াদ,, যার প্রতিটি কদমে কদমে টাকারা কথা বলে,, তবে এই টাকা খুব একটা পছন্দ না অরুনের৷ ছোট থেকেই টাকার উপর বড়ো হয়েছে সে,, বাবা মায়ের সঙ্গ পায়নি,, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মেইডদের কাউকেই কাছে পায়নি ।জীবনের স্পেশাল মুতুর্ত কিংবা অসুস্থতা,, কোনো অবস্থাতোই বাবা মা তার খেয়াল রাখেনি,, পাশে বসে দুটো কথা বলেনি। মাঝেসাজে যাই হোক খাবার টেবিলে দেখা হয়ে যায় তখনো বাবা মায়ের মুখ থাকে গম্ভীর,, তারা খাবার টেবিলে কথা বলা পছন্দ করেন না। প্রথমদিকে অরুন বাবা মাকে কাছে চাইলেও সময়ের সাথে সাথে তার চাওয়াগুলো ও কেমন ফিকে হয়ে গিয়েছে,, এখন আর তার বাবা মা লাগে না। সে বর্তমানে সুখ-শান্তি বলতে বন্ধু মহল আর ভালোবাসার রাত্রিটাকেই বুঝে।

বন্ধু অন্ত প্রান অরুন। সেই বন্ধু আর ভালোবাসার রাত্রিটা হাজতে বন্দি রয়োছে অথচ অরুন কিছু করতে পারছে না৷ অরুনের ডেড আরমান জাওয়াদ ইসফাক কাইসারের বিজন্যাস পার্টনার,, তার উপর অর্পনাকে কেইস থেকে বাচাতে ঘটনাস্থল থেকে সুস্মিতা কাইসারকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলো অরুন। যার ফল স্বরুপ অরুনের নামে কোনো কেইস দায়েল করা হয়নি। পল্লব আর রাত্রিকে এরেস্ট করার বিষয়টা জানতে পেরে মম তাকে বাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছিলো,, কথা দিয়েছিলো রাত আর পল্লবকে ছাড়িয়ে আনবে কিন্তু মম তার কথা রাখেনি উল্টো তাকে প্রয়োজনীয় কথা বলার নাম করে রুমে এনে বাহির থেকে দরজা লক করে দিয়েছে,, ফোনটাও কেরে নিয়েছে। সেই বিকালের শেষ প্রহর থেকে এখন রাত বাজে ১২ টা ২৮,, অরুনের রুমের দরজা খোলা হয়নি,, একমুঠো খাবার দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি কেউ,, পাছে যদি অরুন পালিয়ে যায়?

অরুন দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে ক্লান্ত হয়ে বিছানার উপর গা হেলিয়ে দিলো,, দুহাতে খামচে ধরলো নিজের মাথার চুল। ভালো লাগছে না, শান্তি লাগছে না,, অর্পনাটা কেমন আছে? ওর তো নোজ ব্ল্যাডিং হচ্ছিলো,, ঠিক আছে তো? রাতটা তো পল্লবের সাথে আছে,, পল্লব নিশ্চয়ই রাতের খেয়াল রাখবে,, এদিক থেকে কিছুটা চিন্তা মুক্ত অরুন কিন্তু পল্লবটার খেয়াল রাখবে কে? পল্লবটা তো চাপা,, মেরে মুরেও মন থেকে দুটো কথা বের করা যায় না। এখন নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে? ইরার একটা খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন,, মেয়েটা বাড়ি গিয়েছে কতোগুলো দিন হয়ে গেলো। এতোটা সময় তো সে যোগাযোগ না করে থাকেনা। একপ্রকার তাদের ছাড়া মেয়েটা কিছুই বুঝে না,, বাবা, চাচাদের সহ্যই করতে পারেনা। সেই মেয়েটা বাড়িতে গিয়ে তাদের ভুলে যাবে? অসম্ভব!! ইরাদের সাথে ভুল কিছু হয়নিতো? নাহ!! অর অপেক্ষা না,, কাল যেভাবেই হোক বাড়ি থেকে বের হবে অরুন। রাত আর পল্লবকে থানা থেকে ছাড়িয়ে এনে অর্পনাকে সাথে নিয়ে পারি জমাবে সিলেটে। ইরাদের বাবা চাচাদের নিয়ে কোনোরুপ ভরসা দিতে পারছেনা সে,, ইরাদের কোনো ক্ষতি হলে ওদেরকে ছাড়বেনা অরুন,, মেরে কেটে একাকার করে দিবে। এসব ভাবতে ভাবতে অরুনের চোখ জ্বালা করে উঠলো,, চোখে ভাসলো প্রতিটি বন্ধুর প্রতিচ্ছবি,, আদুরে মুহূর্ত,, দুষ্টামি, একসাথে রমনা চষে বেড়ানো। চোখ থেকে পানি গড়াতেই অরুন বুকে কষ্টের পাহাড় জমিয়ে দুটো লাইন আওড়ালো —

,,,আমার ধূলো বালি জমা বই,,
আমার বন্ধুরা সব কই?,,,
,,,ভাল্লাগে না এই মিথ্যা শহর
রাতের আড়ালে রই।,,,

সিঙ্গাপুর,,
সময়টা ৯ টা ২২,, বাংলাদেশ সময় আনুমানিক ভোর ৭ টা ২২ মিনিট। সিঙ্গাপুর রাজদানীর কেন্দ্রীয় অভিজাত এলাকা অরচার্ড রোড-এ মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটাল অবস্থিত। এটি সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে পরিচিত এবং বিলাসবহুল প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর মধ্যে একটি,, কাচে ঘেরা এই হসপিটালে জটিল গাইনী অপারেশন থেকে শুরু করে মরন ব্যাদি ক্যান্সার পর্যন্ত চিকিৎসা করা হয়। হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট,,ওপেন হার্ট সার্জারি,, বাইপাস সার্জারি,, হার্ট ভালভ রিপ্লেসমেন্ট
এনজিওগ্রাম ও এনজিওপ্লাস্টি হার্ট ফেইলিউর চিকিৎসার জন্য বেশ সুনাম অর্জন করেছেন বছরের পর বছর ধরে। অর্পনার চিকিৎসার জন্য সর্বপ্রথম এখানেই আবেদন করা হয়,, সম্পূর্ন রিপোর্ট দেখার পর হসপিটাল থেকে সাথে সাথে এপ্লিকেশন এপ্রোভ করে এম্বাসিতে পাঠানো হয়। সেখান থেকেই রুগি সহ আরও দুজনার ইমার্জেন্সি ভিসা সেন্ড করা হয়।

,,, একটি কার্ডিও টিম মিলে অর্পনার হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করবে। এর মধ্যে প্রধান স্থানে রয়েছেন কার্ডিওথেরাসিস সার্জন লিংকন ওয়াহিদ। এসিস্ট্যান্ট হিসেবে রয়েছেন কার্ডিও লজিস্ট ডক্টর ইমরা ফাহরিম। কার্ডিও এনেস্থেওলজিস্ট ডক্টর মাফতিহা খালিদ!! পারফিওসনিস্ট ত্রিয়ান ডেনিয়েল। ট্রান্সপ্লান্ট কারডিওনেটর লোসা জায়েন। এবং লিংকন ওয়াহিদের আয়ত্বে স্টাডি রত কার্ডিও সার্জন ডক্টর আব্রাহাম জাহাঙ্গীর। সাথে তিনজন প্রোফেশনাল নার্স।যারা মিলে সম্পূর্ণ মিশনটা সাক্সেস করার প্রচেষ্টা চালাবেন।

,,, হসপিটালের এয়ার এম্বুলেন্স পার্কিং জোনে এয়ার এম্বুলেন্স লেন্ড করতেই চারজন ওয়ার্ড বয় ছুটে এলো,, নিস্তেজ অর্পনাকে তাদের নির্দিষ্ট স্টেচারে তুলে নিতেই ওয়ার্ড বয়দের সাথে বেড়িয়ে এলো দ্বীপ আর আরশাদ জামান,, নিজের দম্ভ ক্ষমতা পিছু হটিয়ে ছুটে গেলো স্ত্রীকে বয়ে নেওয়া স্ট্রেচারের পিছু পিছু। হিসেব মতো ডোনার মারা গিয়েছে তিন ঘন্টা পেরিয়ে গিয়ে চার ঘন্টায় পৌছেছে। হার্ট OCS প্রিজার্ভেটিং এ আছে ৩ ঘন্টা ৪৮ মিনিট,, হার্ট জীবিত থাকার সময়কাল ফুরিয়ে এসেছে অনেকটাই,তাই ওয়ার্ড বয়দের পদযুগল কোথাও থামলো না। ছুটে গেলো লিফ্টের উদ্দশ্যে,, চার তলায় এসে লিফ্ট থামতেই আবারও প্রানপন ছুটে গেলো ওয়ার্ড বয় চারজন। সরাসরি ঢুকে গেলো অপারেশন থিয়েটারে,, সময়ের স্বল্পতার প্রভাবে আগে থেকেই অপারেশন রুম রেডি করা ছিলো। দ্বীপ আর আরশাদ জামানের পদযুগল অপারেশন থিয়েটারের সামনে এসে থেকে গেলো। দ্বীপের চোখ ফাকি দিয়ে হাড়িয়ে গেলো তার ঘার ত্যাড়া বউটা তবে দ্বীপ সরলো না। কাচের দরজার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। আরশাদ জামান ব্যাথিত নজরে মেয়ের জামাইয়ের দিকে তাকালেন ,, ছেলেটা গতো ১৭ ঘন্টায় একেবারে মুড়চে গিয়েছে,, চোখে মুখের দিকে তাকালে যে কারোর বুকের ভিতরটা কেপে উঠবে,, দ্বীপ মির্জাকে এতোটা অগোছালো, এতোটা ভঙ্গুুর বোধহয় বহু বছর আগে দেখা গিয়েছিলো। আরশাদ জামান মেয়ের জামাইকে টেনে পাশে সাজিয়ে রাখা ওয়েটিং চেয়ারে বসিয়ে দিলেন,, নিজেও বসলো পাশাপাশি। কাধে হাত রেখে নরম কন্ঠে বললো — চিন্তা করোনা,, সব ঠিক হয়ে যাবে।

,,, বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পরলেন আরশাদ জামান,, তিনি আপন মানুষদের বেলায় বড্ড দূর্বল,, নিজের তৈরি করা সন্জোমটা হর হামেশাই ধরে রাখতে পারেন না। কিছু সময়ের মাঝেই নিজেকে সামলে নিলেন আরশাদ জামান,, মেয়ের জামাইকে বসিয়ে রেখে রিসিপশনের উদ্দেশ্যে হাটা দিলেন। টাকা পয়শার লেনদেন আগে থেকেই চুকানো হয়ে গেলেও এখনো অনেক ফরমালিটিস বাকি রয়েছে,, সেসবি পূরন করতে হবে।
,,, দ্বীপ অপারেশন থিয়েটার থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই একটি হাস্যজ্বল মুখের দেখা পেলো। পরনে সাদা শার্ট,, হাতে ডক্টরের ইউনিফর্ম,, চোখে গোল ফ্রেমের চসমা,, বিদেশে থাকার দরুন গায়ের রং উজ্জ্বল দেখালেও চেহারা বাংলাদেশি। ছেলেটি চঞ্চল পায়ে দ্বীপের দিকেই এগিয়ে আসছে। দ্বীপ ভ্রু কুচকে তাকাতেই ছেলেটি সামনে এসে হাত বাড়িয়ে সালাম দিলো। দ্বীপ চোখে মুখে দ্বিধা নিয়ে উঠে দাড়িয়ে হাত মিলাতেই ছেলেটি আকষ্মিক উষ্ণ আলিঙ্গনে বেধে নিলো দ্বীপকে। দ্বীপের কিছুটা অস্বস্তি হলো,, বিহান আর বাবা চাচা ছাড়া অন্য কারোর সাথে মোলাকাত করা পছন্দ না তার,, এভাবে হুটহাট অচেনা কারোর আলিঙ্গনে অসস্থি হওয়াটা স্বাভাবিক। অচেনা বিদায় দ্বীপ সৌজন্যতার সহিত ছেলেটিকে সরিয়ে দিতেই ছেলেটি ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো — ভাইয়া আমাকে চিনতে পারেননি? আমি আব্রাহাম!! যাকে আপনি স্কুল লাইফে আবুল বলে বুলিং করতেন,, আপনার চার বছরের জুনিয়র।

,,, দ্বীপ তখনো দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে,, দ্বীপকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখে ছেলেটার মুখের হাসি গায়েব হলো। বুঝলো দ্বীপ তাকে চিনতে পারেনি তাই মনে করানোর জন্য বললো — আপনার সাথে আমার আট বছর আগেও দেখা হয়েছিলো,, মনে নেই? আপনি আমাকে রেসাল্ট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আবার কোন ভার্সিটিতে এপ্লাই করবো,, ফিউচার প্লান কি? এসব জানতে চেয়েছিলেন। আপনার সাথে বিহান ভাইয়া ও ছিলো সাথে আপনার ছোট বোন পরশ ( পরশ নাম শুনে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো দ্বীপ,, ছেলেটি আমতা আমতা করে বললো) ম, মানে,, আই মিন পরশী নামক মেয়েটা ছিলো আরকি।

,,, দ্বীপ বুঝলো ছেলেটি তাকে মনে করানোর জন্য প্রানপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অগত্যা দ্বীপ নিজেও কিছুটা চেষ্টা করলো,, ডানহাতের তর্জনী আঙুল দিয়ে ভ্রু কুচকে মনে করতে চাইলো ছেলেটাকে সে আদেও চিনে কিনা? তবে তার মস্তিষ্ক কোনো সৎ উত্তর দিলোনা।দ্বীপ এখনো পুরোনো অনেক কথা মনে করতে পারেনা,, তবুও মেনে নিলো। স্কুল, কলেজ কিংবা ভার্সিটি লাইফে বহুবার বহুজনকে রেগ দিয়েছে দ্বীপ,, এটা তার নেশা নয় বরং পেশা ছিলো। হয়তো এই ছেলেটাও তাদের মধ্যে একজন। তাই ঠোঁটে জোর পূর্বক হাসি ফুটিয়ে কিছু বলতে নিবে নিবে তখনি একজন মধ্য বয়সী নার্স ওদের সামনে এসে ম্যান্ডারিন ভাষায় আওড়ালো —
,,, স্যার!! অপারেশন থিয়েটার রেডি,, লিংকন স্যার আপনাকে ডাকছেন,, দশ মিনিটের মাথায় অপারেশন শুরু হবে।

,,, বলেই নার্সটি প্রস্থান নিলো। আব্রাহাম সেদিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাশ ফেললো,, পরপর চোখ সরিয়ে দ্বীপের দিকে নজর স্থির করে আশ্বাসের স্বরে আওড়ালো।
,,,,ভরসা রাখুন ভাইয়া… ইনশাআল্লাহ ভাবির কিছুই হবে না। ডক্টর লিংকন স্যারের হাতে আজ পর্যন্ত যতগুলো হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে, আল্লাহর রহমতে একটাও ব্যর্থ হয়নি। প্রতিটি অপারেশনই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তাই প্লিজ ভেঙে পড়বেন না শুধু দোয়া করে যান। এখন তো নিজেকে আপনার খুব পরিচিত একজন বলে প্রুফ করতে পারলাম না তবে আল্লাহ এর রহমতে ভাবিকে ফিরিয়ে আনার পর অবশ্যই নিজেকে আপনার পরিচিত বলে প্রমান করবো। মনে না পরলেও মনে করানোর চেষ্টায় মত্ত থাকবো সর্বক্ষণ।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৯ (৩)

,,, বলেই সামনের দিকে হাটা দিলো ছেলেটা,, দ্বীপ তখনো মনে করার প্রয়াস চালাচ্ছে,, আসলেই কি ছেলেটাকে সে চিনে? আর ছেলেটাই বা তাকে এতো ইম্পরট্যান্স দিচ্ছে কেনো? সার্থ কি? সার্থ ছাড়া তো মানুষ এক কদম ও হাটেনা,, তাহলে এই ছেলেটার সার্থ হাসিল ঠিক কোন জায়গা থেকে হতে পারে?

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬০ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here