৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬০ (২)
রুপান্জলি
সিঙ্গাপুর,,
সকাল ৯ টা ৪০ মিনিট,,,
,,, অর্পনাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার পর ডক্টর মাফতিহা খালিদ দক্ষতার সহিত অর্পনার সম্পূর্ণ শরীরে পরিমান মতো অ্যানেস্থেসিয়া পুস করেছিলেন,, যার ফল স্বরুপ কিছুক্ষণের মাঝেই একেবারে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় অর্পনা। কিছু সময় পর অর্পনার মুখে ভেন্টিলেটর টিউব,, ও শরীরে বিভিন্ন ধরনের মনিটর লাগানো হলো। অর্পনার শরীর ধীরে ধীরে ডক্টরদের আয়ত্তে পৌছাতেই অপারেশন শুরু হলো। ডক্টর লিংকন সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে ধীরে ধীরে অর্পনার বুকের মাঝখানটা কেটে একটা একটা করে পর্দা সরালো। একজন মানুষ কখনোই হার্ট ছাড়া এক মুহুর্ত ও বাচতে পারেনা তাই যতটা সময় অর্পনার বুকে হার্ট অনুপস্থিত থাকবে ততোটা সময় তাকে হার্ট-লাং মেশিনের সাহায্যে বাচিয়ে রাখা হবে।
( হার্ট লাং এমন একটি যন্ত্র যা মানব দেহে হার্ট ও ফুসফুসের অনুপস্থিতিতে রক্তে অক্সিজেন যুক্ত করে সম্পূর্ন শরীরে চলাচল করতে সাহায্য করে) বুকে হার্ট- লাং মেশিন সংযোগ করার পর অর্পনার হৃদ কম্পন স্বাভাবিক হতেই ডক্টর লিংকন আব্রাহামের সাহায্যে ধীরে ধীরে অর্পনার পুরোনো হার্টের বেশিভাগ অংশ কেটে নিলো। তবে কিছু অংশ রেখো দিলো,, বিশেষ করে উপরের রক্তনালীর অংশ,, যেনো নতুন হার্ট সহজেই সংযোগ করা যায়। ডক্টর ইমরা ফাহরিম OCS বক্স থেকে নতুন হার্ট টা এগিয়ে দিতেই আব্রাহাম সেটা ধীরে অর্পনার হার্টের অসম্পূর্ণ জায়গাটাতে বসিয়ে দিলো। লিংকন ওয়াহিদ খুব সূক্ষ্ম ভাবে সেলাই দিয়ে একে একে বড় রক্তনালীগুলো জোড়া লাগিয়ে দিলো। যেমন,, অ্যাওর্টা,, পালমোনারি আর্টারি,, উপরের ও নিচের ভেনা কাভা ও বাম এট্রিয়ামের অংশ। এই প্রতিটি কাজ অত্যন্ত নিখুত ভাবে করেছেন তিনি।
সম্পূর্ণ রক্তনালি যুক্ত করার পর নতুন হার্টের কম্পন চালু করা হলো তবে খুব একটা ফলাফল হলো না। হার্ট এখনো অকেজো,, হয়তো দুটো অংশ একে অপরকে অপরিচিত মনে করছে। ঘাবড়ে গেলেন প্রতিটি ডক্টর,, অর্পনার হার্ট সচল না হওয়ায় আব্রাহামের বুকটাও কেমন ধরফর করে উঠলো,, দ্বীপ ভাইয়াকে কথা দিয়েছিলো সে,, তাহলে কি সেই কথা রাখতে পারবে না? আব্রাহাম কিছু একটা ভেবে তৎক্ষনাৎ সব সংযোগ বিছিন্ন করে হার্টের মাধ্যমে রক্ত চলাচল করার সুযোগ করে দিলো। তবে এতেও কাজ হলো না,, হার্ট ধরফর করছে না, রক্ত পাম্প করছে না, অর্পনার শ্বাস ভারি হয়ে আসছে। অর্পনার বেগতিক অবস্থা দেখে আব্রাহাম অনুমতির আশায় লিংকন ওয়াহিদের দিকে তাকাতেই ডক্টর লিংকন ইশারায় অনুমতি দিলেন। সাথে সাথে ডক্টর লোসা জায়েনকে জায়গা করে দিলো আব্রাহাম। লোসা জায়েন এগিয়ে এসে অর্পনার বুকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া শুরু করলেন। প্রথম দিকে হার্টের রেসপন্স না পাওয়া গেলেও কয়েকটা শক দিতেই ধরফরিয়ে উঠলো হার্ট।
মনিটরে হার্টের ভিপ ভিপ কম্পনের শব্দ হতেই ডক্টরদের ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে উঠলো,, ওয়াহিদ লিংকন ঠোটে হাসি রেখে আব্রাহামের উদ্দেশ্য বৃদ্ধাঙ্গুল তুলে সাবাসি দিতেই আব্রাহাম খুশিতে হাত বুকের কাছে নিয়ে হালকা ঝুকলো। এটা তাদের বহুদিনের অভ্যাস। আব্রাহাম প্রায় দের বছর ধরে লিংকন ওয়াহিদের সাথে কাজ করে যাচ্ছে,, প্রতিটি সাক্সেস তারা এভাবেই সেলিব্রেট করে। পুরোনো হার্টের অংশ আর নতুন হার্ট একে অপরের সাথে পরিচিত হওয়ার পর অর্পনার বুক থেকে হার্ট-লাং মেশিন খুলে ফেলা হলো। এই পর্যায়ে নতুন হার্টের কার্যক্ষমতা কিছুটা ধীর দেখালো তবে সময় পেরুতেই স্বাভাবিক হয়ে উঠলো সবকিছু। অর্পনার বুকে নতুন হার্ট একদম স্বাভাবিকভাবে রক্ত পাম্প করতে পারছে,, একবারো অপরিচিত ভেবে এটাক করছে না,, বিষয়টাতে বেশ প্রফুল্ল হলো ডক্টর গন। ধীরে ধীরে সবটা স্থিতিশীল হওয়ার পর অর্পনার বুকের হাড় তার দিয়ে জোড়া লাগিয়ে সেলাই করে দিলো আব্রাহাম,, সম্পূর্ণ বিষয়টা তদারকি করেছেন লিংকন ওয়াহিদ।
১২ টা ৫২ মিনিট,,,
,,, ওয়েটিং রুমে থাকা স্ক্রিনে অর্পনা জামান’স অপারেশন ইস ওভার দেখাতেই চমকে তাকালেন আরশাদ জামান। কাল বিলম্ব না করে ছুটে গেলেন অপারেশন থিয়েটারের সামনে। বর্তমানে দরজার উপরে থাকা সর্জারি বাল্বে সবুজ আলো জ্বলছে তার মানে সত্যি ই অর্পনার অপারেশন শেষ।আরশাদ জামান ঠায় দাড়িয়ে রইলেন,, মনে তীব্র ভয় সংকোচ,, অপারেশন সাক্সেস হয়েছে তো? তার প্রিন্সেস বাচবে তো? দ্বীপ এখানে নেই,, হসপিটালের শেষ প্রান্তে টায়েল্সের মেঝেতে গতো ৩ ঘন্টা যাবত নামাজ আদায় করে যাচ্ছে। ছেলেটা নিশ্চয়ই ভালো সংবাদ ডিসার্ভ করে? আরশাদ জামানের ভাবনার মাঝেই একজন নার্স বেড়িয়ে এলেন,, তার হাতে ভীপে ভর্তি অর্পনার পুরোনো হার্ট, রক্তাক্ত সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট। আরশাদ জামানকে দেখে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলেন নার্সটি,, মিন্ডারিন ভাষায় আওড়ালেন–
,,,, অপারেশন সাক্সেস হয়েছে,, ঘন্টা দুয়েকের মাঝে অর্পনা জামানকে ক্যাবিনে দেওয়া হবে।
,,,, বলেই নার্সটি চলে গেলো,, অপারেশন সাক্সেস হয়েছে কথানা কর্নকূহর হতেই ঝরঝর করে কেদে দিলেন আরশাদ জামান। এই বিশ টা ঘন্টা উনার মনে কি পরিমান ঝড় বয়ে গিয়েছে তা বোধহয় একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই জানেন। আরশাদ জামান পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে দ্রুত কদমে হাটা দিলো। আল্লাহ এর দরবারে হাত পেতে রাখা ছেলেটাকে জানাতে হবে তো নাকি? আল্লাহ যে তাকে দ্বিতীয়বার ফিরাননি, দোয়া কবুল করেছেন।
বাংলাদেশ,,,,
,,, মাঝে কেটেছে চারদিন,, সিলেটের রেলস্টেশন থেকে বের হয়ে বাকা পথ দিয়ে এগুতেই গরুর গাড়ির দেখা মিললো,, গাড়োয়ানকে সওদাগর বাড়ির নাম বলতেই এক নামেই চিনে নিলো মধ্যবয়সী লোকটা। অরুন, রাত্রি, পল্লব উঠে বসলো। রাত আর পল্লব হাজত থেকে ছাড়া পেয়েছে আজ তিনদিন পেরিয়েছে,, সেদিন ভোর রাতের দিকেই থানায় পৌছেছিলো বিহান। মোটা অংকের টাকা দেওয়ায় প্রধান আসামি অর্পনা জামান ব্যাতিত বাকি দুজনার কেইস উইথড্র করা হয়েছে,, বিহান চাইলেই ওদেরকে জামিনে ছাড়িয়ে আনতে পারতো কিন্তু অর্পনার কর্মফল কয়েকদিন পরপর দুটো নির্দোষ ছেলে মেয়ে ভোগ করবে সেটা তো হতে দেওয়া যায়না। অর্পনার জন্য ওর স্বামী আছে,, ডিটেকটিভ বাবা আছে,, একটা রাজনীতিবিদ বড়ো ভাই আছে,, তারা চাইলেই অর্পনাকে যেকোনো বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে। হাজারটা খুনের প্রমান ধামাচাপা দিতে পারবে যদিও সুস্মিতা কাইসার মারা যাননি,, এখনো আটকে আছে পৃথিবীর মোহ মায়ায়। তবে সেটা বেশিদিন স্থায়ী হবেনা। পরিবেশ শান্ত হলে ঠান্ডা মাথায় উনাকে উনার গন্তব্যে পৌঁছে দিবে বিহান।
,,, সওদাগর বাড়ির সামনে গরুর গাড়ি থামতেই নেমে পরলো তিনজন। গাড়োয়ানের সাথে টাকার ল্যানদেন চুকিয়ে বাড়িটির দিকে নজর তাক করতেই তিন জোড়া চোখ বিশ্বময়ে কিছুটা বড়ো হয়ে এলো,, তারা বরাবরই শুনে এসেছে ইরার বাবা চাচারা বেশ বড়োলোক তবে এতোটাও বড়োলোক হবে ভাবতে পারেনি। সামনের বাড়িটি দেখে মনে হচ্ছে ইট রঙা পুরোনো আমলের কোনো রাজ প্রাসাদ,, বাড়ির সামনে বড়ো করে জিসু খ্রিস্টের মুর্তি দাড় করানো,, গলায় হাতে চকচক করছে স্বর্নলংকার,, পরনে দামি মখমলের পোষাক। বাড়ির কোনায় কোনায় ক্রুস চিন্হের ন্যায় পিলার তৈরি করা। গেইটের ফাক ফোকর দিয়েই দেখা যাচ্ছে সারি সারি হয়ে দাড়িয়ে থাকা সাদা পোষাক ধারি গার্ডদের। রাত্রি ভয়ে ঢোক গিললো,, তিনটে অপরিচিত ছেলে মেয়েকে গেইটের সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুচকালো দাড়োয়ান,, কিছু বলতে নিবে তখনি উল্টো পথ দিয়ে দলবল সহ একটা লম্বামতো যুবক এসে গেইটের সামনে দাড়ালো।পরিচিত মুখয়ব দেখে অরুন আর পল্লবের ঠোঁটে হাসি ফুটলো তবে রাত্রির ব্যাপারটা আলাদা। সে ইরার বড়ো ভাইকে জমের মতো ভয় পায়,, কেমন ডাকাত ডাকাত চেহারা,, হাতে আবার রাম দা নিয়ে ঘুরছে,, শরীরের রক্তের ছিটেফোঁটা লেগে আছে নিশ্চয়ই কারোর সাথে মারামারি করে এসেছে। রাত্রি ভয়ে অরুনে পিছনে লুকিয়ে শার্ট খামচে ধরলো, বিষয়টা নজর এড়ালো না জোসেফের। এই মেয়েটার এসব ভীতু ভীতু কান্ডে বহুবার বিব্রত হয়েছে জোসেফ,, ধর্মের বাধা না থাকলে মেয়েটা এখন তার বংশধরের জননী থাকতো। অরুন, পল্লব, অর্পনা আর ভীতু মেয়েটার সাথে পূর্ববর্তী সাক্ষাৎ রয়েছে জোসেফের। ইরার সাথে যতোবার ঢাকায় দেখা করতে গিয়েছে ততোবার এদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে,, সে নিজে তেমন একটা মুসলিমদের অপছন্দ করতোনা,, যতোটা অবজ্ঞা করতো তার সবটাই বাবা চাচার মন রক্ষার্থে,, তবে আজ তার মনে মুসলিমদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে। অন্য সময় হেসে কথা বললেও আজ তার ঠোঁটে হাসি ফুটলো না বরং চোখে মুখে ফুটে উঠলো প্রবল হিংস্রতা। এদের সাথে থেকে থেকেই তার বোনটা উচ্ছন্নে গিয়েছে,, আজ বোনটা বেচে থাকতেও বড়ো ভাই হয়ে পুরো এলাকায় তাকে মৃত বলে আক্ষা দিতে হচ্ছে। এসবের দায় কার? অবশ্যই এই মুসলিমের বাচ্চাদের। আজ বুঝলো জোসেফ,, এই কারনেই বাবা চাচা মুসলিমদের এতোটা অপছন্দ করে। অরুন, পল্লব ইরাদের কাছে বহুবার শুনেছে তার বাবা ভাইরা নাকি দিন দুপুরে খুনোখুনি করে বেড়ায়,, তবে কখনো সরাসরি দেখেনি। জোসেফের হাতে রক্তাক্ত রাম দা আর চোখের হিংস্রতা দেখে দমে গেলো অরুন পল্লব । তখনি শুনা গেলো জোসেফের হিংস্র ধ্বনি — কি চাই এখানে?
,,, এমন হুংকারে ভিতরটা কেপে উঠলেও উপর থেকে টললো না দুই বন্ধু,, তবে জোসেফের ব্যাবহারে বেশ অবাক হয়েছে তারা। পল্লব অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেও অরুন নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো — ইরাদ কই? সিলেটে আসার পর থেকে ওর কোনো খোজ পাচ্ছি না, ফোন বন্ধ, কি হয়েছে? ও ঠিক আছে তো?
,,, জোসেফ মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো– না নেই,,
,,, নেই মানে? কি নেই? ( পল্লব)
,,, জাহিন মারা গিয়েছে। বাড়ির পশ্চিম পাশে সদ্য সাদা রং করা সমাধিটা দোখছো না? ওটাই জাহিনের সনাধি,, যাও এবার!! নিজেদের ভালো চাইলে এখনি নিজেদের শহরে ফিরে যাও।
,,, জোসেফ কথাটা যতো সহজে বলেছে অরুন, পল্লব, রাত্রি ততোটা সহজ ভাবে নিতে পারলো না বরং কিয়ৎক্ষনের জন্য অনুভুতি শুন্য হয়ে পরলো। হুস ফিরলো রাত্রির ফোঁপানোর শব্দে,, মেয়েটা যে অল্পতেই কেদে দেয়। পল্লব দুপা পিছিয়ে গেলো,, দ্বিধান্বিত কন্ঠে সুধালো — কি আবোল তাবোল বকছেন ভাইয়া? ও তো একদম ঠিক ছিলো,, খুশি মনে সিলেটের উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছিলো। আমরা নিজে ওকে ট্রেইনে উঠিয়ে দিয়েছি,, এটা কিভাবে সম্ভব?
,,, অরুনের চোখ জ্বালা করে পানি জমা হলো,, ভাঙা কন্ঠে আওড়ালো — ক,কবে হয়েছে এটা?
,,, জোসেফ কিছু বলবে তার আগে জোসেফের পাশে দাড়ানো ছেলেটা হুট করেই বলে বসলো– মার্চের ২২ তারিখে।
,,, ছেলেটির কথা শুনে চমকে তাকালো অরুন পল্লব,, মনে সন্দেহরা দানা বাধলো,, অরুনের চোখের পানি শুকিয়ে গেলো অচিরেই তার পরিবর্তে ফুটে উঠলো রাগ। জোসেফ দাতে দাত পিষে ছেলেটির দিকে তাকাতেই ছেলেটি মাথা নত করে নিলো। অরুন যা বুঝার বুঝে নিয়েছে,, নিশ্চয়ই ইরার বাবা চাচা ওর সাথে কিছু একটা করেছে আর জোসেফ ও তার বাবা চাচার সাথে সাথ দিয়েছে। ইরাদ তো এদের অপকর্ম, পাষানতা সম্পর্কে কম কিছু বলেনি,, দুঃখের বিষয় হচ্ছে শেষ পর্যন্ত জোসেফ ভাইয়াও বাবা চাচার সাথে মিলিত হয়েছে। পল্লবের মনেও একই কথার বাস,, সে জোসেফের দিকে দুপা এগিয়ে এলো,, চোখে চোখ রেখে শক্ত কন্ঠে সুধালো —
,,, অথচ ইরা সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে ২৭ তারিখে। সত্যি করে বলুন,, আপনারা কি করেছেন ওর সাথে? মেরেছেন? আটকে রেখেছেন নাকি বিক্রি করে দিয়েছেন?
,,, পল্লবের কথায় ফুসে উঠলো জোসেফ — এই ছেলে!! মুখ সামলে কথা বলো,, আমাদেরকে তোমার অমানুষ মনে হয়? নিজের বাড়ির মেয়েকে বিক্রি করে দিবো আমরা?
,,, অরুন কটাক্ষ করে বললো– মানুষ নাকি আপনারা? আপনাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে ধারনা নেই ভেবেছেন? অতো আলাপ চারিতায় যেতে চাইনা। আমাদের ইরাদ কোথায় সেটা বলুন,,
,,, বললাম তো মরে গিয়েছে,,
,,, এই পর্যায়ে অরুনের রাগ আকাশ ছুলো। রাত্রির থেকে শার্টটা ছাড়িয়ে জোসেফের কলার চেপে ধরলো। জোসেফ ইরার থেকে ৮ বছরের বড়ো। ইরার পর দাদার বাবা নাম করা পালোয়ান ছিলেন, সেই পালোয়ান বংশের প্রতিক জোসেফ,, শরীর সাস্থ পালোয়ানের মতোই বিশাল। তবে সেই সাস্থকে পরোয়া করলো না অরুন,, আর না জোসেফের হাতে থাকা রক্তাক্ত রাম দায়ের ভয় করলো। তার মাথায় চলছে শুধু ইরাদ। সে কলারে আরও শক্তি প্রয়োগ করে দাতে দাত চাপলো — সাবধান!! আরেকবার এই কথা বললে মুখ ভেঙে ফেলবো একদম।
,,,অরুনের রাগে কিছু এলো গেলো না জোসোফের,, দলের ছেলেরা রাগে কটমট করছে,, তেড়ে মেরে মারতে আসতে নিলে প্রস্রয় দিলো জোসেফ। অরুনকে ধাক্কা মেরো নিজের থেকে সরিয়ে দিলো,, পল্লব অরুনকে আকরে ধরে ফুসে উঠতেই জোসেফ বেঙ্গাক্তক স্বরে বললো– কথায় আছে না? মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি,, এই এদেরকে এলাকার বাহিরে নিয়ে ফেলে আয়,, যেতে না চাইলে হাত পা ভেঙে তারপর ফেলে আসবি। তারপরেও বারাবাড়ি করলে মেরে পাহাড়ের নিচে পুতে দিস।
,, ছেলেগুলো বোধহয় জোসেফের হুকুমের অপেক্ষায় ছিলো,, একপ্রকার তেড়ে মেরে অরুন আর পল্লবকে ধরতে নিলে পাল্টা আঘাত করলো পল্লব,, অরুন ও সাথ দিলো তাতে,, রাত্রি ভয়ে একপাশে সরে গেলো। ছেলেপুলেদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অরুন আর পল্লব বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না,, জোসেফ তখনো ঠায় দাড়িয়ে থেকে বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করছে। অরুন আর পল্লবকে মার খেতে দেখে এগিয়ে গেলো রাত্রি,, ছাড়ানোর প্রয়াস চালালো কিন্তু ভিরের মাঝে ঢুকতে পারলো না। অরুন আর পল্লব মার খেয়ে ততোক্ষণে মিয়িয়ে পরেছে,, রাত্রি শব্দ তুলে কেদে উঠলো,, ছুটে গেলো দাড়োয়ানের কাছে কিন্তু দারোয়ানের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা গেলো না। নিশ্চই মালিকের খেয়ে মালিকের সাথে বেইমানি করবে না বলেই তাকে সাহায্য করলো না। কোনো উপায় অন্তর না পেয়ে ভয়ে ভয়ে জোসেফের সামনে গিয়ে দাড়ালো রাত্রি,, তীব্র সাহস নিয়ে অনুনয়ের স্বরে বললো– ভাইয়া!! ছেড়ে দিতে বলুন,, ওদের কিছু একটা হয়ে যাবে,, প্লিজ ভাইয়া। ইরাদ তো আপনারি বোন,, আমরা তো ওর খারাপ চাইনা। বলুন!! ছেড়ে দিতে বলেন না ভাইয়া প্লিজ!!
,,, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর মানবটাও বোধহয় একটা জায়গায় এসে দূর্বল হয়ে পরে,, সেটা ভালোবাসা। জোসেফ জানেনা সে রাতকে ভালোবাসে কিনা? তবে মেয়েটাকে যতোবার দেখেছে ততোবার মনটা মেয়েটাকে নিজের করে পাওয়ার আবদার জানিয়েছে। একজন খ্রিস্টান মেয়ে চাইলেই নিজের ধর্ম বজায় রেখে মুসলিমকে বিয়ে করতে পারে কিন্তু ছেলের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম নেই,,তাদেরকে ধর্ম পরিবর্তন করতে হবে। আর জোসেফের পক্ষে কোনো মতেই এটা করা সম্ভব না,, তাই এতোকিছুর বেরাজালে মেয়েটাকে আর নিজের করা হলো না। মনের আবদার টুকু ও রাখা হলো না। জোসেফ রাত্রির অনুরোধ ভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে ছেলেদের উদ্দেশ্য বললো —
,,, হয়েছে থাম,, ছেড়ে দে এদের। এলাকার বাহিরে ফেলে দিতে হবে না,, এদের একটা ভালো মতো শিক্ষা হোক। সব গারোয়ানদের নিষেধ করো দে,, এই ছেলে মেয়েদের যেনো কেউ গাড়িতে না তোলে,, যে তুলবে তাকেই পরদিন সকালে কঠোর থেকেও কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
,,, বলেই রাত্রিকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে চলে গেলো জোসেফ,, বাধা পেয়ে ছেলেপুলেরা অসন্তুষ্ট হলো। আরও কয়েক ঘা দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও মালিকের হুকুম তামিল করা তাদের দায়িত্ব,, অগত্যা তারাও অরুন আর পল্লবকে ছেড়ে ভিতরে ঢুকে গেলো। রাত্রি ছুটে গেলো অরুন আর পল্লবের কাছে,, ছেলে দুটো মার খেয়ে একদম কাবু হয়ে গিয়েছে,, অরুনের ঠোঁট ফেটে রক্ত গরিয়েছে,, পল্লব নিচে পরার দরুন হাতের অনেক জায়গায় ছিলে গিয়েছে। রাত্রি ওদের টেনে টুনে তোলার প্রয়াশ চালালো। বাড়ির দিকে হেটে যাওয়া জোসেফের পা যুগল হুট করেই থেমে গেলো,, ঘাড় ঘুরিয়ে দুই বন্ধুর জন্য কেদে ভাষানো মেয়েটার দিকে এক পলক তাকিয়ে আবারও সামনের দিকে হাটা দিলো,, ঠোঁট ফুরে বেড়িয়ে এলো দুটো বাক্য,,
,,, তোমাকে না পাওয়ার আফসোস মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত থেকে যাবে রাত। তোমার আমার ধর্মটা এক হলেও পারতো।
,,, বেলা ফুরিয়ে সন্ধা নেমেছে,, পথে ঘাটে কয়েকটা গরুর গাড়ির দেখা মিললেও কেও ওদের নিতে চাইলো না,, জোসেফ সওদাগরের আদেশ বলে কথা। অগত্যা কোনো উপায় অন্তর না পেয়ে খোরাতে খোরাতে হাটতে লাগলো অরুন পল্লব,, এতো হাটছে তবুও যেনো রাস্তা ফুরাচ্ছে না,, বৃষ্টি হওয়ার দরুন রাস্তাঘাট কাদা কাদা হয়ে আছে,, এই কাদা জলে হাটতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে অরুন পল্লবের। রাত্রি তখনো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে। অর্পনটা থাকলে এখন ঠিক বুদ্ধি করে কিছু একটা করতে পারতো,, ইরাটার কি হয়েছে, কোথায় আছে খুজে বের করতে পারতো। কেনো যে সেদিন ওরা দিয়া বাড়ির ওদিকে যেতে গেলো,, সেদিন না গেলে নিশ্চয়ই অর্পনা এখন তাদের সাথে থাকতো। ভাবতে গিয়ে মেয়েটা আরও ফোপাচ্ছে। পল্লব আপাতত বেশ বিরক্ত,, ব্যাথা পেয়েছে তারা,, মার খেয়েছে তারা,, এই মেয়ে এমন মরা কান্না করছে কেনো? ওদের হাটার মাঝেই হুট করে পিছন থেকে কে যেনো রাত্রির হাত টেনে ধরলো ,, মেয়েটা এমনি জোসেফের ভয়ে কাতর ছিলো, সন্ধা নাগাত এহেন স্পর্শে চিৎকার দিয়ে আঁতকে উঠলো। রাত্রির চিৎকার শুনে সেদিকে ফিরে তাকালো অরুন-পল্লব। একজন বোরখা পরা রমনিকে রাতের হাত ধরে রাখতে দেখে ভ্রু গুটালো দুজন,, অরুন সুধালো–
,,, কে আপনি? ওর হাত এভাবে ধরেছেন কেনো?
,,, অরুনের প্রশ্নে মাথার নিকাবটা উপরে তুলে নিলো রমনি,, সন্ধার আবছা আলোয় রমনিকে ভালো করেই চিনতে পারলো রাত্রি। এটা তো ইরার মা,, বহুবার ইরার ফোনে মায়ের সাথে ছবি দেখেছে। আগে পরিচয় না থাকা সত্তেও কোনো বাক্য ব্যায় ছাড়াই ইরার মাকে জড়িয়ে ধরলো রাত্রি। রাত্রিকে এমন অপরিচিত জায়গায় অপরিচিত এক রমনিকে জড়িয়ে ধরতে দেখে আশ্চর্য হলো দুই বন্ধু। অরুন রাত্রির হাত টেনে বললো — কি করছিস? চিনিস ওনাকে? ছাড়।
,,, রাত্রি ইরার মাকে ছেড়ে উত্তর করলো– চিনি তো,, এটা ইরার মা।
,,, অরুন আর পল্লবের কেমন বিশ্বাস হলো না,, ইরার মা তো খ্রিস্টান তাহলে এমন বোরখা পরবে কেনো? পল্লব সন্দেহি কন্ঠে প্রশ্ন করলো — আপনি ইরার মা? তাহলে আপনি বোরখা পরে আছেন কেনো? আপনি তো খ্রিস্টান!!
,,, ইরার মা দ্রুত নিকাব টেনে মুখ আড়াল করে এদিক ওদিক তাকিয়ে সতর্ক কন্ঠে বললো — এতো কথা বলার সময় নেই,, আমাকে এখোনি ফিরতে হবে নয়তো ঐ অমানুষটা জানতে পারলে বাড়িতে কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে ছাড়বে। আমি শুধু তোমাদের একটা কথা বলতে এসেছি,, জাহিন মারা যায়নি, ওকে ওর বাবা চাচারা মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
,,, ইরার মায়ের কথায় বেশ বিষ্মিত হলো তিনজন,, পল্লব প্রশ্ন করলো — কিন্তু কেনো?
,,, এমালিয়া পারভিন আবারও এদিক ওদিক সতর্ক দৃষ্টি ফেলে সেদিন ঘটা প্রতিটি ঘটনা খুলে বললো। সবটা শুনে কি বলবে ভেবে পেলো না তিনজন। সিদ্বার্থকে তারা চিনেনা,, ইরা আর অর্পনাকে কিডন্যাপ করার দিন দেখেছিলো শুধু তাও শত্রুপক্ষ হিসেবে।তবে ইরার মুখে যতটা শুনেছিলো তাতে বুঝেছিলো সিদ্বার্থ ছেলেটা ইরাদকে ভালোবাসে কিন্তু সেই ভালোবাসাটা যে এতো পরিমান টক্সিক হবে,, পাওয়ার জন্য সম্মান নিয়ে টানা হেচরা করবে সেটা একেবারেই কল্পনাতিত। ওদের কথা বার্তার মাঝেই পথে জোসেফের কাছে কর্মরত দুটো ছেলেকে দেখা গেলো,, আতকে উঠলেন এমালিয়া পারভিন। অরুন, পল্লবকে আর কোনো প্রশ্ন করার ফুসরত না দিয়ে তাড়াহুড়ো কন্ঠে আওড়ালেন–
,,,,,এখান থেকে আট কিলোমিটার দূরে মৌলভীবাজার,, সেখান থেকে অটো কিংবা সিএনজি নিয়ে কূলাওড়া উপজেলায় পৌছাবে। সেখানে গিয়ে কালা পাহাড়ের সন্ধান করলেই যেকোনো গাড়ির ড্রাইভার নিয়ে যাবে তোমাদের। পাহাড়ের একদম শীর্ষে “”ক্রুস গির্জা” অবস্থিত( বাস্তবতা নেই)। অনেক উচুতে হওয়ায় ওখানে সবাই খুব একটা যায়না,, যারা জিসু খ্রিস্টের পরম ভক্ত তারাই বহু কষরত করে ওখানে পৌছায়। জাহিন ছোট থেকেই যখন হতাশ থাকতো, বাড়িতে ঝগড়া হতো কিংবা আমার উপর তার বাবার করা অত্যাচার গুলো মেনে নিতে পারতো না তখনি ওখানে চলে যেতো। দশ দিন, পনেরো দিন ওখানেই পরে থাকতো,, আমার মনে হচ্ছে এবারেও জাহিন ওখানেই গিয়েছে। তোমরা যদি ওকে পাও তাহলে ওকে বলো,, ওর মা ওকে খুব ভালোবাসে। সবাই ওকে ছেড়ে দিলেও মা কখনো ছাড়েনি,, পারলে আমার সাথে একটু দেখা করতে বলো,, ও বলেছিলো আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাবে,, কথাটা রাখতে বলো। আমি অপেক্ষায় আছি।
,,, বলেই লোকালয়ের দিকে ছুটে গেলেন মহিলা,, অরুন, পল্লব রাত্রি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। রমনিটি যেনো ঝরের ন্যায় হাজির হলো আবার ঝড়ের ন্যায় পালিয়ে গেলো। কার থেকে পালালো? নিজের স্বামী সন্তানের লোকেদের নজর থেকে? এতোটা ভয় নিয়ে কিভাবে বেচে আছেন এই মা টা? এতোটা যন্ত্রণা, ভয় নিয়ে বাচা যায় বুঝি? যেখানে একজন নারী জন্মের পর বাবার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ থাকে তারপর স্বামী এরপর সন্তান। অথচ এই নারীটি সবাইকে ভয় পায়,, দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত সাথে দুনিয়ার মানুষ।
” পৃথিবীতে অতো ধরনের রং ও নেই বোধহয়,,যতো ধরনের মানুষ রয়েছে”
অর্পনার জ্ঞান ফিরেছে আজ তিনদিন তবে চোখ মেলে তাকিয়েছে আজ সন্ধায়,, সম্পূর্ণ শরীর অবশ,, মস্তিষ্কটাও এখনো কাজ করছে না,, কানে শুনতে পাচ্ছে ঠিকি তবে তা নিউরন গ্রহণ করতে রাজি নয়,, যার ফল স্বরুপ মস্তিষ্ক শায় দিচ্ছে না,, ঠিক হতে আরও সময় লাগবে হয়তো। হার্ট ঠিকঠাক ভাবেই বিট করছে,, আশ্চর্য জনক হলেও সত্যি এই চারদিনে অর্পনার শরীরে স্থাপন করা নতুন হার্টকে অর্পনার শরীর এক মুহুর্তের জন্য অপরিচিত মনে করেনি,, এটাক করা তো দূর। এরকমটা সচারাচর হয়না,, নরমাল্লি হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করার পর প্রথম কয়েকদিনে বেশ কয়েকবার ছোট খাটো এটাক আসে,, তখন থেরাপির মাধ্যমে দুটো হার্টের অংশকে একে অপরের সাথে অভ্যস্ত করানো হয়। এই বিষয়টা নিয়ে ডক্টররা মোটামুটি ভালোই আশ্চর্য হয়েছেন। অর্পনার অপারেশনটা ডক্টর ওয়াহিদ লিংকন করলেও ফলো আপ করছে ডক্টর আব্রাহাম জাহাঙ্গীর। এই ফলো আপ আরও মাস তিনেক চলবে তারপর হয়তো অর্পনাকে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরবে দ্বীপ। মাহিদ মির্জা, শাহিন মির্জা আগামীকাল সকালে আসবেন,, ভিসা প্রসেসিং এর জন্য এতোটা লেইট হয়েছে। বিহান আপাতত এদিকে আসবেনা,, দ্বীপের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের সকল কারবার তাকেই সামলাতে হবে। দ্বীপ প্রথম দিকে আব্রাহাম জাহাঙ্গীরকে না চিনলেও বাবা আর বংশ পরিচয় দেওয়ার পর কিছুটা চিনতে পেরেছে। সুস্থ হওয়ার পর আব্রাহামের বাবার সাথে দুয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছিলো দ্বীপের,, এর বাহিরে আগের কথা খুব একটা মনে পরেনা। আব্রাহাম ছেলেটা বেশ মিসুক,, নিজেকে আপন কেউ প্রমান করার বড্ড তাড়া তার। এতে অবশ্য একটা লাভ হয়েছে,, দ্বীপ চাইলেই একবার করে অর্পনার সাথে দেখা করতে পারছে,, টুকটাক কথা বলতে পারছে,, মাঝেমধ্যে দ্বীপের পর আরশাদ জামানকেও দেখা করার ব্যাবস্থা করে দিচ্ছে আব্রাহাম। আজো তার ব্যাতিক্রম হলো না,, আব্রাহাম নিজ থেকেই দ্বীপকে অর্পনার ক্যাবিনে যাওয়ার পারমিশন দিলো,, সেই পারমিশন প্যাপার নিয়েই আই সি ইউ ক্যাবিনের সামনে দাড়িয়ে আছে দ্বীপ। যেই দ্বীপ মির্জা কখনো কারোর পরোয়া করেনি। কারোর পারমিশন নেওয়া তো দূর,,কেড়ে নেওয়া, জোর করা ব্যাতিত অন্য কোনো ওয়ার্ড যার ডিকসোনারিতে নেই সেই দ্বীপ মির্জা এক আনারিকে ভালোবেসে এই জায়গায় দাড়িয়ে।
,,, অর্পনার হুস না থাকায় তাকে বর্তমানে নল দ্বারা তরল খাবার খাওয়ানো হয়,, নার্স খাবার খায়িয়ে বেরুতেই দ্বীপ আব্রাহামের সাইন কৃত পারমিশন প্যাপারটা এগিয়ে দিলো,, নার্স বিনাবাক্যে দ্বীপকে ভিতরে ঢুকার ইশারা করে জায়গা হতে প্রস্থান নিলো। দ্বীপ আরও একবার ভালো মতো হেন্ড সানিটাইস্ড করে আই সি ইউ রুমের কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো,, মুহুর্তেই বিভিন্ন মনিটরের ভিপ ভিপ শব্দে ঝাজিয়ে উঠলো দ্বীপের কান। এই কয়েকদিনে অর্পনার হলুদ ফর্সা মুখটা সাদা ফকফকা রং ধারন করেছে,, আগে যতখানি চিকন ছিলো অপারেশনের পর তার থেকেও অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছে। দ্বীপ অর্পনার বেডের পাশাপাশি অফ হোয়াইট রঙা ফোমের তৈরি টুলটাতে বসলো। দ্বীপের মনটা প্রয়োজনের তুলনায় আজ বেশ ভার। গতো কয়েক রাত না ঘুমানোর ফলে ছেলেটার চোখের নিচে বাসা বেধেছে কালো রঙা সার্কেল,, দাড়ি গোফ কিছুটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে,, চুলগুলো উষ্কখুষ্ক,, চোখটা লাল,, গালে দু একটা ব্রনের দেখা মিলেছে যা ফর্সা মুখে লাল আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। শার্টটা কুচকে আছে,, ফোল্ড করা হাতার ভাজটাও কেমন এলোমেলো। সিঙ্গাপুরের মাটিতে দ্বীপ মির্জার এহেন রুপ বড্ড অকল্পনীয়। দ্বীপ বুকে চলা তান্ডব লুকিয়ে ঠোঁটে জোর পূর্বক হাসি ফুটিয়ে স্ত্রীকে ডাকলো —
,,, কি অবস্থা মিসেস!! খাওয়া দাওয়া হয়েছে? তাকান একটু,, এইযে এদিকে। তাকান না!!
,,, অর্পনা তাকালো না,, পাথরের ন্যায় শুয়ে রইল। দ্বীপের ইচ্ছা করলো অর্পনাকে একটু ছুয়ে দিতে কিন্তু ইচ্ছাটা ইচ্ছাই রয়ে গেলো। অর্পনাকে ছোয়া বারন,, আব্রাহাম নিষেধ করেছে। দ্বীপ অর্পনাকে আরও কয়েকবার ডাকলো তবে উত্তর মিললো না,, শক্ত পুরুষের বুকটা আরও ভার হয়ে এলো । এই নিশ্ব রমনিটি কি জানে? তাকে আরও একবার নিশ্ব করে দেওয়ার জন্য সন্ধা ৭ টা ৫২ মিনিটে মেয়েটার আপন বাবা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পরোলোক গমন করেছেন? মা তো বহু বছর আগেই মারা গিয়েছে,, বড়ো বোনটাও নেই এখন পরে রয়েছে একটা ছোট ভাই। দ্বীপের খুব ইচ্ছা করলো অর্পনাকে জানাতে তার আপন বাবা তার হার্ট ড্যামেজ হওয়ার কথা শুনে নিজে হার্ট এটাক করে মারা গিয়েছেন। বাবারা বাবাই হয়,, মেয়ে কাছে থাকুক কিংবা দূরে,, পৃথিবীতে সব মায়া ছিন্ন করা গেলেও সন্তানের প্রতি পিতা মাতার মায়া ছিন্ন করা যায়না। দ্বীপের গভীর ভাবনার মাঝে চোখ মেলে তাকালো অর্পনা,, দৃষ্টি সোজা সিলিং এর দিকে তাক করা। আব্রাহামের নিষেধ থাকা সত্তেও অক্সিজেন নল লাগানো অর্পনার টকটকা লাল নাকটায় আঙুল দিয়ে ছুয়ে দিলো দ্বীপ,, সাথে সাথে অর্পনার চোখ বেয়ে এক ফোটা পানি গড়ালো,, শ্বাসের গতি বাড়লো কিছুটা। দ্বীপের ব্যাথিত মনে এক পশলা বর্শন হলো বোধয়। অর্পনা তার স্পর্শে রেসপন্স করছে বিষয়টা বুঝে আসতেই অর্পনার হাতটা পরম যত্নে আগলে নিলো দ্বীপ। সে তো হাত স্যানিটাইস্ড করে এসেছে তাহলে এটুকু ছোয়ায় নিশ্চয়ই ভেলোরার কোনো ক্ষতি হবেনা? আর ভালোবাসার মানুষ ছুলে কারোর ক্ষতি হয় নাকি? একদমি না। ভালোবাসার মাধ্যমে জীবানু না বরং ভালোবাসা ছড়ায়। দ্বীপের ভাবনা সত্যি হলো,, দ্বীপ হাত ছুতেই অর্পনা আঙুল নাড়ালো,, অর্পনার আশকারা পেয়ে আরও বেহায়া হলো দ্বীপ,, মুখ নামিয়ে হাতে চুমু খেয়ে বললো —
“”তুমি যদি অসম্ভব হও, আমি পৃথিবীর বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও তোমায় নিজের করে ছাড়বো।
তোমাকে ভালোবাসা যদি পাপ হয়, তবে সেই পাপের সাজা মাথা পেতে নিয়ে হলেও আমি তোমাকেই ভালোবাসবো।”” আমার তোমাকে নিয়ে বিন্দু মাত্র আফসোস নেই ভেলোরা বরং তোমাকে পেয়ে আমি পরিপূর্ণ। ,হয়তো সেদিন তোমায় ভিষন ভাবে আঘাত করেছি,, কি করবো বলো? আমি যে হিংসুটে। তর বেলায় আমি চরম মাত্রায় হিংসুটে অর্পন। তকে অন্য কারোর সাথে দেখা তো দূর কারোর সাথে কল্পনা করতেও আমার বুক কাপে,, হিংসায় অন্তরটা জ্বলে যায় । তুই আমার!! আমার মালিকানায় থাকা সম্পদ। তর মাথার চুল থেকে শুরু করে পায়ের নোখ পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় শুধু আমার এবং আমারি অধিকার। তুই হাসবি আমার জন্য, কাদবি আমার জন্য , মিষ্টি করে কিংবা কর্কশ করে, কথা বলবি শুধু আমার জন্য। তর চুলের ঘ্রান আমার, গায়ে লেপ্টে থাকা পোষাকের ভাগটা আমার এমনকি পায়ের তলার ধুলোটা পর্যন্ত একান্তই আমার। তর সাথে ০.০০ শতাংশ ও মিশে আছে এমন প্রতিটি বস্তুর উপর শুধু দ্বীপ মির্জার অধিকার। তর ভাগ আমি কাউকে দিবো না,, এক চুল ও না, নেনো মিটার ও না। তর হয়তো আমাকে উন্মাদ মনে হতে পারে,, হোক!! তাতে আমার কিছু আসে যায়না। এটাই শেষ নয়,, ভবিষ্যতেও যদি তর মুখে আমি ঐ ব্লাডি এসহোলের নাম শুনি তাহলে আবারও তকে হাজারটা ব্যাথায় জর্জরিত করে দিবো,, লাগলে আরও ১০ বার হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করাবো তাও তুই অন্যায় করে ছাড়া পাবিনা। আ’ ম নট সরি ফর মাই বিহেভিওয়্যার। দ্বীপ মির্জা তার ব্যাবহারের জন্য একটু ও অনুতপ্ত না ,,, বরং সুস্থ হওয়ার পর ভদ্র বউয়ের মতো তুই আমার কাছে ক্ষমা চাইবি। অবাধ্যতা, ঘারত্যারামি সব মেনে নিবো কিন্তু অন্য কারোর প্রতি সামান্য পরিমাণ অনুভুতি,, জ্যান্ত পুতে ফেলবো।
,,, বলেই বিনা অনুমতিতে পাগল দ্বীপটা বউয়ের নাকে ঠোঁট ছোয়ালো,, গালে, কপালে ঠোঁট ছোয়াতেও ভাবলো না দুবার। ঠোঁটে কোমল স্পর্শ দিতে নিবে তখনি পিছন থেকে কারোর গলা খাকারির শব্দ শুনা গেলো — একজন হার্টের প্যাশেন্টকে এভাবে হুমকি ধামকি দেওয়াটা কি আদেও ঠিক? ভাবি যদি আবারও হার্ট এটাক করে?
,,, উত্তর এলো — আবারও হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট করাবো।
,,সকাল ৬ টা ২৫
,,,পাহাড়ের আকা বাকা পথ ধরে হাটছে তিনজন,, ভোর রাতের দিকে রওনা দিলেও বর্তমান আকাশটা বেশ পরিষ্কার। পাহাড়ের কোল ঘেসে রক্তিম সূর্যের দেখা মিলছে,, বড্ড সুন্দর লাগছে দৃশ্যটা। অজানা দিক থেকে আসা শো শো বাতাস এসে তিন নর নারীর শরীর রাঙিয়ে দিচ্ছে। রাত্রি পরনের কাচা হলুদ উড়নার কানিটা উড়ছে অবলীলায় সাথে লম্বা কেশরাশি ও বাধ মানছেনা। গতকাল রাতেই তারা কালা পাহাড়ের সামনে এসে পৌছেছিলো কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও তখনি রওনা দেওয়া হয়নি। রাত্রি যতোই তাদের বন্ধু হোক না কেনো বোন তো আর নয়,, একটা মেয়েকে নিয়ে রাতবিরেতে দুটো পুরুষ মানুষ পাহাড়ে উঠা,, তাদের মাঝে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য না থাকলেও,, মানুষ তো আর সেটা বুঝবে না। অগত্যা তারা কালা পাহাড়ের কাছাকাছি ই একটা হোটেলে দুটো রুম নিয়ে কোনোরকমে রাতটা পার করেছে। তবে ঘুমানোর উদ্দশ্যে রুম নিলেও রাতে কারোরি ঘুম হলো না। ইরাটার চিন্তায় দুটো চোখের পাতা এক করার যো নেই। কোথায় আছে মেয়েটা? যদি চার্চে না থাকে? তাহলে কোথায় গেলে পাওয়া যাবে তাকে? ইরাদটা কি হাড়িয়ে যাবে? সেই চিন্তা ভাবনা থেকেই ভোর সারে চারটায় ফোনের টর্চ হাতে বেড়িয়ে পরেছে তিন নরনারী।
এ নিয়ে বেশ ভোগান্তি ও হয়েছে তাদের,, ঘন চা বাগানে সাপ খোপের খপ্পরে পরা আহামরি কোনো ব্যাপার না,, সেই সাথে এই পর্যন্ত দুই বার পথ ভ্রষ্ট হয়েছে তারা। পুরো পাহাড়ে চা পাতার বন থাকার দরুন আইল বাই আইল হাটতে গিয়ে কই থেকে কই যে পৌছেছে ধারনা নেই। কয়েকবার হাটতে গিয়ে আরও নিচের দিকে চলে গিয়েছে। অরুন আর পল্লবের শরীরের ব্যাথা কিছুটা কমেছে,, মৌলভীবাজার থেকে ব্যাথার ঔষধ খেয়েছিলো গতকাল রাতে। তবে বর্তমানে হাটতে হাটতে তিনজনারি পায়ে ব্যাথা হয়ে গিয়েছে,, যার ফল স্বরুপ, মুখ চুন করে হেলে দুলে হাটছে রাত্রি। হাটতে হাটতে হুট করেই পায়ের পাতায় পিচ্ছিল কিছুর আভাস পেয়ে পল্লবের নাম ধরে চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা। সাথে সাথে ওর দিকে ফিরে তাকালো অরুন পল্লব। কি হয়েছে জানতে চাইলে রাত্রি পায়ের দিকে ইশারা করলো,, মাঝারি সাইজের দুটো জোক রাত্রির পায়ে আটকে গিয়েছে,, রাত্রি সেদিকে তাকিয়ে বমি করার মতো ওয়াক ওয়াক করতে লাগলো। ব্যাচারি জোক যতোটা ভয় পায় তার থেকেও বেশি ঘিন্না করে। অরুন আবার এসবে বেশ ভয় পায়,, তাই সে ছিটকে কিছুটা দূরে সরে গেলো। পল্লব সেদিকে তাকিয়ে হাসলো, ঝুকে রাতের পা থেকে একে একে দুটো জোক সরিয়ে ব্যাঙ্গাক্তক স্বরে বললো —
,,, এভাবে ভীতুর মতো দূরে সরে গেলে সারা জীবন এটাকে সামলাবি কি করে? তর বউ তো মহা ভীতু,, সব কিছুতেই ভয় পায়, কেদে কুটে একশা করে ফেলে। একটু সাহসী হো ভাই।
,,, অরুন মুচকি হাসলো,, রাত্রিকে টেনে বাহুবন্ধনে নিয়ে বললো– তুই, তরা সবাই আছিস তো। তরা থাকতে আমার অতো চিন্তা কিসের,, আমি যা পারবো না তরা সবাই মিলে তা উৎরে দিবি।
,,,, বিনিময়ে মুচকি হাসলো পল্লব,, আবারও হাটা ধরলো তিনজন,, তবে রাতের মনটা কেমন ভার হয়ে এলো। সে কি পল্লবের উপর একটু বেশি ই নির্ভরশীল হয়ে পরেছে? নয়তো সে বিপদে পরুক কিংবা কিছু প্রয়োজন পরলে অরুনের পরিবর্তে পল্লবকে কেনো ডাকে? এটা কি অভ্যাস নাকি অন্যায়? পল্লব একটা সুন্দর গানে শিষ বাজাচ্ছে,, রাত্রি হুট করেই মাথা থেকে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে সেই শিষের তালে গান গেয়ে উঠলো, অরুন ও যুক্ত হলো তাতে। দিনের আলো আরও কিছুটা প্রখর হতেই পাহাড়ের কোল থেকে থামি ও ফতুয়া পরিহিত কয়েকজন রমনি কাধে ঝুড়ি ঝুলিয়ে চা পাতা তোলায় ব্যাস্ত হলো। হাটতে হাটতে তাদেরকেই দেখতে লাগলো রাত্রি। মনে মনে নিয়ত করলো একদিন সবাই মিলে এখানে এসে এরকম থামি পরে চা পাতা তুলবে।
,,,,টানা ৫ ঘন্টা হাটাহাটির পর সারে আটটার দিকে ” ক্রুস গীর্জার সামনে এসে পৌছালো তিনজন।চার্চটা ততোটাও আধুনিক না, পুরোনো আমলের দুটো বিল্ডিং আরেকটা মাটির ঘর। জায়গায় জায়গায় ক্রুস চিন্হের পিলার বসানো,, সবকয়টা পিলারি ইটের তৈরি, আস্ত্র করা হয়নি বিদায় শেওলা পরে গিয়েছে। বড়ো বিল্ডিং এর ভিতর থেকে গসপেল সং এর শব্দ আসছে,, হয়তো কোনো নান বাচ্চাদেরকে তাদের প্রভুর প্রার্থনা পাঠ শিখাচ্ছে। আপাতত বাহিরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। পল্লব, অরুন রাত্রি আরেকটু এগিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই একটা ছেলেকে দেখতে পেলো। ছেলেটির পরনে কালো কাপর, লুঙ্গির মতো পরেছে আর গায়ে কালো চাদর পেট আর বাহু পেচিয়ে দেওয়া। ছেলেটি গাছের পিছনে লুকিয়ে থাকায় এতোক্ষণ তাদের নজরে পরেনি,, ছেলেটা কেমন চোরের মতো মুখ করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে নিশ্চয়ই প্রার্থনা ছবক শিখবেনা বলেই এখানে লুকিয়ে আছে। ফাকিবাজ স্টুডেন্ট!! অরুন মনে মনে নাক শিটকে বাচ্চাটির উদ্দেশ্যে বললো — এই পিচ্চি!! একটু এদিকে আসো তো।
,,, পিচ্চি ডাকটা বোধহয় ছেলেটির পছন্দ হয়নি,, ডাক শুনেই কেমন কপালে তিনটা ভাজ ফেলে দিয়েছে। কিছু মুহূর্ত ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে পরোক্ষনেই মুখ বাকিয়ে নিলো। এইটুকুনি ছেলের ভাব দেখে বিরক্ত হলো অরুন। আবারও ডাকলো,, এই পর্যায়ে ছেলেটি ফিরেও তাকালো না। অগত্যা উপায় অন্তর না পেয়ে তারাই এগিয়ে গেলো,, ছেলেটর সামনে দাড়িয়ে অরুন আবারও ডাকলো — এই যে তোমাকে যে ডাকছি, শুনতে পাচ্ছো না?
,,, ছেলেটা এবার তাকালো,, চোখে মুখে গম্ভীরতা নিয়ে বললো — শুনেছি কিন্তু যাওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি তাই যাইনি।
,,, ছেলেটির কথা বলার দরন একদম অর্পনার মতো,, অরুনের বুকটা কেমন করে উঠলো। রাত্রি ছেলেটির দিকে ঝুকে গেলো,, নমনীয় কন্ঠে বললো — কেনো? প্রয়োজন মনে করোনি কেনো?
,,, ছেলেটি অরুনের দিকে আঙুল তাক করে নাক ফুলিয়ে বললো– এই কাকুটা আমাকে পিচ্চি বলে ডাকলো কেনো? আমি কি পিচ্চি?
,,, অরুন কপাল কুচকে নিলো,, দাতে দাত চেপে পল্লবের দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখিয়ে বললো
,,, আমাকে ওর কাকুর মতো লাগছে? কাকু?
,,, পল্লব মাথা ঝাকিয়ে শায় জানালো,, রাত্রি না চাইতেও হেসে ফেললো। সে বাচ্চাটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো– একদমি না, তুমি তো বড়ো কিন্তু আমরা তো তোমার নাম জানি না তাই কাকুটা তোমাকে এই নামে ডেকেছে। তোমার নাম কি বাবা?
,,, জিসু!!
,,, বাহ!! খুব সুন্দর নাম। আচ্ছা জিসু!! আমাদের জন্য একটা কাজ করে দিতে পারবে?
,,, ছেলেটি রাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো– আপনি সুন্দর আছেন আপনার জন্য করাই যায় কিন্তু ঐ কাকুটা সুন্দর না, বাজে। ঐ কাকুটা আবার সুন্দর আছে।
,,, অরুনের রাগের পারদ এবার আকাশ ছুলো,, দাত কিরমির করে তাকাতেই রাত্রি চোখ রাঙালো। এটুকু ছেলের সাথে ঝগড়া করবে নাকি এই ছেলে? রাত্রির চোখ রাঙানিতে দমে গেলো অরুন,, রাত্রি বললো — এভাবে বলতে হয়না বাবা,,এই পৃথিবীতে সবাই নিজ নিজ দিক থেকে সুন্দর। যাই হোক!! তোমাদের এখানকার ফাদার কোথায়? ওনার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ করাতে পারবে?
,,, ফাদার? ফাদার তো প্রার্থনা করছে,, চলুন আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি।
,,, ওহুম!! আমরা মুসলিম,, আমরা তোমাদের ইশ্বরের উপাসনার স্থানে যেতে পারবো না, আমাদের আল্লাহ নারাজ হবেন। তুমি একটু তোমার ফাদারকে ডেকে আনতে পারবে?
,,, রাত্রির কথায় ছেলেটি কেমন ভাবুক হলো,, কিছুক্ষণ বুদ্ধিজিবীর মতো ভাবা ভাবি করে বললো — আপনারা অপেক্ষা করুন,, আমি ফাদারকে নিয়ে আসছি।
,,, ছেলেটি চলে যেতেই সোজা হলো রাত্রি,, অরুন আর পল্লব এগিয়ে গিয়ে কনক্রিটের বসার জায়গাটাতে বসে পরলো,, রাত্রিও রয়ে সয়ে বসলো সেখানে। অরুন রাগ ঢাগ সরিয়ে কোমন হতাশ কন্ঠে বললো–
,,, কি মনে হয়? ইরাদকে পাওয়া যাবে এখানে?
,,, পল্লব অরুনের কাধে হাত রেখে বললো– আশা করতে ক্ষতি কি?
অরুন উত্তর করলো না,, পল্লব ও আর কিছু বললো না। অনেকটা সময় পেরুনোর পর ছেলেটাকে আসতে দেখা গেলো, তার পিছনে বৃদ্ধ একটা লোক, গায়ে ছেলেটির মতো করেই কালো চাদর জড়ানো। লোকটাকে দেখে উঠে দাড়ালো তিনজন,, এগিয়ে গেলো কিছুটা,, মুখোমুখি হতেই লোকটা প্রশ্ন করলো–
,,,, তোমরা কারা? তোমরা নাকি মুসলিম? এখানে কি করছো? কিছু প্রয়োজন?
,,,, পল্লব উত্তর করলো — আমরা এখানে একজনার খোজে এসেছি,, সে আমাদের বন্ধু,,তার ধর্ম খ্রিস্টান। কয়েকদিন আগে বাড়িতে ঝগড়া করে কোথাও একটা চলে গিয়েছে,, মেয়েটার মা আশঙ্কা করছে সে নাকি এই গীর্জায় এসেছে। ছোট থেকেই নাকি বাড়িতে রাগারাগি হলে বা কোনো কারনে কষ্ট পেলে এখানে চলে আসতো এখনো হয়তো তাই করেছে।
,,, ফাদার প্রশ্ন করলেন– তার নাম?
,,, অরুন বললো– ইরাদ, না মানে জাহিন।
,,, এই নামের তো কাউকে আমি চিনি না বাবা,, তার কি অন্য কোনো নাম আছে?
,,, রাত্রি বললো– না, এটাই তো ওর নাম। পুরো নাম রুমজাহিন সওদাগর ইরাদ।
,,, ফাদার এবার ভাবুক হলো,, নামটা দুবার আওড়ালেন — রুমজাহিন? রুমজাহিন? তোমরা কি রুমির কথা বলছো?
,,, এরুপ নাম শুনে তিনজনাই অবাক হলো– রুমি?
,,, হুম রুমি,, ওই ছোট থেকে বাড়িতে রাগারাগি হলে শান্তির খোজে এখানে চলে আসে,, সওদাগর বাড়ির মেয়ে। ( ফাদার)
,,,ও কি সবসময় সাদা জামা পরে? ( রাত্রি)
,,, হুম!! ৯ বছর বয়স থেকেই। ( ফাদার)
,,, রাত্রির চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠলো,, কাপা কাপা কন্ঠে বললো— হ,হে ওই আমাদের ইরাদ,, ওর সাথে দেখা করবো। ও কোথায়?
,,,, ফাদার কিছুটা দূরে টিলার মতো উচু জায়গার দিকে ইশারা করে বললো– দেখা করতে হলে তোমাদেরকে ওই পাহাড়ের চুড়ায় উঠতে হবে,, একেবারে শীর্ষে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ওখানেই গিয়েছে মেয়েটা, কখন ফিরবে জানিনা। এসে থেকে বেশি ভাগ সময় ওখানেই থেকেছে, কারোর সাথে কথা বলে না, ঠিক মতো আহার করে না, সারাক্ষণ ওখানে নয়তো ওইযে ওই ঘরটায় চুপচাপ বসে থাকে। ( মাটির ঘর দেখিয়ে)
,,, ফাদারের মুখ থেকে কথা বেড়ুতে দেরি রাত্রি ছুটে যেতে দেরি করলো না। অরুন করুন দৃষ্টিতে পল্লবের দিকে তাকালো। পল্লব তপ্ত শ্বাস ফেলে ফাদারের দিকে অনুতপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললে — কিছু মনে করবেন না,, ও এরকমি। আপনি আজ্ঞা দিলে আমরাও ওদিকে রওনা দিতাম।
,,, ফাদার চোখের ইশারায় শায় দিয়ে ফিরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই দুই বন্ধু রাত্রির চেয়েও দ্রুত কদমে ছটে গেলো উপরের দিকে,, যেনো ওখানে তাদের প্রান ভোমরা লুকিয়ে রাখা, যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধার করতে হবে। রাত্রি হন্ত দন্ত পায়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতেই সাদা শাড়ি পরিহিত ইরাদকে দেখতে পেলো,, হাটুতে মুখ গুজে বসে আছে রমনী,, লম্বা চুলগুলো মাটি ছুয়েছে,, সূর্যের আলো আর বাতাসের তোপে উষ্কখুষ্ক হয়ে ছুটছে এদিক ওদিক। রাত্রি কেমন কাপা কাপা কন্ঠে ডাকলো — ইরাদ!!
,,, বহুদিন পর খুব পরিচিত কন্ঠ শুনে ধ্যান ভাঙলো ইরাদের,, পিছন ঘুরে তাকাতেই হৃদ যন্ত্রটা কেমন দিক হাড়ালো,, বুঝতে পারছেনা এটা স্বপ্ন নাকি সত্যি। রাত্রি ছুটে গিয়ে ইরাদকে জড়িয়ে ধরলো,, এই পর্যায়ে সম্ভিত ফিরলো ইরাদের। বুঝলো এটা কোনো স্বপ্ন না, সত্যি ই তার বন্ধু বান্ধব তার কাছে এসেছে। ইরাদ আরও শক্ত বাধনে বেধে নিলো রাতকে। রাত্রি ফুপিয়ে উঠলো,, ইরাদ নিজেও কেদে ফেললো,,এতোদিন জমিয়ে রাখা কান্না গুলোকে উগরে দিলো অবলীলায়,, ঠোঁট ফুরে বেড়িয়ে এলো একটা বাক্য — আমার কেউ রইলো না রাত,, আব্বুজান আমাকে একেবারে ত্যাগ করেছে। আমি বেচে থাকতেই আমার সমাধি দিয়েছে। আব্বুজান কেনো আমাকে ভালোবাসলো না? আমি কেনো ছেলে হলাম না? সিদ্বার্থ কেনো বার বার ঠকালো আমায়?
,,,, রাত্রি কিছুই বলতে পারলো,, সে শুধু কেদেই যাচ্ছে।
দের কান্না কাটির মাঝেই অরুন আর পল্লবের আগমন ঘটলো,, অরুন এগিয়ে দিয়ে রাত্রিকে মাটি থেকে টেনে তুললো। পল্লব ইরাদকে টেনে বললো — এদিকে আয়, উঠ!! কি পাগলিনীর মতো অবস্থা করেছিস নিজের? এমনি কালি তার উপর এখানে থেকে থেকে আরও কালো হয়েছে,, এগুলো চুল নাকি কাকের বাসা? আবার সাদা শাড়ি পরেছে,, এসব কে দিয়েছে তকে? বিদবা নারী,, নাদানের বাচ্চা!! তর বাপ তকে বের করে দিয়েছে তাতে কি? ঢাকা চিনিস না? নাকি ঢাকা কিভাবে যেতে হয় সেটা জানিস না। আমরা কি মরে গিয়েছি? তরা শুধু একটা কথাই বলতে জানিস,, আমার কেউ নেই,, ওই বেয়াদবটাও একই কথা বলে পালানোর চেষ্টা করেছে। ভাই তদের কি আমাদের মানুষ মনে হয়না? বন্ধুরা কি আপন জনের কাতারে পরেনা?
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬০
,,, পল্লবের অতো কথা মাথায় নিলোনা ইরাদ,, পল্লবের বাহুতে মাথা হেলিয়ে ঝরঝর করে কেদে দিলো। রাত্রি এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো দুজনকে,, অরুন ও যুক্ত হলো তাতে শুধু ফাকা পরে রইলো অর্পনার জায়গাটা। আবার কবে পঞ্চ মুর্তি এক হবে? আবার কবে গ্রুপ হাগটা পূর্নতা পাবে? হয়তো খুব শীগ্রই,, অর্পন তো এখন বিপদ মুক্ত।
