Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬১

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬১

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬১
রুপান্জলি

সিঙ্গাপুর,,,,
,,, সময় পেরিয়েছে আরও তিনদিন,,উচ্চ পাওয়ারের ঔষধ খাওয়ার ফলে অপারেশনের পর থেকে আজ পর্যন্ত সবকয়টা দিন অর্পনা ঘুমের মাঝেই কাটিয়েছে,, যতটুকু সময় জেগে ছিলো সেই সময়টাতে হয় নার্সদের সামনে পেয়েছে নয়তো ডক্টরদের মধ্যে কাউকে। কখনো কখনো ভাগ্য ভালো হলে দ্বীপ কিংবা আরশাদ জামানের দেখা পেয়েছে। তবে আজ ব্যাপারটা ভিন্ন,, অপারশনের পঞ্চম দিন থেকে ব্রেইন রেসপন্স করলেও আজ সকাল থেকে টুকটাক কথা বলতে পারছে মেয়েটা।অপারেশনের ক্ষততেও কিছুটা টান ধরেছে,, তাই সকালের অন ডিউটিতে ডক্টর ইমরা ফাহরিম অর্পনার বুকের বড়ো বেন্ডেজটা খুলে ক্লিন ড্রেসিং করে আবারও স্বল্প পরিমানে বেন্ডেজ করে দিয়েছিলেন। এই বেন্ডেজ খোলা হবে আরও সাত-আট দিন পর,, অর্পনা যখন নিজ থেকে উঠে বসতে পারবে, টুকটাক হাটা চলা করতে পারবে তখন। অর্পনার সাস্থের কিছুটা উন্নতি দেখে গতোকাল রাত্রেই আব্রাহাম ঔষধের পাওয়ার অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছিলো। আপাতত সকাল বেলা অর্পনাকে সেই ঔষধ ই দেওয়া হয়েছিলো,, যার ফল স্বরুপ অর্পনা আজ আর বেহুসের মতো ঘুমায়নি,, বেলার অনেকটা সময় ই জেগে ছিলো। এই জেগে থাকা মুহুর্তে সে একবারও বাবা কিংবা স্বামীর দেখা পায়নি। প্রতিদিনকার ন্যায় সকালে কোনো রকমে নার্সের হাতে নাস্তা করলেও দুপুরের খাবার খাওয়ার বেলায় বেকে বসলো অর্পনা।

,,,বেলা বারোটা পেরুতেই অর্পনার ক্যাবিনে খাবার নিয়ে হাজির হয়েছিলেন নার্স কিন্তু মেয়েটা ছাফ ছাফ জানিয়ে দিয়েছে,, সে খাবেনা। কেনো খাবেনা জানতে চাইলেও কোনোরুপ উত্তর করেনি,, নার্স অনেক অনুরোধ করেছে কিন্তু মেয়েটা নাছোড়বান্দা,, সে খাবেনা মানে খাবেই না। ডক্টর আব্রাহাম জাহাঙ্গীরের তীব্র নির্দেশ,, কোনো মতেই প্যাশেন্টকে জোর জবরদস্তি করা যাবেনা। অগত্যা নার্স ও নিরুপায় হয়ে শুধু অনুরোধ করেই গেলেন,, নার্সের কান্ডে বেশ বিরক্ত হয়েছে অর্পনা,, কথা বাড়াবে না বলে চোখ বুঝে রেখেছিলো। সেই চোখ বুঝে রাখার মাঝেই নতুন করে ঘুমেরা হানা দেওয়ায় এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আছে রমনি। আরসাদ জামান মেয়ের পাশে বসে আছেন প্রায় দুই ঘন্টা হতে চললো,, উনাকে নার্স গিয়ে ডেকে এনেছেন। বেলা পেরিয়ে ২ টা, প্যাসেন্ট যদি খাবার না খায় তাহলে ঔষধ দিবেন কি করে? এই মুহুর্তে অর্পনার হার্ট ঠিক রাখার জন্য টাইম মাফিক ঔষধ সেবন করা খুবি গুরুত্বপূর্ণ। আরশাদ জামান একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিলেন ১ টা ৪৭ মিনিট। বাংলাদেশে স্বাভাবিক ভাবে মানুষ তিন বেলা খাবার খেলেও সিঙ্গাপুরে সেটা বিকাল সহ চার বেলা ধরা হয়। হসপিটালে টাইম টু টাইম ঘন্টা মেপে মেপে ঔষধ খাওয়ানো হয়। যা বর্তমানে অর্পনার বেখেয়ালির কারনে বহু আগেই ফুরিয়ে গিয়েছে। আরশাদ জামান একবার ভাবলেন মেয়েকে ডাকবেন কিন্তু অসুস্থ মেয়েটার ঘুম ভাঙাতে বড্ড মায়া হচ্ছে উনার। সেই সাথে আজ মেয়েটার মুখোমুখি হতেও বড্ড ভয় হচ্ছে।

মেয়েটা যদি উনাকে অস্বীকার করে? বাবা বলে মানতে না চায়? দূরে সরে যায়? তখন কি করবেন তিনি? বাচবেন কি করে? অর্পনার বাবার পরিচয় ব্যাতিত এই পৃথিবীতে বেচে থাকা আরশাদ জামানের কাছে মৃত্যু যন্ত্রণার সমান। এই যন্ত্রণা সহ্য করার নয়। আরশাদ জামানের ভাবনার মাঝেই চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। এদিক ওদিক চোখ ঘুড়াতেই বড্ড কাঙ্ক্ষিত একটা মুখের সন্ধান পেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। পাপ্পাকে লাস্ট গতকাল সকালে দেখেছিলো সে এরপর আর একবারও দেখেনি। তাকিয়ে থাকার মাঝেই অর্পনার মন পুটে কেমন ব্যাথারা হানা দিলো। সে মানতেই পারছেনা এই পাপ্পাটা তার নিজের বাবা না,, কেমন ভিতরটা হাসফাস লাগছে,, কান্না পাচ্ছে,, কিন্তু অর্পনা কাদলো না। সে এতোটাও ইম্মেচিউর নয় যে বিষয়টা নিয়ে বার বার কান্নাকাটি করবে। যা হয়েছে হয়েছে,, কান্নাকাটি করলেই তো সব মিথ্যা হয়ে যাবেনা তাই না? অর্পনা খেয়াল করলো তার পাপ্পাটাকে কেমন অপ্রস্তুত দেখাচ্ছে,, বার বার এদিক ওদিক তাকিয়ে কান্না আটকানোর প্রয়াশ চালাচ্ছে বোধয়। অর্পনা পরিবেশ স্থিতিশীল করতে ঠোঁট বাকিয়ে সুক্ষ হাসলো,, বুকে এক পাহাড় সমান দুঃখ লুকিয়ে আগের মতো করে ডাকলো — হোয়াট্স আপ ইয়ং ম্যান? ভালো?

,,, মেয়ের কথায় চমকালেন আরশাদ জামান। এতোক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেকে শক্ত করার আপ্রান চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। ভাবতে পারেননি অর্পনা আগের মতো করে কথা বলবে। মেয়ের স্বাভাবিক আচরনে আরশাদ জামানের চোখে পানি জমা হলো,, অর্পনা বাবার দিকেই তাকিয়ে ছিলো,, পাপ্পার চোখে পানি দেখে অর্পনা পাপ্পার হাতে হাত রাখলো। সাথে সাথে মেয়ের হাত আকরে ধরে ঝরঝর করে কেদে দিলেন আরশাদ জামান। অর্পনার হাতে কপাল ঠেকিয়ে ভাঙা কন্ঠে আওড়ালেন — মা!! তুই কি পাল্টে যাবি? আমি তর নিজের বাবা নয় বলে দূরে সরে যাবি? আমার যে তুই ছাড়া কেউ নেই। আমার কেমন যেনো নিজেকে পর পর মনে হচ্ছে,, আমি কি তর আপন কেউ না? জন্ম না দিলে কি বাবা হওয়া যায় না?

,,, আরশাদ জামান কাদলেও অর্পনা নির্বিকার,, তার চোখে পানি নেই আর না চোখ জ্বালা করছে। সে আরশাদ জামানের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে আনলো,, অবাক হলেন আরশাদ জামান। অর্পনা ফের মুচকি হেসে পাপ্পার চুল গুলো এলোমেলো করে দিতে দিতে বললো — বাবারা কখনো আপন পর হয়না পাপ্পা। বাবারা শুধু বাবা হয়, তাদের পরিচয় তারা বাবা,, শুধু বাবা।
,,, বলেই পাপ্পার চোখের পানি মুছে দিলো,, আরশাদ জামান মেয়ের হাতে চুমু খেলেন পরপর কপালে, চোখের পাতায়। অর্পনা হাসলো,, আগের মতোই আদুরে হয়ে উঠলো পাপ্পার সাথে। অর্পনা জানে তার বায়োলজিক্যাল ফাদার কে? এতোটুকু বুঝার মতো ক্ষমতা তার ব্রেইনের রয়েছে। এমনি এমনি ই তো পারু আর তার চেহারা এক হয়ে যায়নি। তার আগেই বুঝা উচিৎ ছিলো দুটো মানুষ একই রকম দেখতে হয় কখন? হয় জমজ হলে নয়তো আপন বোন হলে। একই পৃথিবীতে সাতজন মানুষ অকারনেই সেইম দেখতে হয় এই উক্তিটাি বা কতোটুকু যৌক্তিক? আর বিষয়টা যদি সত্যি হয় ও তাহলে খোঁজ নিলে দেখা যাবে কোনো না কোনো দিক থেকে তাদের মধ্যে বহু যুগ আগের যোগসূত্র রয়েছে। আপাতত নিজের বায়োলজিক্যাল ফাদার, মাদার, সিস্টার কিংবা ব্রাদার নিয়ে ভাবতে চায়না অর্পনা। আগে নিজেকে একটু সামলে নিক, মনটা পরিস্থিতি মানতে শিখুক তারপর নাহয় একবার নিজের বাপের ভিটা জয়পুর হাট-টা দেখে আসবে। বাবা মা, ভাইয়ের সাথে দেখা করে আসবে,, পারু তো মারাই গেলো। অর্পনা সেসব ভাবতে পারলো না,, সে অসুস্থ,, এই মুহুর্তে পারু তার বড়ো বোন অথচ মারা গিয়েছে ভাবতে গেলেও তার বড্ডো কষ্ট হবে,,তাই আপাতত এসব ভাবনা বাদ। আরশাদ জামান মেয়েকে মন ভরে আদর করে ক্ষান্ত হলেন,, অর্পনাকে ধীরে ধীরে উঠিয়ে বালিশের সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে বেল বাটন চেপে নার্সকে ডেকে পাঠালেন। নার্স বাটিতে করে লাউ সিদ্ধ আর চিকেন স্যুপ নিয়ে এলেন। খাবারটা মেডিসিন টেবিলের উপর রেখে চলে যেতেই আরশাদ জামান হাত স্যানিটাইস্ড করে চামচ দিয়ে চিকেন স্যুপ এগিয়ে দিতেই ভ্রু গুটালো অর্পনা। মুখ ফিরিয়ে বললো — আমি খাবো না পাপ্পা।

,,, কেনো প্রিন্সেস? দেখো তো কয়টা বাজে,, ২ টা ৩। একটু পর লাঞ্চ টাইম ওভার হয়ে যাবে,, ঔষধ খাওয়ার সময় ও ৪৩ মিনিট আগে পার হয়ে গিয়েছে। একটু খেয়ে নাও মাম্মা,,
,,, বলেই আবারও চামচ এগিয়ে দিতেই অর্পনা ফের নাকোচ করে বললো– খাবার ও খাবো না,, ঔষধ ও খাবো না।
,,, কেনো খাবেনা বলো,,
,,, এই পর্যায়ে অর্পনার ছিমছাম গালটা হালকা ফুলে উঠলো, মুখ ঝুড়ে অভিমান — উনি কোথায়? সকাল থেকে দেখছি না যে? উনি কি শুনেননি আমি যে কথা বলতে পারছি?
,,, আরশাদ জামান মেয়ের গাল ফুলানোটা দেখলেন,, উনার মেয়ে বুঝি এভাবে গাল ফুলাতেও জানে? হুম জানে তবে সেসব ছোট বেলার কাহিনি। গতো পাচ বছর ধরে এসব আর দেখার সৌভাগ্য হয়নি উনার,, আজ দ্বীপের বদৌলতে হচ্ছে। আরশাদ জামান অর্পনার মনোভাব বুঝতে পেরেও প্রশ্ন করলেন– কার কথা বলছো? ঐ বিরক্তিকর ছেলেটার? ও তো এখানে নেই মাম্মা।

,,, কোথায় আছে?
,,, কাল রাতে তুমি ঘুমানোর পর বাংলাদেশ গিয়েছে,, এখনো ফিরেনি।
,,, এই পর্যায়ে অর্পনার গালটা আরেকটু ফুলে উঠলো। লোকটা তাকে রেখে বাংলাদেশে চলে গেলো? একবার ও তার কথা ভাবলো না? রাত পেরিয়ে, সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে এলো তবুও ফিরলো না? না ফিরুক, অর্পনার তাতে একটু ও কিছু আসে যায় না। সে মনে তীব্র অভিমান জমিয়ে উত্তর করলো — ফিরতে হবেও না, উনাকে বলো বাংলাদেশেই থেকে যেতে। আমি কিছু খাবো না, এসব ফেলে দাও।
,,, মেয়ের কথায় অবাক হলেন আরশাদ জামান — ঐ বিরক্তিকর ছেলেটা নেই বলে তুমি এতোক্ষণ খাবার খাওনি?
,,, অর্পনা কিছু বললো না,, বলতে পারলো না। পাপ্পাকে কি এসব বলা যায় নাকি? লজ্জা সরমের ও তো একটা ব্যাপার আছে, নাকি? আরশাদ জামান তপ্ত শ্বাস ফেললেন,, যা বুঝার বুঝা হয়েছে। খাবারটা পাশের মেডিসিন টেবিলের উপর রাখতেই ক্যাবিনের দরজা খোলার শব্দ হলো। ঘাড় বাকিয়ে সেদিকে তাকালেন তিনি,, অর্পনাও তাকিয়েছিলো। দ্বীপকে দেখে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। শক্ত মানবকে আজ বেশ পরিপাটি লাগছে। গায়ে অফ-হোয়াইট শার্ট, পিচ রঙা পেন্ট। বাম হাতে সিলভার ওয়াচ, ডান হাতে সিলভার ব্রেসলেট,, তুলনামূলক ভাবে গতো সাত দিনের মধ্যে আজ একটু বেশি ই সুন্দর লাগছে,, যেনো আগের বিরক্তিকর ছেলেটাকে দেখতে পেলেন আরশাদ জামান। দ্বীপ ক্যাবিনের দরজা টেনে ভিতরে আসতেই আরশাদ জামান উঠে দাড়ালেন,, মেয়ে আর মেয়ে জামাইয়ের মাঝে থাকাটা বড্ড অশোভনীয় দেখায়। আরশাদ জামানকে চলে যেতে দেখে অর্পনা বাবার হাত টেনে ধরলো — যেওনা না পাপ্পা, বসো,, আরেকটু কথা বলি।

,,, আরশাদ জামান মেয়ের থেকে হাত ছাড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো– তোমরা কথা বলো, আমি একটু আব্রাহামের সাথে দেখা করে আসছি।
,,, বলেই বাহিরের দিকে চলে গেলেন আরশাদ জামান। পাপ্পা চলে যেতেই অর্পন আবারও অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। দ্বীপ বউয়ের হাব ভাব পরখ করতে করতে এগিয়ে এসে টুলটাতে বসলো। তাকিয়ে রইলো অপলক,, তবে কিছু বললো না, অর্পনাও তাকালো না। এভাবেই কাটলো অনেকটা সময়,, অর্পনার ফুলে উঠা গাল দেখে দ্বীপ উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে পকেট হাতড়ে কিছু একটা বের করলো,, পরপর আস্তে করে ছুড়ে মারলো অর্পনার মুখের উপর। নিশানায় পারদর্শী দ্বীপের নিশানা ভুল হলো না,, বস্তুটা একদম অর্পনার মুখের উপর গিয়ে পরলো। পরিচিত ঘ্রাণ নাকে ঠেকতেই ভ্রু গুটিয়ে নিলো অর্পনা, হাত উচিয়ে বস্তুটা ছুয়ে দিতেই ভ্রু জোড়া শিথিল হয়ে এলো। আচমকাই ঠোঁট ফুরে বেড়িয়ে এলো– কাঠ গোলাপ কোথায় পেলেন?

,,, বাংলাদেশ থেকে এনেছি।
,,, হঠাৎ?
,,, সেদিন বলেছিলেনা ওসব তোমার চাই, তাই।
,,, অর্পনা এই পর্যায়ে দ্বীপের দিকে তাকালো, পরখ করলো সম্পূর্ণ কায়া। লোকটাকে একটু বেশি সুন্দর লাগছে না? হুম, অনেকটাই।অর্পনা মনে মনে খুশি হলেও মুখে গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে বললো– সিঙ্গাপুরে অহরহ কাঠগোলাপ পাওয়া যায়,, এগুলো আনতে বাংলাদেশে যেতে হবে কেনো? ছলনা করছেন?
,,, দ্বীপ চিকেন স্যুপের বাটি টা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললো — তুমি যেই গাছের ফুল চেয়েছিলে সেই গাছটা বাংলাদেশের।।
,,,, যেই গাছের ফুল চেয়েছি ঐ গাছেরি দিতে হবে কেনো? ফুল তো ফুল ই হয়।
,,, দ্বীপ উত্তর করলো না। চামচে স্যুপ নিয়ে অর্পনার দিকে এগিয়ে দিলো,, মুখ ফিরিয়ে নিলো মেয়েটা। দ্বীপ হাত বাড়িয়ে আবারও মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলো, অর্পনা ফের মুখ ফিরাতে নিলে চোখ পাকালো দ্বীপ। লোকটার চোখ পাকানিতে অর্পনা ভয় পায়না তবে স্বামীকে সম্মান করার খাতিরে মুখ ফুলিয়ে খেয়ে নিলো। অর্পনার মুখ ফুলানোতে পাত্তা দিলো না দ্বীপ,, একটার পর একটা চামচ ভর্তি স্যুপ এগিয়ে দিতে থাকলো। অর্পনাও বাক্য ব্যায় না করে মেনে নিলো। অনেকটা সময় পেরুনোর পর অর্পনা ফুলের মালাটা হাতে পেচাতে পেচাতে বললো–

,,, দেখে তো এখনো তরতাজাই মনে হচ্ছে,, নিজে কুড়িয়ে এনেছেন? নাকি অন্য কাউকে দিয়ে?
,,, নিজেই।
,,, সিরিয়াসলি? কেউ দেখেনি?
,,, হুম অনেকেই দেখেছে।
,,, সম্মানে লাগেনি?
,,, সম্মানের থেকেও তুই খুব মুল্যবান।
,,, আপনি একটা মারাত্মক পরিমানের ছলনা কারী,, এক মুখে দুই কথা বলেন। দু-মুখো সত্তা আমি অপছন্দ করি।
,,, এরুপ কথা বলার কারন?
,,, সেদিন আমায় নিয়ে আফসোস করেছিলেন আজ মুল্যবান বলছেন। মুখ তো একটাই কথা দুটো হয় কেনো?
,,, আজ স্বামী সত্তাকে দেখছিস,, সেদিন দ্বীপ মির্জাকে দেখেছিলি। কি ভাবিস? তর কাছে যেমন থাকি,, দ্বীপ মির্জা স্বভাবতই তেমন?

,,, অর্পনা উত্তর করতে পারলো না। কি বলবে? সে তো জানেই এই লোক কেমন। জেনে শুনেই তো জীবনে এসেছিলো। এখন নাটক করে তো লাভ হবে না। অর্পনা ফুলটা নাকে ঠেকিয়ে ঘ্রান নিলো,, ফুলের সৌন্দর্যের তুলনায় ঘ্রাণ অত্তন্ত খিন। তবুও সেই ঘ্রাণ চোখ বুঝে গ্রহণ করলো রমনি। যা সহজে, বলার সাথে সাথে পাওয়া যায়, তা পেয়ে মানুষ যতোখানি আনন্দিত হয় তার চেয়েও শতগুণ বেশি আনন্দিত হয়, পাবো না জেনেও হুট করে কাঙ্খিত জিনিসটা পেয়ে যাওয়ার পর। তাও এমন লোকের কাছ থেকে যেই লোকটার দ্বারা এসব কখনোই সম্ভব ছিলো না। সেদিন যদি দ্বীপ অর্পনাকে সেই ফুল গুলো কুড়িয়ে দিতো তাহলে অর্পনা খুশি হতো কিন্তু আজ অন্যরকম অনুভুতি হচ্ছে। অর্পনার ভালো লাগছে,, সদ্য স্থাপন করা হৃদয়ে সুখের হাওয়া বইছে কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না। অর্পনা কেনো যেনো ভিতরে চলা অনুভূতি গুলো প্রকাশ করতে অপারগ। অর্পনার গভীর ভাবনার মাঝে হুট করে মুখের উপর পরিচিত গরম নিশ্বাস আছড়ে পরতেই তড়িৎ বেগে চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। দ্বীপ তার দুপাশে দুহাত রেখে তাতে ভর দিয়ে তার মুখের উপর ঝুকে আছে,, চোখে মুখে তীব্র রাগ,, অর্পনা ভ্রু গুটিয়ে প্রশ্ন করলে — কি চাই?
,,, দ্বীপ আরও একটু ঝুকে এলো, দুজনার মাঝে খুব একটা দূরত্ব নেই,, রাগের তোপে লোকটার নিশ্বাস ভারি হয়ে এসেছে। চোয়াল হয়েছে শক্ত, অর্পনা কিছুটা ভয় পেলো। এইতো লোকটা ভালো মতো কথা বলছিলো, হুট করে রেগে গেলো কেনো? অর্পনার প্রশ্নে দ্বীপ কাট গলায় উত্তর করলো — জবাবদিহি।

,,, ভয়ে অর্পনার চোখের পাতা বার কয়েক নড়ে উঠলো, কাপা কন্ঠে সুধালো — কিসের?
,,, তুই কবে থেকে সেচ্ছায় উল্টো পাল্টা ঔষধ খাওয়া শুরু করেছিস?
,,, দ্বীপের এহেন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পরলো অর্পনা,, এটারি ভয় করছিলো এতোক্ষণ,, দ্বীপ না জানি কি অবস্থা করে তার। অর্পনাকে চুপ থাকতে দেখে দ্বীপের রাগ আরও বাড়লো, লোকটার কপালে ভাজ পরতেই অর্পনা ঢোক গিলে বললো– চার বছর আগে থেকে।
,,, কেনো?
,,,, এমনি।
,,, হোয়াট এমনি? এমনি এমনি কেউ ক্যান্সার, এলার্জি, প্রদাহ,অটোইমিউন, নাক বন্ধ, সব ঔষধ মিলিয়ে খায়? তুই ক্যান্সারের রুগি? কোথায় ক্যন্সার হয়েছে তর,, দেখি।
,,, বলেই এক হাতে ভর রেখে অন্য হাতে অর্পনার চোয়াল ধরে নাড়াচাড়া করতে লাগলো দ্বীপ। দ্বীপের বলা প্রতিটি কথা ও আচরনে হিংস্রতা প্রকাশ পাচ্ছে,, লোকটা একপ্রকার সাপের ন্যায় ফুসছে। অর্পনা চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো,,কোনোরকম সাহস নিয়ে আওড়ালো — ম, মরতে চেয়েছিলাম তাই।
,,, তাহলে আমার জীবনে কেনো এসেছিলি? তুই জানিস,, তুই বেশিদিন বাচবি না। যখন তখন মারা যেতে পারিস। তাহলে আমার জীবনে কেনো এসেছিস? আমাকে আবারও ধ্বংস করতে?
,,, দ্বীপের কথায় অর্পনা চোখ মেলে তাকালো,, সেকেন্ডের গতিতে পানি জমা হলো চোখে — আবারও আফসোস করছেন?

,,,, অর্পনার চোখে ছলছল করা পানি দেখে দমে গেলো দ্বীপ। চোয়াল ছেড়ে আবারও অপর পাশে হাত রাখলো। চোখে মুখের রাগি ভাব কিছুটা কমেছে,, নিশ্বাস হয়েছে ধীর, শীতল — এটাকে আফসোস বলে না অর্পন,, এটাকে নির্ভরতা বলে। এই মুহুর্তে আমি এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি,, যেখান থেকে ফিরার কোনো পথ নেই। তর প্রতি এতোটাই নির্ভরশীল হয়েছি যে তুই ছাড়া একটা মুহুর্ত ও আমার কাছে মৃত্যু সমান। অথচ তুই দুদিন আগে মরতে বসেছিলি। যদি হার্টের ব্যাবস্থা না হতো? তকে বাচাতে না পারতাম? আমার কি অবস্থা হতো? আমি কিভাবে বাচতাম?
,,, দ্বীপের সরল স্বীকারোক্তিতে অর্পনার চোখে জমা পানিগুলো গড়িয়ে পরলো,, হাত উচিয়ে দ্বীপের গালে হাত রাখলো। ছোট ছোট দুটো হাতে দ্বীপের সম্পূর্ণ মুখশ্রীতে হাত বুলালো,, ছুয়ে দিলো মানবের ঠোঁট, নাক, গাল, কপাল। দ্বীপ তখনো উত্তরের আশায় অর্পনার দিকে তাকিয়ে। অর্পনা ঠোঁট কামরে কান্না আটকানোর প্রয়াশ চালিয়ে ভাঙা কন্ঠে আওড়ালো

,,,, স,স, সরি!! কি করবো বলুন? জানি না কেনো? আমি খুব ছোট থেকেই ভালোবাসা, আহ্লাদ, আদরের পাগল ছিলাম। যে একটুখানি আদর করতো বার বার তার কাছেই যেতাম একটু আদরের আশায়। আমি মাম্মাকে খুব ভালোবাসি , এখনো বাসি,, আগেও বাসতাম। আমার মনটা অকারণেই সারাক্ষণ মা মা করতো,, পথে ঘাটে বাচ্চাদের সাথে তাদের মাকে দেখলে অনেক লোভ লাগতো কিন্তু আমার মা তো আসবে না। তার সংসার রয়েছে,, তাই মনকে বুঝাতাম সে যেনো ভালোবাসা না চায় কিন্তু আমার অবাধ্য মন তা বুঝতে নারাজ,, সে ভালোবাসা চায়,, মাম্মাকে খোজে। শুনেছি মন আর হৃদয় নাকি একই? তাই মনকে কষ্ট দিবো বলে হৃদয় জখম করার চেষ্টায় মেতেছিলাম। যে হৃদয় আমার কথা শুনে না তাকে আঘাতে আঘাতে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম৷ সফল ও হয়েছিলাম কিন্তু হুট করেই আমার পৃথিবীটা কেমন পাল্টে গেলো। কিভাবে কিভাবে যেনো আপনার কাছে পৌঁছে গেলাম আর আপনার সংস্পর্শে যাওয়ার পর আমার কি যেনো হয়ে গেলো। জীবনের এতোগুলা দিন ভালোবাসার পিছনে ছুটলেও আপনি আসার পর বুঝেছিলাম মায়া কি জিনিস। মানুষ বার বার প্রেমে পরতে পারে কিন্তু মায়া ঐ একজনার প্রতি ই আসে যাকে ছাড়া এক মুহুর্ত ও থাকা যায় না। আপনি আমার সেই মায়া দ্বীপ,, এর পর থেকে আমি আর ওসব খাইনি,, ট্রাস্ট করুন। আপনার জীবনে আসার পর আমি একদম ভালো হয়ে গিয়েছি,, কাউকে নিজের কাছ ঘেষতে দেওয়া তো দূর, মিষ্টি ভাষায় দুটো কথাও বলিনি। আমি সত্যি ই অতীতে জানতাম না আপনি আমার জীবনে আসবেন,, আমি বিয়ে করবো,, আমার একটা সংসার, স্বামী হবে। আমি তো মরবো বলে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম তাই যা ইচ্ছা হয়েছে তাই করেছি। যেভাবে প্রতিশোধ নেওয়া যায় সেই পথেই হেটেছি।

,,,, বলেই বড়ো করে দাম নিলো অর্পনা। দ্বীপ অর্পনার পাশ ঘেষে বসে পরলো,, বৃদ্ধাঙ্গুল উচিয়ে মুছে দিলো রমনির কন্দনরত চোখ জোড়া। রুক্ষ হাতটা গলিয়ে দিলো গলদেশে যার অবস্থান ধীরে ধীরে চুলের ভাজে পৌছালো। স্বামীর আদর পেয়ে মোমের ন্যায় গলে গেলো অর্পনা,,
,,, দ্বীপ!! বিশ্বাস করুন,, আমি আপনার হক নষ্ট করিনি। প্রতিশোধ প্রতিশোধ খেলায় কখনোই নিজের ইজ্জতে আঘাত হানতে দেই নি। ম*লেস্ট হওয়া ব্যাতিত অন্য কোনো দিক থেকে আমি অপবিত্র নই। তবুও আমি সরি,, আমি হয়তো বারাবাড়ি করে ফেলেছি,, হিসেব নেওয়ার মতো কেউ ছিলো নাতো তাই।
,,, এই পর্যায়ে দ্বীপের মন আরও কিছুটা গললো,, চোখে মুখের কাঠিন্য ভাবটা অনেকটাই কমে এসেছে। সে আবারও অর্পনার চোখ মুছে দিয়ে কোমল কন্ঠে বললো — আমিও সরি,, তোমাকে এতোটা হার্ট করা উচিৎ হয়নি,, অন্তত আফসোস শব্দটা ইউজ করা আমার বড্ড অন্যায় হয়েছে। কিছু মনে রেখো না,, আমি ওসব মন থেকে বলিনি।

,,, অর্পনা উত্তর করলো না,, চেয়ে রইলো লোকটার পানে। এটা আজ নতুন নয়,, এই সাতদিন বহুবার লোকটা সরি বলেছে,, ভুল স্বীকার করেছে আবার হুমকি ও দিয়েছে। রেসপন্স করতে না পারলেও সবটা শুনেছে অর্পনা,, লোকটা এতো পাগলামি করে,, অর্পনা তো মাঝে মধ্যে বিপাকে পরে যায় এটা বুঝতে বুঝতেই আসলেই এই লোক সুস্থ হয়েছে তো? নাকি এখনো পাগল ই রয়ে গিয়েছে? অর্পনার ভাবনার মাঝেই আরও কিছুটা ঝুকে এলো দ্বীপ,, এক হাতে অর্পনার মাথাটা শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বললো — নড়াচড়া করো না,, ব্যাথা পাবে।
,,, দ্বীপের এহেন কথার মানে বুঝলো না অর্পনা তাই দ্বিধান্মিত কন্ঠে কিছু বলতে নিবে তখনি আকষ্মিক হাড়ে অর্পনার উষ্ঠ যুগল দখল করে নিলো দ্বীপ। স্পর্শ অত্তন্ত কোমল এবং ধীরো। প্রতিটি স্পর্শে ভালোবাসা বিদ্যামান। অর্পনা আবেশে চোখ বুঝে নিলো। চোখ থেকে আরও দু ফোটা পানি গড়ালো। অর্পনা চাইলেই দ্বীপের সাথে ঝামেলা করতে পারতো,, ত্যারামি করে বেয়াদবি করতে পারতো কিন্তু কি দরকার? এতে সংসারে অশান্তি হবে। এই অশান্তি আর ভালো লাগছে না অর্পনার,, হাপিয়ে উঠেছে লড়াই করতে করতে। আর না,, এবার একটা সুন্দর সংসার হোক। দুটো বাচ্চা কাচ্চা হোক,, জীবনটা সাজানো উচিৎ,, কতোকাল আর ভবঘুরে হয়ে জীবন পার করবে সে? ছন্নছাড়ার এবার একটা ঘর হোক।

বাংলাদেশ,,,
শহিদ মিনারে বসে আছে ইরাদ, রাত্রি, অরুন, পল্লব। সবার মন কিছুটা ফুরফুরা,,কিছুক্ষণ আগেই আরশাদ আঙ্কেলের সাথে কথা হয়েছে,, অর্পনা এখন কিছুটা সুস্থ,, সকাল থেকেই টুকটাক কথা বলতে পারছে তবে এখনো নিজ থেকে উঠে বসতে পারেনা, হাত পা নাড়াতে চাড়াতে পারে,, ভারি খাবার ও খেতে পারে। তাদের কাছে আপাতত এটুকুই অনেক বড়ো ব্যাপার,, এভাবে একটু একটু করে সুস্থ হতে হতে অর্পনা একদিন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে। এরপর নিশ্চয়ই আবারও এক হতে পারবে পাঁচ জন? এতোকিছুর মাঝে ইরাদ কিছুটা চিন্তিত,, সে নিজের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবছে। এতোকাল তো বাপের টাকায় জীবন ঝাপন করলো,, নিজেকে কিছুই করতে হয়নি কিন্তু এখন তো বাপ থেকেও নেই। যদিও একাউন্ট এখনো লক করেনি কিন্তু ঐ টাকা ছুয়েও দেখবে না ইরাদ। এখন জীবন চালাতে গেলে তাকে কাজ খুজতে হবে,, তবে কি ধরনের কাজ করবে সেটাই খুজে পাচ্ছে না। তার আবার একটা বেড হেবিট আছে,, সে স্টুডেন্ট পড়াতে পারেনা,, মাথা গরম হয়ে যায়। কাউকে কিছু বুঝানোর পর সে যদি প্রথম বারেই বুঝে যায় তাহলে ইট্স ওকে,, কিন্তু না বুঝলে ইরাদের মাথায় রাগ চড়ে যায়,, হুট হাট মেরে বসে বাচ্চাদের। এই কারনে ইরাদের কাজিনরা কখনো তার কাছে পড়তে বসেনি,, প্রথমবার বসলেও দ্বিতীয়বার আর তাদের খুজে পাওয়া যায়নি তাই এই কাজটা সে করতে পারবে না। আবার কোথাও জব করাও তার পক্ষে সম্ভব না,, মানুষের হুকুম তামিল করা যে তার বংশে নেই। সে রক্ত গতই রানী,, সারাজীবন অন্যের উপর হুকুম করে এসেছে,, তাই অন্যের হুকুম মতো জীবন যাপন করা তার জন্য অসম্ভব প্রায়। এখন কি করা যায়? এগুলো ছাড়া তো আর কোনো কাজ তার মাথায় আসছে না যা করে নিজের পরিস্থিতি স্টেবল করা যায়। এই মুহুর্তে তার কিছু একটা করা প্রয়োজন নয়তো নিজের এবং মায়ের দায়িত্ব নিবে কি করে? ইরার গভীর ভাবনার মাঝে শুনা গেলো অরুনের উচ্ছসিত স্বর– দোস্ত!! তর জন্য একটা ভালো কাজ পেয়েছি,, যাতে তর ইগু হার্ড হবে না, মাথা গরম হবেনা আবার অন্যের হুকুম ও তামিল করতে হবে না।

,,, অরুনের কথায় সবাই চট করে ওর দিকে তাকালো,, পল্লব বললো– কি কাজ?
,,, অরুন উত্তর করলো না। রয়ে সয়ে ফোন ঘেটে কিছু একটা বের করলো। সবাইকে দেখানোর উদ্দেশ্য সামনে এনে বললো — এইযে এই ওয়্যাল ওয়াচ গুলো দেখ,, রেজিন দিয়ে বানানো। ইরাদ তো আর্ট এন্ড ক্রাফ্ট এ বেশ পারদর্শী। শুধু ওয়াল ওয়্যাচ না আরও অনেক কিছুই বানানো সম্ভব। ভালো করে দেখ।
,,, অরুন একটার পর একটা দেখাতে লাগলো। ইরাদ সেসবে নজর রেখেই বললো — হুম!! এসব আমি পারি তাও এর থেকে সুন্দর করে। কিন্তু এতে ফায়দা টা কি?
,,, ফায়দা মানে? আলবাত ফায়দা। তুই অনলাইনে বিজন্যাস করবি। এগুলো বানিয়ে বানিয়ে সেল করবি, সেই সাথে তুই তো ভালোই আর্ট করতে পারিস। এখন থেকে আর্টেও ভালো মতো ফোকাস করবি,, প্রকৃতির ছবি আকবি, মানুষের ছবি আকবি,,তারপর সেসব টিকটক, ফেইসবুক, ইন্সটাতে পোস্ট করবি। আমরাও বিভিন্ন জায়গায় প্রোমোট করবো,, ধীরে ধীরে অর্ডার আসবে,, তুই অর্ডার অনুযায়ী কাজ করবি। দেখবি একদিন তুই অনেক সফল একজন বিজন্যাসম্যান হবি।

,,, অরুনের কথাটা বেশ মনে ধরলো পল্লবের — এটা ভালো ছিলো,, এই ক্ষেত্রে বিজন্যাস ছোট হোক কিংবা বড়ো,, তুই তর বিজন্যাসের ওনার। কেউ তকে হুকুম করতে পারবে না,, আর না তকে কারোর কাছে ছোট হতে হবে।
,,, সে নাহয় ঠিক আছে কিন্তু এসব তো চারটে খানি কথা নয় ভাই,, এসব করতে অনেক টাকা লাগবে,,দামি ফোন লাগবে,, এতো টাকা আমি কই পাবো? সেই সাথে আর্টের ক্ষেত্রে আমি পারদর্শী হলেও প্রোফেসনাল না,, এটা শিখতেও আমাকে কোর্স করতে হবে। সেখানেও হাজার হাজার টাকার ব্যাপার অথচ আমার কাছে মাত্র ১০,২০০ টাকা রয়েছে,, তাও আব্বুজানের দেওয়া। এটুকু টাকায় কোনোকিছু সম্ভব বল?

,,, ইরার কথায় যুক্তি রয়েছে,, একটা বিজনেস শুরু করতে হলে কমপক্ষে ২০-৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন। একটা নরমাল আর্ট কোর্স করতেও ২০-৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন। এতো টাকা তো তার কাছে নেই কিন্তু টাকা নেই বলে পিছিয়ে যাওয়া ও তো সম্ভব না। রাত্রি বললো — এখন তর আব্বুজানের থেকে নে,, পরে যখন তর অনেক টাকা হবে তখন নাহয় ফিরিয়ে দিস।
,,, কথাটা বলেই ইরার দিকে তাকালো রাত,, মেয়েটার চোখে তীব্র বিষাদ। বাবার থেকে টাকা নিয়ে বড়ো হতে চায়না সে। এতোদিন ভালো না বাসলেও নিজের মেয়ে বলে মানতো তাই উনার টাকা ইরার পেটে হজম হয়েছে,, এখন আর হবে না। ইরাদ তপ্ত শ্বাস ফেলে উঠে দাড়ালো। কাধের ব্যাগটা ঠিক ঠাক করে নিয়ে ছোট করে আওড়ালো — অচেনা কারোর টাকা নেওয়ার চেয়ে অন্যের গোলামি করা ডের ভালো। কাল থেকেই একটা কাজের সন্ধান করবো আমি৷

,,, সিঙ্গাপুর,,,
আজ অপারেশনের পনেরো দিন পূর্ণ হতে চললো। তিনদিন আগে অর্পনাকে নরমাল ক্যাবিনে সিফ্ট করা হয়েছিলো,, কয়েকদিন বাদেই হয়তো হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হবে। বুকের ক্ষতটাও প্রায় শুকিয়ে এসেছে,, আজ সন্ধায় সম্পূর্ণ বেন্ডেজ খুলে ড্রেসিং করে দিয়েছেন ডক্টর ইমরা ফাহরিম। যার ফল স্বরুপ অর্পনার মন মেজাজ কিছুটা ফুরফুরা হয়ে আছে। অপারেশনের পর এই কটাদিন শরীরে বেন্ডেজ পেচিয়ে থাকার দরুন অর্পনার এরুপ অনুভব হতো যেনো একটা মোটা সাপ তাকে আষ্টেপৃষ্টে পেচিয়ে রেখেছে,, এখন বেশ শান্তি লাগছে। এই কদিনে অনেক কিছুই পাল্টে গিয়েছে,, পাল্টেছে আব্রাহাম আর দ্বীপের সম্পর্কের সমীকরণ। দ্বীপ আর আব্রাহামের মাঝে এখন বন্ডিং টা খুব সুন্দর একদম বড়ো ভাই আর ছোট ভাইয়ের মতো। আসার পর থেকে দ্বীপ নিজেদের জন্য এপার্টমেন্ট ভারা নিতে চাইলেও নিতে দেয়নি আব্রাহাম,, শুরু থেকেই এক প্রকার জোর জবরদস্তি করে দ্বীপ আর আরশাদ জামানকে নিজের এপার্টমেন্টে তুলেছে। এখনো দ্বীপ, আরশাদ জামান ওখানেই থাকছে। সারাদিন হসপিটালে থাকলেও প্রতি রাতে অর্পনা ঘুমিয়ে গেলে দ্বীপ আব্রাহামের ফ্লাটে চলে যায়। আজো তাই করবে। বিষয়টা ভেবেই অর্পনা উসখুস করতে করতে একবার দ্বীপের দিকে তাকালো,, লোকটা ফোনে কি যেনো করছে। অর্পনা এবার উসখুস করতে করতে উঠে বসলো,, দ্বীপের কিছুটা মনোযোগ ফোনে থাকলেও বেশিভাগ মনোযোগ শুয়ে থাকা রমনির উপরেই ছিলো। অর্পনাকে উঠে বসতে দেখে দ্বীপ সুধালো–

,,, কি হয়েছে? উঠে বসলে কেনো? ঘুমাও।
,,, অর্পনা চোরা চোখে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বললো– ওহুম!! ঘুমাবো না।
,,, অর্পনার চোরা দৃষ্টি ধরতে পারলো দ্বীপ,, ফের সুধালো– কিছু প্রয়োজন?
,,, অর্পনা এদিক ওদিক তাকিয়ে উসখুস করতে করতে মাথা ঝাকিয়ে শায় জানিয়ে বললো — আমার একটা আপনি প্রয়োজন,, আমি আপনার সাথে যাবো।
,,, দ্বীপ তপ্ত শ্বাস ফেললো,, সারাদিন ঘুরে বেড়ানো মেয়েটা গোটা ১৫ দিন ধরে হসপিটালের বেডে পরে আছে,, বোরিং ফিল করাটা স্বাভাবিক। দ্বীপ উঠে দাড়িয়ে অর্পনাকে আবারও শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো– এখন তো সম্ভব না সোনা, তোমার হেল্থ আরেকটু স্টেবল হলে তারপর রিলিজ দেওয়া হবে,, এখন চোখ বন্ধ করো।
,,কথা শুনলো না মেয়েটা,, গাল ফুলিয়ে সকল লজ্জা সরম বিসর্জন দিয়ে বললো– আমার একা একা ঘুমাতে ভালো লাগে না।

,,, এহেন কথায় দ্বীপ চোখ ছোট ছোট করে তাকাতেই অর্পনা লজ্জা পেয়ে বালিশে মুখ লুকালো। মেয়েটার কান্ডে অন্যদিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো দ্বীপ। কিছু সময় বাদে অর্পনা আড় চোখে দ্বীপের দিকে তাকাতেই দ্বীপকে হাসতে দেখে এবার বেশ লজ্জা পেলো। লোকটা তাকে আবার বেহায়া ভাবছে নাতো? কিন্তু কি করনীয়? তার যে সত্যি ই একা ঘুমাতে ভালো লাগে না,, দ্বীপের গলদেশের ঘ্রান নাসারন্ধ্রে না পৌছালে শান্তি লাগে না। দ্বীপ উঠে গিয়ে ক্যাবিনের ডোর ভিতর থেকে লক করে ভালো মতো পর্দা টেনে দিলো পরপর লাইট অফ করে অর্পনার পাশাপাশি শুয়ে পরলো। দ্বীপের কান্ডে আরও লজ্জা পেলো অর্পনা,, লোকটা তার মনের কথা ধরে ফেললো? ইসস!! ব্যাপারটা সত্যি ই লজ্জা জনক। বিষয়টা লজ্জা জনক হলেও দ্বীপ বাহু এগিয়ে দিতেই অর্পনা সব ভুলে মাথা রাখলো সেখানে। রয়ে সয়ে ধীর গতিতে মিশে গেলো দ্বীপের বুকের সাথে। গলায় মুখ গুজে একটা পা উপরে তুলে দিলো,, দ্বীপ ওর কোমর জড়িয়ে আরেকটু কাছে টেনে নিলো। অনেকটা সময় এভাবেই কাটলো দুজনার,, এতোদিন পর স্বামীর সান্নিধ্য পেয়েও মেয়েটার চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না। মাথায় হাজারটা চিন্তা ঘুরছে। সন্ধায় বেন্ডেজ করার সময় অর্পনা তার বুকের মাঝখানের লম্বা দাগটা দেখেছে,, দাগটা খুবি গভীর আর ভয়ংকর। দুদিক থেকেই বড়ো বড়ো শেলাইয়ের দাগ,, ফুলে আছে। গতো পাঁচ বছরে অর্পনা নিজ ইচ্ছায় নিজের শরীরে অসংখ্য কাটা ছেড়া করেছে কিন্তু সেসব চামড়ার পর সাদা মাংসল অংশ পর্যন্তই পৌছেছে,, সেসবে কোনো সেলাইয়ের প্রয়োজন পরেনি তাই একটি দাগ ও এতোটা ভয়ানক রুপ ধারন করেনি। এই দাগ তো কোনোদিন মিটবে না,, সারাজীবন থেকে যাবে। ভেবেই অর্পনা আফসোস হলো,, সে দ্বীপের শার্টের কলার নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললো

,,, ইদানীং আপনার ভাগ্য নিয়ে আমার বড্ড আফসোস হয় দ্বীপ।
,,,, এরুপ কথা বলার কারন?
,,, এইযে আমার শরীরে এতো এতো দাগ সেই সাথে আরও একটা ভয়ঙ্কর দাগ যুক্ত হলো।এই দাগ তো কোনোদিন মিটবে না।
,,,অর্পনার কথা ফুরানোর সাথে সাথে ওর নীল রঙা প্যাসেন্ট ড্রেসের বুতামে হাত রাখলো দ্বীপ। সাথে সাথে আতকে উঠলো অর্পনা — কি করছেন? আজব!!
,,, দ্বীপ নিজের কাজে অব্যহত থেকে সুধালো– দেখতে চাই কতোটা দাগ হওয়ায় আমার ভাগ্য নিয়ে তোমার অতো আফসোস হচ্ছে।
,,, দ্বীপ!! পাগলামি করবেন না, এটা হসপিটাল।
,,, হু কেয়ার্স?

৮-৫-২০২৬
বাংলাদেশ,,,
,,, ক্লাস শেষ হতেই রাত্রি আর ইরা ক্লাস হতে বেড়িয়ে এলো। দুই গরু আজ ভার্সিটিতে আসনি সেই নিয়ে বড্ড মন খারাপ দুজনার। ইচ্ছা ছিলো ক্লাস শেষে অর্পনাকে ভিডিও কলে রেখে প্রচুর আড্ডা দেওয়ার কিন্তু দেওয়া হলো না,, ছেলে দুটো তো এলোই না। গেইট পেরিয়ে রিকশা ডেকে তাতে চরে বসলো ইরা, রাত্রিও উঠে বসলো। বর্তমানে তাদের গন্তব্য রাত্রিদের ফ্লাট,, ইরা এখন রাত্রিদের বাড়িতেই থাকে। কিছুদিন আগে একপ্রকার জোর জবরদস্তি করেই ইরাকে নিজের বাড়ি তুলেছেন সুহাসিনী,, মেয়ের মতো আগলে রেখেছেন। মা তুল্য বান্ধবীর মায়ের আবদার ফিরাতে পারেনি ইরা তাই বাক্স পেঁটরা গুছিয়ে রাত্রিদের বাড়ি উঠতে বাধ্য হয়েছে। ২৪\১৮ ফুটের চার তলা বাড়িটির সামনে রিকশাটি থামতেই নেমে পরলো দুজন। ইরাদ বেগ হাতরে টাকা বের করতে নিলে রাত্রি ই দিয়ে দিলো। ৩০ টাকার রাস্তা,, এ আর এমন কি টাকা? ইরা অবশ্য আপত্তি করেছে কারন গতো কয়েক দিন ধরে রাত্রি ই টাকা দিচ্ছে,, ইরার কেমন যেনো ইদানীং নিজেকে ছোট মনে হয়,, সবাই উপকার করছে যে।

ওদিকে এই ১৫ দিনে কম করে হলেও ২২ টা জায়গায় কাজের খোজ করেছে ইরা,, তবে এ শহরে কাজের বড্ড অভাব। ইরা চাইলেই অর্পনার দেবরকে বলে তাদের কোম্পানিতে একটা ছোট খাটো পদে জব নিতে পারতো কিন্তু সেটাও একদিকে দয়া হয়ে দাড়ায়। ইরাদ গরিব হতে পারে কিন্তু আত্মসম্মান হীন না। রাত্রিদের ফ্লাটটা দুতলায়,, এই ফ্লাটে লিফ্ট নেই,, ছোট খাটো ফ্লাট তো তাই। ইরা আর রাত্রি হাতে হাত ধরে হেলতে দুলতে সিরি দিয়ে দুতলায় উঠলো এটা তারা গতো কয়েকদিন ধরেই করছে,, করতে ভালো লাগে। ফ্লাটের সামনে এসে কলিং বেল বাজাতেই কাজের মেয়ে সোনালী দরজা খুলে দিলো। মেয়েটার বয়স ২৮,, স্বামী নেশা করে টাকা উড়ায়,, কাজ করেনা,, সারাদিন নেশা করে এখানে ওখানে পরে থাকে যার ফল স্বরুপ ৪ টা বাসা বাড়িতে কাজ করে তিন ছেলেকে মানুষ করছে। আসার পর থেকেই সোনালির সাথে বেশ সাক্ষাৎ হয়েছে ইরার,, দুঃখজনক হলেও সত্যি ইরা রাগের মাথায় বাসা বাড়ির কাজ পর্যন্ত করতে চেয়েছে।

সোনালিকে বলেছে খুজে দিতে। বিষয়টা জানতে পেরে খুব বকেছিলেন সুহানি আন্টি ইরা ইদানীং টের পায়,, বাবারা অমানুষ হলেও বটগাছ হয়। যখন ইরার বাবা নামক বটগাছটা ছিলো তখন দুনিয়া কতো রঙিন ছিলো,, টাকার পাওয়ার খাটিয়ে রাগ করে বিনদেশে পাড়ি জমানোর মতো ক্ষমতা ছিলো তার। আর এখন!! যাই হোক,, ইরার এসবে আফসোস নেই,, যা হয়েছে তা বোধহয় ভালোর জন্যই হয়েছে। না হলে হয়তো মাকে নিয়ে আলাদা জীবন সাজানোর স্বপ্নটা সপ্নই থেকে যেতো,, পদক্ষেপটা নেওয়া হতো না। বাড়ির ভিতরে ঢুকার পর সুহানি আন্টিকে রান্নাঘরে দেখে অবাক হলো ইরাদ, এই সময় তো উনি বাড়িতে থাকেন না। কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধা পেরিয়ে যায় তাহলে আজ দুপুরের টাইমে হঠাৎ বাড়িতে? মনে প্রশ্ন জাগলেও প্রশ্ন করলো না,, নাকে ঠেকলো বিরিয়ানির ঘ্রাণ,, হয়তো স্পেশাল কোনো ডে আছে তাই রান্না করছেন। রাত্রিদের ফ্লাটে দুটো রুম আরেকটা স্টোর রুম,, বর্তমানে ইরা রাত্রির সাথে রাত্রির রুমেই থাকছে। তাই সেদিকেই হাটা দিলো,, তবে রুমে যাওয়ার পথে হুট করেই ইরার পিছনে চলে গেলো রাত্রি,, দুহাতে জড়িয়ে ধরে দরজার দিকে এগুতে লাগলো।,, হাট করে দরজা খোলার শব্দ হওয়ার সাথে সাথে শুনা গেলো চার মূর্তির চিৎকার।

“”” হেপি বার্থ ডে ইরাদ”””
,,, রাত্রি চিৎকার দিয়ে ভিতরে ঢুকে পরলো,, ইরাদ রুমের ভিতরকার পরিবেশ,দেখে হতবিহ্বল হয়ে পরলো। রুমের একপাশ বেলুন দিয়ে সাজানো,, ছোট্ট একটা টেবিলে কেক রাখা,, সেই সাথে এক গাল হাসি দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকা চারটি প্রান,, ইরাদের খুব আপনজন। অর্পনটাও ভিডিও কলে আছে। ইরাদকে হতবিহবল নজরে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাত্রি আছতে করে ধাক্কা মারলো,, ইরাদ আনন্দে রাত্রিকে জড়িয়ে ধরলো পরপর অরুন আর পল্লবকে। সবাইকে হাগ করতে দেখে ভিডিও কলে থাকা অর্পনা হিংসাত্মক কন্ঠে বললো — বেস্ট ফ্রেন্ড!!
,,, ইরাদ হেসে ফেললো,, ফোনের কাছে এসে দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে বললো — লেট্স হাগ!!
,,, অর্পনা মুখ বাকিয়ে বললো– ফুট!! আমার উনি রাগ করবে। কাউকে জড়িয়ে ধরা মানা।
,,, পল্লব ফোনের সামনে এসে বললো — তুই আবার ডিম মির্জাকে ভয় পেতে শুরু করেছিস কবে থেকে?
,,, অর্পনা আতকে উঠলো,, ইশারায় চুপ থাকতে বলে বেক ক্যামেরায় দ্বীপকে দেখালো। লোকটা কিছুটা দূরে সোফায় বসে ফোনে কাজ করছে। অর্পনা ফিসফিস করে বললো– বলিস না,, এমনি ই কি নিয়ে যেনো রেগে আছে,, এসব শুনতে পেলে খবর করে ছাড়বে।

,,, পল্লব ভোলাভালা ছেলের মতো মাথা ঝাকিয়ে শায় জানালো,, অর্পনা হেসে ফেললো। কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়ার শেষে সুহাসিনী আন্টি আর সোনালী যুক্ত হতেই কেক কাটলো ইরাদ। সবাইকে একে একে খাওয়ালো,, সব শেষে অর্পনার দিকে এগিয়ে দিতেই হা করলো অর্পনা,, ইরাদ সেটা ফিরিয়ে এনে খেয়ে নিলো। এতো বড়ো সারপ্রাইজ পেয়ে বড্ড খুশি হয়েছে ইরাদ,, সে তো ভুলেই গিয়েছিলো তার যে আজ জন্মদিন। মানুষ যখন সত্যিকারের জীবনের যাতাকলে পিষে যায় তখন জন্মদিন নামক মুহুর্তটাকেও ফিকে মনে হয়। কেক কাটাকাটির শেষে সুহাসিনী সবাইকে খাবার টেবিলে আসার আহবান জানিয়ে রাত্রির রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো,, সোনালী ও গেলো পিছু পিছু। ওরা চলে যেতেই ইরাদ মুখ গোমড়া করে বললো– আমার গিফ্ট কই? গিফট আনিসনি?

,,, অরুন, পল্লব, রাত্রি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না করলো। ইরাদ মুখটা আরও গোমড়া করে নিলো। রাত্রি শান্তনা দিতে এগিয়ে গিয়ে হুট করেই ইরার হাত ধরে ওকে ঘুড়িয়ে দিল,, ইরা চমকিত হয়ে ফিরে তাকানোর আগেই মেয়েটা বাহু ধরে আটকে দিয়ে দুহাতে ইরার চোখ ঢেকে ধাক্কা দিতে দিতে কোথাও একটা নিয়ে যেতে থাকলো,, ইরাদ ও পা মিলালো। হাটতে হাটতে দরজার সাথে আটকে গেলো ইরাদ,, রাত্রি আরেকটু এগুতেই ইরাও এগুতে বাধ্য হলো, দরাজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই থেমে গেলো রাত্রি। পিছু পিছু অরুন আর পল্লব ও ঢুকলো,, অরুনের ফোনে অর্পনা। রাত্রি ইরার চোখ থেকে হাত সরিয়ে দিতেই বাক হাড়া হয়ে পরলো ইরা। স্টোর রুমটা এখন আর স্টোর রুম নেই,, আর্ট রুম হয়ে উঠেছে। একপাশে আর্ট টেবিল,, সেখানে একটা ক্যানভাস সেট করা,, রং তুলি সব রাখা। অন্যপাশের একটা টেবিলে নানান রকমের মোল্ড,, রেসিন,, শুকনো ফুল,, জুয়েলারির এসোসোরিজ,, পাটের সুতা,, আরও নানান রকমের প্রোডাক্ট। কিছুটা দূরে বিভিন্ন সাইজের অনেকগুলো ক্যানভাস ও দেখা যাচ্ছে সাথে রঙ তৈরির এসোসোরিজ। ইরার অবাকতার মাঝেই অরুন একটা দামি ফোন এগিয়ে দিয়ে বললো — ওগুলো গিফ্ট আর এটা ধার,, ইনকাম করে আমাকেও একটা কিনে দিস।

,,, পল্লব একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললো — এটা তর আর্ট কোর্সের রেজিস্ট্রার প্যাপার,, অর্পনার পক্ষ থেকে,, এটাও ধার,, পরে শোধ করে দিস। আর বাকি সব আমরা সবাই মিলে করেছি,, হেপি হয়েছিস?
,,, ইরার এবার বেশ কান্না পেলো,, কেদেই দিলো মেয়েটা। অর্পনা ফোরন কেটে বললো — এই সেন্টিখোরকে দুটো চর দে তো পল্লব,, এটা মার না খেলে ঠিক হবে না।
,,, পল্লব সত্যি সত্যি ই মারতে গেলো,, ইরাদ চোখে পানি নিয়েই হেসে ফেললো। তখনি শুনা গেলো সুহাসিনীর চিৎকার — বাচ্চারা খেতে আসো,, আমাকে আবার কলেজে যেতে হবে।
,,, অর্পনার ওপাশ থেকে শুনা গেলো দ্বীপের স্বর — ভেলোরা!! মেডিসিন টাইম পেরিয়ে যাচ্ছে,, ফোন রাখো।
,,, অর্পনা তপ্ত শ্বাস ফেলে সবার থেকে বিদায় নিয়ে ফোন কেটে দ্বীপের দিকে তাকালো। কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বললো — দেখছেন না বন্ধুদের সাথে কথা বলছি? ঔষধ তো সেই কখন খেলাম,, এখন এতো ডাকাডাকি কিসের?

,,, দ্বীপ এগিয়ে এসে ফোনটা কেড়ে নিলো। ফ্যাফ্যাসে কন্ঠে সুধালো — ডিম মির্জা কে?
,,, এরুপ প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলো অর্পনা। লোকটার কানে না ইয়্যারপড ছিলো,, শুনলো কি করে? অর্পনা ঠোঁটে নিষ্পাপ হাসি রেখে ছোট্ট করে বললো — কেউ না,, কেউ না।
,,, দ্বীপের চোখ মুখ শক্ত,, দেখেই বুঝা যাচ্ছে বিষয়টাতে বেশ রেগে গিয়েছে দ্বীপ। অর্পনা আবারও কিছু বলতে নিবে তার আগেই দ্বীপ দাতে দাত চেপে বললো– এর আগেও তোমার নোটে এই নামটা পেয়েছি,, এসব আমি পছন্দ করিনা ভেলোরা। আর কখনো যেনো না শুনি।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬০ (২)

,,, বলেই অর্পনার ফোনটা নিয়ে হনহন করে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো দ্বীপ। অর্পনা এতোক্ষণ বালিশ হেলান দিয়ে বসে ছিলো এবার হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পরলো। লোকটা বেশ রেগেছে,, ফোন ও নিয়ে গিয়েছে,, এই রাগ ভাঙাতে না জানি আবার কি করা লাগে।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here