৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৯
রুপান্জলি
১০/০৩/২০১৯
,,,প্রতিদিনকার মতো রাস্তা পার করে ভার্সিটির গেইট পেরুতেই সিমি আর পারু আলাদা হয়ে গেলো। তারা ঐটুকু পথ একসাথে এলেও ডিপার্টমেন্ট আলাদা হওয়ায় দুজনকে আলাদা পথ বেছে নিতে হয়।পারুর হাতে প্রতিদিনকার মতো সেই লাল গোলাপের থোকা। যদিও গেইটের কাছে দ্বীপকে পাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু আজকে লোকটাকে বা তার গ্যাং কে দেখা গেলোনা। পারুর কি একটু মন খারাপ হলো? কি জানি, তবে একটু একটু চিন্তা হলো বোধয়। গতকাল লোকটা তার ভুলের কারনে এতোটা ভিজেছে, নিশ্চয়ই জ্বর টর এসেছে? কিছু পথ পেরুতেই ওদের ক্লাসের সেই ছেলেটার বন্ধু মহলকে দেখতে পেলো। ঐ ছেলেটা ভার্সিটিতে আসেনা আজ ছয়দিন হবে। লাস্টবার ছেলেটা যেদিন পারুর দিকে তাকিয়েছিলো সেদিনের পর আর ছেলেটাকে দেখা যায়নি। যদিও ঐ ছেলের প্রতি তার কোনো ইন্টারেস্ট ছিলোনা,, তবুও দ্বীপের কারনে সে কিছুটা নজরে নজরে রেখেছে। পারু আর বিষয়টাতে তেমন মাথা ঘামালোনা,, আসলে আসুক না আসলে নেই তাতে তার কি এসে যায়? শুধু দ্বীপ ঐ ছেলেটার নিখোঁজ হওয়ার পিছনে না থাকলেই হলো। ক্যাম্পাস পেরিয়ে ক্লাসে ঢুকতেই মেধাকে দেখলো। সে ব্যাচারি মন খারাপ করে বসে আছে,, পারু তার পাশের সিটে বসে গলা খাকারি দিয়ে বললো–
,,,কি হয়েছে মেধা রানী? মন খারাপ কেনো?
,, মেধা হতাশার শ্বাস ফেলে বললো — ভাইয়া আর বিহানের শরীরে খুন জ্বর। বিহানেরটা কম হলেও ভাইয়ার নাকি অনেক বেশি জ্বর, শুয়া থেকে উঠতেই পারছেনা। আসলে ভাইয়া তো বৃষ্টিতে ভিজতে পারেনা তাই আরকি। তার উপর কাল বাড়ি ফিরেনি, নিজের ফ্লাটে থেকেছে, বাড়ির কেউ জানেনা ভাইয়ার জ্বরের কথা। ফাহাদ ভাইয়া না বললে তো আমি জানতেই পারতাম না।
,,,পারুর মুখটা কেমন চুপসে গেলো, সে যা ভেবেছে তাই হলো। কেনো যেনো তার মনে হচ্ছে দ্বীপ ওর কারনেই অসুস্থ হয়ে পরেছে। সে যদি গতকাল দ্বীপকে কল দিয়ে বলতো সে আসতে পারবেনা, দ্বীপ যেনো বাড়িতে ফিরে যায়, তাহলেই তো ঐ লোককে ভিজতে হতোনা, আর না এরকম জ্বরে ভুগতে হতো। পারু গালে হাত দিয়ে বসে পরলো, পরপর মলিন কন্ঠে বললো– তোমার বাড়িতে জানিয়েছো?
,,,, নাহ!! বাড়িতে জানালে ভাইয়া রাগ করবে। বাড়িতে জানাবেনা বলেইতো রাতে নিজের ফ্লাটে ঘুমিয়েছে।
,,,বিহান ভাইয়া ও উনার সাথে আছে?
,,,হুম!! কিন্তু সেও অসুস্থ। কেউ কারোর খেয়াল রাখার মতো অবস্থায় নেই। আমার ওদের জন্য বেশ চিন্তা হচ্ছে, জানো?
,,,পারু নিজেও চিন্তিত, কেনো যেনো তার ভিতরটা খুব হাসফাস করছে। একটাবার দ্বীপকে দেখতে মন চাচ্ছে। কিন্তু সেই ইচ্ছা প্রকাশ করা মানে নিজেকে বেহায়া প্রমান করা। তাই নিজো মনের অনিরক্তি টুকুন আটকে রেখে বললো– তাহলে এখন কি করবে?
,,,মেধা ঠোঁট চেপে কিছু একটা ভেবে বললো — পারু চলোনা, ভাইয়াকে একটু দেখে আসি।যাবো আর আসবো, একটু ও লেইট করবোনা। প্লিজ প্লিজ!!
,,,পারু মনে মনে খুশি হলো, সে তো এরকম কিছুই চাচ্ছিলো। কিন্তু দ্বীপের বাড়িতে তো দ্বীপ আর বিহান একা, যদি তার কোনো ক্ষতি টতি হয়? নাহ!! দ্বীপ যেমনি হোক বিহান ভাই তো খুব ভালো। উনি নিশ্চয়ই এমন কিছু করবেনা? আর সাথে তো মেধা আছেই। তাই আর কিছু না ভেবে মাথা ঝাকিয়ে সায় জানালো।সাথে সাথে উঠে দাড়ালো মেধা, পারুর হাত ধরে হাটা দিলো দ্বীপের ফ্লাটের উদ্দেশ্যে। ভার্সিটি থেকে দ্বীপের ফ্লাটে যেতে সময় লাগে ১০ মিনিট তাই দুজন রিকশায় চড়ে বসলো। মাঝ পথে পারু ফলমূল নিতে চাইলে মেধা বাধা প্রয়োগ করলো। ফ্রিজে এমনি অনেক ফলমুল থাকে, এখন এক্সট্রা করে নেয়া মানে অযথা টাকা নষ্ট। মিনিট চার পেরুতেই একটা বড়ো এপার্টমেন্টের সামনে এসে রিকশা থামলো। পারু অবাক নয়নে পুরো এপার্টমেন্ট টা একবার দেখে নিলো পরপর মেধাকে জিজ্ঞেস করলো — এটা তোমাদের?
,,, না না,এটা ভাইয়ার।
,,, পারু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো– তোমরা আর তোমাদের ভাইয়া কি আলাাদা?
,,,মেধা মুচকি হেসে বললো — নাহ!! তবে, আমাদের পরিবারের সবারি আলাদা করে একটা একটা এপার্টমেন্ট আছে,, এগুলো বড়ো আব্বুর দেওয়া গিফ্ট।
আসলে,, বড়ো আব্বু চায় আমাদের সবার যেনো আলাদা আলাদা অবলম্বন থাকে, কোনো অবস্থাতেই যেনো নিজেকে অসহায় মনে না হয়। যদিও ভাইয়ার নামে আরও কয়েকটা এপার্টমেন্ট, রেসোর্ট প্লাস রেস্টুরেন্ট আছে। সেগুলো আবার একেকটা একেক জায়গায়, ব্যাবসায়িক কারনে অনেক জায়গায় যেতে হয়তো!! তাই।
,,,,পারু মাথা ঝাকালো,, বড়ো বড়ো লোকদের ভাই বড়ো সরো ব্যাপার, সেসব পারু বুঝবেনা। তার কাছে তো গ্রামের সচ্ছ, শেমল ধরনী আর টিনের চালার ঘর ই বেস্ট মনে হয়। যার মাধ্যমে শীতকালে বইবে শীতল আভা আর গরম কালে বইবে টুপটাপ বৃষ্টি। জোৎস্না রাতে জানালার ফাক গলে আসবে হালকা মৃধু আলো আর অমাবস্যার অন্ধকারে ঘরে জ্বলবে তৈল যুক্ত হারিকেন। এরকম একটা ঘরে আজীবন কাটিয়ে দেওয়ার মাঝেই অমুল্য সুখ খুজে পায় সে।
,,,,, দ্বীপের এপার্টমেন্ট টা ১০ তলার তাই উপরে উঠতে গেলে সহসাই লিফ্ট ইউজ করতে হয়। অগত্যা লিফ্টের মাধ্যমে তিন তলায় পৌছালো তারা। জীবনে প্রথম বারের মতো লিফ্টে উঠার দরুন বেশ ভয় পেয়েছে পারমিতা,, মেধা অবশ্য সেটা বুঝতে পেরে পারুর হাত ধরে সাপোর্ট দিয়েছে। অন্যান্য তলায় তিন থেকে চার ইউনিটের ফ্লাট থাকলেও, তিনতলার ফ্লাট টা পুরো বিল্ডিং জুড়ে করা। ফ্লাটের সামনে গিয়ে কলিং বেল বাজাতেই ওপাশ থেকে বিহান দরজা খুলে দিলো, তার গায়ে রান্না ঘরের এপ্রোন পরা। দেখেই বুঝা যাচ্ছে বিহান এতোক্ষণ রান্না করছিলো, চোখের সামনে মেধা আর পারুকে দেখে অমায়িক হাসলো সে। পরপর নরম স্বরে বললো — আরে তোমরা এখানে? কি অবস্থা দুজনের? হঠাৎ কি মনে করে?
,,,,মেধা আগে ভাগেই এগিয়ে গেলো, আঙ্গুলে ভর দিয়ে কিছুটা উচু হয়ে বিহানের গাল গলা চেক করে দেখলো গায়ে বেশ জ্বর, এই জ্বর নিয়েই রান্না করছে এই লোক? কত বড়ো বেখেয়ালি হলে মানুষ এমন করতে পারে? মেধা বিহানের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো– এসব কি হা ? এই জ্বর নিয়ে রান্না করছো কেনো? আমাকে ডাকলে না কেনো? আমি কি মরে গেছি?
,,,বিহান মৃধু হেসে মেধাকে জড়িয়ে ধরলো, টপাটপ দুগালে দুটো চুমু ও খেয়ে বললো— জোহান তো বাহিরের খাবার খেতে পারেনা তাই রান্না চাপিয়েছিলাম। চিন্তা করোনা আমি ঠিক আছি।
,,,,এদিকে ওদের প্রেম দেখে পারু অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। শহরের ছেলে মেয়েরা বুঝি এরকম নির্লজ্জ হয়? কই তাদের গ্রামে তো এসব হয় না। কতোই তো কাপল দেখছে, তারা মানুষের সামনে গেলে একজন আরেকজনের সাথে অপরিচিতর মতো ব্যাবহার করে। যাই হোক, শহুরে পোলাপান বলে কথা। এদিকে প্রেম করতে করতে পারুর কথা মনে আসতেই বিহানের থেকে দূরে সরে গেলো মেধা। তারাহুরো করে বললো — চলো আমি রান্নায় হেল্প করছি,, পারু তুমি ভাইয়াকে দেখতে যাবেনা? বিহান তুমি একটু পারুকে ভাইয়ার রুমে নিয়ে যাও৷
,,, এরুপ কথা শুনে কিছুটা বিচলিত হয়ে পরলো পারু, ঐ লোকের ঘরে সে একা একা কিছুতেই যাবেনা। পুরুষ মানুষ বলে কথা,, যদি উল্টা পাল্টা কিছু করতে আসে? এমনি ঐ লোকের মুখে লাগাম নেই, মাঝে মধ্যেই কিসব ফালতু কথা বলে। তাই পারু মিনমিনে স্বরে বললো– আমি একা যাবোনা, মেধা তুমিও এসো।
,,, মেধা অবাক হয়ে জানতে চাইলো,, তুমি একা কোথায়? বিহান আছে তো সাথে, যাও।
,,,পারু দুদিকে মাথা ঝাকিয়ে না বুঝালো। মেধা বোধয় পারুর অস্বস্তির কারনটা বুঝলো তাই আর কথা বাড়ালোনা। ফ্রিজ থেকে কয়েক ধরনের ফল বের করে সেগুলো কাটতে নিলে বিহান বললো— দাও আমি কেটে দিচ্ছি।
,,, মেধা দিলোনা, সে নিজের মতো ফল কাটতে লাগলো। বিহান এগিয়ে গিয়ে পারুকে সোফায় বসার জন্য নির্দেশ দিলে পারু গুটিশুটি মেরে বসে পরলো। কুকারে ভাত চাপিয়েছে বিহান, তার উপরেই কয়েকটা আলু রেখেছে যেনো সেগুলো ও ভাতের সাথে সিদ্ধ হয়ে যায়। এরকমটা ওরা মাঝেমধ্যেই করে। কখনো যদি মারামারি করতে গিয়ে দুভাই বেশি আহত হয়ে যায় তখন তারা বাড়িতে না গিয়ে এখানে থেকে যায়। সেই মুহুর্তে আলু ভর্তা আর ভাত ব্যাতিত খাওয়ার মতো কিছুই জুটেটা,, অগত্যা সেটাই বানিয়ে খেতে হয়। আজকেও তার ব্যাতিক্রম কিছু হলোনা। বিহান আলুগুলো বের করতেই পারু এগিয়ে এলো, বিহানের পিছনে দাড়িয়ে মৃধু স্বরে বললো– ভাইয়া!! আপনি বিশ্রাম নিন আমি বানিয়ে দিচ্ছি।
,,,বিহান মানা করলোনা, ছেলে মানুষ যতই রান্না জানুক না কেনো মেয়ে মানুষের রান্নার সাথে তুলনাই হয়না। পারু আলু গুলোকে সাইড করে রেখে কাচা মরিচ, পেয়াজ, ধনে পাতা কেটে আলুর সাথে মিশিয়ে নিলো। পরপর একটা টমেটো কেটে গ্যাসে করাই চাপিয়ে দিলো। করাই গরম হতেই তাতে সরিষার তেল দিয়ে কাটা টমেটো টা ছেড়ে দিলো, টমেটো যখন একদম মেইস হয়ে গেলো তখন আলুর ভর্তাটা ছেড়ে দিলো। সরিষার তেল, টোমাটো আর আলুর সংমিশ্রণে খুব সুন্দর একটা ঘ্রান তৈরি হয়েছে। ঘ্রানটা এতো পরিমাণ তিব্র ছিলো যে ঘরের প্রতিটি কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পরেছে। যার ফলে অর্ধ ঘুমন্ত দ্বীপের নাকেও সে ঘ্রাণ পৌছেছে,, দ্বীপ ঘ্রান শুঁকে কিছুটা উচ্চ স্বরেই বললো– বিহান!! মেধা এসেছে? এক কাপ কফি দিতে বল।
,,, বিহান মেধার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে নিলে পারু আলুর ভর্তা বাটিতে রেখে বললো — আমি করে দিচ্ছি।
,,,বিহান গা হেলিয়ে সোফায় বসলো,, দুদিকে দুহাত ছড়িয়ে দ্বীপের উদ্দেশ্যে বললো– তর বউ বানিয়ে দিচ্ছে, অপেক্ষা কর।
,,,বউ শব্দ টা শুনে পারু বেশ লজ্জা পেলো,, তারো নিজেকে কেমন সংসারি সংসারি মনে হচ্ছিলো। তার তো এমনি একটা সংসার চাই, যেখানে সে রান্না করবে, বরের জন্য কফি বানাবে, বরকে ভাত বেড়ে খাওয়াবে, ছেলে মেয়েদের খাবার খাইয়ে স্কুলে পাঠাবে আবার তারা ফিরে এলে তাদের পড়তে বসাবে। এরকম একটা সংসার পেলে পারুর জীবনে আর কোনো আফসোস থাকবেনা। আপাতত সেসব ভাবনা সাইডে রেখে মন দিয়ে কফি বানালো, এর মধ্যে মেধার ফল কাটাও শেষ । পারু সবার জন্যই কফি বানিয়েছিলো তাই যার যারটা তার তার হাতে ধরিয়ে দিলো। দ্বীপের টা আর নিজেরটা হাতে নিয়ে বিহান আর মেধার সাথে দ্বীপের রুমে ঢুকলো। দ্বীপের রুমে ঢুকে পারু বেশ অবাক হলো। বিছানা ব্যাতিত বাকি সব একদম পরিপাটি করে গোছানো, কোনো একটা জায়গায় সামান্য পরিমান ও অগোছালো নেই। ছেলেদের রুম এতোটা পরিপাটি হয় বুঝি? কই, তার ভাইয়ের রুম সে গুছিয়ে না দিলে তো পুরো জঙ্গল হয়ে থাকে। তাহলে দ্বীপের রুম এতো সুন্দর থাকতে পারে কিভাবে? ওর ভাবনার মাঝেই বিহান দ্বীপকে উদ্দেশ্য করে বললো–
,,, এই ভাই!! ভাই!! উঠ, তর বউ আর কফি দুটোই হাজির, এবার তো চোখ মেলে দেখ।
,,, বিহানের কথায় চোখ বন্ধ রেখেই ভ্রু গুটালো দ্বীপ, এখানে তার বউ আসবে কত থেকে? তার তো বউ ই নেই। আর যেটা আছে সেটা হাফ বউ, মন প্রান দেওয়া হলেও এখনো কবুল করা হয়নি। তবে কি তার হাফ বউ এসেছে? মানে পারু এসেছে? ভেবেই তরাগ করে চোখ মেলে তাকালো দ্বীপ, কিছুটা দূরে পারুকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বুক ভরে একটা শ্বাস নিলো। আহ!! শান্তি লাগছে ভিতরটা। দ্বীপ পারুকে ভালো মতো দেখে বিহানের উদ্দেশ্য প্রশ্ন ছুড়লো,,
,,, আমার বউয়ের সাথে তদের কি কাজ? যাহ, তর বউ নিয়ে ভাগ এখান থেকে।
,,,বিহান দুষ্ট হেসে বললো — তর বউ তকে ভয় পায়, কখন না জানি আবার কি করে দেস। পুরুষ মানুষ তো, বিশ্বাস করা যায়না।
,,,দ্বীপ বিরক্ত হলো, কিছুটা রাগত স্বরেই বললো — ১০ সেকেন্ডের মাঝে দুজন এখান থেকে বেরিয়ে যাবি,, নয়তো দুদিনের মাথায় মেধাকে অন্য ছেলের হাতে তুলে দিবো।
,,,বিহানকে আর আটকায় কে? সে তার মেধা রানিকে পারেনা এক প্রকার কোলে করেই এখান থেকে ছুটে পালিয়ে যায়। এমনি তার একটা মাত্র মেধা, এই মেধাকে হাড়িয়ে ফেল্লে সে বাচবে কি করে? আজব!! বিহান যেতে যেতে বললো — যাচ্ছি যাচ্ছি, তর আর তর বউয়ের রুমে থাকতে আসিনি আমরা। চলোতো মেধা রানী, আমরা দুজন হলরুমে গিয়ে প্রেম করি। তোমার ভাই এমন ভাব ধরে যেনো তার ই প্রেমিকা আছে, আর কারোর নেই। যত্যসব!!
,,,বলতে বলতে বেড়িয়ে গেলো দু’জন , মেধা ওদের কথা শুনে খিল খিল করে হাসছে। ওরা যেতেই পারুর হাত পায়ে কাপন ধরা শুরু, সেও কফির কাপ টেবিলের উপর রেখে রুম ত্যাগ করার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই দ্বীপ রাগান্বিত কন্ঠে বললো — কই যাস?
,,, পারু চোখ খিচে মিনমিন করে বললো — ম,মেধার কাছে?.
,,,যেতে বলেছি আমি?
,,, পারু মাথা ঝাকিয়ে না বুঝালো। দ্বীপ তার পাশে বসার জন্য ইশারা করে বললো — এখানে এসে বসো।
,,,পারু ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো, সে যাবেনা। দ্বীপ আবারও ধমকে বললো — বসতে বললামনা? মার খাবি?
,,,পারু পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো, দ্বীপের পাশে বসতেই সে পারুর হাত টেনে তাতে চুমু খেয়ে বললো — এখানে কি তর? কেনো এসেছিস?
,,, দ্বীপের নরম ঠোঁটর স্পর্শে কেপে উঠলো পারু, কয়েকবার পলক ঝাপটে হাত সরাতে নিলে দ্বীপ হাত ধরে টেনে ওকে নিজের দিকে ঝুকিয়ে নিলো। ভারসাম্য বজায় রাখতে পারু অন্য হাত দ্বীপের বুকে রাখলো। দুজনার দৃষ্টি দুজনের মাঝে স্থির। পারুর বুকটা কেমন ধরফর করছে, শ্বাস ভারি হয়ে আসছে। দ্বীপ হাত উচিয়ে পারুর সামনে আসা চুল গুলো কানের পিঠে গুজে দিয়ে বললো — কেনো এসেছো এখানে?
,,,পারু হাসফাস করে উঠলো, নিজেকে ছাড়াতে চেয়ে বললো — ছাড়ুন,, আমি মেধার কাছে যাবো।
,,,ছাড়বোনা, আগে বলো কেনো এসেছো?
,,, পারু বাধ্য মেয়ের মতো বললো — আপনাকে দেখতে।
,,, দ্বীপ ভ্রু বাকিয়ে বললো — আমাকে দেখতে হবে কেনো? ভালো তো বাসিস না, দয়া দেখাতে এসেছিস?
,,,পারু মাথা ঝাকিয়ে না বুঝালো, মানে দয়া দেখাতে আসেনি। দ্বীপ ঠোঁট বাকিয়ে সুক্ষ হেসে বললো — তাহলে কেনো এসেছো? ভালোবাসো আমাকে?
,,, পারু কিছু বললোনা, বলার মতো সাহস থাকলে তো বলবে। এখন যদি সে বলতে যায় যে সে দ্বীপকে ভালোবাসেনা। তাহলেই ধমকে ধামকে রুম থেকে বের করে দিবে,, কিন্তু কেনো যেনো পারুর যেতে ইচ্ছা করছেনা। এই লোক কি তাকে বসিকরন জাদু টাদু করলো নাকি? করতেই পারে। এই লোকের চোখে তাকালেই তার কেমন যেনো মায়া মায়া লাগে। একটা ঘোরের ভিতর চলে যায় সে। পারুকে এতোটা কাছে দেখে দ্বীপের মনে কিছুটা নিষিদ্ধ অনুভুতি জাগরন হলো, তবে দ্বীপ অভদ্র কিংবা অমানুষ নয়। যে একটা মেয়েকে অবৈধ ভাবে সামান্য পরিমান স্পর্শ করবে। অগত্যাই বেকুল কন্ঠে বললো — চলোনা বিয়েটা করে নেই ।
,,,হে আমি ও এটাই বলতে চাচ্ছিলাম,, আগে বিয়েটা কর। না মানে আমি তো আমার মেধা রানিকে নিয়ে চলেই গিয়েছিলাম, কিন্তু যেতে গিয়ে মনে হলো তরা তো এখনো বিয়েই করিসনি। যেহেতু এখনো বিয়ে হয়নি সেহেতু বউ নিয়ে একা রুমে থাকা বন্ধ।
এই পারু, চলোতো, চলো আমরা এখন খাবার খাবো। কারোর যদি না হওয়া বউয়ের প্রতি এতোই টান থাকে তাহলে সে এমনি এমনি খেতে আসবে।
,,,বলতে বলতে পারুর সামনে এসে দাড়ালো বিহান,, বিহানের কন্ঠ শুনে পারু উঠে দাড়ালো পরপর বিহানের দিকে তাকিয়ে মৃধু স্বরে বললো– উনার তো খুব জ্বর, উঠতে পারবে বলে মনে হয়না।
,,,বিহান গাড়ো নিশ্বাস ফেলে বললো — বাহ বাহ!! এর মধ্যে জ্বর মাপাও শেষ? ভালো ভালো।
,,, না চাইতেও লজ্জা পেলো পারু, রুম থেকে ছুটে বেড়িয়ে গেলো। বের হতেই দেখলো মেধা টেবিলে খাবার বাড়ছে তাই সে এগিয়ে গিয়ে ফিল্টার থেকে জগ ভর্তি করে পানি এনে রাখলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বীপকে নিয়ে খাবার টেবিলে হাজির হলো বিহান। মেধা নিজ উদ্দমে চারটা প্লেটে ভাত বেড়ে নিলো। চার প্লেট দেখে পারু সাৎে সাথে নাকোচ করে বললো–
,,,এই না না,, আমি খাবোনা। প্লিজ আমার জন্য ভাত বেরোনা।
,,,দ্বীপ চেয়ার টেনে ভ্রু কুচকে বললো — তোমাকে খেতে কেউ বলেওনি,, আসো, আমাকে খাইয়ে দাও।
,,, পারু অবাক চোখে তাকিয়ে নিজের দিকে আঙুল তাক করে বললো– আমি?
,,,তো? এখানে কি আমার আরও দশটা বউ আছে? যে আমাকে খাইয়ে দিবে।
,,,পারু দুদিকে মাথা ঝাকিয়ে বললো — না না!! আমি পারবো না?
,,, দ্বীপ পাশ থেকে কাচের গ্লাস নিয়ে সেটা ঘুড়াতে ঘুড়াতে বললো — এখানে কিন্তু কাচের গ্লাস আছে,, মরতে চাস? ভাঙবো এটা?
,,, আত্মা ছলকে উঠলো পারুর,, সে দ্রুত খাবার টেবিলে বসে ভাত মাখতে শুরু করলো। দ্বীপ অন্য দিকে ফিরে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। আল্লাহ এই মেয়েটাকে এতো ভিতু আর বোকা বানিয়েছে যে সামান্য মারার থ্রেড দিতেই দ্বীপের কথায় রাজি হয়ে গেলো। এই মেয়ের বোকামি গুলোতেই বারবার আটকে যায় দ্বীপ। ওকে হাসতে দেখে বিহান ও ঠোঁট টিপে হাসলো। ওদের হাসাহাসির মাঝেই পারু ভাত মেখে দ্বীপের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো — খাবেন না?
,,,দ্বীপ মুখটাকে আবারও গম্ভীর করে নিয়ে লোকমাটা মুখে তুলে নিলো। সময় পেরুলো অনেকটা,, এর মধ্যে দ্বীপের ধমকাধমকিতে পারু নিজেও কয়েক লোকমা খেলো। খাওয়ার মাঝে হুট করেই দ্বীপের ফোন বেজে উঠলো, খাওয়ার মাঝে কল আসায় দ্বীপ কিছুটা বিরক্ত হয়েই কল ধরলো, যার ফলে ফোন কখন যে স্পিকারে চলে এসেছে বুঝতেই পারেনি। বুঝলো তখন যখন ওপাশ থেকে একজন হাপাতে হাপাতে বললো —
,,,ভাই!! ভাবির দিকে যেই ছেলেটা তাকিয়েছিলো তার অবস্থা খুব খারাপ, ইমেডিয়েট হসপিটালিস্ট করত,,,
,,,পারুর বাড়িয়ে দেওয়া লোকমাটা হাত ফসকে পরে গেলো, চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো, মুখ জুড়ে ঘৃনার ছাপ স্পস্ট। পারুর চোখে চোখ পরতেই তারাহুরো করে কল কেটে দিলো দ্বীপ। অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,,সিট !! মেয়েটা মাত্রই তার সাথে একটু সহজ হচ্ছিলো, আর এখনি কিনা এই অঘটন টা ঘটতে হলো। দ্বীপ পারুর দিকে হাত বাড়াতে নিলে ছিটকে দূরে সরে গেলো সে। দুদিকে মাথা ঝাকাতে ঝাকাতে বললো — না, না,আপনি এগুবেন না। আপনি একটা খুনি, নিকৃষ্ট খুনি। আপনার মতো খুনিদের আমি ঘৃণা করি।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৮
,,,দ্বীপ এগিয়ে গিয়ে পারুকে ছুতে চাইলে সে মেধার কাছে গিয়ে মেধার হাত ধরে বললো — মেধা!! আমি এখনি হোস্টেলে ফিরবো। যদি তুমি আমায় না নিয়ে যাও, তবে আজ থেকে তোমার আর আমার পথ সম্পূর্ণ আলাদা।
,,,মেধা অসহায় দৃষ্টিতে দ্বীপের দিকে তাকালে দ্বীপ ইশারায় তাকে পারুর সাথে যেতে বললো। হাত না ধুয়েই বেড়িয়ে গেলো ওরা। ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিহান তপ্ত শ্বাস ফেললো। তাদের জীবনে একটা সুন্দর মুহুর্ত তৈরি হতে গিয়েও হলোনা। দ্বীপ রাগ সামলাতে না পেরে ভাতের প্লেট মেঝেতে ছুড়ে ফেলে বললো — ঠাটা পরা জীবন আমার,, চার আনার শান্তি নেই। ভালোবাসলাম একটা ভিতুর বাচ্চাকে,, মন বুঝেনা, ইচ্ছা বুঝেনা,, হুদাই ইদুরের বাচ্চার মতো চিউ চিউ করে।
