৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ১০
রুপান্জলি
১২/০৩/২০১৯
,,,মাঝে কেটেছে দুটো দিন, দ্বীপের থেকে শতবার পালানোর চেষ্টা করলেও দ্বীপের হাত থেকে ছাড়া পেলোনা পারু। ভার্সিটি বন্ধ থাকার দরুন দুজনের দেখা না হলেও পারুর জানালা বরাবর দ্বীপের দাড়িয়ে থাকাটা মিস যায়নি,, কল দিয়ে ধমকি ধামকি কিংবা প্রেম ময় বাক্য ব্যায় করাও মিস যায়নি। পারুর ইদানীং কি যেনো হয়েছে। মন জুড়ে ঘৃণার বদলে তিব্র অভিমান যুক্ত হয়েছে। তার মন মানতে চায়না দ্বীপ এসব করতে পারে। সে মন প্রান দিয়ে চায় দ্বীপ ভালো হয়ে যাক, মানুষকে আঘাত না করুক। কিন্তু তাতো হওয়ার নয়, সে পারুর জন্য কিছুই ছাড়বেনা বরং পারুকে তার ওসব কাজ মেনে ভালোবাসতে হবে। কেনো মানবে সে? ওসব কি ভালো কাজ? ভালো মানুষ রা কখনোই এরকম কাজ করেনা। পারু বোধয় দ্বীপের পাগলামি গুলোর মায়ায় পরে যাচ্ছে নয়তো তার এমন লাগে কেনো? এসব ভাবতে ভাবতেই রেডি হচ্ছিলো পারু। আজ ভার্সিটিতে তাদের নবীন বরন অনুষ্ঠান, তাই সিনিয়রদের দেওয়া কালার কোড অনুযায়ী শাড়ী পরে রেডি হচ্ছে সে আর সিমি। আজ যেহেতু ক্লাস নেই সেহেতু আজ সারাদিন সিমি আর সে একসাথেই থাকবে সাথে অবশ্য মেধা আর সিমির বান্ধবীরাও থাকবে। সবাই একসাথে দল বেধে ঘুরে বেড়ালেই বোধহয় বেশি মজা লাগে। শাড়ী পরা শেষ হলে সিমি পিন গুলো বক্সে রেখে বললো–
,,,পারু, হলো তোমার? চলো চলো, আমাদের কিন্তু কাজ আছে, ভুললে চলবেনা।
,,,সিমির কথায় ধ্যান ভাঙলো তার। সেও নিজের পিনগুলো বক্সে রেখে তারাহুরো করে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলো। আজ সত্যি ই তাদের বিশাল বড়ো একটা দায়িত্ব আছে। ভার্সিটির গেইট পেরুনোর সময় ভার্সিটিতে ডেকোরেটরের লোক আর কয়েকজন সিনিয়র বাধে তেমন কেউ ছিলোনা। তারমানে তারা ঠিক টাইমেই চলে এসেছে,, অগত্যা তারা সিনিয়রদের সাথে দেখা করে কমন রুমে চলে গেলো। ওখানে তাদের আরও কাজ বাকি।
,,, আসসালামু আলাইকুম, নমসস্কার এবং শুভ সকাল!! আশা করি সবাই ভালো আছেন, সুস্থ আছেন। প্রতি বছরের ন্যায় আজ আমরা আবারও নতুন মুখ,, নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে যাচ্ছি। আগমন জানাতে যাচ্ছি আমাদের আগামী ভবিষ্যত দের। অতিবো আন্তরিকতার সহিত সবাইকে জানাই নবীন বরনের সুভেচ্ছা। অতিরিক্ত বাক্য ব্যায় করে আপনাদের সময় নষ্ট করতে চাইনা। আপাতত আমি আসি,, আমি চলে গেলেও আপনারা স্টেজে চোখ রাখুন,, কারন আপনাদের জন্য একটা বিরাট সারপ্রাইজ রেডি আছে,, কাম অন, আমাদের দেবদাস-এর পারু,, দেবের পারু!!!!
,,,মাইকে ঘোষণা জানিয়ে হোস্ট চলে যেতেই সাউন্ড সিস্টেমে গানের বায়োলিন বাজতে শুরু করেছে। সাথে সাথে এক দল মেয়ে ছুটে এলো মঞ্চে তাদের মধ্যে মেইন ক্যারকক্টার হচ্ছে পারু আর তাকে প্রতিনিধিত্ব করছে মেধা আর সিমি, ওদের তিনজনার পিছনে দাড়িয়ে আছে ছয় জন মেয়ে। বাজনার শব্দ পেরিয়ে গান শুরু হতেই নাচতে শুরু করলো সবাই,,,
,,musam neli angdhani,, Aye
Aye,, lehraa kii barkha
phir chayi,, chayi,, chayi,,
Jhonka hawa ka aayega,
aur ye diya bujh jaaegaa
Silsila ye chahat ka naa
maine bujhane diya
Ho, hmm
Silsila ye chaahat ka naa
maine bujhane diya
O, piya, ye diya
Naa bujha hai, naa bujhegaa
meri chaahat ka diya
Mere piya, ab aaja re, mere piya
Ho, mere piya, ab aaja re, mere piya
,,,,মেইন লিড করা পারু আর তার সাথে মেধা-সিমির অসাধারন বন্ডিং যুক্ত ডান্স, সবাইকে এক প্রকার থমকে যেতে বাধ্য করেছে। সবার মাঝে মেইন আকর্ষণ হচ্ছে পারু, কারন তার কোমরের নিচ পর্যন্ত লম্বা ঘন চুলে আজ আর তেল নেই। সম্পূর্ন বাধন হাড়া চুলগুলো নাচের তালে তালে দোল খাচ্ছে। পারু যখন প্রদিপ হাতে এদিকে ওদিক ছুটে নাচ করছে তখন তার তেল বিহীন মুখটা সূর্যের নরম আলো আর প্রদিপের আলোয় জ্বল জ্বল করে উঠছে,, এটা যেনো আলো আর রুপের মনোমুগ্ধকর খেলা। ছিম ছাম গরনের পারুর শরীরে, নীল কালার ব্লাউজ আর লাল কালারের শাড়ী। সুন্দর মুখটায় আজ হালকা পাতলা সাজ। পারুর থিমে সাজতে গিয়ে যেনো নিজেই দেবদাস-এর পারু হয়ে উঠেছে৷ এদিকে ওর নাচ দেখে স্টুডেন্টদের মাঝে তিব্র উত্তেজনা কাজ করছে, সবার মুখে একটাই নাম,, পারু,, পারু,,, পারু,, পারু!!
,,, মুলত এমন নয় যে, সবাই পারুর নাম জানে, আসলে পারু পার্বতীর চরিত্রে নাচ করছে বলেই সবাই পারু পারু বলে চিৎকার করছে। কিন্তু এটা দ্বীপকে কে বুঝাবে? সে তো মহা নাছোড়বান্দা!! তার পারুকে কেউ এমন ভাবে দেখবে,, বারবার নাম ধরে ডাকবে এটা তার সহ্য হলোনা। সে জানতো সবার জন্য একটা সারপ্রাইজ ডান্সের এরেন্জম্যান্ট করা হয়েছে কিন্তু সেটা যে তার পারু করবে, সেটাতো সে জানতোনা। জানলে যে পারুকে দিয়ে সবার সামনে নাচ করাতে চেয়েছে তাকে সবার আগে কেটে কুটি কুটি করতো তারপর পারুর হাত পা ভেঙে নিজের সাথে মিশিয়ে রাখতো। পারুকে স্টেজে দেখে দ্বীপ বিহানের কলার ধরে শাসিয়ে বললো — বাস্টার্ডের বাচ্চা!! এই প্লান কার? কে আমার পারুকে নাচতে বলেছে? পারু নাচবে এটা আমাকে জানানো হয়নি কেনো? আমি এখানে রোজ রোজ ঘাস কাটতে আসি? আমার অনুমতি ব্যাতিত কার এতো বড়ো সাহস হলো, এন্স মি।
,,, বিহান দ্বীপকে শান্ত করতে বললো — ভাই থাম!! আমি খোজ নিচ্ছি,, মাস্টার্স এর ছেলেরাই বোধয় এমন করেছে। আসলে, কেউ তো জানেনা যে তুই পারুকে ভালোবাসিস বা পারু তর। নামের মিল আর অতিরিক্ত সুন্দরী হওয়ায় হয়তো ওকে নিয়েছে। তুই থাক! আমি দেখছি, এখনি গান বন্ধ করার ব্যাবস্থা করছি। আর কারা কারা এর মধ্যে আছে তাদের ও খবর নিচ্ছি। রাগিস না ভাই, পারুকে কিছু বলিসনা। মেয়েটা বাচ্চা তার উপর শান্ত শিষ্ট, নিশ্চয়ই কেউ জোর করেছে বলেই রাজি হয়েছে।
,,, বলেই বিহান দ্বীপের হাত কলার থেকে ছাড়িয়ে সাউন্ড সিস্টেমের ঐদিকে এগিয়ে গেলো তবে দ্বীপের যেনো এতেও শান্তি হলোনা। যেই অনুষ্ঠানে তার পারুকে দিয়ে নাচ করানো হয় সেই অনুষ্ঠান শান্তিতে কবার করতে দিবেনা সে। দ্বীপের কলিজা নিয়ে টানাটানি করার পর, বিষয়টা তো এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া যায়না। দ্বীপ একবার পারুর দিকে তাকিয়ে সোজা বিদ্যুৎ অফিসে কল করলো,, ওপাশ থেকে কল ধরতেই শাসিয়ে বললো।
,,, ১০ সেকেন্ডেের মাঝে যদি কারেন্ট না যায় তাহলে মিনিটের মাথায় বিদ্যুত অফিসে আগুন জ্বলবে।
,,,দ্বীপের কথা শেষ হতে দেরি ভার্সিটির প্রাঙ্গনে জ্বলা প্রতিটি লাইট, সাউন্ড সিস্টেম, মাইকিং সিস্টেম অফ হতে দেরি নেই। চারদিকে হৈচৈ পরে গেলো, এতো সুন্দর মোমেন্টে গান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয়? গান বন্ধ হতেই পারুরা থেমে গেলো। সবাই তাড়া দিলো আই পি এস চালু করার জন্য । নাহ!! আইপি এস লাইন ও বন্ধ, সব লাইন একসাথে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা কারোর বোধগম্য হলোনা। সকল ডিপার্টমেন্টের ডিএইচ, প্রোফেসর রাও বিচলিত হয়ে পরলো। তখনি সাংস্কৃতিক বিভাগের এজেন্ট জানালো খুব শিগ্রই জেনারেটরের ব্যাবস্থা করা হবে। আপাতত সকলে ওয়েট করুক,, সবাই চাইলে পারু আরও একবার পারফরমেন্স করবে। পারু আবার পারফরমেন্স করবে জানতে পেরে স্টুডেন্টরা শান্ত হলো। অগত্যাই পারুরা স্টেজ ছেড়ে বেড়িয়ে গেলো। নাচতে গিয়ে পারুর শাড়ীতে একটু প্রবলেম করছিলো তাই সে কমন রুমের দিকে পা বাড়ালো। হাটতে হাটতে যখন কোলাহল ছাপিয়ে কিছুটা নির্জন জায়গায় এলো তখনি খপ করে ওর হাত টেনে ধরলো দ্বীপ। তার চোখে মুখে অগ্নিয় গিরির দাবানল, কিছুতেই রাগ দমাতে পারছেনা। ওকে টানতে টানতে ফাকা একটা ক্লাসে নিয়ে গিয়ে দরজা আটকে দিলো। পুরো ভার্সিটির স্টুডেন্ট, প্রোফেসর-রা স্টেজে থাকার দরুন হাত ধরে টানাটানি করার সিনটা কেউ দেখতে পেলোনা। আর দেখলেও বা কি? ভার্সিটির ভিপি তার উপর এমপি মন্ত্রীর ভাতিজা, সবার সামনে থেকে তুলে নিয়ে গেলেও কারোর কিছু বলার ক্ষমতা নেই। দ্বীপ পারুকে নিয়ে ক্লাসে ঢুকে দরজা আটকে দিলো পরপর ওকে নিজের কাছে এনে শক্ত বাধনে বেধে রাখলো। পারুর ভয়ে হাত পা কাপছে তবুও চোখ মুখ জুড়ে তিব্র ঘৃনা। সেই ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে নজর রাখলো দ্বীপ, তবে পারুর ঘৃনাকে পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলোনা। তিব্র রাগে পারুর মাথার সব চুল একসাথে মুঠোয় নিয়ে, শক্ত করে ধরে শাসিয়ে বললো —
,,,তর মাথার তেল কই? মুখে, হাতে,পায়ে তেল দিলিনা কেনো? এখনো পর্যন্ত আমি যেই রুপ দেখিনি সেই রুপ অন্যকে দেখাচ্ছিস? তকে এতো সাহস কে দেয় পারু? বল আমায়,,কে দিলো এতো সাহস?
,,, চুলের ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা, এক হাতে দ্বীপের বুকের পাশের শার্ট খামচে ধরে অন্য হাতে নিজের চুলের ভাজে থাকা দ্বীপের হাত ছাড়াতে চেয়ে বললো– ছাড়ুন, লাগছে।
,,,দ্বীপ দাতে দাত চেপে বললো — তর কি মনে হয়? নাটক করছি আমি? ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছে,, এভাবে সাজলি কেনো? তকে নাচার পারমিশন কে দিয়েছে পারু ? আর পরপুরুষদের নিজের রুপ দেখানোর পারমিশন কে দিয়েছে? বল!!
,,,পারু এখনো চুল থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে,, ব্যাথায় ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। পারুর নিস্তব্ধতা সহ্য হলোনা দ্বীপের সে হাতের জোড় বাড়িয়ে হিসহিসিয়ে বললো — কথার উত্তর দে পারু,, কে বলেছে তকে এসব করতে? আমার মাথাটা খারাপ করিসনা,, ভালোবাসি বলে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র কিন্তু আমি নই। তকে একদম খুন করে নিজে মরে যাবো, তাও তকে অন্য কেউ এভাবে দেখবে সেটা সহ্য করতে পারবোনা। শুধু একবার নাম বল, বল বেয়াদবের বাচ্চা। ( খেকিয়ে উঠে)
,,,ব্যাথায় ফুপিয়ে উঠলো পারমিতা, ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে দ্বীপের বুকে মাথা হেলিয়ে দিলো। দ্বীপ বোধয় এমন কিছু আশা করেনি, তরতরিয়ে উঠা রাগটা হুট করেই নিভে গেলো। উন্মাদের মতো পারুর চুলের ভাজে হাত ভুলাতে ভুলাতে শ-খানিক চুমু খেলো। পরপর গাল আকরে দু চোখের পাতায় ঠোঁট ছুইয়ে বললো — বলো জান!! কে তোমাকে নাচতে বলেছে? বলো।
,,,দ্বীপ নরম হয়ে আসতেই পারু ছিটকে দূরে সরে গেলো। এই প্রথম নিজের স্বভাবের বাহিরে গিয়ে কাদতে কাদতে চেচিয়ে বললো — কেনো? জেনে কি করবেন? কি কাজ জেনে? যারা বলেছে তাদেরকেও মারবেন? খু*ন করবেন? আপনার মতো মানুষকে আমি কোনোদিন ভালোবাসবোনা। আপনাকে আমি ঘৃণা করি,, বুঝলেন? দূরে যান, আমাকে শান্তিতে বাচতে দেন। আমি আপনার কাছে কোনোদিন যাবোনা, ভালো ও বাসবোনা।
,,, কমে যাওয়া রাগটা আবারও তরতর করে বাড়লো, তেড়ে গিয়ে পারুর বাহু চেপে আবারও নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বললো— ত্যাজ দেখাস? ত্যাজ দেখাস আমাকে? বলতে বললাম না? কারা কারা বলছে তকে নাচতে? দেখ পারু!! আমি এখান থেকে বের হলেই সব জানতে পারবো,, আমি চাই তুই নিজের মুখে বল। তুই এক্খন আমার কাছে নালিশ করবি,, নালিশ কর!!
,,, পারু ফোপাতে ফোপাঁতে বললো — পাগল আপনি,, ভালো ডক্টর দেখান। আপনার মানষিক চিকিৎসার দরকার, কোনো স্বাভাবিক মানুষ কখোনোই, এই সামান্য কারনে এমন করতে পারেনা। আমার জীবনটা জাহান্নাম করে দিয়েছেন, দম বন্ধ লাগে।
,,,পারুর বলা কথাগুলো দ্বীপের খুব লাগলো,, সে ধাক্কা দিয়ে পারুকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিলো। পরপর তাচ্ছিল্য হেসে বললো — আমার ভালোবাসাকে তর মানসিক রোগ মনে হয়? যাহ!! করলামনা পাগলামি,, থাক তুই তর মতো। বাট!! বাট,, তুই আমার জন্য কাদবি। কাদতে কাদতে বারবার ভালোবাসার জন্য পাগলামি করবি। আর তুই যেদিন ঠিক আমার মতো পাগল হবি,, মানসিক রুগি হবি,, ডাক্তারের প্রয়োজন পরবে,, সেদিন আমি তর কাছে ফিরবো। এর আগে যদি আমি তর কাছে এসেছি তাহলে আমি মাহিদ মির্জার সন্তান না। সর বেয়াদবের বাচ্চা!!
,,,বলেই ধাক্কা দিয়ে পকেট থেকে সি*গারেট বের করে লাইটার দিয়ে সি*গারেট ধরালো। ঠোঁটে চেপে অনেক সময় নিয়ে সি*গারেট টেনে সব ধোঁয়া গিলে নিলো। পারু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে,, তার বুকে সুক্ষ যন্ত্রণা হচ্ছে। সে তো এভাবে বলতে চায়নি,, রাগের মাথায় কি থেকে কি বলে ফেলেছে সে নিজেই বুঝতে পারেনি। দ্বীপকে ধোয়া গিলে নিতে দেখে পারুর চোখ ছাপিয়ে পানি ঝরলো। এই লোকটা সত্যি ই উন্মাদ, পাগল। নয়তো কেউ এমন বিপদ জনক কাজ করে? এই লোক কি জানেনা? সি*গারেটের ধোয়া গিলে নেওয়া কতোটা ক্ষতিকারক? পারু কাদতে কাদতে কিছু বলতে নিবে তখনি দ্বীপ আবারও সিগারেট টেনে ধোয়া গিলে নিয়ে ধাম করে দরজা খুলে বেড়িয়ে গেলো। পারু তাকিয়ে দেখলো দ্বীপের প্রস্থান,, লোকটা এতো ত্যারা কেন? সবসময় এমন করে।
,,,অর্পণ, প্রিন্সেস!! দরজা খুলো।
,,, দরজার ঠক ঠক শব্দের সাথে পাপ্পার ডাক ভেসে আসতেই অর্পনা অতীত থেকে বের হয়ে ডায়েরিটা বন্ধ করে নিলো। যদিও এই জায়গাটাতে প্রবল উত্তেজনা কাজ করছে,, কি হবে তারপর? দ্বীপ কি সত্যি ই আর পারুর কাছে ছুটে যাবেনা? পারু কি সত্যি ই দ্বীপকে পাওয়ার জন্য পাগলামি করবে? দ্বীপের জন্য কাদবে? কি হবে ভবিষ্যতে? তাদের কিভাবে মিলন হবে? পারু কি তার স্বপ্নের সংসার পাবে? পারু আর দ্বীপের কি একটা সুন্দর সংসার হবে? নাকি তারাও মেতে উঠবে বিচ্ছেদের খেলায়? তারাও কি একে অপরের কাছে ঠকে যাবে? এরকম হাজারটা প্রশ্ন মনে চেপে রেখে ডায়েরিটা আপাতত বুক সেল্ফে রেখে দিলো। পাপ্পা চলে গেলে নাহয় আবারও পড়া যাবে। অর্পনা ডাইরিটা রেখে দরজাটা খুলে দিলো,, আরসাদ জামান দুহাতে দুকাপ কফি নিয়ে অর্পনার দিকে রুষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো । অর্পনা ভ্রু নাচিয়ে বললো — কি ইয়্যাং ম্যান, কি ব্যাপার? এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? আমাকে কি কোনো সাইড থেকে ক্রিমিনাল ক্রিমিনাল ভাইব দিচ্ছে? গোয়েন্দা গিড়ি করে থানায় ঢুকিয়ে দেওয়ার প্লান কষছেন না তো? দিলেও দিতে পারেন,, ঘরে ডিটেক্টিভ বাপ থাকলে আমার মতো ক্রিমিনাল রা এতো সহজে ছাড়া পাবে বলে মনে হয়না। তো ডিটেক্টিভ সাহেব!! আপনার হেন্ডকাফ কোথায়? আমি কিন্তু হাত বাড়িয়ে রেখেছি, পড়িয়ে দিন। ( বলতে বলতে আবারও বার কয়েক ভ্রু নাচালো অর্পনা)
,,, মেয়ের হাসি খুশি মুখ খানা দেখে আরশাদ জামানের রাগটা পরে গেলো। উনার মেয়েটা সবসময় হাসেনা শুধু বন্ধু বান্ধব আর উনার সাথেই টুকটাক হাসে, আর নয়তো বাকিটা সময় মেয়েটা মন খারাপ করে থাকে। মেয়েটার বুকে চেপে রাখা সব কষ্ট তিনি পারেন না এক লহমায় মুছিয়ে দিতে। ঐ কষ্ট মুছতে গেলে যে মেয়েটা আরও গভীর কষ্টে ডুবে যাবে। থাকনা!! এটুকু কষ্ট নিয়েই বেচে থাক। কোনো না কোনো একদিন মেয়েটা যদি কাউকে ভালোবাসে আর ঐ মানুষটার কাছে প্রকৃত ভালোবাসা পায় তখন হয়তো এই আক্ষেপ, অবিশ্বাস, কষ্ট গুলো তার জীবনে এক্সিস্ট করবেনা। সবাইকে আর ঠক মনে হবেনা। ভাবতে ভাবতেই মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন আরশাদ জামান। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির কাপ দুটো টেবিলে রেখে মেয়েকে নিয়ে বিছানায় বসলেন, তারপর কফির কাপগুলো দেখিয়ে বললেন,,
,,,মাম্মা!! তুমি কি জানো? ঘন্টা খানিক আগেও এই কফিতে গরম ধোয়া ছড়াচ্ছিলো?
,,,অর্পনা কিছু বললো না, শুধু নিরব দৃষ্টিতে পাপ্পার দিকে তাকিয়ে রইলো, বুঝতে চাইলো পাপ্পা তাকে কি বলতে চায়। আরশাদ জামান তপ্ত শ্বাস ফেলে বললেন — ঐ ধোয়া উঠা কফিটা খেতে যতখানি অমৃত লাগতো, বর্তমানে সেই কফিটাই বিষের মতো তিক্ত হয়ে উঠেছে, তুমি শত চাইলেও সেই আগের স্বাধ ফিরে পাবেনা। আমাদের জীবনটাও এমন মাম্মা, আজ তোমায় যে সবটা জুড়ে ভালোবাসলো, তাকে তুমি অবহেলায় ছুড়ে ফেলে দিলে, গতকাল তার ভালোবাসাটা যখন হাড়িয়ে যাবে তখন তুমি শত চাইলেও আগের ভালোবাসাটা ফিরে পাবেনা। আদ্রিয়ানকে অবহেলা করোনা মা, সে তোমায় পাগলের মতো ভালোবাসে।
,,,,অর্পনা ঠোট বাকিয়ে হাসলো,, সে জানে তার কাজে আদ্রিয়ান কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু সে তার জীবনে কাউকে জড়াতে চায়না, বিশেষ করে আদ্রিয়ানকে। তাই ওর সাৎে খারাপ ব্যাবহার করে যেনো অর্পনকে ভুলে অন্য কাউকে নিয়ে সংসার সাজায়। অর্পনা উঠে গিয়ে তার চিরো সঙ্গি গিটারটা এনে পাপ্পার কাধে মাথা রেখে বললো — পাপ্পা গান শুনবে?
,,, আরশাদ জামান মেয়ের চুলের ভাজে হাত ভুলিয়ে বললেন — আমার কথার প্রেক্ষিতে কিছু বলবেনা মাম্মা?
,,, অর্পনা গিটারে টুংটাং শব্দ করে বললো — যেই কফির সাধ ক্ষনিকের অবহেলায় হাড়িয়ে যায়, সেই কফি আমার চাইনা। আমি নতুন এক কাপ বানিয়ে খাবো, বাড়িতে কি কফির অভাব পরেছে?
,,,বলেই শব্দ করে হাসলো অর্পনা, আরশাদ জামান তপ্ত শ্বাস ফেললেন। মেয়েটা কফির মাধ্যমে তাকে জটিল একটা উত্তর দিলো, যেই উত্তর টা উনার সাথে সাথে দরজার বাহিরে দাড়িয়ে থাকা আদ্রিয়ানের বুকেও আঘাত হানলো। লোকে বলে পুরুষ মানুষ কাদেনা, তবে আদ্রিয়ানের চোখে পানি কেনো? আল্লাহ কি কোনোদিন তার সহায় হবেন না? এতো ভালোবাসার পরেও কি সে অর্পনার একটুখানি মনোযোগ পাবেনা? ভাবতে ভাবতে আরও কয়েক ফোটা অশ্রু ছেড়ে দিলো আদ্রিয়ান। তার কিছুই ভালো লাগেনা। ভালোবাসার কাঙাল হয়ে পরিবার ছেড়ে বাংলাদেশে পরে আছে আজ দু বছর। বাবার এতো এতো সম্পত্তি, প্রতিপত্তি রেখে সামান্য ভার্সিটির প্রোফেসর হিসেবে জীবন কাটাচ্ছে। আমেরিকায় তার কি নেই? সব সব সব আছে। তবুও সে অর্পনার জন্য পরে আছে, মেয়েটা যদি তাকে একটু বুঝতো। ভালো না বাসুক সারাটা জীবন একসাথে থাকুক। প্রয়োজনে সে সারাজীবন অর্পনাকে না ছুয়ে থাকবে তবুও অর্পনা তার হোক, তার সাথেই থাকুক।
,,,অর্পনা উঠে গিয়ে লাইট অফ করে দিলো, এখন সে লাইভে যাবে, সাথে পাপ্পা থাকার দরুন ড্রিম লাইট জ্বালালো না। রুম অন্ধকার করে আবারও বাবার কাধে মাথা রেখো গিটারে সুর তুলে গাইলো,,,
,,,প্রেমে পড়া বারন,, কারনে, অকারন,,
,,আঙুলে আঙুল রাখলেও,, হাত ছোয়া বারন,,
,,,প্রেমে পড়া বারন,, কারনে, অকারন,,
,,আঙুলে আঙুল রাখলেও,, হাত ছোয়া বারন,,
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৯
,,,,,,,, প্রেমে পরা বারন ,,,,,,
,,তোমায় যত গল্প বলার ছিলো,,
,,সব পাপড়ি হয়ে গাছের পাশে ছড়িয়ে রয়ে ছিলো,,
,,দাওনি তুমি সেসব আমায়,,
,,কুড়িয়ে নেবার কোনো কারন
,,,প্রেমে পড়া বারন,, কারনে, অকারন,,
,,আঙুলে আঙুল রাখলেও,, হাত ছোয়া বারন,,
