নোলকের নতুন শাড়ি শেষ পর্ব
ইলোরা ফারদিন
বাসার সামনে এতো মানুষ দেখে চমকে গেল হাসান আর নোলক। দ্রুত গতিতে বাসার ভেতরে যেয়ে যা দেখলো তা দেখে হাসান সাথে সাথে জ্ঞান হারালো।
ফরিদা বানুর মাটি হলো কিছুক্ষিণ আগে। হাসান উঠানে বসে আছে। ওর থেকে একটু দূরে রতন আর সাকিব বসে। পরের দিন আসার কথা থাকলেও, হাসানরা এসেছে আরও এক মাস পর। বাচ্চাদের পরীক্ষা ছিল।
এদিকে বিনুও উদাস চোখে উঠানে বসে আছে। তার মুখেও ইদানীং কোনো রা শোনা যায় না। শাহেদের মৃত্যুর সাথে তার অহংকার টাও ভেঙে গিয়েছে। বাড়ি ব্যবসা সব তার নামে। তাই টাকার অভাব নেই। কিন্তু এসব দিয়ে কি কাজ। মাথার উপর স্বামী নামক ছাদটাই যে নেই তার। শাহেদ মারা যাওয়ার পর শাহেদের মা বোন পুরো ভেঙে পরেছিলেন। কিন্তু পরে তাদের মনে আবার লোভ জেগে ওঠে। ছেলের এই অবস্থার জন্য তারা বিণুকে দায়ী করে মামলা দিতে চেয়েছিল, সম্পত্তি নিজেদের আয়ত্ত্বে নিতে চেয়েছিল। এক কথায় ছেলে মারা গিয়েছে, ভাই মারা গিয়েছে এসবে তাদের মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু বাড়ির বউয়ের ঘাড়ে দোষ দিতে হবে, সম্পত্তি নিজেদের নামে নিতে হবে এটাই এখন তাদের মূখ্য কাজ।
কিন্তু বিনুও তো তাদেরি মতো। সে মোটেই এসব সহ্য করে নি। সরাসরি বলে যে সু*ইসাইড নোটে আপনাদেরও নাম উল্লেখ আছে। মামলা দেই আপনাদের নামে?
এই কথা শুনে দুই মা মেয়ে ভয় পেয়ে যায়। বিনুও বিন্দু মাত্র দেরি না করে মা মেয়েকে বাসা থেকে বের করে দেয়। সে প্রথমে ভেবেছিল এদের দায়িত্ব নিবে। কিন্তু এরা যেই রূপ দেখালো, পরবর্তীতে দেখা যাবে সম্পত্তির লোভা তার বাচ্চা দুটোকে মেরে ফেলেছে।
আর শাহেদ? ওকে নিয়ে আর ভাবে না বিণু। যেই মানুষটা মৃ*ত্যুর আগে লিখে গিয়েছে যে বিনু তার প্রিয় মানুষ ছিল না, তার জন্য মায়া কান্না কেনো করবে। হ্যা, স্বামীকে হারিয়ে সে কষ্ট পেয়েছে। মানুষটা তাকে ভালো না বাসলেও সে তো ভালোবেসেছিল। নিজের ভাইয়ের উপর মানসিক চাপ দিয়ে টাকা নিয়ে দিত শাহেদকে যাতে শাহেদ একটি ভালো অবস্থানে নিতে পারে, দিন রাত সংসার সন্তানের পেছনে খেটেছে। বিনিময়ে পেল শাহেদের এতো অপবাদ। সে মানে যে সে স্বার্থপর কিন্তু সে সব সময় একজন ভালো স্ত্রী আর মা হওয়ার চেষ্টা করেছে। চেচামেচি করতো, কিন্তু তা শুধুমাত্র নিজের সংসারের খাতিরে।
কিন্তু যাই হোক, শাহেদের চলে যাওয়ার পর বিনুও নিজেকে বদলে ফেলেছে। আজকাল চুপচাপ থাকাটাই তার কাছে শান্তির। কারো কাছে আর চাওয়া পাওয়া নেই, রাগ নেই, অভিমান নেই। নিজের ভুল গুলোই এখন সে বোঝে। সে মাত্র একটি বছর শ্বাশুড়ি ননদের অত্যাচার সহ্য করতে পারি নি। আর নোলক কত বছর ধরে সহ্য করেছে।
এদিকে নোলক রান্না ঘর সামলাচ্ছে। বাসায় এতো লোক। খালি মুখে তো আর বসিয়ে রাখা যায় না। নোলক অবশ্য ভেবেছিল সব ভাই বোন মিলে হাসান আর তার উপর চড়াও হবে যে তাদের জন্য আম্মার এই অবস্থা। কিন্তু এমন কিছুই হয় নি। অবশ্য কেউ কিছু বললে নোলক চুপ থাকতো না। উলটো কথা শুনিয়ে দিত। তিন বছরে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। সবার মাঝেই পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে তার দুই ননদ। কিছুক্ষণ আগেই অবশ্য জানতে পেরেছে বিনুর জামাই নাকি আত্মহ*ত্যা করেছে।
নোলকের চিন্তার মাঝেই বিনু আর মিনু রান্না ঘরে এলো। এসে নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করলো, ” ভাবি কোনো কাজ থাকলে বলেন। করে দিচ্ছে।”
দুই বোনের আচরণে বেশ অবাক হলো নোলক। এতটা পরিবর্তন হলো কি করে। সূর্য কোন দিকে উঠেছে।
নোলকের মনের কথা বুঝলো মিনু। হালকা হেসে বলল, ” পরিস্থিতিই আমাদের সব শিখিয়ে দিয়েছে ভাবি। এসব নিয়ে ভেব না।”
তারপর দু বোনই নোলকের হাতে হাতে কাজ করতে লাগল।
বাড়িতে আসা মেহমানরাও অবাক হলো। এই ভাবি ননদগুলোর মিল হল কবে!
ধীরে ধীরে সব আত্মীয় চলে গিয়েছে। বাসায় এখন মিনু, বিনু, হাসান,নোলক, রতন আর সাকিব। অদ্ভুৎ ব্যাপার হচ্ছে আজ কারো মধ্যে তাদের মায়ের টাকা বা সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে কোনো কথাই হচ্ছে না। যেন ওসবে আর কারো কোনো টান নেই। বুঝে গিয়েছে এসব জীবনের মূল না।
নিরবতা ভেঙে নোলক বলল,” মিনু তুমি যেহেতু এখন একা, তুমি বরং আমাদের সাথে ময়মনসিংহ চলো।”
মিতু হেসে উত্তর দিল, ” না ভাবি, আমি এখানে চাকরি করি। হ্যা, এই বাসায় থাকব না। এতো বড় বাসায় আমার একা থাকা নিরাপদ না। ভেবেছি এখানেই একটি মহিলা হোস্টেলে থাকবে। তবে আগের বারের মতো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন কর না। জানি অনেক অভিমান আমাদের উপর। পারলে ক্ষমা করিও।”
পাশ থেকে রতন বলল,” হ্যা ভাবি। আমাদের সবার এখন আলাদা আলাদা জীবন। তোমার আর হাসান ভাইয়ের প্রতি অন্যায় করেছি অনেক। এখন অনুভব করি। কিন্তু যোগাযোগ টা অন্তত রেখো। বছরে একদিন যাতে একসাথে সপ্তাহ খানেক এক সাথে থাকতে পারি, সেই আশাই রাখি এখন।”
সাকিব বলল,” আমি এবাসাতেই থাকতে চাই। দোকানে মাল তুলব ভেবেছি। একটি মুদি দোকান দিব। ব্যবসাটা দাড় করিয়েই সাধারণ মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিব।”
সাকিবের কথায় সবাই সমর্থন জানালো
সাকিব আবার বলল,” মিনু তুই চাইলে আমার সাথেই থাকতে পারিস।”
মিনু হেসে বলল,” না ভাইয়া। কারো সংসারে আর থাকতে চাই না। তোমাদের দোষ দিব না। কিন্তু মা যখন অসুস্থ ছিল, তখন তোরা কেউ পাশে ছিল না দায়িত্ব নেয়ার ভয়ে। আমি তখনও চাকরিতে ঢুকি নি। মায়ের ওই মাসিক মুনাফা আর আমার টিউশনির টাকায় সংসার চলেছে। আমি বাধ্য হয়ে জুতার দোকানে সেলস গার্লের চাকরিও করেছি। হাসান ভাই মায়ের অসুস্থতার কথা জানলে অবশ্য সাথে সাথে ছুটে আসতো, ভাইয়ার উপর এই বিশ্বাস আছে। কিন্তু তোমাকে আর রতন ভাইকে জানানোর সত্ত্বেও তোমরা ফিরেও তাকাও নি। একটা বার ভাবও নি আমি একা কিভাবে সামলাবো। বিনু আপাও দায়িত্ব নেয়ার ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। আমি ভুলি নি সেসব দিনের কথা। যাই হোক। কারো প্রতি রাগ নেই। আমি চাই দূরত্ব বজায় রেখেই আমরা যে যার মতো ভালো থাকি যেন, যোগাযোগ টুকু অন্তত থাক। এর বেশি কিছু না।”
তারপর হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল,” ভাইয়া মায়ের ব্যংকের পচিশ লাখ টাকার পনেরো লাখ মা তোমাকে দিয়েছে। পাচ লাখ আমাকে। আর বাকি পাচ লাখ রতন ভাই, বিনু আপা আর সাকিব ভাইয়ের নামে। আশা করি এ নিয়ে কেউ চেচামেচি করবে না। হাসান ভাইয়ের প্রাপ্যটুকু মা তাকে দিয়েছে। আর আমি যেহেতু শেষ সময়ে তার পাশে ছিলাম, তাই আমাকে আমার প্রাপ্য টুকু দিয়েছে। আর এই বাসার অর্ধেক আমার আর বিনু আপার নামে। বাকি অর্ধেক হাসান ভাই, রতন ভাই আর সাকিব ভাইয়ের নামে।একটু পরেই উকিল আংকেল আসবে।”
রতন আর সাকিব কিছু বলতে যেয়েও থেমে গেল। এতোদিন তো শুধু টাকা আর নিজের স্বার্থের কথায় ভেবে এসেছে। কিন্তু দিনশেষে জীবনে শান্তি পায় নি। এবার অন্তত আর লোভে না পরে, স্বার্থপর না হয়ে নতুন করে জীবন গড়বে।
এদিকে বিণুও পুরো সময় চুপ ছিল। কারণ এখন তারও আর কোনো লোভ নেই। এখন তার জীবনের একটিই লক্ষ্য সন্তান দুটোকে মানুষ করতে হবে।
“তো কি ভাবলে মায়া? আমার সাথে সংসার চাও নাকি নিজের বাপের বাসাত থেকে যেতে চাও।” নির্লিপ্ত ভাবে জিজ্ঞেস করলো রতন
” আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও রতন। আমি ভালো নেই এখানে। সবাই অনেক খারাও ব্যবহার করে।”
” এড্রেস তোমার জানাই আছে মায়া। চলে এসো। কিন্তু মনে রেখো আমার অল্প বেতনেই তোমাকে এডজাস্ট করতে হবে।”
” আমি রাজি রতন। আমার শুধু নিজের একটি সংসার চাই। আর কিছু চাই না। এই দুই মাসে অনেক কিছু বুঝেছি। ” কাদতে কাদতে বলল মায়া
” চলে এসো মায়া। আমি আর আমার সংসার দুটোই তোমার অপেক্ষায় আছি।”
“মিনু, কেমন আছো?”
স্কুলের সামনে অয়নকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিনু অবাক হলো। তবে কিছু না বলেই সে অয়নকে এড়িয়ে চলে গেল।
অয়নও নাছড় বান্দা হয়ে মিনুর পিছু পিছু যেতে লাগলো।
এভাবে রাস্তার মাঝে একটি ছেলে তার পিছু পিছু ডাকছে, বেশ বিব্রত হলো মিনুম বাধ্য হয়ে পেছনে ফেরে সে রাগান্বিত স্বরে বলল, ” আপনার সমস্যাটা কি
অয়ন? কেনো পিছু পিছু ঘুরছেন? ”
” মিনু আমার তোমার সাথে কথা ছিল। একটু সময় দিবে প্লিজ?”
” কেন? আমাকে দেখে পুরোনো প্রেম জেগে উঠেছে। লজ্জা করে না বাসায় বউ রেখে প্রাক্তনের পিছু পিছু ঘুরছেন?”
মিনুর কথায় তব্দা খেল অয়ন৷ ও তো বিয়েই করে নি। বউ কোথা থেকে আসলো। তবু নিজেকে শান্ত করে বলল, ” এখানে রাস্তায় কথা বলা ভালো দেখায় না। আমরা বরং কোনো ক্যাফে তে যেয়ে বসি।”
বাধ্য হয়ে মিনু রাজি হলো। জানে অয়ন পিছু ছাড়বে না।
” এখন বলুন কি চান?”
” তোমাকে।।”
” ফাইজলামি পেয়েছেন অয়ন? আমাকে এতো সস্তা মনে হয় যে একজন বিবাহিত পুরুষের সাথে সম্পর্কে জড়াবো। থা*পড়ে দাত ফেলে দিব। অসভ্য লোক।”
বলেই মিনু উঠে যেতে নিলে অয়ন ওর হাত আটকে ফেলে।
তারপর বলে,” আমি বিয়ে করি নি মিনু। বিশ্বাস করো।” তারপর একে একে সব ঘটনা খুলে বলল।
সব ঘটনা শুনে মিনু স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর অয়নকে জুতোর দোকানের ঘটনা জিজ্ঞেস করলো।
” ওটা সম্পর্কে আমার ভাতিজি মিনু। আমার বড় চাচার বড় ছেলে মেরাজ ভাই আর আমার বাবা সমবয়সী। ফলে মেরাজ ভাইয়ের মেয়ে আর আমিও প্রায় সমবয়সী। ও আমাদের সকলের আদরের। ওর বিয়েও হয়ে গিয়েছে। এখন লন্ডনে স্বামীর সাথে থাকে। বিশ্বাস না করলে এই দেখো ছবি।”
ছবি দেখে মিনু বাচ্চাদের মতো কেদে দিল। অয়নও আগলে নিল তাকে
আজ মিনু আর অয়নের বিয়ে। সবার আলাদা আলাদা সংসার থাকলেও আজ মিনুর বিয়ে উপলক্ষে সবাই এক হয়েছে। হাসান নিয়েই মিনুর বিয়ের সব দায়িত্ব নিয়েছে। নোলকের সিদ্ধান্তও এটাই। নোলকের টাকা পয়শার লোভ নেই। ও চেয়েছিল শুধু একটু সম্মান আর ভালোবাসা। আর মিনু যেহেতু বদলে গিয়েছে, তাই মিনুকে নিয়ে নোলকের আর কোনো ক্ষোভ নেই। উলটো মিনুর বিয়ে উপলক্ষে নোলক নিজের একটি গলার হার মিনুকে উপহার হিসেবে দিয়েছে।
নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ১১
কি অদ্ভুৎ না, যেই মিনুর বিয়েতে চার বছর আগে সবাই আলাদা হয়েছিল, আজ সেই মিনুর বিয়ে উপলক্ষে সবাই আবার এক হয়েছে। তখন সবার মনে স্বার্থ হিংসা কত কিছু ছিল, কিন্তু আজ সবার মনে ভালোবাসা আর একজন আরেকজনের প্রতি সম্মান।
যেই গল্পের শুরু হয়েছিল নোলকের সামান্য একটি নতুন শাড়ি দিয়ে, সেই গল্পের সমাপ্তি ঘটলো নোলকের সম্মান দিয়ে।
ওটা শুধু নোলকের নতুন শাড়ি ছিল না, ছিল নোলকের আত্মসম্মানের লড়াইয়ের সূচনা। যা সে অর্জন করেই ছেড়েছে। নোলক জিতেছে।
সমাপ্ত
