Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৪৮

এক দেখায় পর্ব ৪৮

এক দেখায় পর্ব ৪৮
সুরভী আক্তার

শান্ত নিরিহ চোখে রাফির দিকে তাকিয়ে । চোখের চাহনি ক্রমান্বয়ে কাতর হয়ে আসলো । নিচের অধর কামড়ে ও আরো একবার তাকালো সাবিনা বেগমের দিকে । অতঃপর রাফির পানে চেয়ে এগিয়ে গেল । ওর পাশে দাঁড়িয়ে বিষাদের শ্বাস ফেলে শীতল কন্ঠে বলল…
” ডাক্তার যখন বলেছে তখন খুব তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরবে । মিহির তো কিচ্ছু হয় নি, আর না কিচ্ছু হবে । ডোন্ট ওয়ারি । তুই ওয়াশ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে, আমি বসছি ওর পাশে !
রাফি বোধহয় মনে মনে ভাবলো । বাধ্য ছেলের ন্যায় দুদিকে মাথা নাড়ালো । অতঃপর উঠে কথা না বাড়িয়ে নিজের মাঝে বিড়বিড় করতে করতে ওয়াশ রুমের দিকে এগোলো । শান্ত ওর জায়গায় বসলো ধীরে সুস্থে । মিহির অবচেতন মুখ খানার পানে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে একটু হাসলো । মিহির বাম হাত টা নিজের হাতের মুঠোয় নিলো । অন্য হাতে স্নেহের সহিত মিহির মাথায় একবার হাত বুলিয়ে আলতো হেসে বলল…

” দেখেছিস পরী ,, তোর জন্য রাফি টা কতো পাগল । কি করেছিস বলতো ওকে ?
তুই তো আমাদের সেই ছোট্ট পরী , আমাদের মিফতাহুল তাই না ? দেখনা, তোকে চিনতে কতটা দেরি করে ফেললাম । জানিস, আমি তোর শান্ত ভাইয়া । আমাকে কি বলে যেনো ডাকতিস তুই ? দেখ , কেমন ভুলে গেছি আমি ? এতো বছর আগের কথা,মনে থাকে কি করে বলতো ? তুই তো তখন কথাই বলতে পারতিস না ঠিকমত । এখন তো অনেক কথা শিখেছিস তাই না ? আর এখনো আমি তোর সেই শান্ত ভাইয়াই আছি । আর তুই , আমার পাখি , আমার জানের পাখি । উঠনা রে , রাফি তোকে পরী বলে ডাকতো জানিস ? ওর পরী তো তুই ? একটু কথা বল ?
তুই জানিস, তোর শরীরে জন্ম দাগ আছে ! আমি কিন্তু জানতাম না । কিন্তু রাফি , ও জানতো , আর ওর মনেও ছিলো দেখ । ওকে আর কষ্ট দিস না পরী , ওকে আমি এমনটা কক্ষনো দেখিনি বিশ্বাস কর ।
” মিহির শরীরে জন্ম দাগ আছে , এটা রাফি কি করে জানলো ?
শান্তর কথার মাঝে আচমকা সাবিনা বেগমের প্রশ্নে চকিতে তাকালো ও । চোখাচোখি হলো সাবিনা বেগমের সাথে । অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়লো ও বোধহয় । ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা অবস্থায় পড়লো….

” জ্বি আন্টি ?
” মিহির জন্ম দাগ রাফি দেখলো কি করে ?
সাবিনা বেগমের কন্ঠ ভার ।
” না,, মানে আন্টি….
শান্তর আমতা আমতা করার মাঝেই মিহির কন্ঠে অস্ফুট আওয়াজ কানে ঠেকলো । তড়িতে ওর দিকে মনোযোগ দিলো শান্ত । সাথে সাবিনা বেগম ও । তিনি সব ভুলে আঁতকে মুহুর্তেই তেড়ে গেলেন মেয়ের কাছে । শান্ত সচকিতে বিচলিত হয়ে ডাকলো….
” মিহি ??
চোখ জোড়া সূক্ষ্ম করে খোলার চেষ্টা করলো মিহি । মুখে ব্যাথা তুর অস্ফুট স্বর । চেহারা কুঁচকানো ব্যাথায় । মিহি সমস্ত জোর খাটিয়ে আধো আধো চোখ খুললো । প্রথমেই চোখে পড়লো শান্তর বিচলিত মুখশ্রী । একটা শ্বাস টেনে ঢোক গিললো মিহি । চোখ বোধহয় অন্য কাউকে দেখার আশায় ছিলো । মরিয়া ছিলো তৃষ্ণার্ত নয়ন জোড়া । মিহি অস্ফুটে উচ্চারণ করলো….

” ভাইয়া ,, আমার আম্মু….
” এইতো মা ,, আমি আছি তোর কাছে । এইযে তোর আম্মু । আমি আছি তো , কোত্থাও যাই নি…
ভেজা সঙ্কিত কন্ঠ স্বর সাবিনা বেগমের । মিহি ধীরে ধীরে পাশ ফিরলো । আধো ভেজা চোখে আম্মু কে দেখে ঠোঁট উল্টে ফিকড়ে উঠলো । শান্ত এক পলক তাকালো ওয়াশ রুমের দিকে । রাফি বেরোয় নি এখনো । ও বিচলিত হয়ে বললো…
” আন্টি ,,মিহিকে দেখুন । আমি ডক্টর কে ডেকে নিয়ে আসছি ।
বলেই তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল ও । মিহির কন্ঠে ব্যথিত জড়তা । গলা চিরে যাচ্ছে মনে হচ্ছে । ও তবুও বললো রুদ্ধ স্বরে…

” আম্মু , তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না প্লিজ । আমি আর তোমার কথার অবাধ্য হবো না । সব শুনবো , কারোর সাথে সম্পর্ক রাখবো না । তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও এবারের মতো ‌। আমি সত্যি বলছি , আর ভুল করবো না আমি…
সাবিনা বেগম নিজেকে ধাতস্থ করতে রত । মিহি কে আর কোনো প্রকার চাপ দেওয়া যাবে না । তিনি নিজেকে সামলে কান্না গিলে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন…
” চুপ ,, একদম চুপ । কোথায় যাবো না আমি । এখন এসব কথা বলার সময় নয় । তুই শান্ত হ মা , ডাক্তার আসুক । তোকে দেখবেন উনি ।
রাফি ক্লান্ত শরীর খানা কোনো রকমে টেনে টুনে ওয়াশ রুম থেকে বের করলো । ভীষণ ভার লাগছে নিজেকে । পায়ের ধাপ বাড়ানো দায় হয়ে পড়েছে । ঘাড়ে টান ধরেছে কেমন । চোখ জ্বলছে , ধোঁয়া বেরোচ্ছে যেন । তবুও সে নিজের দিকে একটুও খেয়ালি নয় ।
ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়েই সাবিনা বেগমের কন্ঠ কানে ঠেকতেই আঁতকে উঠলো রাফি । মিহির জ্ঞান ফিরেছে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে সমস্ত ক্লান্তি ঠেলে ছুটে আসলো । মিহির পাশে আগের জায়গায় বসে উত্তেজিত হয়ে পড়লো…

” মিহি ,, জ্ঞান ফিরেছে তোমার ? ঠিক আছো তুমি ? ডক্টর,, ডক্টর কোথায় ? মিহি , কষ্ট হচ্ছে কোথাও ? বলো আমায় , ব্যাথা হচ্ছে তোমার ?
মিহি ধীরে ধীরে চোখ ফেরালো রাফির দিকে । রাফির বিচলিত অবসন্ন চেহারা খানা দেখে ঠোঁট ভেঙে কান্না আসলো । বুলি ফুটালো কোনো রকমে….
” চলে যান এখান থেকে । আমি চিনি না আপনাকে । আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না আপনাকে ! প্লিজ, চলে যান ।
” মিহি ,, ও রাফি !! কিসব বলছিস ওকে ?
” আমি ঠিক বলছি আম্মু । আমি আর ভুল করবো না । তোমাকে হারাতে পারবো না আমি । ওনাকে আমি বললে উনি শুনবেন না । তুমি চলে যেতে বলো ওনাকে । আমি তাকাবো না ওনার দিকে । ওনাকে বলো আমি ওনাকে চিনি না । ওনাকে চলে যেতে বলো এখান থেকে….
মিহির কান্না জড়িত কণ্ঠ । রাফির দিক থেকে চোখ ফিরিয়েছে ও । রাফি আহত চোখে তাকিয়ে থাকলো , শুনলো কথা গুলো । মস্তিষ্ক আর চলছে না । আর মেনে নিতে পারছে না এসব । নিভে যাচ্ছে সকল সচলতা ।
ও মিহির উপেক্ষায় শ্বাস ফেললো । নিজের মাথার ভার বহন করাও ভীষণ কষ্ট দায়ক লাগছে । ও ক্লান্তিতে মাথা টা মিহির উদরের পাশে সামনের দিকে এগিয়ে দিলো ‌। চোখ বুজলো একই ক্লান্তিতে । সাবিনা বেগম ওকে আর নিজের মেয়ে কে এক পলক করে দেখে কন্ঠ কঠিন করলেন মিহির উপর….
” মিহি , আমি বলছি না চুপ করতে । ও রাফি , কোত্থাও যাবে না ও । ও তোর কাছেই থাকবে , সারাজীবন তোকে ওর কাছেই থাকতে হবে । আমি কে , আমাকে হারানোর ভয়ে কেনো ওকে ছাড়বি তুই ? ভালোবাসিস তো ওকে , না ? আমার জন্য নিজের ভালোবাসা কে ছাড়বি ? ও তো এতো কিছুর পরেও তোকে ছাড়েনি , আর তুই ছাড়বি ?
মিহি ফুঁপিয়ে উঠে থামলো । অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে রইল আম্মুর দিকে । এলিয়ে দেওয়া ভার মাথা খানা তুললো রাফি । দুজনের পিটপিট ভেজা চাহনি দেখে সাবিনা বেগম আবার বললেন….
এবার কন্ঠে নমনীয়তা…

” অনেক হয়েছে লুকোচুরি । আমার জন্য এতদিন অনেক কিছু হয়েছে । এখন তো সব পরিষ্কার । আমি চোখ থাকতেও অন্ধ ছিলাম ‌। সব সত্যিই যখন বেরিয়ে এসেছে ,এটা বাকি থাকে কেনো । মিহির গর্ভধারিনী নই আমি , তাতে কি হয়েছে , মা আমি ওর ।
” আবার তুমি এক কথা বলছো , তুমিই আমার আম্মু ! আমি কিন্তু আর শুনবো না এসব ।
” হুম ,, উনিই তোমার আম্মু । তোমাকে আর এসব শুনতে হবে না । উনি বলবেন না আর এসব । তুমি শান্ত হও প্লিজ….
একবার তাকাও আমার দিকে । প্লিজ মিহি… আমার দিকে তাকাও….
রাফির আবেদনাত্মক কন্ঠ । মিহি নাক টানলো । রাফির দিকে ফেরার আগেই ডাক্তার হাজির । কেবিনে ঢুকেই ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন তিনি । পিছু পিছু উদ্বিগ্ন শান্ত । মিহির সম্পুর্ন জ্ঞান ফিরেছে দেখে তৃপ্ত হাসলো সে । সাবিনা বেগম সরতেই ডাক্তার পালস রেট চেক করলেন মিহির । নরমাল সব কিছু পরীক্ষা করে আলতো হেসে রাফির দিকে ফিরলেন ।

” ডোন্ট ওয়ারি,মি. রাফি । আপনার বোন এখন একদম ঠিক আছেন ।
রাফি তৎক্ষণাৎ সরু চোখে তাকালো । একেই অসময়ে এন্ট্রি নিয়েছেন ইনি । তার উপর কিসব উল্টো পাল্টা বলছেন । মিহি কে বোন বানিয়ে দিচ্ছেন রাফির । শান্ত ভরাট কন্ঠে বাঁধ সাধলো ডাক্তারের…
” আরে ডাক্তার,,, বোন নয় । আপনারা এমন ক্যান হ্যাঁ ,, যাকে তাকে বোন বানিয়ে দেন । সৌভাগ্য বসত বউ ও তো হতে পারে না কি ? চাচার মেয়ে,‌মামার মেয়ে,হলেই কি শুধু বোন হয় ?
ডাক্তার ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন । গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের কথা শুধরে নিলেন তড়িঘড়ি করে..
” ওও সরি ,, কাজিন সিস্টার । উনি ঠিক আছেন । আমাদের সিস্টার থাকবে ওনার টেক কেয়ার এর জন্য । ওনাকে একটু রেস্ট করতে দিন আপাতত….
বলেই ঝটপট জায়গা ত্যাগ করলেন তিনি । মিহি এখনো এসবের মানে বুঝতে অক্ষম । কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না ওর । আর না ঢোকানোর চেষ্টা করছে ।
শান্ত ওকে দেখে মুচকি হাসলো । একটু ঝুঁকে বললো…

” কি,,পরী ? কেমন লাগছে এখন ?
মিহি অবাক লোচনে চেয়ে । শান্ত ফিক করে হাসলো । বললো…
” আমাকে ভুলে গেছিস না ?
মিহির অবুঝ মন ভাব দেখে শান্ত কে কথা বাড়াতে দিলো না রাফি । ও বাঁধ সাধলো…
” শান্ত ,, চুপ । এসব পরে হবে । মিহি কে রেস্ট করতে দে ।
মিহি এখনো তাকায় নি ওর দিকে । রাফি শুল্ক ঢোক গিললো । শান্ত পরিস্থিতি বুঝে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল । পিছু পিছু সাবিনা বেগম ও । আম্মু কে ওভাবে যেতে দেখে মিহি খানিক ভ্রু গুটালো । কেবিনের দরজা চাপিয়ে দু’জনেই বাইরে বেরিয়ে গেছে ।
রাফি মিহির উপেক্ষিত চেহারার পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল । অতঃপর চুপচাপ নিজেও বাইরে বেরোনোর জন্য উঠে দাঁড়ালো ‌। মিহির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে এক কদম পা বাড়াতেই খপ করে ওর হাত খানা চেপে ধরলো মিহি । বাহুতে গুলি বিদ্ধ হাতে টান পড়তেই পুরো শরীর ঝিঁঝিঁ ধরার ন্যায় ঝনঝন করে উঠলো রাফির । তৎক্ষণাৎ তীক্ষ্ণ ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকালো সে । মিহি হয়তো টের পায়নি ওর ব্যাথা । ও ঠোঁট উল্টে অভিমানী কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো….

” সরি..!
রাফি ধীরে ধীরে ব্যাথা তুর মুখো ভঙ্গিমা পরিবর্তন করে মিহির দিকে ফিরলো । মিহি বললো একই স্বরে…
” আপনি আম্মু কে মানিয়ে নিয়েছেন ?
বসলো রাফি । মিহির হাত খানা ছাড়িয়ে নিজে ধরলো ওকে । শীতল কন্ঠে বলল…
” হুম !!
” সত্যিই ? আম্মু মেনে নিয়েছে সব ? রাজি আম্মু ?
উৎসুক কন্ঠস্বর মিহির । রাফির আবার ছোট্ট উত্তর…
” হুম ।
মিহি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল…
” তখন আম্মু ওসব কেনো বললো ? আমি তো মিহি না ? আমি আমার আম্মু আব্বুর মেয়ে ? আমাকে ওসব উল্টো পাল্টা কেনো বললো । আম্মু রেগে ছিলো ভীষণ ? তাই ওসব বলেছে ? আমি কেউ নোই , আমি মিহি ? মিফতাহুল নোই আমি ! তাই তো ? বলুন না আপনি..
মিহি হয়তো সবটা বুঝেও বুঝতে চাইছে না । রাফি শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে শান্ত স্বরে বলল….

” তুমি আমার পরী । আমার জান , আমার ব্লোসোম , আমার মিহি ,, আমার সবকিছু তুমি । এটাই তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয় ।
” আপনিও রেগে আছেন আমার উপর ?
” না তো !
” তাহলে এভাবে কথা বলছেন কেনো ?
” কিভাবে বলছি ?
” এতো ছোট ছোট উত্তর দিচ্ছেন কেনো ? ভালো করে কথা বলুন আমার সাথে । আমি আর আপনাকে না চেনার ভান করবো না । এখন তো সব ঠিকঠাক । আপনি বেশি বেশি করে কথা বলুন আমার সাথে ।
” বেশি বেশি কি বলবো ?
” অনেক কিছু বলুন । যা খুশি তাই বলুন !
” যা খুশি তাই করি ?
” করুন ।
তৎক্ষণাৎ ঝট করে জবাব মিহির । ওর অভিমানী আদল লালচে । উল্টানো ওষ্ঠ জোড়া । রাফি আনমনে হাসলো । একই হিমশীতল কন্ঠে বললো…

” সত্যিই ?
” হুম !
” চোখ বন্ধ করো তাহলে !
” কেনো ?
” আগে করো !
মিহি চোখ বুজলো নরম আবেশে । রাফি এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । অনেক টা ঝুঁকে সব দ্বিধা কাটিয়ে মুহুর্তেই অধর ছোঁয়ালো মিহির ওষ্ঠাধরে ।
বিদ্যুতের ন্যায় ঝটকা খেলো মিহি । কেঁপে উঠে তৎক্ষণাৎ চোখ মেললো ঝট করে । খুব কাছ থেকে রাফির বন্ধ অক্ষি যুগল‌‌‌ নজরে আসলো ।রাফি মিহির কানের পাশ গলিয়ে গলার নিচে হাত রাখলো । পুরো শরীর শিরশির করে উঠলো মিহির । এক মুহুর্ত পাথরের ন্যায় জমে গেলেও পর মুহুর্তে ব্যাথা তুর হাতে আলতো ধাক্কা দিয়ে রাফি কে নিজের থেকে সরাতে চাইলো সে । তবে কাজ হলো না । রাফি আরো বেশি দখলদারী ফলালো মিহির ওষ্ঠাধরে । মিহির এক হাত চেপে ধরলো নিজের বুকের সাথে । নিজের মাঝে আঁকড়ে ধরলো ওকে । প্রথম কোনো পুরুষের এতো গভীর স্পর্শের গভীরতায় খেই হারালো মিহির । ছোটাছুটি ছেড়ে স্থির হয়ে চোখ বুজে আসলো আপনা আপনি । মিহি কে নিস্তেজ হতে দেখে বন্ধ অক্ষি যুগল‌‌‌ খুললো রাফি । নিজে থেকে ছাড়লো মিহি কে । একটু ছেড়ে আরো একবার আলতো চুমু খেয়ে সরে আসলো । হাঁফ পেতেই বৃহৎ আকারে অক্ষি যুগল‌‌‌ মেললো মিহি । কন্ঠ নালি শুকিয়ে কাঠ । দৃষ্টিতে অবিশ্বাস । জোরে জোরে শ্বাস টানলো ও । রাফির চোখে চোখ পড়তেই ছলকে উঠলো সে । রাফি ঠোঁট পিষে হেসে বিড়বিড় করলো…

” সরি ,, যা খুশি তা করার পারমিশন তুমিই দিয়েছিলে !
মিহি আহম্মকের ন্যায় । ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে আছে । ওর সাথে কি ঘটলো বুঝলো, তবে যে ঘটালো তার দিক দিয়ে ঘটনা মিলছে না । মিহি কে ওভাবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফিচেল হেসে শুধালো রাফি..
” কি দেখছো ?
সম্বিতে ফিরলো মিহি । তৎক্ষণাৎ দুহাতে ঢেকে ফেললো নিজের লালিত মুখশ্রী । বুলি ফুটালো কোনো রকমে…
” ছিঃ ,, অভদ্র লোক ,, আপনি এতো খারাপ..
” খারাপ আর হলাম কোই ! খারাপ যখন বললেই , তখন আর একটু খারাপ হই ? শুনেছি ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয় । আজ চেখে দেখলাম , মিষ্টিই আছে । আর একটু দেখি….?
মিহি দুহাতে মুখ ঢাকলো আরো শক্ত করে । এই মুহূর্তে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে একদম । এই লোকের মনে মনে এই ছিলো ? ইনি না ওর বান্ধবীর বড় ভাই !
ঠোঁট উল্টালো মিহি । কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে । মিহি ঝাই ঝাই করে উঠলো….

” চলে যান এখান থেকে….
বেশি বেশি কথাও বলতে হবে না , আর বেশি বেশি কিছুও করতে হবে না আপনাকে ।
রাফি আলতো হাতে মিহির হাত দুখানা ধরলো । কেঁপে উঠলো মেয়েটা । গায়ে কাঁটা দিচ্ছে একেই । তার উপর রাফির স্পর্শে শরীর জমাট বেঁধে আসছে । কন্ঠ নালিতে কথা এসে আটকে গেলো । আর কিছু উচ্চারণ করতে পারলো না মেয়েটা । চোখ খিচে বন্ধ করে রইলো । শক্তি কাজ করলো না নিজের । রাফি অতি সহজে মিহির হাত দুখানা সরালো ওর লাজুক মুখখানা থেকে । দৃশ্যমান হলো আবেদন ময়ী লালচে মুখায়ব । বন্ধ চোখের বৃহৎ পাপড়ি , গোলাপি অধর তিরতিরে কম্পমান । বক্ষ স্থল ওঠানামা করছে দ্বিগুণ গতিতে । রাফি চেয়ে মুচকি হাসলো । আরো একটু ঝুঁকে তেই ওর গরম নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারলো মিহি । প্রকম্পিত রুদ্ধ গলায় বুলি ফুটালো কোনো রকমে….

” আর কাছে আসবেন না প্লিজ ,, কেউ দেখে ফেলবে ।
রাফি শুনলে তো । ও সুযোগের সৎ ব্যাবহার করলো । মিহির অসম্মতি বুঝে এবার আর বেশি কিছু করলো না । ওষ্ঠ বাড়িয়ে মিহির বন্ধ দুচোখের পাপড়িতে আর নাকের ডগায় পরশ আকলো । কপালে কপাল ঠেকিয়ে নাকে নাক ঘষে হিমশীতল আবেশিত কন্ঠে বলল দু বাক্য…
” কেউ দেখে নি ।
” একদম ঠিক ভাই , কেউ কিচ্ছু দেখে নি । আমিও দেখিনি কিছু । এসব জিনিস দেখতে নেই , আমি কানা । ইউ কন্টিনিউ…
হকচকিয়ে দরজার দিকে ছ্যাঁত করে তাকালো মিহি । শান্ত ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে ওদের দিকে । রাফি একটুও নড়লো না । সে ওভাবেই দায় সারা ভাবে শান্তর দিকে তাকালো । থতমত খেলো মিহি । নড়ে চড়ে রাফি কে ঠেলতে গেলে আহ্ সূচক শব্দে কোমরের ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো মৃদু আর্তনাদে । চোখ মুখ খিচে ব্যাথায় ঠোঁট উল্টালো । ঝট করে সরে এসে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো রাফি…

” মিহি , আই এম সরি জান..
ব্যাথা পেলে ? কোথায় ব্যাথা পেয়েছো বলো ? দেখি ?
রাফি মিহির ক্ষত স্থান দেখার উদ্দেশ্যে কোমরে হাত রাখতেই আঁতকে উঠলো মিহি । বৃহৎ নয়নে তাকিয়ে ঝাই ঝাই করে উঠলো…
” আরে কি করছেন ,, সরুন….
যান এখান থেকে….
সাদা চাদর টা মাথা অবধি টেনে নিজেকে আড়াল করলো মিহি । বুক ধক্ ধক্ করছে । একেই রাফির স্পর্শ , তার উপর ওর মোহিত চাহনি । আর সবচেয়ে বড় শান্ত ! সে কিভাবে তাকিয়ে আছে ? কি দেখলো কে জানে ।
মিহি মুখ লুকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো অনেক ! রাফির এমন আচমকা কর্মকান্ডের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে । আর না কখনো কল্পনা করেছিল । এই লোকের মনে মনে এই ছিলো তবে ? লজ্জায় লাল হয়ে গলে যাচ্ছে মিহি । আড়ালে চোখ বুজে ছটফট করে উঠলো সে । দুআঙুল চেপে ধরলো নিজের অধরে । ঢোক গিললো শুকনো ।
এদিকে রাফি ওর অমন কান্ড দেখে হেসে ফেললো ফিক করে । শান্ত দরজায় হেলান দিয়ে বুকে হাত গুটিয়ে আড়াআড়ি পা রেখে দাঁড়িয়ে দেখছে ওদের । রাফি ওর দিকে তাকিয়ে ভ্রু গুটালো । এই ছেলেটা আর আসার সময় পেলো না ? এক্ষুনি আসতে হলো । চোখ সরু করে তাকালো রাফি । শান্ত ঠোঁট কামড়ে হেসে ঘাড় কাত করলো পিছনের দিকে । ওর পিছন থেকে রুহি উঁকি দিয়ে একেবারে সোজাসুজি দৃষ্টি রাখলো রাফির চোখে । রুহি কে অকস্মাৎ দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেলো রাফি । কেশে উঠলো খুক খুক করে । রুহিও আছে ? এই বদমাইশ টা রুহি কে আনলো কখন কে জানে ? ওর সাদা সিধে বোনটা কি থেকে কি দেখলো কে জানে ? রুহি অবুঝের ভান করে সাদাসিধে ভঙ্গিমায় গদগদ হয়ে বলল ….

” ভাইয়া ,, আমিও দেখিনি কিছু ?
শান্তর দিকে কটমট করে তাকালো রাফি । শান্ত মুখখানা চুপসে সোজা হয়ে দাঁড়ালো । যেন সে কতো অবুঝ । রুহির কন্ঠে চাদরের নিচ থেকে মাথা বের করে পিটপিট করে উঁকি দিলো মিহি । রুহি কে পুরোপুরি দেখে সব ভুললো মুহুর্তেই । ঝট করে চাদর সরিয়ে গদগদ হয়ে ডাকলো…
” পাখি…!
ভাইয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে মিহির দিকে তাকালো রুহি । দুই বান্ধবী মুচকি হাসলো একে অপরের চোখে চোখ রেখে । দ্রুত এগিয়ে গেলো রুহি । মিহি শক্তি খাটিয়ে শোয়া থেকে খানিক ওঠার চেষ্টা করলো । তবে যন্ত্রনায় পারলো না । রুহি ছুটে এসে ওভাবেই জড়িয়ে ধরলো মিহি কে । ছটফট করে বললো….
” পাখি ,, কেমন আছিস এখন ?
” আমি ভালো আছি পাখি !
” ওও সরি ,, ভুল হয়ে গেছে । তুই না আমার বোনু । তার থেকেও বড় কথা তুই আমার ভাবি জান ।
মিহি কপাল কুঁচকালো আবার । রাফি গলা খাঁকারি দিয়ে কথা ঘোরানোর তাগিদে ডাকলো রুহি কে…
” Sissy !
চকিতে ফিরলো রুহি । চোখের ইশারায় ওকে কিছু বোঝালো রাফি । মিহি এই মুহূর্তে নরমাল নয় । কোনো প্রকার প্রেসার ক্রিয়েট করা ঠিক হবে না ওর উপর । এই মুহূর্তে ওকে সব জানালে ‌ ও হাইপার হতে পারে । ওর পক্ষে এতো সহজে সব কিছু মেনে নেওয়া সহজ হবে না । রাফির ইশারা বুঝে নিজেকে সংযত করলো রুহি । আমতা আমতা করে বলল….

” পাখি ! জানিস ,কতো ওয়েট করেছি তোর জন্য ? তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা প্লিজ ! আমরা সবাই বাড়িতে অপেক্ষা করছি তোর জন্য…
মিহি মুচকি হাসলো । রাফি শুধালো এবার…
” এতো রাতে তুই কার সাথে আসলি sissy ?
” ড্রাইভারের সাথে । শুধু আমি না , আব্বু,আম্মু, চাচ্চু, ছোট মা, জেনি, সবাই এসেছে । মেহজাবিন আপিও এসেছে । সবাই বাইরে , আন্টির সাথে কথা বলছে ।
ওর কথা শেষ হতে না হতেই কেবিনের ভেতর সবার আগমন । সাবিনা বেগম সবার সাথে । মেহজাবিন কম্পিত পায়ে সবার সামনে । চোখ ছলছল ওর । সজল ঝাঁপসা চাহনি মিহি নামক মিফতাহুলের পানে , ওর ছোট্ট বোনটার পানে । মিহি সবাই কে একসাথে দেখে এক গাল হাসলো । ওকে দেখতে এসেছে সবাই ? এইতো সবাই একসাথে ? পুরো পরিবার , কতজন !

ওর আম্মু ও তো আছে সবার সাথে । মেহজাবিন এক পা দু’পা করে এগিয়ে শেষের পথ টুকু ছুটে আসলো মিহি পর্যন্ত । রুহি সরে দাঁড়িয়েছে । রাফি ওকে বাঁধা দেওয়ার আগেই রুহির মতো করেই ও হুড়মুড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো মিহি কে । ফিকড়ে কেঁদে উঠলো মেয়েটা । মিহি না বুঝে থতমত খেলো । ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল । মেহজাবিন কান্না রত কন্ঠে ওকে শক্ত করে জড়ালো । খানিক ব্যাথা পেলো মিহি । ফিকড়ে উঠলো মেহজাবিন….
” তুই আমার বোন মিহি ? আমার মিফতাহুল তুই ? আমার নিজের বোন তুই ? বল না ? বল না তুই আমার বোন ! বেঁচে আছিস তুই ! একদম সুস্থ আছিস । কিচ্ছু হয়নি তোর । আমার মিফতাহুলের কিচ্ছু হয়নি । লাশ হয় নি ও । ও জীবিত । তুই আমার মিফতাহুল । আমার বোন তুই ….
মিহি নড়ে চড়ে উঠলো । যতই এই কথাটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে , মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে , ততই সবাই বারবার এই কথাটা বলছে ওকে । কেনো ? ও মিহি ! ওর আব্বু আম্মুর মেয়ে । আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগমের একমাত্র মেয়ে ।
তখন থেকে তো ও শুনে আসছে সবার কথা । মাথায় গেড়ে আছে সবার বলা কথা গুলো । কিন্তু ও বিশ্বাস করবে না । ও কিছুতেই বিশ্বাস করবে না । মিহি থমকে রইলো । চোখ ভিজে আসছে । মেহজাবিন ছাড়লো ওকে । ওর আদলখানা নিজের দুহাতের আজলে নিয়ে হেঁচকি তুলে ধরা গলায় বলল আবার….

” তুই আমার বোন রে ?
মিহি ঢোক গিলে দুদিকে মাথা নাড়ালো । চোখের পানি পড়লো টপ করে । ও তাকালো সাবিনা বেগমের দিকে । জোর পূর্বক অবিশ্বাস জোগালো নিজেকে , আবারো আগের মতো করে বললো….
” আম্মু , আমার কাছে এসো তো । আমি কারোর কথা শুনবো না । এসব বলবে না কেউ আমায় । আমি কেউ নোই । আমি মিহি । বুঝলে তোমরা ? আমার আব্বু আম্মু আছে । না না , আব্বু তো নেই । আমার আম্মু আছে । ঐ যে আমার আম্মু দাঁড়িয়ে আছে । আমি ওনার মেয়ে । এটাই আমি । তোমরা তখন থেকে কিসব বলছো আমায় । কে মিফতাহুল ? আমি মিফতাহুল নোই । আমি মিহি । বুঝলে…
চিৎকার করে উঠলো মিহি । এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সে । শ্বাস প্রশ্বাস আবার বেগতিক হয়ে আসছে । ছটফট করে উঠছে । রাফি পরিস্থিতি বুঝলো । মিহির এক হাত ধরে বললো….
” মেহজাবিন ,, এখন এসবের সময় নয় বোন । প্লিজ চুপ কর । ও যেভাবে আছে , সেভাবেই থাকতে দে ওকে । এসবের জন্য অনেক সময় বাকি আছে ।

” এখনই এসবের সময় রাফি । অনেক সময় পেরিয়েছে , মিহি যখন সবকিছু জেনেছে তখন সবকিছু খোলসা করে জানতে দাও ওকে ।
সাবিনা বেগমের গুরুভার কন্ঠ । শান্ত হলো মিহি । সজল চোখে চাইলো নিজের আম্মুর দিকে । রাফির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মিহির দিকে তাকালেন সাবিনা বেগম । এগিয়ে গেলেন তিনি । মেয়ের শিয়রে বসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন । চোখের পানি লুকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললেন…
” আমি কি হোই তোর ?
” আম্মু !
ঠোঁট কামড়ে ধরা জবাব মিহির । ও রাফির থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে শক্ত করে ধরলো সাবিনা বেগম কে । বললেন সাবিনা বেগম…
” আমি তো তোর মা’ই । জন্ম দিলেই কি শুধু মা হওয়া যায় বল ? মা হতে জন্ম দিতে হয় জানি ‌। আমি না কাউকে জন্ম দিতে পারি নি । কিন্তু দেখ , তবুও মা হয়েছি তোর । ষোলো টা বছর তোর মুখে আম্মু ডাক শুনেছি ।
আজ তোকে একটা কঠিন সত্য বলি ? আমি না তোর আম্মু নোই । আর না তুই আমার মিহি , একদিন মিফতাহুলের গল্প করেছিলি না ? সেই মিফতাহুল তুই ! সেই মিফতাহুল বেঁচে আছে । আজ সে মিহি । আমরা সেই দিন তোকে পেয়েছিলাম সেই এক্সিডেন্ট স্পটে , রাস্তার নিচে । কাঁদছিলি তুই ! তোর কান্না শুনে তোর আব্বু তোকে কোলে নিয়েছিল । আর তারপর , তারপর আমি ! আর তোকে নিয়ে সেদিন আমরা পালিয়ে গেছি….

” মিহি , আন্টির কথা বাদ দাও । আমার কথা শোনো । আন্টি আর আঙ্কেল সেদিন পেয়েছিল তোমায় । তুমি তো ছোট ছিলে , তোমার পরিচয় পান নি তারা । তাই তোমাকে নিজের পরিচয়ে বড় করেছেন তারা । বুঝলে ? তুমি তাদের সন্তান…
সাবিনা বেগম কে থামিয়ে রাফি কথার মোড় খানিক বদলালো । যাতে মিহির মনে তার আব্বু আম্মু কে নিয়ে অপরাধী মনভাব না জাগে ।
সাবিনা বেগম হাসলেন নির্বিকার । বাকিরা নিশ্চুপ । তিনি বললেন আবার…
” আর কিছু বলতে হবে না তোমায় রাফি ‌। কিছু লুকিয়ে লাভ কি । মিহি তখন ছোট ছিল এখন নয় । আমি জানি ও সব বুঝেছে । ওর মনকে মানাতে দাও ।
আমি খুব লোভি , জানিস মিহি ? তোর আব্বুর ভালোবাসার মোহে লোভ করলাম । যে লোভের পরিনাম তোর অজানা নয় । আবার মা ডাক শোনার জন্য আবার লোভ করলাম । খুব ইচ্ছে ছিলো মা ডাক শোনার জানিস । আমি ভুল করেছি তাই । মা হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম তোর । অন্যের সম্পদ কে নিজের করে আকড়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম । আমাকে ক্ষমা করে দিস মা..! এই দেখ তোর বোন ! নিজের বোন তোর । এরা তোর নিজের পরিবার । তোর নিজের আম্মু ও আছে ।
মিহি সমস্ত ব্যথা ভুলে জোর খাটিয়ে উঠে বসলো । সেপ্টে শক্ত জড়িয়ে ধরলো আম্মুর কোল । কেঁদে কেঁদে চিৎকার করলো….

” আম্মু…
চুপ করবে তুমি ? আমার কাউকে লাগবে না । তুমিই আমার সব । আমার আম্মু তুমি । ওরা আমাকে তোমার থেকে সরিয়ে দেবে ? আমি যাবো না ওদের সাথে । আমার আম্মুর কেউ নেই আমি ছাড়া । চলে যান আপনারা , আমি আমার আম্মু কে ছেড়ে যাবো না আপনাদের সাথে । আপনারা চলে যান প্লিজ । আমার আম্মুর কেউ নেই । উনি মরে যাবেন নয়তো । আমিও মরে যাবো । আমি মিফতাহুল হোই আর যেই হোই , আমি তো মৃত ছিলাম আপনাদের কাছে । এখন ও আমি মৃত । মিহি আমি । আমার আব্বু আম্মুর মিহি । আমার আব্বু খুব কষ্ট পাবে উপর থেকে এসব দেখলে ।
আব্বু কে কথা দিয়েছিলাম আমি , আম্মু কে কখনো কষ্ট পেতে দেবো না । আমার আম্মু কষ্ট পাবে আমার জন্য ? নাআআআ ! আমার আম্মু খুব ভালোবাসে আমায় ,, আমি কোত্থাও যাবো না আমার আম্মু কে ছেড়ে ….
রাফি বিচলিত মিহির অবস্থা দেখে । শিহরিত সে ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী মুচকি হাসলেন । এগোলেন তিনি । বসলেন মিহির সামনে । সাবিনা বেগমের কোলে মিহির মাথা । তিনি অতি যত্নে হাত রাখলেন মেয়ের মাথায় । মোলায়েম কন্ঠে বললেন….
” পাগলী মেয়ে …
তোর আম্মু কে ছেড়ে কোথায় যাবি তুই ? আর আমাদের ছেড়েই বা কোথায় যাবি ? তুই তো আমাদের ও মেয়ে বল ? মিফতাহুল না মিহি , নাম বড় কথা নয় । তুই আমাদের মেয়ে সেটাই বড় কথা । তুই আমার বোনের ও মেয়ে । তোরা কেউই কোত্থাও যাবি না আমাদের ছেড়ে । তোর সবাই আছে । সবাই কে ছেড়ে কোথায় যাবি তুই । তোর আম্মু ও কোথাও যাবে না । তুই সবাইকে পাবি । আমাদের সবার সাথে থাকবি তুই ,একই সাথে থাকবো আমরা ।
মিহি মাথা তুললো । রাশেদ রায়হান চৌধুরী শীতল কন্ঠে আবার বললেন…

” আমাকে একবার আব্বু বলে ডাকবি মা ? মেহজাবিন ও আব্বু ডাকে আমায় । জেনিও ডাকে । তুই ও ডাকবি একবার ?
মিহি নাক টানলো ।
বললো না কিছু । হাসার চেষ্টা করলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । জেনি বাচ্চা সুলভ আচরণে লেলিয়ে পড়লো ।
” মিহি আপি ,, তুমি আমার সত্যি সত্যিই আপি হও ? রুহি আর মেহজাবিন আপির মতো ?
উত্তর করলেন হেনা বেগম ।
” ও তোর আপি । ছোট আপি । সত্যি সত্যিই আপি তোর ।
খুশিতে চিকচিক করে উঠলো জেনির বাচ্চা সত্ত্বা । মিহি চুপচাপ ।
তখন কার পর থেকে আর এক মুহূর্তের জন্যও রাফির দিকে তাকায় নি ও । রাফির সবার সাথে মিহি কে দেখে আনমনে মুচকি হাসলো । এই দিন টা এভাবে কখনো আসবে কে ভেবেছিল । কে ভেবেছিল তার ছোট্ট পরী টা ফিরে আসবে একদিন না একদিন । তাও পরিচয়ের শেষে পরিচয় মিলবে তার ।

এক দেখায় পর্ব ৪৭

মিহি কে ছয়দিন হসপিটালে রাখা হবে । রাতে সাবিনা বেগম আর হেনা বেগম হসপিটালে ছিলেন । রাফি কে জোর করে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী নিজে ছেলে কে সাথে নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন ।
রাফির ছটফট সত্ত্বা । যা দীর্ঘ সময় বাড়িতে টেকে নি । সকালের আলো ফুটেছে কি ফোটেনি । সে ছুটে এসেছে হসপিটালে । মিহি ঘুমিয়ে । ওঠে নি এখনো । সাবিনা বেগম আর হেনা বেগম ফ্রেশ হয়ে বসে ছিলেন ওর পাশে । রাফি আসতেই ওনাদের পাঠিয়েছেন ব্রেকফাস্ট করতে । ডাক্তার সকালে একবার ঘুমন্ত মিহি কে দেখে গেছেন । কোনো প্রকার হাঁটা হাঁটি,চলা ফেরা বারন ওর । রাফি নিঃশব্দে ওর সম্মুখে বসলো ।
মিহির জাগার সময় হয়ে গেছে । শরীর খানা ভীষণ দুর্বল , খানিক উষ্ণ ও । রাফি একবার কপালে হাত ছোঁয়ালো । এতেই ঘুমের ঘোরে চমকে উঠলো মিহি ।

এক দেখায় পর্ব ৪৯