Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৬১

এক দেখায় পর্ব ৬১

এক দেখায় পর্ব ৬১
সুরভী আক্তার

স্টেজের সামনে ভিড় জমেছে সকলের । রুহি ফুঁপিয়ে কাঁদছে । সবারই ভেজা চোখ । হেনা বেগম মেয়েকে জড়িয়ে নিতেই কান্নার বেগ বাড়লো দু’জনেরই । সকলের চোখ ছাপিয়ে আসলো মা মেয়ের কান্না দেখে । আফসানা বেগম এগিয়ে গিয়ে রুহি কে আলগা করলেন হেনা বেগমের থেকে । আশ্বাসি স্বরে বললেন….
“ আরে পাগলি মেয়ে , কাঁদছিস কেনো ? আর ভাবি তুমিও কাঁদছো ? কোথায় তুমি মেয়েকে একটু শান্তনা দেবে তা না , ওর সাথে তাল মেলাচ্ছো তুমিও ? অবুঝ হলে তুমি ? মেয়েকে কি পরের ঘরে পাঠাচ্ছো ? পাঠাচ্ছো তো আমার ঘরে । আমার মেয়েকে আমি নিয়ে যাচ্ছি । ও তোমার মেয়ে হওয়ার সাথে সাথে আমার ও মেয়ে । আমার মেয়ে কি আমার ঘরে অযত্নে থাকবে ? নাকি অবহেলায় ?

শাড়ির আঁচলে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে পাশে সরে দাঁড়ালেন হেনা বেগম । মায়ের মন তো , মানে কি করে ? রুহির হাঁটু টলছে । কেঁপে কেঁপে উঠছে কান্নার দরুন । মিহি সজল চোখ আড়াল করে ওর পাশে দাঁড়ালো । পাশ‌ থেকে আলতো করে কাঁধ জড়িয়ে ধরলো রুহির । অমনি আবারো ফিকড়ে উঠলো মেয়েটা ।
কান্না চাপতে ওষ্ঠপূটে দাঁত চাপলো । দূরে রাশেদ রায়হান চৌধুরী কে বিষন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জাকির হোসেন বলে উঠলেন এবার….
“ ভাইয়া , কি হয়েছে বলুন তো আপনাদের ? আমাদের উপর কি ভরসা নেই ? মেয়ের বিদায়ের সময় এমন হুতাশ হয়ে আছেন কেনো সবাই ?
শান্তর কোনো ধ্যান জ্ঞান নেই । সে অস্থির । অস্থিরতা বাড়ছে বই কমছে না ওর । এখানে বেকার বেকার টাইম ওয়েস্ট হচ্ছে শুধু । বিয়ে তো হয়ে গেছে ,‌রুহি কে নিয়ে যেতেই হবে । তাহলে এভাবে কেঁদে কেঁটে বিদায় দেওয়ার মানে কি ? রুহি টাও কাঁদছে কেমন ! নাকের ডগা লালচে করে ফেলেছে । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে সে । রুহি কে দেখে বেশ দুঃখ লাগলো শান্তর । বেচারি দুঃখে কষ্টে কাঁদছে । শান্ত আন্দাজ করলো , নিজের অতোটাও দুঃখ হচ্ছে না বোধহয়,কারন ও তো ওর প্রিয় মানুষটাকেই পাচ্ছে জীবনে ! শান্ত স্থির চোখে কান্না রত রুহির পানে তাকিয়ে । মনে মনে আওড়ালো সে….

“ ছিঁচকাদুনে মেয়ে একটা ।
অতঃপর ওষ্ঠাপূটে মৃদু হাসি ফুটলো আপনা আপনি । জাকির হোসেনের সাথে রাশেদ রায়হান চৌধুরী টুকটাক কথা বলছেন । শান্ত আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না । অধৈর্য হয়ে পড়ছে সে ।
রুহি কে একে একে সবাই স্নেহ দিয়ে জড়িয়ে ধরলো । রাফি এতক্ষণ ছিলো না এখানে । ঘরে গিয়ে চেঞ্জ করে আসলো সে । সবাইকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উৎসুক স্বরে বলল…
“ এখনো দাঁড়িয়ে আছো এখানে ? গাড়িতে ওঠো নি…
সবাই চকিতে তাকায় ওর‌ দিকে । রাফি সোজা এসে বোনের সামনে দাঁড়ায় । রুহি এক পলক চোখ তুলে তাকিয়ে ফের মাথা নামিয়েছে । রাফি একটু হেলে নিচু হয়ে নত জানু রুহির‌ মুখ দেখার চেষ্টা করলো । বললো ঠাট্টা করে…
“ Sissy…

চল‌ তোকে তাড়িয়ে দিয়ে আসি ।
অমনি কেঁদে উঠলো রুহি । হুমড়ি খেয়ে ভাইয়া কে জড়িয়ে ধরলো । এবার আর ফোপানো কান্না নয় । কান্নার গতিবেগের সাথে সাথে শব্দ ও বেড়েছে । রুহি শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ভাইয়া কে ।
ক্রন্দনরত কন্ঠে আওড়ালো অস্পষ্ট স্বরে…
“ আবার এভাবে বলছো তুমি ? আমাকে এরপর তাহলে সত্যি সত্যিই ভুলে যাবে ? আর আমি তোমার আদরের Sissy থাকবো না । আমাকে আর সহ্য করতে হবে না । আমি চলে যাচ্ছি এ বাড়ি ছেড়ে । তুমি আমাকে সবসময় আর ডাকতে পারবে না ।
“ আরে আরে আরে , তুই দেখি আমার কথা শুনিস না । আবার কাঁদছিস ? আর কতবার এক কথা বলতে হবে তোকে ? চুপ কর বনু , আমি আর ইভান তো এখন যাচ্ছি তোর সাথে ও বাড়িতে । তোকে রেখে তবেই আসবো । জেনিও যাচ্ছে তোর সাথে । শুধু আম্মু, আব্বু, ছোট বাবা, ছোট মা, মেহজাবিন, মিহি,মামনি আর আন্টি যাচ্ছে না । বাকিরা সবাই যাচ্ছে …
রুহি কান্নার মাঝেই হেসে ফেললো । রাফির আহ্লাদ বুঝে মৃদু হাসলো সকলে । রাফি বোনের হাসি অনুমান করে আবার বললো…

“ চল‌ বনু , তোর পাখি কেও আমার সাথে নিয়ে যাবো । তোকে ও বাড়িতে রেখে ইভান সহ তিন জনে ফিরবো আবার । আবার পরশু তো তোকে এ বাড়িতে নিয়ে আসবো । কাঁদছিস কেনো তবে ? দেখতো চেহারার কি হাল বানিয়েছিস ।
রুহি ওভাবে একই অবস্থায় থেকেই আদুরে গলায় বলল..
“ পরশু নিয়ে আসবে তো আমায় ?
“ হুম , নিয়ে আসবো !
“ তারপর ?
আবার রোজ রোজ এ বাড়িতে আসবো আমি !
“ আসবি তো ! এ বাড়িতেই থাকবি ।
“ যখন থাকবো না , তখন তুমি বারবার আমার কাছে যাবে , বলো ?
“ বারবার যাবো । দিনে হাজার বার যাবো আমার বনুর কাছে !
রুহি নাক টেনে মুখ তুললো । রাফি কে ছাড়লো । সযত্নে বোনের চোখের পানি মুছিয়ে দিলো রাফি । আফসানা বেগম দুটোর কান্ড দেখে দুদিকে মাথা নাড়ালেন স্মিথ হেসে । অতঃপর বললেন…
“ হয়েছে তোদের ভাই বোনের সোহাগ ? এবার তো যেতে পারি ?
মাথা নেড়ে সায় দেয় রাফি । এতোক্ষণ শান্তর ভাবমূর্তি নিশ্চুপ ছিলো । এখন যাওয়ার কথা উঠতেই চট করে মুখ খুললো বেশরমের মতো ।

“ হুম চলো চলো । আর কতো কাঁদবে তোমরা । কতক্ষন ধরে দাঁড়িয়ে আছি । চলো চলো , দেরি হয়ে যাচ্ছে । রাত তো এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে …
ভিমড়ি খেলো সকলে । রুহি এবার কটমট করে তাকালো । এতক্ষণ কাঁদলো বেচারি । অথচ শান্ত ওকে একটুও শান্তনা দিলো না ? একটা টু শব্দও করলো না ওর কান্না দেখে । ভেতরে ভেতরে ফুঁসলো রুহি । শান্ত রুহির পানে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের । অমনি দাঁত কেলিয়ে হাসলো শান্ত । খুশি উপচে পড়ছে দুই ঠোঁটের হাসিতে । রুহির ভেজা চোখ , আর এই লোকের ঠোঁটে হাসি ! একটুও সহ্য হলো না রুহির । কটমট করলো সে । মনে মনে ফন্দি আঁটলো , এই লোককে তো পরে দেখে নেবে ও ।
গাড়িতে উঠে পড়েছে বর পক্ষের সবাই । রাফি নিজের গাড়িতে যাবে । শান্তর গাড়ির সামনে গিয়ে আরেক দফা থামলো সকলে । আরেক দফা কান্না কাটি হলো ।
এর মাঝে রাফি আর কাউকে আটকায় নি কান্না থেকে ।‌ শান্ত সুযোগ বুঝে পাশ কাটিয়ে রাফির দিকে এগোলো । রাফি আর ইভান পাশাপাশি বুকে হাত গুটিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে । মূলত ইভান রাফি কে অনুকরণ করে একটু ভান ধরে দাঁড়িয়েছে । শান্ত এসে ও দুটোর মাঝে দাঁড়ালো । এরপর সে বিরাট ব্যস্ত হয়ে পড়বে । রাফি কে সময় দেওয়ার মতো সময়ই থাকবে না ওর কাছে । হাজার হোক , রাফি ওর বেস্ট ফ্রেন্ড । একটু তো মানবিক খাতির আছেই । শান্ত ওর পাশে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিলো । রাফি আর ইভানের উদ্দেশ্যে নিচু স্বরে বললো..
গলায় এক রাশ উদ্বিগ্নতা….

“ হাই সিঙ্গেল দোস্ত গন !
নাও আই এম ম্যারেইড ! তোরা এখন আমার দলের বাইরে । যা ভাগ । ত্রিশ বছর হতে চললো বিয়ে করিস না ? কেমন পুরুষ তোরা ? লজ্জা নেই ! যৌবনে ঠাডা পড়বে কয়দিন বাদ । আমার মতো সময় থাকতে থাকতে বিয়ে করে নে । আমার আপাতত একটা বাচ্চা হোক । তারপর বাচ্চা সহ তোদের বিয়ের দাওয়াত খেতে যাবো । হি হি , তোরা আমার বিয়ে একলা খেলি , আর আমি তোদের বিয়ে তিন কোলা খাবো…
উফফফ , কি প্রফিট আমার !
ইভান বাকি সব বাদ দিয়ে মাথা চুলকে বোকার ন্যায় শুধালো….
“ এই তিন কোলা আবার কি ভাই ?
শান্ত বিরক্তি নিয়ে বাচ্চা বোঝানোর ন্যায় বললো…
“ উফফফ গবেট কোথাকার ! বুঝিস না ?
একজন হলে একলা , দুই জন হলে দোকলা , আর তিন জন হলে তিন কোলা ! শালা হাদা , এটুকুও বুঝিস না ? এই জন্যই কেউ মেয়ে দিচ্ছে না তোকে !
রাফি মুখ চিপে হাসে । ইভান এবার কঠিন ধাঁধা বোঝার ন্যায় বলে উঠলো…

“ ওও আচ্ছা !
তাহলে চারজন হলে চার কোলা , আর পাঁচজন হলে পাঁচ কোলা , আর‌ ছয়জন হলে ছকলা…
উফ্ কি দারুন ভাই । এসব ভাষা দেখি নতুন নতুন….
“ হ , আমার সাথে থাকবি । তাহলে এমন নতুন নতুন ইউনিক কিছু শিখতে পারবি । আপাতত আমি বিজি হয়ে যাবো । তোদের আর সময় দিতে পারবো না । ডোন্ট মাইন্ড প্লিজ ! আমি নতুন বর , মানে বুঝিসই তো ।
শান্তর টিটকারী স্বর । রাফি পাত্তা দিচ্ছে না ওকে । শান্ত ওর প্রতিক্রিয়া পেলো না এতো আবাল তাবাল বকেও । এবার সে আরো বেশি সিরিয়াস হলো । রাফির কাছে ঘেঁষলো একটু । কানের কাছে মুখ এনে বললো…
“ আজ তোর ছিঁচকাদুনে বোনকে কিন্তু সত্যি সত্যিই ছাড়বো না আমি । নাউ ইউর সিস্টার ইজ মাই লিগালি ওয়েডেড ওয়াইফ । রিভেঞ্জ বাকি আছে অনেক ওর উপর । অনেক জ্বালিয়েছে তোর বোন আমাকে । আজ সবটার হিসেব তুলবো । তোর বোন বলে কিন্তু ছাড় পাবে না ও । নেহাতই বড় হয়েছি বলে হাতের খামচির দাগ উঠে গেছে । বাট মনের দহনের দাগ কিন্তু ওঠে নি এখনো….

রাফি মুহুর্তেই ক্ষুব্ধ হয়ে তীর্যক দৃষ্টি পাত করলো শান্তর দিকে । শান্ত কথা শেষ করেই সরে দাঁড়িয়েছে । রাফির‌ দৃষ্টি দেখে ভ্রু নাচিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো ।
ঘাড় উঁচিয়ে ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখালো । ওদিক থেকে তাড়া দিয়ে উঠলো আফসানা বেগম । শান্ত কে ডাকতেই রুহি ভেজা চোখে চাইলো ওদের তিনটের দিকে । শান্ত কে ঠোঁট কামড়ে হাসতে দেখে ভেজা কান্নারত অক্ষি যুগল‌‌‌ সূক্ষ্ম হয়ে আসলো ওর ।
চৌধুরী বাড়ি থেকে থেকে গাড়ি রওনা দিয়েছে । রাফি, ইভান,মিহি এক গাড়িতে । ওদের সাথে ঠেলে ঠুলে লিনা কেও পাঠিয়ে দিয়েছেন লতা বেগম ।
শান্ত দের বাড়িতে গিয়ে গাড়ি থেমেছে । এ বাড়িতে আজ প্রথম পা রাখলো মিহি । চৌধুরী বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয় । কাছাকাছিই অনেকটা । বাড়িতে এসে আরো টুকটাক এটা সেটা করতে করতেই সময় পেরিয়েছে কিছুটা ।
এর মধ্যেই এগোরোটা বেজে গেছে । শান্তর ঘর‌ দোতলায় । এতো বড় বাড়িতে আগে মোটে তিনটে মানুষ থাকতো । এখন বাড়লো একজন । যদিও আফসানা বেগম এ বাড়ির থেকে চৌধুরী বাড়িতে বেশিই থাকতেন । তবে এখন নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে এ বাড়িতে থাকার জন্য একটা সঙ্গি জুটলো তার ।

রুহি কে শান্তর ঘরে তুলে দিয়ে এগারোটার পর পর চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে ওরা চারজন রওনা দিয়েছে আবার । জেনি এ বাড়িতেই আছে । ও এখন বরপক্ষ । এসেছেও শান্তর সাথে শান্তর গাড়িতে ।
শান্তর ঘরটা কাঁচা ফুলের গন্ধে মুখোরিত । মো মো করছে পুরো কামরা । ঘরে দুটো ডিম লাইট জ্বলছে । একটা সবুজ রঙা , অন্যটা হলুদ । দুটোর মিশ্রনে অদ্ভুত আলো ফুটেছে । শান্ত এখনো ঘরে আসে নি । রুহি ফুলের পাপড়ির ছড়ানো বিছানায় বসে আছে হাঁটু জড়িয়ে চুপটি করে । ঘোমটা টানা একহাত । এতক্ষণ খাটে সাজানো ফুলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিলো , ঘ্রাণ নিচ্ছিল সুগন্ধিত ফুলের ।
বাইরে কারোর পায়ের আওয়াজ কানে আসতেই চটপট করে ঠিকঠাক হয়ে বসলো । গুটিয়ে নিলো নিজেকে । ঘোমটা টেনে নিলো একেবারে গলা অবধি ।
দরজা ঠেলে ঢুকলো কেউ । আবার দরজাটা লাগিয়েও দিলো । এক কদম করে এগিয়ে এগিয়ে গলা খাঁকারি দিলো ভরাট কন্ঠে । রুহির গা শিউরে ওঠে । ঘোমটার আড়ালে ঠোঁটের কোণা কামড়ে মৃদু হাসে । নামানো চোখ নামিয়ে নেয় আরো ।

শান্ত আবারো গলা ঝাড়ে । এবার পূর্বের তুলনায় আরো বেশি শব্দ করে । এভাবে আরো দুবার একই কাজ রিপিট করে সে । সেভাবেই এক এক কদম ফেলে পাশে গিয়ে দাঁড়ায় খাটের । দূরু দূরু তার পুরুষালি চিত্ত । গলা ভিজিয়ে সে বরাবরের ন্যায় ডাকলো চমৎকার কন্ঠে….
“ জান !!!
রুহি কাঁপে । তবে প্রকাশিত হয় না । কান গরম হয়ে আসে ওর । শান্ত ধীরে ওর সম্মুখে বসলো । ঘাড় নিচু করে হেলে ঘোমটার আড়ালে রুহির মুখ দেখার চেষ্টা করলো । দেখতে পারলো না । অদ্ভুত আলোয় আলোকিত ঘর । চারদিক কেমন অস্পষ্ট ঘোলাটে লাগছে । শান্ত হাত বাড়িয়ে দিলো ল্যাম্পশেড জ্বালানোর জন্য । তবে পিছুপা হলো কিছু একটা ভেবে । হাত সরিয়ে নিলো সে । জিভে অধর ভিজিয়ে আবার ডাকলো…
“ জান ! লজ্জা পাচ্ছো ?

একটু ডেকেই সময় পার করলো না । তড়িঘড়ি করে হাত বাড়িয়ে ঘোমটা সরিয়ে দিলো । অমনি চমকানো দৃষ্টিতে চোখ বড় বড় করলো । মুখ ফাঁক করে তাকালো রুহির দিকে । কোথায় লজ্জা পাচ্ছে এই মেয়ে ?
চোখ পাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে ধারালো তীর্যক দৃষ্টি নিক্ষেপিত হয়েছে শান্তর দিকে । চোখ তো নয় যেন তরমুজের বিচি । শান্ত কোথায় ভেবেছিল ঘোমটা তুলে লাজে রাঙা রুহিত লালিত মুখখানা দেখতে পারবে , তা না ? এই মেয়ে এভাবে কটমট করে তাকিয়ে আছে কেনো ? বিরাট অবাক হয় শান্ত । চোখে পলক ফেলে আবার তাকায় । রুহির দৃষ্টি ভঙ্গি অদ্ভুত । চোখে ক্ষিপ্ততা একরাশ । রুহির রাগান্বিত চাহনি রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনা শান্তর ।
শান্ত ওভাবে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে অবাক হয়ে বুলি ফুটায় মুখে…..
“ এ কি জান ! তোমার না আজ , এখন, এই মুহূর্তে লজ্জা পাওয়ার কথা ! তাহলে এভাবে ঝলসানো চোখে ভ্যাট ভ্যাট করে তাকিয়ে আছো কেনো তুমি ?
রুহি তেতে উঠল । ছিটকে পিছিয়ে গেল ও । ঝাঁজালো কন্ঠে গলা টাটিয়ে বললো তৎক্ষণাৎ….
“ খবরদার , দূরে যান বলছি । যদি আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন , তাহলে মুখে সুপার গ্লু লাগিয়ে দেবো আপনার ।

“ এ কেমন কথা বউ জান ? কি বলছো এসব ?
শান্তর ভ্যটকানো সচকিত স্বর । এক মুহুর্তে গুলিয়ে গেলো সব । রুহির হাবভাব,লক্ষন মাথার উপর দিয়ে গেলো । রুহি ফের ঘ্যাস ঘ্যাসে গলায় খেকিয়ে উঠলো….
“ চুপ করুন ‌। দূরে যান আমার থেকে । যান এখান থেকে…
শান্ত হা বনে যায় । পলক ফেলে ঘন । বেখেয়ালেই বলে….
“ দূরে যাবো কেনো ? আজ তো কাছে আসবো ! দূরে কোথায় যেতে বলছো আমায়…?
“ আবার কথা বলছেন ?
আপনার তো সাহস কম নয় ? আমি তখন দুঃখে কষ্টে কাঁদছিলাম আর আপনি আমার কান্না দেখেও ফ্যাল ফ্যাল হাসছিলেন ? খুব হাসি পাচ্ছিলো না আমাকে দেখে ? নতুন বিয়ে করছেন বলে ? হাসুন , এখন এভাবে মুখ গোল করে তাকিয়ে আছেন কেনো । হাসুন ।
শান্ত কথা মতো বোকার ন্যায় দাঁত কেলালো ।
“ এইতো হাসছি । দেখো দেখো…
কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়লো রুহির । ফোঁস করে উঠলো সে ! আরো একটু পিছিয়ে চার ফুট দূরত্ব বাড়ালো । আঙ্গুল তুলে শাসানোর স্বরে বলল….

“ আবার হাসছেন আপনি ? আপনাকে তো…
আপনাকে আমি….
“ চুমু খাবে ? খেয়ে নাও…
কথাটা বলেই শান্ত নৈকট্য লাভের আশায় একটু এগোতে গেলে রুহি চেঁচিয়ে উঠলো….
“ খবরদার আমার কাছে আসবেন না । আর আশার ও‌ চেষ্টা করবেন না । যদি আসেন তাহলে চেঁচিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় করবো আমি । এটাই আপনার শাস্তি । হাসুন আরো , আমার কান্না দেখে খুব হাসি পাচ্ছিলো না ?
একটু থেমে শান্তর তাজ্জব ভাব গতিক ঠাহর করে ঠোঁট চেপে ধরলো খানিক । অতঃপর চড়াও কন্ঠে আবার বললো….
“ সরুন সামনে থেকে !
“ এ কেমন বর্বরতা জান ? তুমি না আমার বউ । আজ না আমাদের বা…..
“ চুপ, অসভ্য লোক । একটা কথা বললে ঘর‌ থেকেও বের করে দেবো । এখানে ঘরে এখনো বসে থাকতে পারছেন, এটা আপনার সাত কপালের ভাগ্য ।
“ এএএ রুহি । ভালো হবে না কিন্তু ।
প্লিজ ইয়ার্কি বাদ দাও জান । রাত পেরিয়ে যাচ্ছে…
তুমি না বলেছিলে আর কখনো ত্যাড়ামো করবে না । কি শুরু করলে আবার ? দেখো জান , অনেক সহ্য করেছি , আর পারবো না ।
রুহি হাল‌ ছাড়ে না । ঠোঁট চেপে ঝট করে খাটের উপর উঠে দাঁড়ালো । ফের আঙ্গুল তুলে বললো…

“ ত্যাড়ামো করবো না বলেছিলাম , কারন তখন আপনাকে হারানোর একটু ভয় ছিলো । এখন তো আপনি আমার । এখন আর ভয় ডর‌ নেই ।
“ আমি তোমার , তো আমাকে তোমার হতে দাও না । প্লিজ এসব ঠাট্টা বাদ দাও…
কাছে এসো জান ।
রুহি লাফিয়ে খাট থেকে নামলো । ওয়াশ রুমের দিকে এগোলো । কিছু না বলে ওয়াশ রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো ঠাস করে । শান্ত আহম্মক বনলো । ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল এখনো । খানিক ক্ষনের মধ্যেই বেরিয়ে আসলো রুহি । শান্তর চোখ চিকচিক করে উঠলো । বললো সে উৎসুক হয়ে….
“ এসো বউ জান…
রুহি রগরগে দৃষ্টিতে তাকালো ফের ।

“ বলেছি না আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না । যদি উল্টো পাল্টা কিছু করার মতলব এঁটে থাকেন । তাহলে তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন । নয়তো একটা চুলও মাথায় থাকবে না । সব টেনে টেনে তুলবো আমি । আপনাকে তো ছাড়বো না । এটাই আপনার উচিত শাস্তি । আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করবেন না আজ । নয়তো আপনার প্রেস্টিজ পাংচার করে দেবো একদম । বউকে ব্যাড টাচ করার অপরাধে জুলাইয়ের নারি নির্যাতনের মামলায় ঢুকিয়ে দেবো..
বলতে বলতে খাটে এসে বসলো । এক ঝটকায় শান্ত কে চমকে দিয়ে আবার বললো….
“ সুরুন , কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে গেছি । ঘুমাবো আমি । আপনি বারান্দায় গিয়ে হাসুন…
বলেই চাদর টেনে গায়ে জড়িয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো । হাসলো ফিক করে ঠোঁট চেপে । শান্তর করুন অবস্থা দেখার মতো হয়েছে পুরো । সে বসে থম মেরে । কি বলে এই মেয়ে ? শান্তর‌ মাথা ঘুরছে । এতক্ষণ আলাভোলার ন্যায় সবটা সহ্য করলেও এবার টান টান করলো নিজেকে । বুক ফুলিয়ে দম নিলো । ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । মুহুর্তেই চুপসে গেল আবার । ফুস হয়ে চুপসে গেলো শিরদাঁড়া । আহ্ , কতো স্বপ্ন এই রাত নিয়ে ? আর এই ছিঁচকাদুনে মেয়ে কিনা ওকে ইগনোর করছে ? ভয় দেখাচ্ছে ?
শান্ত আবারো গুরুত্বর হলো । সাহস জুগিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে রুহির পাশে বসলো । হেলে রুহির মুখ দেখে বললো…

“ ব্যাড টাচ করবো না জান । আসো , গুড টাচ করি । গিফট এনেছি তোমার জন্য , নেবে না ? বাসর‌ রাতে হাসবেন্ডের থেকে গিফট নিতে হয় । আর , কালকে তোমায় অনেক গুলো আইসক্রিম কিনে দেবো । কেমন ? শপিংয়ে নিয়ে যাবো কাল । বিরিয়ানি খাবে ? আমি নিজে রেঁধে খাওয়াবো । ফুসকা খাওয়াবো আনলিমিটেড । যত খেতে পারো তত, একটুও বাঁধা দেবো না । হানিমুনে চাঁদে নিমে যাবো । চাঁদের মাটিতে এক টুকরো জমি কিনে বাড়ি বানাবো । সেখানে তোমাকে রাণী বানিয়ে রাখবো । আমাদের এক ডজন রাজ পূত্র আর রাজকন্যা হবে । কিন্তু রাজপুত্র আর রাজকন্যা হওয়ার জন্য তোমাকে গুড টাচ করতে হবে….
ভেবে দেখো , সেই অফার । শুধু আজকে রাতের জন্য । আজকের পর কিন্তু অফার শেষ হয়ে যাবে ।
রুহি হাসি চেপে ক্ষিপ্ত দৃষ্টি পাত করলো শান্তর দিকে । শান্ত সয়ে যাচ্ছে । রুহি কিছু না বলে ফের মুখ ফিরিয়ে চোখ বুজলো । শান্ত হুতাশ হয়ে বিড়বিড় করলো কিছু । এবার বিড়বিড় করলো জোরে…

“ আর জীবনেও হাসবো না জান…
এই দেখো , প্রমিস করছি । সব সময় কাঁদবো । তবু ত্যাড়ামো ছাড়ো । আমি কিন্তু সহ্য করছি । সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে গেলে ভালো হবে না তোমার জন্য ।
“ আপনার সহ্য ক্ষমতা হারালে আসলেই ভালো হবে না । আপনার জন্যেও না ! চুপচাপ থাকুন , ঘুমাতে দিন । আপাতত চাঁদে এক টুকরো জমির অর্ডার দিয়ে বাড়ি বানিয়ে ফেলুন । তারপর সেই বাড়িতে দেখা হবে আপনার সাথে…
বলেই হাই তুললো রুহি । শান্ত বিরক্ত হলো চরম । কি রনচন্ডি জেদি মেয়েরে বাবা । বেশি কিছু বললে , রাগ দেখালে মুখ ফুলিয়ে থাকবে তখন । শান্ত ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বরাবরের ন্যায় । ভীষণ দূঃখ হচ্ছে । সে আর একটু হেলে ভাঙ্গা গলায় গান ধরলো দুঃখ কষ্ট ঢেকে….
“ Sun Meri Rani Rani , Ban Meri Rani Rani …
Sahjahan mein tera Dil Mumtaj banadunga..
Ban jaa TU Meri Rani , tenu mehal dawa Dunga…

“ আমি রাণী হতে চাই না , দূরে যান !
শান্ত হাত মুঠো করলো । চোয়াল শক্ত করে একটানে রুহি কে ফেরালো নিজের দিকে । আকস্মিক ভড়কালো রুহি । চমকানো স্বরে মুখ খোলার আগেই ওর হাত দুটো একসাথে শক্ত করে বিছানার সাথে চেপে ধরলো শান্ত । এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে নিজের অধর দ্বারা চেপে ধরলো রুহির নরম ওষ্ঠাধর । রুহি চমকে ছ্যাঁত করে উঠলো । চোখ জোড়া হয়ে আসলো মার্বেলের মতো গোল । শান্তর অকস্মাৎ নৈকট্য আর তীব্র স্পর্শে জমে গেলো শরীর । ছটফট করতেও শক্তি পেলো না । গুঁড়িয়ে আসলো মেয়েটা । ওষ্ঠাধরে শান্তর আধিপত্য বিস্তার বেড়েই চললো । এক পর্যায়ে নুইয়ে আসলো রুহি । চোখ বুজে আসলো আপনা আপনি । শ্বাস আটকে আসছে । হৃৎপিণ্ড ওঠা নামা করছে তীব্র গতিতে । পাক্কা দশ মিনিট বাদ রুহির অধর ছাড়লো শান্ত । একটু বিরতি দিয়ে চোখ খুলে রুহির পানে তাকালো । মেয়েটা এতক্ষণে হাঁফ ছাড়ল । চোখ বুজেই শ্বাস নিলো জোরে জোরে । শান্ত ফিচেল হাসলো তা দেখে । বাঁকা হেসে বিড়বিড় করলো….

এক দেখায় পর্ব ৬০

“ এতো গুলো বছর অপেক্ষা করেছি , আর একটা সেকেন্ড ও অপেক্ষা করা নট পসিবল ফর মি । নাটক কম করো জান । আই নো, আমাকে খোঁচাচ্ছো তুমি !
এবার আর ছাড় পাবে না । বি প্রিপেয়ার ফর এভরিথিং…
লাভ ইউ মাই লাভ ‌! এন্ড আই নিড ইউ নাউ । ব্যাডলি নিউ ইউ ! চলো হারাই দু’জনে….
কথাটা বলেই রুহির উন্মুক্ত ফর্সা গ্রীবায় মুখ ডোবায় শান্ত । কুকিয়ে ওঠে রুহি । চোখ মুখ খিচে ফেলে অদ্ভুত অবাধ্য অনুভূতিতে । কেঁপে ওঠে পুরো শরীর । শিউরে ওঠে লোমকূপ । শান্তর শক্ত হাতের বাঁধন থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে শান্ত কে ।

এক দেখায় পর্ব ৬২