Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৮ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৮ (২)

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৮ (২)
ইনান হাওলাদার

মনে মনে যখন রাগের স্তূপ গড়ছিল তূর্য ,ঠিক সেই মুহূর্তে একটা কালো ছায়া এসে লম্বালম্বি ভাবে ল্যাপটপ আর ওর মুখের উপর এসে পড়লো। ছায়ার উৎস খুঁজতে সামনে তাঁকালো সে।যদিও জানে আহি ছাড়া আর কে-ই বা হবে। তবুও একপলক তাকিয়ে দেখলো । তারপরে আবার ল্যাপটপে নজর নিবদ্ধ করলো।সেকেন্ডের ব্যবধানে আবার চোখ তুলে তাকালো সামনে। ও ঠিক দেখলো? শাড়ি পরেছে আহি? হ্যাঁ,সত্যিই তো পরেছে। প্রেয়সীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার নিগূঢ় দৃষ্টিতে স্ক্যান করে নিল সে। কি চাইছে স্টু’পিডটা? এত রাতে শাড়ি পরে ফায়দা কি? কি ভেবেছে শাড়ি পরে সব ভুলিয়ে দিবে? নিজের উপর সম্পূর্ণ কন্ট্রোল আছে তার। শুধু মাত্র শাড়ি পরাতেই গলবে না সে। একদম গলবে না ! ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে গেলেও না। সে পুনরায় ল্যাপটপে মনোযোগ দিল। তবে আদেও দিতে পারল তো?
আহি নমনীয় কন্ঠে ডাকলো ওকে,

” তূর্য ভাই?”
কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না তূর্য। মেয়েটা পুনরায় ডাকলো।এবারেও একই অবস্থা।অতঃপর তিনবারের মাথায় সাঁড়া দিলো তূর্য। খিটখিটে মেজাজে বলল,
” কি চাই? ”
প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত মেজাজ দেখলো সে। মূলত ভিতরের পরিস্থিতি বাইরে আসতে না দেওয়ার কঠিন প্রচেষ্টা এটা। আহি হাত-পা দুলিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখলো নিজেকে। উৎফুল্ল চিত্তে বলল,
” শাড়ি পরেছি আমি ”
” হ্যাঁ,দেখেছি ” গম্ভীর গলায় বলে পুনরায় ল্যাপটপে চোখ রাখলো তূর্য।এই পর্যায়ে মেয়েটার মুখ গোমড়া হয়ে গেল। ‘ হ্যাঁ,দেখেছি ‘ এটা কেমন কথা? রেগে আছে সে মানলো তবুও একটু প্রশংসা তো করতে পারতো লোকটা।রেগেই না হয় একটা কমপ্লিমেন্ট দিলো। ও স্বাভাবিক ভাবে বলল,

” ঘুমাবেন না?”
” কাজ কমপ্লিট করবো তারপর।তুই ঘুমা ” গম্ভীর কন্ঠস্বর তূর্যের।
আহি এবার তূর্যের পাশ ঘেঁষে বসলো। বাহু জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখলো। বলল,
” আমিও আপনার সাথে ঘুমোবো ”
তূর্য এবার শব্দ করে ল্যাপটপের শাটার বন্ধ করলো । বলল,
” কি প্রবলেইম তোর?শাড়ি পরে স্যি’ডিউস করতে চলে এসেছিস ?আবার ঘেঁষা-ঘেঁষিও করছিস!একটু ছুঁতে গেলেই তো মৃগে ব্যারাম শুরু হয়ে যাবে ”
আহি সাথে সাথে তূর্যের কাধ থেকে মাথা উঠালো। চমকে তাঁকালো ওর দিকে। রাগ পড়ে গিয়েছে লোকটার?
এদিকে ওর অমন হুট করে মাথা সরানো দেখে উল্টো বুঝলো তূর্য । বলল,
” নেও ! এখনই শুরু হয়ে গিয়েছে। তোকে টাচ করা কোনো ইচ্ছা-ই আমার নেই ” বলে ডিভান থেকে উঠলো সে।জায়গার ল্যাপটপ জায়গায় রেখে দরজা লক করে এলো। বিছানার বালিশ গুলো ঠিক করবে তার আগেই মেয়েলি মিনমিনে কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

” হবে না ”
মাথা একদম নত করা মেয়েটার।তূর্য বালিশ ঠিক না করেই ওর দিকে কিছুটা এগিয়ে এলো। ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলো,
” কি হবে না?”
” মৃগে ব্যারাম ”
তূর্য কিছুক্ষণ ওকে দেখলো। অতঃপর বলল,
” ওহ,আচ্ছা! ঘুমা এখন ”
” বললাম তো …..” কিছুটা উচ্চ কন্ঠে কথাটা বলতে গিয়ে বাক্য অসম্পূর্ণ রেখেই আবার থেমে গেল আহি।তূর্যকে জাপটে ধরে বলল,
” ভালোবাসি ”
মুহূর্তেই একদম স্তব্ধ হয়ে গেল তূর্য।চোখ বন্ধ করে নিল। আহির মুখে ভালোবাসি শব্দটা যে এত শ্রুতিমধুর শুনাবে সেটা ওর ধারণার বাইরে ছিল। মনের মধ্যে এতটা সুখ-সুখ দোলা দিবে কল্পনার বাইরে ছিল । তবে পাজিটার দুষ্টুমি এখনো মনে আছে তার। ও ভারী গলায় বলল,

” তো আমি কি করবো ? ”
তূর্যের বুক থেকে মুখ তুললো আহি।তবে একই ভাবে জাপটে ধরে মাথা উঁচু করে তাকালো স্বামীর মুখের দিকে। দৃষ্টিতে শুধু বিগেদ খানিক উপরে থাকা শক্ত চোয়াল দৃশ্যমান। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
” এহহ..আপনিই তো গতকাল রাতে কতকিছু বললেন।ভালোবাসি শুনতে চান বললেন । আর এখন নাটক…”
” ওয়েট ওয়েট…! এসব তোকে কে বলেছে?” তূর্য থামালো ওকে। এসব কথা সে নিজে না বললে আহির জানার কথা নয়।সে যখন কিছুই বলেনি তাহলে মেয়েটা কীভাবে জানলো?
আহি বলতে শুরু করলো,
” আমি জানতাম আপনি কখনই আমার উপর এত রাগ করতেই পারেন না।তাই ঘুমানোর আগে মোবাইলে রেকর্ডার অন করে রেখেছিলাম।” তারপর খিলখিল করে হেসে দিল ও।
এ কথা শুনে অপ্রস্তুত হলো তূর্য।তার মানে সবকিছু শুনে নিয়েছে?
ও গলা ঝেড়ে থতমত করলো সে,

” আর কি কি শুনেছিস তুই? ” তারপর প্রেয়সীকে নিজের হতে ছাড়িয়ে নিল। আহি দুই হাত কোমরে গুঁজে দাঁড়ালো।চোখ ,ভ্রু এমন ভাবে বিকৃত করেছে যেন তার সামনে থাকা মানবটি বিরাট বড় অন্যায় করে ফেলেছে। মেয়েটা সেভাবেই রাগ ঝাড়ল,
” আপনি কত্ত বড় অভিনেতা তূর্য ভাই ?আমি জাস্ট ভাবতেই পারছি না। বছরের পর বছর এভাবে নাটক করলেন কীভাবে,হুম? ঐ উপন্যাসও আপনি দিয়েছিলেন?আর আগে আমি আপনার রুমে গেলে আপনি বিরক্ত হতেন না।ওটা-ও ঢং করতেন?আর আপনি….”
মেয়েটাকে আর কিছু বলতে দিল না তূর্য।এক হাত মাথার পিছনে দিয়ে এবং অন্য হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো। বলল,
” চুপ…! একদম চুপ। আর শুনতে চাইছি না আমি ।”
সব শুনে ফেলেছে ইডিয়ট টা? এতকাল ধরে লুকিয়ে রাখা সত্যতা ঠিকই সামনে চলে এল। আহি ওর হাতের নিচে ‘ উমমম ‘ ‘ উমমম ‘ শব্দ করে উঠলো।তূর্য হাত আলগা করে গম্ভীর গলায় বলল,
” ওসব সিরিয়াসলি নেওয়ার দরকার নেই। আমি আসলে বুঝতে পেরেছিলাম তুই রেকর্ডার অন করে রেখেছিলিস। তাই একটু নাটক করছিলাম।”

” আর মিথ্যা বলতে হবে না আপনার তূর্য ভাই। আমাকে কতটা বোকা ভাবেন আপনি হুম?এখন এসব বললেই আমি বিশ্বাস করে নিব? ”
” বুঝেছিস যখন তো আরেকবার বল ” গমগমে গলায় বলল তূর্য।
আহি বুঝতে পারলো না ওর কথা। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বলল,
” কি বলবো ? ”
” ভালোবাসি ”
অবাক হাসলো আহি। এটা সত্যিই তার তূর্য ভাই? একটা মানুষ ভালোবাসি শব্দটা শোনার জন্যে এতটা কাঙাল কিভাবে হতে পারে? আর আজব মানুষ! এসব আদুরে সময়েও কেমন গম্ভীর ভাব করে আছে। একটু সুন্দর করেই তো বলতে পারে। তবুও সে বলল,

” আচ্ছা! ভালোবাসি ”
তূর্য এক টানে মেয়েটাকে তার উন্মুক্ত বুকে এনে ফেললো।জোরসে আঁকড়ে ধরলো।একটা ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
” আবার… ”
কিছুক্ষণ পার হলেও কাঙ্ক্ষিত উত্তর পেল না তূর্য । সে আকুল হয়ে পুনরায় বলল,
” আরেকবার বল জা’ন। প্লিজ জা’ন আর একবার।জাস্ট একবার! প্লিজ ”
তূর্যের এরকম অনুনয় মেয়েটার বুকের মধ্যে অপরাধবোধের ঝড় তুলল। একটু ভালোবাসি শুনতে লোকটা কিভাবে পাগলের মতো করছে। আর সে জীবনে একবারের জন্যেও ভালোবাসি বলেনি।এটা কি মোটেও ঠিক হয়েছে? ভাবতে ভাবতে লোকটার বুকের মধ্যেই হুঁ হুঁ করে কাঁন্না আরম্ভ করে দিলো মেয়েটা।তূর্য বুঝলো না ওর কাঁন্নার কারণ।তবুও চুপচাপ রইলো। তবুও সময় দিক ওকে কাঁন্না করতে।মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।থেকে থেকে চুলের ভাঁজে ঠোঁট ছোঁয়াতে লাগলো। কিছুক্ষণ বাদে শান্ত হলো আহি। নাক টেনে টেনে বলতে আরম্ভ করলো,
” ভালোবাসি তূর্য ভাই …অনেক অনেক ভালোবাসি।যতটা বলছি তার থেকেও বেশি ভালোবাসি। ”
তূর্য যেন প্রশান্তি ফিরে পেল। আরো জোরে আঁকড়ে ধরলো রমণীকে।যেন বুকের ভিতরেই পিষে ফেলবে। এভাবে ঠিক কতক্ষণ অতিবাহিত হলো ওদের জানা নেই।নীরবতা ভেঙে আহি বলল,

” অথচ আপনি এখনো একবারও বললেন না ভালোবাসি ”
সন্ধ্যা বেলায় খুব জ্বালানো হয়েছে না? এটার শোধ তো তুলতেই হয়। সে বলল,
” ভালো তো বাসি-ই বলার কি আছে? ”
” তাহলে তো আমারও বলার কিছু ছিল না। নিজে কেন গোঁ ধরে পড়ে ছিলেন? “বলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল তূর্যের হতে।মেয়েটার অগোচরে ঠোঁট টিপে হাসলো তূর্য। বলল,
” ইচ্ছা হয়েছিল তাই ”
পুনরায় স্বামীর বুকে মাথা রাখল আহি। আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
” আমারও শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে ”

” হলে হোক ! তাতে আমার কি? ” কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল সে।
” আপনার…আপনার ঘোড়ার ডিম ” বুক থেকে মাথা তুলে রাগে চিড়বিড়িয়ে বললো আহি।অতঃপর বাঁধন হতে ছাড়িয়ে নিতে চাইলো নিজেকে।ওর কান্ডে মুচকি হাসলো তূর্য। প্রেয়সীর মাথা খানা বুকে চেপে ধরে একটু ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিল। ফিসফিসিয়ে বলল,
” উঁহু! আমার তুই । শুধু তুই ”
এতটুকু কথাতেই বুকের মধ্যে দোল খেল রমণীর। সারা শরীর জুড়ে ভালো লাগায় ছেয়ে গেল। লাজুক হাসির দেখা মিললো ঠোঁটের কোণে। সে যখন খুশিতে আত্মহারা সেই মুহূর্তেই অন্য পক্ষের উদাসীন গলা ভেসে আসলো,
” এখন তুই নিজেই যদি নিজেকে ঘোড়ার ডিম বলিস আমার আর কি করার।ঘোড়ার ডিম-ই তুই ” বলে কপট দীর্ঘশ্বাস ফেললো তূর্য। পরপর আবার কপট আশ্চর্যের ভান ধরলো সে । প্রেয়সীকে বুক থেকে ছাড়িয়ে দুই বাহু ধরে বলল,

” তোর মতিগতি তো কিছুই বুঝছি না। ”
আহিও আশ্চর্য হলো।বলল,
” কি করেছি আমি ”
” শার্টলেস পেয়েই শুধু বুকের ভিতর আঁচড়ে পড়ছিস কাহিনী কি?” বলে ঠোঁট টিপে হাসলো ও।লজ্জায় রাঙা হলো আহি।লাজুক হেসে আর্তনাদ করে বলল,
” তূর্য ভাই ! ”
মুহূর্তেই গম্ভীর হলো তূর্য।বলল,
” আরেকবার মুখে ‘ ভাই ‘ শুনলে তোর ঠোঁট আমি টেনে ছিঁ’ড়ে ফেলবো আহি। ”
” আমি তো না বলার চেষ্টা করছি-ই। হঠাৎ করে কিভাবে বন্ধ করব !” প্রতিবাদ করলো সে।
” কিভাবে বন্ধ করবি বলি , ওয়ান সেকেন্ড ” বলে তূর্য কিয়ৎক্ষণ চুপ করে কিছু ভাবলো।তারপর বলল,
” যখনই ভাই ডাক মুখে এসে যাবে তখনই ইমাজিন করবি তোর সাথে আমি ঠিক কি কি করেছি। ভাইয়েরা নিশ্চয়ই কোনো বোনের সাথে ওসব করবে না? এগুলো যখনই মনে করবি দেখিস রুচিতে লাগবে ‘ভাই’ ডাকতে ”
মৃদু কন্ঠে ধ’মকে উঠল মেয়েটা,

” উফফ… তূর্য ভাআআ.. মানে আপনি থামুন তো ”
‘ ভাই ‘ বলতে বলতে থেমে যাওয়া দেখে তূর্য বলল,
” কাজ করলো মনে হচ্ছে ? ”
” আপনি অনেকটা নি’র্লজ্জের মতো কথা বলেন জানেন সেটা? ”
” উঁহু ! আপনি না বললে জানতাম-ই না ”
” আপনি …..” তেঁড়ে উঠে কিছু বলতে চাচ্ছিল আহি তার আগেই তূর্য পাজকলা করে তুলে নিল ওকে।লোকটার হঠাৎ আ’ক্রমণে কথা বন্ধ হয়ে গেল তার। মৃদু চি’ৎকার করে উঠল।বলল,
” তূর্য ভাই..! ”
তূর্য শা’সালো ওকে,
” চুপ..! ”
অতঃপর বালিশে শুইয়ে দিয়ে বলল,

” অনেক ঝ’গড়া হয়েছে এবার ঘুমা। ”
তারপর নিজেও পাশে শুয়ে পড়লো। আহি উঠতে উঠতে বলল,
” শাড়ি বদলে আসি একটু ”
” চেইঞ্জ যখন করবি পরেছিস কেন? ”
” আপনার মন গলাতে ,একটু খুশি করতে ”
” নেক্সট টাইম খুশি করতে এত কষ্ট করার দরকার নেই।একবার
‘ ভালোবাসি ‘ বললেই হবে ” শান্ত কন্ঠে কথাটা বলে চোখ বুজলো তূর্য।মুহূর্তেই খুশিতে বাক-বাকুম হয়ে উঠল আহির নারী সত্ত্বা।
সে শাড়ি পাল্টে একটা সুতি থ্রি পিস গায়ে জড়ালো। অতঃপর রুমের সকল আলো নিভিয়ে স্বামীর প্রশস্ত, উন্মুক্ত বুকে মাথা রাখলো। দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো তাকে।তূর্যও আগলে নিল ওকে। ঘুমে কন্ঠ ভারী হয়ে এসেছে ।সে ঘুম জড়ানো মোটা কন্ঠে ডাকলো,
” জা’ন?”
” হুঁ ” আস্তে করে উত্তর দিলো আহি।
তূর্য মিহি কন্ঠে পুনরায় ডাকলো,
” জা’ন?”
” হুঁউউ “এবারে কন্ঠটা আরেকটু উঁচু করলো সে।
তূর্য ফের ডাকল।টেনে টেনে বলল,
” জাআআআন ”
” হুঁউউউউ ”
” ঘুমা ”

তূর্যের এহেন কথায় খিলখিল করে হেসে উঠল আহি। সে তো ঘুমাচ্ছেই। বলার কি আছে?পাগল হয়ে গেল লোকটা? তূর্য নড়ে-চড়ে উঠলো। মেয়েটাকে পাশে রেখে ডান হাত তার ঘাড়ের নিচ দিয়ে গলিয়ে দিল।অন্যহাতে পিঠ জড়িয়ে ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
” হাসিস না,ঘুমা। ”
আহি গুঁটি-সুঁটি মে’রে পড়ে রইলো স্বামীর বুকের মধ্যে।
কিছুক্ষণ বাদে হুট করে প্রশ্ন করলো তূর্য,
” জানিস? ”
” কি? ”
” আমার সাত বছরের পূর্ণতা তুই ”
বিষ্ময়ে আহির মুখ হা হয়ে গেল। হৃদস্পন্দন জোরালো হলো। সাত সাতটা বছর ধরে অপেক্ষা করেছেন লোকটা? অথচ কখনো ওকে কিচ্ছুটি বুঝতে দেয়নি। তূর্য একটা একটা দম নিয়ে পুনরায় বলল,
” আই থিঙ্ক সেভেন ইয়ার’স। এক্সাক্ট টাইম জানি না। রিয়ালাইজ করেছি সাত বছর হচ্ছে। এই সাত বছর আমি কিভাবে কাটিয়েছি একমাত্র আমি-ই জানি। প্রতিটা মুহূর্ত নিজের সাথে ফা’ইট করে গিয়েছি। কারণে-অকারণে তোকে ব’কাবকি করতাম,সেটাও নিজের সাথে যুদ্ধ করে। কয তুই সামনে এলে আমার দিন-দুনিয়া গুলিয়ে যেত। ইচ্ছে করত সেই মুহূর্তেই সবাইকে সবটা জানিয়ে তোকে নিজের করে নেই। বাট তখন এসব করলে তুই নিজেই বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়াতিস।” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো ও।বললো,

” তুই আমার অনেক অপেক্ষা, কষ্ট আর ধৈর্যের ফল আহি। আমার প্রতি ওয়াক্তের নামাজ শেষে মোনাজাতের একমাত্র চাওয়া ছিলি তুই। ”
তূর্যের কথা শেষ হওয়ার পর আহি কিছুক্ষণ একদম নিশ্চুপ হয়ে পড়ে রইল। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে ওর।
লোকটা তাকে পাওয়ার জন্য এতটা সময় ধরে নিজের সাথে যু’দ্ধ করে গিয়েছে? গলা শুকিয়ে এলো মেয়েটার। তিরতির করে ঠোঁট জোড়া কাঁপছে।মানুষটা প্রতিটা মুহূর্ত নিজের অনুভূতির সাথে এতটা লড়াই করেছে অথচ কাউকে কিছু বুঝতেও দেয়নি?
লোকটা সব সময় রাগ দেখালেও অদ্ভুতভাবে তার সবকিছুতে খেয়ালও রাখত। সে ভেজা গলায় বলল,
” দাদু সবটা জানতেন ,তাই না ?”
আস্তে স্বীকারোক্তি দিলো তূর্য,
” হুম ”
” আর কেউ জানত না? ”
” লাস্ট থ্রি ইয়ার’স ধরে আম্মুও জানতো। আর মেজো মা জেনেছে বছর খানেক আগে ”
” আম্মুও জানতো? ” আশ্চর্য হলো আহি।এতক্ষণে তূর্যের বুক থেকে মাথা তুললো। তাড়াহুড়ো করে উঠে বসলো। তূর্যও উঠলো।পিঠের নিচে বালিশ দিয়ে খাটের হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে বলল,

” তোর বড় মা জানত এটা শুনে অবাক হলি না?”
” এটা তো আগেই জানি ”
ভ্রু কুঁচকালো তূর্য।বলল,
” কিভাবে? কে বলেছে ?”
” দুইদিন আগে বড় মা-ই বলেছেন।সাথে আরো অনেক কিছু বলেছেন ”
” কি বলেছেন ? ” জানতে চাইলো তূর্য।
” থাক ,কিছু না। বললে তো আবার অস্বীকার করবেন “বলে একটা কপট দীর্ঘশ্বাস ফেললো আহি।
” বল তুই ” গম্ভীর কন্ঠস্বর তূর্যের।
” বড় মা বলেছেন, একটা মানুষ আমার জন্যে নাকি প্রচুর পাগলামি করেছে ,কাঁন্না-কাটি করেছে । সে নাকি…”
তূর্য দ্রুত থামলো ওকে,
” হয়েছে , থাম তুই। ”
অতঃপর আমতা আমতা করে বললো ,
” এসব তো অস্বীকার করার মতোই কথা। আমার তো আর খেয়ে কাজ নেই পাগল-ছাগলের জন্যে পাগলামি,কাঁন্না-কাটি করতে যাব ”
আহি সন্দিহান কন্ঠে বললো,

” সত্যিই এসব কিছু করেননি? ”
মিথ্যা বলার অভ্যাস না থাকায় সোজাসুজি ‘ না ‘ বলতে পারল না তূর্য। এদিকে সত্যটা স্বীকার করাও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। সে কি এখন ভালোবাসা নিয়ে শো-অফ করবে নাকি? বড় গলা করে বলে বেড়াবে নাকি যে ‘ হ্যাঁ, করেছি পাগলামি,কাঁন্না-কাটি। কয়েকদিন মদারুও হয়েছি ‘
সে থমথমে গলায় বলল,
” মুখ বন্ধ করে ঘুমা তো ”
বলে নিজে দ্রুত শুয়ে পড়লো ।
আহির যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। সেও আর ঘাটালো না তূর্যকে। পূর্বের মতোই স্বামীর বুকের মধ্যে জায়গা করে শুয়ে পড়ল। তূর্যের এই গোপন ভালোবাসাতেই অভ্যস্ত সে। বলল,
” আচ্ছা তূর্য ভা.. ”
পরপর আবার নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল,

” আচ্ছা যদি আমিও আপনার প্রেমে না পড়তাম তখন কি হতো? ”
” যা হয়নি সেটা নিয়ে কেন ভাবছিস? ”
” মনে করুন যদি এমনটা হতো তাহলে কি করতেন আপনি?”
” কি আর করার! সারা জীবন তো আর সন্ন্যাসী হয়ে কাটাতে পারতাম না। তোর চেয়ে সুন্দরী একটা মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিতাম।দ্যান তাকে এভাবে জড়িয়ে রেখে শুয়ে থাকতাম। তুই সেই মেয়েকে ভাবি বলে ডাকতিস। আর আমার বাচ্চা-কাচ্চারা তোকে ফুপি বলে ডাকত।এভাবেই জীবন কাটতো ”
তূর্য চাইলো আহিকে রা’গিয়ে দিতে। রে’গে গেলে রা’গ ভা’ঙ্গানোর উছিলায় টপাটপ কয়েকটা চু’মু খেয়ে নিবে।কিন্তু আহির মাথায় চলছে অন্যকিছু।সে সম্মতি প্রকাশ করলো তূর্যের কথায়,
” হ্যাঁ,সেটা ঠিক ! তারপর আমারও অন্য জায়গা বিয়ে হতো।আমার বাচ্চা-কাচ্চা আপনাকে মামা বলে ডাকত।তারপর.. ”

” যেভাবে ভাই ভাই করিস এমিতেও মামা বলেই ডাকবে ” ওর কথার মধ্যে বলে উঠলো তূর্য।
আহি বিরক্ত হয়ে বলল,
” আরে কথাটা তো শেষ করতে দিন।”
” প্লিজ কন্টিনিউ ”
” তারপর আমিও আমার স্বামীর বুকের মধ্যে এভাবে শুয়ে থাক….”
মেজাজ গরম হয়ে উঠলো তূর্যের।প্রেয়সীকে রাগাতে গিয়ে নিজেই রেগে গেল। ধমকে উঠে বলল,
” শাট আপ আহি।”
ঠোঁট চেপে হাসি আটকালো আহি। তূর্য ওর হাতের বাঁধন চারগুণ শক্ত করে বুকের মধ্যে চেপে ধরলো মেয়েটাকে। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

” এভাবে পিষে মে’রে ফেলব একদম ”
” আপনি যে বললেন তার বেলা ? ”
” আমি বলেছি বিধায় তোকেও বলতে হবে?”
” হ্যাঁ!আপনি বলবেন কেন? ”
” তুই আজগুবি কোশ্চেন করবি কেন? ”
” আচ্ছা ,আচ্ছা আর করব না। আবার একটু আস্তে ধরুন দম বন্ধ হয়ে গেল তো ” খুব দ্রুত গতিতে কথাটা বলল আহি।তূর্য ঢিলে করলো হাতের বাঁধন।তারপর মিহি কণ্ঠে বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৮

” অনেক বকবক হয়েছে এখন ঘুমাও ”
দিল ,লোকটা দিল !আজকের ঘুমটা কুরবান করে দিল।এরপরেও আর ঘুম আসবে ওর ?’ ঘুমাও ‘ বলার কি এমন দরকার ছিল?
‘ ঘুমা ‘ বললে কি সে ঘুমোতো না? ব’দমাশ লোক!

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৯