প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৭
সাইয়্যারা খান
“তুমি ল্যাগেজ গোছাচ্ছো কেন তুহিন? কোথায় যাচ্ছো?”
“অস্ট্রেলিয়া।”
“আপার কাছে?”
“হুঁ।”
“হঠাৎ? সব ঠিক আছে তো? আমিও কি চলব সাথে?”
তুহিন বিরক্ত হলো। কিছু প্রয়োজনীয় টিশার্ট তুলে ভেতরে রাখলো। চেইনটাও দুপাশ থেকে টেনে মাঝে এনে আটকে দাঁড়ালো সোজা হলো। কোমড় ব্যথা হয়ে গিয়েছে তার। ল্যাগেজ একপাশে রেখে গায়ের টিশার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেললো এক পাশে। পলকের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তুমি বাসায় থাকবে? চাইলে কোথাও ঘুরতে যেতে পারো। আমাকে বলো। আমি গুছিয়ে দিচ্ছি।”
নিজের প্রশ্নের বিপরীতে এমন প্রশ্ন পলক আশা করে নি। দুই পা এগিয়ে এসে তুহিনের ফুলেফেঁপে থাকা বাহুতে হাত রেখে বললো,
“আমি তোমার সাথে চলি?”
“তুমি তো যেতে পারবে না পলক। জানো না তুমি, তোমাকে কেউ পছন্দ করে না। আপাও না।”
“আমি ভুল করেছিলাম তুহিন। এতগুলো বছর হলো। এখন তো মেঝ ভাইয়াও সুখে আছে। তুমি তাদের ফ্ল্যাটে কেন যাও এতো? ওখানে যেও না। মেঝ ভাইয়া রাগ করবেন?”
ভ্রুঁ দুটো ভীষণ সূক্ষ্ম ভাবে নাড়ালো তুহিন যেন সরাসরি ব্যাঙ্গ করলো পলককে। পলক একটু থমকে গেলো। তুহিন ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তোমার ইশারা ইঙ্গিত কোনটাই আমি কম বুঝি না জান। কাম টু মি।”
পলকের জান গলায় চলে এলো। তুহিন কি কিছু ধরে ফেললো? ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পলক নিজ জায়গায় জমে গেলো। তাকে গলাতে এগিয়ে এলো তুহিন। নিজের বাহুবন্ধনীতে আটকে নিলো পলককে। ভীষণ অনুনয় করে বললো,
“আমাকে একটা বাবু দিবে পলক?”
পলকের ভীত মুখেও ঋণাত্মক উত্তরই দেখলো তুহিন। তুহিন অবশ্য রাগলো না বরং নরম স্বরে বললো,
“ইউ নিড মোর টাইম?”
“আই ডোন্ট ওয়ান্ট কিডস।”
“ইয়্যু আর লায়িং পলক।”
“নো তুহিন।”
“ইয়েস।”
“নো।”
তুহিন আস্তে করে ছেড়ে দিলো পলককে। তার চোখমুখ শক্ত হয়ে আসছে। পলকের দিকে তাকিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলে উঠলো,
“এটা কেমন পা গলামো পলক? তুমি সময় চাইতে পারো কিন্তু কখনো বাবু চাইবে না, এটা কেমন কথা? কত বছর হয়েছে বিয়ের? আমি মানি আমি নেশায় ডুবে ছিলাম। ঠিক কি হই নি? হয়েছি তো। আর রইলো আমার নেশার কথা তার জন্য দায়ী কে পলক? তুমি দায় এড়াতে পারবে? তুমি আমাকে আমার ভাইদের চোখে এতটাই ফেলে দিয়েছো যে সুস্থ আমি চোখ তুলে তাকাতে পারতাম না৷ তাদের সাথে কথা বলার জন্য আমার নেশা করা লাগতো। আমার সুস্থ মস্তিষ্ক আমাকে লজ্জায় ফেলে কথা বলতে দিতো না। বড় ভাই সরাসরি বলেছিলেন তোমাকে ছাড়তে। আমি পারি নি। শুধু মাত্র ভালোবাসার কাছে আটকে ছিলাম। তোমাকে ভালোবেসে আমি চরম মূল্য পরিশোধ করেছি পলক। এখন তুমি তামাশা করছো আমার সাথে?”
রেগে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো তুহিন। তার মন শান্ত হলো না। উঠে গিয়ে ধ্রাম করে দরজা লাগিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। পলক দাঁড়িয়ে রইলো নিশ্চুপ হয়ে। তার চোখ দুটো শূন্য। তুহিন যদি জানে পলক এখনো তার বোনের সাথে যোগাযোগ রেখেছে তাহলে কি হবে? সে কি এবার পলককে তালাক দিবে? নাহ্, সে জানবেই না এবিষয়ে।
ব্যারিকেডের দেওয়ার মতো দুই বাহু প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে তৌসিফ। তার বউ একটা টুলের উপর ছোট্ট আরেকটা টুল দিয়ে দাঁড়িয়েছে। আলমারির একদম উপরের তাকে খুঁজছে কিছু। তৌসিফ এতবার না করলো কিন্তু তার বউ শুনলো না। সে তো শুনার মানুষই না। সে হলো ত্যাড়া এক বাদর। পৌষ ঘাড়টা ঘুরিয়ে তৌসিফকে দেখলো একবার। সন্দিহান কণ্ঠে বললো,
“মুখটা ওমন দেখায় কেন?”
তৌসিফ উত্তর দিলো না। মুখ ঘুরিয়ে নিলো। পৌষ অবাক হওয়ার ভান করলো। আশ্চর্য হয়ে বললো,
“আপনারই তো ছোট ভাই।”
“স্টিল…”
থেমে গেলো তৌসিফ। কথা বাড়াতেই ইচ্ছে হচ্ছে না। পৌষ খুঁজে পেলো কাঙ্খিত জিনিস। ছুঁড়ে কাপড়টা বিছানায় দেওয়া মাত্রই তৌসিফ এক হাতে তার কোমড় পেঁচিয়ে ধরলো। ঝট করে নামিয়ে ফেললো সেখান থেকে। এতটাক্ষণ ধরে তার জানটা ঐ উঁচুতে উঠে ছিলো। এখনও তৌসিফের বাহুর মাঝে আটকে পৌষ। দুই কাঁধে হাত দিয়ে একটু ঝুঁকলো পৌষ। তৌসিফের মসৃণ চামড়ার সরু কপালটায় ঠোঁট দাবিয়ে চুমু খেলো। তৌসিফ চোখ বুজে নেয় আরামে। প্রায়সময় এভাবে আদর করে তাকে তার বউ। সেই সময়টা নিতান্তই স্বর্নসময় তৌসিফের জন্য।
“এবার তো নামান আমাকে।”
“মন চাইছে না।”
“হানিমুন তাহলে ঘরেই হোক। আমার সমস্যা নেই।”
“কিন্তু আমার তো আছে হানি।”
তৌসিফ পৌষকে নামালো। ল্যাগেজ গোছানো শেষ তাদের। তৌসিফ লুকিয়ে কিছু রেখেছে সেখানে। তার জীবনে বহুত শখ আহ্লাদ আছে, সেগুলো সে পূরণ করবে এই হানিমুনে। পৌষকে একটু রেস্ট নিতে বলে তৌসিফ স্যালনে চলে গেলো। তার আজ ফুল বডি কেয়ার প্রয়োজন। বউ নিয়ে প্রথম হানিমুনে যাচ্ছে সে, তাকে অবশ্যই আকর্ষণীয় লাগতে হবে। পৌষ জানে না অবশ্য, জানলে তৌসিফের সাথে একদফা ঝগড়া ঝামেলা এখনই হয়ে যেতো।
ফ্লাইটের সময় রাত দুটো। এখন বাজে রাত আটটা। ল্যাগেজ গাড়িতে তোলা হচ্ছে। হেমন্ত ভাই-বোনদের নিয়ে তাদের বিদায় দিতে এসেছে। সবাই বেশ হাসিখুশি। আদিত্য ডিকি বন্ধ করে বললো,
“মেঝচাচ্চু, বেরিয়ে পরো এখন। রাস্তায় জ্যাম। তুমি পোস্তগোলা দিয়ে যাও।”
“ওখান দিয়েই যাব।”
অদি তার হাতে থাকা লিস্টটা তৌসিফের পকেটে ঢুকিয়ে দিলো আলগোছে। তৌসিফ চোখে হাসলো। এগিয়ে এলো পিহার দিকে। চুলের ক্লিপটা খুলে আবার লাগাতে লাগাতে প্রশ্ন করলো সে,
“দুলাভাই কি আনবে পিহার জন্য? পিহার কি চাই?”
“কিছু চাই না দুলাভাই। আপনারা সাবধানে ফিরে আসবেন।”
“চকলেট? কোন বিশেষ খেলনা বা ধরো কোন টেডি?”
“আছে তো।”
“দুলাভাই তবুও জানতে চাইছি পিহা।”
“তাহলে আপনার যেটা ইচ্ছে।”
“ডান।”
পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ইনি, মিনি। পৌষের দুই হাঁটু জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। তৌসিফ ওদের ছাড়িয়ে নিলো। নিজের দুই বাহুতে তুলে আদর করলো যথাযথ। আদুরে স্বরে বললো,
“কি আনবে দুলাভাই?”
“কি আনবে?”
“বলো তোমরা। আপাকে নিয়ে ঘুরতে যাব অনেকদূরে। কি লাগবে?”
দু’জন ভাবলো। দুলাভাই তাদের এভাবেই প্রশ্ন করে ভাবনায় ফেলে দেয়। অন্যকেউ তো জিজ্ঞেস করে না৷ জিজ্ঞেস করে তাদের দুলাভাই। উত্তরগুলো তাদের আবার অজানা৷ মহা মুশকিল বটে। তৌসিফ নিজের গাল পেতে দিলো। এবার তাদের জন্য বিষয়টা সহজ হলো। পেতে দেওয়া গালে দু’জন চুমু খেলো। গলা জড়িয়ে ধরলো। তৌসিফ পুণরায় জানতে চাইলো। ইনি, মিনি আপার দিকে তাকিয়ে রইলো অতঃপর ফট করে বললো,
“মিমি আনবে? মিমি খেতে দেয় না তো। দাঁতে পোকা অয়।”
“আনব তো। একশবার আনব।”
“এথানে আথলে থাব। বাতায় মা মালে।”
“তোর মায়ের গুষ্টি কিলাই৷ মাগনা পেয়েছে যে হুদাই মারে?”
পৌষ ক্ষেপে গেলো। মহিলা বাচ্চা পালতে পারে না। জামাই নিয়ে সারাক্ষণ ইটিশপিটিশ তার৷ হেমন্ত চাপা ধমকালো পৌষকে। পৌষ তেঁতে উঠে বললো,
“আমাকে ধমকাও কেন? ছোট চাচিকে বলতে পারো না? দূর্বলদের প্রতি জুলুম সবসময়।”
জৈষ্ঠ্য আর চৈত্রকে কাঁধ চাপড়ে বিদায় জানালো তৌসিফ। পৌষ অতশত কখনোই করে না। হেমন্তকে একটু হুমকি দিলো শুধু,
“ওদের দেখে রাখবে।”
“পারব না।”
“আমিও তাহলে ঝামেলা পাকাব।”
“তখন দুটো চড় মারব।”
গাড়িতে উঠে বসলো ওরা। ড্রাইভারের সাথে বহু আগেই গাড়িতে উঠেছে তুহিন। তৌসিফ তাকে না নেওয়ার বহুত পায়তারা করতে পারে। তুহিন তা সফল হতে দিবে না কোনভাবেই।
“আপনার সিটবেল্ট ঠিকভাবে বাঁধা আছে কিনা নিশ্চিত করুন।”
সুরেলা এবং খুব গোছানো স্বরে কথাটা বললেন একজন নারী। পৌষের প্লেনে উঠেই খারাপ লাগছে। ভাগ্য সহায় থাকায় তুহিনের সিট তাদের থেকে পেছনে। বিজনেস ক্লাসে থাকায় সুবিধা হয়েছে অনেকটা। তৌসিফ পৌষের কপালে হাত রেখে দেখলো। পৌষ চোখ বুজে পড়ে আছে। প্লেন টেকঅফ করতেই পৌষ মুখ চেপে ধরলো। তৌসিফ তখন সত্যিই ঘাবড়ে গেলো।
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৬
টেকঅফের পর যখন একটু স্থির হলো তখনই ক্রু এগিয়ে এলন। পৌষ বমিটা করেই ফেলেছে, তৌসিফের গায়ে এসেছে কিছুটা। খুঁতখুঁত তৌসিফ নিজেকে নিয়ে নয় বরং সে ব্যাস্ত পৌষকে নিয়ে। ভীষণ ব্যাস্ত হয়ে ক্রুর সাথে পৌষকে পরিষ্কার করলো ও। নিজে পরিষ্কার হয়ে এসে আলগোছে নিজের বুকে আগলে নিলো নেতানো পৌষকে। মেয়েটা ভীষণ দূর্বল হয়ে পড়েছে। কপালের চুলগুলো গুছিয়ে বুকের মাঝে চেপে ধরলো ও। চোখে ভাসছে সুন্দর সময়। কিছু সুন্দর মূহুর্তের সাক্ষী হতে চলেছে তারা শিঘ্রই। তৌসিফ তোরজোর করে সব আয়োজন করে রেখেছে।
