Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩
বন্যা সিকদার

“ভাই তোর বংশের বাতি এখনো ঠিকঠাক আছে নাকি এক লাথিতে সোজা চান্দের দেশে চলে গিয়েছে?
​আরিয়া’নের এই কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল। বাড়ির সবার এই কাণ্ড দেখে ব্যথায় নীল হয়ে যাওয়া উজান একদম তাজ্জব বনে গেল!
​​আর এদিকে এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও মৌ এখনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো লোভাতুর দৃষ্টিতে উজানে’র দিকে তাকিয়ে ছিল। তার এভাবে তাকিয়ে থাকার আসল কারণ ড্রয়িং রুমের বাকিরা না বুঝলেও‚ মেহের কিন্তু ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। মৌ’য়ের এই অস্বাভাবিক আর হাভাতের মতো চাহনিতে উজান নিজেই বেশ বিরক্ত হলো। সে চরম গম্ভীর স্বরে আওড়াল‚

“এই স্টুপিড ওভাবে হা করে তাকিয়ে আছো কেন?
​মৌ এবার ঝট করে মেহেরে’র দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো সরু করে ফিসফিসিয়ে বলল‚ “জানু আমি কি সত্যি ঠিক দেখছি রে? এই বুড়ো খবিশ ওহ্ সরি‚ টমেটো… ধুররর। এই প্রফেসর সাহেব আমার আসল বর?
​মেহের মনে মনে নিঃশব্দে হাসল। এই পাগল মেয়েটার কথার ধরন এমন কেন‚ তার কারণ মেহেরে’র চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। সে মৌ’য়ের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বলতেই মৌ খুশিতে একেবারে উৎফুল্ল হয়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠল।
​”জানু জানু জানু আমার ২৭৫ নম্বর ক্রাশ এখন আমার নিজের বর? আব্বাজান শেষমেশ আমার এই ক্রাশটার সাথেই আমার বিয়ে দিয়েছে? ইয়াহু এখন তো আমার খুশিতে নাগিন ড্যান্স দিতে ইচ্ছে করছে। নাগিনী নাগিনী….

​এই বলেই মৌ কারও তোয়াক্কা না করে নিজের মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ড্রয়িং রুমের মাঝখানেই কোমর দুলিয়ে নাচতে লাগল। তার এই অভাবনীয় কাণ্ড দেখে বাড়ির সবার চোখ চড়কগাছ! সবাই বিস্ময়কর দৃষ্টিতে এই নতুন বউয়ের দিকে তাকিয়ে আছে‚ কেউ ঠিক করে ঘটনা বুঝে উঠতে পারছে না। পাত্র না দেখেই এক প্রকার জেদ আর অভিমান করে উজান’কে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল মৌ। তার বাবা বিয়ের আগে বারবার ছেলের ছবি দেখতে বললেও সে রাগে দেখেনি। আর মেহের সবটা জেনে-শুনেও মৌ’কে একটা বিশাল সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য সত্যিটা গোপন রেখেছিল।
উজান’কে মৌ প্রায় দুই বছর ধরে চেনে। তবে সামনাসামনি চেনা নয়‚ ফেসবুকে উজানে’র একটা ড্যাশিং ছবি দেখেই সে তার ওপর মারাত্মক ক্রাশ খেয়েছিল। আর উজানে’র ওপর ক্রাশ খাওয়ার সংখ্যাটা ছিল ঠিক ২৭৫ নম্বর! দিনে যে কত শ’ জনের প্রতি মৌ ক্রাশ খায়’ তার হিসাব সে নিজেও জানে না। তবে বাকিদের নিয়ে সে মোটেও সিরিয়াস না হলেও‚ উজান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ​ফেসবুকে উজান‚কে সে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ফলো করে। উজানে’র এমন কোনো পোস্ট ছিল না‚ যেখানে গিয়ে মৌ সবার সামনে ‘আই লাভ ইউ’ বলে কমেন্ট করেনি। কোনো মেয়ে যদি ভুল করেও উজানে’র ছবিতে একটা ‘লাভ’ ইমোজি বা প্রশংসার কমেন্ট করত মৌ ডিরেক্ট সেই মেয়ের ইনবক্সে গিয়ে চুলোচুলি আর ঝগড়া বাধিয়ে দিত।

এই দীর্ঘ দুই বছরে উজানে’র সাথে তার মাত্র একবারই কথা হয়েছিল। যখন উজান বিরক্ত হয়ে টেক্সট করেছিল। কেন মৌ সবার সাথে ঝগড়া করে। এরপর মৌ শত শত মেসেজ দিলেও উজান আর কোনোদিন তা সিন পর্যন্ত করেনি। ​মৌ এখনো মনের সুখে নেচেই চলেছে। মেহের তাকে টেনে ধরে থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে ফিসফিসিয়ে বলল‚
“মৌ প্লিজ এবার থাম বইন। সবাই হাঁ করে দেখছে তোকে!
​”দেখুক তাতে আমার কী? ফাইনালি আমি আমার ২৭৫ নম্বর ক্রাশকে পার্মানেন্টলি পেয়ে গিয়েছি‚ আজ আমি নাচবই।
​মৌ এতটাই এক্সাইটেড যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরিফুল চৌধুরী ওরফে নিজের শ্বশুরের হাতটাই খপ করে ধরে গোল হয়ে নাচতে শুরু করল এবং সাথে তাল মিলিয়ে গাইতে লাগল।

“ধুম্মা চলে ধুম্মা চলে উজানে’র নানি খ্যাতার তলে। মূলা খাইয়া বোম মারে। লালা লা লা লায়য়য়য়য়….
​নতুন বউয়ের মুখে এমন অখাদ্য আর অদ্ভুত মার্কার গান শুনে উজান হার্ট অ্যাটাক হওয়ার দশা! সে নিজের বাবা-মায়ের দিকে চরম কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। উজান বরাবরই খুব গম্ভীর আর কম কথার মানুষ অথচ এই আজব বিয়ের চক্করে পড়ে আজ এক রাতেই তাকে জীবনের সবচেয়ে বেশি কথা বলতে হয়েছে। ছেলের এই রাগান্বিত আর থমথমে ফেস দেখে মা মৌসুমী চৌধুরী একটু ভয় পেয়ে এগিয়ে এলেন এবং সান্ত্বনার সুরে বললেন‚ “বাবা এমন করে রাগ নিয়ে তাকাচ্ছিস কেন? মেয়েটা কিন্তু মনে মনে অনেক ভালো রে।
​“ভালো মাই ফুট। একটা পাবনা পাগল গারদ থেকে পালিয়ে আসা বিড়ালের বাচ্চার সাথে তোমরা আমাকে ধরে-বেঁধে বিয়ে দিয়েছ। সে নিজে তো আস্ত একটা পাগল সাথে আমাকেও আজ রাতারাতি পাগল বানিয়ে ছাড়বে। আমার সাথে সাথে আমার নানির গুষ্টিও উদ্ধার করে ছাড়ল‚ ডিসগাস্টিং! এই স্টুপিড মেয়ে যেন ভুলেও আজ আমার রুমে না আসে‚গট ইট?

​এই বলেই উজান চরম রাগে গজগজ করতে করতে বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। ​উজান চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মৌ’য়ের নাচের ভূত মাথা থেকে নামল। সে চারদিকে তাকিয়ে উজান’কে না দেখে গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল‚ “শ্বশুর আব্বা আমার হ্যান্ডসাম প্রফেসর সাহেব কই গেল?
​আরিফুল চৌধুরী ততক্ষণে মৌ’য়ের এই ঝোড়ো হাওয়ার পাল্লায় পড়ে একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছেন। তিনি ধপাস করে সোফায় বসে পড়ে নিজের কপাল মুছতে লাগলেন। মৌ এবার সোজা শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোমর বাঁকিয়ে বলল‚ “এই শাশুড়ি আম্মা আমার বরটা হুট করে কই পালাল?
​মেহের এবার আর সহ্য করতে না পেরে এক প্রকার জোর করে টেনে মৌ’কে আড়ালে নিয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিচু করে ধমকের সুরে বলল‚ “বইন তুই এসব কী বলছিস? মাথা ঠিক আছে তোর? এটা আমাদের বা ফুপিদের বাসা নয়। এটা তোর শ্বশুরবাড়ি ‚ প্লিজ তোর এই বাচ্চামো এবার বন্ধ কর। আমি বুঝতে পারছি তুই তোর ক্রাশকে বর হিসেবে পেয়ে কতটা হ্যাপি কিন্তু তোর এই অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে বাড়ির সবাই তোকে অলরেডি পাগল ভাবতে শুরু করেছে। আর এত ‘বর বর’ করতে হবে না। সে নিজের রুমে গেছে। এখন তুইও সোজা নিজের রুমে গিয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড় আর একটা কথাও যেন তোর মুখ থেকে না বের হয়।

​মেহেরে’র এমন বাঘা আর রাগী দৃষ্টি দেখে মৌ এবার কিছুটা দমে গেল। সে নিজের ঠোঁট কামড়ে একটা কিউট হাসি দিল। তারপর ভারী বেনারসি শাড়িটা দু-হাতে আলতো করে উঁচু করে ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে পেছন ফিরে চেঁচিয়ে বলল‚ ​”শাশুড়ি আম্মা মেনি মেনি থ্যাংকস আপনার এই ড্যাশিং‚ হ্যান্ডসাম ছেলেকে আমার কপালে জুটিয়ে দেওয়ার জন্য। কাল সকালে আমার আব্বাজানকে ফোন দিয়ে একটু বলে দিয়েন‚ তার মেয়ে এই বিয়েতে বেজায় খুশি হয়েছে। আব্বাজানকে মন থেকে একরাশ আই লাভ ইউ!
​আর এক মুহূর্তও সেখানে দেরি করল না মৌ‚ বরের রুমে যাওয়ার জন্য শাড়ি সামলে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। এদিকে ড্রয়িং রুমে বাকিরা সবাই হা হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল।

​রুমে ঢুকেই আচমকা থমকে গেল মৌ। পুরো চারদিক চোখ বুলিয়ে দেখল উজান রুমে নেই। মুহূর্তের মধ্যে মৌ’য়ের মুখটা শুকিয়ে চুন হয়ে গেল। সে ভাবল‚ ড্রয়িং রুমের ওই তুলকালাম কাণ্ডের পর রাগ করে উজান হয়তো আবারও রুম ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। যেহেতু এই বিশাল রাজপ্রাসাদ সম্বলিত বাড়ির কোনো কিছুই তার চেনা নয়‚ তাই সে আর একা একা রুম থেকে বের হওয়ার সাহস পেল না। অভিমানে ঠোঁট উল্টে‚ গাল দুটো রসগোল্লার মতো ফুলিয়ে ধপাস করে বিছানার মাঝখানে গিয়ে বসে পড়ল সে। ​
এর কিছুক্ষণ পরেই বাথরুমের দরজা খুলে উজান কোমরে একটা সাদা টাওয়াল জড়িয়ে বেরিয়ে এলো। তার ভেজা চুল আর মাথা থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছে। ড্রয়িং রুমের ওই চরম অপমানের পর নিজের মাথা ঠান্ডা করতে মাঝরাতেই তাকে শাওয়ার নিতে হয়েছে। কিন্তু বের হয়েই যখন সে বিছানার ওপর লাল টুকটুকে বেনারসি পরা মৌ’কে ওভাবে গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে দেখল‚ তখন রাগে তার কপালের রগগুলো দপদপ করে ফুলে উঠল। মাথাটা যেন মুহূর্তের মধ্যে ঝিমঝিম করে উঠল। যে বিয়েটাকে সে মনের ভুলেও স্বীকার করে না অথচ সেই বিয়ের মেয়েটা তার বিছানা দখল করে বসে আছে। ​উজান আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। বাজখাঁই মেজাজে চেঁচিয়ে উঠে বলল„

“হেই স্টুপিড গার্ল তুমি এখানে কেন এসেছ? এক্ষুনি আমার রুম থেকে বের হও।
​এতক্ষণ পর নিজের ক্রাশ-মার্কা জামাইয়ের কণ্ঠস্বর পেয়ে মৌ’য়ের ভেতরের সব দুঃখ এক পলকে উধাও। খুশিতে একেবারে গদগদ হয়ে সে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে সোজা উজানে’র সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এমনিতেই মৌ’কে দেখে উজানের’ পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল। তার ওপর মেয়েটা এখন এক হাত দূরত্বের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাব করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। উজান আবারও সিংহের মতো ধমকে উঠল।
​“স্টুপিড গার্ল কথা বলছ না কেন? হোয়াই আর ইউ সাইলেন্ট?
​মৌ সেদিকে পাত্তাই দিল না। উজানে’র ভেতরের রাগ না দেখে সে তার ভেজা চুলের সুঠাম অবয়ব দেখে মুগ্ধ হয়ে দুই গালে হাত দিয়ে আলতো করে আওড়াল‚ “সো কিউট!…

​মৌ’য়ের মুখে এই কথা শুনে উজানে’র মুখের রঙ পাল্টে গেল। মেয়েটাকে সে জানপ্রাণ দিয়ে ধমকাচ্ছে অথচ সে রাগ গায়ে মাখা তো দূর‚ উল্টো তাকে দেখে ফ্লার্ট করছে! এই অবাধ্য মেয়ের সাথে কথা বলাই বৃথা। উজান নিজের বিরক্তি চেপে ধরে নিজেই একপাশ হয়ে সরে দাঁড়াল। এই ডানপিটে মেয়েটার চক্করে মাঝরাতে তাকে ঠান্ডা পানিতে শাওয়ার নিতে হয়েছে। সে আর নতুন করে ঝগড়া করে এনার্জি নষ্ট করতে চায় না। সে ক্যাবিনেট থেকে দ্রুত একটা ব্ল্যাক টি-শার্ট বের করে গায়ে জড়িয়ে নিল।
​কিন্তু মৌ এখনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার দিকে তাকিয়েই আছে। হঠাৎ করেই সে ঘোর কাটিয়ে উজান নিজের রুমের ভেতরে যেদিকে পা বাড়ায়‚ মৌও ঠিক ছায়ার মতো তার পিছু পিছু সেদিকেই যায়। উজান ডানে গেলে মৌ ডানে যায়‚ উজান বাঁয়ে গেলে মৌ বাঁয়ে। তা দেখে রাগে একেবারে বোম ফাটল উজানের। সে ঝট করে পেছন ফিরে কটমট করে তাকিয়ে গর্জে উঠল‚

“ইডিয়টের মতো আমার পিছু পিছু ঘুরছো কেন? প্রব্লেম কী তোমার?
​মৌ শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে একগাল হেসে বলল‚ “আরে ক্রাশ বর আপনি এখনো আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি মৌ ‚মৌ ‚’তাসফিয়া মৌ! যে আপনাকে ফেসবুকে রোজ কম হলেও একশোটা করে মেসেজ পাঠাতাম। ভুলেই গেলেন আমায়?
​কথাটা কান দিয়ে মগজে পৌঁছাতেই উজান যেন আকাশ থেকে পড়ল! সে চোখ দুটো সরু করে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল। মৌ’কে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিজের কপাল চাপড়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল‚ “শেষমেশ একটা স্টুপিড গার্লই আমার কপালে জুটল। তোমার ওই পাগলামির জন্য ফ্রেন্ড সার্কেলের কারও সাথে আমি লজ্জায় কথা বলতে পারি না। ফ্রেন্ডলিস্টের যার সাথেই আমার ছবি দেখেছো‚ তার ইনবক্সে গিয়েই তুমি তুমুল ঝগড়া বাধিয়েছ! আর এখন তুমি পার্মানেন্টলি আমার রুমে বউ সেজে চলে আসলে?
​মৌ এবার লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতা করলো। শাড়ির পাড় দিয়ে মুখটা সামান্য আড়াল করে মাথা নিচু করে বলল, “আমি ওদের সাথে এমনি এমনি ঝগড়া করেছি নাকি? ওই ডাইনিগুলো কেন আপনাকে কমেন্টে আর ইনবক্সে ওভাবে লাভ ইমোজি দেবে? আমার ক্রাশের দিকে অন্য কেউ তাকাবে এটা আমি বেঁচে থাকতে হতে দেব না।
​মৌ’য়ের লজিক শুনে উজান নিজের চুলে মুঠি টেনে ধরে চিৎকার করে বলল‚ “জাস্ট শাট আপ!

​ব্যাস‚ বরের ধমক শুনে মৌ লক্ষ্মী মেয়ের মতো চট করে নিজের ঠোঁটের ওপর আঙুল দিয়ে মুখ বন্ধ করে ফেলল। উজান নিজের মাথা চেপে ধরে একটু শান্তির খোঁজে বেলকনির দিকে গেল। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়‚ সেখানে গিয়েও বিপদ তার পিছু ছাড়ল না। মৌ ঠিক ছায়ার মতো সেখানেও তার পেছনে এসে হাজির হলো। ​উজান এবার চরম গম্ভীর স্বরে দুই হাত বুকের কাছে গুটিয়ে আওরায়‚ “হোয়াই আর ইউ ফলোইং মি এগেইন?
​মৌ মুখে আঙুল রেখেই চোখ দুটো বড় বড় করেই বলল‚ “আপনি কত সুন্দর।
উজান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গর্জন তুলল। “এক থাপ্পড় দিয়ে তোমার সব কটা দাঁত ভেঙে দেবো। বয়স কত তোমার‚ হ্যাঁ? কোন ক্লাসে পড়?
​মৌ নিজের বুক টান টান করে বেশ দেমাকের সাথে উত্তর দিল„ “আমার বয়স সতেরো। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।

​উজানে’র চোখ জোড়া এবার কপালে উঠল। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল‚ “পুঁচকে একটা মেয়ে।
​মৌ নিজের কোমর দুই হাত দিয়ে ধরে মুখটা বেঁকিয়ে তেজ দেখিয়ে প্রতিধ্বনিত করে। “আমি মোটেও পুঁচকে নই হুহ! আমি অনেক বড় হয়েছি।
উজান সরু চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো। “তা দেখেই বুঝতে পারছি। তা কোন গ্রুপ নিয়েছো?
মৌ খানিকটা ভান নিয়ে উওর দিল। “এটা আবার কেউ জিজ্ঞেস করে নাকি? আমি খুবই ইনটেলিজেন্ট স্টুডেন্ট তাই সায়েন্স নিয়েছি।
“তাহলে নিউটনের প্রথম সূত্রটা বলো?
মৌ যেন আকাশ থেকে পরলো। পড়াশোনায় সে বরাবরই ডাব্বা। তবুও সে সায়েন্স ছাড়া কোনোটি নেবে না তাই কলেজে গিয়েও সায়েন্স নিয়েছে। সে পদার্থ বিজ্ঞান কেন? শুধু বিজ্ঞান পড়তে গিয়েও দাঁত ভেঙে যাওয়ার উপক্রম আর এই লোকটা তাকে নিউটনের সূত্র ধরছে ভাবা যায়। মৌ উপরে তাকিয়ে দু-হাত দিয়ে মোনাজাত ধরে বলতে লাগলো।
“মাবুদ তুমি আমাকে কোনো জালিমের হাতে তুলে দিলে? বাসর রাতে রোমাঞ্চ না করে কোন দেশের ইবলিশ শয়তানের সূত্র বলতে বলছে। এর থেকে তুমি আমায় তুলে নাও।
​উজান আড়ালে মুচকি হাসল। মেয়েটার ওপর সে চরম বিরক্তও হচ্ছে‚ আবার তার এমন পাগলাটে কথাবার্তায় না হেসেও পারছে না। ঠিক তখনই মৌ নিজের ঠোঁট টিপে ধরে ফিসফিসিয়ে হাসতে হাসতে আচমকা বলে উঠল‚

“আই লাভ ইউ প্রফেসর সাহেব…!
​হুট করে এমন বাণ শুনে উজান খকখক করে কাশতে শুরু করল। নিজের হ্যান্ডসাম লুক আর প্রফেশনের কারণে জীবনে সে মেয়েদের কাছ থেকে অনেক প্রপোজাল পেয়েছে সত্যি কিন্তু বাসর রাতে ওভাবে মুখের ওপর হুটহাট কেউ প্রপোজ করতে পারে‚ তা তার জানা ছিল না। তার ওপর এই পিচ্চি মেয়েটার বয়স তার চেয়ে প্রায় অর্ধেক। উজান ভাবল‚ এখন যদি সে একটুও স্বাভাবিকভাবে কথা বলে তবে এই অবাধ্য মেয়েটা মাথায় উঠে নাচবে। তাই সে নিজের নাক সিঁটকে চরম রাগান্বিত কণ্ঠে ধমকে উঠল।
“চুপ কর ইডিয়েট। নাক টিপলে যার দুধ বের হয় সে কিনা ভালোবাসি বলে। শোনো মেয়ে‚ পিচ্চি পিচ্চির মতো থাকবে নয়তো বাসর রাতে ম্যাথ করাবো।
​এতক্ষণ সব ঠিকঠাকই ছিল কিন্তু এই গভীর রাতে রোমান্সের বদলে হুট করে ‘ম্যাথ’ এর কথা শুনে মৌ’য়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! গণিতের নাম শুনলেই তার গায়ে জ্বর আসে। সে দ্রুত নিজের সব কটা দাঁত কেলিয়ে একটা কাঁচুমাচু হাসি দিয়ে বলল‚ “এই না না আমি তো জাস্ট এমনি ইয়ার্কি করেছি! ম্যাথ করতে যাবো কোন দুঃখে তবে….

​মৌ নিজের কথা শেষ করার আগেই উজান গটগট করে পা ফেলে সোজা রুমের ভেতর চলে গেল। মৌ বাইরে দাঁড়িয়ে মুখটা বাঁকিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল।
​”খবিশ একটা। শেয়ালের সামনে আস্ত একটা মুরগি ঘুরঘুর করছে অথচ তার চোখে পড়ছে না। যেদিন নিজে পিরিত করতে আমার পেছনে ঘুরঘুর করবে‚ সেদিন তোকে লাথি মেরে সোজা উগান্ডায় পাঠিয়ে দেবো হুহ।
​উজানে’র পিছু পিছু মৌও রুমে ঢুকল। সে এবার উজানে’র সামনে গিয়ে ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু উজান তার দিকে এক পলক তাকানোরও প্রয়োজন মনে করল না। সে বেড থেকে নিজের একটা বালিশ টেনে নিল। তারপর মৌ’য়ের পাশ কাটিয়ে সোজা গিয়ে কোণার সোফাটায় ধপাস করে শুয়ে পড়ল। ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করার আগে সে বরাবরের মতো গম্ভীর স্বরে শেষ হুঁশিয়ারি দিল।

​“এই স্টুপিড গার্ল! তুমি ওই বিশাল বিছানায় ঘুমাবে আর আমি এখানে সোফায়। রাতে যদি কোনো কারণে আমার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছ‚ তবে একটা থাপ্পড় দিয়ে মাঝরাতেই রুম থেকে বের করে দেবো মাইন্ড ইট! না তুমি আমার কেউ হও‚ আর না আমি তোমার। সো আমার থেকে সবসময় অন্তত দশ হাত দূরত্ব বজায় রেখে চলবে‚ বুঝতে পেরেছ?

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ২

​মৌ উজানে’র দিকে মুখটা কুঁচকে এক বিশ্রী ভেংচি কাটল। কিন্তু উজান হুট করে চোখ খুলে যেই না তার দিকে একটা রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করল‚ মৌ আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। সে এক দৌড়ে বিছানায় গিয়ে কমফোর্টারটা সারা গায়ে জড়িয়ে নিল। সারাদিনের ধকলের পর বিছানার নরম স্পর্শ পেতেই মৌ মুহূর্তের মধ্যে গভীর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪