Home প্রফেসর উজান চৌধুরী প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৪
বন্যা সিকদার

​ভোরের মৃদু আলো এসে চোখে-মুখে পড়তেই বিরক্তি নিয়ে ঝট করে চোখ বন্ধ করে নিল উজান। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে মাথাটা চেপে ধরল সে। মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে। ঠিক তখনই শরীরের ওপর কেমন যেন একটা অতিরিক্ত ভার অনুভব করল উজান। চোখ মেলে সামনে তাকাতেই সে চমকে উঠল‚ তার হৃৎস্পন্দন যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল! ​সামনে এ কী দৃশ্য। মৌ তাকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে দু-হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। সোফার এক চিলতে জায়গাতেই মেয়েটা কখন যে এসে তার ওপর এভাবে ঘুমিয়ে আছে উজান টেরই পায়নি। রাগে উজানে’র ফর্সা মুখ মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে গেল। সে বিদ্যুৎ গতিতে মৌ’কে নিজের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।

​হুট করে ঘুমের ঘোরে এমন অতর্কিত ধাক্কা পাওয়ায় ঘুমন্ত মৌ’য়ের পুরো ব্যাপারটা বুঝতে বেশ খানিকটা বেগ পেতে হলো। সোফা থেকে সটান মেঝেতে পড়ে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল সে। শাড়ির আঁচলটা একপাশে লুটিয়ে পড়েছে। মৌ নিজের কোমরটা চেপে ধরে ঠোঁট ফুলিয়ে উজানে’র রাগান্বিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ভোর হতে না হতেই লোকটার কাছ থেকে এমন অমানবিক আচরণ পেতে হবে‚ তা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। মৌ কোনো রকমে টাল সামলে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল তবে চোখ থেকে এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে আবারও মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিলে উজান এবার নিজের অজান্তেই বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে গিয়ে তার কোমর ধরে তাকে সামলে নিল। পরক্ষণেই নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বরাবরের মতো বাজখাঁই মেজাজে চেঁচিয়ে উঠল।

​“এই বেয়াদব মেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াও। আর তুমি কোন সাহসে মাঝরাতে আমার বুকের ওপর এসে শুয়েছিলে হ্যাঁ? কাল রাতেই তোমাকে কড়া ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম না যে ভুলেও আমাকে টাচ করবে না?”
​উজানের এমন ধমকের চোটে মৌ’য়ের চোখের সব ঘুম এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে নিজের শাড়িটা টেনেটুনে কোনোমতে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে একরাশ নির্বাক দৃষ্টি। সোফা থেকে আচমকা শক্ত মেঝেতে ফেলে দেওয়ার কারণে তার কোমরে বেশ চোট লেগেছে‚ প্রচন্ড ব্যথা করছে। কিন্তু সেই শারীরিক ব্যথা সে মুখ চেপে সহ্য করে নিলেও। সাতসকালে উজানে’র এমন নির্মম ব্যবহার তার মনটাকে তছনছ করে দিল। সে অভিমানী মুখ করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল‚

​”এমন করে সবসময় কেন বকেন বলুন তো? আমি কি ইচ্ছে করে আপনার সোফায় এসেছিলাম নাকি? রাতে বাইরে প্রচণ্ড জোরে মেঘ ডাকছিল আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তাছাড়া আমাদের তো এখন বিয়ে হয়েছে আর আমি তো আপনাকে সত্যি সত্যি অনেক ভালোবাসি। সেই হিসেবে নিজের বরকে একটু জড়িয়ে ধরে ঘুমাতেই পারি‚ তাই না? এতে এত মহাভারত অশুদ্ধ কী হলো?
উজান তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল‚ “জাস্ট শাট আপ। বিয়ে হয়ে গিয়েছে মানেই যা ইচ্ছে তাই করবে? লিসেন টু মি কেয়ারফুলি‚ নেক্সট টাইম একদম আমার ধারেকাছে আসার চেষ্টা করবে না। আমি ঘৃণা করি তোমার মতো মেয়েদের। যাদের কাছে ভালোবাসা মানে সস্তা একটা খেলা। যখন ইচ্ছে হলো ইমোজি পাঠালাম‚ আর যখন ইচ্ছে হলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলাম। আই হেট লাভ অ্যান্ড আই হেট ইউ। তোমাকে আমি কোনোদিন বউ হিসেবে মানি না আর না কোনোদিন মানবো। বুঝতে পেরেছো?

​এই বলেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দ্রুত রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল উজান। তার চলে যাওয়ার দরজার দিকে মৌ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার চোখের কোণটা অশ্রুতে ভরে উঠেছে। মৌ মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল। উজান তাকে বউ হিসেবে মানছে না সেটা বুঝল। উজান তার ২৭৫ নম্বর ক্রাশ সেটাও সত্য। কিন্তু তার মানে কি এই যে মৌ উজান’কে সত্যি সত্যি ভালোবাসে না? যদি মনে ভালোবাসা নাই থাকত‚ তবে গত দুটো বছর ধরে উজানে’র পাশে অন্য কোনো মেয়েকে দেখলে মৌ’য়ের বুকে কেন এত তীব্র হিংসা হতো? কেন সে অন্য মেয়েদের সহ্য করতে পারত না? কেন দিনে শত শত মেসেজ করে নিজেকে এভাবে উজানে’র সামনে পাগল প্রমাণ করত? কেন ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলত? এসব কি শুধুই একটা পুঁচকে মেয়ের সাময়িক মোহ নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে খাঁটি গভীর কোনো ভালোবাসা?
​মৌ চুপ করে কিছুক্ষণ রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। বাপের বাড়িতে সে বড্ড আদরে‚ রাজকন্যার মতো মানুষ হয়েছে। তাই খুব ছোটখাটো কড়া কথাও তার মনের ভেতর তিরের মতো এসে বিঁধে। তাকে ভেতর থেকে রক্তাক্ত করে দেয়। অথচ পাথরের মতো শক্ত এই উজান চৌধুরী তার সেই নরম ছোট্ট মনটা একটুও বুঝতে পারল না। মৌ নিজের চোখের পানিটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল। তারপর জোর করে মুখে একরাশ হাসি ঝুলিয়ে নিজের জামা নিয়ে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে পড়ল।

​প্রায় আধা ঘণ্টা পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে সে বাইরে বেরিয়ে এলো। শাওয়ার নেওয়ার পর তার ভেজা চুলগুলো থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরে মেঝেতে পড়ছে। সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিজের চুল আঁচড়ানোর জন্য চিরুনিটা হাতে নিল কিন্তু কিছুতেই তা গুছিয়ে উঠতে পারল না। চুলগুলো তার কোমর অবধি ছড়ানো‚ ঘন কালো কৃষ্ণচূড়ার মতো লম্বা। লম্বা চুল মৌ’য়ের নিজের খুব একটা পছন্দ নয়‚ আর সে নিজে কখনো নিজের চুল বাঁধতেও পারে না। বাপের বাড়িতে তার চুলের সব রকম যত্ন মেহের আর তার ফুপাতো ভাই সাব্বির নিয়ে থাকে। সাব্বির, মেহের আর মৌ একই কলেজে পড়াশোনা করে। যেখানে সাব্বির মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। অভিভাবকের মতো এই দুই পিচ্চি বোনকে সবসময় চোখে চোখে আগলে রাখাই সাব্বিরে’র প্রধান কাজ।

​মৌ নিজের অবাধ্য চুল কিছুতেই ঠিক করতে না পেরে চিরুনিটা ছুড়ে ফেলে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল। ঠিক এর কিছুক্ষণ পরেই উজান গম্ভীর মুখে রুমে ঢুকল। মৌ’কে ওভাবে চুপচাপ শান্ত হয়ে বিছানায় বসে থাকতে দেখে উজানে’র জোড়া ভ্রু কুঁচকে গেল। মেয়েটার তো একটুও শান্ত হয়ে বসে থাকার কথা নয়! যে মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে পা দিতে না আসতেই মাঝরাতে এত বড় তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে বসে থাকে‚ সে অন্তত এতটা শান্ত থাকার পাত্রী নয়।
উজান মৌ’য়ের দিকে আর মনোযোগ না দিয়ে নিজের মতো করে রেডি হতে লাগল। একটা অফ-হোয়াইট শার্ট পরে সে বাইরে যাওয়ার জন্য একদম প্রস্তুত। ​হঠাৎ করেই মৌ বিছানা থেকে উঠে সোজা উজানে’র সামনে গিয়ে গাল ফুলিয়ে দাঁড়াল। তবে এবার আর উজান রেগে গেল না বরং তার চোখ-মুখের শান্ত রূপ দেখে বেশ শীতল ও নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল‚

কী চাই তোমার?
​মৌ চোখের পলক না ফেলে বলল‚ “আমার তো জীবনভর শুধু আপনাকেই চাই। তবে এখন শুধু আমার এই ভেজা চুলগুলো একটু আঁচড়ে দেবেন প্লিজ? আমি নিজে চুল আঁচড়াতে পারি না।
​উজানে’র চোখ জোড়া কপালে উঠল‚ “হোয়াটটট? এত বড় হয়েছ অথচ এখনো নিজের চুল আঁচড়াতে পারো না?
​মৌ মুখটা একটু বাঁকিয়ে নিলো। “কই বড় হলাম? আপনিই তো আমায় সবসময় পুঁচকে আর বিড়ালের বাচ্চা ভাবেন। তাহলে আমার চুলগুলো একটু ঠিক করে দিন না প্লিজ? আমি মেহেরে’র কাছেই যেতাম, তবে আমার মিষ্টি বোনটা এখন একটু আরাম করে ঘুমাচ্ছে। তাই ডাকতে ইচ্ছে হলো না। আর জানেন‚ আমার বোনটা গত পাঁচটা বছর ধরে একটা রাতও ঠিক করে ঘুমাতে পারে না। ঘুমাতে গেলেই সেই কালো‚ অন্ধকার দিনটার কথা ওর বারবার মনে পড়ে যায়। তখন ও ভেতরে ভেতরে বড্ড কষ্ট পায় কিন্তু বাইরে কাউকে নিজের কষ্টটা বুঝতে দেয় না। সেই অভিশপ্ত অন্ধকার দিনটার জন্যই মেহের একাধারে নিজের বাবাকে হারাল আর তার কিছুদিন পরই নিজের মা-কেও হারিয়ে পুরোপুরি একা হয়ে গেল। আমার জানুটা আগে এমন চুপচাপ ছিল না জানেন? ও আগে কত দুষ্টুমি করত‚ সারাক্ষণ হাসত! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ওর জীবনের সব আনন্দ বদলে গিয়েছে। আমার সেই পুরনো জানুটা আর আগের মতো নেই..।

​কথাগুলো বলতে বলতে মৌ’য়ের চোখ বেয়ে আপনা-আপনিই দু-ফোঁটা নোনা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। ​মৌ’য়ের কথা শুনে উজানে’র মনটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। সে নিজেও বিয়ে বাড়ি থেকে লক্ষ্য করেছে‚ মেহের মেয়েটা ভীষণ চুপচাপ স্বভাবের। কারও সাথে খুব একটা কথা বলে না‚ সবসময় একটা দূরত্ব বজায় রাখে। তাকে আর ইফাত’কে দেখলে তো মেয়েটা সোজা দশ হাত দূর দিয়ে হেঁটে চলে যায়। কিন্তু কেন এমন করে তা উজান নিজেও জানত না। বিয়ের দিন যখন সবাই আলো আর বাজনার মাঝে আনন্দ করছিল্ তখন মেহেরকে সে ছাদের এক কোণায় একা একা বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কান্না করতে দেখেছিল। উজান তখন মেহেরে’র কাছে গিয়ে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেও মেহের তাকে এড়িয়ে গিয়ে একটা কথাও বলেনি।

​হঠাৎ উজান কৌতূহল সামলাতে না পেরে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল‚ “কী এমন হয়েছিল মেহেরে’র লাইফে?
​উজানে’র প্রশ্নে মৌ’য়ের এবার ঘোর কাটল। সে বুঝতে পারল আবেগের বশে সে মেহেরে’র গোপন কষ্টের কথা মুখ ফস্কে বলে ফেলেছে। সে উজানে’র দিকে এক পলক তাকিয়ে তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়িয়ে বলল‚ “না মানে কিছু না।

​উজান বুঝতে পারল মৌ সেই অন্ধকার দিনের কথা আর বিস্তারিত বলতে চায় না তাই সে আর জোরাজুরি করল না। তবে সে আলতো করে মৌ’য়ের হাত ধরে তাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এনে দাঁড় করাল। টেবিল থেকে হেয়ার ড্রায়ারটা হাতে নিয়ে সে পরম যত্নে মৌ’য়ের ভেজা চুলগুলো শুকিয়ে দিতে লাগল। মৃদু বাতাসে মৌ’য়ের অবাধ্য লম্বা চুল গুলো বারবার উড়ে এসে উজানে’র মুখে আছড়ে পড়ছিল। অথচ আশ্চর্য বিষয় উজানে’র এখন আর বিন্দুমাত্র বিরক্তি লাগছিল না! বরং তার হৃদয়ের গভীর কোণে কেমন যেন এক অদ্ভুত‚ অচেনা অনুভূতির সৃষ্টি হতে লাগল। এই অনুভূতিটা তার জীবনের অন্য বসন্তের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন‚ একদম নতুন।
​চুল শুকানো শেষ হলে উজান চিরুনি দিয়ে অত্যন্ত যত্ন সহকারে মৌ’য়ের মাথায় একটি সুন্দর খোঁপা করে দিল এবং আয়নায় মৌ’য়ের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে অবচেতনভাবেই মনে মনে একটু মুচকি হাসল। বরের হাতের সেই কোমল স্পর্শ আর আয়নায় তার মুচকি হাসি দেখে মৌ’য়ের বুকটা ধক করে উঠল। সে ভীষণ লজ্জা পেয়ে নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা লুকিয়ে দ্রুত পা ফেলে কক্ষ ত্যাগ করে নিচে চলে গেল। আর উজান মৌ’য়ের লজ্জামাখা হাসি দেখে শব্দ করে হাসলো।

​সিঁড়ি বেয়ে নিজের অফ-হোয়াইট শার্টের হাতা দুটো কনুই অবধি ফোল্ড করতে করতে নিচে নেমে আসছে উজান। ড্রয়িং রুমে সোফায় বসা মৌ তার দিকে তাকিয়ে নিজের এক হাত দিয়ে মুখ চেপে মিটিমিটি হাসছে। ডাইনিং টেবিলে তখন শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরী পরম আদরে মৌ আর মেহের’কে নিজ হাতে খাবার তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন। আজ যেহেতু চাঁদ রাত আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই খুশির ঈদ‚ তাই মেহের আজ বিকেলেই নিজের ফুঁপির বাসায় চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু এই চৌধুরী বাড়ির কেউ তাকে একা একাকী সেই বাসায় ফিরে যেতে দেয়নি। বাড়ির কর্তা আরিফুল চৌধুরী মনে মনে সিদ্ধান্তই নিয়ে রেখেছেন মেহের’কে আর ওর ফুপির বাসায় রেখে কষ্ট দিয়ে পড়াশোনা করাবেন না। এখন থেকে ও এই বাড়িতেই সবার সাথে থাকবে। যেহেতু আরিফুল চৌধুরীদের দুই ভাইয়ের কোনো কন্যাসন্তান নেই তাই ঘরের বউমা তুবা, মৌ আর মেহেরে’র প্রতি তারা এক অন্যরকম পিতৃত্বের টান অনুভব করেন। বাড়ির বড় বউ তুবা একপাশে বসে আগামীকালের ঈদের সকল জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে।

​ঠিক তখনই সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে মৌ চট করে শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরীর হাতে একটা আলতো খোঁচা দিল উজান’কে কিছু বলার জন্য। মৌসুমী চৌধুরী মৌ’য়ের মনের ভাব বুঝতে পেরে মুচকি হেসে উজানকে উদ্দেশ্য করে ডেকে উঠলেন‚ “উজান বাবা সকাল সকাল রেডি হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
​উজান ঘাড় বাঁকিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল। মৌ’কে ওভাবে চোরের মতো মুখ টিপে হাসতে দেখে তার মগজে প্রচন্ড রাগ চড়ে গেল কিন্তু মায়ের সামনে সে নিজের রাগ প্রকাশ না করে শান্ত গলায় বলল„
“একটু ভার্সিটি যাচ্ছি আম্মু। কোনো দরকার ছিল?
​”দরকার থাকবে না কেন? আজ বাদে কাল ঈদ‚ ঘরের মেয়েদের ঈদের শপিং করিয়ে দিতে হবে না? তুই গিয়ে ওদের সাথে করে শপিংমল থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আয়।
​উজান নিজের বিরক্তি চেপে বলল‚ “সেটা আমাকে বলছ কেন আম্মু? তুমি‚ তুবা ভাবি আছে। তোমরা সবাই মিলে গিয়ে শপিং করে এসো। আমার অনেক কাজ।
​মৌসুমী চৌধুরী এবার একটু কড়া গলায় বললেন‚ “আমরা গিয়ে করে আসব মানে কী? চুপচাপ ঘন্টাখানেকের মধ্যে ভার্সিটির কাজ শেষ করে বাসায় চলে আসবি। তারপর তোরা সবাই মিলে একসাথে শপিংয়ে বের হবি। ব্যস‚ এটাই আমার শেষ কথা।

​“সিরিয়াসলি আম্মু?
উজান এবার মায়ের ওপর কিছুটা ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলল„ “একটা আস্ত আপদকে এমনিতেই তোমরা জোর করে আমার ঘাড়ে তুলে দিয়েছ। এখন আবারও নতুন করে উটকো ঝামেলার জন্য ফোর্স করছ? আমি আগেই পরিষ্কার বলে দিচ্ছি‚ এইসব শপিং-টপিংয়ের ফালতু ঝামেলার মধ্যে আমি একদমই নেই। আর আজ রাতে বাসায় ফিরতে আমার বেশ দেরি হবে। ফ্রেন্ড সার্কেলের সাথে আমাদের ঈদের আগের রাতের একটা বিশেষ গেট-টুগেদার পার্টি আছে।
​মৌসুমী চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন‚ “ঘরে নতুন বিয়ে করা বউ রেখে তুই মাঝরাত পর্যন্ত বাইরে বন্ধুদের সাথে পার্টি করবি?
​“আম্মু প্লিজ স্টপ। আমি তোমাদের আর কতবার বলব যে‚ না আমি এই জোরপূর্বক বিয়েটাকে মানি আর না এই ইডিয়ট মেয়েটাকে নিজের বউ বলে স্বীকার করি!
​এই বলেই উজান আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে গটগট করে সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মৌ ডাইনিং চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন থেকে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল।

​”ক্রাশ বর শপিংয়ে না যান ভালো কথা কিন্তু বিকেলে আসার সময় আমার জন্য মেহেদী নিয়ে আসবেন। আমি কিন্তু বিয়ের দিন হাতে মেহেদী ছোঁয়াতেও পারিনি। তবে আজ রাতে অবশ্যই দেবো। আপনি যদি নিজ হাতে মেহেদী এনে না দেন তাহলে আমি কিন্তু এই ঈদে হাত খালি রাখব কিচ্ছু দেবো না।
​উজান দরজার কাছে গিয়ে এক পলকের জন্যও মৌ’য়ের দিকে ফিরে তাকাল না। শুধু যাওয়ার আগে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল‚ “যা ইচ্ছে করো‚ আই ডোন্ট কেয়ার!
​”সত্যি সত্যি বলছি‚ এনে না দিলে আমি কিন্তু হাতে মেহেদীই ছোঁয়াবো না।
মৌ পেছন থেকে পা দাপাল। কিন্তু উজান ততক্ষণে ধুপধাপ পা ফেলে দেউড়ি পার হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ​উজানে’র এমন বেখায়ালি দেখে মৌ এবার শাশুড়ির সামনে গিয়ে রসগোল্লার মতো গাল ফুলিয়ে বসে পড়ল। অভিমানী সুরে বলল‚
“শাশুড়ি আম্মা আমি আগেই আপনাদের ডিক্লেয়ার দিয়ে রাখছি। আপনার ওই খিটখিটে ছেলে যদি আজ বিকেলে আমার জন্য মেহেদী কিনে না আনে‚ তবে আমি কাল ঈদের দিনে কোনো নতুন জামাকাপড় পরব না হুহ!

​মৌ-ও আর সেখানে দাঁড়াল না। রাগ করে এক দৌড়ে দোতলার দিকে চলে গেল। মৌসুমী চৌধুরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ চোখে মেহেরে’র দিকে তাকালেন। ছেলেটা কেন যে এমন অবুঝের মতো ব্যবহার করছে। মেহেরও চিন্তিত মুখে দৌড়ে মৌ’য়ের পিছু নিল।
​দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো‚ আর বিকেল গড়িয়ে ঘুটঘুটে রাত নামল তবুও উজান বাসায় ফিরল না। এদিকে মৌ নিজের রুমের দরজা ভেতর থেকে লক করে চরম মুড অফ করে বিছানায় বসে রইল। শাশুড়ি মৌসুমী চৌধুরী দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কত অনুনয়-বিনয় করলেন কিন্তু মৌ জেদের বশে দরজা তো খুলেইনি ‚উল্টো এক ফোঁটা পানিও মুখে তোলেনি। মৌ আজ সারাদিনে নিজের রাগ আর অভিমান চেপে রাখতে না পেরে শাশুড়ির ফোন থেকে উজান’কে কম করে হলেও পঞ্চাশবারের ওপর কল করেছিল। উজান প্রথমবার রিসিভ করে মৌ’য়ের গলার আওয়াজ পেয়েই কেটে দিয়েছিল আর তারপর থেকে ফোনটা পকেটে পুরে রেখেছিল। একবারের জন্যও রিসিভ করেনি। মৌ মেঝেতেই উপুড় হয়ে কাঁদতে কাঁদতে একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ​

রাত যখন প্রায় দু’টো তখন উজান অত্যন্ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে ধীরপায়ে বাসায় ফিরল। কিন্তু সে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতেই সোফা থেকে বাজখাঁই মেজাজে উঠে দাঁড়িয়ে সিংহের মতো গর্জে উঠলেন আরিফুল চৌধুরী। বাবার এমন রুদ্ররূপ দেখে উজানে’র পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অবধি কেঁপে উঠল। ​আরিফুল চৌধুরী দাঁতে দাঁত চেপে বললেন‚
“বেয়াদব ছেলে আমি কি তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি? যেখানে আজ পর্যন্ত এই বাড়ির কোনো মেয়ে বা বউকে সামান্য কথার আঘাত পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সেখানে তুই আমাদের ঘরের নতুন বউমাকে সারাদিন এভাবে কাঁদিয়েছিস? নিজেকে কী মনে করিস তুই হ্যাঁ? একজন সামান্য ভুল নারী তোর জীবন থেকে চলে গিয়েছে বলে তুই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এভাবে আরেকটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন বিষিয়ে তুলবি? মেয়েটার বাবার হাত ধরে আমি নিজে কথা দিয়ে এসেছিলাম যে ওকে আমি নিজের মেয়ের মতো রাজমোহিনী করে রাখব। কখনো কোনো কষ্ট পেতে দেবো না। অথচ তুই আমার সেই আদরের বউমার চোখে আজ ঈদের আগের রাতে অশ্রু ঝরালি?

​“ড্যাড…
​”একদম চুপ কর তুই। একটা সামান্য মেহেদী এনে দিলে তোর কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো হ্যাঁ? সারাদিন মেয়েটার ওই ফ্যাকাশে আর ক্রন্দনরত মুখের দিকে আমি তাকাতে পারিনি। সারাদিন কারো সাথে একটা কথাও বলেনি‚ এমনকি রাতে এক লোকমা ভাতও পেটে দেয়নি ও।
​বাবার মুখ থেকে মৌয়ের সারাদিন না খেয়ে থাকার কথাটি শোনা মাত্রই উজানে’র বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল। নিজের অজান্তেই তার নিজের প্রতি এক তীব্র রাগ ও অপরাধবোধ জন্ম নিল। সে মনে মনে যতই মেয়েটাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করুক না কেন কিন্তু দিনশেষে সমাজের আইন আর ধর্মের বাঁধনে এই মেয়েটি তারই বিবাহিতা স্ত্রী। উজান আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়িয়ে কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পা ফেলে আবারও বাসা থেকে বের হয়ে রাতের অন্ধকারের মাঝে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল। আরিফুল চৌধুরী রাগান্বিত চোখে ছেলের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

​প্রায় ঘণ্টাখানেক পর উজান যখন ফিরে এলো তখন তার একহাতে গুনে গুনে দশটা ব্র্যান্ডের মেহেদীর আর অন্যহাতে ঈদ উপলক্ষে একটি চমৎকার শাড়ি। মেয়েদের শাড়ি বা ড্রেসের ব্যাপারে উজানে’র বিন্দুমাত্র ধারণা নেই‚ তাই মলে গিয়ে নিজের চোখে যে শাড়িটা সবচেয়ে উজ্জ্বল আর সুন্দর লেগেছে সেটাই সে মৌ’য়ের জন্য নিয়ে এসেছে। ​ধীরপায়ে মৌ’য়ের রুমে লকটা নিজের চাবির ডুপ্লিকেট সেট দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকল উজান। রুমে ঢুকে জিরো ওয়াটের আবছা নীল আলোয় সে দেখতে পেল‚ মৌ অবোধ বাচ্চাদের মতো ঠোঁট দুটো উল্টে, কমফোর্টর ছাড়া রুমের শক্ত ঠান্ডা মেঝেতেই গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। কান্না করার কারণে তার চোখের পাতা আর মুখটা বেশ ফুলে গিয়েছে। মৌ’য়ের সেই ফোলা ফ্যাকাশে মুখটা দেখা মাত্রই উজানে’র বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত মোচড় দিয়ে উঠল। তার নিজের ওপরই নিজের ঘৃণা হতে লাগল।

সে অন্য একজনের ওপর থাকা পুরনো ক্ষোভ ও ঘৃণা উগড়ে দিতে গিয়ে একটা ছোট্ট‚ অবুঝ মেয়ের প্রতি কতটা কঠোর আর নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে। একজনের করা ভুলের শাস্তি সে অন্যায়ভাবে আরেকজন নিষ্পাপ মেয়ের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ​উজান শাড়ির প্যাকেটটা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে অত্যন্ত আলতো পায়ে মৌ’য়ের সামনে গিয়ে বসল। সে পরম মমতায় দুই হাত দিয়ে মৌ’কে পাঁজা কোলে তুলে নিল। মৌ ঘুমের ঘোরেই উজানে’র চেনা গায়ের পারফিউমের সুবাস পেয়ে তার বুকে নিজের মুখটা আরেকটু গুঁজে দিল। উজান তাকে সাবধানে এনে নরম বিছানার মাঝখানে শুইয়ে দিয়ে গায়ে কমফোর্টারটা জড়িয়ে দিল। এই গভীর ঘুমে নিমগ্ন মৌ’কে আর জাগাতে ইচ্ছে করল না উজানের। কিন্তু তার হঠাৎ মনে হলো কাল সকাল হলেই ঈদের দিন‚ এই আনন্দের দিনে সব মেয়ের হাত মেহেদীর রঙে রঙিন থাকবে অথচ তার নিজের জিদ্দি ব্যবহারের জন্য মৌ’য়ের এই ছোট্ট হাত দুটো খালি পড়ে থাকবে। এটা ভেবে উজানে’র নিজের ভেতরেই কেমন যেন একটা খটকা লাগল। মেয়েটার মলিন মুখের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়‚ তার অবুঝ মনে কতটা গভীর অভিমান জমা হয়ে আছে।

​উজান বিছানার পাশে বসে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে ভাবল। কীভাবে এই ঘুমন্ত মেয়েটার অভিমান ভাঙানো যায় এবং তার হাত দুটো রাঙিয়ে দেওয়া যায়? হঠাৎ করেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে গুগলে কয়েকটা সুন্দর ও সহজ মেহেদীর ডিজাইন দেখে নিল। তারপর একটি মেহেদী হাতে নিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও সাবধানী মনোযোগ দিয়ে মৌ’য়ের ফর্সা নরম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মেহেদী পরাতে লাগল। ​মেহেদীর ঠান্ডা ছোঁয়া লাগতেই মৌ ঘুমের ঘোরে বারবার নিজের হাতটা নড়েচড়ে সরিয়ে নিতে চাইল। তাতে অতিষ্ঠ হয়ে উজান মৌ’য়ের হাতটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে কপালে ভাজ ফেলে ফিসফিসিয়ে বকল।

প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩

​“পুঁচকে মেয়ে একটা। ঘুমের ঘোরেও একটু শান্ত হয়ে থাকতে পারে না। বিকেলে মেহেদী কিনে দিইনি বলে কত অভিমান। আর এখন উজান চৌধুরী নিজের জীবনে প্রথমবার কোনো নারীর হাত নিজ দায়িত্বে এত যত্ন করে মেহেদী দিয়ে রাঙিয়ে দিচ্ছে। তবুও এই বিড়ালের বাচ্চার শান্তভাবে ঘুমানোর নাম নেই হুহ!
​মৌ ঘুমের ঘোরে আবারও দু-একবার নড়েচড়ে উঠল। তবুও উজান তার নরম হাতটা নিজের শক্ত পেশিবহুল হাতের মুঠোয় আগলে রেখে শেষ রাত অবধি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেহেদী দিয়ে পুরো হাত ভরিয়ে দিল। যদিও ডিজাইনটা প্রফেশনাল মেহেদী ডিজাইনারদের মতো অতটা নিখুঁত হয়নি কিন্তু একজন গম্ভীর প্রফেসরের প্রথম হাতের ছোঁয়ায় তৈরি সেই নকশাটি দেখতে মোটেও খুব একটা মন্দ লাগছিল না। জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে‚ আর উজান মৌ’য়ের মেহেদী রাঙা হাতটার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি হাসল।

প্রফেসর উজান চৌধুরী ঈদ স্পেশাল