অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৭
তোনিমা খান
বেঁচে থাকার শর্তানুযায়ী ধরণীতে ছেয়ে যাওয়া ঘুঁটঘুঁটে তমসার আড়ালে দুঃখগুলোও খানিক মিলিয়ে গেল। পুনশ্চঃ জাগ্রত হওয়া চেতনা অনুভব করে, কঠিন বাস্তবতা। বাঁচতে হলে সব ভুলে হাসিমুখে বাঁচতে হবে।
অত্যাধিক মাথা ব্যাথায় ঘুম হালকা হয়ে গেল তপোবনের। আবছা অন্ধকারে চোখ মেলে তাকালে, অনুভব হয় বুকের মাঝে শুয়ে থাকা ছেলের উষ্ণতা।
চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছে। ক্ষীণ এক নিঃশ্বাস ফেলে কপালে দীর্ঘক্ষণ ঠোঁট চেপে রাখে। ছেলেটা চোখের পলকে বড় হয়ে গিয়েছে। কখন সন্তান নিজ ব্যক্তিত্বে বলীয়ান হয়ে বাবার থেকে দূরত্ব করে নেয় জানে! তাই মাঝেমধ্যে তৃষ্ণা মিটিয়ে ছেলেকে আদর করার চেষ্টা করে। কিন্তু সব চেষ্টা কি সবসময় সফল হয়?
মাঝেমধ্যেই সৃষ্টিকর্তার কাছে অবুঝ আর্জি জানাতে ইচ্ছে হয়—তার সন্তানটি এমনি ছোটো থাকুক আর সে যেন জীবনভর এমনি পিতৃস্নেহে বক্ষমাঝে আগলে রাখবে। কখনো আদর করতে কোনো দ্বিধাবোধ কাজ করবে না। তবে এগুলো যে নিতান্তই অবুঝপনা!
পুনশ্চঃ ছেলের কাঁটা কাঁটা চুলগুলোতে হাত গলিয়ে চোখ বুজতে গেলে চোখে বাঁধে অদ্ভুত এক দৃশ্য। সোফায় কোনো নারী অবয়ব অনুভব করায় তার কপালে ভাঁজের সৃষ্টি হয়। সে পলক ঝাপটায়, নিজের ভাবনা সত্য না-কি মিথ্যা প্রমাণ করতে হাত বাড়িয়ে ল্যাম্প জ্বালালে দৃশ্যমান হয় সোফায় গুটিয়ে শুয়ে থাকা স্নিগ্ধ এক মুখশ্রী। গভীর রাতের কনকনে শীতের প্রকোপ মৃদু কাঁপছে রূপকথা।
ঘুম জড়ানো চোখে হতবাক তপোবন তড়িৎ গতিতে ছেলেকে শুইয়ে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে আসে। সোফার কাছে যেতে যেতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পাতলা কাঁথা পেঁচিয়ে শুয়ে আছে। মেয়েটি এখানে কি করছে?
ঘুমন্ত ছেলের পানে আরেকবার তাকিয়ে সে রূপকথাকে পাঁজাকোলে তুলে নিলো। দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিয়ে কম্ফোর্টার জড়িয়ে দেয় গায়ে। নিজেও শুয়ে পড়ে তার পাশ ঘেঁষে। এবং কিছুটা স্বল্প বদঅভ্যাসের জোরেই মেয়েটির পেট জড়িয়ে বক্ষমাঝারে নিয়ে আসে। নয়তো কিছুক্ষণ পরে মেঝেতে পাওয়া যাবে।
ব্যথায় ফেটে যাওয়া মাথা নিয়ে চোখ বোজে। সেই ছোট্ট বেলা থেকে ভাঙতে ভাঙতে এভাবেই সে দিনশেষে কিছু একটা কুড়িয়ে নেয় বেঁচে থাকার জন্য!
তখন রাতের দ্বিপ্রহর। চাপিয়ে রাখা দরজাটি খুলে এরোজ ধীরপায়ে ঘরটিতে ঢোকে। যেই ঘরটিতে ঢুকলে মনে হয় শত অপ্রাপ্তি, ক্লেশের মাঝেও পৃথিবীটা খানিক সুন্দর!
সাদা ট্রাউজার, সাদা টিশার্ট পরিহিত পুরুষটি স্মিত হাসল গুটিয়ে শুয়ে থাকা তানশানের ফোলা ফোলা মুখ দেখে। কেঁদেছে কি-না! বছরের এই কিছু বিশেষ দিনেই ছেলেটিকে কাঁদতে দেখা যায়। আর তারা মোটেও বাঁধা দেয় না।
মাথার কাছে এক প্যাকেট বুবু লুবু চকলেটের বক্স সহ আর একটি গিফট বক্স রেখে সে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে। চুলের গোছায় হাত গলিয়ে দিয়ে পাশে ভাঁজ করে রাখা চিঠিদুটো বেদনা মিশ্রিত হাসিমুখে পড়ে। তার ভাবিজান আমোদপ্রমোদ প্রিয় এক মানুষ ছিল। এই বাড়ির সৌন্দর্য ছিল। দ্বিতীয়বার জীবন শুরু করা তার জন্য অসম্ভব হলেও সে খুব করে চায় তার তানশান আর বড় ভাইজানের জীবনে দ্বিতীয়বার সুখের কারণ হয়ে উঠুক তার ছোট্ট দেখতে বড় ভাবিজান। জীবনে চরম অসুখী সে, সবাইকে ভালো থাকতে দেখতে চায়।
অতি ঠান্ডা স্পর্শে তানশান নড়েচড়ে উঠল। চেতনা ফিরতেই মনে হলো মাথাটা ব্যথায় ভারী হয়ে আছে। সে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালে এরোজের হাসিমুখটি ভেসে উঠল। মৃদু উদ্বেগ দেখাগেল তানশানের মাঝে। সে কিছু বলতে গেলে এরোজ তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
–“হ্যাপি বার্থডে, প্রিন্স। প্রথমবারের জন্য ছোট পাপাকে পিতৃত্ব অনুভব করানোর জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।”
তানশান জড়ানো কণ্ঠে শুধায়,
–” তুমি এসেছ? এতদিন কোথায় ছিলে? আমি তোমায় মিস করেছি।”
এরোজ ম্লান হাসল। ফাঁকা ঢোক গিলে বলল,
–“আসতেই হতো! এই দিনটার জন্য যে ছোট পাপা এতদিন ছটফট করছিলাম। তোমার জন্মদিন শেষ! এখন ছোট পাপার যাওয়ার সময় ও এসে গিয়েছে।”
তানশানের মুখশ্রীতে বিষন্নতা ছুঁয়ে গেল। সবসময় কেন সবাই ছেঁড়ে চলে যায়? সে টলটলে নেত্রে চেয়ছ বলল,
–“প্লিজ ডোন্ট গো!”
–“ছোট পাপা শুধু তোমার আর নায়েলের জন্মদিনের জন্য এসেছিলাম তানশান।”
–“কিন্তু নায়েলের জন্মদিন আগামী মাসে।”
এরোজ এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল কথার প্যাঁচে হার মানতে গিয়ে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“ছোট পাপা ইজ হার্মফুল ফর বোথ অফ ইউ। আই হ্যাভ টু গো তানশান।”
পল্লব ভিজে ওঠা নয়নে তানশান ফিসফিসিয়ে বলল
–“বাট আই একসেপ্ট ইউ, হোয়াট ইউ আর!”
–“বাট আই ডোন্ট! আই ডোন্ট একসেপ্ট মাইসেল্ফ তানশান। ছোট পাপার দম বন্ধ হয়ে আসে এখানে। তুমি কি চাও ছোট পাপা কষ্ট পাই?”, এরোজ হাঁসফাঁস করে বলল। লালচে অক্ষিপটে তখনো ভাসছে দুই জোড়া ভয়ার্ত দৃষ্টি। দম বন্ধকর অনুভূতিতে ঘেমে ওঠে এরোজ।
তানশান ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“নো।”
এরোজ স্মিত হাসল। ঠিক এভাবেই ম্যানুপুলেট করে আজ এত বছর যাবৎ এই চমৎকার মানুষটাকে নিজের থেকে দূরে রাখছে। সে পুনরায় কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
–“খুব দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছো তুমি! হয়তো এর পরেরবার আর এমন আদর করার পর্যায়ে থাকবে না। তাই এবার মন ভরে আদর করে যাব যেন পুনরায় দেখা হোক বা না হোক, কোনো তৃষ্ণা না থাকে।”
–“আমি তোমার কাছে পড়তে যাব।”, তানশান বরাবরের মতো একই আবদার করে। এরোজ হাসিমুখে বলল,
–“ছোট পাপা বেঁচে থাকলে অবশ্যই যাবে। নয়তো পাপার কাছে থেকেই পড়াশুনা শেষ করবে। তোমার পাপার তুমি ছাড়া আর কেউ নেই তানশান।”
–“তুমি সবসময় এমন কথা কেন বলো? কেন আমায় ছেড়ে যাওয়ার কথা বলো সবসময়? সবাই কেন আমায় ছেড়ে যাও শুধু?” তানশান আর অশ্রু ধরে রাখতে পারে না। এরোজ গড়িয়ে পড়া নোনাজল গুলো আলতো হাতে মুছে নিয়ে বলে,
–“কিছু মৃত্যু হয় ভীষণ প্রশান্তির। আর তোমার ছোট পাপার সকল দুঃখের সমাধান। এত কাঁদবে না তানশান। ছোট পাপার একটুও পছন্দ না তোমায় কাঁদতে দেখা।”
–“তবে ছেড়ে যেওনা। থেকে যাও না!”
–“থেকে যাওয়ার কারণগুলো একদিন ভাগ্য ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তবুও ছোট পাপা শুধু তোমার জন্য ফিরে আসি। আর কোনো আবদার করবে না তানশান। ছোট পাপার রাখার ক্ষমতা নেই।”
এরোজ অশ্রুসিক্ত নয়নের ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল। পুনরায় মৃদু হেসে বলল,
–“কাঁদছ কেন? এখনি যাচ্ছি না। টিকিট কাটতে এখনো কিছুদিন লাগবে।”
তানশান জোড়ালো হাতে আঁকড়ে ধরে চাচার হাত। এরোজ ম্লান হেসে তার সাথেই শুয়ে পড়ে। চাচা ভাতিজা একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ছোটবেলায় এমন কতশত রাত চাচার বুকেই কাটিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ভাইজান ক্লান্ত হলে সে নিতো, সে ক্লান্ত হলে ভাইজান নিতো।
তানশান ফের ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে আরামের ঘুম কি হয় এটা ভুলে যাওয়া পুরুষটি আজ ও ঘুমাতে পারল না। এরোজ নীরবে তানশানকে রেখে বেরিয়ে আসে কক্ষ থেকে। নিজের কক্ষে ঢুকলে ভ্যাঁপসা গন্ধ নাসারন্ধ্রে অস্বস্তি তৈরি করল।
সেদিনকার সর্বসুখী ইমরোজকে দেখার পর থেকে ঘরে আর পা রাখেনি।
আড়ষ্ট বদনে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে হাঁটতে হাঁটতেই কাবার্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সাজিয়ে রাখা বোতলগুলোর মধ্য থেকে ছোট্ট একটা বোতল হাতে নিয়ে তাতে বিলম্বহীন এক সিপ মুখে তোলে। কাবার্ড বন্ধ করতে গেলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বহু বছর যাবৎ তালাবদ্ধ একটা ড্রয়ার!
এরোজ পা গুটিয়ে বসে মেঝেতে। অলসতার সাথে কাবার্ডের সবচেয়ে নিচে থাকা বদ্ধ এক ড্রয়ার খুললো। খুলতেই ভেসে উঠল সোনালী এক বক্স! ওষ্ঠকোনে ক্ষীণ হাসি অথচ অক্ষিকোটরে মৃদু নোনাজলের আভাস। সে ধীরস্থির বক্সটিকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে খুলতেই চোখ ঝলসে গেল কারুকার্য খচিত এক লাল বেনারসির চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য!
আলতো হাতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে পুরো শাড়িটা। বহু বছর পুরাতন! অথচ শাড়িটা আজও প্রথমদিনের মতো জ্বলজ্বল করছে, ঠিক যেমন তার যন্ত্রনাগুলোও আজও প্রথম দিনের মতো তীব্র!
সে পাশের আরেকটা ড্রয়ার খোলে ক্ল ক্লিপে ভরতি ড্রয়ারটিও অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে। এরোজ হাত পা ছেড়ে তাকিয়ে রইল সেদিকে। চোখে ভাসছে কতশত দেখা অদেখা স্বপ্নগুলো! একটাসময় নোনাজলগুলো ভার সইতে না পেরে হুঁ হুঁ করে বেরিয়ে আসে। অনুযোগ ভরা অবুঝ কণ্ঠে আওড়ায়,
–“কেউ কি করে আমার সাজানো গোছানো জীবনটা ছিনিয়ে নিতে পারে? তুমি তো জানতে আমি কত স্বপ্ন বুনেছিলাম তবে কি করে এমনটা হতে দিলে?”
উন্মত্তের ন্যায় এরোজ আজও ঠিক প্রথম দিনের মতো তীব্র অনুভূতির তাড়নায় তরপায়, সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ জানায়। কিন্তু দিনশেষে কোনো জবাব আসে না। এবং সবসময়ের মতোই দিনশেষে এরোজ শূন্যহাতে একবুক হাহাকার নিয়ে পড়ে থাকে। সাথে থাকে একটু স্বস্তি দেয়ার সঙ্গী হিসেবে কিছু নিষিদ্ধ পানীয় কিংবা কিছু অতি মাত্রার নেশা দ্রব্য!
রাতের দূর্বিষহ প্রহরগুলো কাটানোর পর তনশানের অজশ্র স্বপ্নে মোড়া ঘুম ভাঙে মাতৃসুলভ এক সুমিষ্ট কণ্ঠে। স্বপ্নগুলো বুঝি এই বাস্তবতা হয়ে ধরা দিলো।
“তানশান! তানশান! আব্বু, এখন ওঠো। নামাজের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। জন্মদিনের দিন আজ! নামাজ না পড়তে পারলে, সারাটাদিন মন খারাপ করে থাকবে।”
চুলের গোছায় অনবরত কারোর এলোমেলো হাত বুলানোতে স্নেহের আভাস। মাতৃসুলভ প্রবল অধিকারবোধ মিশ্রিত কণ্ঠে আধো আধো নয়ন মেলে তাকায় তানশান। অচল মস্তিষ্কে মা ব্যতীত আর কারোর অস্তিত্ব নেই। মায়েরা এত শক্তিশালী কেন হয়? অবচেতনেও মস্তিষ্কে তাদের দুর্ধর্ষ রাজত্ব চলে! চেতনাহীন কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
–“মাম্মা?”
–“জি মাম্মা, এখন ওঠো। আজান দিয়েছে অনেক সময় হয়েছে, আব্বু! জামায়াত মিস হয়ে যাবে। তোমার পাপাও আজ ঘুম থেকে উঠছে না। কি আশ্চর্য! বাইরে সকলে মিলাদের আয়োজনে ছোটাছুটি করছে আর তোমরা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ দু’জন পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছো?”, পুনশ্চঃ সেই মাতৃসুলভ চঞ্চল কণ্ঠে মস্তিষ্ক পাগলা ঘোড়ার ন্যায় ছুটতে লাগল। সে কি উচ্ছ্বাস ভরা বদনে উঠে বসে ছেলেটি।
তবে কি সৃষ্টিকর্তা কি তার রাত ভরের চেতনায়, অবচেতনে করা দোয়াগুলো কবুল করে নিয়েছে? তার মাম্মাকে পাঠিয়ে দিয়েছে? আধো অস্পষ্ট জড়ানো নয়নে তাকায় এদিক সেদিক। উচ্ছ্বাস নিয়ে শুধায়,
–“মাম্মা তুমি এসেছো?”
তবে তানশানের সকল উচ্ছ্বাসকে মলিন করে দেয় পাশে বসা রূপকথা নামক নারীটি। তানশানের মুখশ্রী অদ্ভুত তমসায় ঢেকে গেল। ছেলেটির নিভে যাওয়া চঞ্চল দেহ উপেক্ষা করে রূপকথা এলোমেলো চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে স্নেহের কণ্ঠে বলে,
–“মাম্মা তো এখানেই আছি। চলো উঠে পড়ো। তাড়াতাড়ি ওজু করে আসো। আমি তোমার পাপাকে ডেকে তুলছি।”
তানশান তখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রূপকথার পানে। মস্তিষ্কের চেতনা ফিরেছে বহুক্ষন। তবে সম্মুখের এই অচেনা মাতৃরূপ তাকে বিভ্রান্ত করে তুলছে। রূপকথা ব্যস্ত গতিতে এদিক সেদিক পড়ে থাকা কাপড় চোপড় গুলো তুলতে তুলতে তাড়া দিয়ে বলে,
–“কি হলো? উঠছো না কেন? আলসে ছেলে! সয়তান নিশ্চয়ই বাঁধা দিচ্ছে তাই না? দাঁড়াও দেখাচ্ছি ঐ ইবলিশকে!”
দ্রুতকদমে মেয়েটি পুনরায় এগিয়ে আসে তানশানের কাছে। উচ্চস্বরে দোয়া দরুদ পড়ে তানশানের হতবাক অনুভূতি মিশ্রিত মুখের উপর ফুঁ দিতেই হকচকায় তানশান। স্থবিরতা ভেঙে নড়েচড়ে উঠল সে। ফোলা ফোলা লালচে মুখটি তুলে তাকায়। অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–“কি করছেন?”
রূপকথা এক গাল হেসে বলল ,
–“ইবলিশকে তাড়াচ্ছি। দেখেছ, চলে গিয়েছে না? এখন ওঠো! তোমার পাঞ্জাবি পায়জামা সোয়েটার এখানে রেখেছি। এগুলো পড়েই একেবারে বের হও। এই শীতে বারবার কাপড় বদলানো কষ্টকর।”
রূপকথা পাঞ্জাবী পায়জামা সোফায় রাখে। তানশান অবাকের রেশ আঁকড়েই বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। ঘড়ির দিকে তাকালে পায়ের গতি দ্বিগুণ হারে বেড়ে যায়। তবে আড়চোখে আরেকবার পর্যবেক্ষণ করতে ভুললো না বদলে যাওয়া আচরণের নারীটিকে।
রূপকথা দ্রুত কদম ফেলে নিজের ঘরে ঢোকে। তখনো কম্ফোর্টার মুড়ি দিয়ে তপোবনকে ঘুমাতে দেখে সে কিছুটা উঁচু স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
“তানশানের পাপাআআ! জামায়াত শেষ হয়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি উঠুন, এখন ওয়াক্তটাও যাওয়ার পালা।”
তীব্র মাথা ব্যথার প্রকোপে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তপোবনের নিশ্চল মস্তিষ্ক সহ স্নায়ু সরব হকচকায় অদ্ভুত সম্বোধনে। বিলম্বহীন মুখের উপর থেকে কম্ফোর্টার নামায় সে। অবুঝপানে তাকিয়ে হড়বড়িয়ে শুধায়,
–“কি হয়েছে? সকাল হয়ে গিয়েছে কি? আমি কি আজ ফজরের নামাজ মিস করে ফেলেছি? মিলাদের সব কাজ কি সম্পন্ন হয়েছে?”
কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথা চোখমুখ কুঁচকে দেখে, বাচ্চাসুলভ অবুঝ আদল ভর করা বুড়ো লোকটিকে। তেরছা দৃষ্টি ফেলে বলে,
–“জি—না, মশাই! কোনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। যাদের জন্য সবকিছু করা হচ্ছে তারাই তো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে! উঠুন ফজরের নামাজের সময় এখনো আছে।”
তপোবন হড়বড়িয়ে মাথা নেড়ে বিছানা থেকে নেমে এক ছুট লাগায় ওয়াশরুমে। ওজু করে বের হতেই রূপকথা ব্যস্ত গতিতে এগিয়ে আসে। তোয়ালে সহ এক সেট পাঞ্জাবি পায়জামা এগিয়ে দিয়ে বলে,
–“এটাই তো পড়বেন তাই না? নিন। বাবা ছেলে আজ এভাবে কুম্ভকর্নের মতো ঘুমালেন কি করে? এমনি সময় তো হুতুম পেঁচার মতো, আমার আগে উঠে বসে থাকেন। অথচ আজ এত গুরুত্বপূর্ণ দিনে বাবা ছেলে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছেন।”
বলতে বলতেই রূপকথা ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। তপোবন এক পলক তাকিয়ে দেখে অত্যাধিক ব্যস্ততায় মুখরিত মানবীকে। কথার ধরণ, আচরণে আত্মবিশ্বাস আর অধিকারবোধের আভাস পেল কি? নিজের ভাবনা ভাবনাতেই থেকে গেল সময়ের স্বল্পতার কারণে।
তানশান দ্রুত তৈরি হচ্ছিল। রূপকথা ত্রস্ত পায়ে তার ঘরে ঢুকতেই তানশান তড়িঘড়ি করে পাঞ্জাবি পড়তে পড়তে মৃদু চেঁচিয়ে উঠল,
–“আরে, নক করে আসবেন না?”
রূপকথা কপাল কুঁচকে বলে,
–“আমি কি অপরিচিত, পর কারোর ঘরে এসেছি? ছেলের ঘরে এসেছি। আর ছেলের ঘরে আসতে হলে মাকে নক করতে হবে এমন দিন এখনো আসেনি। নক করব তখন— যখন সুন্দর দেখে একটা বউ আনব। তার আগে ভুলে যাও এসব নক টক!”
তানশান বোকা বনে গেল রূপকথার কথায়। সে তড়িঘড়ি করে পাঞ্জাবিটা পড়ে, নিট কার্ডিগানটা পড়ে নেয়। রূপকথা সেদিকে একপলক তাকিয়ে টেবিলের উপর রাখা কানটুপিটা নিয়ে তার কাছে এগিয়ে যায়। তানশানকে আরো দ্বিগুণ বিব্রত করে সেটি জোরপূর্বক পড়িয়ে দেয় মাথায়। তানশান বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। একটানে টুপিটা খুলে ফেলে বলল,
–“আমি এটা পড়ব না। আমি বাচ্চা নই।”
রূপকথা নির্বিকার তানশানের হাত থেকে টুপিটা নিয়ে আবারও জোরপূর্বক পড়িয়ে দেয়। শানিত কণ্ঠে বলে,
–“বেশি কথা বলো না, তানশান। আমি যতটুকু জানি, তোমার পাপা এই টুপি ছাড়া তোমায় ঘরের বাইরে যেতে দেবে না। সময় নেই— অথচ তোমরা বাবা ছেলে আজ এত গুরুত্বপূর্ণ দিনটাতে ঢং করছো?”
–“ঢং? ঢং তো মেয়েরা করে!”, তানশান কপাল কুঁচকে বলে।
রূপকথা রাগ ঝেড়ে বলল,
–“হুঁ, তুমি মেয়েদের মতোই ঢং করছ।”
তানশান অবাকপানে বলে,
–“আশ্চর্য! আমি মেয়েদের মতো ঢং করি?”
–“হ্যাঁ করো।”
রূপকথা গায়ে মাখে না ছেলের কথা। সে নিজ কর্মে মগ্ন। সে হাতে করে আনা আঁতরটি ছেলের গলদেশের দুই পশে ঘঁষে দেয়। অতঃপর স্মিত হেসে বিনম্র কণ্ঠে বলে,
–“শুভ জন্মদিন আব্বু! পৃথিবীর সব সুখ তোমার হোক!”
তানশান ইতস্তত নয়ন তুলে তাকায়। মিহি স্বরে বলে,
–“ধন্যবাদ।”
রূপকথা মিহি শুধায়,
–“উপহার হিসেবে তোমার কি চাই?”
–“কিছু না। আমার সব আছে।”
তানশানের কথায় রূপকথা মৃদু হাসল। বলল,
–“তোমার কাছে সব নেই।”
তানশান অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–“কি নেই?”
রূপকথা চমৎকার হেসে বলল,
–“তোমার কাছে যেটা নেই সেটা আমার কাছে আছে। আর সেটা তুমি ধীরে ধীরে পেয়ে যাবে। কিন্তু আপাতত আমার কাছে তোমায় দেয়ার মতো মূল্যবান কোন কিছু নেই। তবে এই একটা ছোট্ট জিনিস আছে। যেটা আমার কাছে অমূল্য। আর আমার সবকিছু তো আমার ছেলের তাই না? এটা তোমার! তোমার নানুভাইয়ের আংটি এটা। তোমার কাছে রেখে দিও।”
স্বর্নের একটা সাদাসিধে আংটি তানশানের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল রূপকথা। বাবার স্মৃতি বলতে এতটুকুই ছিল তার মায়ের কাছে। যেটা বিয়ের সময় মা তাকে দিয়েছিল। তানশান অস্বস্তি ভরা চাহনিতে এক পলক দেখে সম্মুখের নারীটিকে। এই যে বদলে যাওয়া আচরণগুলো তাকে ভীষণ বিব্রত করছে। সে এতে অভ্যস্ত নয়। তাই অনভ্যস্ততা আঁকড়েই গম্ভীর গলায় বলে,
–“এটা আমার প্রয়োজন নেই। আপনি দোয়া করবেন আমার জন্য, তাতেই হবে।”
–“কেউ উপহার দিলে ফিরিয়ে দিতে হয় না, তানশান।”, বাবার ভারী কণ্ঠে তানশান চকিতে দরজার দিকে তাকায়। গায়ে চাদর জড়াতে জড়াতে তপোবন দরজার সামনে থেকে কয়েক পা এগিয়ে আসে। তানশানকে বাড়তি কথা বলার প্রয়োজন পড়ে না। তার আগেই সে মিনমিনে স্বরে বলে,
–“ধন্যবাদ।”
রূপকথা মৃদু হেসে তার মাথার চুল এলোমেলো করে দেয়। হাসিমুখে বলে,
–“মাকে আবার ধন্যবাদ! যাও নামাজে যাও।”
তানশান ফের ভ্রু কুঁচকে তাকায় রূপকথার দিকে। চুলে হাত দেয়া, নাকে, কানে হাত দেয়া তার অপছন্দ। আর সকলে সেটাই কেন বেশি করে? তার থেকেও অদ্ভুত অস্বস্তি লাগে সম্মুখের মানুষটির মুখে মা সম্বোধন শুনতে। মা ডাকা কিংবা মা হয়ে ওঠা যে এত সহজ নয়।
বাবা ছেলে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। তারা যেতেই রূপকথা দেয়ালে এঁটে থাকা তানশানের ছোটবেলার ফোকলা এক ছবির দিকে দৃষ্টি রাখে। মৃদু হেসে আওড়ায়,
–“তোমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সত্ত্বা ‘মা’ নামক মানুষটাই নেই। আমি নাহয় তোমার জন্মদিনের উপহার হিসেবে তোমার মা হবো।”
যেতে যেতেও ফিরে আসা তপোবনের পা থেমে যায় সেই মিষ্টি উপহার কর্নগোচর হতেই। ওষ্ঠকোনে স্মিত হাসি নিয়ে তাকায় আধখোলা চুলগুলো পুরোটা খুলে খোপা করতে ব্যস্ত রমনীর পানে। তবে কি এই আত্মবিশ্বাস, এই অধিকারবোধ তানশানের মা হয়ে ওঠার জন্য? ছোট্ট মেয়েটির বিশাল এই মনোভাবে শুধু এতটুকু বলল,
–“আমি নাহয় প্রতি মোনাজাতে চাইবো তুমি জিতে যাও। আর তানশান তোমার উপহার গ্রহণ করুক।”
সে আবার পথ ঘুরিয়ে বেরিয়ে যায়।
নামাজ শেষে সেন্টার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ানো রূপকথা গায়ের ভর ছেড়ে বুক ভরা শ্বাস ফেলল। এতক্ষণের নির্লিপ্ততার প্রলেপ ভেঙে যায়। ফিরে আসে সেই ভীতু, জড়তা, অস্বস্তি ঘেরা ব্যক্তিত্বে। এতোক্ষণ যাবৎ গলধঃকরন করেছিল এই ব্যক্তিত্বটাকে। সে জানে মা হয়ে ওঠা সহজ নয়। কিন্তু চেষ্টা করতে কি সমস্যা! তবে আজ এতটুকুতেই মনে হচ্ছে কাজটা অনেক কঠিন। তবুও সে হার মানবে না। সে দৃঢ় কণ্ঠে নিজেকে সাহস দেয়,
“তোকে পারতেই হবে রূপকথা।”
এই স্বামী, সন্তান, সংসার এখন তার। এটাই তার জীবনের মানে। তবে কিসের এতোষ জড়তা! তাকে নিজের অধিকার আদায় করে নিতে হবে। বয়স, পরিস্থিতি এগুলো কোনো বাঁধা হতে পারে না। সম্পর্কের ভিত্তি গুলোই হলো আসল। তানশান মানুক বা না মানুক, সে তানশানের মা। আর এখন থেকে তানশানের জীবনের ছোট ছোট প্রতিটা বিষয়ে সে নাক গলাবে এবং পাশে থাকবে। এই সংসার সহ মানুষগুলোর মাঝে নিজের কতৃত্ব বাড়াতে হবে। বিনিময়ে সে সকলের কষ্ট শুষে নেয়ার চেষ্টা করবে। আজ থেকে আর উদাসীনতা, ইতস্ততা নয়।
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৬
দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েই সে কোমড় বেঁধে নেমে পড়ে নিজের সন্তান সহ এই সংসারটির হাল ধরতে। তানশানের পুরো ঘর গুছিয়ে সে নিজের ঘরে যায়। বিছানার কাছে যেতেই লাজে কুঁকড়ে গেল। প্রভাতের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মুহুর্ত মনে পড়তেই। তার ঘুমের ধরণ খারাপ। এর জন্য প্রতিরাতে কতো সাবধানে ঘুমায়। কিন্তু সেই অঘটন তো ঘটেই গেল। আজ সে নিজেকে তানশানের বাবার পেটের উপর ঘুমানো অবস্থায় পেয়েছে। তারচেয়েও অবাক করা বিষয় ছিল, পুরুষালী একটি বলিষ্ঠ হাত তাকে নিজের সাথে আগলে রেখেছিল। তখন মাটি খুঁড়ে এক গজ জমিনের নিচে চলে যাওয়ার মতো অবস্থা ছিল তার।কিন্তু এবারে ভাগ্য তার সহায় ছিল। তানশানের পাপা গভীর ঘুমে ছিল। সে কিছুই দেখেনি। এযাত্রায় বেঁচে গিয়েছে আজ থেকে আর এই ভুল হবে না। দরকার পড়লে পড়ে যাবে নিচে, ব্যথা সহ্য করে নেবে তবুও কোলবালিশটা নিজেদের মাঝে রাখবে।
